Categories
Uncategorized

প্রবাল ঘেরা রুপালী দ্বীপে…

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে চার পাশের নীল পানিকে পাড়াপ্রতিবেশী বানিয়ে যে প্রবালদ্বীপের বসবাস সেটাই কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের রুপালী দ্বীপ। পূবের এলোমেলো পাহাড় আর পশ্চিমের ঢলঢলে সাগরের মাঝখানের অংশে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল নিয়ে নিত্যদিনের জোয়ার ভাটায় বছরের পর বছর ধরে গা ভিজিয়ে চলছে এই নারিকেল জিঞ্জিরা। মজার ব্যাপার হলো দুনিয়ার আর কোথাও এত প্রজাতির প্রবাল একসাথে পাওয়া যায় না।এই নীল সাগরের সাদা বালি আর টুকটুকে লাল কাঁকড়া দেখার টানে এর আগে অনেকবারই ছুটে গিয়েছিলাম অমাবশ্যার চকচকে তারা ভরা আকাশের স্বপ্নদ্বীপ সেন্টমারটিন্সে।

এত আশা, এত উন্মাদনা, এত স্বপ্ন নিয়ে সেন্টমারটিন্সে ছুটে যাওয়ার পর সেখানের বালিতে পা ফেললেই কারোরই আর কিছু করার থাকেনা। খুব ছোট এই দ্বীপটা চাইলে পায়ে হেঁটেই ৩ ঘন্টার মধ্যে পুরোটা ঘুরে ফেলা সম্ভব। তাই যারা সকালে গিয়ে বিকেলেই ফেরত চলে আসেন তাঁরা আসলে সেন্টুর কোনো মজাই পান না, সেন্টুর আসল মজা লুকিয়ে আছে এর বিকেল আর রাতগুলোতে। বিকেল বেলায় ভাটার টানে যখন সব পানি স্কুল ছুটির মতন হুড়হাড় করে পালিয়ে যেতে থাকে তখন প্রবালের খাঁজে খাঁজে এক হাঁটু পানিতে আটকে পড়ে রংধনু রঙের ছোট ছোট অনেক মাছের দল। পানি এতই স্বচ্ছ যে দেখেই মনে হয় মাছগুলো মিনারেল ওয়াটারের মধ্যে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শেষ বিকেলের এই মাছ দেখা সময়টা কাটতে না কাটতেই তারার উঠোন নিয়ে চলে আসে রাত্রির আয়োজন। সেখানে রাতের জ্যোৎস্না এসে জড়িয়ে ধরে চিকচিকে বালির সারা গা, নীরব নিথর কেয়া বনে শাঁ শাঁ করে ছুটে যায় ব্যস্ত বাতাস, সাগরের ফেনা আছড়ে পরে রুক্ষ প্রবালের গায়ে – সেখান থেকে বালিতে চেয়ার ডুবিয়ে বসে থাকা আমাদের পায়ে, গায়ে, পুরো শরীরে… চাঁদের আলো গায়ে মাখা এই রুপালী দ্বীপে যে একবার জ্যোৎস্না দেখেছে সে জেনেছে পূর্ণিমা কি জিনিস, সে বুঝেছে চাঁদের হাসি কাকে বলে। এলোমেলো বাতাসে ভোলাভালা চুলগুলো পেছনের দিকে ছুটে গিয়ে চোখগুলোকে যখন টানটান করে তোলে তখন আরো ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে জাপটে ধরি ক্রমশ চলে যেতে থাকা নির্ঘুম রাতটাকে।

সেন্টমারটিন্সের সকালটা বাংলাদেশের আর সব জায়গার সকাল থেকে আলাদা। খুব ভোরে সুয্যিমামা জাগার আগেই মর্নিং ওয়াকে বের হয় লালকাঁকড়ার দল, তাদের নিজ পায়ে করা শিল্পকর্ম যদি তারা নিজেরা কোনোদিন দেখতো তাইলে এই দুনিয়াতে আর কোনো চিত্রশিল্পী পুরস্কার পেতেন না।

সেন্টমারটিন্সে আমরা যাই দুইটা কাজ করার জন্য। এক দেখা আর দুই হলো খাওয়া। বাংলাদেশের আর সব আনাচে কানাচে গিয়ে খাওয়া নিয়ে বাছবিচার করলেও সেন্টুতে গিয়ে আমরা উদরপূর্তির বিষয়টাতে রীতিমতন উদার হয়ে যাই। সারাদিন ছেঁড়াদীপে টই টই করে ঘুরে পেটে রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে সন্ধ্যের সময় ফিরলাম বাজারে। উদ্দেশ্য মাছের বার-বি-কিউ খাবো। মাছ দেখে চক্ষু চড়ক গাছ– কি বিশাল সাইজ একেকটার ! দোকানীর প্লেটে শুয়ে শুয়ে আমাদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে দেড়-দুই কেজি ওজনের রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, কালাচাঁদা আর কোরালগুলো। লাইটের আলোয় চকচক করতে থাকা মাছগুলোর দিকে আমরা দিগুণ লোভনীয় দৃষ্টি ঢেলে দাম জানতে চাইলাম, ব্যাপক দর কষাকষি শেষে দুইটা বিশাল সাইজের মাছ কিনলাম ৮৫০ টাকা দিয়ে, জীবনের সেরা বার-বি-কিউ খেলাম সেদিন।  ফোলা পেট নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে যখন সাগরের কিনারে এসে পা ডুবিয়ে দাঁড়ালাম, তখন ভরা পূর্ণিমার চাঁদকেও আড়াল করে দিলো উত্তর-দক্ষিনে সোজা চলে যাওয়া দুধ সাদা ছায়াপথ। তার সাথে তাল মিলিয়ে সোনালী চাঁদের রুপালী আলোতে থৈ থৈ করে নাচতে থাকা বঙ্গোপসাগর জানান দিলো আর দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দর জায়গাগুলোর একটাতে কি নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যায়। চোখের তারায় কি চরম আশ্চর্য নিয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়া যায় চাঁদ তারার এই সলিল দেশে, নীল সাগরের সাদা বালির এই প্রবালের দেশে…

For More Photos, please click here…