Categories
Uncategorized

গঙ্গামতির বালুচরে…

বালি জিনিসটা পায়ের তলাতে থাকলেও এর গুণের কোনো শেষ নেই। বালি দিয়ে বাড়ি বানানোর পাশা-পাশি মুড়িও বানায় কেউ, কেউবা সেই মুড়ি খাওয়ার পর কোনো কাজ না পেয়ে বালি দিয়েই সাগরপাড়ে বানায় ক্ষণিকের বসতি। সাগর আর বালির মাঝে এই বন্ধুত্ব একেবারে আদিকালের। সমুদ্র তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ভাটার সময় যখন দূরে চলে যায়, সেই ক্ষণিকের বিচ্ছেদেই বালির রং হয়ে যায় ধবধবে সাদা, আর বাকিটা সময় সাগর স্পর্শে প্রাণ ফিরে পাওয়া বালির রং হয় নিমেষ ঘোলাটে। ঐ ঘোলা বালিতে এলো-মেলো পা ফেলে সাগরের দিকে ছুটে গিয়ে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। সে আশাতেই এবারে ছুটে গিয়েছিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। কিন্তু আসল সাগরের সেই তুলতুলে সৌন্দর্য্য কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে কি আর পাওয়া যায় ! যেতে হবে আরেকটু দূরে, একেবারে নিরিবিলি সৈকতে – যেখানে নিরেট বালির হাতছানি আর নিটোল সবুজের গুণগুনানির সাথে কাত পাতলে শুনতে পাওয়া যায় চিরতরুণ বঙ্গোপসাগরের দুরন্ত ফিসফিস। পলাতক শেয়ালের ভীত পায়ের ছাপ আর উৎস্যুক বানরের বোধগম্যহীন ডাক আপনাকে ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দিবে – স্বাগতম গঙ্গামতির চরে…

কুয়াকাটা হলো বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে একই সাথে সূর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখা যায়। বাংলাদেশের সবচাইতে শান্ত সৈকতও এই কুয়াকাটা। কিন্তু এখানে গেলে কেউই আর শান্ত থাকেনা, ছুটে বেড়ায় সৈকতের এমাথা-ওমাথা, ঝাঁপিয়ে পড়ে বালুজলে। আমরাও বা আর বাদ থাকবো কেন ! আমার আর রকি ভাইয়ের ছোট্ট একটা পোঁটলা সবসময়ই রেডি থাকে, কখন যে কার ডাক আসে। পাহাড় ঘোরা শেষে এবার দু’জনেরই শখ হলো সাগরে মাথা ডুবানোর, সাগর আমাদের ডাক দিয়েছে ! কুয়াকাটার পশ্চিমে রয়েছে সবুজের অরণ্য – সুন্দরবন, আর সোজা দক্ষিণে রয়েছে নীলের অতল গহ্বর – সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। সে গল্প আরেকদিন করবো, আপাতত গল্পের শুরুটা হোঁচট খেয়েছে পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার রাস্তায়, যে পরিমাণ ধুলো-বালি রাস্তায় খেয়েছি তাতে করে সকাল বেলা আমরা খেয়ে দেয়ে বের হয়ে ভুলই করেছিলাম। মটরসাইকলের পেছনে বসে ধুলোর সাগরের মাঝে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখছি পটুয়াখালির কলাপাড়া ইউনিয়নের সাজানো গোছানো বাড়িগুলো, এতো সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো বাড়ি এর আগে আর কোনো এলাকায় দেখেছি বলে মনে পড়েনা। আমাদের ড্রাইভার ধুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য গামছা দিয়ে নিজের চেহারা এমনভাবে পেচিয়েছে যে সেই অবস্থায় তাকে দেখলে বারাক ওবামা সকল প্রাপ্তির উল্লাসে অনবরত সার্কাস নৃত্য দিতেন। তিনটা ফেরি পার হওয়ার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আর সারা গায়ে ১০/১২ কেজি বালু নিয়ে পৌঁছলাম বালুর শহর কুয়াকাটায়। এখান থেকেই যাবো সবুজ বনে ঘেরা শীতল বালির এক শান্ত নির্জন সৈকত – গঙ্গামতির চরে…

কুয়াকাটায় থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যা নেই, সাগর কখোনো কাউকে নিরাশ করেনা। আমরা এবারে এসেছিলাম মূলত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে যাবার জন্য কিছু তথ্য যোগাড় করা ও বোট ভাড়া করার জন্য, সেই লক্ষ্যেই যাকে পাই তাকেই জিজ্ঞেস করি যে এদিকে দেখার মতন আর কোনো স্ন্দুর যায়গা আছে কিনা। একজন পূর্বদিক দেখায় তো একজন পশ্চিম দিক দেখায়, কেউ চোখ বড় করে আমাদের দিকে তাকায় তো কেউ চোখের উপরে হাত তুলে দূর সাগরের দিকে নির্দেশ করে – এরমানে যেদিকে মন চায় ঘুরতে পারো! আমরাও যেদিকে মন চায় ঘুরছি, কুয়াকাটার মূল সৈকতেই হাঁটতে হাঁটতে নজরে পড়লো উভচর নৌকার, মানে নৌকার নিচে চাকা লাগিয়ে ৩/৪ জন মিলে সেটাকে ঠেলেঠুলে ঝপাস করে পানিতে ফেলে দিচ্ছে, তারপর নির্দোষ চাকাগুলো খুলে নিয়ে আসছে আরেকটা নৌকায় প্রাণ দেবার জন্য, রীতিমতো বিচিত্র ঘটনা ! খানিকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে এভাবে ৮/৯ টা নৌকাকে পানিতে ঝাঁপ দিতে দেখলাম, অবাক হবো হবো ভাব করছি এমন সময়ই হুস করে পেছন দিয়ে কি যেন একটা জীবন্ত কিছু ছুটে গেলো। চোখ থেকে বালি মুছে তাকাতেই দেখলাম একটা ধুসর ঘোড়া লেজ নাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে পূব দিকে, তার পিঠে মোটামুটি বড়সড় একটা বাচ্চাছেলে। ঘোড়াটার পেছন পেছন টেনশন নিয়ে ছুটতে থাকা মায়ের কাছে জানতে পারলাম এখানে চড়ার জন্য ভাড়ায় ঘোড়া পাওয়া যায়, বিকট আওয়াজ তুলে একটা মোটর সাইকেলও ধোঁয়া ছেড়ে যেতে যেতে জানিয়ে গেলো যে শুধু ঘোড়াই না, টাকা থাকলে তার পিঠে চড়েও সমুদ্র দেখা যায়।

সমুদ্র কি আর দূর থেকে দেখতে ভালো লাগে ! সমুদ্রকে দেখতে হয় এর বুকে বসে, হাজার হাজার মাইল সাঁতরে এসে একেটা ঢেউ যখন ক্লান্ত হয়ে তীরে আসে বিশ্রামের জন্য তখন তাদেরকে দু’হাত ছড়িয়ে আলিঙ্গন করার মাঝেই তো সমুদ্র দেখার তৃপ্তি। আমার এই দার্শনিক মতবাদে পানি ঢেলে দিলেন রকি ভাই, তিনি জানালেন যে তিনি সাঁতার পারেন না, কাজেই পানিতে নামানামির মতন শীতল চিন্তা-ভাবনা আমাকে যেকোনো মূল্যে বাদ দিতে হবে। তাই বলে কি আর সাগরে নামবোনা ! সুতরাং, সারাদিনের জন্য ভাড়া করা হলো মাত্রই সাগর থেকে তুলে আনা একটি ভেজা নৌকা, যেটার মাঝি ঘোষণা দিলেন তাঁর এই নৌকা দিগিজ্বয়ী, আমরা যেদিকে যেতে চাই কোনো ব্যাপারইনা, আমি ঘোষণা দিলাম – চলেন শ্রীলঙ্কা যাই, উনি নৌকার পানি সেঁচা বাদ দিয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন, তাঁর দৃষ্টিতেই বুঝলাম এদিকে আশেপাশে শ্রীলঙ্কা নামের কোনো জায়গা নাই, যেগুলো আছে সেগুলো হলো – সবুজ হলুদের মিশেলে তৈরী ম্যানগ্রোভ বন – ফাতরার চর, মাছের বসতি নামে পরিচিত – শুটকি পল্লী, ধবধবে সাদা বালি’র – লাল কাঁকড়ার দ্বীপ, আর সব কল্পনাকে হার মানানো সবুজে ঘেরা শান্ত নির্জন এক স্নিগ্ধ সৈকত – গঙ্গামতির চর।

শুরু করেছিলাম ফাতরার চর ভ্রমণ দিয়ে। কুয়াকাটার মূল সৈকতকে ডান পাশে রেখে বঙ্গোপসাগরে দোল খেতে খেতে দেখছি গাঙ্গচিলের উড়াউড়ি, একটা ফিশিং বোট আমাদের পাশ কাটিয়ে মুখ ঘুরিয়েছে শুঁটকি পল্লীর দিকে। তার পেছনে গাঙ্গচিলের মিছিল, এতোগুলো গাঙ্গচিল আমি কখোনো একসাথে দেখিনি, ফিশিং বোট থেকে বেদরকারী যে মাছগুলো সাগরে ফেলা দেয়া হচ্ছে সেগুলো দিয়েই হচ্ছে তাদের রাজভোজ, হুড়োহুড়ি লুটোপুটিতে যারা পেরে উঠছেনা তারা পাখাদুটো আস্তে করে মেলে বসে পড়েছে ধুসর সাগরে, সকালের বাড়ন্ত রোদে তাদের সাদাকালো পাখা গুলোতে যে রঙের ছটা ফুট উঠছে তার সৌন্দর্য্য বর্ননা করতে যাওয়াটাও বোকামী। আমাদের মাঝিটা কিন্তু অত বোকা না, তিনি সঠিক সময়েই আমাদের নামিয়ে দিলেন ফাতরার বনে। এই বনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি মূলত ম্যনগ্রোভ বন, সারাটা বন জুড়েই মাটিতে শাঁসমূল জেগে রয়েছে, ট্যুরিস্টরা এলাপাথাড়ি ঘুরতে ঘুরতে বনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পায়েচলা রাস্তা বানিয়ে ফেলেছে, এর মধ্যে একটা রাস্তা অসম্ভব সুন্দর, গাছের শেকড় বেরিয়ে থাকা রাস্তাটির দু’পাশ জুড়ে ঝাউবন, কেওড়া গাছের তোরণ রয়েছে পুরোটা পথেই, যার শেষ মাথায় কাদামাটির সাগর। এখানে একটা চুলা রয়েছে, বোঝাই যায় যেই এদিকে আসুকনা কেন, পিকনিক করে যায়। আমাদের খাবার জো নেই ওদিকে মাঝিভাই আমাদের জন্য কাঁকড়া অর্ডার দিয়ে রেখেছে, ঝাল ঝাল করে রান্না করা সেই কাঁকড়া কথা চিন্তা করলে এখোনো জিবে জল চলে আসে। অনেকেই বলে ফাতরার বনে নাকি গাছে গাছে হলুদ পাতার ছড়াছড়ি, তেমন কিছু দেখতে না পেলেও একটা পুকুরপাড়ের পুরোটা ঘিরে অনেকগুলো হলুদ নারিকেল গাছ দেখলাম, হয়তোবা এটাই সব, হয়তোবা এর জন্যই অনেকে একে হলুদ পাতার বন বলে থাকে।

ফাতরার বনে কাঁকড়া খেয়ে ঝালের চোটে হা করে মুখে ঠান্ডা বাতাস লাগাতে লাগাতে ছুটলাম নৌকায়, গন্তব্য এবার শুঁটকি পল্লী। এখানে এসে দেখলাম মাছের এক নতুন রূপ, অগুনিত মাছ সাজিয়ে রাখা হয়েছে খোলা মাঠে। কয়েকটা জায়গায় আবার সুন্দর কিছু মাচা করে মাছগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, জেলেদের কাজ এখানেই শেষ, বাকিটা সূর্যের দায়িত্ব। শুঁটকি পল্লীর অন্যদিকে গ্রামের মহিলারা সবাই মিলে মাছ বাছাই করছে, আমাদের দেখে তেমন একটা পাত্তা দিলোনা, সম্ভবত আমাদের থেকেও মাছের দাম বেশী তাই। শুঁটকি পল্লীর সবচাইতে মজার বিষয় হলো এখানে সব ধরণের শুঁটকি পাওয়া যায়, এক যায়গায় দেখলাম মাঝারী সাইজের কয়েকটা হাঙ্গরের পাখা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, আরেক জায়গায় বিশাল এক তলোয়ার মাছের শুকনো দেহ সূর্যের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। যারা শুঁটকি মাছ পছন্দ করেন তারা জানেন যে এর গন্ধ কতটা মধুর, সৌভাগ্যক্রমে তাদের মধ্যে আমিও একজন, কাজেই ঘন্টা দুয়েক সময় এখানে কাটাতে আমার কোনোই আপত্তি ছিলোনা।

শুঁটকি পল্লী থেকে নৌকা চললো কাঁকড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে, ছোট ছোট লাল কাঁকড়ার বিশাল রাজত্ব এখানে। কেউ না থাকলে নির্ভয়ে এরা চরে বেড়ায় নিজেদের রাজত্বে। তাদের রাজত্ব ঘুরে দেখার জন্যই নৌকা থেকে নেমে সোজা হাঁটা দিলাম সাদা বালির রাজ্যে। এমন সাদা বালি এর আগে কোথাও দেখিনি, দেখিনি সেদিন কোনো লাল কাঁকড়াও, তাই বলে তাদের বাড়ি ঘরে চোখ বুলানোতো দোষের কিছু নয়। অতএব ঘুরে দেখতে লাগলাম কাঁকড়া দ্বীপ। এখানকার সৈকতটা খুবই সুন্দর, কোনো জনমানব নেই একেবারে শান্ত। একপাশে রয়েছে গাছের সারি আর পুরো সৈকত জুড়ে সাদা সাদা ঝিনুকের ছড়াছড়ি, দূর থেকে দেখলে মনে হবে পুরো সমুদ্র সৈকতটাই যেন একটা কোয়েল পাখি। তবে ভর দুপুরে এখানে বেড়াতে হলে কলিজায় পানি থাকা লাগবে, কেননা সূর্য তার পুরো উত্তাপটাই অকৃপণভাবে ঢেলে দেয় এখানে। প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে যখন গাছপালাগুলো সব ধেই ধেই করে নাচছে তখন পড়ন্ত বিকেল প্রায়, সূর্যাস্ত দেখার জন্য তাই ছুট লাগালাম গঙ্গামতির চরে।

ঢেউয়ের দোলায় নাচতে নাচতে হঠাৎ করেই দেখি আমদের মাঝি সাহেব নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে বসে ইঞ্জিনের সৌন্দর্য্য দেখছেন, শব্দহীন পরিবেশে সমুদ্র দেখার এমন সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমরা তার এই কর্মকান্ডের প্রসংশা না করে পারলাম না, তাকে বাহবা দিতে গিয়ে শুনি ভর সাগরে সে শুকনো মুখে জানাচ্ছে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে ! বলে কি ! অথৈ সাগরে এতো বড় নৌকাই যেখানে সাঁতার দিতে পারছেনা সেখানে আমিতো চুনোপুঁটি ! ভয়ে ভয়ে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কি হবে মামা ? তিনি বললেন কোনো সমস্যা নাই আপনেরা নাইমা হাঁইটা যান আমি নৌকা ঠেইলা নিয় আসতেছি ! বলে কি এই লোক, এই মাঝ সাগরে নেমে হাঁটবো ! আহারে নৌকার কষ্টে বেচারার বুঝি মাথাটাও গেলো, আমাদের অবাক করে দিয়ে মাঝি ঝুপ করে সাগরে নেমে গেলো – কোমর পানি সেখানে ! এই হলো গঙ্গামতির শুরু, সাগর এখানে অনেকদূর পর্যন্ত সি-বিচ বিছিয়ে রেখেছে, সেন্টমার্টিন্স ছাড়া আর কোথাও আমি এতোদূরে এরকম কোমর পানি দেখিনি। গঙ্গামতিকে দু’ভাগ করে মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বনের ভেতরে চলে গেছে ভোলাভালা চেহারার একটা মোটাতাজা খাল, তার একপাশে কমলা আর বরইয়ের গাছের সারি আর অন্যপাশে নাম-না-জানা গাছের বাড়ি। সাগরে থেকেই ভোরের সূর্য উঠার মতো করে পানি ছেড়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে ভেজা বালির সৈকত, এখানকার বালি এতোই নরম যে খালি পায়ে আলতো করে হাঁটলেও পায়ের স্থায়ী ছাপ পড়ে থাকে পরবর্তী জোয়ার না আসা পর্যন্ত, তার উপরে জমে থাকা পানিতে রপালী আভা তৈরি করে বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো। ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে দৌড়ে বেড়াই বাঁধাহীন বালির বুকে, অচেনা চরের অজানা বন হাতছানি দিয়ে ভেতরে ডাকে বিকেলের পড়ন্ত আলোতে। সেখানে সবুজের কারখানা, বিশাল বিশাল গাছের গায়ে লেপটে থাকা পরগাছার মতো ইচ্ছে করে নিজেও একটু ঝুুলে থাকি এদের মাঝে। এই বনে বানর আছে, আছে শিয়াল, শুকর, অজগর সহ নাম না জানা হাজার হাজার পাখি – আর, আর রয়েছে চোখের সীমানা ছাড়ানো সীমাহীন বঙ্গোপসাগর। এখান থেকেই একই জায়গার দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এখানে এক সাগরের পানিই একদিনেই দুইবার লাল হয় – এক বার ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ সূর্যোদয়ের সময় আরেকবার বিদায়ী সূর্যের শেষ ছোঁয়াতে। গঙ্গামতি চরের এই সৌন্দর্য্য একবারের জন্যও মিস করতে চায়না সূর্য, তাই সারাটা দিন একে চোখে চোখে রাখে, সে চলে গেলেই এই দায়িত্ব নিয়ে নেয় রুপালী চাঁদ, আর সেও না থাকলে দূরদেশী মিটমিটে তারা।

ইঞ্জিন ঠিকঠাক করে ঠিক সন্ধ্যায় ফিরে আসি আমরা, পেছন ফিরে তাকাই বারবার। আবার আসবো গঙ্গামতিতে, পরেরবার তাঁবু নিয়ে আসবো, এই সোনালী চর-কে রুপালী আলোতে প্রাণভরে দেখবো।

কিভাবে যাবেনঃ
কুয়াকাটায় বাস ও লঞ্চ দিয়ে যাওয়া যায়। আমরা গিয়েছিলাম লঞ্চ দিয়ে। ঢাকা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত সরাসরি লঞ্চ রয়েছে, ভাড়া নিবে ১৮০ টাকা করে। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার গাড়ি রয়েছে, ইচ্ছে করলে আপনি মটরসাইকেলেও যেতে পারবেন। ফেরী পার হতে হবে ৩টা, শেষের দিকে রাস্তা খুবই খারাপ। কুয়াকাটায় নেমে যদি সব যায়গা ঘুরে বেড়াতে চান তাহলে ইঞ্জিনচালিত একটা ছোট নৌকা সারা দিনের জন্য ভাড়া করে নিন, ১০০০-১২০০ টাকার মতো চাইবে। গঙ্গামতির চরে যাবেন হয় খুব ভোরে অথবা মাঝ বিকেলে। কাঁকড়া দ্বীপটা বাদ দেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা। আর গঙ্গামতির সৌন্দর্য্য দেখার পর যদি ঢাকা বাসীরা শহরে ফিরতে চান তাহলে কুয়াকাটা থেকেই ঢাকাগামী বাসে উঠে যেতে পারেন। শুধু একটু খেয়াল রাখবেন ঢাকা আসার বাস কিন্তু একটাই, আর সেটা কুয়াকাটা ছেড়ে যায় ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায়। একবার মিস করলে যতই চেঁচামেচি করেননা কেন, পরদিনের সূর্যোদয় না দেখিয়ে আপনাকে আর ফিরতে দেবেনা সাগরকন্যা কুয়াকাটা।