Categories
Uncategorized

তারার সাথে বসবাস…

লোকালয়ের ঠিক পাশেই পাহাড়টির বাস। সেই পাহাড়ে দিনভর রোদের আলো খেলা করে, হাজার পাখির মেলা বসে, আর লাখো সবুজের আসর জমে বছরের পর বছর। আঁকাবাঁকা এক ঝিড়ি পথে পাথর ডুবিয়ে চলে ঠান্ডা পানির স্রোতহীন আয়েশী পথ চলা, সে পানির ধার ঘেঁসে এক পা ডুবিয়ে শিকারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকে সাদা বকের ঝাঁক। আর দু-কুল ছাপানো বুনো গাছের আড়ালে কৌতুহলী চোখ মেলে চেয়ে থাকে বানরের দল, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকে ঘরপালানো কোন এক দলছুট পাহাড়ী হরিণ। এমনই মায়া-ভালোবাসা আর আদর ঘিরে গড়ে উঠা এই চিরসবুজের বনটা হটাৎ করেই কেঁপে উঠে পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরণা ঘেরা লোকালয়ের খুব কাছের এই যায়গাটির নাম সীতাকুন্ড বন। এবারে আমরা ক্যাম্পিং করেছিলাম জল-ঝর্নার এই বনে, তারার সাথে সারারাত কথা বলেছিলাম অচীন পাথরের গায়ের উপরে হেলান দিয়ে, এই গল্পের শুধু শুরুই আছে আর আছে গল্পটা প্রলম্বিত করার আয়েশী ইচ্ছে…

এবারের প্ল্যানটা হুট করেই হয়ে গেলো, মাঝ রাতে আরমান ভাই ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন “ভাই, আর কত লেপের তলায় ঘুমাইবেন ! চলেন কালকে পাথরের উপরে ঘুমাই, পাহাড় ডাকতেছে”। পাহাড়ের ডাক অগ্রাহ্য করার মতন দুঃসাহস আমার কখোনই ছিলোনা, এবারও হলো না, বিছানায় শুয়েই ছটফট করে অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোরের আলো ফোটার জন্য – কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পুরো শহর কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ঝিম মেরে শুয়ে আছে, আলো ফোটার নামটি নেই। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভোর এলো ধুলোর শহরে। জীবনে কখনোই যে কাজটি করিনি, সেটাই করলাম এবার! কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটিতে একটা মোটাসোটা “কম্বল” ভরেই রওয়ানা দিলাম জল-ঝরনার দেশে। সকাল ৯টার গাড়ি পাহাড়ের টানেই শহর ছাড়লো, বাস ভর্তি কচিকাঁচার আসর ! পুরো বাসে সব মিলিয়ে গোটা দশেক মুরব্বী ছাড়া বাকি সব আন্ডা-বাচ্চার দল, সব নাকি বান্দরবান যাবে! মেঘ-পাহাড়ের দেশের গাড়ি আটকে গেলো কুমিল্লাতে, যেই সেই আটকানো না – টানা ৩ ঘন্টা জ্যামের মধ্যে থম মেরে বসে রইলো পিচঢালা রাস্তায়। অবশেষে সব জ্যাম তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাকে বিকেল ৫টায় নামিয়ে দেয়া হলো সীতাকুন্ড বাজারে। ইকোপার্কের গেইটটা পার হয়ে দেখি সেখানে আগে থেকেই হাসিমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে অনেকগুলো চেনা মুখ, যাদের দেখলেই মনে হয় পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই এদের জন্ম…

চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য...
চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য…

এবারে পাহাড়ে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো এক হাজারটা মোমবাতি জালানো, তারার আলোয় মোমের আলোয় পুরো পাহাড়ি ঝর্নাটার এক অন্য রুপ দেখা, আর অদূরেই তাঁবু টাঙ্গিয়ে হালকা আগুনের আঁচে নিজেদের গরম করতে করতে সেই রুপ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া। চিন্তাভাবনা করা বড়দের কাজ, আমরা চিন্তা ভাবনা করিনা – ধুম করে কাজটা করে ফেলি। তাই ধুম করেই চলে গেলাম পাহাড়ের টানে। সীতাকুন্ডের সেই পাহাড়ের পথে ঢোকার আগেই দেখা গেলো কালপুরুষ অপু ভাই, লিমন ভাই, রুপা আপু, আরমান ভাই, রুবা আপু বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করেছে, হাতে তাদের রাতের খাবারের জন্য বাজার সদাই, কি নেই তাতে! খিচুড়ি রাঁধার ডাল থেকে শুরু করে সালাদ বানানোর টমেটো পর্যন্ত সব রয়েছে, সেগুলোর ভীড়ে আবার থলে থেকে উকি দিচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা মুরগীর মাংস। এত বড় বড় ব্যাগ দেখে শুরুতেই হোঁচট খেলাম, আড়চোখে তাকালাম নিজের খুদে ব্যাগের দিকে – মনে হচ্ছে হাতির মিছিলে কোন এক দলছুট লিলিপুট ঝুলছে আমার পিঠে! যাই হোক এসব তোয়াক্কা করার দিন শেষ, চোখ রাখলাম এক্কেবারে উপরের পাহাড় চুড়াটায়, আর পা চালালাম সবুজ কেটে কেটে তৈরি করা একমাত্র মাটির রাস্তাটি ধরে। সে রাস্তা সাপের মতন একেবেঁকে ঝুপ করে গিয়ে পড়েছে পাথুরে ঝিড়িতে, সেটা দিয়ে নিশ্চিন্তে বয়ে চলেছে পৌষের শীতের ঊষালগ্নে হাড় কাঁপিয়ে দেয়া ঠান্ডা পানি! একেকবার একেকজনের পা পড়ে সেই পানিতে আর গগন বিদারী আওয়াজে ভরে উঠে বনের এমাথা ও মাথা। কিছুক্ষণ আগে একটা মায়া হরিণ বোধ হয় কাউকে ডাকছিলো ঘরে ফেরার জন্য, আমাদের আর্তনাদ শুনে সেও মুখে কলুপ এঁটে ভেগে গেলো অন্য কোন শান্ত যায়গায়। আর আমরা ১২টা প্রাণী পিঠে কয়েক কেজি বস্তা নিয়ে হেঁটে চলেছি ঝিড়ি থেকে বনে, বন থেকে পাথরে, পাথর থেকে কাঁটার জঙ্গলে, সেখান থেকে আবার চিৎপাত হয়ে শ্যাওলা ভরা পিচ্ছিল নতুন কোন ঝিড়িতে। দিনের আলো যখন আমাদের একাকী করে তারার দেশে রেখে গেলো ঠিক সে সময় দেখা মিলল আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গার। এখানেই আমরা ক্যাম্পিং করবো আজ রাতে, মোমের আলোতে ভাসিয়ে দেবো পাহাড়ি ঝর্ণার ক্ষীণ স্রোতগুলোকে, আর কনকনে বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে গলা ছেড়ে গাইবো নিজেদেরই স্বরচিত কোন মুগ্ধ করা গান। অন্ধকারে যখন আমাদের হাতের তালু ছাড়া নিকটবর্তী আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঠিক সে সময় আমরা হাচড়ে পাচড়ে উঠে পৌছালাম পাহাড়ের এক্কেবারে চুড়ায়, এখান থেকে এক নিঃশ্বাসে পুরো ঝর্নাটা দেখা যায়, বর্ষাকালে চারপাশের বন, পাহাড় আর বাতাস কাঁপিয়ে যেই ঝর্নাটা নেমে আসে – সেখানে এখন হেলেদুলে বয়ে চলেছে রুগ্ন পানির ধারা। এই জায়গার নাম সুপ্তধারা ঝর্না।

ক্যাম্পিং করার প্রথম শর্তই হলো তাঁবু ফেলার জন্য ভালো এবং আরামদায়ক একটা জায়গা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো খাবার রান্নার জন্য আগুনের ব্যবস্থা করা, আর তৃতীয় শর্ত হলো আয়েশ করে আসমান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাওয়া। সুতরাং বসে থাকলে তো আমাদের হবে না, বিরাট বিরাট সব পাথর পড়ে আছে আমাদের সামনে, দুনিয়ার আর সব মানুষের কাছে এগুলো সামান্য পাথর হলেও আমাদের চোখে তখন এগুলো জলজ্যান্ত একেকটা বিছানা, কোন পাথরে কোন তাঁবু ফেলা হবে তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা আর গবেষণায় স্রোত বয়ে গেলো মিনিট পাঁচেক। এতক্ষনে অন্যদের বড় ব্যাগের রহস্য বোঝা গেলো, টপাটপ করে সেগুলো থেকে বের হতে লাগলো ভ্রাম্যমান ঘর, এদের মধ্যে একটা তাঁবু আবার বিশালতার দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলো, যখন সেটাকে দাড় করানো হলো তখন সে রীতিমতন একটা বিশাল ঘরে পরিনত হলো, যেখানে অনায়াসেই আটজন হাত পা মেলে ঘুমাতে পারবে। তাঁবুর গায়ে বাবর আলী নেপাল থেকে নিয়ে আসা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দিলো কয়েকটা, এগুলো নাকি যত উপরে সম্ভব লাগানো উচিত, এতে করে বুদ্ধের শান্তির বানী বাতাসের সাথে ছড়িয়ে পড়ে বন থেকে বনে, গ্রাম থেকে গ্রামে – আর সে বাতাস যদি শহুরে কোন লোকালয়ের উপরে দিয়ে বয়ে যায়, সেখানেও শান্তির বানী ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে ঘরে। আমি হা করে তাবুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি পোলাপাইন সব গায়েব ! কিছু চলে গেলো লাকড়ি জোগাড় করতে, আগুন জ্বালাবে আর কিছু চলে গেলো পেনি স্টোভ দিয়ে আগুন জ্বালাতে, কফি বানাবে। সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভয়াবহ ঠান্ডা পানিতে খাবার দাবার কাটাকুটি করতে বসে গেলো রুপা দিদি! যে পানি দূর থেকে দেখলেই ঠান্ডায় গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায় সেই পানিতে অবলীলায় তিনি মুরগী, পেয়াজ, টমেটো কেটে আবার চাল, ডালও ধুয়ে ফেললেন ! ওদিকে সবার পেটে তখন ছুঁচোর নাচন – লাকড়ি রেডি, রান্না করার জন্য খাবার রেডি, পিপাসা মেটানোর জন্য ঝর্নার অঢেল পানি রেডি, আর কিসের চিন্তা – এবার জ্বালাও আগুন! কনকনে ঠান্ডায় আগুল জ্বলা মাত্রই সবাই সব কাজ ফেলে ছুটে এলো আগুনের পাশে, পরম মমতায় চুলোয় রান্না চড়িয়েছেন রুমী ভাই, তাকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছেন বুনো ভাই। এই দুইজনের হাতের রান্না যেন চামচ চামচ শিল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবার প্লেটে প্লেটে, এতগুলো প্লেটও আসলে আনা হয়নাই! ফলে কেউ খেতে বসলো কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসা সন্দেশের প্যাকেটে, আবার কেউ খেতে বসলো পাতিলের ঢাকনা উল্টো করে, এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন আরমান ভাই, তিনি মগের মধ্যে খিচুড়ি-মাংস ঢেলে লাল জ্যাকেট পরে বসে গেলে কমলা আলোর কোলে। যেখানে কেউ ফোনের নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না সেখানে রুবা আপু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইভারে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছেন আর আড্ডার ফাঁকে একফোঁটা ফুসরত পেলেই টপাটপ ক্যাম্পিং, রান্নার ছবি তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুকে। বিশাল সে আয়োজন – রান্নার স্বাদ এখনো মুখে লেগে রয়েছে, ফারহান ভাইএর কাছে রান্না এতই মজা লেগেছে যে তাঁকে খিচুড়ির পাতিলের আশপাশ থেকে নড়ানোই যাচ্ছে না, শেষমেশ খোকন কারিগর এসে তাঁকে পাজাকোলা করে তাঁবুতে নিয়ে শুইয়ে দিলেন, সাথে দিলেন পানির বোতল, উনি সারারাত পানি খেয়েই পার করে দিলেন!

খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট...
খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট…

রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে আমরা সবাই মুখোমুখি হলাম আকাশের, সেখান হাজার তারার মেলা বসেছে। সবাই সেজেছে আলোর সাজে। নিকষ আঁধারকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সবকটা তারা যেন আমাদের জন্যই কুয়াশাকে বিদায় করে দিয়েছে আজ, আজ তাদের অতিথিদের মুগ্ধ করার রাত, আজ তাদের নিজেদের উজাড় করে আঁধার পৃথিবীটা আলোকিত করার রাত। আমরা মুগ্ধ তাদের আয়োজন দেখে, প্রতি ঘণ্টায় পাল্টে যাচ্ছে আকাশের দৃশ্যপট, তারার সারি ক্রমেই বাড়ছে, দেখে মনে হচ্ছে রাতের সাথে সাথে ঘুমও ভাংছে তাদের, একেকজন একটা একটা করে চোখ মেলছে আর একটা একটা করে তারার জন্ম হচ্ছে ঘুটঘুটে কালো আকাশের গায়ে। হটাৎ তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হাজার হাজার ছিদ্র – সে ছিদ্র দিয়েই বুঝি আসছে আলোর বন্যা। তারার থেকে চোখ ফিরিয়ে এবার আমরা নজর দিলাম মর্ত্যের আঁধারে, এবার মোমবাতি জ্বালানো হবে। সবাই মিলে চললাম ঝর্নার একেবারে কোলে, ঠান্ডা পানি পায়ে মাড়িয়ে এসে থামলাম পাহাড়ের বুকের মাঝে, প্যাকেট থেকে একের পর এক অবমুক্ত করা হলো মোমবাতিগুলো। বসানো হলো নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর। মিনিটখানেক নিরবতা, সবাই চুপ, সবকিছুই যেন স্থবির।

এরপরই কালপুরুষ অপু, লিমন বড়ুয়া, বাবর আলী, বুনো ভাই, দিদার ভাই আর ফারহান ভাই এর হাতের ছোঁয়ায় জ্বলে উঠতে লাগলো মোমের শিখা, একের পর এক, শ’য়ের পর শ – সেগুলো ছাড়িয়ে গেলো হাজারের ঘরে। পুরো ঝর্না জুড়ে তিরতির করে চলছে মোমের আলোর নাচন! মুহূর্তেই কালো পাহাড় ভরে গেলো সোনালী আলোর ছটায়, সে আলোতে প্রাণ পেলো ঝর্নার পানি। তারার সাথে মিতালী গড়ে যে পানি এতদিন ধরে নিজের রুপে মুগ্ধ করছিলো পাহাড়ের অচেনা গাছের দলকে, সে পানি আজ তারার বসতি ছেড়ে গায়ে মেখেছে মোমের আলোর অলংকার! মুগ্ধ সে দৃশ্য দেখত হলেও দরকার মুগ্ধ চোখের, আমাদের সে চোখে মুগ্ধতা নেই আছে স্তব্ধ বিস্ময় – আমরা বিস্মিত হয়ে দেখছি সামান্য কিছু মোমের আলো কিভাবে রঙ ছড়িয়ে দেয় অচেনা জঙ্গলে ! আকাশ জুড়ে মিটমিট করতে হাসতে থাকা তারার দলও ম্রিয়মাণ হয়ে যায় টিমটিমে জ্বলতে থাকা এই মোমের শিখার কাছে। ধরাধমে চর্মচক্ষুতে এমন দৃশ্য খুব বেশী হয়তো দেখা সৌভাগ্য হয়না, তাই তোড়জোড় শুরু হলো ক্যামেরা নিয়ে। ট্রাইপডে বসে বসে সে একের পর এক ধরে রাখতে শুরু করলো মুগ্ধ বিস্ময়ের মুহূর্তটুকুকে। এক সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এই আমাদের চোখের সামনেই গলে গলে থেমে গেলো বায়বীয় সোনালী আলোর নাচন, সে যায়গায় ভর করলো শুন্যতা। রাত তখন দেড়টা। আবার হেসেছে তারার মিছিল। আর আমরা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম তাঁবুর ঘরের ঠান্ডা পাথুরে বিছানায়, সারারাত পৌষের শীত ছুরি চালালো কম্বলের বাহিরে থাকা শরীরের অংশে। আর সবকিছু রয়ে সয়ে আমরা চোখ বন্ধ করলাম গহীন অরণ্যে, তারার বিছানার ঠিক উল্টো দিকে। সারারাত তারার দল পাহারা দিয়ে রাখলো আমাদের, প্রকৃতির এই সন্তানদের…

হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল...
হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল…

পাহাড়ে ক্যাম্পিং করার সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, কোন অপচনশীল জিনিস (পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট) ফেলে আসবেন না। এগুলো পুরো পরিবেশকে বিষিয়ে তুলবে। মলমুত্র এমন যায়গায় ত্যাগ করবেন যেখানে পানির সংস্পর্শ থাকবে না, এতে করে ঝর্নার পানি দূষিত হবে না। পাহাড়ে গিয়ে কাঁচা গাছ কাটবেন না, কোন পশু-পাখি হত্যা করবেন না। সবচাইতে বড় কথা চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না, এটা জঙ্গলের প্রাণীদের আস্তানা, আমাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সবচাইতে বড় অসুবিধা হয় তাদেরই। আর পাহাড়ে অনেক ঠান্ডা, কাজেই রাতে ক্যাম্পিং করতে গেলে গরম কাপড় অবশ্যই নিয়ে যাবেন, সাথে একটা তাঁবু। একটা জিনিস বুকের মধ্যে গেঁথে নিয়ে যাবেন – এই দেশের প্রতিটা  সম্পদ আমাদের, কাজেই একে কোনোভাবেই আমরা নস্ট করবো না। আমি যে সৌন্দর্যটা দেখার জন্য এখানে ছুটে এসেছি আমার ছোটভাইটা, সন্তানটা যেন ২০/৩০ বছর পরে এখানে এসে ঠিক আমার মত করেই যেন চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে বলতে পারে – “দেখো দেখো, আমাদের বাংলাদেশ কি সুন্দর”…

ও আরেকটা কথা, এখানে যাওয়া কিন্তু খুব সহজ, ঢাকা থেকে যেকোন চট্টগ্রামের গাড়িতে উঠে সীতাকুন্ডতে নেমে পড়বেন, সেখানের এসকেএম জুট মিলের রাস্তা ধরে রেললাইন পার হয়ে ঝিড়ি পথে হাঁটা দিবেন পাহাড় লক্ষ্য করে। ৪০ মিনিট পর নিজেদের আবিষ্কার করবেন সুপ্তধারা ঝর্নার নিচে, সেখান থেকে ডান পাশের পাহাড় বেয়ে উঠে যাবেন ঝর্নার উপরে। এবার জায়গা বেছে আরাম আয়েশ করে তাঁবু ফেলে কাটিয়ে দিতে পারেন জীবনের খুব অসাধারণ একটা রাত… জলে জঙ্গলে আপনাকে স্বাগতম…