Categories
Uncategorized

জলের উপর বন দোলে…

বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান বন হলো ‘রাতারগুল ফরেস্ট’।

থৈ থৈ স্বচ্ছ পানিতে ভাসছে এই বন, সেই পানির আয়নায় সারাটা দিন নিজের চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে চির সবুজের এই স্বোয়াম্প ফরেস্ট। নৌকা নিয়ে ঘুরতে হয় এই বনে, বানর আর সাপের সাথে দোস্তি করে ঢুকতে হয় এই বনে – এই বনটা মায়ার, এই বনটা ছায়ার, এই বনটা অনেক কিছু না পাওয়াকে পাওয়ার।

২০১১ সালের জুনের ১ তারিখে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির এই ভাসমান বন দেখার জন্য, কিন্ত বিধি বাম, মোটামুটি শুকনো কাদার ভেতরে বনের গহীনে হেঁটেই ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে হয়েছে সেবারের মতোন। চার পাশে হিজল আর করচ গাছ থমথমে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একেকটা গাছের শেকড় উঠে আছে ১০/১৫ ফিট উপরে, মনে হয় তাদের জন্মই হয়েছে অর্ধেক রাস্তা থেকে। উপরে সবুজের বিস্তীর্ণ সমাহার আর নিচে আাঁকাবাঁকা গাছের গোড়ালী, মাঝখানে গজিয়েছে নতুন শেকড়। সেবারই বুঝেছিলাম এ বন দেখতে হলে আসতে হবে বর্ষাকালে, হিজলের-করচের শাখে শাখে দুলতে হলে আসতে হবে বানের সময়, নীল সবুজের রহস্যে হারিয়ে যেতে হলে ঢুকতে হবে জলের সাথে। তাই সেবার ঘাড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জারুল গাছটাকে আবার আসবো বলে কথা দিয়ে চলে এসেছিলাম ধুলোর নগরীতে।

জুলাইয়ের বৃষ্টিকে আরো কিছুদিন গা ছাড়া ভাব নিয়ে পড়তে দিয়েছিলাম, যখনই খবর পেলাম সিলেটের বনে বান ডেকেছে তখনি তার টানে বেরিয়ে পড়লাম নিজের ছোট্ট পোটলাটা নিয়ে। প্ল্যান ছিলো এবারে একলা যাবো, কারণ রমজান মাসে ঘুরাঘুরির জন্য আর কাউকেই পাবোনা। যেমন কথা তেমন কাজ, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি সেখানে নববিবাহিত রকি ভাই এবং রেদওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। নীল সবুজের বন তাদেরকেও ডাকছে। ওদিকে ফেসবুকে খবর পেয়ে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর কোলে নিয়ে আহসান ভাই এবং লুৎফর ভাইও রওয়ানা দিয়েছে খুলনা থেকে। বিশাল সুন্দরবন ফেলে তারা আসছে সুন্দর আরেকটা বন ছুঁয়ে দেখতে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই দলের একটাই উদ্দেশ্য, একটা বিশাল বন কিভাবে জলের উপর হেলতে দুলতে ভাসতে থাকে সেটাই দেখা।

সিলেট শহরে নেমেছি ভোর পৌনে পাঁচটায়, জনমাবহীন খাঁ খাঁ রাস্তায় রিক্সা আর সিএনজি চালকরা রীতীমতো রাস্তা কাঁপিয়ে নাক ডাকছেন, আমরাও হালকা ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এগুচ্ছি একটা সিএনজি’র আশায়, গন্তব্য পাহাড়ের পাড় ঘেঁসে নীলচে পানিতে শুয়ে দোল খাওয়া আশ্চর্য্য সুন্দর এক উপজেলা গোয়াইনঘাট। আমাদের হালকা কাঁপাকাঁপিতেই বোধ হয় ঘুম ভেঙ্গে গেলো রাস্তা কাঁপনো রিক্সা চালকদের। মেঘের আলোয় পাঁচজন যুবককে দেখে সে মহা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো “কই যান” ! আমরা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আরেকটু এগুতেই দেখি এক সিএনজি ড্রাইভার চোখ কচলে লাল করে সিএনজির সিটে শুয়েই ভীষণ উদ্বিগ্ন স্বরে বললো “কই যান”! পাশ থেকে আরেকজন বয়স্ক লোক গায়ে শাল জড়িয়ে যাবার পথে জিজ্ঞেস করলেন “কই যান”! তাদের সবার কন্ঠেই আমাদের নিয়ে উৎকণ্ঠা। সবার একটাই কথা “কই যান”? তাদের আগ্রহ মেটানোর জন্যই বলি আমরা ‘রাতারগুল’ যাবো, কেউ চিনেনা। অবশেষে এক সিএনজি পাওয়া গেলো যে গোয়াইনঘাট যেতে চায়। আর দেরী না করেই জড়াজড়ি করে উঠে গেলাম তার তিন চাক্কার দুনিয়ায়।

P1330743

ভরা বর্ষায়, ভেজা মেঘের কুয়াশার ভেতর দিয়ে জনমানবশুণ্য সিলেট শহরকে পেছনে ফেলে বিমানবন্দরের রাস্তা ধরে এগুতে থাকলাম শালুটিকরের দিকে। একপাশে বন্দী পাহাড়ের সারি মেঘ কোলে নিয়ে ঘুমুচ্ছে, আরেক পাশে চেঙ্গীর খালের ঘোলা পানিতে পড়ি পড়ি করেও গা ছোঁয়াচ্ছেনা ভোরের বৃষ্টি। এই চেঙ্গীরখাল যায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর, খালের উপরে বিশাল একটা ব্রিজ শুয়ে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পুরো শালুটিকর দেখা যায়। ঘোলা পানিতে শিকড় গেঁড়ে ভাসতে থাকা একেটা বাড়িকে মনে হচ্ছে একেকটা বিচ্ছন্ন দ্বীপ, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে বেড়াতে গেলেও নৌকা দিয়ে যেতে হয়। আমাদের সিএনজি এগুতে থাকলো চেঙ্গীর খালের পাড় ধরে। সামান্য একটা ইটের রাস্তায় প্রকৃতির কত বিস্ময়, কত সৌন্দর্য্য যে লুকিয়ে থাকতে পারে তা এখানে উঁকি না দিলে বুঝতে পারতাম না। দু’পাশে হাঁটু পানি, সে পানির রং আবার সাদাটে নীল ! দেখে মনে হবে যেন জলজ্যান্ত আকাশটাকে টেনে মাটিতে নামিয়ে এনছে এই শুকনো একাকী রাস্তাটি। আমার জীবনে আমি অনেক সুন্দর রাস্তা দেখেছি কিন্তু এই রাস্তার সৌন্দর্য্যরে ধারেকাছেও নেই বাকিগুলো। নিজের আপন খেয়ালে চলতে থাকা এই রাস্তা কিছুদূর সোজা গিয়েই খেয়ালী বালিকার মতো বেঁকে গিয়েছে একদিকে, আরো কিছুটা গিয়ে দুষ্টু বালকের মতো লাফ দিয়েছে ব্রিজের উপর দিয়ে, মাঝে মাঝে খেলার মেজাজে কয়েক ফুট করে ডুব দিয়েছে ক্রমশ জমতে থাকা পাহাড়ী ঢলে। আশ্চর্য সুন্দর এই রাস্তার একপাশ জুড়ে রয়েছে ভারতের সবুজ পাহাড়গুলো যেটাতে সবুজের লেশমাত্রও নেই, তুমুল নীলে হারিয়ে গেছে তারা। আর একপাশে রয়েছে জলে ভাসতে থাকা মুগ্ধ বাংলাদেশ। বাড়ি-ঘর সব ডুবে আছে পানিতে, বাচ্চারা হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে স্কুলে যাচ্ছে আর বাকিরা নৌকায়, প্রত্যেকটা দৃশ্যই ছবির মতোন। এই রাস্তার দু’পাশ জুড়ে বিশাল সব গাছের সারি, ছাগল – ভেড়ার পাল আর মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি। এমন জায়গায় বিস্মিত না হওয়াটাই বিস্ময়কর। একসময় সিএনজি থেকে নেমে আহসান ভাই দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করে বললেন, এমন যায়গায় একলা আসাটাই বোকামী, পরেরবার প্রিয় কাউকে নিয়ে আসবো।

P1330766

বেলা ১০ টায় আমরা পৌঁছলাম গোয়াইন ঘাট বাজারে, সেখান থেকে একটা ট্রলার রিজার্ভ নিলাম ‘রাতারগুল’ ফরেস্টের উদ্দেশ্যে। পুরো নদী জুড়ে হাওর হাওড় ভাব, পেছনে ভারতের পাহাড় থেকে ঝরছে ছোট-বড় অসংখ্য ঝরণা, সেগুলোর পানিই মিশেছে এখানে। কাঁচের মতোন স্বচ্ছ পানি, একটানে ৮/১০ ফুট পরিষ্কার দেখা যায়। পুরো নদীটাই দেখার মতোন একটি দৃশ্য। মহিষেরা গা ডুবিয়ে আয়েশ করে ঢেঁকিশাক চিবুচ্ছে। আমাদের ট্রলারের পানি তাদের গায়ে লাগতেই ঘাড় ঘুরিয়ে মৃদু একটা ধমক দিয়ে আবার দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ঘাস চিবুতে থাকে। এমন সৌন্দর্য্যে সেও মুগ্ধ। একসময় ট্রলার ভিড়ে ‘রাতারগুল’ ফরেস্টের বিট অফিসে, সেখানে আগের থেকেই চকচকে নতুন নৌকা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বিট অফিসের কর্মচারী হুমায়ুন ভাই। আর দেরী করা কি চলে ! পড়িমড়ি করে সবাই ছোট নৌকায় উঠতে গিয়ে দেখি লুৎফর ভাই গায়েব, বন বিভাগের টয়লেটে গিয়ে তিনি বিপুল বিস্ময়ে চেয়ে আছেন পেছনের বিশাল বনের দিকে। সেখানে পানির দোলনায় দুলছে হিজলের বন, সেই সম্মোহন এড়ানো অসম্ভব। কোনোমতে তাঁকে ঠেলেঠুলে নৌকায় উঠালাম, জানালাম, হা করে থাকার সুযোগ সামনে আরো আছে। বৃথা চেষ্টা, তাঁর হা আরো বড় হয়ে উঠলো যখন দেখলো বনবিভাগের অফিসের সিঁড়ির গোড়ায় এইমাত্র একটা মাছ ঝপাৎ করে উঠে কতক্ষণ লাফিয়ে আবার টুপ করে ডুব দিলো পানিতে। যাবার আগে আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে যেন বলে গেলো ‘আমাদের রাজ্যে স্বাগতম’। এ আবেদন উপেক্ষা করার মতোন বোকা এখোনো হই নাই। রওয়ানা দিলাম পানির দেশে।

P1330752

বনের সীমানায় ঢুকতেই এলোমেলো হয়ে গেলো আগের থেকে সাজিয়ে রাখা সব পরিকল্পনা। চোখের সামনে তব্দা মেরে দেয়া সবুজের মশারী, গাছের মাথা সমান টলটলে পানি হইহুল্লোড় করে ছুটে যাচ্ছে এক গাছের কোল থেকে আরেক গাছের বুকে। পাতা গুলো নিচু হয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে পানির সাথে। প্রকৃতি এখানে ঠান্ডা, নীরব, কেমন যেন একটা ভরাট সৌন্দর্য্য হুটোপুটি খাচ্ছে। বনে ঢোকার পর থেকেই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন সারাক্ষণ বকবক করতে থাকা রকি ভাই, একফোঁটা শব্দও যেনো এ বনে মানায় না, চোখ বড়বড় করে তিনি তাকিয়ে আছেন সামনের চলমান গাছগুলোর দিকে। চলাৎ ছলাৎ শব্দে নৌকা চলছে গাছের ডাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, মাঝে মাঝে ডালের বাড়ি খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে শুয়ে পড়ছে সবাই। কিন্তু বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারেনা, তাড়াতাড়ি উঠে আবার তাকায় অদ্ভুত গাছগুলোর দিকে। সারাজীবন হিজল আর করচ গাছের নাম শুনেছি আজ দেখলাম,এদের গড়নটাই আলাদা। অনেকটা জিগজ্যাগ স্টাইলে বেড়ে উঠেছে এই গাছগুলো, কাঁচের মতোন স্বচ্ছ পানিতে ক্রমাগত নড়ছে তাদের প্রতিবিম্ব। ভাবতে অবাক লাগে একমাস আগে এই বনের মাঝ দিয়ে খালি পায়ে হেঁটেছিলাম, এখন সেখানে ১০ ফুট পানি, রোদের আলো পড়ে একেবারে তলার মাটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সেখানে জেলেরা ব্যাঙ বেঁধে টোপ হিসেবে ঝুলিয়ে রেখেছে বোয়াল মাছের জন্য। প্রতিটা গাছের শেকড় দুলছে পানির উপরে। ইচ্ছে হলে নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে নির্দোষ একটা গোসলও দেয়া যেতে পারে ঠান্ডা এই পাহাড়ী জলে। কিন্তু সেটা করতে দিলেননা হুমায়ুন ভাই, চোখ গাছের উপরে উপরে তুলে আমাদের দেখালেন দুইটা সাপ চুপচাপ শুয়ে শুয়ে অতিথিদের দেখছে, এখন আপ্যায়ন না করতে চাইলেই হয় ! সাপ দেখে চুপসে যাওয়া রেদওয়ানকে ঠেলে-ঠুলে উঠিয়ে বানরের ঝাঁক দেখালেন আহসান ভাই। আমাদের দেখেও তারা কোনো গা করলোনা, এক হাত দিয়ে ঝুলতে ঝুলতে সবুজ পাতাগুলো পেটে চালান করে দিচ্ছে নির্লিপ্তভাবে।

একের পর এক বিস্ময় উপহার দেয়া এই বনে ঘুরতে ঘুরতে মাদকতা লেগে গিয়েছিলো চোখে, তাই সময়ের কোনো হিসাবই রাখিনি। এর মাঝেই আকাশ কালো করে মেঘ ধেয়ে এলো মেঘালয় থেকে। প্রকৃতির নিজের কাছে রাখা সব সৌন্দর্য্য একবারে উজাড় করে দিতে চায় আগত অতিথিদের। টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হলো ‘রাতারগুল’ জুড়ে। এতোক্ষণ চুপচাপ শান্ত হয়ে থাকা বনটা মুহূর্তেই নড়েচড়ে উঠলো। গাছগুলো গা-ঝাড়া দিয়ে শরীর থেকে পানি ফেলে দিচ্ছে। পাতার সাপগুলো হেলতে দুলতে নেমে গেলো পানিতে। অনেক্ষণ বিশ্রাম নেয়া হয়েছে, এবারে খাবার খোঁজার পালা তাদের। আমরাও চাইনি তাদের খাবার হতে, তাই ভাসমান এই বন থেকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেই বের হয়ে আসলাম।

নৌকা ছেড়ে আমাদের ট্রলারে করে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান বনটা ফেলে আসছি, আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছি। শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে বারবার – এই বনটা মায়ার, এই বনটা ছায়ার, এই বনটা অনেক কিছু না পাওয়াকে পাওয়ার। আবার আসবো এই বনে, ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের আলোতে গাছের ফাঁকে ফাঁকে থই থই পানিতে উথাল পাথাল জোৎস্না দেখতে আবার আসবো এই ঢেউয়ের বনে।

কিভাবে যাবেনঃ

এই পানির বনেতে যাওয়াটা পানির মতোই সোজা। এজন্যে সবার প্রথমে আপনাকে সিলেট যেতে হবে। সিলেট থেকে দুইভাবে ‘রাতারগুল’ ফরেস্টে যাওয়া যায়। বিমানবন্দরের পাশ ঘেঁসে শালুটিকর পাড়ি দিয়ে চেঙ্গেরখালের মায়াবী রাস্তাটি দিয়ে গোয়াইনঘাট বাজার পর্যন্ত সিএনজিতে যাবেন, সিলেট থেকে গোয়াইনঘাট পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া নিবে ৪৫০ টাকা। সেখান থেকে একটা ট্রলার ৮০০ টাকা দিয়ে ভাড়া করে চলে যাবেন ‘রাতারগুল ফরেস্টে’। এ তো গেলো সিনেমা হলে যাওয়ার রাস্তা! আর সৌন্দর্য্যরে বাকি অংশটুকু দেখতে হলে বনে ঢুকতে হবে ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে। ফেরার পথে গোয়ইনঘাট নেমে জাফলং-এর ঠান্ডা পানিতে গোসলটা সেরে আসতে পারেন, ওটা খুব বেশী দূরে নয়। আর অন্য পথটা হলো সিলেট থেকে মোটরঘাট হয়ে। সেটার কথা নাইবা বললাম, জীবনে যদি মনে রাখার মতোন কোনো স্মৃতি নিয়ে ঘরে ফিরতে চান তাহলে গোয়াইনঘাটের রাস্তাটা দিয়েই ঘুরে আসুন।

আর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে পরামর্শ সেটা হলো ‘রাতারগুল’ যেতে চাইলে অবশ্যই জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যাবেন, এর পরে বা আগে গেলে বনে পানি পাবেন না।

Categories
Uncategorized

এক বর্ষায় লোভনীয় সিলেট…

ডুব পাথরে জলের বিছানাঃ বিছানাকান্দি, সিলেট

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের রস্তুমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বিছানাকান্দি সিলেট জেলার নবীনতম ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সাদা কালো মেঘের চাদরে ঘেরা চেরাপুঞ্জি আর মেঘালয়ের সবুজ গালিচা পাতা পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাণবন্ত ঝর্ণার স্রোতস্বিনী জলধারার নিচে বিস্তৃত পাথুরে বিছানায় সজ্জিত অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম বিছানাকান্দি। অনেকের মতে গুচ্ছ গুচ্ছ পাথর বিছানো বলেই এর নাম হয়েছে বিছানাকান্দি।


বিছানাকান্দি মুলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল যেখানে অনেকগুল ঝরনাধারার পানি একত্রিত হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পরে বাংলাদেশের পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সাথে বড় বড় পাথর এসে জমা হয় বিছানাকান্দিতে। পিয়াইন নদীর একটি শাখা পাহাড়ের নীচ দিয়ে চলে গেছে ভোলাগঞ্জের দিকে আর একটি শাখা গেছে পাংতুমাই হয়ে জাফলং এর দিকে।


বর্ষার দিনে বিছানাকান্দির পূর্ণ যৌবনে লাভ করে, ভরাট জলে মেলে ধরে তার আসল রূপের বিস্তৃত মায়াজাল। শীতল এই স্রোতধারার স্বর্গীয় বিছানায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম লাবণ্যের স্পর্শ। সুযোগ করে দিতে পারে নগর জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটানোর। দুই পাশে আকাশচুম্বী পাহাড়, তার মাঝে বয়ে চলা ঝরনার স্রোত, পানি একেবারে পরিষ্কার, স্বচ্ছ, এবং টলমলে। স্বচ্ছ শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোমও দেখা যাবে স্পষ্ট। টলটলে পানিতে অর্ধ ডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে মন চাইবে। দীর্ঘ সময় জল পাথরের বিছানায় শুয়ে-বসে গোসল আর জলকেলিতে মেতে উঠলেও টের পাবেন না কখন বেলা গড়িয়ে যাবে। এই স্বর্গীয় বিছানা ছেড়ে হয়তো কোন কালেই উঠতে ইচ্ছে করবে না আপনার। কিন্তু বে-রসিক ঘড়ির কাঁটা একসময় জানিয়ে দিবে দুপুর পেড়িয়ে সময় এখন পড়ন্ত বিকেল, ফিরতে হবে আপন নীড়ে।


বিছানাকান্দি যেতে হলে র্সবপ্রথম আপনাকে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে প্রথমেই চোখে পরবে লাক্কাতুরা আর মালনিছরা চা বাগান। রাস্তার দুই পাশ জুড়ে শুধু সবুজ চা গাছের সারি, ওপরে নীল আকাশ আর নীচে যেন সবুজ গালিচা বিছানো। বিমানবন্দর পর্যন্ত এ রকমই সুন্দর রাস্তা দেখতে পাবেন। ছোট ছোট মনোলোভা টিলা পার হয়েই দেখা মিলবে পাথর ভাঙা রাজ্যের। এই রাস্তা ধরে সালুটিকর হয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন হাদারপার বাজারের কাছে। হাদারপার বাজারে যাবার আগেই মেঘালয়ের সারিবদ্ধ হয়ে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে সীমাহীন উঁচু পাহাড়ের সারি স্বাগত জানাতে জানাতে ধীরে ধীরে যেনো কাছে চলে আসতে থাকবে আপনার। দূর থেকে দেখতে পাবেন পাহারের বুক চিড়ে বয়ে আসা সাদা রেখার ন্যায় অসংখ্য ঝর্না হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে নিজেদের দিকে, আর আফসোস করতে থাকবেন ওই সবুজে মোড়ানো সারিবদ্ধ পাহাড় আর ঝর্নাগুলো কেন আমাদের হলো না! এসব ঝরণার কাছে গিয়ে পানি ছোঁয়ার কোনও সুযোগ নেই, শুধুই দুই চোখ ভরে উপভোগ করা যায়। কারণ এর সবগুলোই ভারতের।


হাদারপার খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চেঁপে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বিছানাকান্দির জল পাথরের বিছানার দিকে যতই এগিয়ে যাবেন ততই তার সৌন্দর্যছটা যেন উপচে বের হয়ে আসতে থাকবে। সঙ্গে মিলেমিশে একাকার নদীর এপার আর ওপারের অপার সৌন্দর্য যা আপনাকে দু হাত প্রসারিত করে আলিঙ্গন করবে সব সয়মই। এভাবেই ঠিক পনের মিনিট পর পৌঁছে যাবেন বিছানাকান্দি। দিনটি যদি হয় মেঘাবৃত আকাশ আর বৃষ্টিঝরা, তাহলে আপনি খুবই সৌভাগ্যবান! কারন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন এখানে আকাশে মেঘের কোলে হেলান দিয়ে পাহাড় যেন ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে।


বিছানাকান্দির এমন সৌন্দর্য বরষা চলে গেলে বা পানি কমে গেলে আর থাকেনা। তখন এটা হয়ে যায় একটা মরুদ্যান। পাথর বহন করার জন্য এখানে চলে অজস্র ট্রাক আর ট্রাকটর। সুতরাং অক্টোবর পর্যন্ত বিছানাকান্দি যাবার মোক্ষম সময়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ঢল থাকে বলে পিয়াইন নদীতে এ সময়ে মূল ধারায় স্রোত অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে, পানির প্রবাহ বেড়ে যায় কয়েকগুন । তাই বিছানাকান্দি যাওয়ার পথে ছোট নৌকা পরিহার করা উচিত। ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে বেড়াতে চেষ্টা করুন। এছাড়া এখানকার নৌকাগুলোতে লাইফ জ্যাকেট থাকে না। তাই যারা সাঁতার জানেন না, সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট নিয়ে নিবেন। আর যারা সাঁতার জানেন তারাও সাবধান, কারণ প্রচন্ড স্রোতে আপনি পাথরে আঘাত পেতে পারেন, কারণ মাঝে মাঝে পাথর খুবই পিচ্ছিল।


বিছানাকান্দির বিছানা বাংলাদেশ আর ভারত মিলিয়ে। স্বাভাবিক ভাবে সীমানা চিহ্ণিত করা নেই এখানে। জায়গাটিতে তাই সাবধানে বেড়ানো উচিৎ। বাংলাদেশ অংশ ছেড়ে ভারত অংশে চলে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। তবে দিনটা যদি হয় শুক্র বা সোমবার, তাহলে ভাববেন কপাল খুলে গেছে আপনার। সকাল দশটা থেকে চারটার ভিতর যেতে পারবেন ভারতে, সীমান্তে হাট বসে তখন। খেতে পারবেন ভারতীয় ফলমূল, কেনেকাটা করতে পারবেন রকমারি জিনিসপত্র।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন পাহাড়ি ঝর্না আর ডুব পাথরের জলখেলার দৃশ্যে শোভিত অপরূপ প্রকৃতির অপ্সরা বিছানাকান্দি থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। হাতে সময় থাকলে নৌকা নিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে আসতে পারেন পাংথুমাই ঝর্না আর লক্ষণছড়া থেকে। লিখাটি পড়ে ভালো লাগলে লাইক এবং শেয়ার দিয়ে অপরকে এই সুন্দর জায়গাটি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিন। 

Bichnakandi

জাফলং , গোয়াইনঘাট, সিলেট

জাফলং বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকায়, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ পাহাড়ী এলাকা যা সবুজ পাহাড়ের অরণ্যে ঘেরা। । এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে পিয়াইন নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্ষাকালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী শিলং মালভূমির পাহাড়গুলোতে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে ঐসব পাহাড় থেকে ডাওকি নদীর প্রবল স্রোত বয়ে আনে বড় বড় গণ্ডশিলা (boulder)। একারণে সিলেট এলাকার জাফলং-এর নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর পাওয়া যায়। আর এই এলাকার মানুষের এক বৃহৎ অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে এই পাথর উত্তোলন ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে।


পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ, ভারত সীমান্ত-অভ্যন্তরে থাকা উঁচু উঁচু পাহাড়শ্রেণী, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, সর্পিলাকারে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেলপানি,উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তোলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। এসব দৃশ্যপট দেখতে প্রতিদিনই দেশী-বিদেশীপর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে।


ঋতুবৈচিত্র্যের সাথে জাফলংও তার রূপ বদলায়। বর্ষায় জাফলংএর রুপ লাবণ্য যেন ভিন্ন মাত্রায় ফুটে উঠে। মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের ফলে ভারত সীমান্তে প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীর স্রোত বেড়ে গলে নদী ফিরে পায় তার প্রাণ, আর হয়ে ওঠে আরো মনোরম। ওপারের সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়েরসবুজাভ চূড়ায় তুলার মত মেঘরাজির বিচরণ এবং যখন-তখন অঝোরধারায় বৃষ্টি মন্ত্রমূগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের। আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং। চারিদেকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহীন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়েই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে জাফলং।


গাড়ী থেকে নেমে ভাড়ার নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্টে যাওয়া যায়, যেখানে রয়েছে ডাউকির ঝুলন্ত সেতু। খেয়া বা ভাড়া নৌকায় নদী পেরিয়ে পশ্চিম তীরে গেলে খাসিয়া আদিবাসীদের গ্রাম সংগ্রামপুঞ্জি ও নকশীয়াপুঞ্জি। নদীর পাড় থেকে স্থানীয় বাহনযোগে এসব পুঞ্জী ঘুরে বেড়ানো যায়। এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠোনে বসে নারী সদস্যরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য পর্যটকদের নজরকাড়ে। পানবরজ ছাড়াও খাসিয়া পল্লীতে দেখা যাবে কমলা বাগান। কাঁচা-পাকা কমলায় নুয়ে আছে বাগানের গাছ। সংগ্রামপুঞ্জির রাস্তা ধরে আরেকটু এগুলো দেখা যাবে দেশের প্রথম সমতল চা বাগান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাজার বছর ধরে জাফলং ছিল খাসিয়া জৈন্তা-রাজার অধীন নির্জন বনভূমি। ১৯৫৪ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর খাসিয়া জৈন্তা রাজ্যের অবসান ঘটে।


যদি ও শীতকালেই পর্যটক সমাগম বেশী হয় কিন্তু এই অঞ্চলের পাহাড়ের সবুজ, মেঘ ও ঝর্ণার প্রকৃত সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় বর্ষাকালে। সিলেটে বর্ষা সাধারনতঃ দীর্ঘ হয়। সেই হিসেবে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভ্রমনের উপযুক্ত সময়।


সরাসরি জাফলং যেতে সিলেট থেকে গাড়ীতে সময় লাগে একঘন্টা ত্রিশ মিনিটের মতো। সিলেট শহর থেকে ৬-৮ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৪৫০০ – ৫০০০ টাকার মধ্যে। ৯-১২ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৫৫০০ – ৬০০০ টাকার মধ্যে। শুক্রবার হলে আরেকটু বেশী ও হতে পারে। নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্টে যেতে স্থানীয় নৌকায় ৫০০ টাকার মতো খরচ পড়ে। নদী পেরিয়ে খাসিয়া পুঞ্জিতে যেতে স্থানীয় বাহনে ( ময়ূরী নামে পরিচিত) খরচ পড়বে সময়ভেদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। যদি আপনি জাফলং-এ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তাহলে জাফলং-এ সারাদিন বেড়িয়ে সন্ধ্যায় সিলেট শহরে ফিরে ডাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
Jaflong

Photo Credit: TuheenBD

খাদিমনগর রেইনফরেস্ট, সিলেট

সিলেট শহর থেকে জাফলং রোড ধরে ১০ কিমি এর মতো এগুলেই শাহপরান মাজার গেট পেরুনোর পর পরই খাদিম চৌমুহনা। খাদিম চৌমুহনা থেকে হাতের ডানদিকে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তা ধরে সামনে গেলে খাদিমনগর চাবাগানের শুরু। বাগানের রাস্তা ধরে আরেকটু সামনে গেলে একটা কালভার্ট। কালভার্ট পেরিয়ে বামের রাস্তা না ধরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে আরো চা বাগান, চা বাগানের পর প্রাকৃতিক বনের হাতছানি। মুল সড়ক থেকে উত্তরের দিকে পাকা, কাঁচা ও ইট বিছানো পাঁচ কিমি পথ পেরুনোর পর খাদিমনগর রেইনফরেস্টের শুরু। পূর্বে ছড়াগাঙ্গ ও হাবিবনগর, পশ্চিমে বরজান ও কালাগুল, উত্তরে গুলনি, দক্ষিনে খাদিমনগর এই ছয়টি চা বাগানের মাঝখানে ১৬৭৩ একর পাহাড় ও প্রাকৃতিক বনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা এই রেইনফরেস্টটি জাতীয় উদ্যান বলে সরকারী স্বীকৃতি পেয়েছে এবং ইউএসএইড এর সহায়তায় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে।

এই বনে হাঁটার জন্য ৪৫ মিনিট ও দুইঘন্টার দুটো ট্রেইল আছে। বনবিভাগের বিট অফিসের সামনে ট্রেইল দুটোর মানচিত্র দেয়া আছে, এ ছাড়া স্থানীয় কাউকে গাইড হিসাবে ও সাথে নেয়া যেতে পারে।

রেইনফরেস্টের সামনে দিয়ে উত্তর দিকে যে রাস্তা চলে গেছে, সে দিক দিয়ে এগিয়ে গেলে এয়ারপোর্ট-হরিপুর সড়কে উঠা যায়, সেখান থেকে আবার রাতারগুল সোয়াম্পফরেস্টে ও সহজেই যাওয়া সম্ভব। কোন পর্যটক যদি একদিনের জন্য সিলেট ঘুরতে চান সে ক্ষেত্রে এই পথটি ব্যবহার করে চাবাগান, রেইনফরেস্ট, সোয়ামফরেস্ট দেখে যেতে পারেন।

এই পথের অধিকাংশ কাঁচা ও ইট বিছানো হলে ও গাড়ী নিয়ে যাওয়া যায় তবে বৃষ্টি থাকলে সে ক্ষেত্রে সিএনজি নিয়ে যাওয়া ভালো। খাদিম চৌমুহনাতে ভাড়ার সিএনজি পাওয়া যায়।

Khadim Nagar Rain forests

Photo Credit: Mehedi Hasan Suvo

লালাখাল, জৈন্তিয়াপুর, সিলেট

মেঘালয় পর্বত শ্রেনীর সবচেয়ে পুর্বের অংশ জৈন্তিয়া হিলসের ঠিক নীচে পাহাড়, প্রাকৃতিক বন, চা বাগান ও নদীঘেরা একটি গ্রাম লালাখাল, । লালাখাল থেকে সারীঘাট পর্যন্ত নদীর ১২ কিমি পানির রঙ পান্না সবুজ- পুরো শীতকাল এবং অন্যান্য সময় বৃষ্টি না হলে এই রঙ থাকে। মুলতঃ জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে আসা প্রবাহমান পানির সাথে মিশে থাকা খনিজ এবং কাদার পরিবর্তে নদীর বালুময় তলদেশের কারনেই এই নদীর পানির রঙ এরকম দেখায়।

স্বচ্চ নীল জল রাশি আর দুধারের অপরুপ সোন্দর্য, দীর্ঘ নৌ পথ ভ্রমনের সাধ যেকোন পর্যটকের কাছে এক দূর্লভ আর্কষণ। সারি নদীর স্বচ্চ জলরাশির উপর দিয়ে নৌকা অথবা স্পীডবোটে করে আপনি যেতে পারেন লালা খালে। যাবার পথে আপনির দুচোখ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন কিন্ত সৌন্দর্য শেষ হবে না। ৪৫ মিনিট যাত্রা শেষে আপনি পৌছে যাবেন লালখাল চা বাগানের ফ্যাক্টরী ঘাটে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন নদীর পানির দিকে। কি সুন্দর নীল, একদম নীচে দেখা যায়। ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই লালাখালের অবস্থান। চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী সারী নদী নামে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।


সিলেট জাফলং মহাসড়কে শহর থেকে প্রায় ৪২ কিমি দূরে সারীঘাট। সারীঘাট থেকে সাধারনতঃ নৌকা নিয়ে পর্যটকরা লালাখাল যান। স্থানীয় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় একঘন্টা পনেরো মিনিটের মতো সময় লাগে সারী নদীর উৎসমুখ পর্যন্ত যেতে। উৎসমুখের কাছাকাছিই রয়েছে লালাখাল চা বাগান।

সরাসরি গাড়ী নিয়ে ও লালাখাল যাওয়া যায়। সারী ব্রীজ় পেরিয়ে একটু সামনেই রাস্তার মাঝখানে একটি পুরনো স্থাপনা।এটি ছিলো জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজকুমারী ইরাবতীর নামে একটি পান্থশালা। এর পাশ দিয়ে হাতের ডানের রাস্তায় ঢুকে সাত কিমি গেলেই লালাখাল। লালাখাল এ রিভার কুইন রেস্টুরেন্ট এর সামনে থেকে ও নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্ট ঘুরে আসা যায়।

সিলেট শহর থেকে লালাখাল পর্যন্ত ৬-৮ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৩৫০০ – ৪০০০ টাকার মধ্যে। ৯-১২ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৪৫০০ – ৫,৫০০ টাকার মধ্যে। শুক্রবার হলে আরেকটু বেশী ও হতে পারে।

সারীঘাট থেকে স্থানীয় নৌকা নিয়ে লালাখাল যেতে খরচ পড়বে ১০০০-১৫০০ টাকার মতো খরচ পড়ে। আর নাজিমগড় বোট স্টেশনের বিশেষায়িত নৌকাগুলোর ভাড়া ২০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত। গাড়ী নিয়ে লালাখাল চলে গেলে রিভারকুইন রেস্টুরেন্ট থেকে আধাঘন্টার জন্য নৌকা ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা।

Lalakhal

Photo Credit: Shakhawat Hossain

লক্ষণছড়া, গোয়াইনঘাট, সিলেট

পাংথুমাই থেকে পিয়াইন নদী ধরে হাদারপাড়ের উদ্দেশে ফিরতি পথে দেখা যাবে আরেকটি পাহাড়ি ঝিরি। এর নাম লক্ষণছড়া। এ ঝিরিটিও ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে এসে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের এ ঝিরিটি দেখতে হলে পিয়াইন নদী ধরে চলতে চলতে পূর্ব রুস্তমপুর প্রামে নামতে হবে। সেখান থেকে লক্ষণছড়া প্রায় বিশ মিনিটের হাঁটা পথ। তবে ভরা বর্ষায় এলাকার নিচু জমি ডুবে গেলে একেবারে লক্ষণছড়ার খুব কাছাকাছি ছোট ইঞ্জিন নৌকায় যাওয়া যায়। এখানে রুস্তমপুর গ্রামে ১২৬৬ নং সীমানা পিলারের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে লক্ষণছড়া। পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে একটু দূরে সবুজের মাঝে একটি বাঁকানো সেতু দেখা যায় ঝিরির উপরে । সেতুটি ভারতের মধ্যে । লক্ষণছড়ার পানিও বেশ শীতল। দুই দেশের বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে এ ছড়ার পানিই ব্যবহার করেন। লক্ষণ ছড়ায় কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। পিয়াইন নদীর পাড়ে রুস্তমপুর গ্রামের মেঠো পথ ধরে লক্ষণছড়ায় হেঁটে যেতে ভালো লাগবে । ভারতের আকাশছোঁয়া পাহাড়ের পাদদেশে এ গ্রামটি ছবির মতো সাজানো ।

Lokkhonchora

লোভাছড়া, কানাইঘাট, সিলেট

উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর পশ্চিম পর্যন্ত সিলেটকে ঘিরে রাখা মেঘালয় পাহাড়শ্রেনীর পূর্ব অংশে কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল লোভাছড়া। লোভাছড়া মুলতঃ একটি পাথর কোয়ারী, এ ছাড়া এখানে অনেক পুরনো একটি চাবাগান রয়েছে।

লোভাছড়া যেতে হলে পর্যটকদের প্রথমে যেতে হবে কানাইঘাট উপজেলা সদরে। সিলেট নগরী থেকে কানাইঘাট যাওয়ার কয়েকটি পথ আছে। সিলেট জাফলং মহাসড়কের উপর দরবস্ত বাজার থেকে হাতের ডান দিকে রাস্তা চলে গেছে কানাইঘাট পর্যন্ত। মাইক্রোতে ঘন্টা দেড়েক এর মতো সময় লাগবে। এই রাস্তাটি ও সুন্দর। বামদিকে জৈন্তিয়া পাহাড়ের সারি । কানাইঘাট উপজেলা সদর সুরমা নদীর তীরে। নদীরঘাট থেকে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয় লোভাছড়ার দিকে। নৌকা এগুতে থাকে পূর্ব দিকে। একটা পয়েন্টে এসে নৌকা পড়বে তিন নদীর মোহনায়। দক্ষিন থেকে এসেছে বরাক, উত্তর থেকে লোভা। এই দুই নদী মিশে সুরমা হিসেবে চলে গেছে পশ্চিমে। এই মোহনায় এসে নৌকা প্রবেশ করে স্বচ্ছ পানির নদী ‘লোভা’য়।


লোভা নদীর স্বচ্ছ কাঁচের মতো পানিতে দূরবর্তী পাহাড় সারির ছায়া এক মোহময় দৃশ্যের জন্ম দেয়। নদীর তীর থেকে উঁচু পাহাড়ের ঢাল পর্যন্ত বিস্তৃত লোভাছড়া চা বাগান। এই বাগানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত ফ্যাক্টরী। বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পুরনো বাংলো দেখা আবশ্যক পর্যটকদের জন্য। বেশ উঁচু পাহাড়ের উপর নির্মিত এই বাংলোটি ‘ফার্গুসন’ এর বাংলো নামে পরিচিত। ফার্গুসন পরিবার এর হাতেই এই চাবাগানের পত্তন হয়েছিলো।
এছাড়া সীমান্তরক্ষীদের অনুমতিসাপেক্ষের লোভা নদীর উৎসমুখে গেলে পর্যটকদের চোখে পড়বে সীমান্তের ওপাড়ে দুই পাহাড়ের সংযোগকারী দীর্ঘ ঝুলন্ত ব্রীজ।


কানাইঘাট থেকে লোভাছড়া নৌকায় যেতে সময় লাগবে প্রায় দেড়ঘণ্টা।

Lovachora, Kanaighat

PC: Dulal Khan

পাহাড়ি মায়া ঝরনাঃ পাংথুমাই

ভারত সীমান্তবর্তি মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থানার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে অবস্থিত পাংথুমাই গ্রামটি বাংলাদেশ এর সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম হিসেবে ইতিমধ্যেই পর্যটকদের নিকট পরিচিতি লাভ করেছে। এই গ্রামের মুল সৌন্দর্য হচ্ছে মেঘালয় পাহাড় থেকে বেয়ে আসা দারুণ একটি ঝর্ণা। ঝরনাটি ভোগোলিক ভাবে ভারতে অন্তর্ভুক্ত। তাই আমরা বাংলাদেশীরা শুধু দূর থেকেই দেখি এর সৌন্দর্য।সুউচ্চ পাহাড় থেকে নেমে আসছে জলরাশি। সফেদ জলধারা লেপ্টে আছে সবুজ পাহাড়ের গায়। দেখলে মনে হবে সবুজের বুকে কেউ হয়তো বিছিয়ে রেখেছে সাদা শাড়ি।এই ঝর্ণাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত, কেউ কেউ একে ডাকেন বড়হিল ঝরনা বলে। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি ‘পাংথুমাই ঝর্ণা’ নামে।


পাংথুমাই যেতে হলে র্সবপ্রথম আপনাকে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে প্রথমেই চোখে পরবে লাক্কাতুরা আর মালনিছরা চা বাগান। রাস্তার দুই পাশ জুড়ে শুধু সবুজ চা গাছের সারি, ওপরে নীল আকাশ আর নীচে যেন সবুজ গালিচা বিছানো। বিমানবন্দর পর্যন্ত এ রকমই সুন্দর রাস্তা দেখতে পাবেন। ছোট ছোট মনোলোভা টিলা পার হয়েই দেখা মিলবে পাথর ভাঙা রাজ্যের। এই রাস্তা ধরে সালুটিকর হয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন হাদারপার বাজারের কাছে। হাদারপার বাজারে যাবার আগেই মেঘালয়ের সারিবদ্ধ হয়ে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে সীমাহীন উঁচু পাহাড়ের সারি স্বাগত জানাতে জানাতে ধীরে ধীরে যেনো কাছে চলে আসতে থাকবে আপনার। দূর থেকে দেখতে পাবেন পাহারের বুক চিড়ে বয়ে আসা সাদা রেখার ন্যায় অসংখ্য ঝর্না হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে নিজেদের দিকে, আর আফসোস করতে থাকবেন ওই সবুজে মোড়ানো সারিবদ্ধ পাহাড় আর ঝর্নাগুলো কেন আমাদের হলো না! এসব ঝরণার কাছে গিয়ে পানি ছোঁয়ার কোনও সুযোগ নেই, শুধুই দুই চোখ ভরে উপভোগ করা যায়। কারণ এর সবগুলোই ভারতের। হাদারপার খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চেঁপে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের সিমান্ত ঘেসা আকাবাকা পিয়াইন নদী ধরে এক থেকে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন পাংথুমাই।


এছাড়া সিলেট শহর থেকে মাইক্রোবাস অথবা সিএনজি ভাড়া করে সরাসরি যাওয়া যাবে পাংথুমাই পর্যন্ত। পাংথুমাইয়ে যাওয়া যায় দুটি রাস্তায়। একটি হচ্ছে গোয়াইনঘাটের সালুটিকর হয়ে আর অন্যটি জৈন্তাপুরের সারিঘাট হয়ে। উভয় রাস্তায় দূরত্ব ও ভাড়া সমান।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন পাহাড়ি ঝর্না পাংথুমাই থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। হাতে সময় থাকলে নৌকা নিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে আসতে পারেন বিছানাকান্দি আর লক্ষণছড়া থেকে।পাংথুমাই ঘুরে এসে বুঝতে পারবেন ঝর্নার কলধ্বনি কানে বেজে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। আর আপসোস হবে মনে মনে, প্রকৃতির অপরূপ মায়াবী সবকটি ঝর্না কেন কেবলি সীমানা পেড়িয়ে ওপার থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

Pangtumai Jhorna

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, গোয়াইনঘাট, সিলেট

জলাভূমিতে বিভিন্ন জাতের ছোট গাছপালা এমনিতেই জন্মে থাকে। কিন্তু এসব গাছের সঙ্গে পানিসহিষ্ণু বড় গাছপালা জন্মে একটা বনের রূপ নিলে তবেই তাকে বলে সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলের জঙ্গল। বিশ্বের বৃহৎ জলাভূমির বনগুলো দেখা যায় কিছু বৃহৎ নদীর পাড়ে যেমন অ্যামাজন, মিসিসিপি এবং কঙ্গোর তীরে কিংবা অন্যান্য রেইন ফরেষ্ট অঞ্চলগুলোতে। সারা পৃথিবীতে ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট বা স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। যার মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আছে দুইটি, একটি শ্রীলংকায় আর আরেকটা আমাদের বাংলাদেশে।


বাংলাদেশের একমাত্র ফ্রেসওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট “জলারন্যঃ রাতারগুল”, শহর থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এই অঞ্চলের ৫০৪ একর বনকে ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বর্তমানে মাত্র দুই বর্গকিমি এর মতো জায়গাজুড়ে টিকে আছে এই বন। অনেক এই বনকে বাংলার আমাজানও বলে থাকেন আর স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন “সুন্দরবন”। কেননা, ম্যানগ্রোভ বনের সাথে বেশ অদ্ভুত মিল আছে এ বনের। যদিও কোনো সমুদ্রের ধারে কাছে এটা অবস্থিত নয়, তবুও মিঠাপানির সংস্পর্শে বেঁচে থাকতে এ বনের গাছগুলো নিজেদের অভিযোজন করে নিয়েছে। কেবল বর্ষায় (বছরের ৫-৭ মাস)এই বনের গাছগুলো আংশিক জলে ডুবে থাকে। জলমগ্ন অবস্থায় এই বনে নৌ-ভ্রমন করতে চাইলে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। বর্ষার পানি নেমে যাবার পর কিছুদিন কর্দমাক্ত থাকে এরপর আবার শীতকালে রাতারগুল বন পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো যায়।


রাতারগুল মুলতঃ তিনটি নদীর কাছাকাছি। দক্ষিন দিক থেকে চ্যাঙ্গের খাল এসেছে, পূর্বদিক থেকে কাফনা। চ্যাঙ্গের খাল ও কাফনা মিলে গোয়াইন নাম ধরে চলে গেছে উত্তরে গোয়াইনঘাটের দিকে। বর্ষাকালে এই নদীগুলোর পানি ঢুকে যায় বনের ভেতরে এবং ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত পানিবন্দী হয়ে পড়ে পুরো বন। তখন গাছগুলোর অর্ধেক পানির উপর, অর্ধেক পানির নীচে, পানিতে ঘন জঙ্গলের ছায়া সবমিলিয়ে এক অভূতপুর্ব দৃশ্যের অবতারনা হয়। নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এই মিঠাপানির জলাবনটিতে উদ্ভিদের দুটো স্তর পরিলক্ষিত হয়। উপরের স্তরটি মূলত বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে গঠিত যেখানে নিচের স্তরটিতে ঘন পাটিপাতার (মুর্তা) আধিক্য বিদ্যমান । এছাড়াও অরণ্যের ৮০ শতাংশ এলাকাই উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত । এই বন মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও পরবর্তিতে বাংলাদেশ বন বিভাগ নানা জাতের জলসহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে এখানে। এখন পর্যন্ত এখানে সর্বমোট ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে রয়েছে জারুল, করচ, কদম, বরুণ, পিটালি, হিজল, অর্জুন, ছাতিয়ান, গুটিজাম, বটগাছ, জালি বেত ও মুর্তা বেতসহ পানিসহিষ্ণু বিভিন্য প্রজাতির উদ্ভিদ। জলমগ্ন বলে এই বনে সাঁপের আবাস বেশি, আছে জোঁকও; শুকনো মৌসুমে বেজিও দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে বানর, গুইসাপ; পাখির মধ্যে আছে সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল এবং বাজপাখি। শীতকালে রাতারগুলে আগমন ঘটে অতিথি পাখির, আসে বিশালাকায় শকুনও। সাপের মধ্যে রয়েছে অজগর, গোসাপ, গোখরা, শঙ্খচূড়, কেউটে, জলধুড়াসহ বিষাক্ত অনেক প্রজাতি। বর্ষায় বনের ভেতর পানি ঢুকলে এসব সাপ গাছের ওপর ওঠে পরে। বনেও দাবিয়ে বেড়ায় মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোঁদড়, শিয়াল সহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী।


রাতারগুল বনের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করে যতটানা বর্ণনা করা যায় তার থেকে সেই জলাভূমিয় চড়ে বেড়ানোটায় অনেক আনন্দঘন এবং রোমাঞ্চকর। রাতারগুল, বনে ঢুকার সাথে সাথে মুখ থেকে উধাও হয়ে যাবে সকল কথা। চোখের সামনে বাকরুদ্ধ করে দেবে সবুজের হাতছানি, দেখতে পাবেন গাছের পাতাদের পানির সাথে লুকোচুরি খেলা, কাকচক্ষুর মতো টলটলে পানি, বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শন শন শব্দের সাথে পানিতে বৈঠা পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ মিলে তৈরী করেছে শব্দের মায়াজাল। এই চিরসবুজ বনাঞ্চলের কিছু অংশ এতোটাই নিমজ্জিত যে যেখানে নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় না। আপনি এই সবুজের চাঁদরে মোড়ানো জলভূমিতে অ্যামাজনের অনুভূতি উপভোগ করতে পারবেন। স্থানীয়ভাবে সুন্দরবন নামে পরিচিত এই জলাবন আপনাকে যেমন ভয় ধরাবে তেমনি স্মৃষ্টি বিস্ময় নিয়েও ভাবাবে। অর্ধ নিমজ্জিত গাছের ডালে ডালে ঝুলে পড়ার অদম্য ইচ্ছাকে অবশ্যই রোধ করতে হবে, কেননা কোন ডাল থেকে যে সর্পমহাশয় ঝুলে বিশ্রাম নিতেছেন তা ঠাহর করা বড় মুশকিল। হিজল, তমাল আর করচ গাছগুলো এখানে এতটাই এঁকে বেঁকে বেড়ে উঠেছে যে আকাশটাও ঢাকা পড়ে যায় গাছের আড়ালে। গাছের সবুজ আর পানিতে সেই সবুজের প্রতিবিম্ব তার উপর সূর্যালোকের লুকচুরি খেলা সবমিলিয়ে এক ভয়াবহ সৌন্দর্য।


নৌকায় করে কিছুদূর গেলে একটি ওয়াচটাওয়ার পাবেন। চেষ্টা করবেন কোথায় ঘুরতে এসেছেন তা একবার পুরোটা উপর থেকে দেখে নেয়ার। নতুবা মাঝির খেলায় বুঝবেন ও না আসলে এটি ৩৩২৫ একরের বাংলাদেশের একমাত্র জলাভূমি এবং বিশ্বের গোটা কয়েক বিশুদ্ধ পানির জলাবনগুলোর একটি। তাই সাবধানে নৌকা ঠিক করে নিবেন। যারা এখনো খুলনার সুন্দরবন দেখেন নি, তাঁরা অনায়াসেই স্বাদ মেটাতে পারেন এই বন দেখে।


রাতারগুল যাওয়ার রয়েছে বেশ কয়েকটি পথে। এর মধ্যে সবথেকে সহজ এবং শর্টকাট রাস্তা হোল আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে সিএনজি বা মাইক্রবাসে এক থেকে দের ঘণ্টার মধ্যে মোটরঘাট হয়ে রাতারগুল গ্রাম। তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকা যোগে চলে যাবেন রাতারগুল বন, সময় লাগবে ২০ মিনিট আর ভাড়া যাওয়া আসা মিলিয়ে ৮০০-১০০০ টাকা। তবে এই নৌকা রাতারগুল বনের ভেতরে যাবে না, বনে ঢুকতে হবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ডিঙি নৌকা ভাড়া করে এবং প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই রাতারগুল বন বিট অফিস থেকে অনুমতি নিতে হবে। বড় নৌকা নিবে ৬০০-৮০০টাকা, সময় দেড় থেকে দুই ঘন্টা আর ছোট নৌকার জন্য ২০০-৩০০ টাকা নিবে। এছাড়া গোয়াইনঘাট হয়েও রাতারগুল যাওয়া যায়, কিন্তু এই পথে সময় একটু বেশি লাগবে। যে পথেই যান, একটি কথা মনে রাখবেনঃ যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না এবং উদ্ভিদ ও বন্য প্রানির ক্ষতি হয় এমন আচরন থেকে বিরত থাকবেন।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন বাংলার অ্যামাজন অথবা সিলেটের সুন্দরবন থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে।

Ratargul Swamp Forests

ভোলাগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, সিলেট

সিলেট শহর থেকে সোজা উত্তরে তেত্রিশ কিমি দূরত্বে ভোলাগঞ্জ- বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাথর কোয়ারী। উত্তরের খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী ধলাই আর পূর্বদিকে ডাউকি থেকে আসা পিয়াইন এর মিলিতধারার পাড়েই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর। সিলেট শহর থেকে আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সালুটিকর-ভোলাগঞ্জ সড়ক ধরে ২৭ কিমি এগিয়ে গেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর। সেখান থেকে আরো ৬ কিমি গেলেই দীর্ঘ পাহাড় সারি, ধলাই নদী, দৃশ্যমান ঝর্ণা আর সারি সারি পাথরের তীর্থ ভোলাগঞ্জ।

১৭৬৫ সালে বৃটিশরা সিলেট দখল করার পর ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে কোম্পানীর রেভিনিউ কালেক্টর হিসাবে সিলেট আসেন, বারো বছর এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভোলাগঞ্জ অঞ্চলে চুনাপাথরের ব্যবসার পত্তন ঘটান। ভোলাগঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরের চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়্গুলো থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হতো ছাতকে, তারপর ছাতক থেকে সুরমা নদী হয়ে এই পাথর চলে যেতো কলকাতায়। এই অঞ্চলের পাথর ব্যবসার লাভ থেকেই লিন্ডসে স্কটল্যান্ড জমিদারী কেনেন, স্যার ও লর্ডস খেতাবে ভূষিত হন। রবার্ট লিন্ডসের আত্নজীবনীতে তৎকালীন পাড়ুয়া, বর্তমানের ভোলাগঞ্জ এলাকার অপার সৌন্দর্য্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্ষায় মেঘালয় পাহাড়জুড়ে মেঘের উচ্ছ্বাস, ঝর্ণার ছুটে চলা, নদীর স্রোতধারা, বর্ষাশেষে জেগে উঠা ধলাই’র দীর্ঘ বালিয়াড়ি পর্যটকদের মুগ্ধ করবে।

সিলেট থেকে মাত্র ৩৩ কিমি হলে ও মুলতঃ রাস্তার অবস্থার কারনে গাড়ী নিয়ে ভোলাগঞ্জ পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দেড়ঘন্টা। আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে ভাড়ায়চালিত সিএনজি নেবে জনপ্রতি ১২০ টাকা। যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন, ভোলাগঞ্জ থেকে পূর্বদিকে দয়ার বাজার, মায়ার বাজার, উথমা, তুরং, উপুর দমদমা, বিত্তরগুল হয়ে চলে যেতে পারেন বিছনাকান্দি পর্যন্ত। মেঘলায় পাহাড়ের নীচ ধরে বেশ কতোগুলো পাহাড়ী ছড়া পাড় হয়ে যেতে যেতে সময় লাগবে ঘন্টা চারেক। দূরত্ব বারো কিমি এর মতো। বিছনাকান্দি থেকে গাড়ী নিয়ে আবার ফিরে আসা যায় সিলেট শহরে।
Volagonj

Photo Credit: emonuzzaman chowdhury