Categories
Uncategorized

চৈইক্ষ্যং-সীমান্তের শেষ পাড়া…

———————————————————————- বাবর আলী

উঁচু কোনো পাহাড় চূড়া কিংবা দুর্গম কোনো ঝরনায় যেতে পারাটা সবসময় আনন্দের। তবে আমার কাছে এর চেয়েও তৃপ্তির ব্যাপার হলো অজানা-অচেনা নতুন কোনো পাহাড়ি পাড়াতে রাত্রিযাপন। কোনো এক পাহাড়ি পরিবারের সাথে তাদেরই ঘরের এক কোণে অজানা ভাষায় কিচির-মিচির শুনতে শুনতে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার অনুভুতিটাই কেমন যেন স্বর্গীয়। এবারের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ পাড়া চৈইক্ষ্যং পাড়া। পাড়াটার অবস্থান  একেবারে মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া। এই পাড়া থেকে মায়ানমারের সীমান্ত মাত্র ২০-২৫ মিনিট দুরত্বের। আর মায়ানমারের নিকটবর্তী জনবসতি পিখিয়ং পাড়া যেতে এই পাড়া থেকে সর্বসাকুল্যে ঘন্টাদেড়েক লাগে। অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই পাড়ার নিকটবর্তী পাড়ায় যেতে সময় লাগে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা। তাই দৈনন্দিন জীবন-যাপন থেকে শুরু করে বিয়ে-শাদীর মতো সামাজিক ব্যাপারেও এই পাড়ার লোকেরা সীমান্তের ওপারের পাড়ার প্রতি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। তাদের নিত্য যোগাযোগ লেগেই আছে। তাছাড়া এই পাড়ার অধিকাংশ লোকের জুম-ই মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া।

DSC_0241

আগের রাতটা কাটিয়েছিলাম সিলোপি পাড়াতে। রাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব। ঘুম ভাঙতেই দেখি আমি লালে লাল! না,এই গহীনে এসে কোনো নগদ অর্থযোগ ঘটেনি। ঘটনা হলো,আগেরদিন সিলোপি পাড়ায় আসার সময় জোঁকের উপর্যুপরি অত্যাচারে শরীরের কয়েকটি অংশে অস্থায়ী নলের সৃষ্টি হয়েছিল। পাড়ায় এসে রাশিক ও লিটু ভাইয়ের সহায়তায় গুল, তুলা, গজ দিয়ে কোনোরকমে নলগুলো  বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। রাতে ঘুমের মধ্যে নড়া-চড়ার ফলে সেই বন্ধ হওয়া কিছু নল আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে খুলে গিয়েছে। সেই সকাবেলাতেই তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েই আবার গজ-তুলা নিয়ে বসতে হল। সে-পর্ব শেষ করে পেনিষ্টোভে নুডলস আর কফি বানাতে বসে পড়লাম। এর মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে আমার সাথে যোগ দিল দুই ট্রিপমেট রাশিক আর লিটু ভাই। প্রাতঃরাশ সেরে আমাদের গন্তব্য সীমান্তের শেষ পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। মূল গন্তব্য চৈইক্ষ্যং পাড়া হলেও যাত্রাপথে আমাদের আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। সেটা হল ‘না থাম ভা’ ঝরনার শেষ ধাপগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। গুগল আর্থে এই ঝরনার ৩টি ধাপ চিহ্নিত করা আছে। আমরা জানতাম এই ঝরনার আরো বেশকিছু ধাপ আছে। দার্জিলিং পাড়া থেকে আমাদের সঙ্গী হওয়া দাদাও অন্য ধাপগুলোর ব্যাপারে বেশকিছু তথ্য দিলেন। দাদা বছর পনের আগে ঐ ঝরনাগুলোতে গিয়েছিলেন। মুলত ভালুক শিকারের উদ্দেশ্যেই ঐ দিকটাতে সে গিয়েছিল। দাদা সাথ থাকাতে আমাদের জন্য অবশ্য ভালোই হয়েছে। এবারের ট্রিপে এমনিতেই আমাদের সাথে কোনো গাইড নেই। তার উপর সাথে নেই এই ঝরনাগুলোর কোনো জিপিএস ট্রেইলও। যদিও দাদার গন্তব্য অবশ্য শেপ্রু পাড়া। নিজের পাড়ার জুম উৎসবের জন্য শুকর আনার গুরুদায়িত্ব পড়েছে তার ঘাড়ে।

DSC_0224-fb

সিলোপি পাড়া থেকে ট্রেইলের শুরুতে বেশ খানিকটা উৎরাই। নামতে নামতে একদম ‘না থাম ভা’ ঝিরির গোড়ায়। শর্টকাট মারার প্রবণতায় ঝিরির পথ না ধরে পাহাড়ি ট্রেইল বেছে নিলাম। কিছুদূর গিয়েই পথ হারালাম। ট্রেইলটা একটা জায়গায় গিয়ে একেবারে ডেড এন্ড। নীচে তাকিয়ে দেখি বিশাল একটা শ’দুয়েক ফুটের ড্রপ। ব্যাকট্রেক করে আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে একেকজন একেকদিকে রেকি করতে গেলাম। ‘পথ পাইছি’-লিটু ভাইয়ের চিৎকার শুনে ওদিক লক্ষ্য করে এগুতে থাকলাম। এরপর শুরু হলো টানা উৎরাই। পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁষে গাছের শিকড়-বাকড় ধরে এগুচ্ছি। তবে এর মধ্যেই রাশিক রেম দাদার দেয়া ‘ভম’ নামটির সার্থকতা রক্ষা করে চলেছে। বম ভাষায় ভম শব্দের অর্থ ‘ভালুক’। ভালুক নাকি বর্ষায় ভুট্টা ক্ষেতে আছাড় খেতে খেতে পথ চলে। রাশিককে চলার পথে উপর্যুপরি আছাড় খেতে দেখেই রেমদার এই নামকরণ। আর কিছুদূর নামতেই ঝিরির দেখা পেলাম। অল্প কিছুদুর এগুতেই ঝরনার আওয়াজে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। বাঁক ঘুরতেই দেখি বিশাল এক ঝরনা। উচ্চতায় শ’দেড়েক ফুটের মত হবে। বেশ কিছুক্ষণ পানিতে দাপিয়ে উঠে পড়লাম।

 DSC_0226-fb

এইবারের পথ উল্টোদিকের পাহাড়ি রিজ ধরে। রিজ ধরে চলছি তো চলছিই। হঠাৎ চোখ আটকাল একটা বড়সড় গাছে। গাছের গায়ে খোদাই করে লেখা ‘এল পি’। দেখেই বুকটা ধ্বক করে উঠল। আগের দিনই অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী এই দলের হাতে পড়েছিলাম আমরা। আমাদের ব্যাক-প্যাক আর তাঁবুগুলো তল্লাশি করে ছেড়ে দিয়েছিল। কোন অনিস্ট অবশ্য করেনি। তারপরও এই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর হতে চাই না। হয়তো কাছেই কোথাও তাদের ক্যাম্প থাকতে পারে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐ পথে না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছুক্ষণ ইতি-উতি করে এদিক-সেদিক ঘুরে একটা পথও পেয়ে গেলাম। পথ বললে অবশ্য ভুল হবে! পাহাড়ের গা ঘেঁষে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে কোনোরকমে এগুনো। কিছুদূর যেতেই একটা নড়বড়ে আধশোয়া মরা গাছ পড়ল। ওটার উপর দিয়ে যেতে হবে। প্রথম দেখাতেই মনে প্রশ্ন জাগল, নড়বড়ে গাছটা আমাদের শরীরের ওজন নিতে পারবে তো? রাশিক আর লিটু ভাই কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে গেল। এবার আমার পালা। মাঝপথে আসতেই আমার আশংকাকে সত্যি করে গাছের গুড়ি সমেত আমি নীচের দিকে দেবে গেলাম। শেষ মুহূর্তে গুড়ি থেকে পা সরে যাওয়াতে আমি নীচের দিকে গড়িয়ে পড়া শুরু করলাম। পনের ফুটের মতো গড়াতেই দৈবক্রমে আমার হাত একটা গাছের গুড়িতে কিভাবে জানি আটকে গেল। নীচে তাকাতেই আক্ষরিক অর্থে মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোতের একটা ধারা বয়ে গেল। রেমদা তৎক্ষনাৎ দড়ি বের করে আমাকে উদ্ধার করলেন। যে ৩০ সেকেন্ডেরর মতো সময় গাছের গুড়িতে ঝুলে ছিলাম, সময়টাকে মনে হয়েছিল অনন্তকাল।

এরপর শুরু হলো একের পর এক বিস্ময়ের পালা। একটু এগুলেই দেখা মিলছিল অনিন্দ্যসুন্দর সব ঝরনা আর ক্যাসকেডের। এ বলে আমাকে দেখ, ও বলে আমাকে দেখ! ঝরনা-ক্যাসকেড দেখতে দেখতে মোটামুটি ত্যাক্ত-বিরক্ত। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর সুন্দর ছিল শেষ ঝরনাটি। ঝরনার পানি যেখানটায় পাশের ঝিরির সাথে মিশেছে সেখানে দুদিকে দু’রংয়ের পানি। মুগ্ধ নয়নে কিছুক্ষণ সেটাই উপভোগ করলাম। ঝিরি ধরে আর বেশ কিছুক্ষণ এগুতেই পেয়ে গেলাম রেমাক্রি খালের দেখা। খাল দেখেই সোজা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। গোসল সেরে পেটপুজাটা খালের পাশেই সারা হল। পেটপূজার মাঝখানেই দেখলাম বিপরীত দিক থেকে ক’জন আসছে। কথা বলে জানতে পারলাম তারা চৈইক্ষ্যং পাড়ার অধিবাসী। আমরাও চৈইক্ষ্যং পাড়া যাব জানতে পেরে একসাথে যাওয়ার জন্য বললো। তাদের স্নানপর্ব শেষ হতেই পাড়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমদিকের পথটা টানা চড়াই।সরু ট্রেইলটা খালের নীচ থেকে কুন্ডলী পাকানো দড়ির মতো পাহাড়ের উপরে গিয়ে মিশেছে। বেশ কিছুদূর উঠে যাওয়ার পর শুরু হলো উঁচু উঁচু সব গাছে ভর্তি এক জঙ্গল। বেশীরভাগ গাছই শতবর্ষী। প্রকাণ্ড গাছগুলোর ফাঁক গলে সূর্যদেব এই ভরদুপুরে ঠিকই তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে আছে জানা-অজানা পাখির কিচিরমিচির। আশেপাশের পাহাড়গুলো যেন সবুজ কার্পেটে মুড়িয়ে দিয়েছে কেউ। পথ চলতে চলতেই সাথের দাদাদের সাথে টুকটাক কথা-বার্তা চালাচ্ছিলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম, সাথের দাদাদের মধ্যে একজন চৈইক্ষ্যং পাড়ার মেম্বার। অন্যদের তুলনায় দাদা বেশ ভালোই বাংলা বলেন এবং বোঝেন। প্রথম দেখাতে তাকে অবশ্য পাহাড়ি বলে মনেই হয় না, বাঙ্গালী বলে ভ্রম হয়। অল্প এগুতেই সামনে বেশ হাঁক-ডাক শোনা গেল। ক’জন পাহাড়ি দাদা দুটো বিশাল আকারের গয়াল নিয়ে ফিরছে। কুশল বিনিময়ের পর জানতে পারলাম, তারা থিংদলতে পাড়ার অধিবাসী। বার্মা গিয়েছিল ফাঁদ পেতে গয়াল ধরতে। এখন পাড়ার দিকে ফিরছে। আর সামান্য চড়াই ভাঙতেই বহুল কাংক্ষিত চৈইক্ষ্যং পাড়ায় পৌছে গেলাম। পাড়ায় ঢুকতেই সবুজে ছাওয়া বিশাল এক মাঠ যেন অভ্যর্থনা  জানাল। মাঠের একপাশে গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ। গয়ালই সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে। অন্যপাশে ধুমসে ফুটবল খেলছে পাড়ার বাচ্চারা। রেম’দার পরিচিত এক ঘরে উঠার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মেম্বার দাদার পীড়াপীড়িতে উনার ঘরেই উঠতে হল। কাঠের দোতলা ঘরটার অবস্থান মাঠের একেবারে শেষপ্রান্তে। অতিকায় এক গয়ালের খুলি ঘরে ঢুকতেই আমাদের সম্ভাষণ জানাল। বিশালাকার সেই গয়ালের খুলির প্রতি আমাদের বিস্ময়ভরা চাহনি দেখে মেম্বার দা হেসে জানালেন, বছর কয়েক আগে বার্মার জংগলে শিকার করেছিলেন এই গয়ালটি। মেম্বারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন আর খুব একটা শিকারে যাওয়া হয় না তার। এ নিয়ে আফসোসও করলেন কিছুক্ষণ। পাশের ঝিরিতে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে তাকাতেই মাথা নস্ট হওয়ার জোগাড়। মেঘের সমুদ্র থেকে উঁকি দিয়ে যেন চারপাশটা দেখছে বাংলাদেশের উচ্চতম পাহাড় সাকা হাফংয়ের চূড়াটা। মেঘ আড়াল করে রেখেছে তার নীচের অংশটাকে। আর চারপাশের ভাসমান পেঁজা তুলার মতো মেঘ থেকে মাথা উঁচিয়ে সদর্পে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে চূড়াটি। ঝিরি থেকে ফিরে মেম্বার দাদার ভাইয়ের শিকার করা রামছাগলের মাংস দিয়ে দুপুরের খাবারটা জমকালোই হলো। খানিকক্ষণ জিরিয়ে বিকেল হতেই পাড়ার আশপাশটা ঘুরে দেখতে বেরুলাম। সঙ্গ দিল পাড়ারই ছেলে মালসম বম। ঢাকার একটি কলেজের এইচএসসির ছাত্র সে। সামনে জুম উৎসব, তাই বাড়ি ফিরেছে। পাড়ার ঘরে ঘরে জুম উৎসবের আয়োজন দেখাতে নিয়ে চলল সে। কিছুক্ষণ চার্চেও বসলাম। উৎসব উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন চলছে সেখানে। শেষ বিকেলটা পাড়ার ছেলে-পেলেদের ফুটবল ম্যাচ দেখতে দেখতেই কেটে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই মাঠের একপাশে বাঁশের বেঞ্চিতে বসে সাকা হাফংয়ের উপর মেঘের খেলা দেখতে লাগলাম। সূর্যের সোনালী আভা পড়ে এতক্ষণের শ্বেত-শুভ্র মেঘগুলোতে যেন রং ধরেছে। ক্ষণে ক্ষণে রং পালটাচ্ছে ভাসমান সাদা মেঘের ভেলাগুলো। আচমকা আমাদের বাঁশের বেঞ্চিটা ভেঙে পপাতঃধরণীতল। পাড়ার যুবতী মেয়েগুলো আমাদের দেখে দেখে হি-হি-লি-লি করতে লাগল। বাঁশের কঞ্চির সাথে লেগে প্যান্ট ফেঁসে গেলেও ‘তেমন ব্যাথা পাইনি’ এমন একটা ভাব করে পাড়ার মেয়েদের সামনে দিয়ে সটানে হেঁটে এলাম।

সন্ধ্যার পরে মালসম পাড়ার অন্যপ্রান্তে তার মামার বাসায় নিয়ে গেল। তারা সবেমাত্র তাদের রাতের খাবার নিয়ে বসেছে। আমাদেরকেও খেতে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। ‘তরকারি কি?’- কৌতুহলবশত রাশিকের করা প্রশ্নের উত্তরে মালসমের মামা একগাল হেসে জানালেন, আজকেই তিনি মায়ানমারের জঙ্গল থেকে একটি বানর শিকার করেছেন। রাতের ভুড়িভোজের আয়োজন সেটা দিয়েই। নিজের পূর্বপুরুষদের মাংস খেতে হবে-এটা ভাবতেই গা কেমন গুলিয়ে উঠল।একদম খিদে নেই-বলে এযাত্রা রক্ষা পেলাম। রাত আরেকটু বাড়তেই মেম্বারদার ঘরে ফিরে গেলাম আমরা। ঘরে ঢুকতেই দেখি বিশাল ভিড়। ভিড়ের উৎস খুঁজতে  গিয়ে দেখলাম, ঘরের এক কোণে একখানা পোর্টেবল ডিভিডি প্লেয়ার। মায়ানমারের একটা মিউজিক ভিডিও চলছে সেখানে। পাড়ার ছেলে-বুড়োদের একটা বড় অংশ নিবিস্ট মনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সেটারই স্ক্রীনের দিকে। মেম্বারদা এবার রুমাবাজার থেকে ফেরার সময় নতুন মিউজিক ভিডিও নিয়ে এসেছেন। সেটারই প্রিমিয়ার শো চলছে এখন। গুটিসুটি মেরে এককোণে শুয়ে পড়লাম। ভিনদেশি সেই মিউজিকের অচেনা সুরে কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম কে জানে। সকাল হতেই ফিরতি যাত্রার প্রস্তুতি শুরু। মেম্বারদা বড়দিনে আবার আসার আমন্ত্রণ দিয়ে রাখলেন। মালসম বম দিল আরো বড় টোপ। বড়দিনে পাড়ায় আসলে সে আমাদেরকে মায়ানমারের বিশাল বড় এক ঝরনায় নিয়ে যাবে বলে কথা দিল। চোখে-মুখে সেই ঝরনার ছবি আঁকতে আঁকতেই আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

   DSC_0219-fb

লেখকের ফেসবুক আইডি লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

Categories
Uncategorized

ঝরনার নাম কাই লো ভা…

———————————————————- বাবর আলী

পাড়া থেকে বেরিয়ে ঘন্টাখানেক হাঁটতেই ঝাঁ ঝাঁ রোদে দফা-রফা অবস্থা। অল্প দূরেই ট্রেইলের পাশে একটা জুমঘর দেখে সেখানেই কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেব বলে মনস্থির করলাম। মিনিট দশেক পরেই সবুজ পাহাড়ের জমিনে বাদামী জুমঘরটার কাছে ভিড়তেই বিকটদর্শন দুটো কালো কুকুর গগনবিদারী চিৎকার শুরু করে দিল। কিছুতেই তারা আমাদের জুমঘরটার কাছে ভিড়তে দিবে না। মুখ দিয়ে উদ্ভট সব শব্দ করে কুকুর পটানোর নানারকম কায়দা-কসরত করেও খুব বেশী সুবিধা করতে না পেরে একসময় রণে ক্ষান্ত দিল রাশিক। বাইরে হাউ-কাউ শুনেই সম্ভবত জুমঘরের ওপাশটা থেকে বেরিয়ে এলেন জুমঘরের মালিক। কানে গোঁজা ফুল দেখেই বুঝলাম দাদা ম্রো তথা মুরং। কথা বলার চেষ্টা করতেই আবিষ্কার করলাম দাদার বাংলা জ্ঞান শুন্যের কোটায়। ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝালাম,উনার জুমঘরটায় ক্ষণিকের অতিথি হতে চাই আমরা। দাদা কুকুর দুটোকে ম্রো ভাষায় কি যেন একটা ধমক দিতেই তারা রীতিমতো চুপসানো বেলুন হয়ে গেল। বুঝলাম, সারমেয় গোত্রের এ দু’সদস্য রাশিকের উদ্ভট বাংলা শব্দাবলী বুঝতে না পারলেও ম্রো ভাষায় তারা বেশ সাবলীল! আর এই ফাঁকে আমরা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ছোট্ট সিড়িটা বেয়ে জুমঘরে উঠে পড়লাম।

মাচাটা ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকতেই বুঝলাম, সচরাচর যেসব জুমঘর দেখতে পাওয়া যায় সেসবের তুলনায় এই জুমঘরটিকে রীতিমতো প্রকান্ডই বলা চলে। ঘরের বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে সদ্যই কেটে আনা ধান। আর অন্যপাশে ফিরতেই দেখি ক’জোড়া উৎসুক চোখ আমাদের দিকে চেয়ে আছে।জুমঘরের মালিকের পরিবারের সদস্য তারা। দিনের প্রথমভাগের কাজ শেষ করে সবেমাত্র তারা দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছে। কুকুর দুটোকে শান্ত করে দাদা ঘরে ঢুকেই ভাত নিয়ে বসলেন। ইশারা-ইঙ্গিতে আমাদেরকেও খেতে বললেন। পাড়া থেকে সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এটা জানাতেই একটু পরে গরম গরম ভুট্টা আসলো আমাদের সামনে। ভুট্টা দেখেই আমি আর রাশিক হামলে পড়লাম। গোগ্রাসে আমাদের ভুট্টা খেতে দেখে রেম’দা ঘোষণা করলেন, এই কদিনে আমি আর রাশিক মিলে যতগুলো ভুট্টা খেয়েছি, একটা পূর্ণবয়স্ক ভালুকও এক মৌসুমে এতগুলো ভুট্টা খেতে পারে না! রেম’দার ইনসাল্টকে আমরা কনসাল্ট  হিসেবে বিবেচনা করে আবার পূর্ণ উদ্যমে ভুট্টার প্রতি মনোনিবেশ করলাম। মুখের ভেতর গালভরা ভুট্টা নিয়েই রেম’দার সাথে আজকের গন্তব্য নিয়ে আলোচনা চালাতে লাগলাম। ‘কাই লো ভা’ নামক একটা মনোলোভা ঝরনাতে যাওয়ার ইচ্ছা আজ।  ‘কাই লো ভা’ শব্দের অর্থ ‘যে ঝিরিতে মাছ উঠতে পারে না’। নাম শুনেই বুঝলাম,মনুষ্য প্রজাতির পাশাপাশি মৎস্যকুলের জন্যও যথেস্ট দুর্গম এই ঝরনার উৎসমুখের ঝিরিটি। রেম’দা বারবার করে বলে দিলেন, ঝরনার নীচের দিকে নামাটা বেশ কঠিন।বেশ কিছুদিন আগে তলাংচাঁদ পাড়ার এক ম্রো শিকারী এই ঝরনার উপর থেকে পড়ে মারা গিয়েছে। নীচের দিকে নামতে দড়ির পাশাপাশি দরকার বাড়তি সাবধানতা।।

DSC_0833-fb new

জুমঘরের মাচার দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি পশ্চিম আকাশের খানিকটা ছেয়ে গেছে কালো মেঘে। একটু পরেই হুড়মুড়িয়ে নামলো বৃষ্টি। শরতের এই এক রূপ। ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার রূপবদল। একবার ভাবলাম,আজকের রাতটা এই জুমঘরেই কাটিয়ে দিই। তবে খানিক পরেই ভাবনাটাকে আর ডাল-পালা মেলতে দেয়া গেল না। ঘরের একপাশ দখল করে রাখা পাকা ধানের বদৌলতে ঘরময় এক ধরনের বদখত দেখতে সবুজ পোকার উৎপাতে টেকাই দায়। ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থা সবার। বাইরে তখনো একটানা রিমঝিম বৃষ্টি।

ঘন্টাখানেক পর বৃষ্টি ধরে আসতেই ট্রেইলে নেমে পড়লাম। তলাংচাঁদ পাড়ার লোকেরা এবছর এদিকের পাহাড়গুলোতে জুম চাষ করেছে। তাই জুমের ফাঁক গলে  সুন্দর ট্রেইল করা আছে। হালকা হলুদ ধানগাছগুলোর নুইয়ে পড়া মাথা এড়িয়ে এগুচ্ছি। দুটো পাহাড় ডিঙানোর পর নিচের ঝিরিতে নেমে পড়ার পালা আসলো। লাল মাটির ট্রেইলটা কিছুক্ষণ আগের বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। ট্রেইলে হাঁটা উপভোগ করার চেয়ে আছাড় না খাওয়ার দিকে অখন্ড মনোযোগ সবার। অল্প এগুতেই দুপাশের জুমের হালকা হলুদ ধান গাছের স্থলাভিষিক্ত হলো বাঁশবাগান। দু’সারি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে সামনের দিকে এগিয়েছে ট্রেইলটা। মিনিট দশেক নামতেই নিচের ঝিরিতে গিয়ে পড়লাম আমরা। এবার পাথরের বোল্ডার টপকানোর পালা। এ-পাথর,ও-পাথরে ছোট ছোট লাফ দিয়ে এগুচ্ছি। ঝিরির দু’পাশে ঘন গাছ-পালার জঙ্গল ভেদ করে রোদ নেমেছে কিছু কিছু জায়গায়। কেমন যেন অদ্ভুত আলোয় আলোকিত সেসব জায়গা। ঝিরি ধরে আর খানিকটা এগুতেই ঝিরিটা দু’ভাগ হয়ে গেল। ডানপাশের ঝিরিতে নামতেই দেখা মিলল সুন্দর একটা ক্যাসকেডের। কিছুক্ষণ গা ভিজিয়ে উঠে এলাম সেটার গোড়া থেকে।এবার এই ঝিরি ধরে নীচে নামতে হবে। তাহলেই দেখা মিলবে কাই লো ভার।ঝিরির সুবিধাজনক একটা জায়গায় আমাদের ভারী ব্যাক-প্যাকগুলো রেখে পিঠে শুধুমাত্র ছোট্ট ডে-প্যাকগুলো চাপিয়ে নিলাম।

সামনের বাঁকটা ঘুরতেই দেখি ছোট-খাট একটা পাথর ধসের এলাকা। পাশের পাহাড়টার ঝুরঝুরে আলগা পাথরগুলোই ধসের কারণ। সাবধানে পথটা পাড়ি দিলাম। আরো কয়েকটা বাঁক ঘুরে খানিকটা নিচের দিকে নামতেই নিজেদেরকে আমরা আবিষ্কার করলাম ঝরনার উপরে। এবার নীচে নামার পালা। নামার পথ দেখে ভিরমি খাবার জোগাড়। রেম’দা জানালেন, এদিকটাতে নামার পথেই ঐ ম্রো শিকারী প্রাণ হারিয়েছে। তৎক্ষণাৎ রাশিকের ঝোলা থেকে রশি বের করে সামনের গাছটাতে বাঁধা হল। পাহাড়ের একেবারে কিনার ঘেঁষে এগুতে হবে। কোনোরকমে একজন মানুষ যেতে পারে এমন একটা পথ। হাতের বামপাশে শ’দুয়েক ফুটের খাদ। হাত বা পা ফসকালেই নিচের পাথুরে জমিনে পড়ে একেবারে আলুর দম। বুকের খাঁচার ভেতরে লাফানো হৃৎপিণ্ড নিয়ে দড়ি ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে এগুতে থাকলাম। খানিক পরেই শুরু হলো, পাশের পাহাড় থেকে খসে পড়া ক্ষুদে পাথরের চাঙড়ের এলাকা। পাথরগুলোর উপর পা পড়লেই সরে যাচ্ছে সেগুলো। দুয়েকটা হার্টবিট মিস করে পৌঁছালাম একটা ছাউনীর মতো অংশে। এখানেই প্রথম দেখা দিল ঝরনাটা। চারপাশের সবুজ বনানীর মধ্যে একখন্ড সাদা ফেনিল ঢেউ যেন। উদ্দাম গতিতে নিচের ঝিরিতে পানি ঢেলেই চলেছে। সাবধানে বাকীপথটুকু বেয়ে নেমে এলাম ঝিরিতে। বোল্ডারের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে পথ চলে বসে পড়লাম একদম ঝরনার গোড়ায়। অবিরত ধারায় ধাপে ধাপে গড়িয়ে নিচের ঝিরির দিকে এগুচ্ছে পানি। একটা ধাপে মাথা ডুবিয়ে প্রশান্তির খোঁজ করলাম খানিকক্ষণ। নিচের ক্যাসকেডটাতে গা ডুবিয়ে ততক্ষণে আপন রাজ্যে হারিয়ে গেছে রাশিক।

ঝিরি ধরে ঝরনার নিচের দিকে এগুতেই খেয়াল করলাম, এই ঝিরিটা একটু অন্যরকম। সাধারণত ঝিরিপথগুলোতে পাথরের বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে থাকে ছোট ছোট পাথর আর নুড়ি মিশ্রিত বালি। আর এই ঝিরিটা পুরোটাই পাথুরে একটা উঠান যেন। অল্প-স্বল্প কিছু বিশালাকৃতি বোল্ডারের দেখা পেলেও বালি-নুড়িপাথর একেবারেই অনুপস্থিত। ঝিরি ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই ভয়াবহ পিচ্ছিল পাথুরে জমিনে আছাড় খেয়ে হাঁটুর নীচে একটা আলু গজিয়ে ফেললাম। আর সামনে না এগিয়ে ঝরনার শেষ ধাপটায় এসে আবার মাথা এলিয়ে দিলাম। হঠাৎ গুড়ুমগুড়ুম শব্দে সংবিৎ ফিরে পেয়ে উপরে তাকিয়েই দেখি কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। আসার পথেই ট্রেইল থেকে অল্প দূরেই বেশ কিছু সুন্দর জুমঘর দেখে এসেছি।সে অভিমুখেই হাঁটা ধরলাম। মনের মধ্যে তখনো ভাসছে সবুজের সমুদ্রে একফালি উত্তাল সাদা ঢেউয়ের নিরন্তর নীচে আছড়ে পড়ার ছবি।

DSC_0797-fb

লেখকের ফেসবুক একাউন্ট লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

Categories
Uncategorized

তারার সাথে বসবাস…

লোকালয়ের ঠিক পাশেই পাহাড়টির বাস। সেই পাহাড়ে দিনভর রোদের আলো খেলা করে, হাজার পাখির মেলা বসে, আর লাখো সবুজের আসর জমে বছরের পর বছর। আঁকাবাঁকা এক ঝিড়ি পথে পাথর ডুবিয়ে চলে ঠান্ডা পানির স্রোতহীন আয়েশী পথ চলা, সে পানির ধার ঘেঁসে এক পা ডুবিয়ে শিকারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকে সাদা বকের ঝাঁক। আর দু-কুল ছাপানো বুনো গাছের আড়ালে কৌতুহলী চোখ মেলে চেয়ে থাকে বানরের দল, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকে ঘরপালানো কোন এক দলছুট পাহাড়ী হরিণ। এমনই মায়া-ভালোবাসা আর আদর ঘিরে গড়ে উঠা এই চিরসবুজের বনটা হটাৎ করেই কেঁপে উঠে পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরণা ঘেরা লোকালয়ের খুব কাছের এই যায়গাটির নাম সীতাকুন্ড বন। এবারে আমরা ক্যাম্পিং করেছিলাম জল-ঝর্নার এই বনে, তারার সাথে সারারাত কথা বলেছিলাম অচীন পাথরের গায়ের উপরে হেলান দিয়ে, এই গল্পের শুধু শুরুই আছে আর আছে গল্পটা প্রলম্বিত করার আয়েশী ইচ্ছে…

এবারের প্ল্যানটা হুট করেই হয়ে গেলো, মাঝ রাতে আরমান ভাই ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন “ভাই, আর কত লেপের তলায় ঘুমাইবেন ! চলেন কালকে পাথরের উপরে ঘুমাই, পাহাড় ডাকতেছে”। পাহাড়ের ডাক অগ্রাহ্য করার মতন দুঃসাহস আমার কখোনই ছিলোনা, এবারও হলো না, বিছানায় শুয়েই ছটফট করে অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোরের আলো ফোটার জন্য – কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পুরো শহর কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ঝিম মেরে শুয়ে আছে, আলো ফোটার নামটি নেই। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভোর এলো ধুলোর শহরে। জীবনে কখনোই যে কাজটি করিনি, সেটাই করলাম এবার! কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটিতে একটা মোটাসোটা “কম্বল” ভরেই রওয়ানা দিলাম জল-ঝরনার দেশে। সকাল ৯টার গাড়ি পাহাড়ের টানেই শহর ছাড়লো, বাস ভর্তি কচিকাঁচার আসর ! পুরো বাসে সব মিলিয়ে গোটা দশেক মুরব্বী ছাড়া বাকি সব আন্ডা-বাচ্চার দল, সব নাকি বান্দরবান যাবে! মেঘ-পাহাড়ের দেশের গাড়ি আটকে গেলো কুমিল্লাতে, যেই সেই আটকানো না – টানা ৩ ঘন্টা জ্যামের মধ্যে থম মেরে বসে রইলো পিচঢালা রাস্তায়। অবশেষে সব জ্যাম তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাকে বিকেল ৫টায় নামিয়ে দেয়া হলো সীতাকুন্ড বাজারে। ইকোপার্কের গেইটটা পার হয়ে দেখি সেখানে আগে থেকেই হাসিমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে অনেকগুলো চেনা মুখ, যাদের দেখলেই মনে হয় পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই এদের জন্ম…

চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য...
চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য…

এবারে পাহাড়ে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো এক হাজারটা মোমবাতি জালানো, তারার আলোয় মোমের আলোয় পুরো পাহাড়ি ঝর্নাটার এক অন্য রুপ দেখা, আর অদূরেই তাঁবু টাঙ্গিয়ে হালকা আগুনের আঁচে নিজেদের গরম করতে করতে সেই রুপ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া। চিন্তাভাবনা করা বড়দের কাজ, আমরা চিন্তা ভাবনা করিনা – ধুম করে কাজটা করে ফেলি। তাই ধুম করেই চলে গেলাম পাহাড়ের টানে। সীতাকুন্ডের সেই পাহাড়ের পথে ঢোকার আগেই দেখা গেলো কালপুরুষ অপু ভাই, লিমন ভাই, রুপা আপু, আরমান ভাই, রুবা আপু বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করেছে, হাতে তাদের রাতের খাবারের জন্য বাজার সদাই, কি নেই তাতে! খিচুড়ি রাঁধার ডাল থেকে শুরু করে সালাদ বানানোর টমেটো পর্যন্ত সব রয়েছে, সেগুলোর ভীড়ে আবার থলে থেকে উকি দিচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা মুরগীর মাংস। এত বড় বড় ব্যাগ দেখে শুরুতেই হোঁচট খেলাম, আড়চোখে তাকালাম নিজের খুদে ব্যাগের দিকে – মনে হচ্ছে হাতির মিছিলে কোন এক দলছুট লিলিপুট ঝুলছে আমার পিঠে! যাই হোক এসব তোয়াক্কা করার দিন শেষ, চোখ রাখলাম এক্কেবারে উপরের পাহাড় চুড়াটায়, আর পা চালালাম সবুজ কেটে কেটে তৈরি করা একমাত্র মাটির রাস্তাটি ধরে। সে রাস্তা সাপের মতন একেবেঁকে ঝুপ করে গিয়ে পড়েছে পাথুরে ঝিড়িতে, সেটা দিয়ে নিশ্চিন্তে বয়ে চলেছে পৌষের শীতের ঊষালগ্নে হাড় কাঁপিয়ে দেয়া ঠান্ডা পানি! একেকবার একেকজনের পা পড়ে সেই পানিতে আর গগন বিদারী আওয়াজে ভরে উঠে বনের এমাথা ও মাথা। কিছুক্ষণ আগে একটা মায়া হরিণ বোধ হয় কাউকে ডাকছিলো ঘরে ফেরার জন্য, আমাদের আর্তনাদ শুনে সেও মুখে কলুপ এঁটে ভেগে গেলো অন্য কোন শান্ত যায়গায়। আর আমরা ১২টা প্রাণী পিঠে কয়েক কেজি বস্তা নিয়ে হেঁটে চলেছি ঝিড়ি থেকে বনে, বন থেকে পাথরে, পাথর থেকে কাঁটার জঙ্গলে, সেখান থেকে আবার চিৎপাত হয়ে শ্যাওলা ভরা পিচ্ছিল নতুন কোন ঝিড়িতে। দিনের আলো যখন আমাদের একাকী করে তারার দেশে রেখে গেলো ঠিক সে সময় দেখা মিলল আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গার। এখানেই আমরা ক্যাম্পিং করবো আজ রাতে, মোমের আলোতে ভাসিয়ে দেবো পাহাড়ি ঝর্ণার ক্ষীণ স্রোতগুলোকে, আর কনকনে বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে গলা ছেড়ে গাইবো নিজেদেরই স্বরচিত কোন মুগ্ধ করা গান। অন্ধকারে যখন আমাদের হাতের তালু ছাড়া নিকটবর্তী আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঠিক সে সময় আমরা হাচড়ে পাচড়ে উঠে পৌছালাম পাহাড়ের এক্কেবারে চুড়ায়, এখান থেকে এক নিঃশ্বাসে পুরো ঝর্নাটা দেখা যায়, বর্ষাকালে চারপাশের বন, পাহাড় আর বাতাস কাঁপিয়ে যেই ঝর্নাটা নেমে আসে – সেখানে এখন হেলেদুলে বয়ে চলেছে রুগ্ন পানির ধারা। এই জায়গার নাম সুপ্তধারা ঝর্না।

ক্যাম্পিং করার প্রথম শর্তই হলো তাঁবু ফেলার জন্য ভালো এবং আরামদায়ক একটা জায়গা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো খাবার রান্নার জন্য আগুনের ব্যবস্থা করা, আর তৃতীয় শর্ত হলো আয়েশ করে আসমান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাওয়া। সুতরাং বসে থাকলে তো আমাদের হবে না, বিরাট বিরাট সব পাথর পড়ে আছে আমাদের সামনে, দুনিয়ার আর সব মানুষের কাছে এগুলো সামান্য পাথর হলেও আমাদের চোখে তখন এগুলো জলজ্যান্ত একেকটা বিছানা, কোন পাথরে কোন তাঁবু ফেলা হবে তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা আর গবেষণায় স্রোত বয়ে গেলো মিনিট পাঁচেক। এতক্ষনে অন্যদের বড় ব্যাগের রহস্য বোঝা গেলো, টপাটপ করে সেগুলো থেকে বের হতে লাগলো ভ্রাম্যমান ঘর, এদের মধ্যে একটা তাঁবু আবার বিশালতার দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলো, যখন সেটাকে দাড় করানো হলো তখন সে রীতিমতন একটা বিশাল ঘরে পরিনত হলো, যেখানে অনায়াসেই আটজন হাত পা মেলে ঘুমাতে পারবে। তাঁবুর গায়ে বাবর আলী নেপাল থেকে নিয়ে আসা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দিলো কয়েকটা, এগুলো নাকি যত উপরে সম্ভব লাগানো উচিত, এতে করে বুদ্ধের শান্তির বানী বাতাসের সাথে ছড়িয়ে পড়ে বন থেকে বনে, গ্রাম থেকে গ্রামে – আর সে বাতাস যদি শহুরে কোন লোকালয়ের উপরে দিয়ে বয়ে যায়, সেখানেও শান্তির বানী ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে ঘরে। আমি হা করে তাবুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি পোলাপাইন সব গায়েব ! কিছু চলে গেলো লাকড়ি জোগাড় করতে, আগুন জ্বালাবে আর কিছু চলে গেলো পেনি স্টোভ দিয়ে আগুন জ্বালাতে, কফি বানাবে। সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভয়াবহ ঠান্ডা পানিতে খাবার দাবার কাটাকুটি করতে বসে গেলো রুপা দিদি! যে পানি দূর থেকে দেখলেই ঠান্ডায় গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায় সেই পানিতে অবলীলায় তিনি মুরগী, পেয়াজ, টমেটো কেটে আবার চাল, ডালও ধুয়ে ফেললেন ! ওদিকে সবার পেটে তখন ছুঁচোর নাচন – লাকড়ি রেডি, রান্না করার জন্য খাবার রেডি, পিপাসা মেটানোর জন্য ঝর্নার অঢেল পানি রেডি, আর কিসের চিন্তা – এবার জ্বালাও আগুন! কনকনে ঠান্ডায় আগুল জ্বলা মাত্রই সবাই সব কাজ ফেলে ছুটে এলো আগুনের পাশে, পরম মমতায় চুলোয় রান্না চড়িয়েছেন রুমী ভাই, তাকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছেন বুনো ভাই। এই দুইজনের হাতের রান্না যেন চামচ চামচ শিল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবার প্লেটে প্লেটে, এতগুলো প্লেটও আসলে আনা হয়নাই! ফলে কেউ খেতে বসলো কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসা সন্দেশের প্যাকেটে, আবার কেউ খেতে বসলো পাতিলের ঢাকনা উল্টো করে, এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন আরমান ভাই, তিনি মগের মধ্যে খিচুড়ি-মাংস ঢেলে লাল জ্যাকেট পরে বসে গেলে কমলা আলোর কোলে। যেখানে কেউ ফোনের নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না সেখানে রুবা আপু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইভারে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছেন আর আড্ডার ফাঁকে একফোঁটা ফুসরত পেলেই টপাটপ ক্যাম্পিং, রান্নার ছবি তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুকে। বিশাল সে আয়োজন – রান্নার স্বাদ এখনো মুখে লেগে রয়েছে, ফারহান ভাইএর কাছে রান্না এতই মজা লেগেছে যে তাঁকে খিচুড়ির পাতিলের আশপাশ থেকে নড়ানোই যাচ্ছে না, শেষমেশ খোকন কারিগর এসে তাঁকে পাজাকোলা করে তাঁবুতে নিয়ে শুইয়ে দিলেন, সাথে দিলেন পানির বোতল, উনি সারারাত পানি খেয়েই পার করে দিলেন!

খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট...
খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট…

রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে আমরা সবাই মুখোমুখি হলাম আকাশের, সেখান হাজার তারার মেলা বসেছে। সবাই সেজেছে আলোর সাজে। নিকষ আঁধারকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সবকটা তারা যেন আমাদের জন্যই কুয়াশাকে বিদায় করে দিয়েছে আজ, আজ তাদের অতিথিদের মুগ্ধ করার রাত, আজ তাদের নিজেদের উজাড় করে আঁধার পৃথিবীটা আলোকিত করার রাত। আমরা মুগ্ধ তাদের আয়োজন দেখে, প্রতি ঘণ্টায় পাল্টে যাচ্ছে আকাশের দৃশ্যপট, তারার সারি ক্রমেই বাড়ছে, দেখে মনে হচ্ছে রাতের সাথে সাথে ঘুমও ভাংছে তাদের, একেকজন একটা একটা করে চোখ মেলছে আর একটা একটা করে তারার জন্ম হচ্ছে ঘুটঘুটে কালো আকাশের গায়ে। হটাৎ তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হাজার হাজার ছিদ্র – সে ছিদ্র দিয়েই বুঝি আসছে আলোর বন্যা। তারার থেকে চোখ ফিরিয়ে এবার আমরা নজর দিলাম মর্ত্যের আঁধারে, এবার মোমবাতি জ্বালানো হবে। সবাই মিলে চললাম ঝর্নার একেবারে কোলে, ঠান্ডা পানি পায়ে মাড়িয়ে এসে থামলাম পাহাড়ের বুকের মাঝে, প্যাকেট থেকে একের পর এক অবমুক্ত করা হলো মোমবাতিগুলো। বসানো হলো নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর। মিনিটখানেক নিরবতা, সবাই চুপ, সবকিছুই যেন স্থবির।

এরপরই কালপুরুষ অপু, লিমন বড়ুয়া, বাবর আলী, বুনো ভাই, দিদার ভাই আর ফারহান ভাই এর হাতের ছোঁয়ায় জ্বলে উঠতে লাগলো মোমের শিখা, একের পর এক, শ’য়ের পর শ – সেগুলো ছাড়িয়ে গেলো হাজারের ঘরে। পুরো ঝর্না জুড়ে তিরতির করে চলছে মোমের আলোর নাচন! মুহূর্তেই কালো পাহাড় ভরে গেলো সোনালী আলোর ছটায়, সে আলোতে প্রাণ পেলো ঝর্নার পানি। তারার সাথে মিতালী গড়ে যে পানি এতদিন ধরে নিজের রুপে মুগ্ধ করছিলো পাহাড়ের অচেনা গাছের দলকে, সে পানি আজ তারার বসতি ছেড়ে গায়ে মেখেছে মোমের আলোর অলংকার! মুগ্ধ সে দৃশ্য দেখত হলেও দরকার মুগ্ধ চোখের, আমাদের সে চোখে মুগ্ধতা নেই আছে স্তব্ধ বিস্ময় – আমরা বিস্মিত হয়ে দেখছি সামান্য কিছু মোমের আলো কিভাবে রঙ ছড়িয়ে দেয় অচেনা জঙ্গলে ! আকাশ জুড়ে মিটমিট করতে হাসতে থাকা তারার দলও ম্রিয়মাণ হয়ে যায় টিমটিমে জ্বলতে থাকা এই মোমের শিখার কাছে। ধরাধমে চর্মচক্ষুতে এমন দৃশ্য খুব বেশী হয়তো দেখা সৌভাগ্য হয়না, তাই তোড়জোড় শুরু হলো ক্যামেরা নিয়ে। ট্রাইপডে বসে বসে সে একের পর এক ধরে রাখতে শুরু করলো মুগ্ধ বিস্ময়ের মুহূর্তটুকুকে। এক সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এই আমাদের চোখের সামনেই গলে গলে থেমে গেলো বায়বীয় সোনালী আলোর নাচন, সে যায়গায় ভর করলো শুন্যতা। রাত তখন দেড়টা। আবার হেসেছে তারার মিছিল। আর আমরা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম তাঁবুর ঘরের ঠান্ডা পাথুরে বিছানায়, সারারাত পৌষের শীত ছুরি চালালো কম্বলের বাহিরে থাকা শরীরের অংশে। আর সবকিছু রয়ে সয়ে আমরা চোখ বন্ধ করলাম গহীন অরণ্যে, তারার বিছানার ঠিক উল্টো দিকে। সারারাত তারার দল পাহারা দিয়ে রাখলো আমাদের, প্রকৃতির এই সন্তানদের…

হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল...
হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল…

পাহাড়ে ক্যাম্পিং করার সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, কোন অপচনশীল জিনিস (পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট) ফেলে আসবেন না। এগুলো পুরো পরিবেশকে বিষিয়ে তুলবে। মলমুত্র এমন যায়গায় ত্যাগ করবেন যেখানে পানির সংস্পর্শ থাকবে না, এতে করে ঝর্নার পানি দূষিত হবে না। পাহাড়ে গিয়ে কাঁচা গাছ কাটবেন না, কোন পশু-পাখি হত্যা করবেন না। সবচাইতে বড় কথা চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না, এটা জঙ্গলের প্রাণীদের আস্তানা, আমাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সবচাইতে বড় অসুবিধা হয় তাদেরই। আর পাহাড়ে অনেক ঠান্ডা, কাজেই রাতে ক্যাম্পিং করতে গেলে গরম কাপড় অবশ্যই নিয়ে যাবেন, সাথে একটা তাঁবু। একটা জিনিস বুকের মধ্যে গেঁথে নিয়ে যাবেন – এই দেশের প্রতিটা  সম্পদ আমাদের, কাজেই একে কোনোভাবেই আমরা নস্ট করবো না। আমি যে সৌন্দর্যটা দেখার জন্য এখানে ছুটে এসেছি আমার ছোটভাইটা, সন্তানটা যেন ২০/৩০ বছর পরে এখানে এসে ঠিক আমার মত করেই যেন চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে বলতে পারে – “দেখো দেখো, আমাদের বাংলাদেশ কি সুন্দর”…

ও আরেকটা কথা, এখানে যাওয়া কিন্তু খুব সহজ, ঢাকা থেকে যেকোন চট্টগ্রামের গাড়িতে উঠে সীতাকুন্ডতে নেমে পড়বেন, সেখানের এসকেএম জুট মিলের রাস্তা ধরে রেললাইন পার হয়ে ঝিড়ি পথে হাঁটা দিবেন পাহাড় লক্ষ্য করে। ৪০ মিনিট পর নিজেদের আবিষ্কার করবেন সুপ্তধারা ঝর্নার নিচে, সেখান থেকে ডান পাশের পাহাড় বেয়ে উঠে যাবেন ঝর্নার উপরে। এবার জায়গা বেছে আরাম আয়েশ করে তাঁবু ফেলে কাটিয়ে দিতে পারেন জীবনের খুব অসাধারণ একটা রাত… জলে জঙ্গলে আপনাকে স্বাগতম…

Categories
Uncategorized

বান্দরবান – আমিয়াখুম, নাফাখুম ও রেমাক্রির গল্প…

……………………………………… (সোহান)……………………………………………

২৮ এপ্রিল – ৩ মে, ২০১৬

কয়দিন ধরেই পাহাড়ের কথা খুব মনে পরছে। বান্দরবানের আগের ট্যুরের স্মৃতি গুলো স্মরণ করেই দিন পার করছি। একদিকে কাজের ঝামেলা আর বান্দরবানের ভ্রমণ এত সহজে আয়োজন করা সম্ভব নয় দেখে দিন গুনছিলাম কখন একটু কাজের ঝামেলা কমবে আর একটা সুযোগ পাব। একদিন ফেসবুকে এই নিয়ে স্ট্যাটাস ও দিলাম। তারপর দিনই হাদি ভাই এর মেসেজ, যাবে নাকি বান্দরবান। ওনাদের একটা ক্লোজ গ্রুপ সার্কেল থেকে বান্দরবান ট্যুরে যাচ্ছে, আমি চাইলে যেতে পারি ওনাদের সাথে। এই কথা শুনে কাজের ঝামেলার কথা ভুলে গিয়ে রাজি হয়ে গেলাম।
২৮ এপ্রিল রাত সেই ভ্রমণের শুরু, তার আগের কয়দিনে যা দরকার গুছিয়ে নিলাম। কিছু প্রস্তুতির দরকার হয় তা সেরে নিলাম। আমার সাথে ভ্রমণ সঙ্গী ২২ জন। পরিচিত বলতে হাদি ভাই আর সহপাঠি তামান্না। বিশাল গ্রুপ নিয়ে ট্রেকিং ট্যুরে যাওয়া এবং বেশিরভাগ সঙ্গী অপরিচিত থাকায় কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম কেমন হবে এই ভ্রমণ। রাত ৯ঃ৩০ এ সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে বন্ধু সুলভ সবার সাথে পরিচিত হতে হতে বুঝে গেলাম, এই ভ্রমণ বেশ মজারই হবে। আমাদের যাত্রা শুরু হলো ১০ঃ৪৫ এ বাস ছাড়ার সাথে সাথেই।
এই ভ্রমণের মূল গন্তব্য হলো আমিয়াখুম ঝর্না, নাফাখুম ঝর্ণা, রেমাক্রি আর তিন্দু। আমাদের যে রুট প্ল্যান ছিলো তা উলট পালট হয়ে গেলো হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৯ তারিখ থানছি যাবে এই কারণে। ঐদিন দুপুর ১২ টার পর থেকে রেমাক্রির দিকে কোন ইঞ্জিন নৌকা চলবে না। যেভাবেই যাই আমাদের দুপুর ১২টার আগেই থানছি পৌঁছে নৌকা নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে আমাদের গন্তব্যের দিকে। তাই মনের মধ্যে একটা সংশয় ছিলো এই নিয়ে। তখন আমাদের রুট প্ল্যান হলো, বান্দরবান-থানছি-পদ্মমুখ-থুইসা পাড়া-আমিয়াখুম-থুইসা পাড়া-নাফাখুম-রেমাক্রি-থানছি-বান্দরবান ।
কাল সারাদিন দৌড়ের উপর থাকতে হবে, বাস ছাড়ার পর চেষ্টা করলাম কিছুটা ঘুমাতে। কিন্তু সব সময়ের মতো ঘুমের দেখা পেলাম না। পাশের যাত্রী রবিন ভাইয়ের সাথে গল্প করে আর গান শুনেই সময় যেতে লাগলো। কাল আবার পাহাড়ের কাছাকাছি থাকব এই ভেবে রোমাঞ্চিত ছিলাম। রাত ৩ টায় কুমিল্লায় নাস্তা করে বাস আবার চলতে শুরু করলো। বান্দরবানে নামলাম সকাল ৭টায়। ১২ টার আগেই থানছিতে থাকতে হবে, তাই তাড়াহুড়া করে পরোটা ডিম দিয়ে নাস্তা করে আগেই ঠিক করে রাখা দুইটা চান্দের গাড়িতে সবাই উঠে গেলাম।
 
বান্দরবান থেকে থানচির দূরত্ব ৭৬ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় সড়ক পথ। আঁকা বাঁকা, উঁচু নিচু রাস্তা ধরে একটার পর একটা পাহাড়কে পাশ কাঁটিয়ে চলতে শুরু করেছে চাঁন্দের গাড়ি। এই যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দৃশ্যই দেখার মতো। গল্প, চিল্লানো আর গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে ১১টায় পৌঁছে গেলাম থানচি বাজারে। মাঝপথে কিছুটা বিশ্রাম আর আর্মি বিজিবি ক্যাম্প গুলোতে রিপোর্টের কাজ ও সারা হলো।
 
থানচিতে আমাদের সাথে গাইড আবুল যোগ দিলো, সাথে তার সহকারী শফিউল। অল্প কিছু নাস্তা আর দরকারি কিছু কেনাকাটা করে নিলো সবাই। এই দিকে টিম লিডার হাসান ভাই আর গাইড গেলো পুলিশ ক্যাম্পে অনুমতি নিতে। ফিরে এসে জানালো অনমুতি দেয় নাই। কিন্তু কিছু করার নাই, আমাদের যেতেই হবে, আর তা অনমুতি দিক কিংবা না দিক। আগেই ঠিক করে রাখা ৫টা ছোট ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে যাত্রা শুরু হলো সাঙ্গু নদী দিয়ে। গন্তব্য পদ্মমুখ, যেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের ট্রেকিং। সাঙ্গু নদী আর তার চারপাশের রূপের কথা আর কি বলবো, এক কথায় যাকে বলে অপরূপ। এই সময় পানির খুবই স্বল্পতা আর নৌকা চলছে উপরের দিকে স্রোতের বিপরীতে। নিচে ছোট বড় পাথরের আস্তরণ, একটু পর পর নৌকার তলা পাথরে আঁটকে যাচ্ছে। সবাইকে নেমে যেতে হচ্ছে, মাঝি আর তার সহকারী নৌকা ঠেলে একটু পানি বেশি আছে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা আবার উঠছি নৌকায়। গ্রীষ্মকাল চলে তবুও পাহাড়ে সবুজের কমতি নেই। দুইপাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সাংগু। ছবির মতো চারপাশ দেখতে দেখতে ঘন্টাকানেক পরেই পদ্মমুখ এ চলে আসলাম।
পদ্মমুখে নেমেই, সামনের সাঙ্গুর টলমল জল দেখে ঝাপিয়ে পড়লাম সবাই। বেশিক্ষণ ঝাপাঝাপি করা গেলো না। আজকেই যেতে হবে অনেক পথ। দুপুরের খাবার গাইডের বাসা থেকেই রান্না করে নিয়ে আসা হয়েছিলো। পদ্মমুখে বসে খিচুরী ডিম আর মুরগী দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হলো। গলা দিয়ে ঢুকছিলো না, কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই। আবার কখনো পেট ভরে খেতে পারবো তার ঠিক নেই। খাওয়ার পর্ব শেষ করে আদিবাসীর দোকানে এক কাপ চা খেয়ে শুরু হলো হাঁটা, সময় দুপুর ১ঃ৪০। গন্তব্য থুসাই পাড়া, যেখানে আজ রাত থাকা হবে। পাহাড়ি পথে ট্রেকিং এ অভ্যস্থ যাদের সময় লাগে ৪-৫ ঘন্টার মতো। আমাদের কত সময় লাগবে তার ঠিক নেই কোন। দলের বেশিরভাগ মানুষেরই এই প্রথম পাহাড়ে ট্রেকিং, সাথে আছে দুইজন মেয়ে। সব কিছু বিবেচনা করে ধরে নিয়েছি ৬-৭ ঘন্টার মতো লাগবে।
পদ্মঝিরি ধরে হাঁটছি। ঝিরিপথ সবসময় আমার পছন্দ। তুলনামূলক সহজ ট্রেইল। চারপাশের দৃশ্য সবসময়ের মতো মনোরম। ঝিরির কিছু জায়গায় শুকনো, কোথাও বা কোমর সমান পানি জমে আছে, দুইপাশেই পাহাড়, ছোট বড় পাথর, পিচ্ছিল পথ, গাছপালা, আলো আধারের খেলা। একেক জনের হাঁটার গতির কারণে কিছুক্ষণ পরেই কয়েক গ্রুপ হয়ে গেলো। কেউ সামনে কেউ পিছনে। নির্জন দুপুরে পাহাড়ের গরম স্বাভাবিক ভাবেই বেশি থাকে কিংবা বেশি লাগে। ঘামছি, শরীর ভিজছে, আবার শুকাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেলে বোতল থেকে এক চুমুক স্যালাইন খাচ্ছি। কতদূর হেঁটে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। আপ ট্রেইল না হওয়ায় সবাই বেশ আনন্দেই চলছি। চারপাশ দেখার সময় কমই পাওয়া যায়, সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়ে পথের উপর, কোথায় পা ফেলছি তার উপর। হঠাৎ জুতার ফিতে খুলে গিয়ে আছাড় খেলাম পাথরে, হাতে রাখা ক্যামের বাঁচাতে গিয়ে ঝিরির পানিতে পড়ে গিয়ে ব্যাগ গেলো ভিজে। ভিজলো ভিতরের সব কিছু। ভাগ্য ভালো কোন ব্যথা পেলাম না এইবার। ব্যাগের ওজন যত কম রাখা যায় ততই মঙ্গল। সেইভাবেই আমি ব্যাগ গুচিয়ে এনেছিলাম। কাপড় আর ব্যাগ ভিজে গিয়ে সেই কাঁধ ব্যাগের ওজন বেড়ে গেলো দ্বিগুন।
গত ৩ ঘন্টা ধরে হেঁটে আসা পথে আপ ট্রেইল ছিলো অল্পই। বাকি পথ টুকু আপ আর ডাউন ট্রেইল। অতিরাম পাড়ায় যাবার আগে এই প্রথম বার মোটামুটি একটা আপ ট্রেইল পাড়ি দিতে হবে। ২০ মিনিটের এই আপ ট্রেইলে উঠেই ফুসফুসে অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছিলাম। পায়ের লিগামেন্ট গুলো মনে হচ্ছিলো যে কোন সময় ছিড়ে যাবে। জানি প্রথমদিন প্রথম উঁচু পাহাড়ে উঠা কষ্টকর, আস্তে ধীরে কিছুটা সয়ে যাবে। হরিতচন্দ্র পাড়ায় উঠেই এক আদিবাসীর ঘর থেকে ঠান্ডা পানি খেয়ে শরীর ঠান্ডা করলাম। একে একে সবাই উঠে আসলো, আর এই প্রথম অনেকেই প্রথমবারের মতো বুঝলো পাহাড়ে উঠা এত সহজ নয়। অনেকদিন পর পাহাড়ে উঠতে গিয়ে বুঝলাম আমার অবস্থাও এত ভালো নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাথার উপর সূর্য আর প্রচন্ড গরম।
হরিতচন্দ্র পাড়ায় ৩০ মিনিটের মত বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু হলো। বিকেল ৫ঃ৩০ তখন, সুর্য পশ্চিমে থাকলে গরম চারপাশেই আছে। পাড়া থেকে পথ চলে গেছে নিচের দিকে। পথ বেশি খাড়া আর ভেজা না থাকলে পাহাড় থেকে নামতে বেশ ভালই লাগে কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পথ উঠতে হবে অন্য এক পাহাড়ে। পাড়া থেকে কিছুদূর যাবার পরই চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা ঝুপ করে চলে আসে। আগেই জানা ছিল ট্রেক শেষ হতে রাত হবে। সাথে করে সবাই টর্চ নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক ছিলো। টর্চের আলোয় আপ আর ডাউন ট্রেইলে চলছি। আশেপাশে কিছু দেখার উপায় নেই, সন্ধ্যায় পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো ডেকেই যাচ্ছে অনবরত। অন্ধকার, পাহাড়, কেমন একটা অদ্ভুত পরিবেশে লাইন ধরে চলছি কয়েকজন। আমাদের সামনের কয়েকজন এক গাইড নিয়ে চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের সাথে আরেক গাইড, মাঝে আমরা কয়েকজন গাইড ছাড়া। পথ ভুল হলে বিপদে পরতে হবে এই চিন্তাও ঘুরছে। এইদিকে আমাদের সাথে যে পানি ছিল শেষ হয়ে গিয়েছে। গাইড বলে দিয়েছিলো পথে একটা ঝিরি পরবে, সেখানে পানি পাওয়া যাবে। হাঁটছি তো হাঁটছি কিন্তু ঝিরির দেখা নেই। সবার গলা শুকিয়ে গেছে। ঘেমে সব পানি বের হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ এই ভাবে গেলে পানি শূন্যতায় ভুগতে হবে। অবশেষে এক ঝিরি পথ পেলাম, কিন্তু কোথায় পানি। সব শুকিয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এইখানে বসে অপেক্ষা করবো পিছনের দলের জন্যে। শুকনো ঝিরির দুইপাশেই ঘন জংগল। উপরে খোলা আকাশে তারার মেলা। সবাই চুপচাপ। অদ্ভুত অনুভূতি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা আর পিছনে সাংকেতিক ভাষায় ডাকাডাকি করেও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। আবার উঠে হাঁটা শুরু, পানি দরকার। পানি পেতেই হবে। পিছনে যারা আছে তাদের কাছেও যতদূর জানি পানি তেমন নাই। কিছুদূর এগিয়ে একটা ডাউন ট্রেইলে যেতেই একজনের মাথা ঘুরাতে লাগলো, টলতে টলতে হাটছিলো। অতীত অভিজ্ঞতায় থেকে উনাকে দেখেই বুঝলাম ডিহাইড্রেশন এর সমস্যা হচ্ছে। উনার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আস্তে ধীরে ধরে ধরে সামনে এগুতে লাগলাম। ঐ মুহুর্তে কিছুটা ভয় লাগছিলো। পানি না পেলে খারাপ কিছু হতে পারে। ভাগ্য ভালো কিছুদূর সামনে এগিয়ে যেতেই একজন চিৎকার দিয়ে জানালো এক গর্তের মধ্যে অল্প জমে থাকা পানি পাওয়া গেছে। পানিতে ময়লা নাকি ব্যাঙ্গাছি আছে তা দেখার সময় নেই, বোতল ভরে স্যালাইল গুলিয়ে ঐ ভাইকে খাওয়ালাম। শরীর মুছিয়ে কিছুক্ষন রেস্ট নেবার পর উনি কিছুটা ঠিক হলো। আমরাও যে যতখানি পারি পানি খেয়ে খালি বোতল গুলো ভরে নিলাম। ঐদিকে পিছনে যারা আছে তাদের কোন খবর নেই। সময় যেতে লাগলো আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। মাথার ভিতর দুঃশ্চিন্তা, ওদের কারও কিছু হয় নি তো। যোগযোগ করার কোন উপায় নাই, ফিরতে পথে যে কেউ যাবে তার শক্তিও নেই। পিছনের দলে তামান্না আছে আর রুমকি আপু আছে তাই চিন্তা একটু বেশি লাগছিলো। অবশেষে ঘন্টা খানেক পরে তাদের সাড়া পাওয়া গেলো। আসার পর জানলাম এই ভাইয়ের মাসল পুল করেছে আর তামান্নার লো সুগার সমস্যা।
আবার শুরু হলো হাঁটা, কতটুকু পথ বাকি গাইডকে জিজ্ঞেস করলে বলে আর একটু আর একটু। কিন্তু একটু আর শেষ হয় না। এই দিকে রাত বাড়ছে, সন্ধ্যার পর ট্রেক করা আরও কঠিন হয়ে যায়। বেশি সবাধান থাকতে হয়। টর্চের আলো ফেলতেই মনে হলো কি জানি নড়লো, একটু পাশে আলো ফেলতেই প্রথমবারের মতো সাপের সাথে দেখা হয়ে গেলো। তিন হাতের মতো লম্বা, অপিরিচিত সাপ। পাশে থাকা হাদি ভাইকে বলতেই ইশারা দিলেন চেপে যেতে। সাপ দেখলে অনেকেই ভয় পেতে পারে তাই চুপ মেরে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। আমি ভুলে গেলাম একটু আগে আমার পা থেকে ৩-৪ হাত দূরে কি দেখেছি। সামনে কাঁধাময় ঝিরি আসলো, সাথে পিচ্ছিল পাথর। অন্ধকারে আরও বেশি দেখে শুনে চলতে হলো। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর পানির শব্দ পেলাম। গাইড কে জিজ্ঞেস করতেই বললো সামনেই রেমাক্রি খাল, সেই খালে পানি আসছে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আমিয়াখুম থেকে। থুইসা পাড়া যেতে এই খাল পাড় হয়ে যেতে হবে। শুরু হলো পাহাড় থেকে নামা। এই প্রথম অনেকেই পাহাড় কত খাড়া হতে পারে তা টের পেলো। অন্ধকার থাকায় ভালই হলো, নিচে দেখা যায় না। দিনের বেলায় হয়তো এত খাড়া ঢাল দেখে মনে ভয় লেগে যেত। আস্তে ধীরে একে একে সবাই নেমে আসলাম খালের কাছে। পাড়ি দিলেই আমাদের গন্তব্যে চলে এসেছি, গাইডের কথা তাই। খালের ওপারে গিয়ে যাওয়ার পর শুনি, সামনে আরেকটা পাহাড় উঠতে হবে তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত থুইসা পাড়া। শরীর আর কত সহ্য করবে, সেই গতকাল রাত থেকে জার্নি শুরু, তারপর ভালো ভাবে বিশ্রাম নেবার সুযোগ ও হয়নি। এই শেষ পাহাড় উঠতে গিয়ে আরও বেশি কষ্ট লাগছিলো। উঠার পর দেখি রাস্তা আমার নেমে গেছে নিচে, নিচে নেমে দেখি পাড়ার কোন দেখা নাই! আলো দেখে বুঝলাম সামনে আরেকটা ছোট পাহাড় আছে তার উপর সেই থুইসা পাড়া। সেই পাড়ায় উঠার পথটা মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার কঠিন পথ। দাঁতে দাঁত চেপে উঠে গেলাম সেখানে। উঠে বুক ভরে বাতাস নিলাম। পাড়ায় ঠিক করে রাখা ঘরের বারান্দায় হাত পা ছুড়ে কতক্ষণ তব্দা মেরে বসে থাকলাম। প্রচন্ড খিদা লেগেছে, দেরী না করে গোসল করে নিলাম। গোসল করার পর কিছুটা শান্তি লাগলো। এই দিকে আগেই চলে আসা গাইড সব কিছু ঠিক ফেলেছিলো। রান্নাও হয়ে গিয়েছিলো। গোসল করে এসেই ভাত ডাল মিষ্টি কুমড়া আর মুরগী মাংস দিয়ে পাগলের মতো খেয়ে নিলাম আমরা কয়েকজন। স্বাদ যেমনই হোক, ঐ সময় মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সেরা খারাপ খাচ্ছি। ঐদিকে পেছনের দলও চলে এসেছে। সবার মুখেই বিজয়ীর হাসি যদিও বেশিরভাগ জনই বলছিলো এইটাই জীবনের এই ধরণের তার শেষ ট্রেকিং ট্যুর। আর জীবনেও আসবেনা এইদিকে , এইভাবে। তামান্না আর রুমকী আপুর জন্যে বিশেষ অভিনন্দন জানালাম এত বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মানসিক শক্তির পরীক্ষা দিয়ে ঠিকমতো থুইসা পাড়ায় আসতে পারার জন্যে।
সবাই খুব বেশি ক্লান্ত। থাকার জন্যে দুইটা ঘর ঠিক করা হয়েছে। যে যার মতো শুয়ে গেলো। এইদিকে বেশি ক্লান্তি থাকলে আমার ঘুম আসে না। পাড়ার এই মাথা ঐ মাথা হেঁটে বেড়ালাম। ৮-৯ টা আদিবাসী পরিবারের বসবাস এই পাড়ায়। ছোট পাড়া। প্রায় সব ঘরেই সৌর বিদুৎ এর ব্যবস্থা আছে। সামনের ঘরেই আরেকটা গ্রুপ উঠেছে। তারাও ঘুরতে এসেছে গতকাল। উঠোনে গানের আসর বসিয়েছে। আমি বসে বসে আকাশের তারা দেখি আর গান শুনি। এই পাহাড়ে এত উচুতে মনে হচ্ছিলো আকাশের তারা গুলো আরও অনেকটা কাছে। অস্তির লাগছে, ঘুম নাই কিন্তু অনেক অনেক ক্লান্ত। আমাদের আরেক থাকার ঘরে গিয়ে দেখি কয়েকজন কার্ড খেলায় মেতেছে। আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। এই খেলা শেষ হলো রাত ৩টার পরে। ইচ্ছে ছিলো ভোর দেখার, কিন্তু সকালেই আবার শুরু হবে দ্বিতীয় দিনের মতো ট্রেকিং। অল্প হলেও ঘুম দরকার, অনিচ্ছা সত্তেও শুয়ে গেলাম। শুয়ে শুয়ে সারাদিনের কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।
সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল, আরও অনেকেই উঠে গেছে। ফ্রেশ হয়ে হালকা হলুদ দেওয়া খিচুড়ি, ডিম আর মুরগীর ঝুল দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। আজ যাবো আমিয়াখুম। থুইসা পাড়া থেকে যেতে কতক্ষণ লাগবে, পথ কেমন হবে গাইড কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে আপনারা যেভাবে হাঁটেন তাঁতে ৫-৬ ঘন্টা লাগবে। সে আমাদের উপর চরম বিরক্ত এত বেশি বিশ্রাম নেই বলে। তাকে বুঝাতে পারলাম না যে গ্রুপের অনেকেরই জীবনের প্রথমবার এমন কঠিন পথে ট্রেকিং, তাই এমন হচ্ছে। সকাল ৯ঃ১৫ তে রওনা হয়ে গেলাম আমিয়াখুমের উদ্দ্যেশে। এই পথে পাড়ার এক দাদা কে সাথে করে নেওয়া হলো গাইড হিসেবে। গাইড আবুল থেকে গেলো অন্যসব কাজ ঘুছিয়ে রাখতে। পাড়ার দাদা জানালো আমাদের কে সহজ পথে অল্প সময়ে যাওয়া যায় এমন পথে নিয়ে যাবে। পাড়া থেকে বের হয়েই একটা আপ ট্রেইল। মাথার উপর সূর্য তার কাজ ঠিকমতই করে যাচ্ছে। পাড়া থেকে বের হয়েই এই আপট্রেইল দেখে আর গতকালের কথা চিন্তা করে একজনের মনোবল ভেঙ্গে গেলো। সে যাবে না আমাদের সাথে, পাড়ায় চলে যাবে। এইভাবে একে একে ৪জন পাড়ায় ফিরে গেলো। তাদের কে ফিরানো চেষ্টা করা হলো না। পাহাড় এমন এক জিনিস যেখানে প্রচন্ড মানসিক শক্তির দকার হয়। মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে গেলে তার জন্যে পাহাড়ে উঠা অসম্ভব হয়ে উঠে।
এই আপ ট্রেইলে উঠতে বেশ কষ্ট হলো আমার, সারা শরীর বেয়ে ঘামের স্রোতধারা। দম বন্ধ করা ঝাঁঝালো গরম। উপরে উঠেই হাপ পা ছুড়ে বসে গেলাম। সাথে থাকা স্যালাইনের অর্ধেক শেষ করে ফেললাম সেখানেই। ভরশা সামনে যদি কোথাও ঝিরি থাকে। তবে বাকি পথে এত কষ্ট হলো না। সুন্দর ট্রেইল আর ছোট কিছু আপ ডাউন ট্রেইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে ২ ঘন্টা পর হাজির হলাম দেবতা পাহাড় নামক এক পাহাড়ের চূড়ায়। তখনো জানতাম না সামনে কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। এই পাহাড় থেকে নামলেই আমিয়াখুমের কাছাকাছি চলে যাবো। ঘন গাছপালা থাকায় নিচে কি আছে বুঝার উপায় নেই। নামতে গিয়ে বুঝলাম এই খাড়া ঢাল অন্যসব পাহাড়ের মত নয়। বেশিরভাগ যায়গায় ৮০ডিগ্রী খাড়া ঢাল। একটু এদিক সেদিক কিংবা একটু অমনযোগ অথবা কপাল খারাপের কারণে হয়তো অনেক খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার ছিলো শুকনো গুড়ো মাটি আর ছোট ছোট পাথর। ট্রেকিং বান্ধব প্লাস্টিকের জুতো সেই গুলোর উপরে পড়লেও স্লিপ খেয়ে যায়। নামার পথের ঢালের দিকে অনেক জায়গাতেই ফাঁকা, তাকালেই মাথা ঘুরে এমন। এইখান থেকে পড়লে কত নিচে পরবো তা দেখার উপায় নেই। নামছি তো নামছি, শেষ হবার লক্ষণ নেই। আবার কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও পায়ের কাছেই গত রাতে পাহাড়ে লাগা আগুন থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোয়া। এত দীর্ঘ খাড়া পাহাড় এ নামা এই প্রথম। বসে বসে, কাঁত হয়ে, হাতের লাটির উপর কখনো পুরো ব্যালেন্স দিয়ে, নুয়ে, জায়গায় জায়গায় অনেক কসরত করে নামছি। সবার কলিজাই ধুঁক ধুঁক করছে। একজন আরেকজন কে সাহস দিচ্ছে, সামনে কোন বিপদ হবার মতো কিছু থাকলে বলে দিচ্ছে, এই ভাবেই চলছি। আমার কোন ভয় কাজ করছিল না, হয়তো সেই অনুভূতি ছিলো না তখন। বুঝেছিলাম এইখানে ভয় পেয়ে লাভ নাই। যা আছে কপালে আর পায়ে, আর আছে ৮০ ডিগ্রী খাড়া ঢালে। মনে সাহস ছিলো, নিজের শরীরের ব্যলেন্সের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো, আস্থা ছিলো পায়ের উপর, শরীরের সব ভর দেওয়া লাঠির উপর।
কোথাও বিশ্রাম নেবার মতো জায়গা নেই, এই ঢালে বসে থাকলেও কষ্ট লাগে। যত নিচে নামছিলাম চারপাশের গাছপালা গুলো আমাজনের মতো মনে হচ্ছিলো। প্রায় ৪৫ মিনিট নামার পর অবশেষে নিচে কিছু দেখা গুলো। মুখ দিয়ে এমনিতেই চিৎকার বের হলো। বাকি পথ তাড়াহুড়া করে নেমে চলে আসলাম নাইখ্যং মুখের কাছে। স্বচ্ছ পানির ছোটখাটো লেকের মতন দেখে আর দেরী করলাম না, সাথে সাথেই নেমে গেলাম আমরা যে কজন ছিলাম। শরীর ভাসিয়ে দিলাম পানিতে, পাথরে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিলো অনন্তকাল এইভাবে থাকি। একে একে আরও কয়েজন চলে আসলো, পিছনে পথেও রয়ে গেল অনেকেই। তাদের জন্যে অপেক্ষা করছি তো করছি, কোন খবর নেই। এই দিকে এই পুরো সময় পানি থেকে উঠিনি। পানিতে বসে বসে দুপুরের খাওয়ার জন্যে নিয়ে আসা বিস্কিট কেক খেয়ে নিলাম। ঘন্টার চেয়েও বেশি সময় পরে শেষ দল পাহাড় থেকে নেমে আসলো। তাদের কে অভিনন্দন জানালাম হাত তালি দিয়ে, দেবতা পাহারের মতন নিষ্ঠুর খাড়া ঢাল বেয়ে সুস্থ মতে নিচে নামতে পারার জন্যে।
যেখানে ছিলাম সেখান থেকে মাত্র ১০মিনিটের হাঁটা পথ পরেই আমিয়াখুম। জানা ছিলো না, থাকলে এত সময় ঐখানে না থেকে ঝর্ণার কাছেই বসে থাকতাম। সে যাই হোক, দূর থেকেই যখন ঝর্ণার গর্জন শুনতে পেলাম, আর সহ্য হচ্ছিলোনা কখন উনার কাছে যেতে পারবো। বড় বড়ো পাথর পেড়িয়ে যখন ঊনার দেখা পেলাম। কয়েক পলক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বর্ষায় এর পুরো যৌবন থাকে, তখন আরও বেশি বন্য হলেও এই গ্রীষ্মে যতটুকুই পানি আছে তা দেখেই বিমোহিত হলাম। সবাই সবার মতো করে ছবি তোলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। সময় তখন ২টার উপরে। এখানে বেশি সময় দেওয়া গেলো না, সামনে সাতভাইখুম থেকে ফিরে যাবার পথ ধরতে হবে। কিন্তু এতদূর আসলাম যে ঝর্ণার জন্যে সেখানে গাঁ ভিজাবো না তা কি হয়, নেমে গেলাম পানিতে। অল্প কিছুক্ষণ ভিজে সাঁতার কেটে উঠে চলে আসতে হলো।
সাতভাইখুম দেখে এইবার ফিরে যাবার পালা, ক্ষুধা অনেক, বিস্কুট ছাড়া কিছু নাই, আরও কিছু বিস্কুট খেয়ে এইবার অন্যপথ ধরে শুরু হলো হাঁটা। এই পথে বেশ কয়েকটা পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। সেই কথা ভেবে সবাই মোটামুটি আতংকিত, আবার দেবতা পাহাড় দিয়ে ফিরে যেতে হবে না এই ভেবে খুশি। ৩ঃ৩০ এ শুরু হলো সেই পথ চলা। প্রথম পাহাড় উঠেই সবার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। শেষ বিকেলের আমাদের সাথে মুখোমুখি সূর্যের তাপদাহে মনে হচ্ছিলো সব পুড়ে যাচ্ছে। সবার সাথেই পানি অল্প করে ছিলো, আমি বুঝতে পারছিলাম সামনে পানির সন্ধান না পেলে সবাইকেই কষ্ট করতে হবে। আমিয়াখুমের জলের ধারা থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ৫০০এম এল এর দুইটা বোতলই ভরশা আমার। যত কমে পানি চুমুক দিয়ে গলা ভিজানো যায় সেইভাবেই পানি খাচ্ছি একটু পর পর। এক পাহাড় শেষ, আবার নামতে হবে নিচে, আবার উঠতে হবে আরেক পাহাড়ে। নামার পথে বড় বড় লতাপাতার আছড় লেগে হাতে পেয়ে মুখে লেগে জ্বলছে। মনে হচ্ছে পাহাড় গুলো মজার খেলায় মজেছে। একবার উঠো, একবার কষ্ট করে নামো আবার উঠো।
সবার কাছে থাকা পানি কমতে লাগলো, আশা সামনে একটা পাড়া আছে। দ্বিতীয় পাহাড় শেষ হবার পর কারও শরীরে শক্তি ছিলো না সামনের পাহাড় শেষ করার। আমার বোতলে এক দুই চুমু দেবার মত পানি বাকি আছে। সামনে পরে আছে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা। কিছুক্ষণ দম নিয়ে মনে শক্তি নিয়ে শুরু হলো শেষ পাহাড়ে উঠা। এইতো দেখা যায় চূড়া, আর একটু পথ বাকি। উঠার পর দেখা যায় না সামনে আরেক চূড়া। বাঁকের জন্যে আগে দেখা যায় নি। ভাবলাম এইটাই শেষ, উঠে দেখি না পথ আরও বাকি। পাহাড় যেন খেলছে প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে। কয়েকজন পানির অভাবে ভুগতে লাগল, শুয়ে গেলো পাহাড়ের ঢালে। মনের মাঝে জিদ চেপে গেলো, পানি ছাড়াই শুরু করলাম উপরে উঠা। একজন বললো ভাই আপনার চোখ তো অনেক হলুদ হয়ে গেছে। কেয়ার করলাম না কিছুই। অবশেষে চূড়ায় উঠেই দমকা বাতাসের স্পর্শ পেলাম। একটূ দূরেই দেখতে পেলাম পাড়ার ঘর গুলো। ভিতরটা সতেজ হয়ে গেলো সাথে সাথেই। পাড়ার নাম অতিরাম পাড়া। এক ঘরের সামনে মাচায় শুয়ে গেলাম, পানি খেলাম পেট ভরে। চুরি করে গাছ থেকে নিয়ে আসা আম খেলাম। কাঁচা আমের স্বাদ নতুন করে পেলাম নতুন পাড়ায় বসে। কিছুটা বিশ্রাম নেবার পর শরীরে শক্তি আসলো। অপেক্ষা করছিলাম সবাই কখন আসবে। অতিরাম পাড়ায় পৌঁছে ছিলাম ৫টায়। বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করে আবার যখন রওনা দিলাম সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমের এক পাহাড়ের আড়ালে।
আর ঘন্টা খানেক পথ, তারপরই পৌঁছে যাবো থুইসা পাড়াতে। ঝিরির গর্ত থেকে আরও কিছু পানি নিয়ে আমি আর সাথে এক সঙ্গী নিয়ে হাঁটছি আনমনে। হঠাৎ সামনে দেখি রাস্তা মাঝে ভয়ংকর সদৃশ এক গয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম গয়ালের সামনা সামনি। বুঝতে পারছিলাম না আমাদের দেখে সে রেগে গেলো নাকি ভয় পেলো। গয়াল কেমন আচরণ করে তার ব্যাপারেও ধারণা নেই। একটু দাড়ালাম, বুঝলাম সে কিছু করবে না। আস্তে ধীরে সে সরে গিয়ে আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিলো। ছোট কিছু আপ আর ডাউন ট্রেইলের সহজ পথ। এই দিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আমার সাথে টর্চ ছিলো না, সাথের সঙ্গীর টর্চ ছিলো বলে রক্ষা। সামনের ওরা চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের দেখা নেই কারও। দুইজন হাঁটছি আধো অন্ধকারে। দুই পথ চলে আসলেই চিন্তা করছি কোন পথ সঠিক। পথে পায়ের ছাপ দেখে নিশ্চিত হতাম ঐ পথই সঠিক। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর অবশেষে এক পাহাড়ের উপরে আলোর দেখা পেয়ে বুঝতে পারলাম আমরা চলে এসেছি থুইসা পাড়ার নিচে। পাড়ায় গিয়েই গোসল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেতে এক মুহুর্ত দেরী করলাম না। খাবারের মেন্যু ছিলো ভাত, ডাল, মিষ্টি কুমড়া আর পাড়া থেকে কেনা এক খাসীর মাংস দিয়ে। প্রতিবারের মতই পেটে একটুও জায়গা খালি না রেখে ভরে নিলাম। ঐসময় মনে হচ্ছিলো কি পরিমাণ ভাত খাচ্ছি আম্মা যদি দেখতো তাহলে সবথেকে খুশি হতো। জীবনে এত খাওয়া কমই খেয়েছি।
উঠোনে আড্ডা জমলো, আমাদের কষ্টের কথা শুনে যারা যায়নি আমাদের সাথে তাদের দুঃখ কিছুটা ঘুচলো। সবাই বলছিলো না গিয়ে তারাই ভালো কাজ করেছে। এই নিয়ে মজা চলছিলো যখন, শুরু হলো গানের আসর। এইদিকে উঠোনের আরেক পাশে গাইড বসে গেলো খাসীর মাংসের বারবিকিউ করতে। একটার পর একটা গান, সবার গলা মিলানো, আর উঠোনে শুয়ে আকাশের হাজার হাজার তারা দেখতে দেখতে মনের উঠোনে খেলা করছিলো অনেক কিছুই। জীবনের অর্থ কী বুঝার মতো কঠিক ব্যাপার গুলোও মাথায় ঘুরছিলো। জীবন সুন্দর কি না জানি না, তবে জীবনকে উপভোগ করতে চাই আমার মতো এমন ভাবনার প্রতি আত্মিবিশ্বাস বাড়ছিলো।
সবাই একসময় ঘুমাতে গেলো। আগের দিনের মত আমার ঘুম আসছিলো না। ঘরের ভিতর গরম লাগছিলো, আবার বাইরে ঠান্ডা পরিবেশ। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকেও ঘুমের দেখা না পেয়ে বাইরে চলে আসলাম। সুনশান নিরবতা, সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। প্রতি পাড়াতেই কুকুর আছে অনেক। আমি হাটছি, কয়েকটা কুকুরের বাচ্চা চলছে পিছু পিছু। হাত মুখ মাথা ভিজিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার আসলাম ঘুমাতে, অনেক্ষণ চেষ্টার পর ঘুমের দেখে পেলাম। সকাল সকাল উঠে যেতে হলো। আজও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আজকের গন্তব্য থুইসা পাড়া থেকে নাফাখুম ঝর্না, তারপর সেখান থেকে রেমাক্রি। অন্য দুই দিনের চেয়ে অনেক সহজ পথ। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম, গরম খিচুড়ি ডিম আর আগের দিনের খাসীর মাংস। স্বাদ যেমনই হোক, খেয়ে নিলাম পেট ভরে। জীবনের সুন্দর দুটো রাত কেটেছে এই পাড়ায়, হয়তো ভবিষ্যতে আবারও কখনো আসবো এই ভেবে সকাল ৯টার কিছু পর সবাইকে বিদায় জানিয়ে বের হলাম পাড়া থেকে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই সামনে পড়লো জিনা পাড়া। আমাদের আগের প্ল্যান অনুযায়ী এই পাড়াতেই থাকার কথা ছিলো। সুন্দর পাড়া, অন্য পাড়া গুলোর তুলনায় বেশি আদিবাসীর বসবাস। পাশ কাঁটিয়ে কিছুদূর আসতেই রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এই সময়ে শুকিয়ে থাকা খালে অল্প বিস্তর পানি গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। বাকি পথ এই খাল ধরেই আগাতে হবে। কোথাও কোথাও একটু বেশি নিচু থাকায় বেশ পানি জমে আছে। চারপাশের প্রকৃতি আর রেমাক্রি খাল মিলেমিশে সুন্দর সব ল্যান্ডস্কেপ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। যখনই কোথাও বিশ্রামের জন্যে থেমেছি, পাশেই থাকা খালের স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ডুবিয়ে বসে থাকার মতো মজার জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করিনি। কাপড় বদলানোর কোন ঝামেলা নেই, কারণ সেই ভেজা কাপড় একটু পরেই রোদ আর শরীরের গরমে শুকিয়ে যায়। থুইসা পাড়া থেকে রেমাক্রি এই পুরো পথে গোসল করেছি ৫ বার!
রেমাক্রি খাল ধরে ট্রেইলটা মজার। এই কখনো মনে হচ্ছে মরুভূমির উপর, কখনো মনে হচ্ছে ছোট ছোট পাথরের দুনিয়ার উপর, কখনো নল খাগড়ার মাঝ দিয়ে কখনো বিশাল বিশাল সব পাথরের ফাঁক গলে, কখনো বা পাহাড়ের কিনারা ঘেষে চিকন পাথুরে দেয়াল দিয়ে। সামনে যতই যাচ্ছিলাম পাথর গুলোর আঁকার ততই বড় হচ্ছিলো। প্রায় ৩ঘন্টা হাঁটার পর দূর থেকেই নাফাখুমের গর্জন শুনতে পেলাম। ঝর্ণার পানি পতনের শব্দের চেয়ে মধুর শব্দ কমই আছে। গিয়ে আর দেরী না করে নেমে গেলাম ঝর্ণার উপরের স্টেপে। সেখান থেকে পানির স্রোতে ভেসে পড়লাম ঝর্ণার পানির সাথে নিচের জলাধারে। পানি কম থাকায় ভালই হয়েছে, যাওয়া যায় ফলের নিচেও। চিৎকার, উল্লাস, উপর থেকে লাফ, ঝর্ণার পানি দিয়ে শরীর ম্যাসেজ সবই হলো। ঘন্টাখানেক কাটালাম পানিতেই। এবার উঠে আবার পথ ধরতে হবে, সন্ধ্যার আগেই রেমাক্রি পৌছাতে হবে। যদিও এই ঝর্ণা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না।
আবার শুরু হলো খালের পাশ দিয়ে হাঁটা। পুরো পথেই বেশ কয়েকবার খালের এইপাশ ঐপাশ যেতে হয়। একটু পর পরই উঁচু পাথরের খাঁজের ভাঁজ থেকে নিচে পানি পতনের কলকল শব্দ আর পাহাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকাদের অবিরাম গেয়ে চলা গান, অচেনা পাখিদের ডাকাডাকি, সেই সাথে মোবাইলে বাজছিলো প্রিয় কিছু গান। ঐ মুহুর্তের অনুভূতি গুলো ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর এক পাড়ায় এসে নাস্তা করে নিলাম। এই দুইদিনে পাড়া কিংবা পথে সব জায়গাতেই ঝিরির ময়লা পানি খেয়েছি। পাড়ার পানি গুলো কিছুটা পরিস্কার থাকলেও, রাস্তায় যে সব ছোট গর্তের পানি খেয়েছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দুনিয়ার যেখানেই যাই, যে কোন পানি খেতে আর সমস্যা হবে না। ছেঁকে কিছুটা পরিস্কার করবো সেই উপায় বা সময় ছিলো না। বোতলে ভরেছি, বোতলের মুখে গামছা রেখে পানি চুষে খেয়েছি। সহজ সিস্টেম। এই পাড়ায় এসে প্রথম কোন দোকান পেলাম, এইদিকে টুরিস্টদের আনাগোনা বেশি থাকে বলেই দোকান নিয়ে বসে আছে আদিবাসীদের পরিবার। অন্য কোন পানীয় এর স্বাদ এবার জন্যে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ অরেঞ্জ খেলাম ৩৫টাকা দিয়ে। দামই বলে দিচ্ছে, কতটুকু দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ ৩৫টা হয়ে যায়। দুপুরের খাওয়া সারা হলো সিদ্ধ ডিম আর পাহাড়ি কলা দিয়েই।
আরও ৩০ মিনিটের পথ বাকি রেমাক্রি যেতে। উঠে গেলাম সবাই। পথ আগের মতই সুন্দর। পথের পাশে কিছু পাড়া চোখে পরে, মানুষজনও দেখা যায় কিছু এইদিকে। এই রেমাক্রি খাল মিশেছে সাঙ্গু নদীর সাথে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই রেমাক্রি পাড়া/বাজার। থাকা খাওয়া সবচেয়ে আধুনিকতার ছাপ চোখে পড়ে। থাকার জন্যে কাঠ বাঁশ দিয়ে তৈরি দুইতলা কটেজ আছে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই ৪রুমের ‘মেলোডি গেস্ট হাউজ’ নামের’ একটা কটেজ নেওয়া হলো আমাদের জন্যে। ছোট ছোট রুম, লম্বালম্বি করে ফ্ল্রোরে থাকার জন্যে আছে যাবতীয় সবকিছু। চারপাশে গাছপালা, সামনেই পাহাড়ের সারি, শুকিয়ে যাওয়া সাঙ্গু ছোট খালের মতো বয়ে চলছে।
সবকিছু কটেজে রেখেই চলে গেলাম গোসল করতে। হাটু পানি বা তারচেয়েও কম সাঙ্গুতে। কুসুম গরম পানির স্রোতে ডুবে থাকলাম অনেক্ষণ, বসে শুয়ে কাঁত হয়ে নানা ভঙ্গিমায় চললো নানান রকমে খেলা। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও উঠতে মন চাইছিলো না। পেটের কথা চিন্তা করে উঠে গেলাম। কাপড় বদলিয়ে কটেজে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন রাতের খাওয়ার জন্যে ডাক আসবে। শরীর ভালো লাগছিলো না, সাধারণত ঘুরতে গেলেই সবসময় আমার মাথা ব্যথা থাকে। গত দুইদিন মাথা ব্যাথার দেখা পাইনি, আজ শুরু হলো। প্রথমদিনই একজন কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার ব্যাকপ্যাক আমার কাঁধে নিয়েই এক পাহাড়ে নামতে গিয়ে ঘাড়ের এক পেশিতে টান খেয়েছিলাম। আজ আবার সেই ব্যথা বেড়েছে। এইদিকে বাসায় বলে এসেছি দুইদিন নেটওয়ার্কের ভিতর থাকব না। আমি জানতাম রেমাক্রিতে টেলিটকে্র নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। কিন্তু এসে দেখি কোন নেটওয়ার্কই নেই। কাল থানচিতে যাবার আগে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই। বাসার কথা ভেবে অস্থির লাগছিল। সেই ব্যথা, মাথা ব্যাথা, বাসার কথা আর নিজের কিছু কারণে অস্থির লাগছিলো। ব্যথার ওষুধ খেয়ে রুমে অন্ধকারে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। সবাই মজা করছে, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি নিজের কাছেই ভালো লাগছিলো না। আমার এই অস্থির ভাব দূর করার জন্যেই হয়তো, হঠাৎ আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। পাহাড়ে ঝরের রাত, এমন একটা রাতের স্বপ্ন আমার অনেক আগে থেকেই ছিলো। সেই স্বপ্ন টা পূরণ করতেই বুঝি ঝড় শুরু হয়ে গেলো। বারান্দায় বসে থাকলাম পুরোটা সময়, বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে উড়ে এসে গায়ে পড়ছিলো। বিদ্যুতচমকের আলোতে সামনের সামনের পাহাড় গুলো দেখা যাচ্ছিলো, কোন দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের ভাজে ভাজে আলোর রেখা খুব বেশি স্পষ্ট ছিলো। ঘণ্টাখানেক সময়ের এই ঝড় সব অস্থিরতা দূর করে দিলো। জীবনের সুন্দর আরেকটা রাত পাহাড়ে কাটছে আমার। রাত বাড়ছে, একে একে সবাই শুয়ে যাচ্ছে। এক রুমে কার্ড খেলা পাগলের খেলা জমে উঠেছে। একসময় আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। খেলা থেকে উঠলাম রাত ২টার পরে। ঘুমাতে যেতে যেতে ৩টা বাজলো। গত দুই দিনের একদিনও ভোর দেখিনি। কোন ট্যুরেই এমন হয় না আমার। আজ শেষ দিন, যে করেই হোক ভোর দেখবো। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
ঘুম ভাঙলো হাদী ভাইয়ের ডাক শুনে, ভাইকে আগেই বলে রেখেছিলাম ভোর দেখব বলে। বের হয়ে গেলাম কটেজ থেকে, স্নিগ্ধ ভোর। চারপাশেই পাহাড়ে জমাট মেঘ। এই তিন দিনে এই প্রথম কাছে মেঘের দেখা পেলাম। এই সময়ে ভোর ছাড়া বাকি সময়ে মেঘের দেখা পাওয়া যায় না এই দিকে। হাটতে হাঁটতে পাশেই বিজিবি ক্যাম্পের হেলিপ্যাডের চুড়ায় উঠে দেখলাম অন্যরকম এক রেমাক্রিকে। বেশ কিছু সময় কাটালাম সঙ্গে আরও কয়েকজন নিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় থেকে সূর্যের দেখা যাওয়ার পর চলে আসলাম কটেজে। একে একে সবাই উঠলো। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম কটেজের মালিকের ঘরে ডিম আলু ভর্তা ডাল আর ভাত দিয়ে। এইখানের রান্নাও তুলনামূলক অনেক ভালো অন্য পাড়ার চেয়ে।
খেয়ে ব্যাগ ঘুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম ফিরে যাবার পথ ধরার জন্যে। রেমাক্রি ঘাটে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে নৌকা। ফেরার পথে বড়পাথর, তিন্দু দেখে যাবো থানচিতে। থানচি থেকে দুপুর ২টায় শেষ বাস যায় বান্দরবানে। ২টার আগেই থাকতে হবে থানচি। ৯টার দিকে একে একে বের হয়ে গেলাম রেমাক্রিকে বিদায় জানিয়ে। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর নৌপথ সাঙ্গু বা শঙ্খ নদীর এই থানচি-রেমাক্রি পথটুকু। অন্তত শুধু এই নৌপথের সৌন্দর্য দেখার জন্যে বার বার এই পথে আসা যায়। ফিরে আসার পথে ভাবছিলাম খুব শিগ্রই আবার দেখা হবে এই পথের সাথে, হয়তো তখন সাঙ্গু থাকবে ভরা যৌবনে।
বড় পাথর/রাজা পাথর জায়গাটুকু একটু বেশিই সুন্দর। বিশাল বিশাল সাইজের পাথর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সাঙ্গুর উপরে। এই পাথর গুলোর পাশ কেটেই আস্তে ধীরে চলছে নৌকা। পাথর গুলোর পাশে নিজেকে বেশ ছোটই মনে হচ্ছিলো। প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট এই মনোমুগ্ধকর নৌভ্রমণ শেষে থানচি ঘাঁটে চলে আসি। এইখানেই দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে বান্দরবানের উদ্দ্যেশে রওনা দিবো।
বাসের টিকেট কাটতে গিয়ে জানা গেলো বান্দরবান যেতে হবে বাস রিসার্ভ করে যেতে হবে। যে টাকা চায়, তারচেয়ে চান্দের গাড়ি করেই যাওয়া যায়। টিম লিডার জানালো বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়ি রওনা দিয়েছে, এইখানে এসে আমাদের নিয়ে যাবে। দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ করার পর ঠান্ডা বাতাসের খোঁজে সামনে এগুলাম। থানচি নতুন ব্রিজের নিচে গিয়ে দেখি বড় বাঁশের মাচা। উপরে ব্রিজ, ব্রিজের পিলার ঘেঁষে মাচা, সাথেই নিচে বয়ে চলছে সাঙ্গু। অনেক বাতাস আর ছায়া পেয়ে চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করলো। ব্যাগটা মাথার নিচে রেখে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম এই খোলা পরিবেশে টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙল আমাদের আরেক সহযাত্রীর ডাকে। গিয়ে দেখি গাড়ি চলে এসেছে। ঘুম ঘুম চোখেই গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। পিছনে কত স্মৃতি ফেলে চলছি। জানি আবার দেখা হবে, নিশ্চয়ই হবে। সবাই বলে পাহাড় খুব খারাপ জিনিস, একবার ভালোবেসে ফেললে, তা থেকে দূরে থাকা যায় না বেশিদিন।
——————————————————————————–
লেখা এবং ছবি — সোহান…
পুরো ভ্রমণের ছবি পাওয়া যাবে এই খানে https://goo.gl/UAQueH ]