Categories
Uncategorized

যে ঝরনাটা বাংলাদেশের না…

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোনাটা পাহাড় দিয়ে থরে থরে সাজানো, যেখানে পাহাড়ের শেষ – সেখান থেকেই বাংলাদেশ। আঁকা বাঁকা পথে যত উপরে উঠি ততই আফসোস বাড়ে – আহারে, কেন আমরা আরো উঁচু ঐ পাহাড়টা পেলাম না, উচ্চতার সাথে সাথে আফসোসের সীমানাটা বাড়তে বাড়তে একসময় ঝুপ করে পড়ে যায় দূর থেকে বয়ে যাওয়া ডাউকি নদী দেখে। নিটোল স্বচ্ছ আয়নারঙা পানিতে ঠোকর খেতে খেতে চলা গল্লুমল্লু পাথরের মতন গলার কাছে দলা বেঁধে জমাট বাঁধে আবেগী কান্নার দল। কাছের সবুজের কারখানাটা এতটা কাছে তবুও হাত বাড়িয়ে ধরার অনুমতি নেই, সবুজের বুকে বারুদের নল নিয়ে তাচ্ছিল্যের চোখে চেয়ে আছে ও পাড়ার সৈন্যবাহিনী। অনেক বড় বড় লেখা একটা সাইনবোর্ড “সাবধান ! সামনে ভারত, প্রবেশ নিষেধ”!!!

তো এভাবেই শুরু আমাদের সেবারের সিলেট যাত্রা, চলতি পথে ধমকি খেয়ে কিছুক্ষণ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম – তাকালাম আল মারুফের দিকে, সে বিশাল ঘুরাঘুরি পাগল মানুষ, তার কাছে কোনো উপায় পাওয়া যায় কিনা – এখন আমাদের কোথায় যাওয়া উচিত! মারুফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে ভারতের পাহাড়ের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে – মানুষ ঢুকতে না পারুক, তার ক্যামেরার লেন্স তো ঢুকবে, ভারতের দুই চারটা পাখিকে আজ আর বন্দি না করলেই নয়। হতাশ হয়ে ডাউকি নদী পার হয়ে স্থানীয় এক ভ্যানচালকের কাছে জানতে চাইলাম যে এখানে আশে পাশে আর কি কি আছে? উনি খুব আগ্রহ নিয়ে জানালেন এখানে রাজার বাড়ি আছে, একটা ছোট্ট ঝরণা আছে, কমলার বাগান আছে, চায়ের বাগান আছে। আমরা হতাশ, সিলেটে চা-বাগান থাকবো নাতো কি খেজুর বাগান থাকবো নাকি! অবশেষে তিনি জানালেন অনেক দূরে একটা ঝরণা আছে, সেটা অবশ্য বাংলাদেশে না, ভারতের ভেতরে পড়ছে তবে বাংলাদেশ থেকে দেখা যায়। আর আমাদের আটকায় কে! বড় ঝরনা বলে কথা! পড়িমড়ি করে তার ভ্যানগাড়িতে উঠে বসলাম।

খাসিয়া পাড়ার ভেতর দিয়ে চলতে লাগলো আমাদের ভ্যানগাড়ি। সিলেটের এই অঞ্চলের রাস্তাগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর, দুইপাশে বিশাল বিশাল গাছের সারি মাথার দুই হাত উপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক স্থায়ী সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। এপ্রিলের এই ভরা রোদেও ঝির ঝির ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, অতি উৎসাহী কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের। হাত দিয়ে তাদের সরাতে গেলেই দেখা যায় নানা রঙের পাতাবাহারের ঝাড়, প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পাতাবাহারের স্তপ যেন আসন পেতে বসে বসে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে। বিশাল চা-বাগান আর কমলা বাগান দেখতে দেখতেই আমরা চলে এলাম প্রতাপপূর সীমান্ত ফাঁড়ির রাস্তায়। এখানে এসে রাস্তা ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে লাগলো তার উদ্ভাসিত সৌন্দর্যটুকু। একপাশে মেঘ টপে যাওয়া পাহাড় আর তার নিচে শ’খানেক ফুটবল খেলার মাঠের মতন সমান জমি নিয়ে আমাদের অবাক করার জন্যই মনে হয় শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। এরপর তারা হটাত করেই জেগে উঠলো ! দূরের পাহাড়ের বুক চিরে সাদা সুতার মতন গলগল করে ঝরতে লাগলো ঝরণার পানি, একটা, দুইটা, ছয়টা, বারোটা এরপর আর গুনতে পারলাম না। একপাশে নীল আকাশের নীচে সবুজ পাহাড় আবার তার ঠিক কয়েক ফুট দূরেই মেঘ থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ! অপার্থিব একটা দৃশ্য ডান পাশে, আর আমরা এখানে রোদের তাপে কয়লা জাতির কাছাকাছি চলে যাচ্ছি! যে রাস্তা নিয়ে দিয়ে যাচ্ছিলাম সেটা সম্পর্কে একটু বলি, গাঁয়ের মেঠো রাস্তা যেমন হয় ঠিক তেমনি বড় বড় গাছের ছায়ায় চোখ যায়না এমন দূর পর্যন্ত এঁকেবেঁকে সবুজের বুক চিরে চলে গেছে সফেদ সাদা রাস্তাটি। এমন একটা পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য এমন রাস্তাই আসলে দরকার, প্রকৃতি জানে কোথায় কি দিতে হয়।

ছবির মতন সাজানো রাস্তাটি দিয়ে প্রায় ঘন্টা দুয়েক চলার পর ‘মাতুরতল’ বাজারে এসে নামলাম আমরা, আমাদের ভ্যানচালক জানালেন এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হবে, ঝরণার কথা শুনলে আমাদের ক্লান্তি পালিয়ে যায় অচীন দেশে। বিশাল এক পাথর পকেটে নিয়ে হাটা শুরু করলো চঞ্চল, অনেক দূর হাঁটতে হবে–ওজন নিয়ে হাঁটা শুরু করলে ক্লান্তি নাকি কম লাগবে। এতক্ষণ ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটা রিতু ছাতা বন্ধ করে রেখে দিলো, তার বক্তব্য ছাতা মাথায় নিয়া ঝর্না দেখতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না ! যাইতেছি ভিজতে–ছাতা মাথায় থাকলে ভিজবো কিভাবে!! যাই হোক, ‘মাতুরতল’ বাজার থেকে ধু ধু গরম বালু পায়ের তলায় নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমরা – মাঠ পেরোলাম, ঘাট পেরোলাম, সামনে থাকা খাল পেরোলাম, জংলা জলা-পাথর মেলা সব পেরিয়ে পড়লাম বাঁশবাগানে। এর বাড়ি, তার ঘর, আরেকজনের উঠোন সব মাড়িয়ে আমরা চলে এলাম এক বিশাল ফুটবল খেলার মাঠে। আমাদের ভ্যানচালক গাইড আঙ্গুল তুলে দেখালেন ঐ যে ঝর্না, “পাংতুমাই” ঝর্না ! আমরা তাজ্জব-চোখের সামনে মাঠ, আমরা মাঠের গোলপোস্ট ছাড়া আর কিছুই দেখিনা, এই লোক ঝর্না পাইলো কৈ ! সিলেটি ভাষায় ঝর্না মানে আবার ফুটবল খেলার মাঠ নাতো ! দুরু দুরু বুকে তাঁর দেখানো জায়গার দিকে হাঁটা দিলাম, সামনের ঝোপ সরিয়েই চক্ষুস্থির! বিস্ময়ে বোবা বনে গিয়ে প্রায় শ’খানেক ফুট দূরের ঝরণাটা দেখা শুরু করলাম। পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে ইংরেজি এস অক্ষরের মতন এঁকেবেঁকে কান ঝালাপালা করে দেয়া শব্দ নিয়ে ভারতের ঝরনাটা আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে।

ঝরণার দিকে এগুতে গিয়েই বাধা পেলাম স্থানীয় লোকজনদের,  কিছুদূর পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমানা – এরপর থেকেই নাকি ভারতের সীমানা, ওপাড়ে যাওয়া মানা ! তাই বলেকি আর আমাদের গোসল করা আটকে রাখা যাবে !  চরম গরমে এতদূর হেঁটে এসে পকেটে রাখা পাথরটা ছুঁড়ে ঝাঁপ দিলো চঞ্চল, তার পানির ঝাপটায় ভিজে চুপচুপা আমরা! গায়ে পানির ছোঁয়া লেগেছে, আর কার সাধ্য আছে আমাদের পানি থেকে দূরে রাখে, তাও আবার পাহাড়গলা হিম হিম পানি।

দেখতে শুনতে খুব সুন্দর এই ঝরনাটা কিন্তু বাংলাদেশের না, তবে এর সবটুকু পানি এসে পড়েছে এদেশেরই মাটিতে। এলোমেলো ছন্নছাড়াদের জন্য এই হটাৎ খুজে পাওয়া ঝর্নাটা একটা আশীর্বাদস্বরূপ। এই ঝরনাটা দেখার সবচাইতে বড় আফসোস, এত সুন্দর একটা ঝরনার একেবারে নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায় না, এর উল্টোপাশে কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপারও আছে – যদি ভারতীর কাউকে নিজ দেশের এই ঝর্না দেখতে আসতে হয় তাহলে তাকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে তারপর দেখতে হবে – কারণ এদেশ ছাড়া এই ঝর্নাটির সৌন্দর্য দেখার আর কোনো উপায় নাই।

 

কিভাবে যাবেন ?

সিলেট থেকে বাসে করে জাফলং, সেখান থেকে ডাউকি নদী পার হয় একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে বলবেন মাতুর তল বাজারে যাবেন, প্রায় দুইঘন্টা পর বাজারে এসে যে কাউকে বললেই হবে যে আপনি পাংতুমাই ঝর্না দেখতে যেতে চান। সানন্দে তারা আপনাকে নিয়ে যাবে।  এই রাস্তায় কোনো বিপদ নেই, ডুবে যাওয়ার ভয়ও নেই, শুধু দেশের সীমানা অতিক্রম করবেন না, ওপাড়ে কিন্তু দাদারা বন্দুক হাতে নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে বাংলাদেশের সবুজ শ্যামল ফসলের মাঠ দেখে আর বসে বসে আফসোস করে – তাদের ওখানে খালি পাহাড় আর পাহাড় একটুও সমান জমি নাই…