Categories
Uncategorized

জুম-ঝরনায় দিন রাত্রি…

——————————————————————— বাবর আলী

 

লোভটা জেগেছিল ঈদের ছুটিতে রুমানা পাড়া গিয়ে। পাড়া হতে জিংসিয়াম ঝরনায় নামার সময় হাতের ডানে সবুজের দায়ে চোখ ফেরানো যায় না।  আদিগন্তবিস্তৃত সবুজের মাঝে দু-চারটে বাদামী কুঁড়েঘর।

DSC_0856-fb small

দূর থেকে দেখে কেনো জানি বুকের মধ্যে হাহাকারটা আরো বাড়ে! ইস! একটা দিনের জন্য যদি এই বাদামী ঘরগুলোর কোনো একটার অতিথি হতে পারতাম। সময়ের চক্রে হাত-পা বাধা। তাই এই যাত্রা আর সেই সৌভাগ্য হয় না।

DSC_0907-fb

শহুরে যান্ত্রিকতায় ফিরে রোবট জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়েও সেই বাদামী কুঁড়েঘরগুলোর মায়া কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছিলাম না।

DSC_0880-fb small

সুযোগটা এসে গেলো মাসখানেকের মধ্যেই। এইবার আর সময়ের টানাটানি নেই,নেই নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যও। ইচ্ছেমত ল্যাটানো যাবে। লুংথাউসিহ পাড়া হয়ে পৌছে গেলাম ত্লাংচাদ পাড়ার জুমে। এর মধ্যেই ঝুম বৃষ্টি।

DSC_0839-fb small

বৃষ্টি ধরে এলে ‘কাই লো ভা’ ঝরনা দেখে রওনা দিলাম রুমানা পাড়ার দিকে। কিছুদুর যেতেই চোখে পড়ল চিরচেনা মখমলের সবুজ বিছানার উপর বাদামী কুঁড়েঘরের সেই ঘোরলাগা দৃশ্য।

DSC_0879-fb small

আমার ট্রিপমেটদের মতামত ছিল,আজকের দিনে যত বেশি সম্ভব পথ পাড়ি দেয়ার। কারণ আগের কয়েকদিনে অনেক বেশি ল্যাটাইছি আমরা। কিন্তু গো ধরলাম আমি। একটা জুম ঘরের সামনে গিয়ে ‘এই জায়গায় রাত কাটাইতে না পারলে আমার জীবন বৃথা’ – এই ডায়লগ দেয়ার পর ট্রিপমেটরাও থেকে যেতে রাজি হলো।

DSC_0893-fb small

জুম ঘরের মালিক নল ভিল’দা আমরা রাতে থাকব শুনে বেজায় খুশি। ভালুকের হাত থেকে জুমের ভুট্টা বাঁচাতে গাদা বন্দুক নিয়ে বেচারা গত কিছুদিন এই জায়গায় মটকা মেরে পড়ে আছে। কথা বলার মানুষ পেয়েই সে মহা আনন্দিত।

DSC_0859-fsmallb

জুম ঘরের মাচায় বসে চারপাশের দৃশ্যাবলী গেলা শুরু করলাম। মাচা থেকেই জিংসিয়াম ঝরনার প্রথম ধাপটা দেখা যায়। একটু কান খাড়া রাখলে পানির শব্দটাও শোনা যায়।

DSC_0863-fb new small

এইসব দেখতে আর শুনতে শুনতে মাচাতেই ঘুমিয়ে গেছিলাম। বাগড়া দিল ঝুম বৃষ্টি। চারপাশ ভাসিয়ে নেয়া সেই বৃষ্টি।

DSC_0836-fb small

জুম ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিয়েও রেহাই নেই। বৃষ্টির ছাট ভিজিয়ে দিচ্ছে সবকিছুই। বৃষ্টি থামার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক অনিবর্চনীয় মুহুর্তের মুখোমুখি হলাম আমরা সবাই। পাড়ার কোলঘেসা পাহাড় ‘আরসুং সিপ’ এর গা ঘেষে উকি দিল এক বিশাল রংধনু। মুগ্ধ নয়নে সেই রূপ গিলতে লাগলাম আমরা।

DSC_0847-fb small

এর পরপরই প্রকৃতি যেন তার আকাশ-সবুজে ছাওয়া মখমলের বিছানা-ঝরনা-মেঘ-ঝিরি-কেওক্রাডং -দুরের কপিতাল পাহাড় নিয়ে আমাদের সামনে এক স্লাইড শো শুরু করলো। এ বলে আমাকে দেখ,ও বলে আমাকে দেখ। আর আমরা কজন উদাসীন মানবসন্তান হাপুস নয়নে এইসব গিলছি! 

              DSC_0882-fb small

লেখকের ফেসবুক আইডি লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

Categories
Uncategorized

বিস্ময় ছড়ানো এক ঝর্ণা – “খইয়াছড়া”…

রাত ১০টায় ফোন দিলেন আরমান ভাই – ভাই কালকে পাহড়ে ঢুকতেছি, কাজ কাম না থাকলে চইলা আসেন। পরদিন আমার অনেক কাজ, পুরা দুনিয়া উঠাইয়া এক যায়গা থেকে আরেক যায়গায় নেওয়ার মত ঝামেলা মাথার উপরে। তাই তাকে বললাম যে যেতে পারছি না। ফোন রেখে ব্যাগ গুছাচ্ছি, অফিস থেকে বাসায় যাবো, হটাত করেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো পাহাড়ের সারি! অটল অবিচল সবুজ পাহাড় ধবধবে সাদা মেঘের ভেতরে গলা ডূবিয়ে বসে আছে, তার মাথায় সবুজ চুলগুলোতে একটানা বাতাসে দোল খেতে খেতে শিস দিচ্ছে ফিঙ্গে পাখির ছানা। আর সবকিছু ছাপিয়ে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে বিরামহীন ছরছর শব্দ। হাজার শব্দের মাঝেও এই শব্দকে আলাদা করে চিনি আমি, মনের ভেতরে খুশির ফোয়ারা ছড়িয়ে দেয়া মন প্রাণ নাচানো এই শব্দ – ঝরনার পানির শব্দ। মাথা ঝাড়া দিয়ে চোখ ফেরালাম সাদা দেয়াল থেকে। মনঃস্থির করা হয়ে গেছে, চুলোয় যাক কাজ, পাহাড় আমাকে ডাকছে, এই ডাক উপেক্ষা করার মতন কলিজা এখনো আমার হয়নাই। অফিসের হাসান ভাইকে রীতিমতন বেঁধে ধরে এক কাপড়েই সায়েদাবাদ রওয়ানা দিলাম, ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ২টা ছুঁই ছুঁই ত্ততক্ষণে আমরা ছেড়ে গেছি ধুলোর নগরী ঢাকার সীমানা – গন্তব্য মীরসরাই।

ভোর ৫টার কিছুক্ষণ আগে মীরসরাই বাজারে নেমে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলাম খইয়াছড়া বিদ্যালয়ের মাঠে, চট্টগ্রাম থেকে আরমান, কালপুরুষ অপু আর লিমন ভাইয়ের আসতে সময় লাগবে আরো ৩ ঘন্টা। কাজেই এই তিনঘণ্টার জন্য উদ্বাস্তু আমরা। সাজানো গোছানো স্কুলের বারান্দায় গামছা পেতে শুয়ে পড়লাম আমি আর হাসান ভাই, পুব আকাশে ততক্ষনে আগুন লেগে গেছে! সূর্যের প্রথম আলো কেটে কুটে ফালাফালা করে দিচ্ছে ঘুমিয়ে থাকা মেঘের সারিকে, ভোরের বাতাসের এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে উদ্ভ্রান্ত মেঘের দল। ঘুম মাথায় উঠলো, শুয়ে শুয়েই দেখলাম মীরসরাইয়ের পাহাড়ের ওপাশ থেকে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। ততক্ষণে চলে এসেছে আমাদের চট্টগ্রামের পাহাড়ী বাহিনী, আর দেরী নয় পেটে দুটো পরোটা দিয়েই পা চালালাম পূবের পাহাড় লক্ষ্য করে। কালপুরুষ অপু’র কাছে জানলাম এই এলাকায় একটা ঝরণা আছে, কোনো নাম নেই এটার, যেহেতু খইয়াছড়া এলাকাতে অবস্থিত তাই স্থানীয়রা একে “খইয়াছড়া ঝর্না” বলে। আমরা জাচ্ছি এই ঝর্না দেখার জন্যই।

খইয়াছড়া স্কুলের উল্টাপাশের মেইন রোড থেকে পিচঢালা রাস্তা চলে গেছে ট্রেনলাইন পর্যন্ত, সেখান থেকে মেঠোপথ আর ক্ষেতের আইলের শুরু। তারপর হটাত করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হলো একটা ঝিড়িপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরণই বলে দিচ্ছে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। স্থানীয় লোকদের ক্ষেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। একটা বিশাল জাম গাছে পেকে টসটসে হয়ে ঝুলে আছে অজস্র জাম, হাত দিয়ে একটা পাতা টানতেই ঝরঝর করে পড়ে গেলো অনেকগুলো, সে কি মিস্টি! চলতি পথে এর বাড়ির উঠান, ওর বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অবশেষে ঢুকলাম পাহাড়ের মূল সীমানায়। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদেরকে আমরা আবিস্কার করলাম লাল আর নীল রঙের ফড়িংএর মিছিলে! যতদূর পর্যন্ত ঝিড়িপথ গেছে ততদুর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছি পানি পড়ার শব্দ, প্রকৃতি এখানে খুব শান্ত, কোথাও কোনো আওয়াজ নেই, চারপাশে মন ভালো করে দেয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংএর পাখায়। একটু দূরে কোনো একটা প্রাণী ডেকে উঠলো, লিমন ভাই জানালো ওটা মায়া হরিণ। হরিণের ডাক আবার শোনার জন্য কান খাড়া করে ফেললাম, তার বদলে শোনা যাচ্ছে একটানা ঝিমঝিম শব্দ! ঐ শব্দের উৎসের দিকেই আমাদের যাত্রা।  কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝর্ণা, অনেক উপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হা করে দেখার মতন কিছু নেই, এমন ঝর্ণা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। কালপুরুষ অপু জানালো এটা নাকি এই ঝরণার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরো আছে নাকি? সে হাসলো, আমাকে বললো দম বন্ধ করতে, সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই, এলাকার লোকজন সব নাকি এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, উপরের দিকে আর যায় না। এই ঝরনার উপরে আরো সাতটা ধাপ আছে, আমরা দাঁড়িয়ে আছি অস্টম ধাপের গোড়ায়!!

বিস্ময়ে মাথা বেকুব হওয়ার জোগাড়, তড়িঘড়ি করে প্রায় খাড়া ঢাল ধরে হাচড়ে পাচড়ে উঠে চললাম ঝরণার উৎসের দিকে। ঝরনার ষষ্ঠ স্টেপে এসে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা, চোখের সামনে যা দেখছি বিশ্বাস করতে কস্ট হচ্ছে! চশমা খুলে মুছে নিয়ে আবার বসালাম নাকের উপরে, না, ভুল দেখিনি – রীতিমতন আকাশ থেকেই পড়ছে ঝরনার পানি, আমার সামনে একেবারে খাড়া হয়ে ঝুলে আছে খইয়াছড়া ঝরণার ৩টা ধাপ ! প্রতিটা ধাপ থেকে সমান তালে পানি পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটা সিঁড়ি চিত হয়ে পড়ে আছে সবুজের বাজারে। প্রতিটা ধাপেই ফুটে আছে রংধনু! আমার আর আরমান ভাইয়ের অবাক হওয়া দেখে মজা পাচ্ছে বাকিরা, ওদের কাছে এই যায়গাটা পুরোনো, ওনেক আগে এরাই প্রথম খুজে বের করেছিলো এই যায়গা, কালপুরুষ অপু জানালো উপরে আরো তিনটা ধাপ আছে, সেখানে আছে একটা গভীর বাথটাব, লাফ-ডুব-সাঁতার সবকিছু ঐ জায়গার জন্যই তুলে রেখেছে তারা। এরপর উঠা শুরু হলো খাড়া ঝরনার গা বেয়ে, একেকটা ধাপে উঠছি আর অবাক হচ্চি নিচের দিকে তাকিয়ে, এও সম্ভব! একটা ঝর্ণা এতটা সুন্দর, এতো নিখুঁত কিভাবে হতে পারে! সবার উপরের ধাপে উঠে ব্যাগগুলো রেখে চললো পানিতে লাফালাফি, সে এক মুহূর্ত বটে।

বাংলাদেশের মোটামুটি অনেকগুলো ঝর্ণাই আমি দেখেছি, সৌন্দর্যের দিক থেকে সবাইকে যোজন যোজন মাইল পেছনে ফেলে এগিয়ে আছে বান্দরবানের “জাদিপাই ঝর্না”। এই ঝর্না দেখার পর আমার ঐ বিশ্বাসটা টলতে শুরু করেছে, কে বেশী সুন্দর – জাদিপাই নাকি খইয়াছড়া! গঠনশৈলীর দিক দিয়ে অদ্ভুত সুন্দর জাদিপাই’এর সাথে টক্কর বাঁধিয়ে দেবার জন্যই যেন এর উত্থান! আমার জীবনে এরকম অতিকায় সুন্দর ঝর্না আমি আর দেখিনি, এর ৮টা স্টেপের প্রতিটিতেই রয়েছে সুবিশাল যায়গা, যেখানে তাঁবু টাঙ্গিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝরনার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে।

 

কিভাবে যাবেন ?

পথের দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের সবচাইতে সহজপথের ঝর্না এটা। ঢাকা থেকে গেলে চট্টগ্রামের গাড়ীতে উঠে ভোরে নেমে যাবেন মীরসরাই বাজারে, সেখান থেকে আট টাকা সিএনজি ভাড়া দিয়ে চলে যাবেন “খইয়াছড়া স্কুলে”। খইয়াছড়া খুলের উল্টাপাশের পাহাড়ের দিকে যে পিচ ঢালা রাস্তাটা চলে গেছে সেদিকে হাঁটা দিবেন, ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পরে নিজেকে আবিস্কার করবেন এই ঝরনার শেষ স্টেপে। এটা বাংলাদেশের একমাত্র ঝর্না যেখানে সকল মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়! বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই ঝর্ণাটা একদমই নতুন শহুরে মানুষের কাছে। এখানকার লোকজন জানেও না যে কি এক আসাধারণ সম্পদ নিয়ে তারা বসে আছে! ঢাকা থেকে যাওয়া আসার বাস ভাড়া বাদ দিলে সারা দিনে এই ঝরণার পেছনে আপনার খরচ হবে ১০০ টাকারও কম, আর সেটাও নির্ভর করবে আপনি কি খাবেন তার উপরে।

খইয়াছড়া - ৩য় স্টেপ
পাথরের শরীর গলে বেরিয়ে আসছে হিম ঠান্ডা সাদাটে জীবনধারা…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
ছোট ছোট পানির নহর যেন জলের বিস্ফোরণ…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
বনের ভেতর জলের রাস্তা, কোন যানজট নেই…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
নিজেকে গোপন করে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা, কিন্তু ক্যামেরার চোখ দেখে ফেলেছে লাজুক এই ঝরনাধারাকে…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
নিদারুণ উচ্ছ্বাস নিয়ে সাদাটে ফেনিল জলধারা আছড়ে পড়ছে সবুজ কার্পেটের উপর…
খইয়াছরা ঝিরি...
এ যেন জলের কার্পেট, বিছিয়ে আছে মুগ্ধ অতিথিদের বরণ করে নেবার জন্য…
খইয়াছড়া ঝরনা - ১ম স্টেপ
পানির ধারা নিজেকে সাপের মতন পেঁচিয়ে রেখেছে নিরেট পাথরের কোলে…
খইয়াছড়া ঝরনা - ২য় স্টেপ
চলছে জলের মিছিল, সবে ত শুরু…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৩য় স্টেপ
বিন্দু বিন্দু জল যেখানে তৈরি করেছে অনিন্দ্য সুন্দর এক পুকুরের…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৪-৩-২
ধাপে ধাপে নেমে এসেছে প্রকৃতির সবচাইতে সুন্দর রহস্যধারা…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৬ষ্ঠ স্টেপ
পাহাড় জুড়ে জলের বিস্ফোরণ…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৭-৬-৫
আকাশছোঁয়া পানির সিঁড়ি…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৮ম স্টেপ
বুনো জলের ফেনিল উচ্ছ্বাস…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৯ম স্টেপ
ঝরনা পাথর জল পুকুর, সময় তখন মধ্য দুপুর…
খইয়াছড়া ঝরনা - ২য় স্টেপ
যুগে যুগে এভাবেই অবাক হয়েছে পাহাড়প্রেমিরা…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৫-৬
ঝরনাসন…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৬ষ্ঠ স্টেপ
এখানে রংধনুরা জন্ম নেয়…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৭-৬-৫
পূর্ণ যৌবনা খইয়াছড়া ঝরনা…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৯ম স্টেপ
জল-ঝরনার পাহাড়ছড়া…
Categories
Uncategorized

সানাক্র পাড়া ঝরনা – বান্দরবান…

 

সুন্দরের খোঁজে মানুষ দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে, ঢুকে পড়ে গহীন থেকে আরো গহীনে। নতুন কিছু পাবার আশায়, নতুন কিছু দেখার আশায় মানুষ নিজেকে নিয়ে যায় বিরাণ কোন জঙ্গলে। অথচ খুব কাছেই একেবারে হাতের নাগালেও যে অমিত সুন্দর কিছু থাকতে পারে সেটা সম্পর্কে আমরা চিন্তাও করিনা। বান্দরবানের অলিতে গলিতে কানা ঘুপচিতে আমি অনেক ঘুরেছি, জেনেছি কোথায় আছে বিমুগ্ধ ঝর্না, বিস্ময়কর ঝিড়িপথ, আর মন ভালো করে দেয়া পাহাড়গুলো। কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি যে এত কাছেই রয়েছে আরো কয়েকটি মুগ্ধ করা ঝর্না!

এবারে হুট করেই ছুটি মিলল দুই দিনের, সাথে শুক্রু শনি মিলিয়ে মোট চার দিনের মামলা। ঠিক করি বান্দরবান যাবো, এই ভয়াবহ গরমে যেখানে নিজের গা থেকেই ঝর্না গড়িয়ে পড়ে সেখানে পাহাড়ী ঝর্না দেখতে যাওয়া দোষের কিছু না। ঠিক করে ফেললাম বাংলাদেশের সবচাইতে উঁচু গ্রাম পাশিং পাড়া-তে তিন রাত ঘুমাবো। সেখানে মেঘের রাজত্ব, জগতের কোন গরম, উষ্ণতা সেখানে ঠাঁই পায়না। এই কাঠ ফাটা গরমে সেখানে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে হয়, সন্ধ্যে হলেই ঠান্ডা ঠান্ডা মেঘের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। কথায় বলে লোভে একলা পোড়া ভালো না, আরো দশজনকে নিয়ে পড়তে হয়। আমি দশজন পেলাম না, পেলাম একজনকে। লালমণিরহাটের নাসিরুল আলম মন্ডল, তাকে জানালাম – আমি জামু, তুমি যাইবা ? কই যাবো, কোথায় যাবো জিজ্ঞেস না করেই সে জানিয়ে দিলো আসতেছে। আর পায় কে আমাকে, দুইজনের সংসার ! ব্যাগ গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম মেঘ-পাহাড়ের দেশে। চট্টগ্রাম বদ্দার হাট ফ্লাইওভারে বাস উঠার আগেই দেখি রাস্তা আগলে এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে না নিয়ে বাস যেতে দিবে না ! তাঁর নাম নাহিদ। এই ছেলেটা বান্দরবানের আনসাং হিরো। বান্দরবানে চেনে না এমন কোণ যায়গা তাঁর কাছে নাই। সব পাড়াতে তাঁর আত্মীয়তা। চলতে চলতেই তিনি জানালেন, পাহাড়ে গিয়া কি করবেন, চলেন ঝর্না দেখতে যাই, গোপন ঝর্না, কেউ জানেনা এইগুলার খবর! আমার আর মন্ডলের সকালের ঘুম তখন রাতের আঁধারের মতই ফুড়ুৎ করে হারিয়ে গেছে। আমাদের চকচক করতে থাকা চোখ দেখে যেকোন অচীন মানুষও চোখ বুঁজে বলে দিবে যে ছেলেগুলা আবার গেছে, আর কেউ এদের থামাতে পারবে না।

বান্দরবানের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে সোজা রুমা চলে গেলাম, সেখানে একটুও সময় নস্ট না করে আমরা উঠে গেলাম ইডেন পাড়ার পাহাড় বেয়ে। আমাদের গন্তব্য মংপ্রু পাড়া। নাহিদ ভাইএর ভাষ্যমতে মংপ্রু পাড়ায় যাবার আগেই বাম দিকে পাহাড়ের নিচে একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে বয়ে চলেছে কয়েকটি ঝর্না। আমাদের লক্ষ্য এবার সেগুলোতে গিয়ে শরীর জুড়ানো। এমন একটা ঘটনা শোনার পর মানুষের আনন্দের দিন শুরু হবার কথা, আমাদের শুরু হলো কস্টের দিন। ভর দুপুরে মাথা ফাটা রোদের মাঝে পাহাড় বাওয়া যে কি পরিমাণ অমানুষিক যন্ত্রণার কাজ সেটা বোঝনোর মতন ভাষা এখনো আমি রপ্ত করতে পারিনি। সামনে যতদূর পথ যায় খালি খাড়া পথ, পিঠের ছোটখাটো ব্যাগটাও তখন মনে হচ্ছে আস্ত একটা পাহাড়। হাঁটু আর বুক এক করে অনেক ঠেলে ঠুলে নিজেকে উঠাচ্ছি পাহাড়ের মাথায়, টপটপ শব্দটাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি বেয়ে। সাথে করে নিয়ে আসা ২ বোতল পানি তখন সোনার চেয়েও দামী। আমাদের হাঁটাপথের দুইপাশ আম বাগানে সয়লাব। সবগুলা গাছে বিশাল বিশাল আম ধরেছে। কিন্তু খাওয়ার মতন একটাও হয়নি, একটা কামড় দিয়েই দ্বিধায় পড়ে গেলাম যে আম খাইলাম নাকি লেবু, তেঁতুল খাইলাম! হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা যখন সহ্যের শেষ সীমায় তখন বাম পাশে দেখা গেলো অনিন্দ্য সুন্দর টেবিল পাহাড়ের। এই পাহাড়ের চুড়াটা একেবারে ডাইনিং টেবিলের মতন সমান হওয়াতে এর নাম দেয়া হয়েছে টেবিল পাহাড়, তার ওপাশে “সিপ্পি”র চূড়া। সিপ্পি-তে যাওয়ার জঙ্গলটা নাকি খুব সুন্দর, হয়তো যাবো একদিন সেখানে। দুই পাহাড়ের চূড়া দেখে যেই একরাশ আনন্দ নিয়ে আমাদের সামনের পথের দিকের তাকালাম, ওমনি যাবতীয় আনন্দ চুপসে গেলো, উঠতে হবে আরো খাড়া পথ! উঠতে উঠতে একেবারে আকাশে মিলিয়ে গেছে পথের বাঁক! উপরে উঠার একটা লাভ আছে, সেটা হলো ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায়, সেই লোভে আর সব কস্টকে ঠেলে ফেলে উঠতে লাগলাম আমরা, উঁচু-নিচু সমতল পেরিয়ে এক সময় হটাৎ করে নামা শুরু করলো আমাদের পথ। এবার সে নামছে তো নামছেই, সাথে সাথে বদলে যেতে থাকলো তার চার পাশের সব দৃশ্যপট। একপাশে কাশফুল, অন্যপাশে ঘাসফুল নিয়ে নামতে নামতে সেই পথ আমাদের নামিয়ে দিলো একেবারে পাহাড়ের গোড়ায়। সেখানে এলোমেলো পাথর পড়ে আছে, মনে হচ্ছে কোন এক মহাযুদ্ধ হয়েছিলো এদিকে। ভাঙ্গা পাথর, জুমের ক্ষেত, ফলবাগান, কৃষ্ণচূড়ার জঙ্গল সব পেরিয়ে একসময় ভর দুপুরে ঝুপ করে আঁধার নামিয়ে দিলো আকাশ সমান গাছের দল। নাম না জানা এই গাছের পাতায় পাতায় বাতাসের টান, সেই টান আর পাখি গান ছাড়িয়ে আমাদের কান পেলো নতুন এক প্রাণের শব্দ, অনেক অনেক পরিচিত এই শব্দ মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করে দিলো, শরীরের সব কয়টা ব্যাথাওয়ালা পেশী আনন্দে যেন নেচে উঠলো এই বয়ে চলা পানির শব্দে। জঙ্গল, ঘাস, গাছ, লতা মাড়িয়ে ছুটে চললাম পানির উৎসের দিকে – ধুম করে সামনে পড়লো এক পাহাড়ী পাড়া। অনেকগুলো ঘর আর নানান ফলবাগানে সাজানো এই পাড়ার নাম “সানাক্র পাড়া”। তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঝর্না আছে নাকি, জবাবে তিনি যেদিকে হাত তুললেন সেদিকে ঘণ জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই নাই। পাহাড়ীরা ভুল করে না, এই তত্ত্ব-কে মেনে নিয়ে ফল বাগান মাড়ালাম, ফুলবাগান ছাড়ালাম, নাহিদ ভাইয়ের জিপিএস বলছে আমরা ঠিক রাস্তাতেই যাচ্ছি। অবশেষে মিনিট দশেক হেঁটে পেলাম তাকে। দুই পাশে দুই বিশাল পাহাড়কে পাহারায় রেখে নিজের যৌবনকে পাথুরে পথে অকাতরে ঢেলে দিচ্ছে এই পাহাড়ী ঝর্না। কয়েকশ ফিট লম্বা ক্যাসকেইডের উপর দিয়ে ঝিরি ঝিরি শব্দ তুলে কই যে ছুটে যাচ্ছে সেও জানে না। দেখে ই মনে হচ্ছে বরফ শীতল ঠান্ডা পানি! এতক্ষণ ধরে রোদে লাল হয়ে যাওয়া তিন ছেলের কাছে এর চাইতে আরামের জিনিস আর কিছুই হতে পারে না। এই ঝরনার নাম “পলিখিয়াং ঝর্না”। পরের গল্পটুকু লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার, এক নাগাড়ে ঘন্টাদুয়েক ধরে ঠান্ডা পানিতে শীতে কাঁপতে থাকার, আর গণগণে সূর্যটাকে ঠান্ডা দৃষ্টি দিয়ে তাচ্ছিল্য করার। গোসল আর ছবি তোলার ফাঁকেই নাহিদ ভাই জানালেন এর উপরে আরো সুন্দর একটা ঝর্না আছে, মিনিট পাঁচেক এর পথ নাম তার “দেব্রখিয়াং ঝর্না”। তার কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু আমাদের ঐদিকে হাঁটার আর কোন দেরি নাই, ব্যাগ পোটলা একপাশে রেখে পাথুরে ক্যাসকেইড ধরে ভিজতে ভিজতে দুই চারবার পিছলা খেতে খেতে সামনে দেখলাম তরতর করে পানি আসছে এক জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। উত্তাল পাহাড় যে জয় করে এসেছে তার দুর্ভেদ্য জঙ্গলে কি ভয়! সুতরাং জঙ্গলে হারিয়ে গেলাম সবাই। মিনিট দুয়েক হেঁটেই থমকে দাঁড়ালাম ! চোখের সামনে কেউ যেন ইংরেজি “আই” অক্ষরটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে, “রোমান ব্যানার” এর মতন এক ঝর্না জঙ্গলের নিস্তব্ধতা খান খান করে আছড়ে পড়ছে বুকসমান এক পুকুরে, সেখানে একটু থেমেই পানিগুলো আবার ছুটছে আমরা একটু আগে যেদিকে গোসল করে এসেছি সেই দিকে। তাজ্জব হয়ে হা করে দাঁড়িয়ে রইলাম ঝরনার নিচে, জীবনে অনেক ঝর্না দেখেছি আমি, কিন্তু এমন অদ্ভুত একটানা লম্বা ঝর্না আমি আর দেখিনি, পুরো যেন ইংরেজি “আই” অক্ষর, কোথাও একফোঁটা বেশকম নাই! মন্ডল তো বলেই দিলো,এমন একটা ঝর্নাতে নিয়ে আসার জন্য নাহিদভাইকে নোবেল দেয়া দরকার, আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম – কারণ কথা বলার মতন অবস্থা আমার নাই।

প্রতিবারই পাহাড় আমাকে নতুন কিছু না কিছু দেয়, আজ পর্যন্ত নিরাশ করেনি এই মেঘ সবুজের অরণ্য। এবারও আবার সে আমাকে চমকে দিলো, বার বার ভাবি এক পাহাড় অরণ্যের মাঝে আর কি-ই বা নতুন থাকতে পারে, আর কিই বা অবাক করার মতন থাকতে পারে! আমার সেই ধারণাকে বার বার ভূল প্রমাণ করে দেয় এইমেঘ-পাহাড়ের দেশ। তাই বার বার পাহাড়ের কাছে ছুটে আসি, তাই বার বার পাহাড় ভালোবাসি…