Categories
Uncategorized

বান্দরবান – আমিয়াখুম, নাফাখুম ও রেমাক্রির গল্প…

……………………………………… (সোহান)……………………………………………

২৮ এপ্রিল – ৩ মে, ২০১৬

কয়দিন ধরেই পাহাড়ের কথা খুব মনে পরছে। বান্দরবানের আগের ট্যুরের স্মৃতি গুলো স্মরণ করেই দিন পার করছি। একদিকে কাজের ঝামেলা আর বান্দরবানের ভ্রমণ এত সহজে আয়োজন করা সম্ভব নয় দেখে দিন গুনছিলাম কখন একটু কাজের ঝামেলা কমবে আর একটা সুযোগ পাব। একদিন ফেসবুকে এই নিয়ে স্ট্যাটাস ও দিলাম। তারপর দিনই হাদি ভাই এর মেসেজ, যাবে নাকি বান্দরবান। ওনাদের একটা ক্লোজ গ্রুপ সার্কেল থেকে বান্দরবান ট্যুরে যাচ্ছে, আমি চাইলে যেতে পারি ওনাদের সাথে। এই কথা শুনে কাজের ঝামেলার কথা ভুলে গিয়ে রাজি হয়ে গেলাম।
২৮ এপ্রিল রাত সেই ভ্রমণের শুরু, তার আগের কয়দিনে যা দরকার গুছিয়ে নিলাম। কিছু প্রস্তুতির দরকার হয় তা সেরে নিলাম। আমার সাথে ভ্রমণ সঙ্গী ২২ জন। পরিচিত বলতে হাদি ভাই আর সহপাঠি তামান্না। বিশাল গ্রুপ নিয়ে ট্রেকিং ট্যুরে যাওয়া এবং বেশিরভাগ সঙ্গী অপরিচিত থাকায় কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম কেমন হবে এই ভ্রমণ। রাত ৯ঃ৩০ এ সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে বন্ধু সুলভ সবার সাথে পরিচিত হতে হতে বুঝে গেলাম, এই ভ্রমণ বেশ মজারই হবে। আমাদের যাত্রা শুরু হলো ১০ঃ৪৫ এ বাস ছাড়ার সাথে সাথেই।
এই ভ্রমণের মূল গন্তব্য হলো আমিয়াখুম ঝর্না, নাফাখুম ঝর্ণা, রেমাক্রি আর তিন্দু। আমাদের যে রুট প্ল্যান ছিলো তা উলট পালট হয়ে গেলো হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৯ তারিখ থানছি যাবে এই কারণে। ঐদিন দুপুর ১২ টার পর থেকে রেমাক্রির দিকে কোন ইঞ্জিন নৌকা চলবে না। যেভাবেই যাই আমাদের দুপুর ১২টার আগেই থানছি পৌঁছে নৌকা নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে আমাদের গন্তব্যের দিকে। তাই মনের মধ্যে একটা সংশয় ছিলো এই নিয়ে। তখন আমাদের রুট প্ল্যান হলো, বান্দরবান-থানছি-পদ্মমুখ-থুইসা পাড়া-আমিয়াখুম-থুইসা পাড়া-নাফাখুম-রেমাক্রি-থানছি-বান্দরবান ।
কাল সারাদিন দৌড়ের উপর থাকতে হবে, বাস ছাড়ার পর চেষ্টা করলাম কিছুটা ঘুমাতে। কিন্তু সব সময়ের মতো ঘুমের দেখা পেলাম না। পাশের যাত্রী রবিন ভাইয়ের সাথে গল্প করে আর গান শুনেই সময় যেতে লাগলো। কাল আবার পাহাড়ের কাছাকাছি থাকব এই ভেবে রোমাঞ্চিত ছিলাম। রাত ৩ টায় কুমিল্লায় নাস্তা করে বাস আবার চলতে শুরু করলো। বান্দরবানে নামলাম সকাল ৭টায়। ১২ টার আগেই থানছিতে থাকতে হবে, তাই তাড়াহুড়া করে পরোটা ডিম দিয়ে নাস্তা করে আগেই ঠিক করে রাখা দুইটা চান্দের গাড়িতে সবাই উঠে গেলাম।
 
বান্দরবান থেকে থানচির দূরত্ব ৭৬ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় সড়ক পথ। আঁকা বাঁকা, উঁচু নিচু রাস্তা ধরে একটার পর একটা পাহাড়কে পাশ কাঁটিয়ে চলতে শুরু করেছে চাঁন্দের গাড়ি। এই যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দৃশ্যই দেখার মতো। গল্প, চিল্লানো আর গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে ১১টায় পৌঁছে গেলাম থানচি বাজারে। মাঝপথে কিছুটা বিশ্রাম আর আর্মি বিজিবি ক্যাম্প গুলোতে রিপোর্টের কাজ ও সারা হলো।
 
থানচিতে আমাদের সাথে গাইড আবুল যোগ দিলো, সাথে তার সহকারী শফিউল। অল্প কিছু নাস্তা আর দরকারি কিছু কেনাকাটা করে নিলো সবাই। এই দিকে টিম লিডার হাসান ভাই আর গাইড গেলো পুলিশ ক্যাম্পে অনুমতি নিতে। ফিরে এসে জানালো অনমুতি দেয় নাই। কিন্তু কিছু করার নাই, আমাদের যেতেই হবে, আর তা অনমুতি দিক কিংবা না দিক। আগেই ঠিক করে রাখা ৫টা ছোট ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে যাত্রা শুরু হলো সাঙ্গু নদী দিয়ে। গন্তব্য পদ্মমুখ, যেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের ট্রেকিং। সাঙ্গু নদী আর তার চারপাশের রূপের কথা আর কি বলবো, এক কথায় যাকে বলে অপরূপ। এই সময় পানির খুবই স্বল্পতা আর নৌকা চলছে উপরের দিকে স্রোতের বিপরীতে। নিচে ছোট বড় পাথরের আস্তরণ, একটু পর পর নৌকার তলা পাথরে আঁটকে যাচ্ছে। সবাইকে নেমে যেতে হচ্ছে, মাঝি আর তার সহকারী নৌকা ঠেলে একটু পানি বেশি আছে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা আবার উঠছি নৌকায়। গ্রীষ্মকাল চলে তবুও পাহাড়ে সবুজের কমতি নেই। দুইপাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সাংগু। ছবির মতো চারপাশ দেখতে দেখতে ঘন্টাকানেক পরেই পদ্মমুখ এ চলে আসলাম।
পদ্মমুখে নেমেই, সামনের সাঙ্গুর টলমল জল দেখে ঝাপিয়ে পড়লাম সবাই। বেশিক্ষণ ঝাপাঝাপি করা গেলো না। আজকেই যেতে হবে অনেক পথ। দুপুরের খাবার গাইডের বাসা থেকেই রান্না করে নিয়ে আসা হয়েছিলো। পদ্মমুখে বসে খিচুরী ডিম আর মুরগী দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হলো। গলা দিয়ে ঢুকছিলো না, কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই। আবার কখনো পেট ভরে খেতে পারবো তার ঠিক নেই। খাওয়ার পর্ব শেষ করে আদিবাসীর দোকানে এক কাপ চা খেয়ে শুরু হলো হাঁটা, সময় দুপুর ১ঃ৪০। গন্তব্য থুসাই পাড়া, যেখানে আজ রাত থাকা হবে। পাহাড়ি পথে ট্রেকিং এ অভ্যস্থ যাদের সময় লাগে ৪-৫ ঘন্টার মতো। আমাদের কত সময় লাগবে তার ঠিক নেই কোন। দলের বেশিরভাগ মানুষেরই এই প্রথম পাহাড়ে ট্রেকিং, সাথে আছে দুইজন মেয়ে। সব কিছু বিবেচনা করে ধরে নিয়েছি ৬-৭ ঘন্টার মতো লাগবে।
পদ্মঝিরি ধরে হাঁটছি। ঝিরিপথ সবসময় আমার পছন্দ। তুলনামূলক সহজ ট্রেইল। চারপাশের দৃশ্য সবসময়ের মতো মনোরম। ঝিরির কিছু জায়গায় শুকনো, কোথাও বা কোমর সমান পানি জমে আছে, দুইপাশেই পাহাড়, ছোট বড় পাথর, পিচ্ছিল পথ, গাছপালা, আলো আধারের খেলা। একেক জনের হাঁটার গতির কারণে কিছুক্ষণ পরেই কয়েক গ্রুপ হয়ে গেলো। কেউ সামনে কেউ পিছনে। নির্জন দুপুরে পাহাড়ের গরম স্বাভাবিক ভাবেই বেশি থাকে কিংবা বেশি লাগে। ঘামছি, শরীর ভিজছে, আবার শুকাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেলে বোতল থেকে এক চুমুক স্যালাইন খাচ্ছি। কতদূর হেঁটে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। আপ ট্রেইল না হওয়ায় সবাই বেশ আনন্দেই চলছি। চারপাশ দেখার সময় কমই পাওয়া যায়, সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়ে পথের উপর, কোথায় পা ফেলছি তার উপর। হঠাৎ জুতার ফিতে খুলে গিয়ে আছাড় খেলাম পাথরে, হাতে রাখা ক্যামের বাঁচাতে গিয়ে ঝিরির পানিতে পড়ে গিয়ে ব্যাগ গেলো ভিজে। ভিজলো ভিতরের সব কিছু। ভাগ্য ভালো কোন ব্যথা পেলাম না এইবার। ব্যাগের ওজন যত কম রাখা যায় ততই মঙ্গল। সেইভাবেই আমি ব্যাগ গুচিয়ে এনেছিলাম। কাপড় আর ব্যাগ ভিজে গিয়ে সেই কাঁধ ব্যাগের ওজন বেড়ে গেলো দ্বিগুন।
গত ৩ ঘন্টা ধরে হেঁটে আসা পথে আপ ট্রেইল ছিলো অল্পই। বাকি পথ টুকু আপ আর ডাউন ট্রেইল। অতিরাম পাড়ায় যাবার আগে এই প্রথম বার মোটামুটি একটা আপ ট্রেইল পাড়ি দিতে হবে। ২০ মিনিটের এই আপ ট্রেইলে উঠেই ফুসফুসে অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছিলাম। পায়ের লিগামেন্ট গুলো মনে হচ্ছিলো যে কোন সময় ছিড়ে যাবে। জানি প্রথমদিন প্রথম উঁচু পাহাড়ে উঠা কষ্টকর, আস্তে ধীরে কিছুটা সয়ে যাবে। হরিতচন্দ্র পাড়ায় উঠেই এক আদিবাসীর ঘর থেকে ঠান্ডা পানি খেয়ে শরীর ঠান্ডা করলাম। একে একে সবাই উঠে আসলো, আর এই প্রথম অনেকেই প্রথমবারের মতো বুঝলো পাহাড়ে উঠা এত সহজ নয়। অনেকদিন পর পাহাড়ে উঠতে গিয়ে বুঝলাম আমার অবস্থাও এত ভালো নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাথার উপর সূর্য আর প্রচন্ড গরম।
হরিতচন্দ্র পাড়ায় ৩০ মিনিটের মত বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু হলো। বিকেল ৫ঃ৩০ তখন, সুর্য পশ্চিমে থাকলে গরম চারপাশেই আছে। পাড়া থেকে পথ চলে গেছে নিচের দিকে। পথ বেশি খাড়া আর ভেজা না থাকলে পাহাড় থেকে নামতে বেশ ভালই লাগে কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পথ উঠতে হবে অন্য এক পাহাড়ে। পাড়া থেকে কিছুদূর যাবার পরই চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা ঝুপ করে চলে আসে। আগেই জানা ছিল ট্রেক শেষ হতে রাত হবে। সাথে করে সবাই টর্চ নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক ছিলো। টর্চের আলোয় আপ আর ডাউন ট্রেইলে চলছি। আশেপাশে কিছু দেখার উপায় নেই, সন্ধ্যায় পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো ডেকেই যাচ্ছে অনবরত। অন্ধকার, পাহাড়, কেমন একটা অদ্ভুত পরিবেশে লাইন ধরে চলছি কয়েকজন। আমাদের সামনের কয়েকজন এক গাইড নিয়ে চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের সাথে আরেক গাইড, মাঝে আমরা কয়েকজন গাইড ছাড়া। পথ ভুল হলে বিপদে পরতে হবে এই চিন্তাও ঘুরছে। এইদিকে আমাদের সাথে যে পানি ছিল শেষ হয়ে গিয়েছে। গাইড বলে দিয়েছিলো পথে একটা ঝিরি পরবে, সেখানে পানি পাওয়া যাবে। হাঁটছি তো হাঁটছি কিন্তু ঝিরির দেখা নেই। সবার গলা শুকিয়ে গেছে। ঘেমে সব পানি বের হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ এই ভাবে গেলে পানি শূন্যতায় ভুগতে হবে। অবশেষে এক ঝিরি পথ পেলাম, কিন্তু কোথায় পানি। সব শুকিয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এইখানে বসে অপেক্ষা করবো পিছনের দলের জন্যে। শুকনো ঝিরির দুইপাশেই ঘন জংগল। উপরে খোলা আকাশে তারার মেলা। সবাই চুপচাপ। অদ্ভুত অনুভূতি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা আর পিছনে সাংকেতিক ভাষায় ডাকাডাকি করেও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। আবার উঠে হাঁটা শুরু, পানি দরকার। পানি পেতেই হবে। পিছনে যারা আছে তাদের কাছেও যতদূর জানি পানি তেমন নাই। কিছুদূর এগিয়ে একটা ডাউন ট্রেইলে যেতেই একজনের মাথা ঘুরাতে লাগলো, টলতে টলতে হাটছিলো। অতীত অভিজ্ঞতায় থেকে উনাকে দেখেই বুঝলাম ডিহাইড্রেশন এর সমস্যা হচ্ছে। উনার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আস্তে ধীরে ধরে ধরে সামনে এগুতে লাগলাম। ঐ মুহুর্তে কিছুটা ভয় লাগছিলো। পানি না পেলে খারাপ কিছু হতে পারে। ভাগ্য ভালো কিছুদূর সামনে এগিয়ে যেতেই একজন চিৎকার দিয়ে জানালো এক গর্তের মধ্যে অল্প জমে থাকা পানি পাওয়া গেছে। পানিতে ময়লা নাকি ব্যাঙ্গাছি আছে তা দেখার সময় নেই, বোতল ভরে স্যালাইল গুলিয়ে ঐ ভাইকে খাওয়ালাম। শরীর মুছিয়ে কিছুক্ষন রেস্ট নেবার পর উনি কিছুটা ঠিক হলো। আমরাও যে যতখানি পারি পানি খেয়ে খালি বোতল গুলো ভরে নিলাম। ঐদিকে পিছনে যারা আছে তাদের কোন খবর নেই। সময় যেতে লাগলো আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। মাথার ভিতর দুঃশ্চিন্তা, ওদের কারও কিছু হয় নি তো। যোগযোগ করার কোন উপায় নাই, ফিরতে পথে যে কেউ যাবে তার শক্তিও নেই। পিছনের দলে তামান্না আছে আর রুমকি আপু আছে তাই চিন্তা একটু বেশি লাগছিলো। অবশেষে ঘন্টা খানেক পরে তাদের সাড়া পাওয়া গেলো। আসার পর জানলাম এই ভাইয়ের মাসল পুল করেছে আর তামান্নার লো সুগার সমস্যা।
আবার শুরু হলো হাঁটা, কতটুকু পথ বাকি গাইডকে জিজ্ঞেস করলে বলে আর একটু আর একটু। কিন্তু একটু আর শেষ হয় না। এই দিকে রাত বাড়ছে, সন্ধ্যার পর ট্রেক করা আরও কঠিন হয়ে যায়। বেশি সবাধান থাকতে হয়। টর্চের আলো ফেলতেই মনে হলো কি জানি নড়লো, একটু পাশে আলো ফেলতেই প্রথমবারের মতো সাপের সাথে দেখা হয়ে গেলো। তিন হাতের মতো লম্বা, অপিরিচিত সাপ। পাশে থাকা হাদি ভাইকে বলতেই ইশারা দিলেন চেপে যেতে। সাপ দেখলে অনেকেই ভয় পেতে পারে তাই চুপ মেরে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। আমি ভুলে গেলাম একটু আগে আমার পা থেকে ৩-৪ হাত দূরে কি দেখেছি। সামনে কাঁধাময় ঝিরি আসলো, সাথে পিচ্ছিল পাথর। অন্ধকারে আরও বেশি দেখে শুনে চলতে হলো। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর পানির শব্দ পেলাম। গাইড কে জিজ্ঞেস করতেই বললো সামনেই রেমাক্রি খাল, সেই খালে পানি আসছে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আমিয়াখুম থেকে। থুইসা পাড়া যেতে এই খাল পাড় হয়ে যেতে হবে। শুরু হলো পাহাড় থেকে নামা। এই প্রথম অনেকেই পাহাড় কত খাড়া হতে পারে তা টের পেলো। অন্ধকার থাকায় ভালই হলো, নিচে দেখা যায় না। দিনের বেলায় হয়তো এত খাড়া ঢাল দেখে মনে ভয় লেগে যেত। আস্তে ধীরে একে একে সবাই নেমে আসলাম খালের কাছে। পাড়ি দিলেই আমাদের গন্তব্যে চলে এসেছি, গাইডের কথা তাই। খালের ওপারে গিয়ে যাওয়ার পর শুনি, সামনে আরেকটা পাহাড় উঠতে হবে তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত থুইসা পাড়া। শরীর আর কত সহ্য করবে, সেই গতকাল রাত থেকে জার্নি শুরু, তারপর ভালো ভাবে বিশ্রাম নেবার সুযোগ ও হয়নি। এই শেষ পাহাড় উঠতে গিয়ে আরও বেশি কষ্ট লাগছিলো। উঠার পর দেখি রাস্তা আমার নেমে গেছে নিচে, নিচে নেমে দেখি পাড়ার কোন দেখা নাই! আলো দেখে বুঝলাম সামনে আরেকটা ছোট পাহাড় আছে তার উপর সেই থুইসা পাড়া। সেই পাড়ায় উঠার পথটা মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার কঠিন পথ। দাঁতে দাঁত চেপে উঠে গেলাম সেখানে। উঠে বুক ভরে বাতাস নিলাম। পাড়ায় ঠিক করে রাখা ঘরের বারান্দায় হাত পা ছুড়ে কতক্ষণ তব্দা মেরে বসে থাকলাম। প্রচন্ড খিদা লেগেছে, দেরী না করে গোসল করে নিলাম। গোসল করার পর কিছুটা শান্তি লাগলো। এই দিকে আগেই চলে আসা গাইড সব কিছু ঠিক ফেলেছিলো। রান্নাও হয়ে গিয়েছিলো। গোসল করে এসেই ভাত ডাল মিষ্টি কুমড়া আর মুরগী মাংস দিয়ে পাগলের মতো খেয়ে নিলাম আমরা কয়েকজন। স্বাদ যেমনই হোক, ঐ সময় মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সেরা খারাপ খাচ্ছি। ঐদিকে পেছনের দলও চলে এসেছে। সবার মুখেই বিজয়ীর হাসি যদিও বেশিরভাগ জনই বলছিলো এইটাই জীবনের এই ধরণের তার শেষ ট্রেকিং ট্যুর। আর জীবনেও আসবেনা এইদিকে , এইভাবে। তামান্না আর রুমকী আপুর জন্যে বিশেষ অভিনন্দন জানালাম এত বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মানসিক শক্তির পরীক্ষা দিয়ে ঠিকমতো থুইসা পাড়ায় আসতে পারার জন্যে।
সবাই খুব বেশি ক্লান্ত। থাকার জন্যে দুইটা ঘর ঠিক করা হয়েছে। যে যার মতো শুয়ে গেলো। এইদিকে বেশি ক্লান্তি থাকলে আমার ঘুম আসে না। পাড়ার এই মাথা ঐ মাথা হেঁটে বেড়ালাম। ৮-৯ টা আদিবাসী পরিবারের বসবাস এই পাড়ায়। ছোট পাড়া। প্রায় সব ঘরেই সৌর বিদুৎ এর ব্যবস্থা আছে। সামনের ঘরেই আরেকটা গ্রুপ উঠেছে। তারাও ঘুরতে এসেছে গতকাল। উঠোনে গানের আসর বসিয়েছে। আমি বসে বসে আকাশের তারা দেখি আর গান শুনি। এই পাহাড়ে এত উচুতে মনে হচ্ছিলো আকাশের তারা গুলো আরও অনেকটা কাছে। অস্তির লাগছে, ঘুম নাই কিন্তু অনেক অনেক ক্লান্ত। আমাদের আরেক থাকার ঘরে গিয়ে দেখি কয়েকজন কার্ড খেলায় মেতেছে। আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। এই খেলা শেষ হলো রাত ৩টার পরে। ইচ্ছে ছিলো ভোর দেখার, কিন্তু সকালেই আবার শুরু হবে দ্বিতীয় দিনের মতো ট্রেকিং। অল্প হলেও ঘুম দরকার, অনিচ্ছা সত্তেও শুয়ে গেলাম। শুয়ে শুয়ে সারাদিনের কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।
সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল, আরও অনেকেই উঠে গেছে। ফ্রেশ হয়ে হালকা হলুদ দেওয়া খিচুড়ি, ডিম আর মুরগীর ঝুল দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। আজ যাবো আমিয়াখুম। থুইসা পাড়া থেকে যেতে কতক্ষণ লাগবে, পথ কেমন হবে গাইড কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে আপনারা যেভাবে হাঁটেন তাঁতে ৫-৬ ঘন্টা লাগবে। সে আমাদের উপর চরম বিরক্ত এত বেশি বিশ্রাম নেই বলে। তাকে বুঝাতে পারলাম না যে গ্রুপের অনেকেরই জীবনের প্রথমবার এমন কঠিন পথে ট্রেকিং, তাই এমন হচ্ছে। সকাল ৯ঃ১৫ তে রওনা হয়ে গেলাম আমিয়াখুমের উদ্দ্যেশে। এই পথে পাড়ার এক দাদা কে সাথে করে নেওয়া হলো গাইড হিসেবে। গাইড আবুল থেকে গেলো অন্যসব কাজ ঘুছিয়ে রাখতে। পাড়ার দাদা জানালো আমাদের কে সহজ পথে অল্প সময়ে যাওয়া যায় এমন পথে নিয়ে যাবে। পাড়া থেকে বের হয়েই একটা আপ ট্রেইল। মাথার উপর সূর্য তার কাজ ঠিকমতই করে যাচ্ছে। পাড়া থেকে বের হয়েই এই আপট্রেইল দেখে আর গতকালের কথা চিন্তা করে একজনের মনোবল ভেঙ্গে গেলো। সে যাবে না আমাদের সাথে, পাড়ায় চলে যাবে। এইভাবে একে একে ৪জন পাড়ায় ফিরে গেলো। তাদের কে ফিরানো চেষ্টা করা হলো না। পাহাড় এমন এক জিনিস যেখানে প্রচন্ড মানসিক শক্তির দকার হয়। মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে গেলে তার জন্যে পাহাড়ে উঠা অসম্ভব হয়ে উঠে।
এই আপ ট্রেইলে উঠতে বেশ কষ্ট হলো আমার, সারা শরীর বেয়ে ঘামের স্রোতধারা। দম বন্ধ করা ঝাঁঝালো গরম। উপরে উঠেই হাপ পা ছুড়ে বসে গেলাম। সাথে থাকা স্যালাইনের অর্ধেক শেষ করে ফেললাম সেখানেই। ভরশা সামনে যদি কোথাও ঝিরি থাকে। তবে বাকি পথে এত কষ্ট হলো না। সুন্দর ট্রেইল আর ছোট কিছু আপ ডাউন ট্রেইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে ২ ঘন্টা পর হাজির হলাম দেবতা পাহাড় নামক এক পাহাড়ের চূড়ায়। তখনো জানতাম না সামনে কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। এই পাহাড় থেকে নামলেই আমিয়াখুমের কাছাকাছি চলে যাবো। ঘন গাছপালা থাকায় নিচে কি আছে বুঝার উপায় নেই। নামতে গিয়ে বুঝলাম এই খাড়া ঢাল অন্যসব পাহাড়ের মত নয়। বেশিরভাগ যায়গায় ৮০ডিগ্রী খাড়া ঢাল। একটু এদিক সেদিক কিংবা একটু অমনযোগ অথবা কপাল খারাপের কারণে হয়তো অনেক খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার ছিলো শুকনো গুড়ো মাটি আর ছোট ছোট পাথর। ট্রেকিং বান্ধব প্লাস্টিকের জুতো সেই গুলোর উপরে পড়লেও স্লিপ খেয়ে যায়। নামার পথের ঢালের দিকে অনেক জায়গাতেই ফাঁকা, তাকালেই মাথা ঘুরে এমন। এইখান থেকে পড়লে কত নিচে পরবো তা দেখার উপায় নেই। নামছি তো নামছি, শেষ হবার লক্ষণ নেই। আবার কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও পায়ের কাছেই গত রাতে পাহাড়ে লাগা আগুন থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোয়া। এত দীর্ঘ খাড়া পাহাড় এ নামা এই প্রথম। বসে বসে, কাঁত হয়ে, হাতের লাটির উপর কখনো পুরো ব্যালেন্স দিয়ে, নুয়ে, জায়গায় জায়গায় অনেক কসরত করে নামছি। সবার কলিজাই ধুঁক ধুঁক করছে। একজন আরেকজন কে সাহস দিচ্ছে, সামনে কোন বিপদ হবার মতো কিছু থাকলে বলে দিচ্ছে, এই ভাবেই চলছি। আমার কোন ভয় কাজ করছিল না, হয়তো সেই অনুভূতি ছিলো না তখন। বুঝেছিলাম এইখানে ভয় পেয়ে লাভ নাই। যা আছে কপালে আর পায়ে, আর আছে ৮০ ডিগ্রী খাড়া ঢালে। মনে সাহস ছিলো, নিজের শরীরের ব্যলেন্সের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো, আস্থা ছিলো পায়ের উপর, শরীরের সব ভর দেওয়া লাঠির উপর।
কোথাও বিশ্রাম নেবার মতো জায়গা নেই, এই ঢালে বসে থাকলেও কষ্ট লাগে। যত নিচে নামছিলাম চারপাশের গাছপালা গুলো আমাজনের মতো মনে হচ্ছিলো। প্রায় ৪৫ মিনিট নামার পর অবশেষে নিচে কিছু দেখা গুলো। মুখ দিয়ে এমনিতেই চিৎকার বের হলো। বাকি পথ তাড়াহুড়া করে নেমে চলে আসলাম নাইখ্যং মুখের কাছে। স্বচ্ছ পানির ছোটখাটো লেকের মতন দেখে আর দেরী করলাম না, সাথে সাথেই নেমে গেলাম আমরা যে কজন ছিলাম। শরীর ভাসিয়ে দিলাম পানিতে, পাথরে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিলো অনন্তকাল এইভাবে থাকি। একে একে আরও কয়েজন চলে আসলো, পিছনে পথেও রয়ে গেল অনেকেই। তাদের জন্যে অপেক্ষা করছি তো করছি, কোন খবর নেই। এই দিকে এই পুরো সময় পানি থেকে উঠিনি। পানিতে বসে বসে দুপুরের খাওয়ার জন্যে নিয়ে আসা বিস্কিট কেক খেয়ে নিলাম। ঘন্টার চেয়েও বেশি সময় পরে শেষ দল পাহাড় থেকে নেমে আসলো। তাদের কে অভিনন্দন জানালাম হাত তালি দিয়ে, দেবতা পাহারের মতন নিষ্ঠুর খাড়া ঢাল বেয়ে সুস্থ মতে নিচে নামতে পারার জন্যে।
যেখানে ছিলাম সেখান থেকে মাত্র ১০মিনিটের হাঁটা পথ পরেই আমিয়াখুম। জানা ছিলো না, থাকলে এত সময় ঐখানে না থেকে ঝর্ণার কাছেই বসে থাকতাম। সে যাই হোক, দূর থেকেই যখন ঝর্ণার গর্জন শুনতে পেলাম, আর সহ্য হচ্ছিলোনা কখন উনার কাছে যেতে পারবো। বড় বড়ো পাথর পেড়িয়ে যখন ঊনার দেখা পেলাম। কয়েক পলক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বর্ষায় এর পুরো যৌবন থাকে, তখন আরও বেশি বন্য হলেও এই গ্রীষ্মে যতটুকুই পানি আছে তা দেখেই বিমোহিত হলাম। সবাই সবার মতো করে ছবি তোলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। সময় তখন ২টার উপরে। এখানে বেশি সময় দেওয়া গেলো না, সামনে সাতভাইখুম থেকে ফিরে যাবার পথ ধরতে হবে। কিন্তু এতদূর আসলাম যে ঝর্ণার জন্যে সেখানে গাঁ ভিজাবো না তা কি হয়, নেমে গেলাম পানিতে। অল্প কিছুক্ষণ ভিজে সাঁতার কেটে উঠে চলে আসতে হলো।
সাতভাইখুম দেখে এইবার ফিরে যাবার পালা, ক্ষুধা অনেক, বিস্কুট ছাড়া কিছু নাই, আরও কিছু বিস্কুট খেয়ে এইবার অন্যপথ ধরে শুরু হলো হাঁটা। এই পথে বেশ কয়েকটা পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। সেই কথা ভেবে সবাই মোটামুটি আতংকিত, আবার দেবতা পাহাড় দিয়ে ফিরে যেতে হবে না এই ভেবে খুশি। ৩ঃ৩০ এ শুরু হলো সেই পথ চলা। প্রথম পাহাড় উঠেই সবার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। শেষ বিকেলের আমাদের সাথে মুখোমুখি সূর্যের তাপদাহে মনে হচ্ছিলো সব পুড়ে যাচ্ছে। সবার সাথেই পানি অল্প করে ছিলো, আমি বুঝতে পারছিলাম সামনে পানির সন্ধান না পেলে সবাইকেই কষ্ট করতে হবে। আমিয়াখুমের জলের ধারা থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ৫০০এম এল এর দুইটা বোতলই ভরশা আমার। যত কমে পানি চুমুক দিয়ে গলা ভিজানো যায় সেইভাবেই পানি খাচ্ছি একটু পর পর। এক পাহাড় শেষ, আবার নামতে হবে নিচে, আবার উঠতে হবে আরেক পাহাড়ে। নামার পথে বড় বড় লতাপাতার আছড় লেগে হাতে পেয়ে মুখে লেগে জ্বলছে। মনে হচ্ছে পাহাড় গুলো মজার খেলায় মজেছে। একবার উঠো, একবার কষ্ট করে নামো আবার উঠো।
সবার কাছে থাকা পানি কমতে লাগলো, আশা সামনে একটা পাড়া আছে। দ্বিতীয় পাহাড় শেষ হবার পর কারও শরীরে শক্তি ছিলো না সামনের পাহাড় শেষ করার। আমার বোতলে এক দুই চুমু দেবার মত পানি বাকি আছে। সামনে পরে আছে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা। কিছুক্ষণ দম নিয়ে মনে শক্তি নিয়ে শুরু হলো শেষ পাহাড়ে উঠা। এইতো দেখা যায় চূড়া, আর একটু পথ বাকি। উঠার পর দেখা যায় না সামনে আরেক চূড়া। বাঁকের জন্যে আগে দেখা যায় নি। ভাবলাম এইটাই শেষ, উঠে দেখি না পথ আরও বাকি। পাহাড় যেন খেলছে প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে। কয়েকজন পানির অভাবে ভুগতে লাগল, শুয়ে গেলো পাহাড়ের ঢালে। মনের মাঝে জিদ চেপে গেলো, পানি ছাড়াই শুরু করলাম উপরে উঠা। একজন বললো ভাই আপনার চোখ তো অনেক হলুদ হয়ে গেছে। কেয়ার করলাম না কিছুই। অবশেষে চূড়ায় উঠেই দমকা বাতাসের স্পর্শ পেলাম। একটূ দূরেই দেখতে পেলাম পাড়ার ঘর গুলো। ভিতরটা সতেজ হয়ে গেলো সাথে সাথেই। পাড়ার নাম অতিরাম পাড়া। এক ঘরের সামনে মাচায় শুয়ে গেলাম, পানি খেলাম পেট ভরে। চুরি করে গাছ থেকে নিয়ে আসা আম খেলাম। কাঁচা আমের স্বাদ নতুন করে পেলাম নতুন পাড়ায় বসে। কিছুটা বিশ্রাম নেবার পর শরীরে শক্তি আসলো। অপেক্ষা করছিলাম সবাই কখন আসবে। অতিরাম পাড়ায় পৌঁছে ছিলাম ৫টায়। বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করে আবার যখন রওনা দিলাম সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমের এক পাহাড়ের আড়ালে।
আর ঘন্টা খানেক পথ, তারপরই পৌঁছে যাবো থুইসা পাড়াতে। ঝিরির গর্ত থেকে আরও কিছু পানি নিয়ে আমি আর সাথে এক সঙ্গী নিয়ে হাঁটছি আনমনে। হঠাৎ সামনে দেখি রাস্তা মাঝে ভয়ংকর সদৃশ এক গয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম গয়ালের সামনা সামনি। বুঝতে পারছিলাম না আমাদের দেখে সে রেগে গেলো নাকি ভয় পেলো। গয়াল কেমন আচরণ করে তার ব্যাপারেও ধারণা নেই। একটু দাড়ালাম, বুঝলাম সে কিছু করবে না। আস্তে ধীরে সে সরে গিয়ে আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিলো। ছোট কিছু আপ আর ডাউন ট্রেইলের সহজ পথ। এই দিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আমার সাথে টর্চ ছিলো না, সাথের সঙ্গীর টর্চ ছিলো বলে রক্ষা। সামনের ওরা চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের দেখা নেই কারও। দুইজন হাঁটছি আধো অন্ধকারে। দুই পথ চলে আসলেই চিন্তা করছি কোন পথ সঠিক। পথে পায়ের ছাপ দেখে নিশ্চিত হতাম ঐ পথই সঠিক। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর অবশেষে এক পাহাড়ের উপরে আলোর দেখা পেয়ে বুঝতে পারলাম আমরা চলে এসেছি থুইসা পাড়ার নিচে। পাড়ায় গিয়েই গোসল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেতে এক মুহুর্ত দেরী করলাম না। খাবারের মেন্যু ছিলো ভাত, ডাল, মিষ্টি কুমড়া আর পাড়া থেকে কেনা এক খাসীর মাংস দিয়ে। প্রতিবারের মতই পেটে একটুও জায়গা খালি না রেখে ভরে নিলাম। ঐসময় মনে হচ্ছিলো কি পরিমাণ ভাত খাচ্ছি আম্মা যদি দেখতো তাহলে সবথেকে খুশি হতো। জীবনে এত খাওয়া কমই খেয়েছি।
উঠোনে আড্ডা জমলো, আমাদের কষ্টের কথা শুনে যারা যায়নি আমাদের সাথে তাদের দুঃখ কিছুটা ঘুচলো। সবাই বলছিলো না গিয়ে তারাই ভালো কাজ করেছে। এই নিয়ে মজা চলছিলো যখন, শুরু হলো গানের আসর। এইদিকে উঠোনের আরেক পাশে গাইড বসে গেলো খাসীর মাংসের বারবিকিউ করতে। একটার পর একটা গান, সবার গলা মিলানো, আর উঠোনে শুয়ে আকাশের হাজার হাজার তারা দেখতে দেখতে মনের উঠোনে খেলা করছিলো অনেক কিছুই। জীবনের অর্থ কী বুঝার মতো কঠিক ব্যাপার গুলোও মাথায় ঘুরছিলো। জীবন সুন্দর কি না জানি না, তবে জীবনকে উপভোগ করতে চাই আমার মতো এমন ভাবনার প্রতি আত্মিবিশ্বাস বাড়ছিলো।
সবাই একসময় ঘুমাতে গেলো। আগের দিনের মত আমার ঘুম আসছিলো না। ঘরের ভিতর গরম লাগছিলো, আবার বাইরে ঠান্ডা পরিবেশ। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকেও ঘুমের দেখা না পেয়ে বাইরে চলে আসলাম। সুনশান নিরবতা, সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। প্রতি পাড়াতেই কুকুর আছে অনেক। আমি হাটছি, কয়েকটা কুকুরের বাচ্চা চলছে পিছু পিছু। হাত মুখ মাথা ভিজিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার আসলাম ঘুমাতে, অনেক্ষণ চেষ্টার পর ঘুমের দেখে পেলাম। সকাল সকাল উঠে যেতে হলো। আজও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আজকের গন্তব্য থুইসা পাড়া থেকে নাফাখুম ঝর্না, তারপর সেখান থেকে রেমাক্রি। অন্য দুই দিনের চেয়ে অনেক সহজ পথ। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম, গরম খিচুড়ি ডিম আর আগের দিনের খাসীর মাংস। স্বাদ যেমনই হোক, খেয়ে নিলাম পেট ভরে। জীবনের সুন্দর দুটো রাত কেটেছে এই পাড়ায়, হয়তো ভবিষ্যতে আবারও কখনো আসবো এই ভেবে সকাল ৯টার কিছু পর সবাইকে বিদায় জানিয়ে বের হলাম পাড়া থেকে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই সামনে পড়লো জিনা পাড়া। আমাদের আগের প্ল্যান অনুযায়ী এই পাড়াতেই থাকার কথা ছিলো। সুন্দর পাড়া, অন্য পাড়া গুলোর তুলনায় বেশি আদিবাসীর বসবাস। পাশ কাঁটিয়ে কিছুদূর আসতেই রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এই সময়ে শুকিয়ে থাকা খালে অল্প বিস্তর পানি গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। বাকি পথ এই খাল ধরেই আগাতে হবে। কোথাও কোথাও একটু বেশি নিচু থাকায় বেশ পানি জমে আছে। চারপাশের প্রকৃতি আর রেমাক্রি খাল মিলেমিশে সুন্দর সব ল্যান্ডস্কেপ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। যখনই কোথাও বিশ্রামের জন্যে থেমেছি, পাশেই থাকা খালের স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ডুবিয়ে বসে থাকার মতো মজার জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করিনি। কাপড় বদলানোর কোন ঝামেলা নেই, কারণ সেই ভেজা কাপড় একটু পরেই রোদ আর শরীরের গরমে শুকিয়ে যায়। থুইসা পাড়া থেকে রেমাক্রি এই পুরো পথে গোসল করেছি ৫ বার!
রেমাক্রি খাল ধরে ট্রেইলটা মজার। এই কখনো মনে হচ্ছে মরুভূমির উপর, কখনো মনে হচ্ছে ছোট ছোট পাথরের দুনিয়ার উপর, কখনো নল খাগড়ার মাঝ দিয়ে কখনো বিশাল বিশাল সব পাথরের ফাঁক গলে, কখনো বা পাহাড়ের কিনারা ঘেষে চিকন পাথুরে দেয়াল দিয়ে। সামনে যতই যাচ্ছিলাম পাথর গুলোর আঁকার ততই বড় হচ্ছিলো। প্রায় ৩ঘন্টা হাঁটার পর দূর থেকেই নাফাখুমের গর্জন শুনতে পেলাম। ঝর্ণার পানি পতনের শব্দের চেয়ে মধুর শব্দ কমই আছে। গিয়ে আর দেরী না করে নেমে গেলাম ঝর্ণার উপরের স্টেপে। সেখান থেকে পানির স্রোতে ভেসে পড়লাম ঝর্ণার পানির সাথে নিচের জলাধারে। পানি কম থাকায় ভালই হয়েছে, যাওয়া যায় ফলের নিচেও। চিৎকার, উল্লাস, উপর থেকে লাফ, ঝর্ণার পানি দিয়ে শরীর ম্যাসেজ সবই হলো। ঘন্টাখানেক কাটালাম পানিতেই। এবার উঠে আবার পথ ধরতে হবে, সন্ধ্যার আগেই রেমাক্রি পৌছাতে হবে। যদিও এই ঝর্ণা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না।
আবার শুরু হলো খালের পাশ দিয়ে হাঁটা। পুরো পথেই বেশ কয়েকবার খালের এইপাশ ঐপাশ যেতে হয়। একটু পর পরই উঁচু পাথরের খাঁজের ভাঁজ থেকে নিচে পানি পতনের কলকল শব্দ আর পাহাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকাদের অবিরাম গেয়ে চলা গান, অচেনা পাখিদের ডাকাডাকি, সেই সাথে মোবাইলে বাজছিলো প্রিয় কিছু গান। ঐ মুহুর্তের অনুভূতি গুলো ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর এক পাড়ায় এসে নাস্তা করে নিলাম। এই দুইদিনে পাড়া কিংবা পথে সব জায়গাতেই ঝিরির ময়লা পানি খেয়েছি। পাড়ার পানি গুলো কিছুটা পরিস্কার থাকলেও, রাস্তায় যে সব ছোট গর্তের পানি খেয়েছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দুনিয়ার যেখানেই যাই, যে কোন পানি খেতে আর সমস্যা হবে না। ছেঁকে কিছুটা পরিস্কার করবো সেই উপায় বা সময় ছিলো না। বোতলে ভরেছি, বোতলের মুখে গামছা রেখে পানি চুষে খেয়েছি। সহজ সিস্টেম। এই পাড়ায় এসে প্রথম কোন দোকান পেলাম, এইদিকে টুরিস্টদের আনাগোনা বেশি থাকে বলেই দোকান নিয়ে বসে আছে আদিবাসীদের পরিবার। অন্য কোন পানীয় এর স্বাদ এবার জন্যে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ অরেঞ্জ খেলাম ৩৫টাকা দিয়ে। দামই বলে দিচ্ছে, কতটুকু দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ ৩৫টা হয়ে যায়। দুপুরের খাওয়া সারা হলো সিদ্ধ ডিম আর পাহাড়ি কলা দিয়েই।
আরও ৩০ মিনিটের পথ বাকি রেমাক্রি যেতে। উঠে গেলাম সবাই। পথ আগের মতই সুন্দর। পথের পাশে কিছু পাড়া চোখে পরে, মানুষজনও দেখা যায় কিছু এইদিকে। এই রেমাক্রি খাল মিশেছে সাঙ্গু নদীর সাথে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই রেমাক্রি পাড়া/বাজার। থাকা খাওয়া সবচেয়ে আধুনিকতার ছাপ চোখে পড়ে। থাকার জন্যে কাঠ বাঁশ দিয়ে তৈরি দুইতলা কটেজ আছে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই ৪রুমের ‘মেলোডি গেস্ট হাউজ’ নামের’ একটা কটেজ নেওয়া হলো আমাদের জন্যে। ছোট ছোট রুম, লম্বালম্বি করে ফ্ল্রোরে থাকার জন্যে আছে যাবতীয় সবকিছু। চারপাশে গাছপালা, সামনেই পাহাড়ের সারি, শুকিয়ে যাওয়া সাঙ্গু ছোট খালের মতো বয়ে চলছে।
সবকিছু কটেজে রেখেই চলে গেলাম গোসল করতে। হাটু পানি বা তারচেয়েও কম সাঙ্গুতে। কুসুম গরম পানির স্রোতে ডুবে থাকলাম অনেক্ষণ, বসে শুয়ে কাঁত হয়ে নানা ভঙ্গিমায় চললো নানান রকমে খেলা। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও উঠতে মন চাইছিলো না। পেটের কথা চিন্তা করে উঠে গেলাম। কাপড় বদলিয়ে কটেজে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন রাতের খাওয়ার জন্যে ডাক আসবে। শরীর ভালো লাগছিলো না, সাধারণত ঘুরতে গেলেই সবসময় আমার মাথা ব্যথা থাকে। গত দুইদিন মাথা ব্যাথার দেখা পাইনি, আজ শুরু হলো। প্রথমদিনই একজন কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার ব্যাকপ্যাক আমার কাঁধে নিয়েই এক পাহাড়ে নামতে গিয়ে ঘাড়ের এক পেশিতে টান খেয়েছিলাম। আজ আবার সেই ব্যথা বেড়েছে। এইদিকে বাসায় বলে এসেছি দুইদিন নেটওয়ার্কের ভিতর থাকব না। আমি জানতাম রেমাক্রিতে টেলিটকে্র নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। কিন্তু এসে দেখি কোন নেটওয়ার্কই নেই। কাল থানচিতে যাবার আগে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই। বাসার কথা ভেবে অস্থির লাগছিল। সেই ব্যথা, মাথা ব্যাথা, বাসার কথা আর নিজের কিছু কারণে অস্থির লাগছিলো। ব্যথার ওষুধ খেয়ে রুমে অন্ধকারে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। সবাই মজা করছে, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি নিজের কাছেই ভালো লাগছিলো না। আমার এই অস্থির ভাব দূর করার জন্যেই হয়তো, হঠাৎ আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। পাহাড়ে ঝরের রাত, এমন একটা রাতের স্বপ্ন আমার অনেক আগে থেকেই ছিলো। সেই স্বপ্ন টা পূরণ করতেই বুঝি ঝড় শুরু হয়ে গেলো। বারান্দায় বসে থাকলাম পুরোটা সময়, বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে উড়ে এসে গায়ে পড়ছিলো। বিদ্যুতচমকের আলোতে সামনের সামনের পাহাড় গুলো দেখা যাচ্ছিলো, কোন দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের ভাজে ভাজে আলোর রেখা খুব বেশি স্পষ্ট ছিলো। ঘণ্টাখানেক সময়ের এই ঝড় সব অস্থিরতা দূর করে দিলো। জীবনের সুন্দর আরেকটা রাত পাহাড়ে কাটছে আমার। রাত বাড়ছে, একে একে সবাই শুয়ে যাচ্ছে। এক রুমে কার্ড খেলা পাগলের খেলা জমে উঠেছে। একসময় আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। খেলা থেকে উঠলাম রাত ২টার পরে। ঘুমাতে যেতে যেতে ৩টা বাজলো। গত দুই দিনের একদিনও ভোর দেখিনি। কোন ট্যুরেই এমন হয় না আমার। আজ শেষ দিন, যে করেই হোক ভোর দেখবো। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
ঘুম ভাঙলো হাদী ভাইয়ের ডাক শুনে, ভাইকে আগেই বলে রেখেছিলাম ভোর দেখব বলে। বের হয়ে গেলাম কটেজ থেকে, স্নিগ্ধ ভোর। চারপাশেই পাহাড়ে জমাট মেঘ। এই তিন দিনে এই প্রথম কাছে মেঘের দেখা পেলাম। এই সময়ে ভোর ছাড়া বাকি সময়ে মেঘের দেখা পাওয়া যায় না এই দিকে। হাটতে হাঁটতে পাশেই বিজিবি ক্যাম্পের হেলিপ্যাডের চুড়ায় উঠে দেখলাম অন্যরকম এক রেমাক্রিকে। বেশ কিছু সময় কাটালাম সঙ্গে আরও কয়েকজন নিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় থেকে সূর্যের দেখা যাওয়ার পর চলে আসলাম কটেজে। একে একে সবাই উঠলো। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম কটেজের মালিকের ঘরে ডিম আলু ভর্তা ডাল আর ভাত দিয়ে। এইখানের রান্নাও তুলনামূলক অনেক ভালো অন্য পাড়ার চেয়ে।
খেয়ে ব্যাগ ঘুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম ফিরে যাবার পথ ধরার জন্যে। রেমাক্রি ঘাটে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে নৌকা। ফেরার পথে বড়পাথর, তিন্দু দেখে যাবো থানচিতে। থানচি থেকে দুপুর ২টায় শেষ বাস যায় বান্দরবানে। ২টার আগেই থাকতে হবে থানচি। ৯টার দিকে একে একে বের হয়ে গেলাম রেমাক্রিকে বিদায় জানিয়ে। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর নৌপথ সাঙ্গু বা শঙ্খ নদীর এই থানচি-রেমাক্রি পথটুকু। অন্তত শুধু এই নৌপথের সৌন্দর্য দেখার জন্যে বার বার এই পথে আসা যায়। ফিরে আসার পথে ভাবছিলাম খুব শিগ্রই আবার দেখা হবে এই পথের সাথে, হয়তো তখন সাঙ্গু থাকবে ভরা যৌবনে।
বড় পাথর/রাজা পাথর জায়গাটুকু একটু বেশিই সুন্দর। বিশাল বিশাল সাইজের পাথর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সাঙ্গুর উপরে। এই পাথর গুলোর পাশ কেটেই আস্তে ধীরে চলছে নৌকা। পাথর গুলোর পাশে নিজেকে বেশ ছোটই মনে হচ্ছিলো। প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট এই মনোমুগ্ধকর নৌভ্রমণ শেষে থানচি ঘাঁটে চলে আসি। এইখানেই দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে বান্দরবানের উদ্দ্যেশে রওনা দিবো।
বাসের টিকেট কাটতে গিয়ে জানা গেলো বান্দরবান যেতে হবে বাস রিসার্ভ করে যেতে হবে। যে টাকা চায়, তারচেয়ে চান্দের গাড়ি করেই যাওয়া যায়। টিম লিডার জানালো বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়ি রওনা দিয়েছে, এইখানে এসে আমাদের নিয়ে যাবে। দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ করার পর ঠান্ডা বাতাসের খোঁজে সামনে এগুলাম। থানচি নতুন ব্রিজের নিচে গিয়ে দেখি বড় বাঁশের মাচা। উপরে ব্রিজ, ব্রিজের পিলার ঘেঁষে মাচা, সাথেই নিচে বয়ে চলছে সাঙ্গু। অনেক বাতাস আর ছায়া পেয়ে চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করলো। ব্যাগটা মাথার নিচে রেখে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম এই খোলা পরিবেশে টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙল আমাদের আরেক সহযাত্রীর ডাকে। গিয়ে দেখি গাড়ি চলে এসেছে। ঘুম ঘুম চোখেই গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। পিছনে কত স্মৃতি ফেলে চলছি। জানি আবার দেখা হবে, নিশ্চয়ই হবে। সবাই বলে পাহাড় খুব খারাপ জিনিস, একবার ভালোবেসে ফেললে, তা থেকে দূরে থাকা যায় না বেশিদিন।
——————————————————————————–
লেখা এবং ছবি — সোহান…
পুরো ভ্রমণের ছবি পাওয়া যাবে এই খানে https://goo.gl/UAQueH ]
Categories
Uncategorized

সৌন্দর্যের রানী – অমিয়াকুম…

জায়গাটার নাম “অমিয়াকুম”…

সেই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার জন্যই এবারে আমরা আবার ছুটে গিয়েছিলাম মেঘ-কুয়াশার দেখে…

অমিয়াকুম যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় থানচি থেকে রেমাক্রী পর্যন্ত পাথুরে সাঙ্গু নদী, বান্দরবানের সবচাইতে এডভেঞ্চারাস এই বর্ণালী সাঙ্গু নদীর প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে রুপের ঝলক – এখানে বালির মিছিল তো ওখানে পাথরের হাউকাউ, একটু দূরে জলের কল্লোল তো মোড় পেরুলেই মাছের লাফ-ঝাঁপ। দুপাশের পাহাড়ের আলিঙ্গন থেকে ঝুঁকে ঝুঁকে কাঁচের মতন স্বচ্ছ পানিতে সারাটাদিন ধরে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের চেহারা দেখে সবুজ গাছের স্থবির দল। এই নদীর তলদেশে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা পাথর কণা হার মানিয়ে দেয় মুক্তো দানাকেও। এলোমেলো পানিরা সারাটাদিন ধরে আড্ডা দেয় পাথরের সাথে। এখানে নিশিদিন জমে জল-পাথরের আড্ডা।

সাঙ্গু নদীতে এলেই আমরা নৌকা ভাড়া নিয়ে ব্যাগগুলো উপরে তার তুলে দিয়ে নিজেরা হেঁটে বেড়াই, এক হাঁটুরও কম এই নদীতে প্রতিমুহূর্তেই নৌকার তলা আটকে যায়, তখন চলে নৌকা ঠেলা, সে কি ঠেলা ! রীতিমতন পানিতে শুয়ে পড়ে নৌকা ঠেলা! যে এখনো সাঙ্গুতে যায়নি সে বুঝবেনা নদীতে শুয়ে পড়তে কত্ত মজা। আমাদের নৌকা একেকবার পাথরে আটকে যায় আর আমরা ইচ্ছে করেই নৌকার দুই পাশ থেকে টুপ টুপ করে পানিতে পড়ে যাই।

এই পথেই পড়ে তিন্দু, আর রাজা পাথরের এলাকা। তিন্দুর ব্যাপারে একটা কথা আমি সবসময়ই বলি – “বান্দরবান যদি বাংলাদেশের স্বর্গ হয় তাহলে তিন্দু সেই স্বর্গের রাজধানী”। তিন্দুর সকালটা দুনিয়ার আর সব জায়গার সকালের থেকে আলাদা। তিন্দুর পরের জায়গাটাই হলো রাজা পাথর এলাকা। প্রকৃতি কি পরিমাণ সুন্দর হতে পারে তা এখানে না এলে বোঝা যায় না, দৈত্যাকার সব পাথরের ভীড়ে হটাত করেই সাঙ্গু নদী হারিয়ে গেছে, এপাথরে বাড়ি খেয়ে ও পাথরে ধাক্কা খেয়ে নৌকার তলা ঘসতে ঘসতে পার হয়ে গেলাম স্থানীয়দের পূজনীয় ভয়ঙ্কর পাথরের এই রাজ্য। বর্ষাকালে এখানে প্রতিদিন এক্সিডেন্ট হয়। এরপরের রাস্তাটুকুতে বিস্ময়েরা ডালপালা নিয়ে জন্ম নেয়, রাজা পাথরের পরের অংশটুকুর নদীর তলদেশ থেকে হারিয়ে গেছে নুড়ি পাথর, সেখানে এখন নিরেট একটা বেসিন, এক খন্ড সমতল পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে সাঙ্গু, কোথাও কোনো ফাঁকা নেই! মনে হচ্ছে যেনো কেউ ঢালাই করে দিয়েছে নদীর তলা! সারাটা রাস্তায় নৌকা ঠেলতে ঠেলতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমরা শেষ বিকেলের আলোয় পৌঁছলাম রুপকুমারী রেমাক্রী খালের মুখে। এখানেই রাতে থাকতে হবে আমাদের, পরদিন এই খাল দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে জাবো নাফাকুম হয়ে জিনা পাড়ায়, সে আরেক বিস্ময়কর যায়গা…

রেমাক্রী রেস্টহাউজটা একেবারে খালের মুখে বানানো, প্রায় কয়েকশ ফুট সিড়ি ভেঙ্গে জেতে হয় সেখানে। সুকঠিন পাহাড়ের উপরে বানানো টলটলে এই বাড়ীসারারাত ধরে বাতাসের ধাক্কায় থরথর করে কেঁপেছে, আমি আর আলো ভাই রাত ১২টায় জাল নিয়ে চলে গেলাম সাঙ্গুতে-মাছ ধরবো। ২ ঘন্টা পরে গোটা বিশেক মাছ নিয়ে আমাদের সে কি উল্লাস। কেউ রান্না করতে জানিনা, অথচ মাছ রান্না হয়ে গেলো! হুড়মুড়িয়ে সে মাছ গলাঃধরণ করেই দোলনা ঘরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে আমাদের হাটাপথ শুরু, এখান থেকে আর কোনো যানবাহন নেই, দুই পা-ই একমাত্র সম্বল। টানা দেড় ঘন্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম নাফাকুমে, এই মৌসুমে নাফাকুমের আশপাশ অনেক শুকনো আর পানি অনেক কম। মনে পড়ে গেলো গতবার ভরা বর্ষায় যখন এসেছিলাম তখন এই নাফাকুমেই আমাদের সঙ্গীসাথীরা পা পিছলে টুপ্টাপ করে সারা রাস্তা জুড়ে ঝরে পড়েছিলো। পড়ে যাওয়ার সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি, ফলাফল আমার ৩টা দাঁত ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো হয়ে গেলো। সেই পিচ্ছিল ভয়ংকর নাফাকুমের তেমন কোনো আলামতই এবারে  পেলাম না, অনেক শুকনো আর নিরিবিলি যায়গা। অনেকেই বলে নাফাকুম হলো বাংলার নায়েগ্রা, কিন্তু আমার কাছে নাফাকুম কখনোই এতো সুন্দর লাগেনি। বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর ঝরণা যদি বলতেই হয় তাহলে সেটা জাদিপাই ঝরণা।

নাফাকুম পার হওয়ার পরই দৃশ্যপট বদলে গেলো, চলার পথা এখানে অমসৃণ। রাস্তা জুড়ে বিরাট বিড়াত “কুম”। স্থানীয়দের ভাসায় “কুম” মানে হলো ‘গর্ত’, সে কি আর জেনো তেনো গর্ত! একটাতে পা পড়লেই আর দিনের আলো দেখতে হবেনা, তাই হাঁটার সময় সাবধান হয়ে গেলাম আমরা, এগাছের ডাল তো ও গাছের শেকড় ধরে ধরে ভীত মনে এগিয়ে চলা, একের পর এক বিরাট বিরাট দিঘী মাথা খারাপ করে দিচ্ছে আমাদের, একটা যায়গা এত সুন্দ হয় কিভাবে ! আরমান আর আহসানকে আর ধরে রাখা গেলো না, পোটলাপুটলি ফেলে ঝুপ করে লাফ দিলো সবুজ হ্রদে, তাদের দেখাদেখি বাকি সবাই, এরপর শরীরের আধা অংশ পানিতে আর আধা অংশ বালিতে রেখে জীবনের সবচাইতে আরামের ২ ঘন্টার ঘুম দিলাম অচেনা সবুজের রাজ্যে। চোখ ধাঁধানো এই সবুজের কাছে আকাশের গাড় নীলও লজ্জা পেয়ে পাতার আড়ালে মুখ লুকায়। এরপর আবার পা গাড়ি চালিয়ে বিকেলের মধ্যেই জিনাপাড়ায় পৌঁছে গেলাম।

বান্দরবানে এই পর্যন্ত আমি যতগুলো পাড়া দেখলাম তাদের মধ্যে সবচাইতে ফলের গাছ বেশী দেখলাম এখানে, আম, পেঁপে, তেতুল, লেবু, কাঁঠাল আনারস থেকে শুরু করে সব মৌসুমি ফসলের মেলা বসেছে এই গ্রামে। এই গ্রামের মানুষ এখনো আদিম, সহজ সরল এই মানুষগুলো এখনো ট্যুরিস্ট দেখলে হা করে তাকিয়ে থাকে, কিছু খেতে চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই কোথা থেকে জেনো পাকা পেঁপে পেড়ে নিয়ে আসে। চরম আতিথেয়তার মিছিলে যোগ দেয় এলাকার গৃহপালিত পশুগুলোও! আমরা ঘুমিয়েছিলাম টং ঘরে, টং ঘর হলো এমন একটা ঘর যেটা মাটিতে থেকে ৩/৪ ফুট উঁচুতে বানানো হয় আর এর একমাত্র উপরের চালটা ছাড়া আর কোনো দেয়াল থাকেনা। মে মাসের প্রচন্ড গরমের রাতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কম্বল মুড়িয়ে ঘুমানোর কি যে আরাম তা কারে বুঝাই! তার উপরে মাঝ রাতে যখন চোখ মেলেই দেখি আকাশে আধখানা চাঁদ তার ঘোলাটে হলদে আলো দিয়ে আমাদের দেখার প্রাণপণ চেস্টা করছে তখন মনে হয় আসলেই লাইফ ইস বিউটিফুল! সেই রাতের কথা আমি আজীবন মনে রাখবো, বিছানার নিচে কুকুর, ছাগল, মুরগী গরু আর শুকরের মিশ্রিত ডাক, আর উপরে মাথার উপরে অবাক চাদের মৌন হাতছানি, অস্থির! জিনা পাড়ায় একটাই সমস্যা – এখানে কোনো টয়লেট নাই। পরদিন সকালে আকাশ অন্ধকার, আমরা রওয়ানা দিচ্ছি দেখেই জিনাপাড়ার হেডম্যান ছুটে আসলেন, তিনি আমাদেরকে জেতে দিবেন না, বৃষ্টি নামলে আমরা নাকি আমিয়াকুমের পাহাড়ে বেঘোরে মারা পড়বো, কে শুনে কার কথা! তাকে অনেক কস্টে বুঝালাম আমরা ভারতের বারো হাজার ফুট উঁচু পাহাড় সান্দাকফু ফেরত, এইখানে এক দেড় হাজার পাহাড়ে আমাদের সমস্যা হবে না। তারপর বেচারার বিষণ্ণ দৃষ্টিকে পেছনে ফেলেই পা চালালাম বান্দরবানের সৌন্দর্যের রানী আমিয়াকুম দেখার উদ্দেশ্যে…

পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙ্গিয়ে প্রত্যেকের কলিজা তখন ছোটখাটো সাহারা মরুভূমি, এমন সময় পুরো পাহাড় জুড়ে নজরে পড়লো টমেটোর মতন এক ধরনের ফল, লম্বা লম্বা গাছে ঝুলে থাকা এই ফল্কে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে “আমের ভাই টাম”, গাইড বলল জিনিসটা খাওয়া যাবে, ভেতরে অনেক পানি আছে, আর যায় কই! একেকজন ২০/২৫টা করে টসটসে পাকা রসালো টাম খেয়ে ফেললাম, অই অবস্থায় মনে হলো এর চাইতে সুস্বাদু খাবার দুনিয়াতে আর নাই। জিনাপাড়া থেকে অমিয়াকুম যাওয়ার পথে কয়েকটা উঁচু উঁচু পাহাড় ডিঙ্গাতে হয়, এর মধ্যে একটা রাস্তা আবার ঝিড়ি পথের মধ্য দিয়ে, বৃষ্টি হলে এটা হয়ে যায় পানির রাজ্য, পুরোটা জুড়ে হাটু সমান ঘন জঙ্গল। আহসান সবার আগে আগে হাঁটছে, আমি তার পেছনে হটাত করেই সে থমকে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো, পরের চিৎকারটা আমার। চোখের সামনে বিশাল লম্বা ধবধবে সাদা একটা দুধরাজ সাপ কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে ছিলো, আমাদের আওয়াজ পেয়ে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলো আরো গভীরে। এরপর আমরা বুঝলাম যে এই যাত্রা ছেলেখেলা নয়, আমরা জংলী প্রাণীদের রাজ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছি। এই ধারণা মিনিট পাচেক পরেই আরো পোক্ত করলো শিপন ভাইয়ের চিৎকার, অপু ভাই ততক্ষণে পেছন ফিরে দৌড় দিয়েছে। ঘটনা বুঝার জন্য সামনে এগিয়ে দেখি বিশাল বিশাল ৬ টা পাহাড়ি গয়াল আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরকে ভদ্রভাবে রাস্তা থেকে সরানো আরেক ধৈর্যের কাজ। কিছুটা দুরেই একটা পাখির বাচ্চা নিচে পড়ে লতায় পেঁচিয়ে চেঁচাচ্ছে, আর তার অসহায় মা মাথার উপরে উড়ে বেড়াচ্ছে, আরমান আর আমি গিয়ে মুক্ত করলাম তাকে চেড়ে দিলাম স্বাধীন রাজ্যে।

পরের রাস্তাটুকু আতঙ্কের, জিনাপাড়ার হেডম্যান ক্যান আমাদের আস্তে দিতে চাননি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। জীবনে কখনো এতো খাড়া পাহাড়ী রাস্তা ধরে নামিনি, পুরা ৮৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে নামতে হচ্ছে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড়! রাস্তা এখানে শুধু খাড়া নয়, খাড়া খাড়া খাড়া। নইচ্চেন তো মইচ্চেন অবস্থা। ভাগ্যকে বার বার দোষারোপ দিলাম সঙ্গে করে রশি আনিনি বলে। টানা ৪০ মিনিট থরে থরে পা নিয়ে পুরো খাড়া পাহাড় যখন নেমে ঢুক্লাম ঘন জঙ্গলের রাজ্যে। এখানে আমাদের হাসিমুখে স্বাগত জানালো জংলী মশা। স্নায়ুর উপর দিয়ে প্রচন্ড চাপ ফেলা এই ভয়াল রাস্তা পেরিয়ে আসা বিধ্বস্ত কাউকেই মুখ ফুটে বলতে হলোনা যে এই আধা ইঞ্চির রঙ্গীন মশাগুলো ম্যালেরিয়ার ঘরবাড়ি, সুতরাং পা চালানো বন্ধ করার উপায় নাই, আরো ২০ মিনিট হাঁটার পরে হটাত করেই চারপাশ থেকে উধাও হয়ে গেলো সবুজের পাঠশালা, সে জায়গায় চোখের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পরলো স্তব্ধ বিস্ময়। খানিকক্ষণ বেকুবের মতন সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম, এ কোথায় এলাম !!! পেছন থেকে আহসান ভাই তাগাদা দিচ্ছে সামনে বাড়ার জন্য, আমার পাশে দাঁড়িয়ে সেও স্তম্ভিত।

আমাদের সামনে আকাশ ছোঁয়া গোল গোল পাথরের দেয়াল, তার মধ্যে দিয়ে ঝরঝর করে বয়ে চলছে সবুজ পানির কোলাহল। এখানে ওখানে জমে সেই পানি রুপ নিয়েছে একেকটা লেগুনে, স্বচ্ছ সে লেগুনের বুকে অলসভাবে সাঁতরে বেড়াচ্ছে বিশাল বিশাল সব মাছেরদের দল, কারো কোনো তাড়া নেই, কোথাও যাওয়ার তাগিদ নেই। এমন একটা যায়গা পেলে আমিও মনে হয়ে সারাক্ষণ ওখানেই ঘুরঘুর করতাম। কিন্তু ততক্ষণে আমাদের গাইড তাগাদা দিলো, এসব নাকি কিছুই না, বামে অমিয়াকুম আর ডানে সাতভাইকুম। সেখানে গেলে আমরা নাকি মাথা ঘুরে পড়ে যাবো এমন সুন্দর! বলে কি ! মাথাটা ভালোমতন বেঁধে সবাই মিলে ছুট লাগালাম জল-পাথরের আড্ডা ছেড়ে জলের পাঠশালায়, দুপাশের সোজা উঠে যাওয়া পাহাড় তখন একের পর এক তার রঙের ডালি বিছিয়ে দিচ্ছে আমাদের জন্য, এখানে আলোর মিছিল তো একটু সামনেই গাছপালায় ঘেরা ঘন অন্ধকার, এ পাথরের উপরে দিয়ে ও পাথরের তলা দিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন তীব্র ঘামের মধ্যেও মেরুদন্ড বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল পানির ধারার অস্তিত্ব টের পেতে ভুললাম না, অবাক চোখের সামনে নিজেকে খোলামেলা করে মেলে ধরেছে বান্দরবানের সবচাইতে সুন্দর এই জায়গাটা। ভর দুপুরের আলোয় অদ্ভুত রহস্যলাগা সৌন্দর্য নিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে অনাদিকাল ধরে রুপধরে রাখা পাহাড়ি ঝর্না “অমিয়াকুম”…

রুপসী বান্দরবানের গহীন অরণ্যে যেখানে সৌন্দর্যরা মাথা খুটে মরে, সেখানের আরেকটা বিস্ময় এই অমিয়াকুম। প্রায় হাজার ফুট খাড়া দুই পাহাড়ের কোলে স্কুল পালানো দুষ্ট বালকের মতন এঁকেবেঁকে এলাকা রাঙ্গিয়ে দেয়া এই পানির ধারা ছুটে চলেছে সিঁড়ির পর সিড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে। স্তব্ধ পাথরের নিস্তব্ধতা গুঁড়িয়ে ঝরঝর শব্দে এখানে সারাদিন চলে ঝরনার রিনিঝিনি গান, এখানে পাথরের তলে বসত গড়েছে কোনোদিন মানুষ না দেখা নির্ভীক মাছের মিছিল, এখানে নীলচে সাদা পানিতে সাঁতরে বেড়ায় সবুজ রঙা সাপের ঝাঁক, এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নির্ভীক পাথরের শক্ত সৈনিক, এটা তাদের এলাকা, আমরা শুধু একদিনের মেহমান। যেই আসে তাকেই উজাড় করে দেখিয়ে দেয় নিজের না দেখা সৌন্দর্যটুকু। অমিয়াকুমকে প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়েছে, তার সাজার জন্য আয়না লাগেনা – সে নিজেই নিজের আয়না…

এমন পানিতে ঝাঁপ না দেওয়াটা গুরুতর অন্যায়, আমি তোড়জোড় শুরুর করার আগেই দেখি সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাতার না জানা অপু ভাই, গায়ে তার লাইফ জ্যাকেট! কয়েকশ কেজি ওজনের পানির চাপ অগ্রাহ্য করে চলে গেলাম এক্কেবারে ঝরণার গোড়ায়। বর্ষায় এখানে দুকুল ছাপিয়ে হাজারটা বজ্রের শব্দে পানি আছড়ে পরে দুপাশের “কুম” ভরা পাথরে, ভয়ংকর সুন্দর মনে হয় একেই বলে। অমিয়াকুমের দুই পাশের পাহাড়ের গঠনশৈলী পুরাই অন্যরকম। কেমন করে যেন এই দুই পাশে সিঁড়ির পরে সিঁড়ি জমেছে, সেগুলোর ধাপ আবার এতো বড় যে একেকটা ধাপে তাঁবু টাঙ্গিয়ে আরাম করে ঘুমানো যাবে। বাংলাদেশের আর কোনো ঝর্নায় আমি এমন মনোমুগ্ধকর গঠনশৈলী দেখিনি। আমিয়াকুম অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখার জিনিস, অমিয়াকুম তীব্র ভালোলাগায় বুকে ব্যাথা ধরিয়ে দেওয়ার জিনিস।

ভেবেছিলাম এবারের মতন ভালোলাগার বুঝি সমাপ্তি হলো, কিন্তু সে ধারণাটা ভেঙ্গে দিলো সাতভাইকুম নামক জায়গাটা। অমিয়াকুম থেকে একটু উপরের দিকে বাশের ভেলায় চড়ে যেতে হয় সাতভাইকুমে। মাত্র ১০ মিনিটের এই পানির রাস্তার কাছে নস্যি দুনিয়ার সপ্তম আশ্চর্যও! দুই পাশের পাহাড় ঘেরা অতল জলের শীতল পানিতে সামান্য কয়েকটা বাঁশের ভেলায় জীবনের সবচাইতে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেলো এবারে। ওজন সইতে না পেরে টুপ করে ডুবে গেলো আরমান আর শিপন ভাইদের ভেলা, সেটা দেখে সাতার না জানা আলো ভাইয়ের চেহারা হলো দেখার মতন, তারপরও আমাদের মতন আনাড়ী ড্রাইভারের হাতে নিজের জীবন জেভাবে ছেড়ে দিয়েছিলেন আলো ভাই, তাঁর সে সাহসিকতার প্রসংশা না করলে অন্যায় হবে।  বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর ১০ মিনিটের পানিপথ পেরিয়ে যখন আমরা একটা পাথরের দুর্গে ঢুকলাম ততক্ষণে নিজেদের প্রথমবারের মতন বোবা মনে হলো, টানা ৩ মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না, চোখের সামনে যেন পাথরের সভা বসেছে, একটা পাথরও ছোট না, ৪০,৫০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু পাথরও বিজ্ঞের ন্যায় বসে আছে ঠান্ডা পানিতে কোমড় ডুবিয়ে। আমার জীবনে এতবড় পাথর আমি কখনো দেখি নাই। পুরো বান্দরবান যেনো এখানে একসাথে ধরা দিয়েছে, এখানে তিন্দুর মতন বড়বড় পাথরও আছে, আছে অমিয়াকুমের মতন সিঁড়ি সিঁড়ি ঝর্না, আছে বগা লেকের মতন স্বচ্ছ পানির হ্রদও। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি খুব যত্ন করে সাজিয়েছে এই অসাধারণ জায়গাটাকে…

ফিরতে ফিরতে বার বার মনে হচ্ছে এখানে তাঁবু নিয়ে আরেকবার আসতে হবে, এই সবুজ পানির কালো মাছদের সাথে কাটাতে হবে একটা রাত, নাহলে জীবনে আর থাকলো কি ! সামনে তখন সেই হাজার ফুট খাড়া পাহাড়, উঠতে হবে যান বাজী রেখে। বেচে থাকলে আবার দেখা হবে…

 

Amiyakhum 8
অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক – অমিয়াকুম…
Amiyakhum 9
এ এক অনন্ত বিস্ময়, যেখানে মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যায় মুগ্ধচোখের পাঠশালায়…
Amiyakhum er mach
অমিয়াকুমে পাহাড়ী জেলেদের ধরা পাহাড়ী মাছ…
Amiyakhum Jhornar niche
জলের বজ্রপাতের নিচে সামান্য এক মানবের আত্মাহুতি…
Amiyakhumer bishalota
অমিয়াকুমের একেকটা পাথর যেন একেটা বিছানা, সেখানে আরাম করে ঘুমানো শুধুমাত্র ক্লান্ত-শ্রান্ত-মুগ্ধ পথিকেরই মানায়…
Amiyakhumer panite satar
জলের স্রোতের মাঝে চলছে সাঁতারের আহ্বান…
Amiyakhumer shiri
বিশাল পাথরের রাজ্যে একাকী বিলাস…
Amiyakhumer subishal pathure shiri
বিছানাও মাঝে মাঝে হয়ে উঠে রাজকীয় আসন…
Naphakhum
অমিয়াকুম যাওয়ার পথে নাফাকুমের বিক্ষুব্ধ জলরাশির সহপতন…
Shatvai khum jawar rasta
দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সাতভাইকুম যাওয়ার রাস্তা…
Shatvai khum
নাইখ্যং এর বিলাসী এবং আয়েশি পাথর…
Shatvaikhum jawar rasta
বান্দরবানের সবচাইতে রহস্যময় জলপথ, যেপথে আছে শুধু বিস্ময়ের হাতছানি…
Shatvaikhum jawar vela
ভেলায় চড়ে পাথরের মেলা দেখতে যেতে হয় এখানে…