Categories
রাকিব কিশোর

অভিযান শুরু হলো সুড়ঙ্গের পথে

সরু পাহাড়ের পথ ধরে কোনমতে এগুনো ছবি: তৌহিদুল হক

খালটা পেরোলেই চোখে পড়ে বড় একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ’। এবার সেখানে নিজেদের ইতিহাস লিখতে ঢুকে পড়লাম আমরা নয়জন…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

প্রকৃতির বড় রহস্যের আধার হলো পাহাড়। এর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চের গন্ধ, একটা পাহাড়ের এপাশ-ওপাশ সম্পূর্ণ আলাদা—এপাশে এলোমেলো অবাধ্য মাটি তো ওপাশে থই থই জলের তরঙ্গ, এপাশে কলাগাছের মিছিল তো ওপাশে বাঁশঝাড়ের পাঠশালা। ক্ষণে ক্ষণে বদলায় পাহাড়ের আকাশ, এখানে ব্রেকফেল করা মেঘগুলো সজোরে ধাক্কা খেয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দেয় সবুজ কার্পেট। এখানে রংধনু এসে ঝাঁপ দেয় নীলের শূন্যে। এবার বান্দরবানে আমাদের আসার সংবাদ শুনে সেই রাতে আলীকদম প্রেসক্লাবের সভাপতি মমতাজউদ্দিন ভাই ছুটে এলেন, তিনি আলীকদমের পাহাড় নিয়ে একটা বই-ই লিখে ফেলেছেন—পরামর্শ দিলেন আলীকদমের ‘আলী’র সুড়ঙ্গটা দেখে আসতে। ওই সুড়ঙ্গের নাকি তিনটা অংশ—একটাতে বাস করে দম বন্ধ হয়ে আসার আতঙ্ক, একটা রয়েছে বাদুড়ের দখলে, আর আরেকটাতে নাকি নিজের রাজত্ব কায়েম করে বসে আছে নিকষ কালো অন্ধকার! সেখানে যেতে হলে সঙ্গে করে আলো নিয়ে যেতে হয়। কেননা, কখনোই নাকি সূর্যের আলো সেখানে ঢোকার অনুমতি পায়নি। রোমাঞ্চের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের চোখগুলোতে দপ করে আলো জ্বলে উঠল, যেন এই আলোতেই দূর করব সুড়ঙ্গের ভেতরের সব অন্ধকার।

আলীর সুড়ঙ্গে যাওয়ার পথে ঠান্ডা ঝিরঝিরে এক পানির ধারা পেরোতে হয়। এই খালের নাম ‘টোয়াইন খাল’। হাঁটুপানির এই খালের ধারা মিশেছে মাতামুহুরী নদীর মূল স্রোতে। খালটা পেরোলেই চোখে পড়ে বড় একটা সাইনবোর্ডে লেখা ‘ঐতিহাসিক আলীর সুড়ঙ্গ’। এবার সেখানে নিজেদের ইতিহাস লিখতে ঢুকে পড়লাম আমরা নয়জন।

পাহাড়ের মাঝ বরাবর উঠে গেলাম। এখানে জুতা রেখে আলীর সুড়ঙ্গের দিকে যেতে হয়। শুরুতেই পড়ল বহুদিনের জল-কুয়াশায় ভেজা বাঁশের একটা সাঁকো। সেটা পার হতেই মনে হলো দুপাশের পাহাড়ের দেয়ালগুলো হেঁটে হেঁটে অনেকটা গায়ের দিকে চলে আসছে। পাহাড়ের দেয়াল থেকে টপটপ করে মাথার তালুতে পড়ছে হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে আসা পানির ফোঁটা। সে ফোঁটা জমে জমে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে একমাত্র পায়ে চলা পথটি। কোনোমতে ভারসাম্য বজায় রেখে এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সামনে তাকিয়ে দেখি আর কোনো রাস্তা নেই। এখন এগোতে হলে কোমর পানিতে নেমে অচেনা জায়গায় পা রেখে চলতে হবে। তা-ও না হয় গেলাম, কিন্তু কিছুদূর পর দুই পা দুই পাহাড়ে রেখে চলতে হবে এমনটা তো কেউ আর আগে থেকে বলে দেয়নি। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল যে নিজের কপালে চাপড় মেরে হা-হুতাশ করব সেই পরিস্থিতিও নেই। দুই পা দুই পাহাড়ে রেখে হাঁটছি, হাত সরলেই ১০-১৫ ফুট নিচে ঝপাৎ!

মাতামুহুরী নদী

এমন পরিস্থিতিতেই চোখে পড়ল প্রথম গুহাটার মুখ, স্থানীয় লোকেরা সেখানে একটা লোহার মই লাগিয়েছেন, যেটার দুই-তিনটা পাশ জং ধরে বিশ্রীভাবে পড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। সেই হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা অল্প ওজনের সাতজন তরতর করে উঠে গেলাম, আটকে গেল আরমান আর অপু ভাই। অনেক কষ্টে এই দুই ভারী জনতাকে উঠিয়ে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! ভরদুপুরের রোদেও অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার সেখানে, টর্চলাইট-মোমবাতি যার কাছে যা ছিল। তা-ই নিয়ে এগিয়ে গেলাম। আঁঁকাবাঁকা গুহাপথটি শেষ হলো একটা চিপা জায়গায় এসে, এখান দিয়ে কেবলমাত্র খুব চিকন বা ছোট মানুষই যেতে পারবে। নিজেকে সেঁধিয়ে দিলাম সুড়ঙ্গের দুই দেয়ালের চিপার মধ্যে। কয়েক ইঞ্চি গিয়েই বুঝলাম এ আমার কর্ম নয়। দুই দেয়ালের মাঝে এমনভাবে আটকে গেলাম যে আর নড়াচড়া করার জো নেই। ক্রমেই আতঙ্ক ভর করতে লাগল, শেষমেশ বাকিরা টেনেটুনে বের করে আনল আমাকে। যাঁরা প্রথম সুড়ঙ্গে ঢুকতে চান, তাঁদের একটা কথা জানিয়ে রাখি, অতিরিক্ত উৎসাহী হওয়ার দরকার নেই, আতঙ্ক খুব খারাপ জিনিস। লিকলিকে শরীর হলে বা ওজন ৫০ কেজির কম হলেই কেবল এখানে ঢোকার কথা চিন্তা করবেন, অন্যথায় নয়।

এরপর অভিযান শুরু হলো দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের পথে। পাহাড় এবার আজব খেল দেখানো শুরু করল। রাস্তা বলে কিছু নেই, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বিশেষ কায়দায় ভারসাম্য বজায় রেখে টানতে হচ্ছে নিজেকে। এখানে বাঁশের কঞ্চি তো ওখানে গাছের ভাঙা গুঁড়ি, আরেকটু সামনে গেলে চোখা পাথর, সারা রাস্তায় যত না পানি, তার চেয়ে বেশি পানি ঘাম হয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমাদের কপাল বেয়ে। এমন সময় পুরো আলীকদম কাঁপিয়ে বিকট শব্দে পানিতে পড়লেন তারিক লিংকন ভাই। তাকে বাঁচাব কী! উল্টো সবাই যার যার মাথা বাঁচিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে বসে পড়ল—পাহাড়ে খুব আস্তে শব্দ করতে হয়, তা না হলে অনেক সময় ওই শব্দের ফলে পাহাড়ধসের শুরু হতে পারে। যা-ই হোক, এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম, কোনোমতে হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে গেলাম দ্বিতীয় সুড়ঙ্গমুখে।

এই সুড়ঙ্গটা ঠিক পাহাড়ের পেটের ভেতর দিয়ে চলে গেছে। ক্রমেই ঢালু হয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গটা শুরুতে এক মাথা সমান উঁচু হলেও ধীরে ধীরে নেমে এসেছে কোমর পর্যন্ত, একসময় হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হয়। টর্চলাইটের আলোতে ঝলসে ওঠে গুহার দেয়ালে ঝুলতে থাকা শিশিরের ফোঁটা ও চকচক করতে থাকা পাথুরে মেঝে দেখতে দেখতে চোখাচোখি হয় উল্টো ঝুলে থাকা বাদুড়ের সঙ্গে। ডানা ঝাপটে উড়ে যাওয়ার আগে তার কর্কশ শব্দ ভয় ধরিয়ে দেয় মনে। এটা তাদের রাজত্ব, আমরাই এখানে অনাহূত। কাদায় হামাগুড়ি দিতে দিতে একেকজনের যে চেহারা হয়েছে, তাতে আমারই আতঙ্ক লাগছে, বেচারা বাদুড়ের আর কি দোষ! সুড়ঙ্গের শেষ মাথাটা কুয়ার মতোন, নিজেকে যতটুকু সম্ভব ছোট করে গলিয়ে দিতে হয় এর মধ্যে। আমি সবার পেছন থেকে দেখছি একেক জন করে গায়েব হয়ে যাচ্ছে ওই ক্ষুদ্র কালো গহ্বরটাতে!

মনে একরাশ ভয় নিয়ে হাতে-পায়ে বিস্তর কাদা মাখিয়ে তাড়াহুড়ো করে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সঁপে দিলাম ওই অচেনা গর্তে। চোখ খুলেই দেখি চারপাশে দিনের আলোর বিস্ফোরণ। এ এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। মাথার অনেক ওপরে একটা বানর গাছের মগডালে বসে তালি বাজাতে লাগল। মনে হলো, এই মাত্র যেন একটা জব্বর সিনেমা দেখে শেষ করল!

দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ায় তৃতীয় সুড়ঙ্গে আর যাওয়া হয়নি। ওটা পরের বারের জন্য রেখে দিয়েছি। আবার আসতে হবে এখানে, বুড়ো পাথরে পা না ছিললে আর ভারী দেয়ালে মাথা না ঠুকলে কিসের আবার অভিযান! সাপ আর বাদুড়ের সঙ্গে এক গুহায় রাত না কাটালে কিসের আমি অভিযাত্রী!

কীভাবে যাবেন                                                                                               ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী যেকোনো বাসে উঠে সোজা চলে যাবেন চকোরিয়াতে। সেখান থেকে চান্দের গাড়ি নিয়ে যাবেন আলীকদম। অনিন্দ্য সুন্দর এই পাহাড়ি পথে আলীকদম পৌঁছাতে ঘণ্টা খানেকের মতো সময় লাগবে। আলীকদম থেকে যেকোনো রিকশাওয়ালাকে বললেই আপনাকে আলীর সুড়ঙ্গে নিয়ে যাবে।

Categories
রাকিব কিশোর

লাইফ ইজ বিউটিফুল

সাতভাইখুম যাওয়ার পথে

অমিয়াখুম যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় থানচি থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত পাথুরে সাঙ্গু নদী। এই নদীর তলদেশে থোকায় থোকায় থাকা পাথরকণা হার মানিয়ে দেয় মুক্তোদানাকেও… লিখেছেন রাকিব কিশোর

সেই রাতের কথা আজীবন মনে রাখব, বিছানার নিচে কুকুর, ছাগল, মুরগি, গরু আর শূকরের মিশ্রিত ডাক, আর মাথার ওপরে অবাক চাঁদের মৌন হাতছানি, অস্থির!আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম মাটি থেকে তিন-চার ফুট উঁচুতে বানানো চারপাশ খোলা একটা টংঘরে, এখানে মে মাসের প্রচণ্ড গরমের রাতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর কী যে আরাম, তা কারে বোঝাই! তার ওপর মাঝরাতে যখন চোখ মেলেই দেখি আকাশে আধখানা চাঁদ তার ঘোলাটে হলদে আলো দিয়ে আমাদের দেখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে, তখন মনে হয়, আসলেই ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’!

জায়গার নাম জিনাপাড়া। অমিয়াখুম যাওয়ার পথেই পড়বে।অমিয়াখুম যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় থানচি থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত পাথুরে সাঙ্গু নদী। এই নদীর তলদেশে থোকায় থোকায় থাকা পাথরকণা হার মানিয়ে দেয় মুক্তোদানাকেও। এই পথেই পড়ে তিন্দু। তিন্দুর ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, বান্দরবান যদি বাংলাদেশের স্বর্গ হয়, তাহলে তিন্দু সেই স্বর্গের রাজধানী। তিন্দুর পরের জায়গাই হলো রাজা পাথর এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের পূজনীয় ভয়ংকর পাথরের এই রাজ্য।
বর্ষাকালে এখানে প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটে। এই পথ হেঁটে পেরিয়ে নাফাখুম, আর নাফাখুম পার হয়ে বিকেলের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম জিনাপাড়ায়।বান্দরবানের এই গ্রামের মানুষ এখনো আদিম, সহজ-সরল এই মানুষগুলো এখনো পর্যটক দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, কিছু খেতে চাইলেই কোথা থেকে যেন পাকা পেঁপে পেড়ে নিয়ে আসে। জিনাপাড়ায় একটাই সমস্যা, এখানে কোনো বাথরুম নেই।পরদিন সকালে পা চালালাম আমিয়াখুম দেখার উদ্দেশে।জিনাপাড়া থেকে অমিয়াখুম যাওয়ার পথে কয়েকটা উঁচু উঁচু পাহাড় ডিঙাতে হয়।আহসান সবার আগে আগে হাঁটছে, আমি তার পেছনে।
হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। চোখের সামনে বিশাল লম্বা ধবধবে সাদা একটা দুধরাজ সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল, আমাদের আওয়াজ পেয়ে মুহূর্তেই হারিয়ে গেল আরও গভীরে। মিনিট পাঁচেক পরেই সামনে দেখি বিশাল বিশাল ছয়টা পাহাড়ি গয়াল আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভদ্রভাবে রাস্তা থেকে সরানো আরেক ধৈর্যের কাজ।

পরের রাস্তাটুকু আতঙ্কের, জীবনে কখনো এত খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে নামিনি, পুরো ৮৫ ডিগ্রি কোণে নামতে হচ্ছে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড়! নইচ্চেন তো মইচ্চেন অবস্থা। ভাগ্যকে বারবার দোষারোপ দিলাম সঙ্গে করে রশি আনিনি বলে। টানা ৪০ মিনিট থরথর করে কাঁপা পা নিয়ে পুরো খাড়া পাহাড় নেমে ঢুকলাম ঘন জঙ্গলের রাজ্যে। আমাদের সামনে আকাশছোঁয়া গোল গোল পাথরের দেয়াল, তার মধ্য দিয়ে ঝরঝর করে বয়ে চলছে সবুজ পানির কোলাহল। এখানে-ওখানে জমে সেই পানি রূপ নিয়েছে একেকটা লেগুনে। স্বচ্ছ সেই লেগুনের বুকে অলসভাবে সাঁতরে বেড়াচ্ছে বিশাল বিশাল সব মাছের দল, কারও কোনো তাড়া নেই, কোথাও যাওয়ার তাগিদ নেই।

আমাদের গাইড তাগাদা দিল, এসব নাকি কিছুই না, বামে অমিয়াখুম আর ডানে সাতভাইখুম। সেখানে গেলে আমরা নাকি মাথা ঘুরে পড়ে যাব এমন সুন্দর!

ছুট লাগালাম জল-পাথরের আড্ডা ছেড়ে জলের পাঠশালায়। এ পাথরের ওপর দিয়ে ও পাথরের তলা দিয়ে যখন দাঁড়ালাম, তখন তীব্র ঘামের মধ্যেও মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল পানির ধারার অস্তিত্ব টের পেতে ভুললাম না, অবাক চোখের সামনে নিজেকে খোলামেলা করে মেলে ধরেছে বান্দরবানের সবচেয়ে সুন্দর এই জায়গা। ভরদুপুরের আলোয় অদ্ভুত রহস্যলাগা সৌন্দর্য নিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে অনাদিকাল থেকে রূপ ধরে রাখা পাহাড়ি ঝরনা ‘অমিয়াখুম’।

এমন পানিতে ঝাঁপ না দেওয়া গুরুতর অন্যায়। আমি তোড়জোড় শুরুর আগেই দেখি সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাঁতার না-জানা অপু ভাই, গায়ে তার লাইফ জ্যাকেট! পানির চাপ অগ্রাহ্য করে চলে গেলাম এক্কেবারে ঝরনার গোড়ায়। অমিয়াখুমের দুই পাশের পাহাড়ের গঠনশৈলী পুরোটাই অন্য রকম, সিঁড়ির পরে সিঁড়ি জমেছে এখানে, সেগুলোর ধাপ আবার এত বড় যে একেকটা ধাপে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে ঘুমানো যাবে।

ভেবেছিলাম এবারের মতো ভালো লাগার বুঝি সমাপ্তি হলো, কিন্তু সে ধারণা ভেঙে দিল সাতভাইখুম নামক জায়গা। অমিয়াখুম থেকে একটু ওপরের দিকে বাঁশের ভেলায় চড়ে যেতে হয় সাতভাইখুমে। মাত্র ১০ মিনিটের এই পানির রাস্তার কাছে নস্যি দুনিয়ার সপ্তাশ্চর্যও! জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেল এবার। ওজন সইতে না পেরে টুপ করে ডুবে গেল আরমান আর শিপন ভাইদের ভেলা, সেটা দেখে সাঁতার না-জানা আলো ভাইয়ের চেহারা হলো দেখার মতো।

আমরা একটা পাথরের দুর্গে ঢুকলাম, নিজেদের প্রথমবারের মতো বোবা মনে হলো। চোখের সামনে যেন পাথরের সভা বসেছে। জীবনে এত বড় বড় পাথর আমি কখনো দেখিনি। পুরো বান্দরবান যেন এখানে একসঙ্গে ধরা দিয়েছে, এখানে তিন্দুর মতো বড় বড় পাথরও আছে, আছে অমিয়াখুমের মতো সিঁড়ি সিঁড়ি ঝরনা, আছে বগা লেকের মতো স্বচ্ছ পানির হ্রদও।

 

নাফাক

যেভাবে যাবেন

বান্দরবানে পৌঁছে সোজা চলে যাবেন থানচিতে। সেখান থেকে নৌকা নিয়ে থামবেন রেমাক্রিতে। এরপর আর কোনো গাড়ি যাবে না, পায়ের ওপরে ছেড়ে দিতে হবে শহুরে হাওয়ায় পেলে পুষে বড় করা শরীরটাকে। চলতি পথে নাফাখুম পড়বে, সেখান থেকে যেতে হবে জিনাপাড়া। এখানে হুটহাট ছবি তুলবেন না।খেয়াল রাখবেন তাদের সংস্কৃতিতে যেন কোনো আঘাত না লাগে। সেখানে রাতে থেকে পরদিন খুব ভোরে অমিয়াখুম আর সাতভাইখুমের দিকে হাঁটা দেবেন। সঙ্গে করে রশি, লাইফ জ্যাকেট আর খাবার নিয়ে যাবেন। ফিরে আসার পথে ‘পদ্মমুখ’ রাস্তা দিয়ে ফেরত আসতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মাত্র পাঁচ ঘণ্টা হেঁটে অনেক আগেই আপনি থানচিতে পৌঁছাতে পারবেন। অমিয়াখুম ও সাতভাইখুম ভালোভাবে ঘুরে আসতে চার দিন লেগে যাবে। গাইডরা এখন একটা প্যাকেজ চালু করেছে, সে প্যাকেজ অনুযায়ী শুধু থানচি থেকে সব ঘুরে আবার থানচিতে ফেরত আসতে আপনার মোট খরচ হবে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা। এই জায়গা দুর্গম, ভারী জিনস আর ট্রলি ব্যাগ না নিয়ে যাওয়াই ভালো

Categories
রাকিব কিশোর

যেখানে পাহাড় এসে থেমে গেছে

মণিপুরি ঘাট পার হতেই সামনের দৃশ্যপট মুহূর্তে পাল্টে গেল। পানি থেকে জেগে ওঠা ডাঙা বাঁক খেয়ে উঠে গেছে দূরের পাহাড়ের দেয়ালে, যত দূর চোখ যায়, সবুজের মখমল…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

মেঘালয়ের পাহাড় যেখানে এসে থেমে গেছে, ঠিক সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে আশ্চর্য এক জলবাগান, এলোমেলো সাদা মেঘের দল পাহাড়ে ঠোকর খেতে খেতে এসে ঝপ করে গা এলিয়ে দেয় এই জলের বিছানায়। এখানে নৌকা চলে জলের উচ্ছ্বাসে। সাতরঙা রংধনুর সবটুকু খুশি গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা এই অপরূপ জায়গাটার নাম টাঙ্গুয়ার হাওর।
এবারে হাওরে গিয়েছিলাম নওয়াজেশ নলেজ সেন্টার থেকে। আমার ফেসবুক বন্ধু সুনামগঞ্জ জেলার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেবুন নাহার আমাদের সব ব্যবস্থা করে দিলেন, হাসন রাজার বাড়ির ঘাট থেকে একটা ট্রলার নিয়ে রওনা দিলাম টাঙ্গুয়া হাওরের উদ্দেশে।

নীল-সবুজ জলে আনন্দের অবগাহন

মণিপুরি ঘাট পার হতেই সামনের দৃশ্যপট মুহূর্তে পাল্টে গেল। পানি থেকে জেগে ওঠা ডাঙা বাঁক খেয়ে উঠে গেছে দূরের পাহাড়ের দেয়ালে, যত দূর চোখ যায়, সবুজের মখমল। নৌকার পাশ দিয়ে বয়সী চোখজোড়া নিয়ে নিচে তাকালাম—নীলচে পানি, পানির নিচে শেওলার অস্তিত্ব পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, নলখাগড়ার ডগা ভেসে ভেসে ঢেউয়ের দোলায় নাচছে হাওরজুড়ে। তার মাঝ দিয়েই মহাসড়কে গাড়ি চালানোর মতো করে শাঁই শাঁই করে ছুটে চলছি আমরা হাওরের উদ্দেশে। যাওয়ার পথে মাছের ঘের পড়ল একটা।
ধীরে ধীরে রং বদলাচ্ছে পানির। নীল থেকে কালো, কালো থেকে সবুজ, আবার গাঢ় নীল। টানা ৬ ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছলাম টাঙ্গুয়া হাওরের সবচেয়ে স্বচ্ছ অংশে, এখানে বর্ষা মৌসুমে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে পানি এসে ভরে যায় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা, শুকনো সতেজ ধানখেতগুলো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে জলের আধারে। এ সময়ে অগণিত হাওর আর বাঁওড় সব এক হয়ে যায়, পানিতে পানিতে মিলেমিশে জন্ম নেয় অসাধারণ এক স্বচ্ছ জলের আধার।
বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত টেকেরঘাটের এই অংশে হাওর দেখে মাথা খারাপ অবস্থা। জলের নিচে যেন জলবাগান—এক হাত লতা গুল্ম থেকে শুরু করে ১১ হাত লম্বা বিশাল গাছও ডুবে আছে, তার পাতায় পাতায় আবার রোদের ঝিলিক!
অচেনা এক পৃথিবী মনে হয় যখন দেখি কোনো রকম ভেলা বা জাহাজ ছাড়াই থইথই পানিতে পইপই ভাসছে ছোট ছোট গ্রাম। পুরো হাওর গাছের সীমানা দিয়ে ঘেরা। সেই গাছও মাথাটুকু বাদে ডুবে আছে নীলের সমুদ্রে।

জলবাগানে ঘোরাঘুরি করার লোভ সামলানো অসম্ভব। গায়ে লাইফ জ্যাকেট চড়িয়ে সবাই একের পর এক টুপ টুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা ডুবসাঁতার নিয়ে চলে গেছি ঘন জঙ্গলে, পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে আয়েশি লতা, হাতে মুখে এসে লাগছে সবুজের রেনু, আর মাথার ওপরে কালো আলকাতরা মাখা নৌকার তলদেশ। সবকিছু ছাড়িয়ে চোখে এসে লাগল সূর্যের ঠান্ডা আলো!
সেখান থেকে উঠে আমরা বিস্কিট চিবোতে চিবোতে যখন পৌঁছলাম শাপলা ফুলের বাগানে, তখন দিগন্তে সূর্যটা চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে, তার চোখে ঘুমের আনাগোনা। মেঘের পর্দায় সে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম টেকেরঘাটে।

কীভাবে যাবেন

শ্যামলী পরিবহনে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ৫৫০ টাকা ভাড়া নেবে। সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সাহেববাজার ঘাট পর্যন্ত রিকশায়। সেখান থেকে টাঙ্গুয়া হাওরের উদ্দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করবেন। প্রতিদিনের জন্য ভাড়া নেবে চার হাজার টাকা। হাওরে যেতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে। দু-তিন দিনের জন্য নৌকা ভাড়া করলে প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করে নেবেন। হাওর ঘুরে রাতটা তাহিরপুর থানার ডাকবাংলোতে থাকতে পারেন। সঙ্গে তেমন কিছুই নিতে হবে না, তবে লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই নেবেন। এটা বর্ষাকালে যাওয়ার রাস্তা। শীতকালে নৌকা চলবে না, সে ক্ষেত্রে আপনাকে সুরমা নদী পার হয়ে মণিপুরিঘাট থেকে মোটরসাইকেলে টেকেরঘাট হয়ে টাঙ্গুয়া হাওরে যেতে হবে। নভেম্বর মাসজুড়ে এখানে এমন পানি পাবেন। এর পর থেকে পানি শুকিয়ে যায়।

Categories
রাকিব কিশোর

সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই

ধাপে ধাপে নেমে এসেছে খইয়াছড়ার সাদা পানি। ছবি: তোফাজ্জল অপু

 কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝরনা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হাঁ করে দেখার মতো কিছু নেই। এমন ঝরনা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। অপু জানালেন, এটা নাকি এই ঝরনার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরও আছে নাকি?…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

রাত ১০টায় ফোন দিলেন আরমান ভাই, ‘কালকে পাহড়ে ঢুকছি, কাজ-টাজ না থাকলে চলে আসেন।’ পরদিন আমার অনেক কাজ, বলে দিলাম যেতে পারছি না। ফোন রেখে ব্যাগ গোছাচ্ছি, অফিস থেকে বাসায় যাব। হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল পাহাড়ের সারি! অটল-অবিচল সবুজ পাহাড় ধবধবে সাদা মেঘের ভেতরে গলা ডুবিয়ে বসে আছে, তার মাথায় সবুজ চুলের বনে একটানা বাতাসে দোল খেতে খেতে শিস দিচ্ছে ফিঙে পাখির ছানা। আর সবকিছু ছাপিয়ে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে বিরামহীন ছরছর শব্দ। হাজার শব্দের মধ্যেও এই শব্দকে আলাদা করে চিনি আমি। মনের ভেতরে খুশির ফোয়ারা ছড়িয়ে দেওয়া মন-প্রাণ নাচানো এই শব্দ—ঝরনার পানির শব্দ। মাথা ঝাড়া দিয়ে চোখ ফেরালাম সাদা দেয়াল থেকে। চুলোয় যাক কাজ, পাহাড় আমাকে ডাকছে, এই ডাক উপেক্ষা করার মতো কলিজা এখনো আমার হয়নি। অফিসের হাসান ভাইকে রীতিমতো বেঁধে-ধরে এক কাপড়েই সায়েদাবাদ রওনা দিলাম। ঘড়ির কাঁটা রাত দুইটা ছুঁইছুঁই, ততক্ষণে আমরা ছেড়ে গেছি ধুলোর নগর ঢাকার সীমানা—গন্তব্য চট্টগ্রামের মীরসরাই।
.ভোর পাঁচটার কিছুক্ষণ আগে মীরসরাই বাজারে নেমে আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলাম খইয়াছড়া বিদ্যালয়ের মাঠে। চট্টগ্রাম থেকে আরমান, অপু আর লিমন ভাইয়ের আসতে সময় লাগবে আর তিন ঘণ্টা। কাজেই এই তিন ঘণ্টার জন্য উদ্বাস্তু আমরা। সাজানো-গোছানো স্কুলের বারান্দায় গামছা পেতে শুয়ে পড়লাম আমি আর হাসান ভাই। পুব আকাশে ততক্ষণে আগুন লেগে গেছে! সূর্যের প্রথম আলো কেটেকুটে ফালাফালা করে দিচ্ছে ঘুমিয়ে থাকা মেঘের সারিকে। ভোরের বাতাসে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে উদ্ভ্রান্ত মেঘের দল। ঘুম মাথায় উঠল, শুয়ে শুয়েই দেখলাম মীরসরাইয়ের পাহাড়ের ওপাশ থেকে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। ততক্ষণে চলে এসেছে আমাদের চট্টগ্রামের ‘পাহাড়ি বাহিনী’। পেটে দুটো পরাটা দিয়েই পা চালালাম পুবের পাহাড় লক্ষ্য করে। অপুর কাছে জানলাম এই এলাকায় একটা ঝরনা আছে, কোনো নাম নেই এটার। যেহেতু খইয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত, তাই স্থানীয়রা একে ‘খইয়াছড়া ঝরনা’ বলে। আমরা যাচ্ছি এই ঝরনা দেখতেই।
খইয়াছড়া স্কুলের উল্টো পাশের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হলো একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দিচ্ছে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। স্থানীয় লোকদের খেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। একটা বিশাল জামগাছে পেকে টসটসে হয়ে ঝুলে আছে অজস্র জাম। হাত দিয়ে একটা পাতা টানতেই ঝরঝর করে পড়ে গেল অনেক জাম। সে কী মিষ্টি! চলতি পথে এর বাড়ির উঠান, ওর বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অবশেষে ঢুকলাম পাহাড়ের মূল সীমানায়। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদের আমরা আবিষ্কার করলাম লাল আর নীল রঙের ফড়িংয়ের মিছিলে! যত দূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে তত দূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছি পানি পড়ার শব্দ। চারপাশে মন ভালো করে দেওয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংয়ের পাখায়। একটু দূরে কোনো একটা প্রাণী ডেকে উঠল। লিমন ভাই জানালেন, ওটা মায়া হরিণ। হরিণের ডাক আবার শোনার জন্য কান খাড়া করে ফেললাম। তার বদলে শোনা যাচ্ছে একটানা ঝিমঝিম শব্দ! ওই শব্দের উৎসের দিকেই আমাদের যাত্রা। কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝরনা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হাঁ করে দেখার মতো কিছু নেই। এমন ঝরনা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। অপু জানালেন, এটা নাকি এই ঝরনার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরও আছে নাকি? অপু হেসে বললেন, দম বন্ধ করতে, সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই, এলাকার লোকজন সব নাকি এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, ওপরের দিকে আর যায় না। এই ঝরনার ওপরে আরও আটটা ধাপ আছে, আমরা দাঁড়িয়ে আছি নবম বা শেষ ধাপের গোড়ায়।
তড়িঘড়ি করে প্রায় খাড়া ঢাল ধরে হাঁচড়ে-পাঁচড় উঠে চললাম উৎসের দিকে। ঝরনার ষষ্ঠ ধাপে এসে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। চোখের সামনে যা দেখছি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। চশমা খুলে মুছে নিয়ে আবার বসালাম নাকের ওপরে। না, ভুল দেখিনি। আমার সামনে একেবারে খাড়া হয়ে ঝুলে আছে খইয়াছড়া ঝরনার তিনটা ধাপ! প্রতিটা ধাপ থেকে সমান তালে পানি পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটা সিঁড়ি চিৎ হয়ে পড়ে আছে সবুজের বাজারে। প্রতিটা ধাপেই ফুটে আছে রংধনু! আমার আর আরমান ভাইয়ের অবাক হওয়া দেখে মজা পাচ্ছে বাকিরা, ওরা আগেও এসেছে। ওপরে নাকি আরও তিনটা ধাপ আছে, সেখানে আছে একটা গভীর বাথটাব, লাফ-ডুব-সাঁতার সবকিছুই হবে ওখানে।
বাংলাদেশের অনেক ঝরনাই আমি দেখেছি। আমার কাছে সৌন্দর্যের দিক থেকে সবাইকে যোজন যোজন মাইল পেছনে ফেলে এগিয়ে আছে বান্দরবানের জাদিপাই ঝরনা। তবে এই ঝরনা দেখার পর আমার ওই বিশ্বাসটা টলতে শুরু করেছে, কে বেশি সুন্দর? জাদিপাই নাকি খইয়াছড়া!
এখানকার নয়টা ধাপের প্রতিটিতেই রয়েছে প্রশস্ত জায়গা, যেখানে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেওয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝরনার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে।

.কীভাবে যাবেন
পথের দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের বেশ সহজপথের ঝরনা এটা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠে ভোরে নেমে যাবেন মীরসরাই বাজারে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে চলে যাবেন খইয়াছড়া স্কুলে। এর উল্টো পাশের পাহাড়ের দিকে যে পিচঢালা রাস্তাটা চলে গেছে, সেদিকে হাঁটা দেবেন। ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পরে নিজেকে আবিষ্কার করবেন এই ঝরনার শেষ ধাপে। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসার বাসভাড়া বাদ দিলে সারা দিনে এই ঝরনার পেছনে আপনার খরচ হবে ১০০ টাকারও কম আর সেটাও নির্ভর করবে আপনি কী খাবেন তার ওপর। সারা দিন ঘুরে রাতের বাসেই ঢাকার পথ ধরতে পারেন।

Categories
রাকিব কিশোর

পাথুরে নদীর পাড়ে…

জল-পাথরের দেশে…

 

 পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশিকাঁথা তৈরি করেছে, কোথাও তার একচিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃণতা …লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

আকাশ-কুয়াশা-মেঘ-নদী-পাথর-পাহাড়-ঝরনা-বন-নীল সবুজ পানি আর রহস্য-রোমাঞ্চ-ভয়—সব যদি একবারে পেতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন তিন্দু। সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয় তখন নিজেকে বারবার ধন্যবাদ দিতে হয় এই দেশে জন্মানোর জন্য।
বান্দরবানের থানচি থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট গেলেই পৌঁছে যাবেন তিন্দু। তিন্দু সম্পর্কে একটা বিশাল বই লিখলেও এর সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও তুলে ধরা সম্ভব না। শুধু এতটুকু বলি, মেঘ-কুয়াশার দেশ তিন্দুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে এখানে নৌকায় চড়ে মেঘের ওপরে যাওয়া যায়, সাদাটে মেঘের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চললেই মাথা ভিজে যায়। এখানে শক্ত কঠিন পাথরকে সারাক্ষণই বুকে নিয়ে লক্ষ্য ছাড়া দৌড়ে বেড়ায় স্বচ্ছ পানির ঢল। নুড়ি পাথরে ছলাৎ ছলাৎ হাঁটতে হাঁটতেই ইচ্ছে করে হাঁটুপানিতে টুপ করে একটা ডুব দিয়ে হাপুস করে খেয়ে নিই পুরো একমুখ টলটলে পানি।
এবার আমাদের তিন্দু অভিযানে দলটা ছিল বিচিত্র। পুরো বান্দরবানে পাহাড়ে পাহাড়ে লাইফ জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়ানো জুনায়েদ আজীম চৌধুরী পানি পেয়েই নৌকা থেকে ঝপাং করে লাফ দিয়েছেন হাঁটুসমান জলে। পাহাড়ের মায়াবী টানে সেই রংপুর থেকে ছুটে এসেছেন নাসিরুল আলম মণ্ডল, তাঁর না ঘুমানো লাল টকটকে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন প্রতিটি পা

তিন্দুর পথে সাঙ্গু নদীতে এমন পাথরের দেখা মিলবে। ছবি: লেখক

হাড়ি মুহূর্ত। আলুর দাম নাকি কমেছে! এই খবর পেয়ে হাসান ভাই থানচি থেকে পাঁচ কেজি গোলআলু কিনে এনেছেন, আমাদের আলুপোড়া খাওয়াবেন। সাঙ্গুর জলে পা রেখে সবচেয়ে শান্ত ছেলে মিরান বাপ্পীও মাছের ঝাঁকের সঙ্গে হুড়মুড় করে দৌড়ে বেড়িয়েছেন পাথরের বাগানে। পিচ্ছিল পাথরে একবারও না পিছলে দিনের মধ্যে ১৬ বার করে গোসল করেছেন ফাহাদ ভাই। আর ছিলেন শাহেদ খাঁ। জীবনে প্রথম পাহাড় দেখা এই উচ্ছল ছেলেটা যা দেখেন তাতেই ‘ওয়াও’ বলে দৌড়ে যান। যে এক দিনে বান্দরবানে ৬৪ জিবি মেমোরির ছবি তুলেছেন।
তিন্দুর দুই পাশ দিয়ে চলে গেছে দুটো ঝিরিপথ, সারা দিন সেখান থেকে কলকল করে ছুটে আসছে পাহাড়গলা স্বচ্ছ পানি। পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশিকাঁথা তৈরি করেছে, কোথাও তার একচিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃণতা। তিন্দুপাড়ের পাথুরে সৈকত এখানে যোগ করেছে নতুন একটা মাত্রা। লাখ লাখ অসমান পাথর মিলে তৈরি করেছে অমসৃণ সমান একটা পায়ে চলা পথের, হাঁটতে হাঁটতে পথটা শেষ হলেই মন খারাপ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে এখানেই কাটিয়ে দিই আরও একটা বসন্ত।

বান্দরবান-কন্যা তিন্দুকে ফেলে আমরা যখন আরও ওপরের দিকে এগোতে থাকলাম তখন মিনিটে মিনিটে বদলে যেতে থাকল পানির নিচের পাথুরে জগৎটা, ছোট ছোট পাথর যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে লাগল, উঠতে উঠতে নদীর বুক ফুঁড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল তাদের মাথা। জায়গাটার নাম ‘বড় পাথর’। এখানে এসে নদীটা হয়ে গেছে সিঁড়ির মতন, এখানে পায়ের পাতাসমান পানিতে নেমে ঠেলেঠুলে নৌকাকে ওঠাতে হয় উপরের দিকে, সেখান থেকে আরও ওপরে একেবারে মেঘের কাছাকাছি। এখানে পাথর আর পানি মিলে ভরদুপুরে তৈরি করে রংধনুর। উত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে থাকা সেই রংধনুগুলোকে নিজের কোলে আশ্রয় দেয় নদীর পাড়জুড়ে ঝুলতে থাকা গাছের সবুজ পাতারা। এখানে সূর্যোদয় দেখতে হয় ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে, এখানে সূর্যাস্ত দেখতে হয় পানির চোখে চোখ রেখে।
পানি আর পাথরের এক সাদা-কালো জাদুঘর গড়ে উঠেছে এই তিন্দুকে ঘিরে। এখানে পাহাড়গলা পানিতে পা ডুবিয়ে চলতি পথের নতুন নতুন মাছের সঙ্গে সারা দিন আড্ডা দিলেও ক্লান্তির ঘাম ঝরবে না কানের লতি বেয়ে, এখানে ঘোলাটে মেঘের ভিড়ে সারাক্ষণ ভিজতে থাকলেও এতটুকু ময়লা লাগবে না গায়ে। জল-পাথরের আড্ডা জমে এখানে। এটা মেঘের দেশ, এটা কুয়াশার দেশ, এটা পাথুরে পানির দেশ, এটা তিন্দু, মেঘ-কুয়াশার তিন্দু।

যেভাবে যাবেন
তিন্দুতে যেতে হলে আপনাকে সবার আগে পৌঁছাতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে বাস বা চান্দের গাড়িতে করে নীলগিরি পেরিয়ে চলে যাবেন ৭৯ কিলোমিটার দূরের থানচিতে। থানচিতে নেমে বিজিবির অনুমতি নিয়ে একটা ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে ঢুকে যাবেন ভূস্বর্গের ভেতরে। এখান থেকেই মূলত মুগ্ধতার শুরু। ‘ওয়াও, ওয়াও’ করতে করতে এরপরের অধ্যায়টুকু লিখবেন আপনি নিজেই। আর একটা কথা, সঙ্গে করে অবশ্যই আলু নিয়ে যাবেন, পূর্ণিমা রাতে পাথুরে নদীর পাড়ে বসে পোড়া আলু খাওয়ার মজা আর কোথাও কি পাবেন?

Categories
রাকিব কিশোর

জোছনা এসে জড়িয়ে ধরে চিকচিকে বালুর সারা গা

নীল সাগর আর নীল আকাশ মিলে গেছে যেন সেন্ট মার্টিনসে।

 বিকেলবেলায় ভাটার টানে যখন সমুদ্রের পানি স্কুল ছুটির মতো সৈকত থেকে হুড়হাড় করে পালিয়ে যেতে থাকে, তখন প্রবালের খাঁজে খাঁজে হাঁটুপানিতে আটকে পড়ে রংধনু রঙের ছোট ছোট অনেক মাছের দল। শেষ বিকেলের এই মাছ দেখা সময়টা কাটতে না কাটতেই চলে আসে তারাভরা রাত…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে চারপাশের নীল পানিকে পাড়া-প্রতিবেশী বানিয়ে যে প্রবাল দ্বীপের বসবাস, সেটাই কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘রুপালি দ্বীপ’, প্রবাল দ্বীপ। পুবের এলোমেলো পাহাড় আর পশ্চিমের নীল সাগরের মাঝখানে তার বাস। নারকেল জিঞ্জিরা নামেও ডাকা হয় এ দ্বীপটিকে।
.নীল সাগরের সাদা বালু আর টুকটুকে লাল কাঁকড়া দেখার টানে ছুটে গেছি স্বপ্নদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। সঙ্গে ছিলেন সারাক্ষণ হাসতে থাকা আরমান ভাই, হাসাতে থাকা রকি ভাই, চুপ মেরে থাকা অলি ভাই আর শাহেদ।
ছোট এই দ্বীপটা চাইলে হেঁটেই তিন ঘণ্টার মধ্যে পুরোটা ঘুরে বেড়ানো সম্ভব। তাই যাঁরা সকালে গিয়ে বিকেলেই ফেরত আসেন, তাঁরা কোনো মজাই পান না, এখানকার আসল মজা লুকিয়ে আছে বিকেল আর রাতগুলোয়। বিকেলবেলায় ভাটার টানে যখন সমুদ্রের পানি স্কুল ছুটির মতো সৈকত থেকে হুড়হাড় করে পালিয়ে যেতে থাকে, তখন প্রবালের খাঁজে খাঁজে হাঁটুপানিতে আটকে পড়ে রংধনু রঙের ছোট ছোট অনেক মাছের দল। শেষ বিকেলের এই মাছ দেখা সময়টা কাটতে না কাটতেই চলে আসে তারাভরা রাত। জোছনা এসে জড়িয়ে ধরে চিকচিকে বালুর সারা গা, নিথর কেয়াবনে শাঁ শাঁ করে ছুটে যায় ব্যস্ত বাতাস, সাগরের ফেনা আছড়ে পড়ে রুক্ষ প্রবালের গায়ে।
চাঁদের আলো গায়ে মাখা এই রুপালি দ্বীপে যিনি একবার জোছনা দেখেছেন, তিনি জেনেছেন—পূর্ণিমা কী জিনিস, চাঁদের হাসি কাকে বলে!
সেন্ট মার্টিনে খুব ভোরে সূয্যিমামা জাগার আগেই প্রাতর্ভ্রমণে বের হয় লাল কাঁকড়ার দল। তাদের নিজ পায়ে করা শিল্পকর্ম দেখলে আর কোন শিল্পীর কাজ মনে ধরবেনা আপনার।
সেন্ট মার্টিনে গিয়েছিলাম দুটো কাজের জন্য। দেখা আর খাওয়া। বাংলাদেশের আর সব আনাচকানাচে গিয়ে খাওয়া নিয়ে বাছবিচার করলেও, সেখানে গিয়ে আমরা উদরপূর্তির বিষয়টায় রীতিমতো উদার হয়ে যাই। সারা দিন ছেঁড়া দ্বীপে টইটই করে ঘুরে পেটে রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে সন্ধ্যার সময় ফিরলাম বাজারে। উদ্দেশ্য, মাছের বারবিকিউ খাব। মাছ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। কী বিশাল একেকটা! দোকানির প্লেটে শুয়ে আমাদের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে দেড়-দুই কেজি ওজনের রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, কালাচাঁদা আর কোরালগুলো। চকচক করতে থাকা মাছগুলোর দিকে লোভনীয় দৃষ্টি ঢেলে দাম জানতে চাইলাম, ব্যাপক দর-কষাকষি শেষে দুটি বিশাল আকারের মাছ কিনলাম ৮৫০ টাকা দিয়ে, জীবনের সেরা বারবিকিউ খেলাম সেদিন। ফোলা পেট নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে যখন সাগরের কিনারে এসে পা ডুবিয়ে দাঁড়ালাম, তখন ভরা পূর্ণিমার চাঁদকেও আড়াল করে দিল উত্তর-দক্ষিণে সোজা চলে যাওয়া দুধসাদা ছায়াপথ। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাঁদের আলোয় নাচতে থাকা বঙ্গোপসাগর জানান দিল, দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর একটায় কী নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যায়।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বাস যায়। সেখান থেকে সকাল সাড়ে নয়টায় জাহাজ ছেড়ে যায় সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে। নাফ নদী পেরিয়ে তিন ঘণ্টা পর আপনি পৌঁছে যাবেন নারকেলের দ্বীপে। থাকা-খাওয়ার জন্য বেশ কিছু হোটেল আছে। যদি মাছের বারবিকিউ খেতে চান, তাহলে দোকান থেকে সরাসরি না কিনে একটু হেঁটে চলে যান মাছের আড়তে, বড় বড় মাছ পাবেন, পাবেন শুঁটকিও। হোটেলগুলোয় আপনার পছন্দমতো রেঁধে দেবে মাছ। এখানে বিকাল তিনটার পর সবকিছু পাবেন অর্ধেক দামে। আরেকটা কথা, এখানে গেলে অবশ্যই এক রাত থাকবেন। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রাত আপনার জন্য লুকিয়ে রেখেছে জল-পাথরের এই রুপালি দ্বীপটা।

Categories
রাকিব কিশোর

ভারতের ঝরনা, দেখা যায় শুধু বাংলাদেশে

দূর পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে পাংতুমাই ঝরনা। ছবি: আল মারুফ রাসেল
গাছের সারি মাথার ওপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। গ্রীষ্মের এই ভরা রোদেও ঝিরি ঝিরি ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোনাটা পাহাড় দিয়ে থরে থরে সাজানো। আঁকাবাঁকা পথে যত ওপরে উঠি ততই আফসোস বাড়ে—আহারে, কেন আমরা আরও উঁচু ওই পাহাড়টা পেলাম না, উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে আফসোসের সীমানাটা বাড়তে বাড়তে একসময় ঝুপ করে পড়ে যায় দূর থেকে বয়ে যাওয়া ডাউকি নদী দেখে। নিটোল স্বচ্ছ আয়নারঙা পানিতে ঠোকর খেতে খেতে চলা পাথরের মতো বুকে জমাট বাঁধে আবেগি কান্নার দল। কাছের সবুজের কারখানাটা এতটা কাছে তবুও হাত বাড়িয়ে ধরার অনুমতি নেই, অনেক বড় বড় লেখা একটা সাইনবোর্ড ‘সাবধান! সামনে ভারত, প্রবেশ নিষেধ’।
তো এভাবেই শুরু আমাদের সেবারের সিলেটযাত্রা। ঠিক এক বছর আগের কথা। গত বছর মে মাসেই গিয়েছিলাম। চলতি পথে সাইনবোর্ডে লেখা সতর্কবার্তা দেখেকিছুক্ষণ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তাকালাম আল মারুফের দিকে, সে ঘোরাঘুরিপাগল মানুষ, তার কাছে কোনো উপায় পাওয়া যায় কি না। দেখি মারুফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে ভারতের পাহাড়ের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। মানুষ ঢুকতে না পারুক, তার ক্যামেরার লেন্স তো ঢুকবে, ভারতের দুই-চারটা পাখিকে আজ আর ‘বন্দী’ না করলেই নয়। হতাশ হয়ে ডাউকি নদী পার হয়ে স্থানীয় এক ভ্যানচালকের কাছে জানতে চাইলাম যে এখানে আশপাশে আর কী কী আছে? উনি খুব আগ্রহ নিয়ে জানালেন এখানে রাজার বাড়ি আছে, একটা ছোট্ট ঝরনা আছে, কমলার বাগান আছে, চায়ের বাগান আছে। আমরা হতাশ, সিলেটে চা-বাগান থাকবে না, তো কী খেজুরবাগান থাকবে! অবশেষে তিনি জানালেন অনেক দূরে একটা ঝরনা আছে, সেটা অবশ্য বাংলাদেশে না, ভারতের ভেতরে পড়ছে তবে বাংলাদেশ থেকে দেখা যায়। আর আমাদের আটকায় কে! ঝরনা বলে কথা! পড়িমরি করে তাঁর ভ্যানগাড়িতে উঠে বসলাম।
খাসিয়াপাড়ার ভেতর দিয়ে চলতে লাগল আমাদের ভ্যানগাড়ি। সিলেটের এই অঞ্চলের রাস্তাগুলো খুব সুন্দর, দুপাশে বিশাল বিশাল গাছের সারি মাথার ওপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। গ্রীষ্মের এই ভরা রোদেও ঝিরি ঝিরি ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের।

হাত দিয়ে তাদের সরাতে গেলেই দেখা যায় নানা রঙের পাতাবাহারের ঝাড়। বিশাল চা-বাগান আর কমলাবাগান দেখতে দেখতেই আমরা চলে এলাম প্রতাপপুর সীমান্ত ফাঁড়ির রাস্তায়। এই জায়গাটা একপাশে প্রায় মেঘ টপকে যাওয়া পাহাড় আর তার নিচে শ খানেক ফুটবল খেলার মাঠের মতো সমান জমি নিয়ে আমাদের অবাক করার জন্যই মনে হয় শুয়ে ছিল এতক্ষণ। দূরের পাহাড়ের বুক চিরে সাদা সুতার মতো গলগল করে ঝরছে ঝরনার পানি, একটা, দুইটা, ছয়টা, ১২টা এরপর আর গুনতে পারলাম না। বড় বড় গাছের ছায়ায় চোখ যায় না এমন দূর পর্যন্ত এঁকেবেঁকে সবুজের বুক চিরে চলে গেছে সফেদ সাদা পথটি। এমন একটা পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য এমন রাস্তাই আসলে দরকার, প্রকৃতি জানে কোথায় কী দিতে হয়।

ছবির মতো সাজানো রাস্তাটি দিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক চলার পর ‘মাতুরতল’ বাজারে এসে নামলাম আমরা, ভ্যানচালক জানালেন এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হবে, ঝরনার কথা শুনলে আমাদের ক্লান্তি পালিয়ে যায় অচীন দেশে। বিশাল এক পাথর পকেটে নিয়ে হাঁটা শুরু করল চঞ্চল, অনেক দূর হাঁটতে হবে। তবু ওজন নিয়ে হাঁটা শুরু করলে ক্লান্তি নাকি কম লাগবে। এতক্ষণ ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটা রিতু ছাতা বন্ধ করে রেখে দিল, তার বক্তব্য ছাতা মাথায় নিয়ে ঝরনা দেখতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ‘যাচ্ছি ঝরনায় ভিজতে, ছাতা মাথায় থাকলে ভিজব কীভাবে!’
যাই হোক, ‘মাতুরতল’ বাজার থেকে ধু ধু গরম বালু পায়ের তলায় নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমরা। মাঠ পেরোলাম, ঘাট পেরোলাম, সামনে থাকা খাল পেরোলাম, জংলা জলা-পাথর সব পেরিয়ে পড়লাম বাঁশবাগানে। এর বাড়ি, তার ঘর, আরেকজনের উঠোন সব মাড়িয়ে আমরা চলে এলাম এক বিশাল মাঠে। আমাদের ভ্যানচালক গাইড আঙুল তুলে দেখালেন ওই যে ঝরনা, ‘পাংতুমাই’ ঝরনা। আমরা তাজ্জব—চোখের সামনে মাঠ, আমরা মাঠের গোলপোস্ট ছাড়া আর কিছুই দেখি না, ঝরনা কই! তাঁর দেখানো জায়গার দিকে হাঁটা দিলাম, সামনের ঝোপ সরিয়েই চক্ষুঃস্থির! পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে ইংরেজি এস অক্ষরের মতো এঁকেবেঁকে কান ঝালাপালা করে দেওয়া শব্দ নিয়ে ভারতের ঝরনাটা আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে।
ঝরনার দিকে এগোতে গিয়েই বাধা পেলাম স্থানীয় লোকজনের, কিছু দূর পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমানা। এর পর থেকেই না কি ভারতের সীমানা, ওপারে যাওয়া মানা।
চরম গরমে এত দূর হেঁটে এসে পকেটে রাখা পাথরটা ছুড়ে ঝাঁপ দিল চঞ্চল, তার পানির ঝাপটায় ভিজে চুপচুপে আমরা। গায়ে পানির ছোঁয়া লেগেছে, আর কার সাধ্য আছে আমাদের পানি থেকে দূরে রাখে, তা-ও আবার পাহাড়গলা হিম হিম পানি।
এই ঝরনাটা বাংলাদেশের না, তবে এর সবটুকু পানি এসে পড়েছে এ দেশেরই মাটিতে। এটি দেখার সবচেয়ে বড় আফসোস, এত সুন্দর একটা ঝরনার একেবারে নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায় না, এর উল্টো পাশে কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপারও আছে। যদি ভারতীর কাউকে নিজ দেশের এই ঝরনা দেখতে আসতে হয় তাহলে তাকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে তারপর দেখতে হবে। কারণ, এ দেশ ছাড়া এই ঝরনাটির সৌন্দর্য দেখার আর কোনো উপায় নেই।

যেভাবে যাবেন
সিলেট থেকে বাসে করে জাফলং, সেখান থেকে ডাউকি নদী পার হয়ে একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে বলবেন মাতুরতল বাজারে যাবেন, প্রায় দুই ঘণ্টা পর বাজারে এসে যে কাউকে বললেই হবে আপনি পাংতুমাই ঝরনা দেখতে যেতে চান। সানন্দে তারা আপনাকে পথ দেখিয়ে দেবে। এই রাস্তায় কোনো বিপদ নেই, ডুবে যাওয়ার ভয়ও নেই, শুধু দেশের সীমানা অতিক্রম করবেন না।

Categories
রাকিব কিশোর

ঢাকা থেকে আড়িয়াল বিলে

আড়িয়াল বিল

এলোমেলো পানি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই সামনে পড়ল টলটলে পানি। সেই পানির ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য ছিল না আমাদের কারোই। যে কয়টা লাইফজ্যাকেট আনা হয়েছিল, তা-ই গায়ে চড়িয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্রলারের এমাথা-ওমাথা থেকে!…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

প্রকৃতিবিষয়ক লাইব্রেরি নওয়াজেশ নলেজ সেন্টার থেকে হুট করেই আয়োজন ছিল এবার। জানলাম, সবাই মিলে ঘুরতে যাবে আড়িয়াল বিলে। নিমেষেই চোখের সামনে ভেসে উঠল ঢেউহীন এক পানির রাজ্য, যেখানে টলটলে জল-জঙ্গলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে শাপলা ফুলের কলি। আর আকাশজুড়ে মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে নাম না-জানা পাখিরা। কল্পনার সব রং একত্র করে রাজি হয়ে গেলাম এই ভ্রমণে। জীবনে কখনো বিল-না-দেখা আমার চোখে তখন নতুন কিছুর তৃষ্ণা। অবশেষে সেই আগ্রহের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটল গত সপ্তাহে।
ঢাকার গুলিস্তান থেকে মাওয়া ঘাটের গাড়িতে উঠে শহর-নগর-নদী পেরিয়ে দুপাশের সবুজ মাঠে চোখ বুলাতে বুলাতেই চলে এল শ্রীনগর বাজার। পানিতে থই থই করছে শ্রীনগর বাজারের চারপাশ। কালভার্টের নিচ দিয়ে বিলের দিকে ছুটছে খালের পানি। সেদিকে তাকিয়েই মনটা আনন্দে নেচে উঠল; অনেক পানি পাওয়া যাবে তাহলে। ভেজবাজার নামের এক জায়গা থেকে ট্রলার নিলাম। দিনচুক্তি ভাড়া। আমাদের বিকেলে আবার এখানে নামিয়ে দেবে।
ট্রলারঘাট থেকে ছোট্ট একটা খাল পেরিয়ে যেতে হয় মূল বিলে। শুরুর দিকের পানিটুকু অনেক ঘোলা। কিছুদূর পেরোতেই বদলে যেতে থাকে দুপাশের দৃশ্যপট। সবুজের মিছিলে একটু একটু করে জানান দিতে থাকে নীলচে পানির ছটা। সেই পানির ওপর কমা-দাঁড়ি-সেমিকোলনের মতো সাদাটে মেঘের আনাগোনা! চোখের সামনে শুধু সবুজ কলমিশাক আর নীলচে পানি। একসময় অজানা লতায় আটকে গেল আমাদের ট্রলারের প্রপেলার। একটুখানি বিরতি। এর পরই আবার যখন ট্রলার চলা শুরু হলো, তখন ঠিক চোখের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সুন্দরের কারখানা। একটা বাঁক পেরোতেই চোখে পড়ে অদ্ভুত এক দৃশ্য! অগণিত কচুরিপানাকে একত্র করে নৌকা বানিয়ে ফেলেছেন একজন। বিশাল এক বাঁশ নিয়ে সেই নৌকা চালিয়েও নিয়ে যাচ্ছেন! আরেকটা বাঁক পেরোতেই শুরু হলো দিনের সবচেয়ে ভালো লাগা মুহূর্তগুলোর। খোলা জলাপ্রান্তর পেরোতে পেরোতে হঠাৎ ঢুকিকচুরিপানার জঙ্গলে। সেখান থেকে বের হয়েই শাপলা ফুলের অরণ্যে গিয়ে পড়ি। হাঁচড়েপাঁচড়ে শাপলা তুলে তার ডাঁটায় এক কামড় বসাতে না বসাতেই চোখের সামনে এসে পড়ে একটা হিজলগাছ। তার ওপরে আবার ভুবনচিলের পাখা গুটিয়ে বসে থাকা, সাদা বকের খেয়ালি ওড়াউড়ি।
এলোমেলো পানি পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই সামনে পড়ল টলটলে পানি। সেই পানির ডাক উপেক্ষা করার সাধ্য ছিল না আমাদের কারোই। যে কয়টা লাইফজ্যাকেট আনা হয়েছিল, তা-ই গায়ে চড়িয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্রলারের এমাথা-ওমাথা থেকে!
এবারে গন্তব্য ‘গাঁধিঘাট’। পেটভরা খিদে নিয়ে

বিলের জলে কার ছায়া… ছবি: লেখক

ঘাটে উঠে দেখি ত্রিসীমানায় কোনো হোটেল নেই। অনেক হেঁটে একজনকে পেলাম। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, এখানে ভাত পাওয়া যাবে কোথায়? তিনি হাত নেড়ে বললেন, নেই। এখানে কিচ্ছু পাওয়া যায় না। বিলের মধ্যে খোলা আসমানের নিচে নৌকার ওপরে মাছ-ভাত খাওয়ার স্বপ্ন ততক্ষণে শরতের মেঘের মতোই মিলিয়ে গেছে। রাক্ষুসে খিদে পেটে নিয়ে ছুট লাগালাম মাওয়া ঘাটের দিকে। পাঁচটা ইলিশ চলে গেল আমাদের পেটে। এরপর পেটে হাত বুলানো, ঘুমে চোখ জড়ানো আর ক্লান্ত-অবসন্ন দেহ নিয়ে চোখ বুজে শহরের উদ্দেশে রওনা। চোখের পাতায় এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে ভুবনচিলের ওড়াউড়ি আর চিংড়ির দৌড়ঝাঁপ। নদী-খাল আর সাগর দেখা শেষে এবার স্মৃতিতে গেঁথে রাখলাম বাংলাদেশের একটা ‘বিল’।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে আড়িয়াল বিলে এক দিনেই ঘুরে আসা যায়। ঢাকার গুলিস্তান থেকে ‘ইলিশ’ গাড়িতে করে মাওয়া ফেরিঘাটের দিকে রওনা দেবেন। মাঝপথে শ্রীনগরের ভেজবাজারে নেমে পড়বেন। ভাড়া পড়বে ৬০ টাকা করে। সেখান থেকে ভালো একটা ট্রলার দেড় হাজার টাকায় সারা দিনের জন্য ভাড়া নিয়ে ঘুরে আসুন আড়িয়াল বিল। একটা জিনিস বুকের মধ্যে গেঁথে নিয়ে যাবেন, এ দেশের সবকিছুই আমাদের। কাজেই এগুলো কোনোভাবেই আমরা নষ্ট করব না। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন ও অপচনশীল কিছু ফেলব না। আমি যে সৌন্দর্য দেখার জন্য এখানে ছুটে এসেছি, আমার ছোট ভাই, সন্তান যেন কয়েক দশক পরও এখানে এসে ঠিক আমার মতো করেই চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে বলতে পারে, ‘দেখো দেখো, আমাদের বাংলাদেশ কী সুন্দর!’

Categories
রাকিব কিশোর

মাথায় রোমাঞ্চের ভূত চাপল

 
টানা আট ঘণ্টা বৃষ্টিতে সৃষ্ট পাহািড় ঢল ঠেলে আর শরীর ভর্তি গোটা ৭০-৮০টা জোঁক নিয়ে শেষ বিকেলে আমরা যখন লুংথাউসি পাড়ার সীমানায় পা রাখলাম তখন আর এতটুকু শক্তিও অবশিষ্ট রাখেনি খেয়ালি সবুজ পাহাড়…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot
সুখে থাকলে ভূতে কিলায়, আমাদেরও মনে অনেক সুখ ছিল, বগালেক থেকে চেনা রাস্তায় হেঁটে হেঁটে পাড়ি জমাচ্ছিলাম কেওক্রাডাং হয়ে ওই সুদূরে তাজিনডং পাহাড়ের দিকে। পথিমধ্যে দার্জিলিং পাড়ায় এসে স্থানীয় এক পাহাড়ির কথা শুনে মাথায় রোমাঞ্চের ভূত চাপল, মাথার ঠিক এক হাত ওপরের ধবধবে সাদা মেঘ ফেলে চোখ ছুটে গেল অচেনা পাহাড়ি জঙ্গলের গাছের িভড়ে, হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের দুরের ঘন-জঙ্গল। সেদিকে নাকি ‘লুংথাউসি’ নামক এক মেঘ-বৃষ্টির পাড়া আছে, সে পাড়ার নিচ দিয়ে অনেক দূর হেঁটে গেলে আছে এক অদ্ভুত পাহাড়ি ঝরনা, নাম তার ‘জিংসাম সাইতার’।
কথা শেষ না হতেই। তাকিয়ে দেখি আমাদের দলের জুনায়েদ আর আরমান ভাই টিং টিং করে লাফিয়ে নেমে গেছে দার্জিলিং পাড়ার বাঁ-পাশ ধরে সবুজ ঘাস বিছানো অন্ধকার বুনোপথ ধরে। তাদের পিছে পিছে ঘন গাছের অন্ধকারে সানগ্লাস পরে নামা শুরু করলেন হাসান ভাই, এই পাহাড়ি পথে উষ্ঠা খাওয়ার উদ্বোধন শুরু হলো তাঁকে দিয়েই। পাহাড়ে ওপরে ওঠার চেয়ে নিচে নামা কঠিন, আর সেই সময়ে যদি পায়ের নিচে থাকে ঝুরঝুরে মাটি তাহলে আর দেখতে হবে না! প্রায় ৮০ ডিগ্রি কোণ ধরে একটানা ২০০০ ফুট খাড়া নামতে থাকলাম আমরা, পরিস্থিতি এমন যে পা একটু পিছলালেই সোজা পড়ব নিচে নামতে থাকা সঙ্গীর ঘাড়ে। এরপরে আবার ওঠা, আমাদের দুঃখ দেখে আকাশও কেঁদে দিল! পরিস্থিতি মুহূর্তেই পরিণত হলো রণাঙ্গনে। টানা আট ঘণ্টা বৃষ্টিতে সৃষ্ট পাহািড় ঢল ঠেলে আর শরীর ভর্তি গোটা ৭০-৮০টা জোঁক নিয়ে শেষ বিকেলে আমরা যখন লুংথাউসি পাড়ার সীমানায় পা রাখলাম তখন আর এতটুকু শক্তিও অবশিষ্ট রাখেনি খেয়ািল সবুজ পাহাড়। আমাদের দেখেই বেড়া বানানোর কাজ ফেলে ছুটে এলেন পাড়ার প্রধান লালমিং বম, ধরাধরি করে একেকজনকে শুইয়ে দিলেন সবুজ পাহাড়ে ঘেরা লুংথাউসির টুকটুকে লালমাটির জমিতে। আদর-আপ্যায়নের কমতি ছিল না এতটুকুও। তখনো আমরা জানতাম না যে চোখ বুজেছিলাম মেঘের রাজ্যে! বুঝলাম যখন সকাল হলো। রাতে থাকার জন্য চারটা তাঁবু টানিয়েছিলাম, সেগুলো ভিজে জবজবে, চারপাশে তাকিয়ে দেখি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পায়ের নিচ থেকে মেঘেরা কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরের দিকে, যেন এইমাত্র তাদের স্কুল ছুটি হলো।
এরপর ‘মারফা’ খেত ডিঙিয়ে, বাঁশের ঝাড় মাড়িয়ে, বুনো ময়না পাখি উড়িয়ে গলাসম ঘাসে পিছলে পিছলে নামতে থাকলাম যেন জগতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিযানে। টানা দেড় ঘণ্টা নামার পর নিজেদের আবিষ্কার করলাম টলটলে জলের এক পাথুরে ঝিরিতে। সে ঝিরিপথের দুধার থেকে গলগল করে নামছে বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি মাটি ধুয়ে নামা এই পানিতে এখন ময়লার বিন্দুমাত্র লেশও নেই, হাঁটুপানিতে নেমেই আঁজলা ভরে মুখে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললাম দুচোখ বন্ধ করে। আকাশসম উঁচু দুপাশের পাহাড়ের মাঝে গুটি গুটি পায়ে হাঁটতে থাকা নিজেদের নিতান্তই ক্ষুদ্র প্রাণী মনে হচ্ছে। কোথাও হাঁটুসম পানি আবার কোথাও কোমরসম। জায়গায়-বেজায়গায় গলা পর্যন্ত এসেও ঠেকেছে। সে পানিকে হাতের ধাক্কায় ঠেলেঠুলে আমরা যখন বাঁকের পর বাঁক পেরোচ্ছি তখনি একের পর এক ছোট ছোট পাহািড় ঝরনারা দল বেঁধে সামনে চলে আসছে। ক্রমাগত পানির শব্দ যেন পুরো জঙ্গলে ছড়িয়ে দিয়েছে সুরের এক মায়াজাল। প্রায় তিন ঘণ্টা পাথুরে ঝিরিতে হেঁটে অবশেষে আমরা পৌঁছালাম জিংসাম সাইতার ঝরনাতে।
.একটা বিশাল পাহাড়ের ঠিক দুই পাশ দিয়ে সমানতালে একনাগাড়ে পড়ছে ধবধবে সাদা ঠান্ডা পাহাড়ি ধারা। তার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হলেও সাহস লাগে ধরাধমের এই দোপেয়ে জাতির। ঝমঝম শব্দে গড়িয়ে পড়া অদ্ভুত সুন্দর এই ঝরনার নামকরণ করা হয়েছিলো নাকি পাহাড়ি এক মেয়ের নামে, তার নাম ‘জিংসাম’, কোনো একসময় এই ঝরনার ওপরে পানি নিতে আসার সময় সে পা পিছলে পড়ে মারা যায় প্রায় দেড় শ ফুট নিচের পাথুরে জলের জমিতে। তার নাম অনুসারেই স্থানীয়রা এই ঝরনার নাম রাখেন জিংসাম সাইতার, পাহাড়ি ভাষায় ‘সাইতার’ মানে ঝরনা।
ঝরনাজলে জোঁকের সঙ্গে যখন আমরা গোসলে ব্যস্ত ততক্ষণে আকাশের আলো কমে গেছে, ঝরনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আকাশ থেকেও নামছে বৃষ্টির ফোঁটা, পুরো জঙ্গল ঝাঁপিয়ে নামছে জলের বান। এমন রোমহর্ষক পাহাড় আমি কখনো বান্দরবানে দেখিনি, দেখিনি এমন অসহ্য সুন্দর সবুজও, সবকিছু ছাপিয়ে জিংসামের বিশালতা মুগ্ধ করে রেখেছিল আমাদের ছোট্ট এই দলের সব সদস্যকে। দিন শেষে আমরা যখন দূর পাহাড়ের মেঘের দিকে যাত্রা করেছি তখনো বারবার পেছন ফিরে দেখেছি জলের একটানা নাচন। আর মনে মনে ভেবে রেখেছি এই ঝরনাপাড়েই এক রাতে তাঁবু গেড়ে ঘুমাতে হবে। ঝিরঝির পানির শব্দের সঙ্গে চোখ মেলতে হবে জোনাকির মিছিলে…
আমরা গিয়েছিলাম আগস্ট মাসে। এখনো পানি আছে এখানে। জানুয়ারি থেকে মার্চ অবশ্য ঝরনা শুকনা থাকে।
যেভাবে যাবেন
বান্দরবান থেকে সোজা রুমা বাজারের গাড়িতে উঠে চলে আসবেন বগালেক, সেখান থেকে পায়ে হেঁটে পাসিংপাড়া হয়ে নেমে যাবেন রুমনাপাড়ায়। স্থানীয় এক গাইড নিয়ে এরপর দিনের আলোকে বিদায় জানিয়ে ঢুকে পড়বেন মেঘ পাহাড়ের দেশের জঙ্গল অংশটুকুতে। এরপর শুধু হাঁটাপথ, ক্লান্তিহীন এই পথের শেষ প্রান্তে পেয়ে যাবেন পাহাড় ডিঙিয়ে ছুটে আসা অবাধ্য সুন্দর জিংসাম সাইতারকে।
Categories
রাকিব কিশোর

জলসবুজের বাদলের দেশে

 

 পায়ের পাতায় মেঘের ছোঁয়া, চোখের পাতায় মেঘলা ধোঁয়া, আর ছাতা মাথায় ভেজা ঘাসে শোয়া—সবকিছু বারবার অপার্থিব সুখের জানানই যেন দিচ্ছিল।…রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের অনেক জায়গায়ই তাঁবু খাটিয়ে রাত পার করেছি, সেই রাতগুলোতে আকাশ ভরা জ্যোৎস্না যেমন ছিল, তেমনি ছিল গা ছমছম করা শেয়ালের হুংকারও। রাতগুলোতে নিকষ আঁধার ভেদ করা অমাবস্যা যেমন ছিল, তেমনি ছিল কলজে পানি করা বুনো হাতির দৌড়ও। গনগনে গরম যেমন ছিল, ঠিক তেমনি ছিল কনকনে ঠান্ডার নির্মম দাপটও…

একটা রাত আর কত রোমাঞ্চই বা দিতে পারে!!! আমার সব ধারণাকে স্রেফ উড়িয়ে দিল আলীকদম ভ্রমণের এক রাত। গিয়েছিলাম মেঘ-পাহাড়ের দেশে, আমরা গিয়েছিলাম জলসবুজের বাদলের দেশে।

আমরা হেঁটে ছিলাম হাঁটুপানি, কোমরপানি, গলাপানি পার হয়ে মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির মধ্য দিয়ে। বাতাসের হিল্লোল থেকে জলের কল্লোল—কোনোটাই বাদ পড়েনি এই ভ্রমণে। ঢিপঢিপে বুক নিয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গ যেমন হাতড়েছি, তেমনি টিপটিপে বুক নিয়ে ঘন অন্ধকার রাতে টপকেছি মেঘের ওপরের পাহাড়কেও।

আর সকাল দেখেছি দুধসাদা মেঘের ভেতরে জেগে। পায়ের পাতায় মেঘের ছোঁয়া, চোখের পাতায় মেঘলা ধোঁয়া, আর ছাতা মাথায় ভেজা ঘাসে শোয়া—সবকিছু বারবার অপার্থিব সুখের জানানই যেন দিচ্ছিল।

পর্যটনের দিক থেকে বিবেচনা করলে বান্দরবানের সবচেয়ে অবহেলিত উপজেলা আলীকদম। কেউ গোনাতেই ধরে না। এক সুড়ঙ্গ ছাড়া সেখানে তৃষ্ণা মেটানোর মতন আর যে কিছুই নেই!

কয়েক মাস ধরে লিমন বড়ুয়া বলছেন, আলীকদমে এক পাহাড় আছে, নাম তার ‘মেরাইথং জাদি’। বড় কঠিন সে পাহাড়ের রাস্তা, একটানা দুই-আড়াই ঘণ্টা উঠতে হয়। সেখান থেকে নাকি হাত বাড়ালেই চাঁদ ছোঁয়া যায়। জ্যোৎস্নার আলোয় দূরের পাহাড় গোনা যায়—লিলুয়া বাতাসে প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও কম্বল গায়ে ঘুরতে হয়!

আমরাও কম্বল নিয়ে গিয়েছিলাম, বৃষ্টি হবে মনে করে রেইনকোট, ছাতা, পলিথিন কী নিইনি সঙ্গে! হঠাৎ করেই শুনি সাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে, ৪ নম্বর বিপৎসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এদিকে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট ওপরের পাহাড় চূড়াতে আমাদের মাথার ওপরে দুনিয়ার সব ঠান্ডা নিয়ে কনকনে এক চাঁদ উঠছে, পূর্ণিমার আলো থইথই করছে কালচে পাহাড়ের কিনারা বেয়ে, সে আলোয় চলছে মেঘের লুকোচুরি! বৈরী আবহাওয়ার কোনো চিহ্নই নেই আমাদের আশপাশে।

এরই মধ্যে পাহাড়ের রাত তার সৌন্দর্য নিয়ে চলে এল আমাদের দেখতে। মুহূর্তেই আমাদের তাঁবু এলাকা মেঘে হারিয়ে গেল, এক তাঁবু থেকে আরেক তাঁবু দেখা যায় না। এ পাহাড়-ও পাহাড়, দূরের পাহাড় থেকে মেঘের দল ছুটে এল। শরীরে ততক্ষণে শীত জেঁকে বসেছে, জগতের কোনো কিছুই বেশি হলে ভালো হয় না। আমাদের বেলায়ও তা-ই হলো—মেঘে মেঘে অনেক ভারী হয়ে গেল কালচে মেঘের দল। ওগুলো আর নড়তে পারে না—অনেক পরিশ্রম করেছে ও পাহাড় থেকে এ পাহাড়ে আসতে, এখন ঘেমে-নেয়ে একাকার, টুপটুপ করে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে আমাদের সদ্য খাটানো বিছানো তাঁবুতে।

আমাদের ‘বেদিশা ট্যুরিস্টের দল…’ ততক্ষণে বুঝতে শুরু করেছে ভালোবাসার অত্যাচার। হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে যে যার তাঁবুতে ঢুকেই চেইন লাগিয়ে চাঁদের গন্ধ নিতে চাইল।

রাত তখন সাড়ে তিনটা। হঠাৎ করে সব জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে হাজারটা ক্রুদ্ধ হাতির মতন বুনো আক্রোশ নিয়ে আমাদের ১২টা তাঁবুর ওপর আছড়ে পড়ল সাগরের ওই নিম্নচাপটা। আমাদের পাহাড়ের অ্যাডভেঞ্চার মুহূর্তেই পরিণত হলো ‘ম্যাডভেঞ্চারে’!

লন্ডভন্ড হয়ে গেল আমাদের সাজানো সংসার, কয়েকটা তাঁবুর লোহার পিন খুলে উড়ে গেল প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট নিচের কোনো টিনের চালে—তাঁবুর ভেতরে যারা ছিল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা নিজেদের আবিষ্কার করল কোমরপানির ভেতরে, প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে তাঁবু উড়ে যায় যায় দশা, যে যেভাবে পারছে তাঁবু ধরে বসে আছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না—মটমট করে তাঁবুর লোহার শিক ভাঙা শুরু হলো। সেই ভয়ংকর বিজলি রাতে আমাদের ২৮ জন ছেলেমেয়ে অসহায়ের মতন বের হয়ে গেল তাঁবু থেকে, কেউ কাউকে দেখছে না মেঘের জন্য—আশপাশে সব ধবধবে সাদা, থেকে থেকে সেখানে চমকাচ্ছে বিজলির আলো!!

ছুটতে শুরু করা সবার গন্তব্য কিছুটা দূরের জুমখেতের ভেতরে ছোট্ট একটা শণের ঘর। সেই ঘূর্ণিঝড়ের রাতে বিজলির দেখানো রাস্তায় অচেনা ধানখেতের ভেতর দিয়ে জীবন বাঁচানো দৌড়ের মধ্যে যে অ্যাডভেঞ্চার লুকিয়ে আছে, সেটা হাজার চেষ্টায়ও আর কোথাও কোনো দিন পাওয়া যাবে না।

সেই কুঁড়েঘরে ভেজা কাপড় নিয়ে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবার একটাই চাওয়া ছিল, কখন ফুটবে ভোরের আলো, কখন থামবে এই মাতাল ঘূর্ণিঝড়। কারও কাছেই ব্যাগ নেই, সব ব্যাগ পানি ভর্তি তাঁবুর মাঝে ফেলে রেখে এসেছে।

অবশেষে পুব আকাশ আলো করে এল সেই মহা কাঙ্ক্ষিত সকাল, ভোরের আলো ফুটতেই ঝড় তার সব ছানাপোনাকে নিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে গেল দূরের এক পাহাড়ের আড়ালে! এ যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য! পায়ের নিচ থেকে ঘাসের গা বেয়ে বেয়ে উঠছে সাদা সাদা ফেনিল মেঘ, তুলোর মতন লতানো সাদাটে আঁশ ধরে ধরে সে সামনে এগোচ্ছে, মুহূর্তেই আমাদের ক্যাম্পসাইট ঢেকে দিল, ঢেকে দিল রাতের সব লন্ডভন্ড করা স্মৃতি। আমরা ছাতা নিয়ে বের হলাম পায়ের তলার মেঘ দেখার জন্য। একবার মেঘ আমাদের সবাইকে ভিজিয়ে দেয়, আরেকবার আমরা সবাই মেঘকে ধাওয়া করে চলে যাই একেবারে পাহাড়ের শেষ কিনারা পর্যন্ত!

এ এক অদ্ভুত মন ভালো করা খেলা…এ খেলায় ক্লান্তি নেই।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চকরিয়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে চান্দের গাড়ি দিয়ে আলীকদম যাওয়ার পথে আবাসিকে নেমে যাবেন, ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৬০ টাকা করে। আবাসিকে নেমে ডান পাশের রাস্তাটা ধরে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন আলীকদমের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় মেরাই থংয়ে। সেখানে খাবার ও পানির কোনো ব্যবস্থা নেই, কাজেই শুকনো খাবার ও পানি সমতল থেকেই নিয়ে যেতে হবে।

Categories
রাকিব কিশোর

প্রতি ঘণ্টায় পাল্টে যাচ্ছে আকাশের দৃশ্যপট

ভোরে ঘুম ভেঙে এমন দৃশ্যই ধরা পড়েছিল ক্যামেরায়। ছবি: সাহিল আরমান

চিরসবুজের বনটা হঠাৎ করেইকেঁপে ওঠে পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরনাঘেরা লোকালয়ের খুব কাছের এই জায়গাটির নাম সীতাকুণ্ড বন। এবারে আমরা তাঁবু গেড়েছিলাম জল-ঝরনার এই বনে, তারার সঙ্গে সারা রাত কথা বলেছিলাম অচিন পাথরের গায়ের ওপরে হেলান দিয়ে…লিখেছেন  রাকিব কিশোর

লোকালয়ের ঠিক পাশেই পাহাড়টি। সেই পাহাড়ে দিনভর রোদের আলো খেলা করে, হাজার পাখির মেলা বসে, আর সবুজের আসর জমে বছরের পর বছর। আঁকাবাঁকা এক ঝিরিপথে পাথর ডুবিয়ে চলে ঠান্ডা পানির আয়েশি পথচলা, সে পানির ধার ঘেঁষে এক পা ডুবিয়ে শিকারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকে সাদা বকের ঝাঁক। আর দু-কূল ছাপানো বুনোগাছের আড়ালে কৌতূহলী চোখ মেলে চেয়ে থাকে বানরের দল, তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডাকে কোনো এক দলছুট পাহাড়ি হরিণ। এমনই মায়া-ভালোবাসা আর আদর ঘিরে গড়ে ওঠা এই চিরসবুজের বনটা হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরনাঘেরা লোকালয়ের খুব কাছের এই জায়গাটির নাম সীতাকুণ্ড বন। এবারে আমরা তাঁবু গেড়েছিলাম জল-ঝরনার এই বনে, তারার সঙ্গে সারা রাত কথা বলেছিলাম অচিন পাথরের গায়ের ওপরে হেলান দিয়ে।
এবারের প্ল্যানটা হুট করেই হয়ে গেল। কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটিতে একটা মোটাসোটা ‘কম্বল’ ভরেই রওনা দিলাম চট্টগ্রাম। সকাল নয়টার গাড়ি আমাকে বিকেল পাঁচটায় নামিয়ে দিল সীতাকুণ্ড বাজারে। ইকোপাকের্র গেটটা পার হয়ে দেখি, সেখানে আগে থেকেই হাসিমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে অনেকগুলো চেনা মুখ—অপু ভাই, লিমন ভাই, রুপা আপু, আরমান ভাই ও রুবা আপু।
বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে সবাই হাঁটা শুরু করেছে, হাতে রাতের খাবারের জন্য বাজার সদাই, কী নেই তাতে! খিচুড়ি রাঁধার ডাল থেকে শুরু করে সালাদ বানানোর টমেটো পর্যন্ত রয়েছে, সেগুলোর ভিড়ে আবার থলে থেকে উঁকি দিচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা মুরগির মাংস।ঘন অন্ধকারে মোমের আলোর নাচন। ছবি: তোফাজ্জল হোসেন

সীতাকুন্ড পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে চোখ রাখলাম এক্কেবারে ওপরের পাহাড় চূড়াটায়, আর পা চালালাম সবুজ কেটে কেটে তৈরি করা একমাত্র মাটির রাস্তাটি ধরে। সে রাস্তা সাপের মতো এঁকেবেঁকে ঝুপ করে গিয়ে পড়েছে পাথুরে ঝিরিতে, সেটা দিয়ে নিশ্চিন্তে বয়ে চলেছে পৌষের শীতের ঊষালগ্নে হাড় কাঁপিয়ে দেওয়া ঠান্ডা পানি! একেকবার একেকজনের পা পড়ে সেই পানিতে আর গগনবিদারী আওয়াজে ভরে ওঠে বনের এমাথা-ওমাথা।
দিনের আলো যখন আমাদের একাকী করে তারার দেশে রেখে গেল, ঠিক সে সময় দেখা মিলল আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গার। এখানেই আমরা তাঁবু খাটাব আজ রাতে, মোমের আলোতে ভাসিয়ে দেব পাহাড়ি ঝরনার ক্ষীণ স্রোতগুলোকে, আর কনকনে বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে গলা ছেড়ে গাইব স্বরচিত কোনো গান। অন্ধকারে যখন আমাদের হাতের তালু ছাড়া নিকটবর্তী আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না, ঠিক সে সময় আমরা হাঁচড়েপাঁচড়ে উঠে পৌঁছালাম পাহাড়ের এক্কেবারে চূড়ায়, এখান থেকে একনিঃশ্বাসে পুরো ঝরনাটা দেখা যায়, বর্ষাকালে চারপাশের বন, পাহাড় আর বাতাস কাঁপিয়ে যেই ঝরনাটা নেমে আসে—সেখানে এখন হেলেদুলে বয়ে চলেছে রুগ্ণ পানির ধারা। এই জায়গার নাম সুপ্তধারা ঝরনা।
ক্যাম্পিং করার প্রথম শর্তই হলো তাঁবু ফেলার জন্য ভালো ও আরামদায়ক একটা জায়গা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো খাবার রান্নার জন্য আগুনের ব্যবস্থা করা, আর তৃতীয় শর্ত হলো আয়েশ করে আসমান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাওয়া। সুতরাং বসে থাকলে তো আমাদের হবে না, বিরাট বিরাট সব পাথর পড়ে আছে আমাদের সামনে, দুনিয়ার আর সব মানুষের কাছে এগুলো সামান্য পাথর হলেও আমাদের চোখে তখন এগুলো জলজ্যান্ত একেকটা বিছানা, কোন পাথরে কোন তাঁবু ফেলা হবে, তাই নিয়ে জল্পনাকল্পনা আর গবেষণায় স্রোত বয়ে গেল মিনিট পাঁচেক। টপাটপ করে সবার ব্যাগ থেকে বের হতে লাগল ভ্রাম্যমাণ ঘর, এদের মধ্যে একটা তাঁবু আবার বিশালতার দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেল, যখন সেটাকে দাঁড় করানো হলো তখন সে রীতিমতো একটা বিশাল ঘরে পরিণত হলো, যেখানে অনায়াসেই আটজন হাত-পা মেলে ঘুমাতে পারবে। তাঁবুর গায়ে বাবর আলী নেপাল থেকে নিয়ে আসা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দিল কয়েকটা।
আমি হাঁ করে তাঁবুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি পোলাপাইন সব গায়েব! কেউ চলে গেল লাকড়ি জোগাড় করতে, আগুন জ্বালাবে। আর কেউ গেল স্টোভ জ্বালাতে, কফি বানাবে। সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভয়াবহ ঠান্ডা পানিতে খাবারদাবার কাটাকুটি করতে বসে গেল রুপা দিদি! যে পানি দূর থেকে দেখলেই ঠান্ডায় গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়, সেই পানিতে অবলীলায় তিনি মুরগি, পেঁয়াজ, টমেটো কেটে আবার চাল, ডালও ধুয়ে ফেললেন! ওদিকে সবার পেটে তখন ছুঁচোর নাচন—লাকড়ি রেডি, রান্না করার জন্য খাবার রেডি, পিপাসা মেটানোর জন্য ঝরনার অঢেল পানি রেডি, আর কিসের চিন্তা। এবার জ্বালাও আগুন!
রান্না চড়িয়েছেন রুমী ভাই, তাঁকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছেন বুনো ভাই। এই দুজনের হাতের রান্না যেন শিল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবার প্লেটে প্লেটে। এতগুলো প্লেটও আসলে আনা হয়নি! ফলে কেউ খেতে বসল কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসা সন্দেশের প্যাকেটে, আবার কেউ খেতে বসল পাতিলের ঢাকনা উল্টো করে। এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন আরমান ভাই, তিনি মগের মধ্যে খিচুড়ি-মাংস ঢেলে লাল জ্যাকেট পরে বসে গেলেন কমলা আলোর কোলে।
.রান্নার স্বাদ এখনো মুখে লেগে রয়েছে, ফারহান ভাইয়ের কাছে রান্না এতই মজা লেগেছে যে তাঁকে খিচুড়ির পাতিলের আশপাশ থেকে নড়ানোই যাচ্ছে না, শেষমেশ খোকন কারিগর এসে তাঁকে পাঁজাকোলা করে তাঁবুতে নিয়ে শুইয়ে দিলেন, সঙ্গে দিলেন পানির বোতল, উনি সারা রাত পানি খেয়েই পার করে দিলেন!
রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে আমরা সবাই মুখোমুখি হলাম আকাশের, সেখান হাজার তারার মেলা বসেছে। সবাই সেজেছে আলোর সাজে। নিকষ আঁধারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সব কটা তারা যেন আমাদের জন্যই কুয়াশাকে বিদায় করে দিয়েছে আজ, আজ তাদের অতিথিদের মুগ্ধ করার রাত, আজ তাদের নিজেদের উজাড় করে আঁধার পৃথিবীটা আলোকিত করার রাত। প্রতি ঘণ্টায় পাল্টে যাচ্ছে আকাশের দৃশ্যপট, তারার সারি ক্রমেই বাড়ছে, দেখে মনে হচ্ছে রাতের সঙ্গে সঙ্গে ঘুমও ভাঙছে তাদের, একেকজন একটা একটা করে চোখ মেলছে আর একটা একটা করে তারার জন্ম হচ্ছে ঘুটঘুটে কালো আকাশের গায়ে।
এবার মোমবাতি জ্বালানো হবে। সবাই মিলে চললাম ঝরনার একেবারে কোলে, ঠান্ডা পানি পায়ে মাড়িয়ে এসে থামলাম পাহাড়ের বুকের মাঝে, প্যাকেট থেকে একের পর বের করা হলো মোমবাতিগুলো। বসানো হলো নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর। মিনিট খানেক নীরবতা, সবাই চুপ, সবকিছুই যেন স্থবির।
এরপরই অপু, লিমন বড়ুয়া, বাবর আলী, বুনো, দিদার আর ফারহান ভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় জ্বলে উঠতে লাগল মোমের শিখা, একের পর এক। পুরো ঝরনাজুড়ে তিরতির করে চলছে হাজার খানেক মোমের আলোর নাচন! মুহূর্তেই কালো পাহাড় ভরে গেল সোনালি আলোর ছটায়, সে আলোতে প্রাণ পেল ঝরনার পানি। আকাশজুড়ে মিটমিট করতে হাসতে থাকা তারার দলও ম্রিয়মাণ হয়ে যায় টিমটিমে জ্বলতে থাকা এই মোমের শিখার কাছে। তোড়জোড় শুরু হলো ক্যামেরা নিয়ে। একসময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এই আমাদের চোখের সামনেই গলে গলে থেমে গেল সোনালি আলোর নাচন। রাত তখন দেড়টা। আবার হেসেছে তারার মিছিল। আর আমরা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম তাঁবুর ঘরের ঠান্ডা পাথুরে বিছানায়, সারা রাত পৌষের শীত ছুরি চালাল কম্বলের বাইরে থাকা শরীরের অংশে। আর সবকিছু রয়ে-সয়ে আমরা চোখ বন্ধ করলাম গহিন অরণ্যে, তারার বিছানার ঠিক উল্টো দিকে।
পাহাড়ে ক্যাম্পিং করার সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, কোনো অপচনশীল জিনিস (পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট) ফেলে আসবেন না। এগুলো পুরো পরিবেশকে বিষিয়ে তুলবে। মলমূত্র এমন জায়গায় ত্যাগ করবেন, যেখানে পানির সংস্পর্শ থাকবে না, এতে করে ঝরনার পানি দূষিত হবে না। পাহাড়ে গিয়ে কাঁচা গাছ কাটবেন না, কোনো পশুপাখি হত্যা করবেন না। সবচেয়ে বড় কথা—চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না, এটা জঙ্গলের প্রাণীদের আস্তানা, আমাদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয় তাদেরই। আর পাহাড়ে অনেক ঠান্ডা, কাজেই রাতে ক্যাম্পিং করতে গেলে গরম কাপড় অবশ্যই নিয়ে যাবেন, সঙ্গে একটা তাঁবু।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে যেকোনো চট্টগ্রামের গাড়িতে উঠে সীতাকুণ্ডে নেমে পড়বেন, সেখানে এস কে এম জুট মিলের রাস্তা ধরে রেললাইন পার হয়ে ঝিরিপথে হাঁটা দেবেন পাহাড় লক্ষ্য করে। ৪০ মিনিট পর নিজেদের আবিষ্কার করবেন সুপ্তধারা ঝরনার নিচে, সেখান থেকে ডান পাশের পাহাড় বেয়ে উঠে যাবেন ঝরনার ওপরে। এবার জায়গা বেছে আরাম-আয়েশ করে তাঁবু ফেলে কাটিয়ে দিতে পারেন অসাধারণ একটা রাত।

Categories
রাকিব কিশোর

পাহাড়ঘেরা বিশাল লেকের পাড়ে

পাহাড়ের ম​ধ্যখানে নীল পানির বগালেক, ছবি: বাবর আলী

 বর্ষাকাল, পাহাড়ে যাওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর নেই। এখন পাহাড় সবুজ, এখন পাহাড়ের ঝরনাগুলোয় উথাল–পাথাল পানি, পাথুরে নদীতে জলের উচ্ছ্বাস—সব পাবেন এখন…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

পাহাড় একটা আনন্দের নাম, উচ্ছ্বাসের নাম, পাহাড় একটা হঠাৎ পাওয়া ভালোবাসার নাম। যে পাহাড়ে চোখ বুজে মুখে মেঘের স্পর্শ পাওয়া যায়, যে পাহাড়ে দুহাত ভরে হিম হিম ঝরনার পানি খাওয়া যায়, যে পাহাড়ে মেঘের ওপরে ঘুমানো যায়, পায়ের নিচে বৃষ্টি হয়, সেই পাহাড়কে ভালো না বেসে পারা যায় না। আমরা খুব ভাগ্যবান যে আমাদের দেশেও চাইলে আমরা গাড়ি নিয়ে মেঘের ওপরে যেতে পারি, আমাদের পাহাড়েও ভরদুপুরে কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুরতে পারি, আমাদের নৌকা দিয়েও পাথরের দেশে অথই জ্যোৎস্না সাগর পাড়ি দিতে পারি। যে জায়গার কথা বলছি সেটা ‘মেঘ-পাহাড়ের দেশ’ বান্দরবান। এখানে সবার আগে সূর্য ওঠে, এখানের আকাশ বাংলাদেশের আর সব আকাশের চেয়ে বড়, বিশাল, উদার, অনেক কাছের…।
অনেক তো সাগর-নদী-দ্বীপ ঘুরলেন, প্রিয়জনকে নিয়ে এবারের ঈদের ছুটিটা না হয় কাটিয়ে দিন মেঘ–পাহাড়ের দেশে। এখন বর্ষাকাল, পাহাড়ে যাওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় আর নেই। এখন পাহাড় সবুজ, এখন পাহাড়ের ঝরনাগুলোয় উথাল–পাথাল পানি, পাথুরে নদীতে জলের উচ্ছ্বাস—সব পাবেন এখন।
বান্দরবানে যে জায়গাগুলোতে যাবেন, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি জায়গার কথা বলি, যাঁরা নতুন বিয়ে করেছেন, তাঁরা নীলগিরি ও নীলাচল ঘুরে আসতে পারেন। নীলগিরিতে মেঘ দেখার জন্য আপনাকে খুব ভোরে সেখানে থাকতে হবে। সূর্য ওঠার আগে সাদাটে সবুজ পাহাড় দেখে হঠাৎ করেই মনে হবে আপনি একটা ধবধবে সাদা সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন, চারপাশে যত দূর চোখ যায়, মেঘ আর মেঘ। চাইলে যেন সকালের চায়ের সঙ্গে মেঘ মিশিয়ে খেতে পারেন। জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এই অভিযানের কাহিনি মনের ডায়েরিতে আপনাআপনিই আজীবনের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে যাবে।
যাঁরা হালকা একটু রোমাঞ্চ চান, একটু হাঁটাহাঁটির অভ্যাস আছে, তাঁরা সঙ্গীসহ হাঁচড়ে–পাঁচড়ে একটু কষ্ট করে উঠে যান বগালেকে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা বিশাল লেকের পাড়ে বসে আরামসে কাটিয়ে দিতে পারবেন সারা বিকেল, রাত। সকালে যখন ঘুম থেকে উঠবেন, তখন ফুঁ দিয়ে মেঘ সরাতে হবে দরজা, জানালা থেকে। হাজার বছর ধরে না নড়া আয়েশি পাহাড় নিমেষেই আপনাকে আরও আয়েশি বানিয়ে দেবে। এক কাপ চা হাতে যখন বারান্দায় এসে দাঁড়াবেন, তখন দেখবেন ধোঁয়া আর মেঘ মিলেমিশে একাকার।
আপনার এবারের ঈদ হোক পাহাড়ে, এবারের ভালোবাসাটুকু হোক পাহাড়ের সঙ্গে একান্ত প্রিয়জনকে নিয়ে। দু-তিন দিনের ছুটি কাটিয়ে যখন সভ্যতা নামক যন্ত্রনগরে প্রবেশ করবেন, তখন বারবার মনে হবে জীবনের সবচেয়ে সেরা সময়টা মাত্রই কাটিয়ে এলেন, কাজের ফাঁকে ফাঁকে আপন মনেই মুখ ফসকে বেরিয়ে আসব—আহা রে, কবে যাব পাহাড়ে…।

Categories
রাকিব কিশোর

মায়াবী এক লালচে মোহনীয়তা

 মধ্যরাতে মাঝপুকুরে কাদাজলে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে গোসল করার, সারা নিঝুম দ্বীপ ঘুরে আটটা মুরগি এনে বারবিকিউ করার, বাঁশের আর গাছের সাঁকো পার হয়ে শুলোবনের মাঝ দিয়ে হরিণ খুঁজে বেড়ানোর, আর মধ্যরাতে চলল নিঝুম দ্বীপের সাদা বালুর সৈকতে জ্যোৎস্নায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

অ্যাডভেঞ্চার যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের দড়ি দিয়ে বেঁধেও ঘরে রাখা সম্ভব না। এই যাত্রার শুরুটাই হয়েছে লঞ্চ ধরার অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে। যে লঞ্চ ছাড়ার কথা ঠিক বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে, সেই লঞ্চ আমরা টেনেটুনে ঘাটের সঙ্গে আটকে রেখেছি ৫টা ৫৭ মিনিট পর্যন্ত—আমাদের দুজন সময়মতো এসে পৌঁছায়নি বলে। হাদী ভাই আর তামান্না ভাবি সদরঘাটের তীব্র যানজটে সিএনজি ছেড়ে পাক্কা সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে এসে যেই না লঞ্চে উঠলেন, তখনই সশব্দে হুড়হাড় করে ছেড়ে দিল আমাদের ভ্রাম্যমাণ এক রাতের বাড়ি। সেই মুহূর্ত থেকেই অ্যাডভেঞ্চারের শুরু।
এরপর লঞ্চ ছাপিয়ে অ্যাডভেঞ্চার ছড়িয়ে গেছে দোদুল্যমান ট্রলারে, এক আনাড়ি মাঝির হাতে পড়ে। হাতিয়ার তমরদ্দি ঘাট থেকে রওনা দিলাম নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে। মাঝি সবাইকে ডান দিকে তাকাতে বলে চালায় বাঁ দিকে, আর বাঁ দিকে তাকাতে বলে সোজা ঠেকিয়ে দেয় কোনো এক বালুচরে! এভাবেই পৌঁছে যাই নোয়াখালী জেলায় বঙ্গোপসাগরের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ নিঝুম দ্বীপে। কাদা, জল আর লোনা পানি ডিঙিয়ে যখন তীরে নামি, তখন পুব আকাশে উঁকি দিচ্ছে রুপালি চাঁদের আভা।
এরপরের গল্পটুকু তুমুল উচ্ছ্বাসের, বাঁধভাঙা আনন্দের আর অজানাকে আপন করে নেওয়ার, মধ্যরাতে মাঝপুকুরে কাদাজলে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে গোসল করার, সারা নিঝুম দ্বীপ ঘুরে আটটা মুরগি এনে বারবিকিউ করার, বাঁশের আর গাছের সাঁকো পার হয়ে শুলোবনের মাঝ দিয়ে হরিণ খুঁজে বেড়ানোর, আর মধ্যরাতে চলল নিঝুম দ্বীপের সাদা বালুর সৈকতে জ্যোৎস্নায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
পরের দিনের শুরুটা হলো কবিরার চরের সবটুকু প্লাস্টিক আর অপচনশীল জিনিস খুঁজে বের করে আগুন জ্বালিয়ে। তাঁবু খাটিয়ে ইলিশ ও চেউয়া মাছ ভাজি দিয়ে বনভোজন শেষে যখন ঠিক হলো আমাদের সেদিনের রাত কাটবে নিঝুম দ্বীপের গহিন জঙ্গলে, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম এ রাত হবে জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাত! তবে কে জানত সেই রাতে আমি, জাফর, কবির, মণ্ডল আর মাহফুজ জঙ্গলে ঢুকে যাব লাকড়ি টোকাতে! কে জানত, লাকড়ি খুঁজতে গিয়ে নিজের মাত্রই কিনে আনা মোবাইল ফোনটি জঙ্গলে হারিয়ে আসবে জাফর!
আমাদের ১১ জনকে নামিয়ে দিয়ে যে দলটা চলে গিয়েছিল বাকি সব বাক্সপেটরা নিয়ে আসতে, তারা পেয়েছে আরেক দারুণ দৃশ্য! ১৬ জনের দলটা রাত ১০টায় যখন বঙ্গোপসাগরে আবার নৌকা ভাসাল, ততক্ষণে তাদের পথ দেখাতে পুরো আকাশ আলো করে উঠল ফাল্গুনী পূর্ণিমার চাঁদ! উথালপাতাল বাতাস আর ঘোরলাগা চন্দ্রাহত হয়ে যখন তারা ভিড়ল মূল ক্যাম্পিং সাইটে, তখন সেটা একটা অন্য দুনিয়া—আগুন জ্বলছে তাঁবুগুলোকে ঘিরে। আর সেই আলোতে কেওড়াবনজুড়ে তৈরি হয়েছে মায়াবী এক লালচে মোহনীয়তা।
সেই রাতটা ছিল অস্থির এক মাদকতায় পূর্ণ! শহুরে যে ছেলেগুলো কোনো দিন নিজের বিছানা ছেড়ে মাটিতে ঘুমায়নি, তারাই ঘুমাল চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া খোলা জঙ্গলের এক তাঁবুতে। ঠান্ডায় শিশিরভেজা তাঁবুর পর্দায় কাঁপতে কাঁপতে বের হয়ে সেই আগুন পোহাতে লাগল মাঝরাত্তিরে…এখানে-ওখানে ক্যাম্পফায়ার আর ভর্তা-ভাতের পাট চুকিয়ে যেই চোখ বোজার সময় হলো, ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে আমাদের চারপাশে ডেকে উঠল শিয়ালের দল—বুনো শিয়াল। ভয়ার্ত আমরা দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে টর্চলাইট ধরলাম তাদের চোখ বরাবর! জ্বলজ্বলে সেই চোখের ভাষা বুঝতে বাকি নেই কারও—যেন ঠান্ডা চোখে জানিয়ে দিচ্ছে আমরাই অনাহূত এখানে, এটা তাদের এলাকা।
কে শোনে কার কথা! ভোর চারটায় ধুম করে শাহেদ চেঁচিয়ে উঠল, ‘বস্তিবাসী জাগোওওও, হুঁশিয়ার, সাবধান’—আর পায় কে! ধুমধাম করে তাঁবু ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ট্যুরিস্টের দল। সবাই ছুটে গেল আগমনরত শিয়ালের দিকে, ভয় পেয়ে ভেগে গেল শিয়ালের পাল, এরপর ঘণ্টা খানেক ধরে চলল এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ওরা দল বেঁধে আসে, আমরা দল বেঁধে ওদের তাড়াই। আবার আসে, আবার তাড়াই। শেষমেশ যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন ২১ ফেব্রুয়ারি।
খালের পানিতে ভরা জোয়ারের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, কুয়াশাঢাকা ১৩টা তাঁবুর মাঝখানে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পতাকাটা, ধোঁয়া ওঠা ক্যাম্পিং সাইট, আর হিমশীতল ঠান্ডা বাতাসে হেলানো-দুলানো কেওড়াবাগান। আমাদের ফেরত নেওয়ার ট্রলার যখন আবার জঙ্গলের খালে আসছে, তখন পেছনে ফেলে যাচ্ছি শান্তস্নিগ্ধ এক জল-জঙ্গলের গল্প। আর সামনে অবারিত জলরাশি হাতছানি দিয়ে ডাকছে নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়।

যেভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন একটামাত্র লঞ্চই হাতিয়ায় যায়। লঞ্চ ছাড়ে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে। সেই লঞ্চ পরদিন সকালবেলা হাতিয়া পৌঁছায়। হাতিয়া থেকে ট্রলারে করে সোজা নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টা, আর ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে। ফেরার সময় একই পথে আসতে পারেন, অথবা হাতিয়া হয়ে চলে আসতে পারেন। ফেরার লঞ্চ কিন্তু দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে।

Categories
রাকিব কিশোর

যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন

গাছে গাছে থোকায় থোকায় ধরে আছে লটকন। ছবিটি নরসিংদীর কামারটেক থেকে তোলা। ছবি: লেখক

পুরো গাছভর্তি লটকন পেকে হলুদ হয়ে আছে, সেই পাকা রঙে বিকেলের আলো আরও সোনালি করে তুলেছে পুরো পরিবেশ। হাঁ করা মুখ নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন। আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে, গাছের শরীর বেয়ে, কাণ্ড বেয়ে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

খুব ছোটবেলায় হাতিয়ায় নানাবাড়িতে একটা লটকনগাছ দেখেছিলাম। সেটাতে ধরে থাকত থোকায় থোকায় লটকন। কালেভদ্রে কখনো বর্ষাকালে গ্রামের বাড়িতে গেলে সেই লটকনগাছ ঘিরে উচ্ছ্বাসের অন্ত থাকত না। টক-মিষ্টির অপূর্ব স্বাদের এই ফলের নাম লটকন কেন হলো সেটা জানি না, তবে ধারণা করতাম থোকায় থোকায় লটকে বা ঝুলে থাকে বলেই এমন নামকরণ। সেবার ঝড়ে লটকনগাছটা ভেঙে পড়ে গেল, এরপর আর কোথাও লটকনগাছ দেখিনি।
এখন লটকনের মৌসুম। একবারে ঝোঁক পেয়ে গেল, খোঁজ লাগালাম কোথায় লটকন বাগান আছে। কোথায় গেলে একসঙ্গে অনেক লটকনগাছ দেখা যাবে। সব অঞ্চলের বন্ধুদের কাছে প্রশ্নটা ছড়িয়ে পড়ল, উত্তর এল কেবল নরসিংদী থেকে। এক বন্ধুর বাড়ি ওখানে। সে জানাল, এদিকে লটকনগাছ ভরা, দোস্ত, আইসা পড়। এখানে রাস্তাঘাটে ‘কোটি কোটি’ লটকন পইড়া রইছে।
দেরি না করে ঈদের পরদিন (৮ জুলাই) সকাল সকাল রওনা দিলাম নরসিংদীর উদ্দেশে। ঢাকা থেকে নরসিংদী যাওয়ার অনেক রাস্তা! একবার গিয়েছিলাম সায়েদাবাদ দিয়ে, পরেরবার গেলাম পূর্বাচলের ৩০০ ফুট রাস্তা দিয়ে। আর এবার যাচ্ছি উত্তরা-টঙ্গী হয়ে। দুপুর সাড়ে ১২টায় নরসিংদী নেমে বন্ধু শাহেদের বাড়িতে উঠলাম। সেখান থেকে শাহেদের মামা লটকন বাগান ঘুরে আসার জন্য গাড়ি দিয়ে দিলেন। নরসিংদীর পাঁচদোনা মোড় থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে আমাদের যেতে হবে ‘মরজাল’ নামের স্থানে। সেখানেই নাকি লটকনের বাগান। চালক কিছুক্ষণ চালিয়ে গাড়ি সোজা ঢুকিয়ে দিলেন কামারটেকের রাস্তায়। জানালেন, এখানেই লটকনের বাগান দেখা যাবে। চোখ কচলে গাড়ির জানালা দিয়ে সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, একটা লটকনগাছও যেন মিস না হয়।
রাস্তা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে সামনের দিকে। পিচ ঢালা রাস্তার দুই পাশে নাম না জানা গাছের সারি। হঠাৎ করে শাহেদ চেঁচিয়ে উঠল, ‘লটকন’, ‘লটকন’! তার আঙুলের নিশানা বরাবর আমিও দাঁড়ালাম, ওই তো বাঁ পাশে এক গাছভর্তি লটকন ঝুলে আছে। তড়িঘড়ি করে নামতে যাচ্ছিলাম। ড্রাইভার বাধা দিলেন, ‘সামনে আরও আছে, এগুলো তো শোপিস, চলেন গোডাউন দেখাই!’ কথায় বলে অপরিচিত জায়গায় অভিজ্ঞদের কথা শুনতে হয়, নইলে বিপদ। শক্ত হয়ে বসে রইলাম আরও বেশি গাছ দেখার আশায়। কিন্তু আর তো পাওয়া যাচ্ছে না! তবে কি এই একটাই গাছ আছে পুরো নরসিংদীতে। মন খারাপের ঠিক চূড়ান্ত অবস্থায় বিকেলের সোনালি আলোটা যেন আরও বেশি সোনালি রং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনের দুই পাশের গাছগুলোতে। হটাৎ করেই যেন লটকনের রাজত্বে চলে এলাম।
পুরো গাছভর্তি লটকন পেকে হলুদ হয়ে আছে, সেই পাকা রঙে বিকেলের আলো আরও সোনালি করে তুলেছে পুরো পরিবেশ। হাঁ করা মুখ নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন। আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে, গাছের শরীর বেয়ে, কাণ্ড বেয়ে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে, কোথায় নেই তারা। একেবারে গোড়া থেকে শুরু করে চোখ যায় না এমন ওপর পর্যন্ত ধরে আছে অজস্র লটকন। একেকটা আকারেও বিশাল। প্রতিটা গাছতলায় ঝরা পাতার মতো পাকা লটকন পড়ে আছে। খাওয়ার কেউ আছে বলে মনে হলো না। হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে একটা লটকন ছিঁড়ে মুখে দিলাম। আহ! অমৃত। টসটসে রসে ভরা কী মিষ্টি! এত বড় লটকন সচরাচর দেখা যায় না। পাশে বাড়িঘর। তার পাশে কাঁঠালগাছের সারি, মাঝখানে লটকনের মিছিল।
আবার গাড়িতে উঠলাম, মাইলের পর মাইল রাস্তাজুড়ে লটকনের সমারোহ। এক জায়গায় এত বেশি লটকন ধরে আছে যে আর না থেমে পারলাম না, এখানকার লটকন আরও বড়। একসময় দেখি এক লোক আমাদের ডাক দিলেন, বললেন, ‘লটকন খাবেন? এদিকে আসেন। এদিকে অনেক লটকন আছে। গিয়ে দেখি তিনি মূলত লটকন ব্যবসায়ী। ছোটখাটো একটা আড়ত আছে তাঁর। সেখানে ঝুড়িতে লটকন সাজানো হচ্ছে। শহরে নিয়ে বিক্রি হবে এগুলো। এত সুন্দর, পরিপাটি করে লটকনগুলো সাজানো হচ্ছে যে দেখে মনে হয় সব নিয়ে যাই।’
তাঁর কাছ থেকে জানলাম, পুরো লটকন বাগান তাঁরা বছরের শুরুতে ইজারা নেন। বৈশাখ মাসে গাছে ফল আসে আর বর্ষায় এগুলো পাকা শুরু করে। ১০ কেজির ঝুড়ি আছে, ২০ কেজির ঝুড়িও আছে। আকার আর গুণগত মান ভেদে এর দাম ভিন্ন। ১০ কেজির ঝুড়ির দাম ৫০০-১০০০ টাকা। বললাম, ‘২ কেজি নেব, ব্যবস্থা করেন।’ তিনি বলেন, ‘দুই-তিন কেজির জন্য আমরা দাম রাখি না। এই মিজান, ভাইজানদের গাড়িতে কিছু লটকন দিয়া দে।’ কথা শেষ হওয়া মাত্রই দেখলাম দসাসই চেহারার একজন দুই হাতভর্তি করে লটকন তুলে নিয়ে গাড়িতে দিয়ে দিলেন। কোনো দাম নিলেন না। আড়তদার খুশি মনে আমাদের বিদায় দিলেন। দাওয়াত দিলেন—যখন মন চায় আসবেন, এখানে বসে যত ইচ্ছা খাবেন। কোনো পয়সা দেওয়া লাগবে না!
তাজ্জব চেহারা নিয়ে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম লটকন বাগানের মধ্য দিয়ে। এখানকার লোকজনের প্রায় সব বাড়িতেই লটকনগাছ আছে। সেসব গাছে পাতার থেকে লটকন বেশি। দেখতে দেখতে চলে এলাম সৃষ্টিগড় বাজারে। এটা মূলত লটকনের হাট। এখানে আরও বড় পরিসরে লটকন বিক্রি হয়। মাত্র ঘণ্টা খানেকের লটকন অভিযান শেষ করে আমরা আবার উঠলাম ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে, সেখান থেকে ‘মরজাল’ হয়ে ভেলনগর বাসস্ট্যান্ডে এসে আমি নেমে গেলাম, ঢাকায় আসতে হবে এখান থেকে। বাসে উঠে কাঁধের ব্যাগভর্তি লটকনের দিকে হাত চলে গেল, একটা একটা করে লটকন মুখে পুরছি আর ভীষণ আনন্দ নিয়ে ফেলে আসা সোনালি বাগানটার কথা ভাবছি। মনে হলো যেন এই মাত্র বিশাল এক আঙুর বাগান ফেলে এলাম।

 

সৃষ্টিগড় বাজারে লটকনের আড়ত

কীভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ, বনানী, মহাখালী বা উত্তরা থেকে যেকোনো নরসিংদীর বাসে উঠে পাঁচদোনা বাসস্ট্যান্ড নামবেন। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করে চলে যাবেন মরজাল। সিএনজির চালককে বললেই হবে যে লটকন বাগান দেখতে যাবেন, তিনিই আপনাকে কামারটেকের রাস্তা দিয়ে সৃষ্টিগড় পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এই ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার সরু রাস্তার পুরোটাজুড়েই লটকন বাগান। লটকন জুলাই মাসের পর আর পাওয়া যাবে না। ফেরার সময় ভেলনগর বা পাঁচদোনা হয়ে আবার চলে আসতে পারেন। ঢাকা থেকে নরসিংদীর পাঁচদোনা পর্যন্ত বাসভাড়া ১০০ টাকা।

 

Categories
রাকিব কিশোর

এক সবুজ সৈকতের দিগন্তে

দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রীরা। ছবি: জুনায়েদ আজীম চৌধুরী

 টানা ৩০ মিনিট সাগরের ওপর দিয়ে প্রায় উড়ে চলে এলাম জল-সবুজের সন্দ্বীপে। সেখানে ঘাটে আগে থেকেই আটটা মোটরসাইকেল অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য…লিখেছেন  রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের ঠিক মাঝ বরাবর এক দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। নানা রকমের বিশাল বিশাল জাহাজের আনাগোনা এই দ্বীপকে ঘিরে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুংকার ছাড়ে সাগরের মাতোয়ারা ঢেউ। নদী আর মোহনার এক ঘোলাটে মিশ্রণ ধীরে ধীরে নীলাভ হয়ে হারিয়ে গেছে গভীর সমুদ্রে, যাওয়ার আগে রেখে গেছে অদ্ভুত সুন্দর সবুজ এক দ্বীপ। তাই আমাদের এবারের গন্তব্য এই জল-সবুজের সন্দ্বীপে। ইচ্ছে ছিল সন্দ্বীপের সাগরপারে তাঁবু টাঙিয়ে তারাভরা আকাশের নিচে কাটিয়ে দেব এক রাত। সেটাকে পূর্ণতা দিতেই রাতের আঁধারে ঢাকা ছেড়ে সীতাকুন্ডের কুয়াশাতে মিশিয়ে ফেললাম নিজেদের।
সন্ধ্যার আগে আগে

তখন শীতের শেষ সময়। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে সীতাকুন্ডের কুমিরা বাসস্ট্যান্ডে যখন বাস আমাদের নামিয়ে দেয় তখন ভোর পাঁচটা। এখান থেকে সন্দ্বীপ ঘাট প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। আমরা ১১ জন জোরপায়ে হাঁটা শুরু করলাম। সামনে বঙ্গোপসাগর আর পেছনে অটল পাহাড়কে রেখে যখন সীতাকুন্ডের সন্দ্বীপ ঘাটে পৌঁছাই তখনো ঘুম ভাঙেনি সূর্যের, আধভাঙা চাঁদের আলোয় চোখের সামনে অতিকায় বিশাল হয়ে ধরা দিল অনেকগুলো জাহাজের কালচে ঘুমন্ত শরীর। এত বিশাল বিশাল জাহাজ আগে সামনাসামনি দেখিনি, যেমন লম্বা তেমনই উঁচু। মানুষের তৈরি বিশালতা দেখে নিমেষেই যাত্রাপথের সব ক্লান্তি গায়েব হয়ে গেল। এই জাহাজগুলোকে নাকি কেটে ফেলার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে!! তাজ্জব ব্যাপার! পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ কিনে এনে এখানে কেটে ফেলা হয়, সেই লোহা আবার চলে যায় বিভিন্ন লোহার কারখানায়! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না-কাটতেই সকালের আবছা আলোয় নিজের সবটুকু সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হলো সন্দ্বীপ ঘাটের এক কিলোমিটার ব্রিজ, যেটা সোজা সাগরের দিকে চলে গেছে। সন্দ্বীপ যেতে হলে আমাদের এই ব্রিজ ধরেই শেষ মাথায় গিয়ে স্পিডবোটে উঠতে হবে।

ভোরের প্রথম আলো ছুঁয়ে গেল তাঁবু

আরমান, ফারুক, সুমন আর রাসেল পৌঁছামাত্রই শুরু হলো আমাদের আনন্দযাত্রা। দিন শুরু হলো জুনায়েদের বিখ্যাত স্পিডবোটের সেলফি দিয়ে। টানা ৩০ মিনিট সাগরের ওপর দিয়ে প্রায় উড়ে চলে এলাম জল-সবুজের সন্দ্বীপে। সেখানে ঘাটে আগে থেকেই আটটা মোটরসাইকেল অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। ওহ্! বলে রাখা ভালো, সন্দ্বীপে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম এই মোটরসাইকেল, এ ছাড়া রিকশা আর হলুদ বেবিট্যাক্সি রয়েছে। ঢাকা থেকে বিদায় হওয়া ট্যাক্সিগুলো এখন প্রবল প্রতাপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাগরধোয়া দ্বীপটিতে।
সন্দ্বীপ এলাম আর বিখ্যাত বিনা শাহর মিষ্টি খাব না, এটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অগ্যতা ২০ টাকার মিষ্টি খাওয়ার জন্য পুরো এলাকাকে জানিয়ে দিয়ে ভোঁ ভোঁ করে রওনা দিলাম প্রায় ৩০ কিলোমিটারের দূরত্ব। এ তো বিকেলের গল্প…।
পশ্চিম আকাশকে লালের আবিরে রাঙিয়ে কুয়াশার মতো ধীরে ধীরে নামল রঙিন সন্ধ্যা। সে সন্ধ্যায় আমরা ছুটে গেলাম পশ্চিমপারের রহমতপুর সি-বিচে। বাংলাদেশে এই প্রথম আমি সবুজ সমুদ্রসৈকত দেখলাম। যত দূর চোখ যায় সমান ঘাসের মাঝে মাঝে নারিকেলগাছের কী দারুণ সুন্দর একটা সৈকত! প্রতিটি গাছই যেন একেকটা ওয়ালপেপার, হুট করে দেখলে মনে হবে দূরদেশের কোনো এক আয়েশি সৈকত অপেক্ষায় আছে অতিথিদের। এই সন্দ্বীপ এলেই আমাদের অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে, তারার আলোয় তাঁবু টাঙিয়ে ঝিরঝিরে বাতাসের মাঝে হাসনাত আর আজমানে বার-বি-কিউ, কিংবা রাত দুইটায় খেজুরের রস-নারিকেল দিয়ে বাপ্পী-নাদিয়ার রান্না করা শিরনির স্বাদ ভোলার মতো নয়। শান্ত এক সাগরের পাড়ে রাতভর আগুন জ্বালিয়ে সৌরভ যে কয়লা বানিয়ে দিয়েছে, তার তাপে শীত তাড়িয়েছি তাঁবুর বাসিন্দারা। শাহেদের জুম লেন্সে তোলা তারার ছবিটাকে চাঁদ ভেবে যে উল্লাসে রাত মাতিয়েছি তা হয়তো সন্দ্বীপের কাঁকড়ার দল অনেক দিন মনে রাখবে।
ভোরের প্রথম আলো যখন নারিকেলগাছের মাথা ছুঁয়ে আমাদের তাঁবু স্পর্শ করল, তখন আড়মোড়া ভেঙে চোখ মেললাম অবারিত এক সবুজ সৈকতের দিগন্তে, যেখানে রাখাল ভেড়ার পাল নিয়ে হেঁটে চলছে আরও সবুজের কাছাকাছি কোনো এক জায়গায়। ঘাসে জমা শিশির মুক্তোকে হার মানিয়ে যখন সবটুকু আবেশ কেড়ে নিচ্ছে, ঠিক তখনই কলসি কাঁখে গায়ের কোনো এক বধূর দূরের এক টিউবওয়েল চাপার শব্দে মোহ কেটে যায় আমাদের সবার। এরপর হুড়হাড়, হইচই, আবার সাগর ডিঙিয়ে সন্দ্বীপকে বিদায় বলার আয়োজন।
বালুর সৈকত অনেক দেখেছি, কিন্তু এবার ঘাসের সৈকত মনের এক বিশেষ জায়গা দখল করে ফেলল। একবার পেছন ফিরে নিজের অজান্তেই নিজের কাছে প্রমিজ করে ফেললাম—এই দ্বীপে, এই নারিকেলতলে আবার আসব ভরা কোনো পূর্ণিমার আয়োজনে…

যেভাবে যাবেন
ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে সীতাকুন্ডের সন্দ্বীপ ঘাটে নেমে যাবেন। সেখান থেকে স্পিডবোটে ৩০০ টাকা নেবে সন্দ্বীপ। সন্দ্বীপে যাতায়াত খরচ বেশি। কারণ, এখানে মোটরসাইকেল আর বেবিট্যাক্সি ছাড়া দূরে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। এখানকার প্রতিটি পরিবারে কমপক্ষে একজন করে প্রবাসী আছেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। ফলে এই দ্বীপের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত। পর্যটক এখনো অনেক কম যায়, তবে সৈকতে ক্যাম্পিং করে নিরিবিলি রাত কাটাতে চাইলে এর থেকে ভালো জায়গা খুব কমই আছে।

Categories
রাকিব কিশোর

বর্ষাকালের নাটাই ছেঁড়া মেঘের ভেলা


ভোর ছয়টায় ঢাকা থেকে বের হয়ে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ফেরিঘাট-শরীয়তপুর-মাদারীপুর-ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ-বাগেরহাট-পিরোজপুর-ঝালকাঠি-বরিশাল-ভোলা হয়ে নোয়াখালী-কুমিল্লা দিয়ে ঘরে ফেরা! এই এক দিনে বাংলার বর্ষাকালের অসাধারণ রূপ দেখে ফেলেছি, এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল বরিশাল থেকে ভোলার লঞ্চ ভ্রমণ… লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য বুঝি বদলে যাওয়া আকাশের রং। যে আকাশ আলতারাঙা ভোর নিয়ে দিন শুরু করে, সে আকাশই আবার ঝকঝকে নীল হয়ে জাপটে ধরে নীল-সবুজের গোল পৃথিবীটা, আর দিন শেষে সোনালি রং ছড়িয়ে সৌরজগৎকে জানিয়ে দেয় এই পৃথিবীটা অমূল্য। আকাশের এই রঙের বদলে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে মেঘ। মেঘ বরাবরই খুব প্রিয়, আর সেটা যদি হয় বর্ষাকালের নাটাই ছেঁড়া মেঘের ভেলা, তাহলে তো কথাই নেই। মাঝে মাঝেই এক দিনের ভ্রমণে বের হই। এর উদ্দেশ্যই থাকে এক দিনের মধ্যে সুন্দর একটি জায়গা দেখে আবার ঘরে ফিরে আসা। এবারের যাত্রাপথ বেশ লম্বা। ভোর ছয়টায় ঢাকা থেকে বের হয়ে মুন্সিগঞ্জের মাওয়া ফেরিঘাট-শরীয়তপুর-মাদারীপুর-ফরিদপুর-গোপালগঞ্জ-বাগেরহাট-পিরোজপুর-ঝালকাঠি-বরিশাল-ভোলা হয়ে নোয়াখালী-কুমিল্লা দিয়ে ঘরে ফেরা! এই এক দিনে বাংলার বর্ষাকালের অসাধারণ রূপ দেখে ফেলেছি, এর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল বরিশাল থেকে ভোলার লঞ্চ ভ্রমণ।

মেঘে মেঘে রংধনু

মাত্র ৪৫ মিনিটের এক নদীপথ এ দেশের সৌন্দর্য সম্পর্কে আমার পুরো মানসচিত্রই পাল্টে দিয়েছে। ভোর ছয়টায় আমি আর জাফর বাসা থেকে বের হয়েছি। গন্তব্য দূর-অস্ত! বেলা তিনটায় যখন বরিশালের লঞ্চঘাটে পৌঁছাই, তখন ভোলার শেষ লঞ্চটা মাত্রই ছেড়ে গেল ঘাট থেকে, লঞ্চের পেছন দিকটা দেখে হা-হুতাশ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমাদের। এমন সময় পাশের একজন বললেন, আপনারা এক কাজ করেন, নৌকা দিয়ে এই নদীটা পার হয়ে ওপার থেকে মোটরসাইকেল বা বাস দিয়ে ‘লাহারহাট’ ঘাটে চলে যান। এই লঞ্চই দেড় ঘণ্টা পর লাহারহাট পৌঁছাবে, ধরতে পারবেন। অথই সাগরে পড়লে মানুষ নাকি বাঁচার জন্য খড়কুটো হলেও আঁকড়ে ধরে, আমরা ধরলাম নৌকা। নদী পার হয়েই একটা মোটরসাইকেল নিয়ে হুঁশ করে ছুটে চললাম লাহারহাটের দিকে। ঘাটে পৌঁছে দেখি আরেকটা ছোট লঞ্চ বরিশাল যাওয়ার জন্য ছাড়ছে, তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লাম শেষ লঞ্চে।
সব সময় পড়ে এসেছি দেশের এই দক্ষিণাঞ্চলে শত শত দ্বীপ রয়েছে, কিন্তু কখনোই নিজ চোখে সেগুলো দেখা হয়নি। লাহারহাট লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়া মাত্রই মুগ্ধতার শুরু হলো। ছোট্ট লঞ্চের ছাদে উঠে যেদিকে তাকাচ্ছি মুখ হাঁ হয়ে আছে, বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই! এখানে আকাশ অনেক বড়। মেঘগুলো খুব কাছ দিয়ে হেলেদুলে উড়ে যাচ্ছে দক্ষিণ থেকে উত্তরে। ছোট ছোট অনেক নদী কোথায় থেকে যেন একসঙ্গে এসে এখানে মেঘনায় মিলেছে, মনে হচ্ছে যেন সবাই দাওয়াতে এসেছে। এখানের পুরো আকাশ যেন শিল্পীর চিত্রপট। এই সাদা মেঘের ভেলা, তো একটু পরই কমলা, কালো-বাদামি মেঘের দৌড়াদৌড়ি আর নিচের দ্বীপগুলো বর্ণনাতীত সুন্দর। মাঝে মাঝে একটা করে ঘর কে বা কারা যেন উঠিয়ে রেখেছে দ্বীপের একেবারে শেষ মাথায়, নদীর কাছাকাছি, মন চায় লঞ্চ থেকে লাফ দিয়ে ওখানে গিয়ে কাশবনের জঙ্গলে শুয়ে থাকি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পার হয়ে যায় গরু’র মতো বিলের ওপর দিয়ে কয়েক শ গরু হেঁটে চলে যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে তারা জানে না, সামনে যত দূর চোখ যায় অবারিত জলরাশি! তাদের আবার রাখালও আছে, স্কুলফেরত এক রাখাল বালিকা গরুগুলোর পেছনে পেছনে হেঁটে যাচ্ছে নদীর ওপর দিয়ে।

এখানে এসে অনেক দিন পর পালতোলা নৌকা দেখতে পেলাম। নাগরিকজীবনে সবার মধ্যে তাড়াহুড়ো থাকে, সবাই ব্যস্ত, কিন্তু এখানে কোনো ব্যস্ততা নেই, নানান রঙের পাল তুলে দিয়ে নৌকাগুলো বাতাসের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে—স্রোত যেদিকে নিচ্ছে, সেদিকে যাচ্ছে। এই সাদা রঙের পাল তো, একটু দূরেই টকটকে লাল পাল, আবার একসঙ্গে অনেক রঙের কাপড় ভাসছে নদীর বুকে। ঝিরঝিরে বাতাসে যেন রঙের মিছিল লেগেছে। এর মাঝেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ব দিক রাঙিয়ে জন্ম নিল এক টুকরো রঙের মিছিল, মিনিটে মিনিটে সে মিছিলে যোগ দিল আরও রং—বেগুনি, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল…

৪৫ মিনিটের ছোট্ট এই যাত্রা এই দেশকে যেন অন্যভাবে চিনিয়েছে। নদী, নদীর পাশের কাশফুল, পালতোলা নৌকা, মেঘ, রংধনু, খালভর্তি হাঁস, নদী ভরা গরু—এদের ভুলে যাওয়া অসম্ভব। সবচেয়ে বাজে ক্যামেরা দিয়েও যদি এখানে কেউ ছবি তোলে, সেটাই হবে সবচেয়ে সুন্দর একটা ছবি। মন খারাপের চূড়ান্ত নিয়ে যদি আপনি এই যাত্রা শুরু করেন, ঝুড়ি ভর্তি রুপালি ইলিশে দেখে মেঘনার ঢেউয়ের সঙ্গে সেই মন খারাপ হারিয়ে যাবে সুদূরে। শেষ বিকেলের আলোতে পুরো মেঘনার পানি রুপালি বর্ণের হয়ে যায়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা-বরিশাল লঞ্চে গেলে এই সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও দেখতে পাবেন না। এর জন্য আপনাকে বরিশাল লঞ্চঘাট পর্যন্ত যেতে হবে, সেখান থেকে ভেদুরিয়া ঘাট। পুরো মেঘনা নদী তার সবটুকু রূপ নিয়ে এখানে বসে আছে, সেটা দেখতে হলে এই নদী দিয়েই যেতে হবে ভেদুরিয়া ঘাটে। লাহারহাট থেকে লঞ্চভাড়া নেবে ৩৪ টাকা। দুপুরের লঞ্চে রওনা দিয়ে বিকেলের লঞ্চে আবার বরিশাল ফেরত আসতে পারবেন। আরেকটু ঘুরতে চাইলে ভেদুরিয়া ঘাট থেকে ভোলার ‘ইলশা ঘাটে’ যাবেন। সেখান থেকে বিকেল চারটার শেষ ট্রলারে করে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিয়ে নোয়াখালী, সময় লাগবে দুই ঘণ্টার বেশি। নোয়াখালী থেকে বাসে করে বাসায় চলে আসতে পারবেন।

 

Categories
রাকিব কিশোর

সুন্দরবনের সাগরঘেঁষা দুবলারচরে

এই বুঝি পানি থেকে মাথা তুলবে কুমির। ছবি: আবদুল্লাহ আবু দায়ান

দিনের সুন্দরবন যতটা প্রাণবন্ত, রাতের সুন্দরবন যেন তার চেয়েও চাকচিক্যময় জৌলুশে ভরপুর। তারা ভর্তি আকাশের নিচে যখন শুয়ে শুয়ে তারা গোনার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা, ঠিক তখনই সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে জোনাকিরা… লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের যে জায়গাটাতে সবুজের দল কখনো বুড়ো হয় না, যেখানে সারাটা দিন উড়ে উড়েও একটুও ময়লা হয় না শুভ্র বকের গায়ের পালক, যেখানে পাতার ফাঁকে ফাঁকে চোখ রেখে মায়ের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে দুষ্টু বানরের দল, সেই জায়গাটার নাম সুন্দরবন। আলো-আঁধারির শ্বাসমূলের এই বনে চার পায়ে হাঁটা বাঘের সঙ্গে প্রতিদিনই টেক্কা দেয় চিত্রা হরিণের ঝাঁক, জোয়ার-ভাটার এই বনে লুকিয়ে চলা শূকরের পাল ধরতে নাক ডুবিয়ে বসে থাকে ধূসর কুমিরের ছোট্ট ছানাটা আর এলোচুলে খোঁপা বেঁধে কোমল বাতাসে দুলতে থাকে বনের গাছেরা, তাদের ডালে ডালে চলে সাপের আনাগোনা। সুন্দরবনকে বলা হয় ভয়ংকর সুন্দর একটা জায়গা—যেখানে যেতে হয় শরীরের সবগুলো ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে নিয়ে, চলতে হয় তুমুল টেনশন আর কৌতূহলে দৌড়াতে থাকা শরীরের গরম রক্তকণাকে বুকে নিয়ে। বাঘ-হরিণের এই বনে আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি আছে বিস্ময় আর চোখ জুড়ানো ভালোবাসা। এই বনে ঢুকতে হলে বন বিভাগ থেকে বিশেষ ধরনের পাস নিতে হয়, যে-কেউ যখন ইচ্ছা মন চাইলেই এখানে ঢুকে পড়তে পারে না। তবে মাঝেমধ্যে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান থাকলে বনে প্রবেশ করা যায়। এর মধ্যে একটি হলো রাসমেলা।
রাসমেলা মূলত অনুষ্ঠিত হয় সুন্দরবনের সাগরঘেঁষা দুবলারচরে। এই চরটা খুব মজার। এখানে বছরের ছয় মাস থই থই পানি থাকে, আর ছয় মাস থাকে শুকনো বালুচর। স্থানীয় জেলেরা ওই ছয় মাসে এখানে এসে মাছের শুঁটকি বানায়। সুন্দরবনের নীলকমল বন ফাঁড়ির পরেই সাগর পাড়ি দিয়ে দুবলারচরের অবস্থান।

গেল বছর এই রাসমেলার কারণেই আমাদের সুযোগ হয়েছিল বনের একেবারে ভেতর দিয়ে ট্রলার নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর। সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে ২০ জনের এক বিশাল লটবহরসহ চকচকে নতুন এক ট্রলার নিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছিলাম বেঙ্গল টাইগারের রাজত্বে। সারা দিন নৌকার ওপরে চুপচাপ বসে থাকব, সে উপায় নেই এই অরণ্যে। ডান পাশে শিং বাগানো এক হরিণ দেখা যায় তো বাঁ পাশে অবাক হয়ে উঁকি দিতে থাকে শূকরের দল, তাদের দিকে ক্যামেরা তাক করতে করতেই ঘোলা নোনা পানি ঠেলে দিনের রোদে গা গরম করতে পাড়ে উঠে আসে বুড়ো কুমিরটা। বিস্ময়ের ঘোর দুপ করে কেটে যায় বানরের গাছ ঝাপটানোতে, আর ঠিক দুই হাত দূরত্বেই জ্ঞানী ভাব নিয়ে বসে আমাদের দেখে নানা রঙের মাছরাঙা। সারা দুনিয়ার মানুষকে অবাক করা রহস্যঘেরা এই সুন্দরবন কখনোই আমাদের একা থাকতে দেয়নি, কখনো সাপ দেখে চিৎকারকরে উঠেছি, আবার কখনো হরিণের বাচ্চা দেখে খুব আদুরে মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। কখনো বানর থেকে নিজেরাই বাঁদরামিতে লাফিয়ে বেড়িয়েছি, আবার কখনো শুশুক দেখে চোখে দুরবিন লাগিয়ে আরও ভালো মতন বোঝার চেষ্টা করেছি যে আসলেই জিনিসটা কী। টানা তিন দিনের এই নৌকাভ্রমণে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল কয়েক শ সাদা বক আর নাম না জানা রঙিন পাখির দল।

সকালের সুন্দরবন

দিনের সুন্দরবন যতটা প্রাণবন্ত, রাতের সুন্দরবন যেন তার চেয়েও চাকচিক্যময় জৌলুশে ভরপুর। তারা ভর্তি আকাশের নিচে যখন শুয়ে শুয়ে তারা গোনার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা, ঠিক তখনই সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে জোনাকিরা। জীবনে যে জিনিস কখনো দেখিনি সেই অদ্ভুত জিনিসই দেখাল আমাদের তারা। সবগুলো জোনাকি একটা নির্দিষ্ট গাছের পাতায় বসে মিটমিট করছে, এরপরের দুইটা গাছ পুরো অন্ধকার তিন নম্বর গাছটাতে আবার জোনাকির আসর বসেছে, পরের দুইটা গাছে তাদের কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু পরের তিন নম্বর গাছে আবার জমেছে তাদের আলোর আসর। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে অনেকগুলো ক্রিসমাস ট্রি শুধু জ্বলছে আর নিভছে।
ভোরবেলাতে নীলকমল বন বিভাগের অফিসে নেমেই পেলাম বাঘের দেখা, দুটো শূকরকে দিগ্বিদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে বনের রাজা। সেই দৃশ্য দেখার মতন পরিস্থিতিতে আমরা নেই, যে যার মতন পড়িমরি করে জান বাঁচাতে ছুটে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে, সেখান থেকেই সবাইকে মুগ্ধ করে দিল সকালের কুয়াশার চাদর মোড়ানো অপার্থিব সুন্দরবন।

বাঘ-হরিণের বনে
দুবলারচরে যখন পৌঁছালাম তখন মাঝদুপুর। রাতে জমবে মেলার নাচ-গান, সুতরাং আয়োজন শুরু হয়ে গেছে সকাল থেকেই। বৈশাখী মেলার মতন স্টল বসেছে কয়েক শ! রাতে শুরু হলো গানের আসর, সে আসরে তাল মেলালাম শহর ফেরত আমরা কিছু তরুণ। এই চরে রাতের জ্যোৎস্না ছিল অপূর্ব, পুরো সাগরজুড়ে ছিল সেই পূর্ণিমার চাঁদের আনাগোনা, যার আলো ছড়ানো ছিল ভোরের সূর্য ওঠার আগ পর্যন্ত। দুবলারচরের সমুদ্রসৈকতটা একেবারে নিরিবিলি আর ঝকঝকে নরম এক সৈকত, এখানে যত দূর চোখ পড়ে সব নারকেলগাছের সারি আর বালুর ডিবি দিয়ে ঘেরা সমুদ্রের পাড়। আর সেই পাড়ের ধার ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে শুটকিপল্লি। পুরো দ্বীপের বাতাস শুঁটকি মাছের গন্ধে ভারী। সঙ্গে সেই শুঁটকি খাবার জন্য জন্য জমেছে পাখিদের মেলাও।
যদি সুন্দরবনকে পরিপূর্ণভাবে দেখতে চান তাহলে রাসমেলা ভালো সুযোগ। কেননা এখানে যেতে হলে সুন্দরবনের মাঝ দিয়েই যেতে হবে। এবারও নভেম্বরের ২৪ ও ২৫ তারিখে সুন্দরবনে রাসমেলা অনুষ্ঠিত হবে। সাজানো হচ্ছে দুবলারচর, নতুন অতিথিদের চমকে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত চমকের ভান্ডার আমাদের সুন্দরবন।

.যেভাবে যাবেন
রাসমেলায় যাওয়ার দুটি রাস্তা। প্রথমটি হলো সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে নীলকমল হয়ে দুবলারচর। এবং আরেকটি হলো মংলা হয়ে কটকা সৈকত ফেলে দুবলারচর। রাসমেলার মৌসুমে প্রচুর নৌকা ও ট্রলার এখন দুবলাতে যাচ্ছে। আপনাকে প্রথমেই বনে ঢোকার পাস নিয়ে নিতে হবে, সঙ্গে যে ট্রলারে যাচ্ছেন তার জন্য অতিরিক্ত পাস নিতে হবে। পুরো ট্রলার রিজার্ভ নিলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কাজেই সুন্দরবনে একটা দল হিসেবে যাওয়াটা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা কিছু সৌন্দর্য আছে যেগুলো কখনো একা দেখতে হয় না, সৌন্দর্য সবাইকে নিয়ে দেখতে হয়। টানা তিন দিনের ট্রলার জার্নিতে দিনে ঘুমালেও রাতে চেষ্টা করবেন না ঘুমিয়ে থাকতে। কারণ সুন্দরবন রাতের বেলাতেই জেগে ওঠে। এর তারাভরা আকাশ এক কথায় অপূর্ব। ভালো কথা, দুবলারচলে কোনো মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, কাজেই পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই সেখানে যাবেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো বনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে মাইক বাজাবেন না, এতে করে পশুপাখিদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। বনে অপচনশীল কিছু ফেলবেন না। বাঘের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করবেন না।

Categories
রাকিব কিশোর

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত

বিশালতার কারণেই সুন্দর দামতুয়া জলপ্রপাত। ছবি: জাফর সাদেক

বান্দরবানের আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে দামতুয়া যাওয়ার জন্য ‘আলীকদম-থানচি’র নতুন রাস্তা ধরে ১৭ কিলোমিটার যেতে হয়। মোটরসাইকেলে এক লহমায় মেঘ ফুঁড়ে উড়ে চললাম বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু এই রাস্তা ধরে…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

কিছু বিস্ময়ের জন্মই হয় প্রকৃতিতে মুগ্ধতা ছড়াতে। কিছু বিশালতার মধ্যে ক্ষুদ্র হয়েও আনন্দে ভাসতে ইচ্ছে করে সারাক্ষণ। বাংলাদেশের প্রকৃতি পরতে পরতে আড়াল করে লুকিয়ে রেখেছে নিজের সেরা সৌন্দর্যগুলোকে।

এবারের বান্দরবান-যাত্রা ছিল মাত্রই খোঁজ পাওয়া এক ঝরনা দেখার জন্য। এক বন্ধুকে ফোন দিলাম। মুহূর্তেই প্ল্যান করে ফেললাম আরেকটা অভিযানের। জাফর, স্বপন ভাই আর বাপ্পীকে সঙ্গে নিয়ে ঝুমবৃষ্টি মাথায় নিয়ে সোজা রওনা দিলাম মেঘ-পাহাড়ের দেশে। গন্তব্য ‘দামতুয়া জলপ্রপাত’।

বান্দরবানের আলীকদম বাসস্ট্যান্ড থেকে দামতুয়া যাওয়ার জন্য ‘আলীকদম-থানচি’র নতুন রাস্তা ধরে ১৭ কিলোমিটার যেতে হয়। মোটরসাইকেলে এক লহমায় মেঘ ফুঁড়ে উড়ে চললাম বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু এই রাস্তা ধরে। অদ্ভুত এই পাহাড়ি রাস্তা সৌন্দর্যের দিক দিয়ে হার মানিয়ে দেয় বাংলাদেশের আর সব পাহাড়ি রাস্তাকে। একখানে খাড়া নিচে নেমে যেতে হয় তো অন্যখানে চিত হয়ে ওপরের দিকে উঠতে হয়! এই দেখা গেল ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে আবার একটু পরেই মেঘের ভেতর হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে চলছি যেন। একবার মোটা মোটা গাছের সারি তো অন্যবার দূর পাহাড়ে বাড়ি! এই করতে করতে একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম ১৭ কিলোমিটার দূরের আদুপাড়ায়। সেখানে রাস্তার পাশের দোকানে ঢুকতেই পাওয়া গেল স্থানীয় গাইড—নাম তার ইংরিং! সে জানাল এখানে দুই পাশে দুই ঝরনা আছে, কোনটাতে যাবেন? একটা নাকি আরেকটার চেয়ে বড়। জানালাম দামতুয়ায় যাব। কথা বলে অন্যদের দিকে তাকানোর আগেই ইংরিং সোজা জঙ্গলের দিকে রওনা দিল। আমরা হাঁটা দিলাম তার পিছু পিছু।

সেই যে হাঁটা দিলাম, আর তো শেষ হয় না। আধা ঘণ্টা যায়, এক ঘণ্টা যায়—শুধু চড়াই, ওপরে ওঠা! হাঁপাতে হাঁপাতে বারবার ইংরিংকে জিজ্ঞেস করি আর কত দূর—সে নির্বিকারভাবে জানাল আরও এক ঘণ্টা। আমরা হতাশ, ওদের এক ঘণ্টা মানে আমাদের কমসে কম দুই ঘণ্টা! কোথাও এক ফোঁটা পানি নেই, অথচ সকালেই কী বৃষ্টিটাই না হলো!

এ পথের পাহাড়গুলো একটু অন্য রকম, বান্দরবানের অন্য পাহাড়গুলোর মতো ঢাল নেই এখানে, এক্কেবারে খাড়া, পাথুরে শরীর। দেখলেই মনে হয় অতিকায় দানব হাঁ করে আছে! একপাশে জুমের খেত আর একপাশে ঢাল নিয়ে পথ চলতে চলতে হঠাৎ শুনি পানির শব্দ। যাঁরা পাহাড়ে হাঁটেন, তাঁরা জানেন ঝরনার শব্দের চেয়ে মধুর কিছু আর নেই! এই শব্দ গলার ভেতর না ভেজালেও মুহূর্তেই কলিজাটা ভিজিয়ে দেয়, আমাদের হাঁটার গতি বেড়ে গেল বহুগুণ। শব্দ লক্ষ্য করে বাঁ দিকে তাকাতেই দেখা গেল বিস্ময়! একসঙ্গে চার-পাঁচটি পানির ধারা পাশের পাহাড় থেকে হুমহাম করে নেমে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে চেরাপুঞ্জির সেভেন সিস্টার ওয়াটারফলসের খুদে সংস্করণ! ইংরিং তাগাদা দিল, দাদা থেমে থাকলে হবে না, যেতে হবে আরও দূর! ঝরনাগুলোকে মনের ফ্রেমে বন্দী করে আবার পা বাড়ালাম আরও বিশাল কিছু দেখার জন্য।

এবার প্রকৃতি বদলে গেল! এখন একটু পরপরই পানি পাওয়া যাচ্ছে, হঠাৎ দেখি চলতি পথে বিশাল ঝিরি! ইংরিং জানাল এই পানি নিচে গিয়ে একটা ঝরনা হয়েছে। সেটার নাম ‘তুক অ’। অবাক আমরা এ আবার কেমন নাম! পাহাড়ি ভাষার ‘তুক অ’ মানে ‘ব্যাঙ ঝিরি’। কোমরপানি ডিঙিয়ে একেবারে ঝিরির মাথায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আসলেই তাই—এই বিশাল পানি হঠাৎ করেই শূন্যে পড়ছে। নিচে একটা বিশাল পাথরে পড়ে আবার লাফ দিয়ে আরেকটু দূরে গিয়ে পড়ছে, একেবারে নিচে! পুরোই ব্যাঙের মতো! এরপরের গল্পটুকু শুধু হারিয়ে যাওয়ার। ‘কাখইপাড়া’ পার হয়ে আমরা বিশাল এক ঝিরিপথে পড়লাম। বৃষ্টি হওয়ায় সে পানি ফুলেফেঁপে একাকার, ঘোলাটে। এই ঝিরিপথে আধঘণ্টার মতো কোমরপানি পার হয়ে আমরা মুখোমুখি হলাম জঙ্গলের সবচেয়ে কঠিন সত্যের—ইংরিং রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে!

শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা এক ঘামের স্রোত গড়িয়ে পড়ল। এখন বাজে বিকেল সাড়ে চারটা, এখনো দামদুয়ায় পৌঁছাতে পারিনি। এর মধ্যে রাস্তা হারানো মানে জঙ্গলেই থেকে যেতে হবে সারা রাত! আকাশে খুব ভয়ংকরভাবে হুমকি দিচ্ছে মেঘের আসর। নিচে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমরা পাঁচজন পাঁচ কোনায় বসে আছি। ইংরিং একবার জঙ্গলে ঢুকছে, একবার ঝিরিপথে নেমে যাচ্ছে—কী করবে বুঝতে পারছে না। এই থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে যা করা উচিত ঠিক তাই করলাম আমি আর জাফর—সোজা নেমে গেলাম সানের গলাপানির ঝিরিতে, দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে নেই। সামনে না এগোলে কখনো আলোর মুখ দেখা যাবে না। ফলাফল—হাত-পা কেটে, স্যান্ডেল হারিয়ে, মোবাইল ভিজিয়ে অন্ধের মতো হ্যাঁচোড়ে-প্যাঁচোড়ে মুখোমুখি হলাম জগতের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যের মুখোমুখির! মেঘের গর্জনকে ছাপিয়ে একটানা বিশাল পানি পড়ার ঝরঝর শব্দ! পাঁচজন একবার করে নিজেদের দিকে তাকালাম, সবার চোখে জয়ের নেশা! এত কষ্ট তাহলে আমাদের সার্থক!

সামনে এগিয়ে যা দেখলাম সেটার জন্য আমরা আসলেই প্রস্তুত ছিলাম না। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মতো বিশাল এলাকা নিয়ে গড়গড়িয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে নিচের দিকে! বিশাল এক ক্যাসকেইড! এত বড় জলধারা আমি এর আগে বান্দরবানের কোনো পাহাড়ে দেখিনি! কী বিশাল আয়তন, কী গম্ভীর তার গর্জন! তখনো জানতাম না এই জলপ্রপাতটা দামতুয়ার ঠিক ওপরের ঝিরিপথ, এর পুরো পানিই নেমে গেছে দামতুয়ায়। সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই আমরা নামলাম প্রায় ৮৫ ডিগ্রি খাড়া এক পাহাড় বেয়ে। বলা হয় সুন্দর কিছু পেতে হলে সহ্যের শেষ সীমায় গিয়ে কষ্ট করতে হয়। আমরা কয়েকজন শেষ সীমায় পা দিয়ে পিছলে গড়িয়ে গেলাম। কাদামাটি আর নুড়িপাথরে গড়গড় করে নেমে একে অপরের গায়ে পড়ে, নাকে-মুখে কাদা লাগিয়ে সামনের দিকে তাকিয়েই সব জ্বলুনি, সব কষ্ট বিলীন হয়ে গেল। চোখের সামনে ভয়ংকর গর্জন করে এই গোধূলির শেষ আলোয়ও পুরো আকাশ আলো করে অবিরাম ঝরছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত! বিশাল তার আকার, এক ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা যায় না এমন বিশাল সে! এখানে একসঙ্গে তিনটি ঝরনার পানি এসে পড়ছে, যার মধ্যে দুইটার পানি পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। দামতুয়া মূল পানিটুকু প্রবল আক্রোশে নামছে মাটিতে। সেখানের আশপাশেও দাঁড়ানো যায় না এমন অবস্থা! কান ফাটানো গর্জন আর দৃষ্টি আড়াল করে দেওয়া সাদাটে পানির মাঝে একবার পড়লে খেই হারিয়ে ফেলবে যে কেউই। আমরা হারালাম, ভুলে গেলাম সময়ের হিসাব, ভুলে গেলাম আমাদের ফিরতে সময় লাগবে আরও তিন ঘণ্টা! এত বড় বিশালতার মুখোমুখি এর আগে যে তেমন হইনি!

অন্ধকার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে যখন ফেরার তাড়া এসে টানতে শুরু করল আমাদের, তখন থেকেই মন খারাপের শুরু! এখানে মাত্র ঘণ্টাখানেকের জন্য যাওয়া মানে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু মুহূর্তের অপচয়, এখানে অল্প কিছু সময়ের জন্য যাওয়া মানে নিজের প্রতি ঘোরতর অন্যায় করা। এখানে আসলে এক রাত থাকতে হবে, পানির ঘুমভাঙানি শব্দে চোখ খুলেই মুখোমুখি হতে হবে সইতে পারা সৌন্দর্যের মুখোমুখি! ফিরে আবার আগে ওপর থেকে আরেকবার দেখলাম এই জলদানবকে। নিজের জন্য না হলেও মনের শখ মেটাতে আরেকবার আসতে হবে এই ঝরনায়, মায়াবী কোনো এক পূর্ণিমা রাতে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে প্রথমে কক্সবাজারের চকরিয়া নামতে হবে। সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে করে ৭০ টাকা দিয়ে আলীকদম। আলীকদম সেনাবাহিনী ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিয়ে পানবাজার থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যেতে হবে ১৭ কিলোমিটার এলাকায়। যাওয়া-আসার ভাড়া লাগবে ৫০০ টাকা। একজন স্থানীয় গাইড নিয়ে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ঘুরে আসতে পারবেন দামতুয়া থেকে।

Categories
রাকিব কিশোর

যেখানে মেঘের সাগরে ডুবে থাকে আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো

দুই নহরের ডাবল ফলস। ছবি: নাহিদ ভুঁইয়া

চারপাশের মেঘের কম্বলের মাঝে একটুখানি আগুনের উষ্ণতা, আসলেই স্বর্গীয় অনুভূতি। এই পাসিংপাড়া আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাগুলোর একটা। এখানে পায়ের পাতা ছোঁয়া মেঘেদের এলোমেলো ভিড়ে ঝিলিক দেয় বজ্রপাতের আলো, মাঝরাতে দমকা বাতাসে উড়ে যেতে চায় মাথার চুলগুলো। আর সকাল?…রাকিব কিশোর Red dot

পাহাড়ে ঘুমাতে হবে, এই ব্রত নিয়ে এবার দুই দিনের ছুটি পেয়ে রওনা দিয়েছিলাম মেঘ পাহাড়ের দেশ বান্দরবানে। সঙ্গী ছিল লালমনিরহাটের নাসিরুল আলম মণ্ডল আর বান্দরবানের সব পাড়ায় আত্মীয়তা পাতিয়ে ফেলা নাহিদ ভাই। বান্দরবানের প্রতিটি পাহাড়ের পাড়ায় পাড়ায় এমন কোনো মানুষ নেই যে নাহিদ ভাইকে চেনে না। বান্দরবানের আকাশে যতবার চাঁদ দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি নাকি দেখা যায় নাহিদ ভাইকে! তিনজনের সঙ্গী হিসেবে রুমা বাজার থেকে যোগ দিলেন গাইড আলমগীর ভাই। এই মানুষটা অসাধারণ, আজ পর্যন্ত যতবার আমি বান্দরবান গিয়েছি, উনি আমাকে খুঁজে নিয়েছেন, এবারও বাজারে আমাদের দেখে দৌড়ে এলেন, এক কাপড়েই রওনা দিলেন অজানার উদ্দেশে। একবারও জিজ্ঞেস করলেন না—কই যাব, কয় দিন থাকব! একবার শুধু জিজ্ঞেস করছিলাম, আলমগীর ভাই, এক কাপড়ে রওনা দিলেন! উনি চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি লুঙ্গি আনছেন না? তাইলেই হইব’।
আমরা বগা লেকের ধার ধারলাম না, এক টানে চলে গেলাম কেওক্রাডাং পেরিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু গ্রাম, পাসিংপাড়ায়। বাতাসে মেঘের গন্ধ, সন্ধ্যার অন্ধকারকে মেঘের অন্ধকার এসে টুপ করে গিলে ফেলেছে, ঠান্ডা মেঘের ভেতর দিয়ে আমরা যখন কেওক্রাডাং পার হই, তখন আশপাশে কোথাও মণ্ডলকে খুঁজে পেলাম না! একটু পরেই মেঘ হালকা হয়ে গেলে দেখা গেল মণ্ডলকে, কেওক্রাডাংয়ের হেলিপ্যাডে উঠে হাঁ করে লাফিয়ে লাফিয়ে যেন মেঘ খাচ্ছে লালমনিরহাটের শান্ত-সরল ছেলেটা। জীবনে যে কখনো মেঘের সাগরে ভেজেনি, তার জন্য এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। তাকে পাগলামি করতে দিয়ে আমরা রাতের রান্নার আয়োজনে বসে গেলাম।
চারপাশের মেঘের কম্বলের মাঝে একটুখানি আগুনের উষ্ণতা, আসলেই স্বর্গীয় অনুভূতি। এই পাসিংপাড়া আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাগুলোর একটা। এখানে পায়ের পাতা ছোঁয়া মেঘেদের এলোমেলো ভিড়ে ঝিলিক দেয় বজ্রপাতের আলো, মাঝরাতে দমকা বাতাসে উড়ে যেতে চায় মাথার চুলগুলো। আর সকাল? সে যেন এক পরির নগরী, যেখানে সাদা মেঘগুলো ছুঁয়ে দেয় খোঁচা খোঁচা দাড়িভরা এই অমসৃণ মুখটা। যেখানে মেঘের সাগরে ডুবে থাকে আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো।
আরামের ঘুমে পানি ঢেলে দিলেন গাইড আলমগীর ভাই। সাতসকালে উঠে সে কী নাচানাচি, ‘আপনেরা ঘুমাইতে আসছেন নাকি, পাহাড়ে কেউ নাক ডাইকা ঘুমায়! পাহাড়ে মানুষ আসে ঝরনা দেখার জন্য, পাত্থর দেখার জন্য, পাহাড় দেখার জন্য!’ আমরা তাঁকে শান্ত করার জন্য এক চোখ খুলে জানালা দিয়ে পাহাড় দেখে ইশারায় তাঁকে জানিয়ে দিলাম, আমাদের পাহাড় দেখা শেষ, সোনার বাংলাদেশ। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা—কাছেই নাকি একটা ঝরনা আছে, নাম ডাবল ফলস। এই ঝরনাতে নাকি দুই দিক দিয়ে পানি পড়ে, এই ঝরনা না দেখলে বেঁচে থাকার কোনো মানে নাই! মণ্ডল খুব একটা গা করল না, তার বাসায় বাথরুমের দুইটা কলেও নাকি একসঙ্গে পানি পড়ে, কাজেই এটা তার জন্য রোমাঞ্চকর কিছু না। কিন্তু আমরা আরামের ঘুম ফেলে ঝরনা দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এবং সত্যি বলতে কি জীবনে যে কয়টা ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সেগুলোর মধ্যে এটা ছিল একটা।
এরপরের গল্পটুকু রোমাঞ্চের। পাসিংপাড়ার আদাখেত ছাড়িয়ে, হাজার ফুটের পাথুরে সিঁড়ি মাড়িয়ে, নাম না-জানা ঘাসফুলের জংলি বাগান নাড়িয়ে, অচেনা ঝিরিপথের ঠান্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে যখন সুংসানপাড়ার মাঝখান দিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছি, তখনই মনে হচ্ছিল আরও একটা অসাধারণ জিনিস দেখতেই বুঝি রওনা দিলাম। বরাবরের মতো এবারও মায়াবী পাহাড় আমাদের নিরাশ করেনি। সুংসানপাড়া থেকে নামতে নামতে মাথাসমান উঁচু ঘাস আর জংলি গাছ ঠেলে যখন ঝরনায় যাওয়ার পথে এসে দাঁড়ালাম, ততক্ষণে প্রচণ্ড পরিশ্রমে আমাদের সবার গা বেয়ে ঘামের ঝরনা ছুটে চলেছে। এরপর নতুন রোমাঞ্চের শুরু, কাশফুলের মতো একধরনের গাছের জঙ্গলে এসে দম আটকে আসার জোগাড় আমাদের। বাতাসে ফুলের রেণু উড়ছে, দম নেওয়ার সুযোগ নেই। নাকে গামছা বেঁধে চলা শুরু করতেই নাহিদ ভাই আছড়ে পড়ল কয়েক ফুট নিচের এক মরা গাছের ওপর। পাহাড় কাঁপিয়ে আমরা হেঁসে উঠলাম। পাশ থেকে একদল বানর আমাদের দিকে লাল চোখ করে তাকিয়ে দূরে চলে গেল।
খাড়া পাহাড়ের দেয়াল টপকে আমরা অবশেষে নেমে গেলাম ডাবল ফলসের গোড়ায়। বিশাল এই পাহাড়ি ঝরনায় দুই পাশ থেকে সমানতালে পানি পড়ে। মজার ব্যাপার হলো, এই ঝরনাটার এক পাশের পানি বরফের মতো প্রচণ্ড ঠান্ডা, আর অন্য পাশের ঝরনাটার পানি তুলনামূলকভাবে কম ঠান্ডা। একেবারে ঠান্ডা পানিটা আসছে অনেক দূরের বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রাম জারুছড়িপাড়া থেকে, আর অন্যটা সুংসানপাড়ার নিচের কোনো এক জায়গা থেকে। এই দুই ঝরনার পানি এক হয়ে জমা হচ্ছে ঝরনার নিচের মাথাসমান উঁচু স্বচ্ছ এক
পুকুরে, সেখান থেকে পানিটুকু অমিয়াখুম, নাফাখুম হয়ে সাঙ্গু নদে গিয়ে মিশেছে।
কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়, এই প্রবাদটা মনে হয় এ রকম কোনো ঝরনা দেখেই বলা হয়েছে। প্রায় ঘণ্টা দু-এক পাহাড়ি পানির শাসন দেখে আমরা যখন ফিরছি, তখন শেষ বিকেলের মরা আলো আমাদের পথ দেখিয়ে লোকালয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর আকাশের গায়ে ফুটে উঠছে একটা-দুইটা-দশটা-পঞ্চাশটা তারা।

যেভাবে যাবেন
বান্দরবান থেকে বাসে করে রুমা বাজার চলে যাবেন। সেখান থেকে গাইড নিয়ে পাসিংপাড়ায় গিয়ে ঘুমাবেন। সকালবেলা মেঘের সাগর দেখে সেই সাগরে ডুব দেবেন, মানে নিচের দিকে নেমে যাবেন। সুংসানপাড়া হয়ে একেবারে নিচের দিকে জঙ্গল পেরিয়ে পাবেন এই ঝরনা। পাহাড়ি ঝরনায় ঘোরাঘুরি করতে গেলে পলিথিন বা অপচনশীল কিছু ফেলে আসবেন না। ভালো হয় যদি এগুলো সঙ্গে করে একেবারেই না নিয়ে যান। ঝরনাটাকে ঝরনার মতোই থাকতে দিন, নাহয় একদিন একে দেখে আপনার করুণা হবে।

Categories
রাকিব কিশোর

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন

করমজলেই পাবেন বনের আমেজ। ছবি: লেখক

করমজল মূলত হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। করমজলে নেমেই বনে ঢোকার টিকিট কাটতে হবে, জনপ্রতি ২৩ টাকা করে টিকিট কেটে বনে পা ফেললেই গা ছমছম করে উঠবে শিহরণে। নিমেষেই চোখ চলে যাবে গাছের আড়ালে, গোলপাতার ফাঁকে, হেতাল বনের ঝোপে। কিছু একটা নড়তে দেখলেই মনে হবে, এই বুঝি বিরাট গর্জন করে ছুটে আসছে বনের রাজা, বেঙ্গল টাইগার…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের মধ্যে সুন্দরবনে ঘুরতেই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। আজ আপনাদের চুপি চুপি একেবারে কম খরচে সুন্দরবনে ঘুরে আসার পথ বলে দেব। এই পথ এমনই সোজা যে অন্যদের যেখানে তিন থেকে পাঁচ দিন লাগে সুন্দরবনে ঘুরে আসতে, সেখানে আপনারা মাত্র এক দিনেই সুন্দরবন দেখে আসতে পারবেন। এই ঘোরা কিন্তু যেনতেন ঘোরা নয়, এক ঘোরাতেই বানর, হরিণ, ডলফিন আর কুমির দেখে আসতে পারবেন। কপাল ভালো থাকলে শূকর আর বনমোরগও চোখে পড়বে। আর কপাল খুব বেশি খারাপ হলে বাঘ মামার সামনে পড়ে যেতে পারেন! মোদ্দা কথা, এক দিনে দেখে আসতে পারবেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, সুন্দরবনকে।

চলুন দেখি, কীভাবে এক দিনেই সুন্দরবন দেখে আসা যায়। কাছের দু-চারজন বন্ধু নিয়ে ভোর ছয়টা-সাতটার দিকে ঢাকার সায়েদাবাদ বাস কাউন্টারে এসে সুন্দরবন বা পর্যটক বাসে উঠে মংলায় চলে আসুন। পদ্মা নদী আর ইলিশের গন্ধে মন উথালপাতাল করা মাওয়া ঘাট পেরিয়ে এই বাস আপনাদের সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ ঘণ্টায় মংলায় পশুর নদের পাড়ে নামিয়ে দেবে। স্পিডবোটে পদ্মা নদী পার হলে সময় আরও এক ঘণ্টা কমে যাবে। মংলায় নেমেই একটা নৌকা ভাড়া করে ফেলুন। ৭০০-৮০০ টাকায় ভাড়া করা এই নৌকা আপনাদের করমজলে ঘুরিয়ে বিকেলে আবার মংলা ঘাটে নামিয়ে দেবে।
পশুর নদী থেকেই মূলত শুরু হবে সুন্দরবন যাত্রা, নৌকায় ওঠার পরপরই চোখের সামনে ফুটে উঠবে সুন্দরবনের গাছের সারি। তরতর করে নৌকা এগোবে পশ্চিম দিকে, নৌকার ছাদে বসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে। সেখান থেকেই খুব ভালোমতো নদীতে খেয়াল রাখলে দেখা যাবে, কিছু ডলফিন একটু পর পর ভেসে উঠছে আবার ডুব দিচ্ছে। এগুলোকে বলা হয় বটলনোজ ডলফিন বা ইরাবতী ডলফিন। নৌকা ৪০ মিনিট চলার পর সোজা এসে থামবে করমজলের ঘাটে। করমজলে যাওয়ার সময় জোয়ার-ভাটার বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। ভাটার সময় করমজলে গেলে তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে।
করমজল মূলত হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। করমজলে নেমেই বনে ঢোকার টিকিট কাটতে হবে, জনপ্রতি ২৩ টাকা করে টিকিট কেটে বনে পা ফেললেই গা ছমছম করে উঠবে শিহরণে। নিমেষেই চোখ চলে যাবে গাছের আড়ালে, গোলপাতার ফাঁকে, হেতাল বনের ঝোপে। কিছু একটা নড়তে দেখলেই মনে হবে, এই বুঝি বিরাট গর্জন করে ছুটে আসছে বনের রাজা, বেঙ্গল টাইগার। করমজলে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুন্দরবনের বিশাল একটা থ্রিডি ম্যাপ। এখানে খুব সহজেই নিজেদের অবস্থান দেখা যাবে। এরপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেই দুটো রাস্তা আসবে সামনে-একটা এঁকেবেঁকে বাঁ দিকে হারিয়ে গেছে, আরেকটা ডানে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। ডানের রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলেই একটা বিশাল খাঁচা দেখা যাবে, এখানে হরিণের বসবাস। মূলত এটা হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, ছোট, বড়, মাঝারি-সব আকৃতির হরিণ ছুটে আসবে আপনাদের দেখে। মানুষে তাদের কোনো ভয় নেই, ঘাস আর কচি পাতা ছিঁড়ে দিলে খুব আয়েশ করে হাত থেকে নিয়ে খেতে শুরু করবে। এরপর রয়েছে কুমিরের আস্তানা। এখানে এক মাস বয়সী কুমির থেকে শুরু করে এক বছর বয়সী কুমির রয়েছে। দেখলে অবাক হয়ে যেতে হবে যে এই বিশালদেহী কুমিরের সাইজ একসময় থাকে টিকটিকির মতো!
কুমির দেখা শেষ করে ঢুকতে হবে বাঁ পাশের ট্রেইলে। একে বলা হয় ‘মাংকি ট্রেইল’। সুন্দরবনের মাঝখান দিয়ে বানানো কাঠের এক রাস্তা ধরে কিছুদূর হাঁটলেই চোখে পড়বে ৩০ থেকে ৪০টি বানরের এক বিশাল দল। বছরের যেকোনো সময়ে গেলেই এদের একই জায়গায় পাওয়া যাবে। এই দলে বাচ্চা থেকে শুরু করে বিশালদেহী সব বয়সের বানর রয়েছে। মানুষ দেখলেই কোথায় ভয় পেয়ে চলে যাবে তা না, বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে বয়সে বড় নেতাটি, বন বিভাগ তার নাম দিয়েছে ‘ভোলা’-এবার সে পথ আগলে দাঁড়িয়েছে, কোনোভাবেই যেতে দেবে না। আশপাশের সব বানর একসঙ্গে চেঁচামেচি করছে, সে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি! এই সময় যদি কেউ ভয় পেয়ে দৌড় দেয়, তাহলেই শেষ। বানরের দল খামচে একাকার করে দেবে! হাতে কোমল পানীয়র একটা আধখাওয়া বোতল থাকলে সেদিকেই থাকবে নেতার নজর। কালবিলম্ব না করে বোতল বাড়িয়ে দিলেই সে খপ করে ধরে ফেলবে, এরপর চোখের নিমেষে ঢকঢক করে পুরো বোতল সাবাড় করে দেবে! তাজ্জব হয়ে দেখবেন, এবার সে পথ ছেড়ে দিয়েছে। ভাবখানা এমন যে তোমাদের এই বনে ট্যাক্স দেওয়া হয়ে গেছে, এবার তোমরা ঘুরে আসতে পারো। গোটা তিরিশেক বানরের মাঝখান দিয়ে আর কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাকি রাস্তা পার হয়ে যাওয়া যাবে।
.রাস্তার শেষ মাথায় রয়েছে একটা ওয়াচ টাওয়ার, আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা উঠে গেলেন একেবারে মাথায়। সেখান থেকে পুরো করমজল একবারে দেখা যায়। এবার একটা পরামর্শ, এই বানরের দলের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই খারাপ ব্যবহার করবেন না। আপনি একটু রাগ দেখালেই এরা পুরো দল নিয়ে আপনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, তখন আসলেই বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না।

জেনে নিন
কীভাবে যাবেন সুন্দরবন, তা বলা হয়েছে আগেই। ফিরতি পথটাও সহজ। একইভাবে বিকেল চারটা-পাঁচটার মধ্যে মংলা থেকে ঢাকার গাড়িতে উঠে পড়বেন। রাত ১০টার আগেই ঢাকার চলে আসতে পারবেন। মাত্র এক দিন, কিন্তু এর মধ্যেই আপনি ঘুরে আসতে পারবে সুন্দরবন। এক দিনে সুন্দরবন!

Categories
রাকিব কিশোর

ঝুম পূর্ণিমা দ্বীপ নিঝুম

নিঝুম দ্বীপে টুপ করে ডুব দিল সূর্য

রাকিব কিশোর Red dot

ফাল্গুনী পূর্ণিমা রাত ছিল তখন। সেই পূর্ণিমার আলোয় ভেসে যেতে উতলা হয়েছিল আমার মতো আরও ২৬ জনের মন। কাজকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদকে আপন করে ছুটে গিয়েছিলাম ঢাকা থেকে অনেক দূরে—জল-জঙ্গলের নিঝুম দ্বীপে।

অ্যাডভেঞ্চার যাদের নিত্যসঙ্গী, তাদের দড়ি দিয়ে বেঁধেও ঘরে রাখা সম্ভব না। এই যাত্রার শুরুটাই হয়েছে লঞ্চ ধরার অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে। যে লঞ্চ ছাড়ার কথা ঠিক বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে, সেই লঞ্চ আমরা টেনেটুনে ঘাটের সঙ্গে আটকে রেখেছি ৫টা ৫৭ মিনিট পর্যন্ত—আমাদের দুজন সময়মতো এসে পৌঁছায়নি বলে। হাদী ভাই আর তামান্না ভাবি সদরঘাটের তীব্র যানজটে সিএনজি ছেড়ে পাক্কা সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে এসে যেই না লঞ্চে উঠলেন, তখনই সশব্দে হুড়হাড় করে ছেড়ে দিল আমাদের ভ্রাম্যমাণ এক রাতের বাড়ি। সেই মুহূর্ত থেকেই অ্যাডভেঞ্চারের শুরু।
এরপর লঞ্চ ছাপিয়ে অ্যাডভেঞ্চার ছড়িয়ে গেছে দোদুল্যমান ট্রলারে, এক আনাড়ি মাঝির হাতে পড়ে। হাতিয়ার তমরদ্দি ঘাট থেকে রওনা দিলাম নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে। মাঝি সবাইকে ডান দিকে তাকাতে বলে চালায় বাঁ দিকে, আর বাঁ দিকে তাকাতে বলে সোজা ঠেকিয়ে দেয় কোনো এক বালুচরে! এভাবেই পৌঁছে যাই নোয়াখালী জেলায় বঙ্গোপসাগরের সর্বদক্ষিণের দ্বীপ নিঝুম দ্বীপে। কাদা, জল আর লোনা পানি ডিঙিয়ে যখন তীরে নামি, তখন পুব আকাশে উঁকি দিচ্ছে রুপালি চাঁদের আভা।
এরপরের গল্পটুকু তুমুল উচ্ছ্বাসের, বাঁধভাঙা আনন্দের আর অজানাকে আপন করে নেওয়ার, মধ্যরাতে মাঝপুকুরে কাদাজলে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে গোসল করার, সারা নিঝুম দ্বীপ ঘুরে আটটা মুরগি এনে বারবিকিউ করার, বাঁশের আর গাছের সাঁকো পার হয়ে শুলোবনের মাঝ দিয়ে হরিণ খুঁজে বেড়ানোর, আর মধ্যরাতে চলল নিঝুম দ্বীপের সাদা বালুর সৈকতে জ্যোৎস্নায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
পরের দিনের শুরুটা হলো কবিরার চরের সবটুকু প্লাস্টিক আর অপচনশীল জিনিস খুঁজে বের করে আগুন জ্বালিয়ে। তাঁবু খাটিয়ে ইলিশ ও চেউয়া মাছ ভাজি দিয়ে বনভোজন শেষে যখন ঠিক হলো আমাদের সেদিনের রাত কাটবে নিঝুম দ্বীপের গহিন জঙ্গলে, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম এ রাত হবে জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর রাত! তবে কে জানত সেই রাতে আমি, জাফর, কবির, মণ্ডল আর মাহফুজ জঙ্গলে ঢুকে যাব লাকড়ি টোকাতে! কে জানত, লাকড়ি খুঁজতে গিয়ে নিজের মাত্রই কিনে আনা মোবাইল ফোনটি জঙ্গলে হারিয়ে আসবে জাফর!
আমাদের ১১ জনকে নামিয়ে দিয়ে যে দলটা চলে গিয়েছিল বাকি সব বাক্সপেটরা নিয়ে আসতে, তারা পেয়েছে আরেক দারুণ দৃশ্য! ১৬ জনের দলটা রাত ১০টায় যখন বঙ্গোপসাগরে আবার নৌকা ভাসাল, ততক্ষণে তাদের পথ দেখাতে পুরো আকাশ আলো করে উঠল ফাল্গুনী পূর্ণিমার চাঁদ! উথালপাতাল বাতাস আর ঘোরলাগা চন্দ্রাহত হয়ে যখন তারা ভিড়ল মূল ক্যাম্পিং সাইটে, তখন সেটা একটা অন্য দুনিয়া—আগুন জ্বলছে তাঁবুগুলোকে ঘিরে। আর সেই আলোতে কেওড়াবনজুড়ে তৈরি হয়েছে মায়াবী এক লালচে মোহনীয়তা।
সেই রাতটা ছিল অস্থির এক মাদকতায় পূর্ণ! শহুরে যে ছেলেগুলো কোনো দিন নিজের বিছানা ছেড়ে মাটিতে ঘুমায়নি, তারাই ঘুমাল চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া খোলা জঙ্গলের এক তাঁবুতে। ঠান্ডায় শিশিরভেজা তাঁবুর পর্দায় কাঁপতে কাঁপতে বের হয়ে সেই আগুন পোহাতে লাগল মাঝরাত্তিরে…এখানে-ওখানে ক্যাম্পফায়ার আর ভর্তা-ভাতের পাট চুকিয়ে যেই চোখ বোজার সময় হলো, ঠিক তখনই রাতের নিস্তব্ধতাকে চিরে দিয়ে আমাদের চারপাশে ডেকে উঠল শিয়ালের দল—বুনো শিয়াল। ভয়ার্ত আমরা দিগ্বিদিকজ্ঞান হারিয়ে টর্চলাইট ধরলাম তাদের চোখ বরাবর! জ্বলজ্বলে সেই চোখের ভাষা বুঝতে বাকি নেই কারও—যেন ঠান্ডা চোখে জানিয়ে দিচ্ছে আমরাই অনাহূত এখানে, এটা তাদের এলাকা।
কে শোনে কার কথা! ভোর চারটায় ধুম করে শাহেদ চেঁচিয়ে উঠল, ‘বস্তিবাসী জাগোওওও, হুঁশিয়ার, সাবধান’—আর পায় কে! ধুমধাম করে তাঁবু ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ট্যুরিস্টের দল। সবাই ছুটে গেল আগমনরত শিয়ালের দিকে, ভয় পেয়ে ভেগে গেল শিয়ালের পাল, এরপর ঘণ্টা খানেক ধরে চলল এই পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ওরা দল বেঁধে আসে, আমরা দল বেঁধে ওদের তাড়াই। আবার আসে, আবার তাড়াই। শেষমেশ যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন ২১ ফেব্রুয়ারি।
খালের পানিতে ভরা জোয়ারের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, কুয়াশাঢাকা ১৩টা তাঁবুর মাঝখানে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পতাকাটা, ধোঁয়া ওঠা ক্যাম্পিং সাইট, আর হিমশীতল ঠান্ডা বাতাসে হেলানো-দুলানো কেওড়াবাগান। আমাদের ফেরত নেওয়ার ট্রলার যখন আবার জঙ্গলের খালে আসছে, তখন পেছনে ফেলে যাচ্ছি শান্তস্নিগ্ধ এক জল-জঙ্গলের গল্প। আর সামনে অবারিত জলরাশি হাতছানি দিয়ে ডাকছে নতুন কোনো অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়।

যেভাবে যাবেন
ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন একটামাত্র লঞ্চই হাতিয়ায় যায়। লঞ্চ ছাড়ে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে। সেই লঞ্চ পরদিন সকালবেলা হাতিয়া পৌঁছায়। হাতিয়া থেকে ট্রলারে করে সোজা নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়। সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টা, আর ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে। ফেরার সময় একই পথে আসতে পারেন, অথবা হাতিয়া হয়ে চলে আসতে পারেন। ফেরার লঞ্চ কিন্তু দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে।

.

Categories
রাকিব কিশোর

দুপপানি ঝরনার এলাকায়, যার নাম উলুছড়ি

 কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটা হাতে ধরে চড়ে বসলাম রাঙামাটির রাতের বাসে, সঙ্গী হলেন ফেসবুক পেজ ওয়াইল্ড অ্যাডভেঞ্চারের আরও ছয়জন। আমরা যারা জল-জঙ্গলে ঘুরতে পছন্দ করি, তারা ফেসবুকে এই পেজটা খুলেছি…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

‘পাহাড়’—এই তিন অক্ষরের শব্দটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রহস্য-রোমাঞ্চ আর অজানা আনন্দের শিহরণ। আঁকাবাঁকা সবুজে ঘেরা চিকন পথটা ঠিক কখন যে দম বন্ধ করা সৌন্দর্যের একেবারে মুখোমুখি করে দেবে, তার কোনো ঠিক নেই। এ-গাছের পাতা সরিয়ে, ও-গাছের ডাল বাঁকিয়ে, সামনের আকাশ-সমান মাটির দেয়াল ডিঙিয়ে সবার ওপরে উঠে যাওয়ার, সবকিছুকে জয় করার আনন্দটাও কম নয়। এরপরও চোখের দৃষ্টিতে কাঁপন ধরানো সাদাটে ঝরনার পানি দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ই থাকে না।

এবার আমাদের গন্তব্য ছিল রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ির দুপপানি ঝরনা। অনেক অনেক দিন পরে কোনো ঝরনা দেখে স্রেফ বোবা বনে গিয়েছিলাম কয়েক মুহূর্ত।

দুপপানির রহস্য

দুপপানি ঝরনা ঘিরে একটা রহস্য রয়েছে—এখানে রোববার ছাড়া যাওয়া যায় না। এই ঝরনার ওপরে একজন সাধু তাঁর আশ্রমে ধ্যান করেন। স্থানীয় ভাষায় এই ধর্মযাজক সাধুকে বলা হয় ‘ভান্তে’, এই ছয় দিনে ভান্তে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি পছন্দ করেন না। তিনি সপ্তাহের ছয় দিন ধ্যান করে শুধু রোববারে খাবার খাওয়ার জন্য নিচে নেমে আসেন। তাই শুধু রোববারেই ঝরনাটায় লোকজনের যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ঈদের আগে এক রোববার পেয়ে গেলাম ছুটি। কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটা হাতে ধরে চড়ে বসলাম রাঙামাটির রাতের বাসে, সঙ্গী হলেন ফেসবুক পেজ ওয়াইল্ড অ্যাডভেঞ্চারের আরও ছয়জন। আমরা যারা জল-জঙ্গলে ঘুরতে পছন্দ করি, তারা ফেসবুকে এই পেজটা খুলেছি।

কাপ্তাই-বিলাইছড়ি-উলুছড়ি

ঈদের আগের যানজট পুরো দিনটাকে কুড়মুড় করে খেয়ে ফেলল। কাপ্তাই পৌঁছালাম বেলা দুইটায়। সেখান থেকে ছইওয়ালা বড় একটা ট্রলার দুই দিনের জন্য ভাড়া করলাম ছয় হাজার টাকায়। ট্রলার আমাদের নিয়ে পাড়ি জমাল কাপ্তাই হ্রদ ধরে বিলাইছড়ির দিকে। বিলাইছড়ি পৌঁছতে বিকেল পাঁচটা। সেখানে আমরা থেকে গেলাম সেদিন। পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই কালচে কাপ্তাই চিরে ঢুকে পড়ব দুপপানি ঝরনার এলাকায়, যার নাম উলুছড়ি।

ভোর পাঁচটায় যখন ভোরের বাতাসের ঘুম ভাঙিয়ে কনকনে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে উলুছড়ির দিকে যাচ্ছি, তখন স্থানীয় সেনাবাহিনী ক্যাম্পের লোকজনেরও চক্ষু চড়কগাছ। তাঁদের কাছে নিজেদের পরিচয় দিয়ে আবার ছুটলাম পাহাড়ের ডাকে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর আমরা উলুছড়ি পৌঁছলাম।

একেবারেই ছিমছাম, শান্ত, চুপচাপ একটা গ্রাম। গ্রামের মানুষ জানেও না, তারা কী অসাধারণ একটা একটা রত্ন নিয়ে বসে আছে! এক পাশে পাহাড় আর অন্য পাশে ধানখেত নিয়ে একটা আস্ত নদী কোলে করে শুয়ে আছে উলুছড়ি, এখানে নদীর ঘোলা পানি আর হইহই করে ধেয়ে আসা স্রোতই জানান দিচ্ছে, ভেতরে কী শক্তিশালী উৎস রয়েছে। চোখ বড় বড় করে সে উৎসের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমরা, যে পানির স্রোতই এত, সেই পানির উৎস না জানি কত বড়। একজন গাইড নিয়ে সামনের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। পরের কয়েক ঘণ্টা এই গাইডই আমাদের জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণ থেকে বারবার উদ্ধার করে নিয়ে এসেছেন। ৪৫ কেজি ওজনের এই গাইডের নাম প্রীতিময়।

রোমাঞ্চকর জঙ্গলে

জঙ্গলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে প্রীতিময়ের হুংকার—সবাইকে প্যান্ট খুলতে হবে! বলে কী! তাঁর কথা শুনে জাফর তো পিছলেই পড়ল। টুপ করে গলা-সমান কাদাপানিতে ডুবে গিয়ে ভুস করে মাথা বের করে জানতে চাইল, কেন? শান্ত, চুপচাপ ধীরস্থির প্রীতিময় বললেন, ওখানে কোমর এবং গলা-সমান পানি। ওটা পার হতে হলে শার্ট-প্যান্ট হাতে নিয়ে পার হতে হবে! তাঁর হাত অনুসরণ করে সামনে তাকিয়ে তাজ্জব বনে গেলাম। মাইল খানেক বিশাল এক জলাশয় চোখের সামনে, সেখানে আবার শাপলা শালুক ফুটে আছে। এটা পেরোনোর চিন্তা স্বাভাবিকভাবে আসে না। শাহেদের মুখ দিয়ে ফুস করে বেরিয়ে পড়ল, শুরুতেই এমন অ্যাডভেঞ্চার! না জানি সামনে আর কী কী আছে!

টানা আধা ঘণ্টা এই পানিপথের যুদ্ধ শেষ করে নিজেদের আবিষ্কার করলাম, মাত্রই পেকে সোনালি হয়ে ওঠা ম-ম সুগন্ধ ছড়ানো ধানখেতে। আমাদের সাঁতার না জানা বন্ধু খয়রুল ঘোষণা দিল, এই জীবনে সে যত দিন বেঁচে থাকবে, ভুলেও আর এ পথে পা মাড়াবে না। এরপর শুধুই হাঁটাপথ, সমতলে ঘণ্টা খানেক হেঁটে হেঁটে ছোটখাটো অনেক খাল পার হলাম। একবারও মনের মধ্যে আসেনি যে এই খালগুলোই ফেরার সময় হয়ে উঠবে মরণফাঁদ! সমতলের শেষ মাথায় কলাবাগানের সারি, পাকা কলার রাজত্ব পেরিয়ে হাঁটুপানির এক নদী ডিঙিয়ে এসে দাঁড়ালাম পাহাড়ের একেবারে গোড়ায়, মাথার ওপরে প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া একটা পাহাড়ি পথ উঠে গেছে।

বাপ্পী আর শুভ্রর এই প্রথম এত বড় পাহাড় দেখা, বোতলের পর বোতল পানি, স্যালাইন আর গ্লুকোজ বিসর্জন দিতে হয়েছে তাদেরকে এই চূড়ায় ওঠার জন্য। ছড়ছড় করে পিছলে পড়ে স্যান্ডেল হারিয়ে ফেলেছে শাহেদ, প্রতি মিনিটে দুবার করে আছাড় খেয়ে পাহাড়ের উচ্চতা কয়েক মিটার দাবিয়ে দিয়েছে জাফর, অন্যদের টেনে তোলার সময় পড়ে গিয়ে পাহাড়ে নতুন নতুন গিরিখাদ তৈরি করে ফেলেছে খয়রুল, আর সবার থেকে আলাদা হয়ে দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে সকালবেলায় তিরিশটা সেদ্ধ ডিম আর বাইশটা কলা খেয়ে পাহাড়ে আসা জটাধারী আহসান ভাই। তাঁর এক পায়ে স্যান্ডেল, অন্য পা খালি। এক পাহাড়ের এত রূপ এর আগে দেখিনি। এখানে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সব ঝরনার সব কটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

হাত বাড়ালেই মেঘ

জঙ্গলের বুনো গন্ধ মাতোয়ারা করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত, হাত বাড়ালেই মেঘের ছোঁয়া, পা বাড়ালেই জংলি ফুলের স্পর্শ, চোখ মেললেই মাইলের পর মাইল পাহাড়ের সারি। বিধাতা খুব যত্ন করে এই পাহাড়টাকে সাজিয়েছেন—ঠিক যেখানে যা থাকার কথা তেমন করে। সবই ঠিক ছিল, শুধু জাফর ছাড়া!
এক পাথুরে পিচ্ছিল পথ ধরে সবার আগে উঠে গেল জাফর। এরপর বলা নেই কওয়া নেই, দুম করে পুরো পাহাড় কাঁপিয়ে পিছলে পড়ে গেল সে। চোখের সামনে একটা আস্ত জাফর উড়ে এসে পড়ল ক্যাসকেইডের নিচের জমানো পানি আর পাথরের গুঁড়ির স্তূপে, কয়েক মিলিমিটারের জন্য বেঁচে গেল তার মাথাটা। ভয় ধরানো ট্রেইলের সূচনা হলো সেখানেই। এরপরই আমরা আবিষ্কার করলাম, এই পাহাড় কতটা ভয়ংকর। গোলাপে যেমন কাঁটা থাকে, তেমনি পাহাড়ের সৌন্দর্যে থাকে পিচ্ছিলতার গল্প।

অবশেষে দুপপানি ঝরনায়
সবকিছু পার করে আমরা পৌঁছে গেলাম দুপপানি পাড়ায়। এখান থেকেই নিচের দিকে গেলে দুপপানি ঝরনা। পাড়া থেকে রাজয় নামের আরেকজন গাইড নিয়ে হেঁটে চললাম আরাধ্য সেই ঝরনার উদ্দেশে।
দুপপানি ঝরনায় নামার রাস্তাটা একেবারেই জাদিপাই ঝরনায় নামার রাস্তার মতো। এখানে রাস্তা বলে কিছু নেই। এ-গাছের মাথা ধরে ও-গাছের গলায় ঝুলে, সে-গাছের পেট জড়িয়ে, ঝুরঝুরে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঝুপ করে নেমে পড়তে হয় এখানে। তারপর আলীবাবার চিচিং-ফাঁকের মতো এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ—তার ওপাশেই অতিকায় দুপপানি ঝরনা! প্রকৃতি নিজ হাতেই যেন এই সুড়ঙ্গ বানিয়ে রেখেছে, অনেক বড় কিছুর সামনে মানুষকে যেমন মাথা ঝুঁকিয়ে ঢুকতে হয়, এই সুড়ঙ্গ ঠিক তেমনই। এখান থেকে বের হয়ে মাথা ওঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সামনে ধরা দিল আমার দেখা এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় ঝরনা। দুধের মতো ধবধবে পানির ধারা কতটা ওপর থেকে কী তীব্র বেগেই না নিচের দিকে পড়ছে! আধেক চাঁদের মতো আকৃতি নিয়ে কয়েক লাখ সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করে বিশাল গর্জন নিয়ে আর সবাইকে জানান দিচ্ছে তার বিশালতা। ঝরনার নিচে টলটলে স্বচ্ছ পানি, সেই পানিতে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর, কোথাও গলা-সমান পানি তো আবার কোথাও হাঁটুর নিচে পাথরের গুঁড়ি কচমচ করে। দুপপানি ঝরনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর নিচ দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ আছে—লর্ড অব দ্য রিংস মুভির মতো।
সুড়ঙ্গের ভেতরে একেবারেই শুকনো, শান্ত, অদ্ভুত এক নিস্তব্ধ পরিবেশ। ঝরনার ভেতর থেকে ঝরনা দেখার এমন অভিজ্ঞতা আমার এর আগে কখনোই ছিল না। হইহই করে পড়তে থাকা পানির ভেতর দিয়ে ঢোকার সময় পিঠের ওপরে কয়েক মণ চাপ নিয়ে পানি আছড়ে পড়ার যে সুখানুভূতি, সেটা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। এই ঝরনাটা এতই বিশাল যে এর সামনে দাঁড়ালে নিজেকে পিঁপড়ার থেকেও ক্ষুদ্র মনে হয়, চারপাশ দিয়ে ধেয়ে আসা পানির ফোয়ারা দেখে মনের ভেতর থেকেই সবকিছু ফেলে-ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক আসে।

 

ফিরতি পথে…

ফেরার পথে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আমাদের কপাল খারাপ, যে খালে হাঁটুর নিচে পানি নিয়ে পার হয়েছিলাম, সেখানে এখন মাথার তিন হাত ওপর দিয়ে প্রবল বেগে ঘোলা পানি ছুটে যাচ্ছে, বাঁশ-দড়ি-কলাগাছের বাকল—কোনো কিছু দিয়েই কাজ হচ্ছে না। সঙ্গে আছে সাঁতার না জানা তিনজন, কোনোরকমে গাছের গুঁড়ি আর বিশাল বাঁশ দিয়ে ভয়ংকর আগ্রাসী স্রোত পার হয়ে আসতেই আরেক খাল। শেষমেশ এক ভাঙা নৌকায় মাঝিসহ নয়জন চড়ে বসলাম। সেই নৌকা স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটে চলেছে বড় নদীর দিকে।

শেষ বিকেলে আমরা যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা নিয়ে মূল নৌকায় ফেরত আসি, তখন জীবনের মানেটাই আসলে পাল্টে যেতে শুরু করল, কী ভয়াবহ, দুঃস্বপ্নের একটা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। অথচ ফিরলাম সুন্দর একটা ঝরনা দেখার সুখস্মৃতি নিয়ে।

 

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে কাপ্তাই গিয়ে সেখানের লঞ্চঘাট থেকে একটা ট্রলার ভাড়া করে বিলাইছড়ির দীঘলছড়ি ক্যাম্প এবং আলিখিয়াং বিজিবি ক্যাম্প পার হয়ে সোজা চলে যাবেন উলুছড়ি। দ্রুতগামী ছোট ট্রলার পাওয়া যায়, এগুলোর ভাড়াও কম। উলুছড়ি থেকে একজন গাইড নিয়ে তিন ঘণ্টা ট্রেক করে ঘুরে আসুন দুপপানি ঝরনা। রোববার ছাড়া অন্যদিন যাওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যাবেন। সেনাবাহিনীর তিনটি ক্যাম্প পড়বে, সেখানে পরিচয়পত্র দেখতে চাইবে। অপচনশীল কিছু জঙ্গলে ফেলবেন না, চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না।।