Categories
ফারুখ আহমেদ

এই পথ কেউ খুব একটা মাড়ায় না

লক্ষ্মণছড়ার যাত্রাপথটাও দারুণ। ছবি: লেখক

এই সময়টায় আবহাওয়া দারুণ থাকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, ঝুমবৃষ্টি, মেঘলা আকাশ, আবার কখনো ঝকঝকে রোদেলা আকাশ। জৈন্তাপুর থেকে সিলেট পৌঁছে এক দিন সিলেট শহরে অবস্থান করে পরদিন আবার বের হলাম। এবারের গন্তব্য অচেনা এক ছড়ার কাছে …লিখেছেন ফারুখ আহমেদ
নৌকা থেকে নামার পর একদল শিশু আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। আশপাশের সৌন্দর্য অসাধারণ। সোজা পাহাড়ের গায়ে গভীর জঙ্গল, তার সামনে চমৎকার একটি সেতু। পাহাড়ের গা বেয়ে একটি ঝরনা দুরন্ত গতিতে নেমে আসছে। চারপাশে অসংখ্য বাঁশঝাড়।
সেদিন সায়েদাবাদ থেকে রাত ১১টায় ছাড়ল আহমেদ পরিবহনের বাস। নরসিংদী, ভৈরব, হবিগঞ্জ, শেরপুর হয়ে সকাল সাতটায় পৌঁছালাম জৈন্তাপুর। জৈন্তাপুর এক দিন থেকে পরদিন সকালে আবার একটি লোকাল বাসে চলে এলাম সিলেট শহরে। সেটা গত বছরের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের ঘটনা। এই সময়টায় আবহাওয়া দারুণ থাকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, ঝুমবৃষ্টি, মেঘলা আকাশ, আবার কখনো ঝকঝকে রোদেলা আকাশ। জৈন্তাপুর থেকে সিলেট পৌঁছে এক দিন সিলেট শহরে অবস্থান করে পরদিন আবার বের হলাম। এবারের গন্তব্য অচেনা এক ছড়ার কাছে। সিলেট শহর থেকে সেই ছড়ার দূরত্ব সাকল্যে তিন ঘণ্টার। এলাকাটি ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয় পাহাড় হলেও এই পথ কেউ খুব একটা মাড়ায় না। পাহাড়ি নদী পিয়াইন, পশ্চিম জাফলং এলাকার বিভিন্ন গ্রাম আর জঙ্গলঘেরা সেই ছড়ার উদ্দেশে আমরা হাদারপারের পথে যাত্রা শুরু করলাম। হাদারপার পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম গনি মিয়ার হোটেলে। খাওয়াদাওয়া শেষে একজন গাইড নিয়ে ছইবিহীন এক খোলা নৌকায় চেপে বসলাম।
বিছনাকান্দি পেছনে ফেলে পশ্চিম জাফলং এলাকার পিয়াইন নদীর বুক দিয়ে নৌকা ছুটে চলেছে। আমাদের চলার দুই পাশে বাঁশঝোপ। একটা এমন ঝোপ দেখে ক্লিক করলাম। ভিউ ফাইন্ডারে ছবি দেখে মনে হলো যেন এক সবুজ ডাইনোসর পিয়াইন নদীর জলে নেমে জলপানে ব্যস্ত। ক্যামেরা রেখে সৌন্দর্য চোখ দিয়ে গিলে খেতে খেতে সেই জলপথে এগিয়ে চলি। এভাবেই একসময় বাঁ দিকে মোড় নিতে হয়। এবার আঁকাবাঁকা খালের ভেতর দিয়ে আমাদের জলপথে চলা। অসাধারণ সেই পথ। চেনা-অচেনা কত না গাছগাছালি। সবুজ ঘাস, সবুজ ফুল, কখনো হলুদ রঙা, আবার কখনো গোলাপি বা সাদা ফুলের বাহারে বিমোহিত আমরা। সেদিন চরম নৈঃশব্দ্যের মধ্যে পিয়াইনের এই খাল দিয়ে চলা আমাদের ভ্রমণের সেরা প্রাপ্তি। দিনটা রোদ ঝকঝকে ছিল না। তবে দিনের আলোয় কী এক মায়া ছিল। জলপথে চলতে আলো-ছায়ার চমৎকার খেলা দেখে মুগ্ধতায় ভরে উঠছিল আমাদের মন। আবার যদি এই পথে না আসা হয়, ভাবতেই ক্যামেরায় হাত চলে আসে। চলে সমানে ক্লিক। ক্রমশ খাল সরু হয়ে আসছে। দেখা মিলছে চিকন বাঁশের সেতুর। একসময় যাত্রাপথ শেষ হয়। আন্দাজ করি, আমরা সীমান্ত এলাকায় চলে এসেছি। কৌতূহলী গ্রামবাসী আমাদের জেঁকে ধরেছে, এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। সামনে অসাধারণ এক সেতু। একেবারে হাত ছোঁয়া দূরত্বে ঝরনা দেখা গেলেও সেই অংশ পড়েছে ভারতের ভেতরে। বাংলাদেশ প্রান্তে এ কেবলি অসাধারণ এক ছড়া। সবাই পাথর বিছানো সেই জলে নেমে পড়লাম। এর মধ্যে একটু বোকা বোকা ভাব করে মুরব্বি গোছের একজনকে পেয়ে প্রশ্ন করে বসি, কাকা, এই জায়গার নাম কী। কাকার স্বতঃফূর্ত জবাব, লক্ষ্মণছড়া!

জেনে নিন
দেখা যাবে এমন সেতুওঢাকা থেকে আপনাকে প্রথমে সিলেট যেতে হবে। সন্ধ্যার বাসে সিলেট রওনা হলে মধ্যরাতে পৌঁছে যাবেন। রাতে বিশ্রাম, পরদিন হাদারপার। সে ক্ষেত্রে আপনার বাহন হতে পারে লেগুনা, মাইক্রোবাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা। হাদারপার দেড় ঘণ্টার পথ। হাদারপার থেকে নৌকায় যেতে হবে লক্ষ্মণছড়া। ইদানীং বিছনাকান্দির দর্শনার্থী বেড়ে যাওয়ায় নৌকার মাঝি ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকেন। সে জন্য ঠিকঠাক মতো দরদাম করেই নৌকায় উঠবেন। হাদারপার থেকে লক্ষ্মণছড়া ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার পথ। নৌকার মাঝির লক্ষ্মণছড়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে কি না, সে বিষয়ে অবগত হয়ে অথবা সঙ্গে গাইড নিয়েই যাত্রা শুরু করুন। নদীর বাতাস আর ছড়ার পানিতে গোসলের পর খিদে মাথাচাড়া দেবেই। সুতরাং সঙ্গে শুকনা খাবার আর পানি রাখতে পারেন। তবে সীমান্ত অতিক্রম করে ঝরনার অনেক কাছে বা সেতুর ওপর ওঠার চেষ্টা করবেন না। লক্ষ্মণছড়া বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত সময় জুন থেকে অক্টোবর মাস।

Categories
ফারুখ আহমেদ

এখানে নাকি লর্ড ক্লাইভ বসবাস করতেন!

কাজলা নদীর শানবাঁধানো ঘাট

কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে রয়েছে বেশ কিছু নীলকুঠি। এর মধ্যে আমঝুপি নীলকুঠি অন্যতম। কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের কাছেই আমঝুপি নীলকুঠির অবস্থান …লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

এখানে প্রচুর পাখি আছে। প্রথম দিন বের হয়েই তা বোঝা গেল। দুইটা হাড়িচাঁচা একসঙ্গে বসে আছে দেখতে পেয়ে ক্যামেরা হাতে আবু জাফরের সে কী দৌড়। যখন ফিরে এলেন, তখন তাঁর চোখেমুখে একরাশ হতাশা। সে ক্লিক করার আগেই নাকি হাড়িচাঁচা ফুড়ুৎ। অনেক চেষ্টা করলেন একটা হলদে পাখির ছবি তুলতে, পারলেন না। জাফরের পাখি দেখা ও পাখির ছবি তোলার নেশায় পরের দিনও সাতসকালে বের হলেন। সঙ্গে আমি, অজয় সরকার আর সংগীতশিল্পী ও উপস্থাপক শেখ শাহেদ। মেহেরপুরে বেড়াতে এসেছি আমরা।

আশ্বিন মাস চলছে তখন। কাটা হয়ে গেছে এলাকার বেশির ভাগ পাট। চারদিকে পানিতে জাগ দেওয়া পাটের গন্ধ। এলাকার একজনকে বললাম, উফ্, দারুণ গন্ধ। তিনি বললেন, দুই দিন থাকেন, এই ভালো লাগা হাওয়ায় উড়বে। সত্যি বলতে কি, তিন দিন থেকেও আমার কাছে এই গন্ধের মোহ একটুও কমেনি। বলছিলাম মুজিবনগরের কথা। এখান থেকেই বেরিয়ে এলাম মেহেরপুরের আমঝুপি নীলকুঠিতে। মুজিবনগর থেকে আমঝুপি নীলকুঠির দূরত্ব ১৮ কিলোমিটারের মতো।
কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে রয়েছে বেশ কিছু নীলকুঠি। এর মধ্যে আমঝুপি নীলকুঠি অন্যতম। কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কের কাছেই আমঝুপি নীলকুঠির অবস্থান। আমঝুপি নীলকুঠির সামনে বাঁধাই করা আমঝুপি স্বর্ণালি ইতিহাস থেকে জানতে পারি, ১৯৭৮ সালের ১৩ মে খুলনা বিভাগ উন্নয়ন বোর্ডের আমঝুপি অধিবেশনের সভায় এক সময়কার নীলকুঠিটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৯ সালে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।
আমঝুপির প্রবেশমুখেই দেখা হয়ে গেল সারি সারি আমগাছের সঙ্গে। এটা হলো আম্রকানন বা আমবাগান। আমরা আম্রকানন ও কিছু প্রাচীন ভবন পেরিয়ে আমঝুপি নীলকুঠিতে পৌঁছাই। প্রবেশমুখে জটলা করে এলাকাবাসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তবে সেদিন কোনো দর্শনার্থী ছিল না। আমরা ঘুরে ঘুরে আমঝুপি নীলকুঠি দেখতে গিয়ে একটি সাইনবোর্ড ও তাতে লেখা দেখে থমকে দাঁড়াই। নীলকুঠি দর্শনের জন্য গাইড হিসেবে মালি বিল্লাল ও শফিকুলের সহায়তা নিতে বলা হয়েছে। অথচ নম্বর মোতাবেক ফোন করে তাঁদের পাওয়া গেল না। ফলাফল, নিজেরাই নীলকুঠি দর্শনে নামি।
আমাদের সামনে এখন আমঝুপি নীলকুঠি লেখা যে ভবনটি দাঁড়িয়ে, সেখানে নাকি একসময় লর্ড ক্লাইভ বসবাস করতেন, মতান্তরে এটা তাঁর অফিস বা কাছারি ছিল। ভবনটির সামনেই লেখা রয়েছে, আমঝুপি নীলকুঠির ইতিহাস। নীলকুঠি থেকে হাতের বাঁ দিকে রয়েছে বিশাল মাঠ। তার পাশে বয়ে চলেছে কাজলা নদী। আমরা সেদিকটায় না গিয়ে ডানপাশের পথ দিয়ে নীলকুঠির পেছনের অংশে প্রবেশ করি। এবার চোখ চলে যায় আকাশের দিকে। স্বচ্ছ নীলাকাশ কিন্তু ওপর থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারা নামতে দেখলাম। গুড়গুড় মেঘের ডাকও শোনা গেল। আমরা নীলকুঠির বারান্দায় আশ্রয় নিতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি উধাও। এবার সামনে চোখ পড়তে দুচোখ ছানাবড়া। আমাদের সামনে এখন ডাক বহনকারী কবুতরের ঘর দাঁড়িয়ে। মানে হলো, সে সময় চিঠি আদান-প্রদানের জন্য যেসব কবুতর ছিল, তাদের বাসগৃহ ছিল এটি।
পাশের যে ভবনটিতে আমরা বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেটি দেখে বিস্ময় জাগল। নীলকুঠির সম্মুখভাগে দেখে এলাম এক রকম স্থাপত্য নিদর্শন, পেছনে অন্য রকম। দুই দিক থেকে দেখলে উভয়কেই মনে হবে মূল ভবনের মূল ফটক। আমাদের স্থপতি বন্ধু আসিফের কাছে জেনে নিলাম ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর আদলে আমঝুপি নীলকুঠি স্থাপিত। ভবনটির উভয় পাশে রয়েছে সারি সারি নারকেলগাছ। আর গোলাপবাগান। ঠিক তার সামনে কাজলা নদী বরাবর বিশাল শানবাঁধানো ঘাট বুঝিয়ে দেয় একসময় কতটা বিশাল আর খরস্রোতা ছিল সে নদী। বোঝা হয়ে গেল কাজলা নদীর সুসময়ে বড় বড় নৌযান চলত তার বুকের ওপর দিয়ে। ইংরেজদের নৌযান তখন এই ঘাটেই ভিড়ত। আমরা দৃষ্টিনন্দন সে ঘাটে গিয়ে দাঁড়াই। ঘাট থেকে নীলকুঠির শোভা দেখতে বেশ লাগছিল, বেশি ভালো লাগছিল নদীর বুকে সারি সারি পাটখড়ি দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য।
কীভাবে যাবেন
আমরা মুজিবনগর থেকে মেহেরপুর গিয়েছিলাম। আপনি সরাসরি মেহেরপুর চলে যেতে পারেন। মেহেরপুর সদর থেকে আমঝুপির দূরত্ব সাত কিলোমিটারের মতো। ঢাকা থেকে মেহেরপুর সরাসরি বাস চলাচল রয়েছে। মেহেরপুর থাকার জন্য মিতা, কামাল, ফিন টাওয়ারসহ ভালো কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন। থাকার ব্যবস্থা করা যাবে জেলা সার্কিট হাউস ও পৌর হলে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা থেকেই থাকার ব্যবস্থা করে যেতে হবে। মেহেরপুর বেড়ানোর জন্য এখানকার স্থানীয়ভাবে নির্মিত যান আলম সাধু দারুণ জনপ্রিয়। ইঞ্জিনচালিত বড় ধরনের ভ্যানগাড়ি বা ভটভটিকে এখানে বলা হয় আলম সাধু। মেহেরপুরে খাবারের ভালো ব্যবস্থা পাবেন। আর এখানকার দই ও মিষ্টির স্বাদ অপূর্ব। মেহেরপুরে আমঝুপি ছাড়াও আছে ভাটপাড়া ও সাহারাবাটি নীলকুঠি। আমদহ স্থাপত্য নিদর্শন, সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির ও ভবানন্দপুর মন্দির ঘুরে আসতে পারেন।

Categories
ফারুখ আহমেদ

শুরু হতেই অনুভূতি অন্য রকম

শশী লজের নান্দনিকতা চোখে পড়ে এখনো। ছবি: লেখক

মুক্তাগাছা রাজবাড়ি। ময়মনসিংহ শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ছুটিছাঁটায় কোথাও বেড়াতে মন চাইলে চলে আসতে পারেন এখানে…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ

বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিন। কিন্তু জরাজীর্ণ সে বাড়িটির কোনো ধরনের
সংস্কার সাধন করা হয়নি এখন পর্যন্ত।
বিশাল বাড়িটির দেখভাল করার জন্য আছেন মাত্র একজন। সেই একজন রশিদ মিয়াকে আবার সব সময়
পাওয়া যায় না। অনুমতি নেই, তবু কেউ কেউ জরাজীর্ণ বাড়িটির ছাদে বা কার্নিশের ওপর চড়ে বসেন। এখানে
কোনো গাইডের ব্যবস্থাও নেই। তবু দেখা হয়ে গেল একদল আলোকচিত্রীর সঙ্গে। স্রেফ বেড়াতে এসেছেন,
এমন মানুষও কম নন।
যে বাড়িটির কথা এতক্ষণ আপনাদের বলে চলেছি, সেটি হচ্ছে মুক্তাগাছা রাজবাড়ি। ময়মনসিংহ শহর থেকে
১৬ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। ছুটিছাঁটায় কোথাও বেড়াতে মন চাইলে চলে আসতে পারেন এখানে।
ময়মনসিংহ শহর থেকে সময় লাগে আধা ঘণ্টার মতো। আর ঢাকা থেকে সাকল্যে চার ঘণ্টা। দিনে গিয়ে দিনেই
ফিরে আসা সম্ভব। মুক্তাগাছার জমিদারির বিশাল অংশ ময়মনসিংহ শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এসব
নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শশী লজ (বর্তমান মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ), লোহার কুঠি বা আলেকজান্ডার
ক্যাসল (বর্তমান টিচার্স ট্রেনিং কলেজ), সূর্যকান্ত হাসপাতাল (এস কে হাসপাতাল), রাজ রাজেশ্বরী পানির
ট্যাংক, শিবমন্দির, বিদ্যাময়ী স্কুল ও ময়মনসিংহ টাউন হল। তা ছাড়া ময়মনসিংহ শহরের অন্য দর্শনীয়
স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়,
ময়মনসিংহ জাদুঘর, নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র ও ব্রহ্মপুত্র নদ। একসঙ্গে এতগুলো অসাধারণ নিদর্শন ময়মনসিংহ
বেড়ানো সার্থক করে তোলে।

মুক্তাগাছার রাজবাড়ি

 

যাত্রা হলো শুরু
ঢাকা থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার যানজটে সবকিছু কেমন অস্থির মনে হবে। জাতীয় উদ্যান শুরু হতেই
অনুভূতি অন্য রকম। এখানকার সবুজ মনে অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করবে। বিড়ম্বনাও আছে, রাস্তাঘাট
মাঝেমধ্যেই ভাঙাচোরা। এখানে দীর্ঘদিন রাস্তা সম্প্র্রসারিত করার কাজ চলছে।
তাই ময়মনসিংহ শহরে আসতে তিন ঘণ্টা বা তার একটু বেশি সময় লাগতে পারে।এখানে একটু যাত্রাবিরতি
দিয়ে চলুন চলে যাই মুক্তাগাছা। মুক্তাগাছার পথে নামতেই আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি। এখানকার রাস্তা
দারুণ! পথের দুই পাশেই সবুজ। এভাবেই পুকুর-ডোবা, ধানখেত আর খোলা প্রান্তরের সবুজে চোখ মেলে দেখে
দেখে একসময় চলে আসবেন মুক্তাগাছা।

মুক্তাগাছা রাজবাড়ি
মুক্তাগাছার জমিদারির মোট অংশ ১৬টি। অর্থাৎ ১৬ জন জমিদার এখানে শাসন করতেন। মুক্তাগাছা
রাজবাড়িটির প্রবেশমুখে রয়েছে বিশাল ফটক। ভেতরে প্রবেশ করলে জীর্ণপ্রায় বাড়িটির অন্য রকম সৌন্দর্যে
চোখ জুড়িয়ে যাবে। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই রাজবাড়িটি প্রাচীন স্থাপনাশৈলীর অনন্য
নিদর্শন।
শুরুতেই দেখা পাবেন একতলা একটি ভবনের। লোহার পাত আর কাঠের পাটাতন দিয়ে করা ছাদ চমৎকার! তা
ছাড়া লোহার পাতের নানা রকম নকশা এ বাড়ির চারপাশে আপনার দৃষ্টি এড়াবে না। এখানে একসময় ছিল
ঘূর্ণায়মান একটি রঙ্গমঞ্চ। দৃষ্টিনন্দন রাজ রাজেশ্বরী মন্দিরটির দেখা পাবেন রাজবাড়ির প্রবেশমুখেই।
রাজকোষাগার, টিন আর কাঠের তৈরি অসাধারণ এক-দোতলা রাজপ্রাসাদ, রানির অন্দরমহল। লম্বা লম্বা
করিডরগুলোও মুগ্ধতা জাগায়।
তা ছাড়া আরও আছে লাইব্রেরি, দরবার হল, কাচারিঘর, লক্ষ্মীপূজা আর দুর্গাপূজার ঘর। আর পেছনে রয়েছে
একটি গোপন সুড়ঙ্গ। মুক্তাগাছা রাজবাড়িটি পাশেই আরও দুটি রাজবাড়ি আছে। শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজ এর
মধ্যে একটি। অন্য বাড়িটি ছিল সে সময়কার হাতিশালা। বর্তমানে এটি আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। দেখা শেষ হলো মুক্তাগাছা রাজবাড়ি। এবার মুক্তাগাছার প্রসিদ্ধ গোপাল পালের মণ্ডার
দোকান ঘুরে মণ্ডা খেয়ে বাড়ির জন্য মণ্ডা নিয়েও যান।

লোহার কুঠি বা আলেকজান্ডার ক্যাসল

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সরাসরি ময়মনসিংহ বাস সারা দিন চলাচল করে। মহাখালী থেকে চলা সেসব বাসের মধ্যে
অন্যতম হলো এনা, সৌখিন, নিরাপদ ও শামীম এন্টারপ্রাইজ। ভাড়া এসি ২৭০, নন-এসি ২৫০ টাকা।
ময়মনসিংহ থেকে মুক্তাগাছা বাস সার্ভিস রয়েছে। চাইলে মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজ মোড় থেকে
সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চড়েও মুক্তাগাছা যেতে পারেন। মাথাপিছু ভাড়া পড়বে ২০ টাকার মতো।
ময়মনসিংহ-মুক্তাগাছা এক দিনে ভ্রমণ সারতে চাইলে নিজস্ব বাহন উত্তম। আর সময় নিয়ে গেলে ময়মনসিংহ
শহরে থাকার ভালো ব্যবস্থা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমির ইন্টারন্যাশনাল আর হোটেল মুস্তাফিজ ইন্টারন্যাশনালের
ওপর আপনি ভরসা করতেই পারেন। আর খাবার নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। প্রেসক্লাব ক্যানটিনের
মোরগ-পোলাওয়ের খুব নামডাক। আর আছে হোটেল ধানসিঁড়ি ও হোটেল সারিন্দা।

Categories
ফারুখ আহমেদ

জাদুকাটার যাত্রা শুরু

নীল-সবুজের নানা ছোঁয়া জাদুকাটার চারপাশে। ছবি: লেখক

ঝকঝকে আকাশে তুলোর মেঘ। পাশাপাশি হাত বাড়ানো দূরত্বে মেঘালয় পর্বতমালা আর জাদুকাটা নদী। বিশাল জলরাশি নিয়ে বয়ে চলা জাদুকাটায় মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখে চলি…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

বারিকটিলা। মাথার ওপর নীল আকাশ। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ সবুজরঙা জলধারা নিয়ে একটি নদী। পাহাড়ি নদীগুলো খুব একটা বড় হয় না। ভুল ভাঙল নদীটির বুকে দৃষ্টি মেলে। নদীতে উথাল-পাথাল ঢেউ নেই কিন্তু নদীর বিশালতায় ঠিক তলিয়ে গেলাম যেন। হেমন্তেই নদীর যে অবস্থা তাতে ভাবতেই বিষম খেলাম, বর্ষায় এ নদীর কী হাল হবে!

নদীর নাম জাদুকাটা। জাদুকাটা নামের উত্স সন্ধান করে নদীর মতোই এর কূল-কিনারা পেলাম না। তবে জাদুকাটা নদীটি অসাধারণ। বারিকটিলার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো নদী দেখতে পাবেন। এখানে ঝকঝকে আকাশের সঙ্গে পুরো এলাকাটাই মনে হবে রঙিন ক্যানভাস। অসাধারণ স্বপ্নিল এক পরিবেশ। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী একজন বললেন, অসম্ভব রূপবতী! পাশেরজনের জিজ্ঞাসা, রূপবতী, কিন্তু রূপবান নয় কেন! এবার আরেকজন ব্যাখ্যা দিলেন ‘নদীর প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে যেন জাদুর পরশ, সঙ্গে মায়ার খেলা। সুতরাং এ কখনো রূপবান হতেই পারে না। এ আমাদের অসম্ভব রূপবতী আর মায়াবতী জাদুকাটা।’ এরপর আর কোনো কথাই চলে না, কোনো কথা হলো না। সবাই তাঁর ব্যাখ্যা মেনে নিয়েই টিলার বাঁক ধরে নিচে নদীর দিকে পা বাড়ালেন।

হেমন্তের এক সকালে আমাদের জাদুকাটা যাত্রা শুরু হয়। এর আগে টেকেরঘাটে কয়লার ডিপোতে রাতযাপন শেষে লাকমাছড়া হয়ে আমরা চারটা মোটরবাইকে চেপে জাদুকাটার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। আগের দিন তাহিরপুর থেকে বজরায় চেপে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে টেকেরঘাটে ডেরা গেড়েছি। আমাদের বন্ধু তৌফিক যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া আর চাঁদনিরাতে কয়লার ডিপোতে রাতযাপনের অসম্ভব সুন্দর গল্প আছে। সে গল্প অন্য দিন হবে। যাই হোক, পরের দিন আমরা লাকমাছড়া ঘুরে জাদুকাটার পথে নামি।

নীল-সবুজের নানা ছোঁয়া জাদুকাটার চারপাশে। ছবি: লেখক

লাকমাছড়া যেন আরেক জাফলং। পথিমধ্যে লাইমস্টোন লেকে কিছু সময় কাটিয়ে শুরু হয় আমাদের একটানা পথচলা। মোটরসাইকেল ছুটে চলেছে মেঘালয় পর্বতমালা ছুঁয়ে। চড়াইয়ের পথ তবু আমাদের বাহন খুব দ্রুতই এগিয়ে চলে। ঘুম ঘুম পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলতে দিনের বেলা গায়ে কেমন শীত শীত লাগছিল। এভাবেই একসময় সামনে পড়ে একটি উঁচু টিলা। মোটরসাইকেল যখন সে টিলার পাদদেশ বেয়ে ওপরে উঠছিল তখন মনে হচ্ছিল এই বুঝি উল্টে যাবে। জায়গাটির নাম বারিকটিলা। একটি গির্জা রয়েছে এখানে। চারদিকে সবুজ প্রকৃতি। পাশেই মেঘালয় পর্বতমালা আর চুনা পাথরের সৌন্দর্যের সঙ্গে আকাশে মেঘেদের লুকোচুরি আর বাতাসের দোল।

ঝকঝকে আকাশে তুলোর মেঘ। পাশাপাশি হাত বাড়ানো দূরত্বে মেঘালয় পর্বতমালা আর জাদুকাটা নদী। বিশাল জলরাশি নিয়ে বয়ে চলা জাদুকাটায় মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখে চলি। কত মানুষ নদীতে, কত কত নৌকা। নদী থেকে পাথর তোলা হচ্ছে। এসব দেখে একসময় আমরা টিলার খাঁজ বেয়ে নেমে আসি নদীতে। তারপর যার যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি। জলের তলে পাথরে ঘষা লেগে অনেকে আহত হলেও এমন ভালোলাগায় তাতে কেউই গা করেন না। একসময় আমাদের জাদুকাটার জল ছেড়ে উঠে আসতেই হয়। তখন নীলাকাশে গোধূলির ছোঁয়া। ওপারের বালিয়ারিতে শেষ বেলার সূর্যের ঝিকিমিকি দেখি। তারপর গুদারাঘাটে এসে যখন খেয়াযানে চড়ে বসি তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়েছে।

জেনে নিন

জাদুকাটা নদী সুনামগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে অবস্থিত। একসঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘোরার প্রস্তুতি নিয়েই আপনাকে জাদুকাটার উদ্দেশে বের হতে হবে। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে। এনা, হানিফ, শ্যামলী, ইউনিকসহ অনেক বাস এই লাইনে চলে। অগ্রিম টিকিট কেটে নিন। সুনামগঞ্জ থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি। এখানে দলবেঁধে যাওয়াই ভালো। সরাসরি জাদুকাটায় যেতে পারেন। আবার টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরেও জাদুকাটায় যাওয়া যায়। আমার পরামর্শ হবে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে টেকেরঘাট রাতযাপন।

টেকেরঘাটে হোটেলে থাকতে পারেন। থাকতে পারেন নৌকাতে। পরদিন লাকমাছড়া, লাইমস্টোন লেক ও টিলা ঘুরে মোটরসাইকেলে চলে যান বারিকটিলা। বারিকটিলা আর জাদুকাটা পাশাপাশি। টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে মনে ভালোলাগা তৈরি হবে। টেকেরঘাট থেকে জাদুকাটা যাওয়ার পথটুকু সে ভালোলাগার মাত্রা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ আর জাদুকাটা আপনাকে ভালো লাগার স্বপ্নময় জগতে পৌঁছে দেবে!

Categories
ফারুখ আহমেদ

কী এক আশ্চর্য মাদকতা

ঢাকার আশপাশেই দেখা মিলবে এমন হলুদের। ছবি: লেখক

শীতের সে তীব্রতা গায়ে নিয়ে আমরা এবার সিরাজদিখানের পথ ধরি। এখানে একপাশে ইছামতী নদী, আর অন্য পাশে দিগন্তজোড়া হলুদ মাঠ। যতই সামনে এগোচ্ছি সরষে ফুলের সুবাসে আমোদিত হচ্ছি…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

ফেসবুকে কার যেন ছবিতে দেখি হলুদ সরষের খেত। ব্যস মনে হলো, নিজেও দেখে আসি না। প্রথমে নরসিংদী যাব ভেবেও পরে চলে গেলাম ঢাকার কাছের সিরাজদিখান।
ওদিকটায় শীত এবার খুব বেশি। শুধু কি শীত, সঙ্গে কুয়াশাও। সকাল গিয়ে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা নামে কিন্তু কুয়াশার চাদর সরে সূর্যের দেখা মেলে না।
সকাল ১০টার দিকে ঢাকা থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। আমাদের নগর কুয়াশায় ঢাকা হলেও কাছের মানুষটাকে ঠিকই দেখা যায়। কিন্তু বাবুবাজারের কাছের বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু পার হয়ে মাওয়া রোডে পৌঁছতেই এমন অবস্থা যে কুয়াশার জন্য এক হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এভাবেই আমরা ধলেশ্বরী নদীর বুকের জোড়া সেতুর শেষেরটায় গিয়ে যাত্রাবিরতি টানি।
নদীতে পানি কম আর তার ডানে-বামে পুরো এলাকাজুড়ে সরষেখেত। প্রায় আধ ঘণ্টা এখানে ধলেশ্বরী সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যের অপেক্ষা করে ফের যাত্রা শুরু করি।
শৈত্যপ্রবাহ যেন গায়ে হিম ধরিয়েছে। শীতের সে তীব্রতা গায়ে নিয়ে আমরা এবার সিরাজদিখানের পথ ধরি। এখানে একপাশে ইছামতী নদী, আর অন্য পাশে দিগন্তজোড়া হলুদ মাঠ। যতই সামনে এগোচ্ছি সরষে ফুলের সুবাসে আমোদিত হচ্ছি। এভাবেই আমরা বেজের হাট, বাসাইল হয়ে চলে আসি সিরাজদিখান। এখানে চা-বিরতি। পরে নৌকায় চেপে টেকের হাঁট পৌঁছতেই আমাদের এক ঘণ্টা লাগে। দুপুর ঘনিয়েছে তবু সূর্যের দেখা নেই। আমরা টেকেরহাট লালনশাহ বটতলায় বসে চা পান করে ওপারের সরষেখেতে নেমে পড়ি। এ সময়ই দেখা দিল সূর্য। আর শুরু হয়ে গেল ক্যামেরার ক্লিক
সরষে ফুলের সুবাসে কী এক আশ্চর্য মাদকতা। সে মাদকতার টানেই মৌমাছিদের ভিড়। আর বক পাখিদের আনাগোনা। সূর্য আড়াল হয়ে প্রকৃতিতে আবার কুয়াশা ভর করতেই মোহ ভাঙে। নৌকায় চড়ে ফেরার পথ ধরি। দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে পানকৌড়ি পাখনা মেলে কুয়াশার আঁধারে বৃথাই রোদ পোহাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমার সঙ্গীরাও ঠান্ডায় কাহিল প্রায়। ক্যামেরা আড়াল হয়েছে, থেমে গেছে আনন্দ-উল্লাস। উদাস চিল গন্তব্যে ফিরে চলেছে। ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাওয়া আমাদেরও ঘরে ফেরার তাড়া। এবার সঙ্গীর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম একটু উষ্ণতার জন্য!
.জেনে নিন
এখনই সরষে দেখার মোক্ষম সময়। পুরো সরষেখেত যেন হলুদ দুনিয়া। সরষের নাচন দেখতে চাইলে যেতে পারেন ঢাকার কাছের সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকা, ডেমরা হয়ে নরসিংদী। আর পুরো মাওয়া রোডজুড়েই পাবেন হলুদ সরষে ফুল। যেতে পারেন বেজেরহাটি বাসাইল হয়ে সিরাজদিখান টেকেরহাট আর ইছাপুর। আর যেতে পারেন কায়কোবাদ সেতু হয়ে নবাবগঞ্জ-দোহার।

Categories
ফারুখ আহমেদ

পাথর মেঘালয় পর্বতমালা

নদীর বুকে পাথরের বিছানা মেলে বিছনাকান্দি। ছবি: লেখক

 নৌকা আমাদের নিয়ে যতই বিছনাকান্দির দিকে এগোচ্ছিল ততই তার সৌন্দর্যচ্ছটা যেন উপচে বের হচ্ছিল। সঙ্গে মিলেমিশে একাকার ছিল নদীর এপার আর ওপারের অপার সৌন্দর্য।…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ

আমার এক বন্ধুর মতে, বিছনাকান্দি হলো জীবনযাপনের যাবতীয় ক্লান্তি দূর করার জন্য চমৎকার জায়গা। সে জায়গার সৌন্দর্যগাথা দেখার জন্য সড়কপথে এক রাতেই চলে এলাম সিলেট। মেঘে ঢাকা আকাশ আর বৃষ্টিঝরা দিন না হলে বিছনাকান্দির সে সৌন্দর্য ঠিক বোঝা যায় না! সকালে ঘুম থেকে উঠে মুষলধারায় বৃষ্টি দেখে মন তাই খুশিতে নেচে উঠল।

ঠিক সকাল সাড়ে ১০টায় লেগুনায় চেপে যাত্রা শুরু। মালিনীছড়া চা-বাগান, সালুটিকর আর বিমানবন্দর সড়ক হয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম হাদারপার বাজার। এখানে খানিক বিশ্রাম। তারপর সবাই মিলে ভুনা খিচুড়ি খেয়ে হাদারপার খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চেপে বিছনাকান্দি। নৌকা আমাদের নিয়ে যতই বিছনাকান্দির দিকে এগোচ্ছিল ততই তার সৌন্দর্যচ্ছটা যেন উপচে বের হচ্ছিল। সঙ্গে মিলেমিশে একাকার ছিল নদীর এপার আর ওপারের অপার সৌন্দর্য। এভাবেই ঠিক ১৫ মিনিট পর আমরা পৌঁছে যাই বিছনাকান্দি।
অবিশ্বাস্য সৌন্দর্য সেখানে।কল্পনাও করতে পারিনি। কাছেই দাঁড়িয়ে মেঘে ঢাকা মেঘালয় পাহাড় আর সে পাহাড় থেকে প্রবাহিত ঝরনাধারার তীব্র স্রোত। এখানে পাথরে ভরা পুরো এলাকা। পানিতে বিছানো রয়েছে মোটা-শক্ত, ছোট-বড় হাজারো পাথর। সেসব পাথরের কোনোটাতে আবার মোটা ঘাসের আস্তরণ। এসব পাথর মেঘালয় পর্বতমালার ওপর থেকে প্রবাহিত ঝরনার ধারায় চলে এসেছে পিয়াইন নদের বিছনাকান্দি অংশে।
ঝাঁপিয়ে পড়ি পাথরভরা পিয়াইন নদের পানিতে, শরীর এলিয়ে দিই পাথর-জলের বিছানায়। যে বিছানা ছেড়ে কোনোকালেই উঠতে ইচ্ছা করবে না।

জেনে নিন
এখন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিছনাকান্দি যাওয়ার মোক্ষম সময়। সিলেট থেকে চাইলে নদীপথে যেতে পারেন। আবার সড়কপথে নিজস্ব বাহন, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা লেগুনা ভাড়া করে দল বেঁধে যেতে পারেন। নদীপথে গেলে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে পাংথুমাই। সেখান থেকে ট্রলারে চেপে বিছনাকান্দি। পাংথুমাই হয়ে বিছনাকান্দি গেলে বাড়তি পাওনা এখানকার বিশাল ঝরনা আর পিয়াইন নদের সৌন্দর্য। পাংথুমাই থেকে বিছনাকান্দি দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পথ। সড়কপথ হলে সিলেট শহর থেকে যেকোনো বাহনে চেপে চলে যান হাদারপার বাজার। সেখান থেকে নৌকায় বিছনাকান্দি। যেভাবেই যান হাদারপার বাজারে গনি মিয়ার ভুনা খিচুড়ি খেতে ভুলবেন না। হাদারপার খেয়াঘাটে নৌকার মাঝি যা মন চায় ভাড়া চাইবে। দরদাম করে কমপক্ষে তিন ঘণ্টার জন্য হাদারপার থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে তবেই বিছনাকান্দির পথ ধরুন। ভাড়া ৬০০ টাকার বেশি নয়।

ছবি
Categories
ফারুখ আহমেদ

আঙিনাজুড়ে যত সব বিস্ময় আর রহস্য

এখনো নাটোর রাজবাড়ির নানা অংশে পুরোনো ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ছবি: লেখক

 রাজবাড়িটির প্রবেশমুখে বিশাল একটি পুকুর, সেই পুকুরের শানবাঁধানো ঘাট দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। পুরো রাজবাড়ি ঘিরে আছে বিশাল সব গাছ। পাশেই নবনির্মিত কমিউনিটি সেন্টার। এখানে কমিউনিটি সেন্টার কেন, তার উত্তর পেলাম না!…লিখেছেন  ফারুখ আহমেদ Red dot

ছোট্ট মফস্বল শহর নাটোর, কিন্তু বর্ণময়। সৌন্দর্য ও ইতিহাস মিলেমিশে আছে এখানে। চলনবিল এখানকার সৌন্দর্য৷ নাটোর রাজবাড়ি আর দিঘাপতিয়ায় উত্তরা গণভবনে রয়েছে ইতিহাসের টান।
যাত্রা হলো শুরু
বনলতা সেনের শহর নাটোর আমার খুব প্রিয়। সময়-অসময়ে নাটোর চলে আসি। চৈত্র মাসের খাঁ খাঁ রোদের দিনে বেরিয়ে পড়লাম নাটোরের উদ্দেশে। পঞ্জিকায় বসন্ত বিদায় নিলেও বসন্তের সুবাতাস যেন বইছে। বাতাসে তেমন উষ্ণতা নেই। মন ভালো করা সবকিছু, তবু বঙ্গবন্ধু সেতু পেরিয়ে মন খারাপ হয়। সেতুর ঢাল বেয়ে নামার পর পাশের রাস্তায় কদিন আগেও সারি সারি পলাশে মন রাঙিয়েছি, এখন পলাশগাছ ফাঁকা, কোনো ফুল নেই, কী জানি ঋতুর পালাবদলেই হয়তো! ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানি না। ঘুম ভাঙে হোটেল ভিআইপিতে এসে। সেদিনের মতো বিশ্রামে যাই। পরদিন নয়টার মধ্যে বন্ধু এসে হাজির। কই যাব যাব করে আমরা পচুর হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে নাটোর রাজবাড়ির পথ ধরি।

.এখনকার নাটোর রাজবাড়ি
নাটোর রাজবাড়ি এখন ভঙ্গুর হলেও রাজবাড়ির বিশাল আঙিনাজুড়ে যত সব বিস্ময় আর রহস্য পাশাপাশি লুকিয়ে। নাটোর শহর থেকে মাদ্রাসা মোড় পেরিয়ে বগুড়া রোড ধরে যেতে হয় নাটোর রাজবাড়ি। যেতে যেতে আপনার দৃষ্টি এড়াবে না ১৮৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নাটোর মহারাজা জে এন উচ্চবিদ্যালয়টি। আমরাও এসব দেখে দেখে জাহিদের ব্যাটারিচালিত
অটোরিকশায় চড়ে নাটোর রাজবাড়ি প্রবেশ করি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন রাজবাড়িটির প্রবেশমুখে বিশাল একটি পুকুর, সেই পুকুরের শানবাঁধানো ঘাট দেখে যে কেউ মুগ্ধ হতে বাধ্য। পুরো রাজবাড়ি ঘিরে আছে বিশাল সব গাছ। পাশেই নবনির্মিত কমিউনিটি সেন্টার। এখানে কমিউনিটি সেন্টার কেন, তার উত্তর পেলাম না! কমিউনিটি সেন্টার ধরে সামনে গেলে তারকেশ্বর মন্দির। আরেকটু সামনে এগিয়ে ডান দিকে বিশাল মাঠ।
মাঠের বিশাল প্রান্তরে দাঁড়ালেই চোখে পড়বে রাজবাড়ির একতলা ভবনটি। এই অংশের নাম ছোট তরফ। এর ঠিক উল্টো দিকে বড় তরফ। যমজ প্রায় বড় তরফের সামনে রয়েছে বিশাল পরিখা এবং পুরো রাজবাড়িতে রয়েছে পাঁচটি পুকুর। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে আটটি মন্দির রয়েছে, যার প্রাণ এক বিশাল শিবমন্দির। এখানে এখনো রীতি মেনে নিয়মিত পূজা হয়।
.দৃষ্টিনন্দন মন্দিরের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। মন্দিরকে ঘিরে আছে একটি শিবমূর্তি, ফণা তোলা সাপের মূর্তি, একজন বাউলের মূর্তিসহ নানা রকম শৈল্পিক কাজ। মন্দিরটির দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার শিল্পকর্ম। আমরা মন্দিরটি দেখে রাজবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখতে বের হই, এখানে প্রায় সব ভবনই ভেঙে পড়েছে। প্রতিটি ভবনের পাশেই রয়েছে লোহার তৈির ঘোরানো সিঁড়ি। এমন নকশাদার সিঁড়ি ঢাকার আহসান মঞ্জিলে দেখেছি।
রািন মহলের কাছে এসে বিশ্রামে বসি। রািন মহলটিতে রািন ভবানী বাস করতেন। এখন রানি মহল আছে নামমাত্র। শুধু সাইনবোর্ডে লেখা দেখে চেনা যায়। এখানে একটি অতিথিশালা আছে, নাম মাত্র। তবু ভগ্নপ্রায় অতিথিশালা দেখে সে সময়কার নাটোর রাজার অতিথি সেবার কিছুটা নমুনা পাওয়া যায়। চলতি পথে এখানে ছোট তরফের একটি ভবনের নাম দেখলাম হ্যানি কুইন ভবন। এখন সেই ভবনে ভাগ্যবঞ্চিতদের বসবাস। রাজবাড়িজুড়েই এমন ভাগ্যবঞ্চিতদের বাস, আর আছে দখলদারিত্বের চিহ্ন।
জেনে নিন
ঢাকা থেকে ন্যাশনাল, শ্যামলী ও হানিফ পরিবহনের বাস দিন-রাত চলে এই পথে। যেকোনো একটি বাসে চড়ে বসুন। পাঁচ ঘণ্টায় নাটোর পৌঁছে যাবেন। তারপর ঘুরে দেখুন নাটোর রাজবাড়ি আর দিঘাপতিয়ায় উত্তরা গণভবন। চাইলে পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকেও বেড়িয়ে আসতে পারেন। নাটোরে থাকা-খাওয়ার ভালো ব্যাবস্থা আছে। থাকার জন্য ভালো হোটেল ভিআইপি। আগে থেকে রুম বুকিং দিয়ে তারপর রওনা হবেন। ভিআইপি হেটেলে খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও আপনি খাবারের জন্য বেছে নিতে পারেন প্রচুর হোটেল। এখানকার খাবার জিভে জল না এনে পারে না। চাইলে নয়ন হোটেলেও খেতে পারেন। তা ছাড়া আছে নাটোরের বিখ্যাত মিষ্টি কাঁচাগোল্লা। খেয়ে আসুন, সঙ্গে নিয়েও আসুন!

Categories
ফারুখ আহমেদ

কুলুমছড়া ঝরনা

এমন জংলাপথ মাড়িয়ে পৌঁছতে হবে কুলুমছড়ায়। ছবি: লেখক

 ঝরনার পানি গড়িয়ে বাংলাদেশ প্রান্তে আছড়ে পড়ছে। সে কী তার গর্জন, দৃশ্য বটে! এত কাছে থেকে পাহাড়ি ঝরনার প্রবাহ বা ঝরনাধারার এমন দৃশ্য এভাবে আগে কখনো দেখিনি। এমন দৃশ্য যতনা বেশি ক্যামেরার লেন্সে ধরা দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি মনে গেঁথে যাচ্ছে!..লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

সিলেট বেড়াতে গেলে একটা আফসোস প্রায়ই হয়। এত সুন্দর সব ঝরনা, বেশির ভাগই ভারতের সীমানায় পড়েছে। আমরা শুধু দূর থেকে দেখতে পাই। কুলুমছড়া ঝরনাটাও তেমনি। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে শুরু হয়ে এ দেশে এসে ছড়া হয়ে গেছে। এর উৎসে যেতে না-ই পারি, বাংলাদেশ প্রান্তে এর পানিতে গোসল করেও মজা পেয়েছি।
সিলেটে এখন পর্যটকদের বেজায় ভিড়। বৃষ্টির পানিতে ঝরনাগুলো টইটম্বুর, তা দেখতেই আসা। বর্ষার শুরুতে আমরা গিয়েছিলাম সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়ায়। সেখানে দুদিন কাটিয়ে আরও এখানে-ওখানে ঘুরে তারপর পাড়ি দিলাম মেঘালয় সীমান্তে। সিলেট বলতে গেলে মেঘালয় পর্বতমালায় ঘেরা। সিলেট এলেই আমরা দূর থেকে দেখতে পাই মেঘালয়ের বনাঞ্চলঘেরা পাহাড় আর সে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া সব ঝরনা। কিছু ঝরনা আছে একটু দুর্গম এলাকায়।
আমরা প্রায় আটজনের দল মিরাবাজার থেকে লেগুনায় যাত্রা শুরু করি। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনার হাট সীমান্তবর্তী কুলুমছড়া একটি গ্রাম। এখানে ভারত সীমান্তের ঝরনাটিই কুলুমছড়া ঝরনা নামে পরিচিত। বৃষ্টি যত দিন থাকবে তত দিনই কুলুমছড়ায় বেড়ানো যাবে। অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত সাধারণত পানির প্রবাহ থাকে।


দুপুর ১২টায় আমরা হাদারপার পৌঁছে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে আসি পিয়াইন নদীর তীরে। এখানে আগে থেকেই আমাদের জন্য নৌকা প্রস্তুত ছিল। হাদারপার ঘাটে কোনো ছইওয়ালা নৌকা মেলে না। তবে আমাদের জন্য নির্ধারিত নৌকাটি বেশ বড়সড়। নৌকা চলতে শুরু করার ১০ মিনিটের মাথায় চলে আসি বিছনাকান্দি। পিয়াইন নদীতে পানি থইথই। পানির ধারায় ভেসে আসা মাছের ঝাঁক ধরায় ব্যস্ত অনেকে। বিছনাকান্দি পেছনে ফেলে আমাদের নৌকা কুলুমছড়ার দিকে তর তর করে এগিয়ে চলেছে

এখন আমরা খোলা প্রান্তরে। গন্তব্য খুব কাছে বোঝাই যাচ্ছে। পাহাড়ের

প্রায় পাদদেশে চলে এসেছি। চারপাশটা অসম্ভব সুন্দর। ঝরনার কুলকুল ধ্বনি কানে আসে। সবার মধ্যে কী এক চঞ্চলতা। নৌকা ছেড়ে এবার জংলাপথ ধরে হেঁটে চলি। এখন ঝরনার শব্দ প্রবল। ঝরনার পানি গড়িয়ে বাংলাদেশ প্রান্তে আছড়ে পড়ছে। সে কী তার গর্জন, দৃশ্য বটে! এত কাছে থেকে পাহাড়ি ঝরনার প্রবাহ বা ঝরনাধারার এমন দৃশ্য এভাবে আগে কখনো দেখিনি। এমন দৃশ্য যতনা বেশি ক্যামেরার লেন্সে ধরা দিচ্ছে তার চেয়ে বেশি মনে গেঁথে যাচ্ছে! বিশাল সব পাথর বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে উচ্ছল সে ঝরনা। আমার সঙ্গীরা প্রবল উচ্ছ্বাসে ঝরনার পানিতে লাফিয়ে পড়ে। আমার হাতে ক্যামেরা কিন্তু ছবি তোলার তাড়া নেই। অসাধারণ সে সৌন্দর্য শুধু চেয়ে দেখার। আমি তাকিয়ে দেখি, তারপর পাথর জল বেয়ে আরও উপরে উঠি। এর মধ্যে বিকাল প্রায় শেষ, গ্রামবাসীরা তাড়া দিচ্ছে ফিরে যাওয়ার। সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার আগেই আমরা ফিরতি পথ ধরি।
এখানে ঝরনার পানিতে স্রোত খুব বেশি, একই অবস্থা বাংলাদেশ প্রান্তে ছড়ার। সুতরাং এখানে এলে এবং গোসলের সময় সাবধান থাকতে হবে। এখানে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, অর্কিড, ভেষজ গাছ-গাছড়ার দেখা পাবেন। কুলুমছড়া ঝরনা দেখার জন্য সকাল সকাল যাওয়াই ভালো। আর সন্ধ্যার আগেই ফেরত আসা উচিত। কেননা, এখানে চড়াই ভাঙতে দম ফুরিয়ে যাবে। আর সীমান্ত এলাকা বলে দিনের আলো ফুরিয়ে আসার আগেই ফিরে আসুন। ঝরনার গভীরে না যাওয়াই ভালো।

ছবি: লেখক

কীভাবে যাবেন
কুলুমছড়া বেড়ানোর মোক্ষম সময় আগস্ট থেকে অক্টোবর মাস। ঢাকা-সিলেট দিনরাত বাস চলাচল থাকে। যেকোনো বাসে চড়ে বসলেই হলো। তবে সন্ধ্যার বাসে যাত্রা শুরু করলে রাতটুকু বিশ্রাম পাবেন। পরদিন সকাল সকাল কুলুমছড়া যাত্রা করুন। এমন ভ্রমণ দলবেঁধে করাই ভালো। সিলেট শহর থেকে হাঁদারপার আপনার বাহন হবে লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস। হাঁদারপারে মোটামুটি মানের খাবার ব্যবস্থা আছে। খাবার খেয়ে, নৌকার ভাড়া চুকিয়ে তবেই নৌকায় উঠুন। রাত্রিযাপনের জন্য আপনাকে সিলেট শহরের ওপরই নির্ভর করতে হবে। এখন সিলেটে পর্যটক খুব বেিশ। সুতরাং যাত্রার শুরুতে হোটেল বুকিং দিয়ে রওনা হতে হবে। মিরাবাজার, জিন্দাবাজার বা দরগাগেটে ভালো মানের হোটেল রয়েছে। আপনি সিলেট শহরকে কেন্দ্রবিন্দু করে কুলুমছড়াসহ সিলেটের অন্যান্য দর্শনীয় সবগুলো জায়গাই ঘুরে আসতে পারবেন।

Categories
ফারুখ আহমেদ

স্মৃতিসৌধের গল্প

সবুজ ছায়ায় সারি সারি সমাধি। ছবি: লেখক
 স্মৃতিসৌধে পৌঁছানোর আগেই মুগ্ধ হতে হয়। সে মুগ্ধতা এনে দেয় এখানকার স্লুইসগেট। চেলাই খালের ওপর নির্মিত সে স্লুইসগেট দেখার পর পা আর আগে বাড়তে চায় না।…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

টিলার ওপর মাঠ, এমন দৃশ্য হয়। কিন্তু টিলার ওপর চোখ জুড়ানো স্মৃতিসৌধ? ঘুরে আসতে পারেন সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলা গ্রামে। শুধু স্মৃতিসৌধ নয়, এখানে আছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার সমাধি। তিন দিকে মেঘালয় পর্বতমালা ঘিরে থাকা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এক কথায় অসাধারণ। এখানে আরও পাবেন চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট ও টিলার ওপর জুমগাঁও।
বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ ইতিবৃত্ত
ডাউক সড়ক থেকে সুনামগঞ্জ এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ নম্বর সেক্টর। পাঁচ নম্বর সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী। পাঁচ নম্বর সেক্টরের সাবসেক্টর ছিল সুনামগঞ্জ জেলার বাঁশতলা। এখানকার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিন। পাহাড়বেষ্টিত বাঁশতলা এলাকায় এবং তার আশপাশে মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হন, তাঁদের সমাহিত করা হয় বাঁশতলার এই নির্জনে। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয় বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ।

স্মৃতিসৌধ
আমাদের বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ দেখা
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক প্রয়াত মেজর জেনারেল আমীন আহমেদ চৌধুরীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য জাগ্রত চৌরঙ্গীর ইতিহাস জানতে গেলে তিনি বাঁশতলা স্মৃতিসৌধের গল্প বলেছিলেন। সে গল্প ভুলতে বসেছিলাম। তরতাজা করল সিলেটের কয়েকজন বন্ধু। তাদের নিয়ে বেশ কয়েকবার পরিকল্পনা হলো, কিন্তু সময় হলো না। একদিন আচমকা বাঁশতলা যাওয়ার প্রস্তাব পেলাম। তারপর বাসে চেপে বসা। রাত সাড়ে ১২টার বাসে চেপে ভোরে সিলেট পৌঁছেই আম্বরখানা চলে আসি। তখনো ভোরের আলো ভালো করে ফোটেনি। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সেই অটোরিকশায় আবার পথে নামি ছাতকের উদ্দেশে। যানজটবিহীন সে রাস্তায় যাত্রাসঙ্গী শরীফ চোখ বুজে ঘুমের ভান করলেও সামিউল্লাহ বলে চলে বাঁশতলার গল্প। সে এর আগেও বাঁশতলা ঘুরে এসেছে।

মেঘ আর পাহাড়ের হাতছানি

দিন শুরুর সঙ্গে কোলাহলও বাড়ছে। এখানে পথের দুপাশের সৌন্দর্য অসাধারণ, সঙ্গে আছে নানা পাখির ডাক। এক ঘণ্টায় পৌঁছে যাই ছাতক বাজার। এখানে পাবলিক খেয়াঘাট থেকে নৌকায় ১০ মিনিটে সুরমা নদী পার হয়ে চলে আসি নোয়ারাই বাজার। সেখান থেকে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় প্রায় দেড় ঘণ্টায় বাংলাবাজার হয়ে বাঁশতলা। স্মৃতিসৌধে পৌঁছানোর আগেই মুগ্ধ হতে হয়। সে মুগ্ধতা এনে দেয় এখানকার স্লুইসগেট। চেলাই খালের ওপর নির্মিত সে স্লুইসগেট দেখার পর পা আর আগে বাড়তে চায় না। তবু শরিফ আর সম্রাটের তাড়া খেয়ে আগে বাড়তে হয়। তবে কথা হয় ফেরার পথে স্লুইসগেটে আমরা অনেক সময় থাকব, আর যাব জুমগাঁও। টিলার ওপর পাহাড়ি গ্রাম। এখানে প্রায় ৩৬ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী পরিবারের বসবাস। শুনে তো আমার পা আবার থমকে যায়। কিন্তু এগিয়ে চলি স্মৃতিসৌধে।
ভারত সীমান্তঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এখন আমাদের একেবারে চোখের সামনে। সূর্য উঠেছে, ঝকঝকে নীলাকাশ যাকে বলে, ঠিক তা-ই। আর যেন হাত বাড়ানো দূরত্বে পাহাড়। আকাশতলে পাহাড় আর স্মৃতিসৌধ ভাবতে ভাবতে বলে ফেলি, আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় আর পাহাড়ে হেলান দিয়ে স্মৃতিসৌধ। গানের একটা লাইন জুড়ে দিলাম ঠিকই কিন্তু সুর দিতে পারলাম না।
সমাধি এলাকায় পা রাখতেই দুই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এখানে শুয়ে আছেন আমাদের ১৪ ভাই, ১৪ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। এখানে শীত-গ্রীষ্ম যাবে-আসবে, দিন-রাত যাবে-আসবে কিন্তু তাঁরা আর ফিরে আসবেন না।

চেলাই খালের ওপর স্লুইসগেট

জেনে নিন
বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ যেতে হলে আপনাকে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারা বাজার উপজেলার বাঁশতলা। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে বাঁশতলা যাওয়া যাবে। আবার ছাতক উপজেলা থেকেও বাঁশতলা যাওয়া যাবে। দিনরাত ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জ বাস চলাচল করে। সুবিধামতো সময়ে হানিফ, ইউনিক কিংবা শ্যামলী পরিবহনের বাসে চেপে বসলেই হবে। আমরা সিলেট-ছাতক-দোয়ারা বাজার হয়ে বাঁশতলা গিয়েছিলাম। সন্ধ্যার বাসে সিলেট যাত্রা করলে রাত ১২টার মধ্যে সিলেট পৌঁছে রাতটুকু বিশ্রাম নিয়ে পরদিন বাঁশতলা। সকালে আম্বরখানা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আপনাকে ছাতক আসতে হবে। ভাড়া মাথাপিছু ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এবার ছাতক বাজার থেকে সুরমা নদী পার হয়ে আবার সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে সরাসরি বাঁশতলা।

Categories
ফারুখ আহমেদ

এসব যেন বনের মায়া

সবুজ বনের ফাঁকে বয়ে গেছে চিকন খাল, ছবি: লেখক
 কেওড়া বনের ভেতর দিয়ে পায়ে হাঁটা সেই পথ। এভাবেই একসময় পেয়ে যাই ওয়াচ টাওয়ার। তারপর ১১০টা সিঁড়ি ভেঙে তার মাথায়। বিষয়টা আমার দুই সঙ্গী ফারাবী হাফিজ ও নূরে আলমের কাছে এভারেস্ট জয়ের কাছাকাছি।…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot
জুন মাসের সকাল। চর কচ্ছপিয়া খালের ভেতর দিয়ে স্পিডবোট ছুটে চলেছে, চারপাশে সবুজ আর সবুজ। একসময় মেঘনার শাখানদী বুড়ি গৌড়াঙ্গতে এসে পড়ি। আমাদের চোখ চেয়ে আছে সামনে, দেখা কি যায় চর কুকরিমুকরি? সবুজ বন যেন একসময় গিলে নিল আমাদের স্পিডবোট। দুপাশে সবুজ বন মাঝখানে কুকরির খাল। অনেকে একে বলে ভারানির খাল। আগের দিন আমরা চর ফ্যাশন এসেছি। এখন আমরা কুকরির খালের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছি চর কুকরিমুকরির দিকে। বহু দূর বিস্তৃত এই কুকরির বন।

ঠিক ২০ মিনিট পর আমরা পা রাখলাম চর কুকরিমুকরিতে। আমাদের দেখে দৌড়ে ছুটে এলো একদল শিশু। তাদের সঙ্গে সঙ্গেই এগোই। এ গ্রামটার নাম বাবুগঞ্জ। এখান থেকে দূরের বন অসাধারণ। পাশেই গ্রামের একমাত্র মনিহারি দোকান। আমরা বেতের তৈরি সেই দোকানঘরটির ভেতর বসি। এখানকার চেয়ারম্যানের আতিথেয়তায় চলে এল ডাবের পানি। একটু জিরিয়ে মেঠোপথ ধরে চলে এলাম আবার কুকরির খালের পাড়।
খালপাড়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি, তখনই এগিয়ে এলো পাতলা লিকলিকে ছেলেটি, নাম বলল আল আমিন। সেও আমাদের সঙ্গী হয়ে গেল। তার কথাতে

চর কুকরিমুকরির চেনা দৃশ্য যেন

ই অনেকটা পথ হাঁটা শুরু করি। কেওড়া বনের ভেতর দিয়ে পায়ে হাঁটা সেই পথ। এভাবেই একসময় পেয়ে যাই ওয়াচ টাওয়ার। তারপর ১১০টা সিঁড়ি ভেঙে তার মাথায়। বিষয়টা আমার দুই সঙ্গী ফারাবী হাফিজ ও নূরে আলমের কাছে এভারেস্ট জয়ের কাছাকাছি। জীর্ণ টাওয়ারটির চারপাশের পুরোটাই খোলা। খুব ভয়ে আর সাবধানে পা ফেলে ওয়াচ টাওয়ারের ওপর উঠলেও, শেষ ধাপে পা রেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। তিন দিকে সবুজ বন, সামনে খোলা মাঠ। ওপর থেকে নিচে দেখতে পেলাম কয়েকটি ঘর। বহু দূরে আরও একটা দুটো চর চোখে পড়ল। একটু পর তো নামতেই হয়। কিছুটা হেঁটে আল আমিনের ট্রলারের যাত্রী হই। এবার বনের উত্তর পাশটায় সামাজিক বনায়ন দেখে তবেই ইউনিয়ন পরিষদ অফিস যাব মনস্থির করি।
আধঘণ্টা পায়ে হেঁটে এবং আরও আধা ঘণ্টা নৌকায় চেপে চলে আসি এখানকার সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে। বনের ভেতর প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করেও দেখা পেলাম না হরিণের। আশপাশে ডাক শুনে কয়েকবার চমকে উঠেছি, এই বুঝি সামনে এল। নাহ, দেখা পাইনি। তবে বানর আর নানা রকম পাখি দেখলাম প্রচুর। আল আমিন জানায়, হরিণ দেখতে হলে খুব ধৈর্যের প্রয়োজন এবং যেতে হবে বনের আরও গভীরে। তবে শীতকালে হরিণ ও পাখি দেখা সাধারণ ঘটনা। সে সময় নাকি ওরা গ্রামের মাঠে গিয়ে শুয়ে-বসে রোদ পোহায়।
বনের এই জায়গাটায় প্রচুর বাবলাগাছ। হলুদ বাবলার ফুল বাতাসের দোলায় দুলছে। ঠিক তখনই আমরা হরিণের ডাকে চঞ্চল হয়ে সামনে এগোই। কোথায় হরিণ, মনে হলো এসব যেন বনের মায়া। বনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে আল আমিন শেয়ালের গল্প শোনায়, শেয়ালের গর্ত দেখায়। একপর্যায়ে মনে হয় পেটেই যেন শেয়াল ডাকছে। সঙ্গে থাকা বিস্কুট কামড় দিয়ে গরম এক কাপ লেবুর চায়ের প্রয়োজন অনুভব করি। চা হলে খুব ভালো হতো ভাবতে ভাবতে একসময় দেখি আমরা ট্রলারের কাছে পৌঁছে গেছি। চরফ্যাশন আজই ফিরতে হবে। দুপুরের খাবার বিকেল বেলা সেরে ফিরতি পথে স্পিডবোটে চেপে বসি। এরই মধ্যে সূর্য পশ্চিম দিকে হেলেছে—ডুবন্ত সূর্যের লাল, হলুদ, কমলা আভা সবুজ রঙা চর কুকরিমুকরির বনে ছড়িয়ে পড়ে বনটিকে আরও মায়াবী করে তুলেছে।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে লঞ্চে সরাসরি যেতে পারবেন ভোলা জেলার চরফ্যাশনে। নামবেন বেতুয়া কিংবা গোঁসাইবাড়ি ঘাটে। সেখান থেকে মোটরসাইকেল কিংবা সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে চর কচ্ছপিয়া। এরপর ট্রলারযাত্রায় পৌঁছে যাবেন চর কুকরিমুকরি। থাকতে পারেন ফরেস্ট রেঞ্জারের বাংলো কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের অফিসে।

Categories
ফারুখ আহমেদ

পানির ওপর জলজ্যান্ত এক হাট

সন্ধ্যা নদী পেছনে ফেলে কুরিয়ানা খাল ধরে এগিয়ে চলেছি ঝালকাঠির ভিমরুলি জলবাজারের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বরূপকাঠি পার হয়ে চলে আসি মাহমুদকাঠি। মাহমুদকাঠিতেও রয়েছে জলবাজার। এখানে নানা রকম গাছের চারা বিক্রি হয়। মাহমুদকাঠি পার হতেই চোখ জুড়িয়ে গেল।…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

একদম নড়াচড়া করা যাবে না, এই শর্তে সওয়ার হলাম ছোট্ট ডিঙি নাওয়ে। গলুইয়ের কাছে কোনোমতে উঠে বসেছি। ক্যামেরাটা তো এবার বের করতেই হয়। তখনই ঘটে গেল ঘটনাটা। আমি তো নড়াচড়া করিনি, তবে কি মাঝিই দায়ী! যে-ই কাজটা করুক, সর্বনাশ হলো আমারই। নৌকা উল্টে একেবারে পানিতে আবিষ্কার করলাম নিজেকে—ক্যামেরা আর নতুন কেনা মুঠোফোন-সমেত। আশপাশের লোকজনের চিৎকার কানে এল, একসময় দেখি আমি পানি ছেড়ে ডাঙায়, হাতে ক্যামেরা আর পকেটে ফোন। এর মধ্যে কয়েকজন এসে ক্যামেরা হাত থেকে নিয়ে গেল, আমি গামছা দিয়ে গা মোছায় মন দিলাম।

এসেছি ঝালকাঠির ভিমরুলি জলবাজারে। হ্যাঁ, পানির ওপর জলজ্যান্ত এক হাট। এ হাটের পণ্য পেয়ারা। সারি সারি নৌকার ওপর সবুজ–হলুদ পেয়ারা। হাটুরেদের হাঁকডাকে সরগরম। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখেই অবাক আমরা। খালের ওপর এ এক আজব বাজার।
.ভিমরুলি জলবাজার দেখতেই এবার আমাদের বরিশাল-যাত্রা। সঙ্গী হলেন বন্ধু নাজমুল হক। সারা রাত লঞ্চ-যাত্রার পর ভোরে পৌঁছালাম বরিশাল। লঞ্চ ঘাট থেকে বের হয়ে নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে যাব স্বরূপকাঠি খেয়াঘাট। নতুন জায়গায় নিজেরা সব ব্যবস্থা করে খেয়াঘাট যখন পৌঁছাই, তখন সকাল প্রায় নয়টা বাজে। এখানে আগে থেকেই আমাদের জন্য ট্রলার ভাড়া করা ছিল। জলযাত্রা শুরু হলো আমাদের।
সন্ধ্যা নদী পেছনে ফেলে কুরিয়ানা খাল ধরে এগিয়ে চলেছি ঝালকাঠির ভিমরুলি জলবাজারের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যে স্বরূপকাঠি পার হয়ে চলে আসি মাহমুদকাঠি। মাহমুদকাঠিতেও রয়েছে জলবাজার। এখানে নানা রকম গাছের চারা বিক্রি হয়। মাহমুদকাঠি পার হতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। হোগলা, সুপারি, আমড়া আর পেয়ারার বন চারপাশে। যতই সামনে এগোচ্ছি, খাল ততই সরু হচ্ছে। কখনো ক্যামেরার চোখে দেখে সে দৃশ্য বন্দী করে নিচ্ছি।
কুরিয়ানা খালে গেলেই বুঝবেন জোরে ট্রলার চালানো এখানে সম্ভব নয়। আশপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে ফুরফুরে এক জলভ্রমণ হয়ে যাবে। স্বরূপকাঠি, মাহমুদ কাঠি—এরপর আদমকাঠি, এভাবেই একসময় আমরা পৌঁছে গেলাম ঝালকাঠি। এটাই ভিমরুলি, জলে ভাসা পেয়ারার হাট বা জলবাজার। আমরা কুরিয়ানার খালে চলতি পথে দেখেছি গাছ থেকে পেয়ারা নামানোর দৃশ্য। সারি সারি ডিঙি নাও বোঝাই করে পেয়ারা নিয়ে বাজারে নিয়ে আসার দৃশ্য। ভিমরুলি এসে পেয়ারা আর কোষা নৌকা ছাড়া চোখে পড়ল না আর কিছুই। অবশ্য বেপারিদের ট্রলার ছিল। পেয়ারার খদ্দের আর পেয়ারার মালিকের হাঁকডাক ছিল। শুক্রবার বলেই হয়তো—ছিল বেশ কিছু পিকনিক ও পর্যটক ট্রলার। ট্রলার থেকে নেমে জলবাজারের আর একটু ভেতরে যেতে চেয়েছিলাম কোষা নৌকায় চেপে। সেখানেই সেই জলপতন। ক্যামেরাটা বাঁচানো গেল না, তবে মেমোরি কার্ডের ছবিগুলো আছে।
আমরা ঘণ্টা তিনেকের মতো ভিমরুলি জলবাজারে ছিলাম। স্থানীয় ব্যক্তিরা একে বলে গোইয়ার হাট। বাজার ঘুরে ঘুরে পেয়ারা চাষি, ক্রেতা ও অতিথিদের আনন্দ দেখলাম। আবার কষ্টও চোখে পড়ল। সকালের দিকে পেয়ারা বিক্রি হচ্ছিল ২০০ থেকে ৩০০ টাকা মণ দরে। সেই পেয়ারা বেলা পড়ার পরই দাম পড়ে গেল মণপ্রতি ১০০ থেকে ৬০ টাকায়। এক চাষি বললেন, ‘গোইয়া বেচুম কী, দাম কইতে গিয়া কান্দন আহে। এক মণ পেয়ারা ষাইট ট্যাকা হয়, কন দেহি দাদা!

.জেনে নিন
ডুমুরিয়া, আটঘর, বেতলা, ডালুহারসহ ঝালকাঠির বেশির ভাগ গ্রাম পেয়ারা চাষের জন্য বিখ্যাত। প্রতিদিন সেসব পেয়ারা বিক্রি হয় আটঘর, কুরিয়ানাসহ ভিমরুলির জলবাজারে। ঝালকাঠির সবচেয়ে বড় জলবাজারটি বসে ভিমরুলিতে। সকাল আটটার মধ্যে বাজার বসে বেচাকেনা চলে বিকেল পর্যন্ত। এখানে আসতে চাইলে ঢাকা থেকে বরিশালের লঞ্চ ধরতে হবে। আসতে হবে ঝালকাঠি। সরাসরি ঝালকাঠির লঞ্চ থাকলেও বরিশালের লঞ্চগুলো আরামদায়ক। বরিশাল নেমে চলে আসুন নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে স্বরূপকাঠি যাওয়ার বাস পাবেন। তবে দলবেঁধে গেলে অটোরিকশার যাত্রী হয়ে যান। এবার স্বরূপকাঠি খেয়াঘাট নেমে রিজার্ভ ট্রলারে চলে আসুন ভিমরুলি জলবাজার। দরদাম করে তবেই ট্রলারে উঠুন। ভাড়া সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা সারা দিনের জন্য। হাতে সময় থাকলে আটঘর ও কুরিয়ানাও দেখে আসতে পারেন। সাঁতার না জানলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখুন। কোষা নৌকায় সাবধানে উঠবেন। অভ্যাস না থাকলে একটু বিপজ্জনকই বটে। বিপদ যদি না-ও ঘটে, আমার মতো আপদ আপনিও ঘটিয়ে বসতে পারেন।
Categories
ফারুখ আহমেদ

সে দৃশ্যে মুগ্ধতা ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই ছিল না

জঙ্গল পার হলেই দেখা মিলবে এমন নির্জন সৈকত। ছবি: লেখক

মেঘনা নদী পেরোনো শেষ হয়ে এখন আমরা চলছি বঙ্গোপসাগরের বুকের ওপর। ঢেউয়ের পর ঢেউ, এক কথায় অপূর্ব। এভাবে কতক্ষণ চলেছি মনে নেই। দুই চোখে সবুজ ভর করতেই বুঝলাম আমরা সোনার চরের খুব কাছে চলে এসেছি…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot
ঢেউয়ের উথালপাতাল, অসংখ্য মাছ ধরার নৌকা, দূরে জেলেদের অস্থায়ী ছোট একটি গ্রাম মন কেড়ে নিয়েছে আমাদের। এমন জনমানবহীন সমুদ্রসৈকত দেখে ভেবে বসেছিলাম দ্বীপটির মালিক আমরা তিনজন। আমরা তিনজন হচ্ছি আমি, চিকিৎসক নাজমূল হক ও বন্ধু শরীফ নীড়। ছোট্ট একটি ট্রলার চেপে প্রথমে তেঁতুলিয়া নদী, তারপর বুড়াগৌরাঙ্গ হয়ে একটু আগে এখানে পা রেখেছি। চার ঘণ্টার ট্রলারভ্রমণ ছিল নিখাদ আনন্দে ভরপুর। কত যে পাখি দেখলাম। নাজমূল হক স্যার দীর্ঘদিন পাখির ছবি তুলেছেন। তিনিও একসময় বললেন, জীবনে একসঙ্গে এত পাখি এই প্রথম দেখলাম। আর সেই পাখির চোখে চোখ রেখে রেখে তিনজনের দল চলে এলাম যেখানে, তার নাম সোনার চর।
পরিকল্পনা ছিল শীত মৌসুমে পুরো দক্ষিণাঞ্চল ঘুরে দেখব। কিন্তু আমাদের সময় হলো বসন্ত মৌসুম শুরু হওয়ার পর। ছয়জনের দল শেষে গিয়ে ঠেকল তিনজনে। আমরা ঢাকা থেকে লঞ্চে চরফ্যাশন ও চর কচ্ছপিয়া হয়ে স্পিড বোটে চেপে চলে আসি চর কুকরি-মুকরি। সেদিন চর কুকরি-মুকরির নারকেল বন ও তারুয়া দ্বীপ ঘুরে দেখি। পরদিন ভোরে বের হই সোনার চরের উদ্দেশে। আমাদের সঙ্গে গাইড হয়ে যাবেন শিক্ষক জাকির হোসেন। আমরা সাতসকালে ইলিশ মাছ ভাজা আর লাল চালের গরম ভাত খেয়ে রওনা হই। ট্রলার দেখে পছন্দ না হলেও চড়ে বসতে কারোরই আপত্তি দেখলাম না। মেঘনার মোহনায় পড়তেই ম্যানগ্রোভ বনের পাশের ছোট্ট চর দিঘলে মহিষের পাল ও বক পাখির সঙ্গে অনেক নাম না-জানা পাখি ও ঝাঁকে ঝাঁকে কাস্তেচেরা দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠতেই বোঝা হয়ে গেল দিনটা আমাদের!
চর দিঘল পেরিয়ে সামনে যেতেই নিজেদের সাত সাগরের ওপার মনে হলো। চারদিকে অথই জল আর মাছ ধরার ফাঁদ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছিল না। মাঝেমধ্যে একটা-দুইটা ইলিশের নাও চলে যাচ্ছে প্রচণ্ড শব্দ করে। এর মধ্যে গড়গড় আওয়াজ করে ট্রলার দাঁড়িয়ে পড়ল। তখনই চোখে পড়ল একঝাঁক সাদা রঙের পাখির ঝলক। নাজমূল স্যার ইশারায় ট্রলারচালককে গতি কমিয়ে ধীরে যেতে বললেন। তারপর শুনলাম তাঁর বিড়বিড় উচ্চারণ, পাতি চখা। ইতিমধ্যে ট্রলারচালক ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে বইঠা বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল পাতি চখার দিকে। শরীফ আর নাজমূল স্যার ততক্ষণ সমানে ক্যামেরা ক্লিক করে চলছিলেন। হঠাৎ কোনো আওয়াজে পাতি চখার দলের আকাশপানে উড়াল। সে দৃশ্যে মুগ্ধতা ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মেঘনা নদী পেরোনো শেষ হয়ে এখন আমরা চলছি বঙ্গোপসাগরের বুকের ওপর। ঢেউয়ের পর ঢেউ, এক কথায় অপূর্ব। এভাবে কতক্ষণ চলেছি মনে নেই। দুই চোখে সবুজ ভর করতেই বুঝলাম আমরা সোনার চরের খুব কাছে চলে এসেছি।
কিছুক্ষণের মধ্যে পাশের খাল ধরে চলে এলাম সোনার চরের শানবাঁধানো ঘাটে। সোনার চরে আমাদের প্রথম মুগ্ধতা ছিল ঝুনঝুনি ফুল আর ঝাউগাছ। আরও চোখে পড়ল উপকূলীয় অঞ্চলের গাছ হরগোজা ও বাবলা। এখানে পুরোটাই ইটের জিগজ্যাগ রাস্তা। সেই রাস্তা আর সবুজে চোখ জুড়িয়ে ঠিক ১০ মিনিটে চলে আসি সমুদ্রসৈকতে। মুগ্ধতায় ভরা সে সৈকতের আরেক সৌন্দর্য কাঁকড়া দলের অসাধারণ শিল্পকর্ম। অনেক পাখির দেখাও পেলাম। উল্লেখযোগ্য হলো চখাচখি, লালপা বা রেডস্যাঙ্ক, হলদে খঞ্জন, কমন স্নাইপ, বড় বুলিন্দা ও কাস্তেচেরা। বক দেখেছি অগণিত। এভাবেই আমরা পায়ে পায়ে চলে আসি জেলেপল্লিতে। সকালের মাছ ধরার পর্যায় শেষ হয়েছে। আবার জেলেরা বের হবে বিকেলবেলা। চলছে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি বানানোর কাজ। এসব শুঁটকির বেশির ভাগই মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।
যেহেতু রাতে থাকব না, সেহেতু বেলা থাকতেই চর কুকরি-মুকরিতে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে ঝাউবনের ভেতর দিয়ে হাঁটা শুরু করি। ঝাউবন পেরিয়ে পেয়ে যাই কেওড়া বন। দেখতে পাই এই ম্যানগ্রোভ বনে সামাজিক বনায়নের চিহ্ন। আমরা চলে আসি আমাদের নির্দিষ্ট ঘাটে, যেখানে নোঙর করা আছে আমাদের বাহন ছোট্ট ট্রলারটি!
সুন্দরবনের পর চর কুকরি-মুকরি ও সোনার চরকেই ধরা হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। সোনার চরের মূল সৌন্দর্য এখানকার ঝাউবন। এ ছাড়া এই বনে রয়েছে প্রচুর কেওড়া, ছৈলাসহ গোলপাতা, বাবলা, করমচা, নলখাগড়া ও জামগাছ। শীত মৌসুমে এখানে প্রচুর পাখি আসে, সে অর্থে সোনার চর প্রচুর দেশি-বিদেশি পাখির বিচরণক্ষেত্র।

.কীভাবে যাবেন
পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে সোনার চর যেতে পারবেন। এ ছাড়া চর কুকরি-মুকরি বা চর কচ্ছপিয়া ফেরিঘাট থেকে সরাসরি সোনার চর যেতে পারেন। যেভাবেই যান, ঢাকার সদর ঘাট থেকে সরাসরি গলাচিপা বা চরফ্যাশন চলে যাওয়া যাবে। চর কুকরি-মুকরি থেকে ট্রলারে করে সোনার চর।
ট্রলারভাড়া আসা-যাওয়া মিলে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকার মতো। সোনার চরে দলবেঁধে যাওয়াই উত্তম। লঞ্চে ঢাকা থেকে চরফ্যাশন (বেতুয়া ঘাট বা ঘোষের হাট) ডেকের ভাড়া ২০০ টাকা। কেবিন এক হাজার টাকা। চরফ্যাশন থেকে চর কচ্ছপিয়া ফেরিঘাট যেতে হবে মোটরসাইকেল অথবা বোরাকে (ইজিবাইক) চেপে। এবার স্পিডবোট কিংবা ট্রলার রিজার্ভ নিয়ে নিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় অথবা লাইনের ট্রলারে চেপে চলে যান চর কুকরি-মুকরি। উপজেলা পরিষদ ভবনে অনুমতি নিয়ে রাতে থাকা যাবে। থাকা যাবে বন বিভাগের অফিসার্স কোয়ার্টার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বাড়ি কিংবা খোলা মাঠে তাঁবু পেতে। খাওয়াদাওয়ার কোনো চিন্তা নেই। বাজারের হোটেলে অর্ডার দিলেই তাজা মাছের সঙ্গে দেশি মুরগি সহজেই পেয়ে যাবেন। দামও হাতের নাগালে। সোনার চরে থাকার জন্য বন বিভাগের বাংলোই একমাত্র ভরসা। যারা রোমাঞ্চপ্রেমিক তারা হয়তো সৈকতের কাছে তাঁবু পেতে থাকতে পারেন। খাবারদাবারের ব্যবস্থা চর কুকরি-মুকরি থেকেই করে আসতে বা নিয়ে আসতে হবে!

সোনার চরে দেখতে পাওয়া যায় প্রচুর পাখি

Categories
ফারুখ আহমেদ

বাংলাদেশের ‘শেষ গ্রাম’

থেগামুখ সম্পর্কে যেমন ভেবেছিলাম তার উল্টোই দেখলাম। দুর্গম এলাকা হলেও সীমান্তঘেরা থেগামুখ বা থেগাদোর গ্রাম ছিমছাম, বেশ সাজানো-গোছানো। এখানে ১০০ পরিবারের বসবাস। তার মানে সব মিলে এখানে ১০০টির মতো বাড়ি বা ঘর আছে…লিখেছেন  ফারুখ আহমেদ Red dot
‘নদীর এই বাঁকটা অনেক বেশি মোহময়’—নাদিয়ার মুখের কথা শেষ না হতেই দেখি চিকিৎসক নাজমুল হক নদীর বাঁকের ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তারপর যতই সামনে এগিয়েছি, কর্ণফুলী নদীর প্রতিটা বাঁক আমাদের শুধুই মুগ্ধ করেছে, বিস্ময়ভরে তাকিয়ে দেখেছি। কখনো ছবি তোলার জন্য ব্যস্ত হয়েছি, আবার কখনো প্রকৃতি উপভোগ করে করে এগিয়েছি। পুরো দুই দিনের প্রায় ২৫ ঘণ্টা আমরা কর্ণফুলী নদীতে ভেসে বেড়িয়েছি। অসাধারণ ছিল সে নদীপথে চলার প্রতিটি মুহূর্ত।

ঠেগামুখ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী শেষ গ্রাম। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন থেগামুখ। এখানে চাকমা ও মারমা নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। থেগামুখের কথা জেনেছিলাম আগেই। সেই জানাটাকে উসকে দিয়েছিল বন্ধু সমীর মল্লিক। শুরু হলো পরিকল্পনা। বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ এল বাংলা নববর্ষের ছুটিতে। প্রথম আলোর রাঙামাটি প্রতিনিধি হরি কিশোর চাকমা ও বন্ধু গ্লোরি চাকমার সহযোগিতা নিলাম। নয়জনের দল নিয়ে আমরা রওনা হলাম। ১৩ এপ্রিল রাতে দেশ ট্র্যাভেলসের বাসে চললাম রাঙামাটির উদ্দেশে। নববর্ষের দিন রাঙামাটি থেকে পরদিন ভোরবেলা মিল্টন চাকমার ট্রলারে চেপে থেগামুখের উদ্দেশে সমতাঘাট থেকে শুরু হলো যাত্রা।
ঘণ্টা খানেক চলার পর পাহাড় ভেদ করে দাঁড়িয়ে থাকা বুদ্ধমূর্তি দেখে প্রথম যাত্রাবিরতি টানতে হলো। এভাবেই শুভলং, বরকল ও বাঙালটিলা হয়ে ঠিক সন্ধ্যায় আমরা ছোট হরিণা পৌঁছাই। সীমান্ত এলাকা, তাই নায়েক রহমতের পরামর্শে সেদিন আর সামনে না গিয়ে ছোট হরিণাতেই রাত কাটালাম আমরা।
পরের দিন ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। অন্ধকার ভেদ করে আমরা যখন বের হলাম, সময় তখন ভোর চারটা হবে। ট্রলার চলা শুরু করতেই অনুভব করি স্বপ্নের মতো ঠান্ডা হাওয়া বইছে, চারিদিক ঝিরঝির। আমরা টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার গ্রাম ছোট হরিণা থেকে এগিয়ে চলি বড় হরিণার দিকে। বড় হরিণাতে আমাদের আবার যাত্রাবিরতি দিতে হয়। বড় হরিণা সীমান্তচৌকি বা বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) আমাদের থেগামুখ যাত্রার বিষয়ে তথ্য জানানো ছিল। নাম লিখিয়ে বিজিবির দেওয়া হালকা চা-নাশতার আতিথেয়তা নিয়ে তবলাবাগ হয়ে ছুটে চলি থেগামুখের দিকে।
আবারও হুহু ঠান্ডা বাতাস আমাদের জড়িয়ে ধরল। আরাম পেয়েই কিনা সঙ্গী-সাথিরা ঘুমের অতলে তলিয়ে পড়ে। আমি না ঘুমিয়ে সারা রাতের ক্লান্তি সরিয়ে ট্রলারের ছাদে গিয়ে বসি। একটু পর দেখি আনিচ মুন্সি চলে এসেছেন। তারপর নওরিন এবং তারও পরে নাদিয়া চলে এল। এভাবে এক এক করে সবাই চলে আসে ট্রলারের ছাদে। এরই মধ্যে পুব আকাশে আলো দেখা দিয়েছে। তবে আকাশের গা থেকে পুরোপুরি অন্ধকার তখনো মুছে যায়নি। প্রচণ্ড গরমের দিনেও কেমন কুয়াশাভেজা প্রকৃতি। মধ্য এপ্রিলেও ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। সূর্যের আলোরা পাখা মেলতেই কর্ণফুলী নদী চকচক করে উঠল। পাখির ডাক ছিল আলো ফোটার আগে থেকেই, এবার শুরু হলো আমাদের কিচিরমিচির। দুপাশে পাহাড় আর সে পাহাড়ের ঘন জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত কর্ণফুলী নদী দিয়ে বড় হরিণা পেছনে ফেলে ট্রলার এগিয়ে চলল আরও সামনে বাংলাদেশের শেষ এবং সীমানা গ্রাম থেগামুখের দিকে। এখানে আমাদের ট্রলার ও এলাকার অন্যান্য ট্রলারের সঙ্গে ভারতের পতাকাবাহী ট্রলার চলতে দেখে দারুণ রোমাঞ্চিত আমরা। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা, মনে মনে ভাবলাম সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক একেই বলে।
থেগামুখ বিওপির প্রবেশমুখটা টাইটানিক জাহাজের মতো। ধারণার চেয়ে আধা ঘণ্টা দেরিতে থেগামুখ পৌঁছানোয় থেগাদোরের আঞ্চলিক কমান্ডার তাঁর উৎকণ্ঠার কথা জানালেন। তারপর হালকা নাশতায় আপ্যায়িত করলেন। নাশতা সেরে এবার আমরা বের হই থেগা গ্রাম ঘুরে দেখতে, পাশেই সাজেকের দিকে বয়ে গেছে থেগা নদী।
থেগামুখ সম্পর্কে যেমন ভেবেছিলাম তার উল্টোই দেখলাম। দুর্গম এলাকা হলেও সীমান্তঘেরা থেগামুখ বা থেগাদোর গ্রাম ছিমছাম, বেশ সাজানো-গোছানো। এখানে ১০০ পরিবারের বসবাস। তার মানে সব মিলে এখানে ১০০টির মতো বাড়ি বা ঘর আছে। একটা চমৎকার বাজার আছে। এখানকার কারবারি বা গ্রামপ্রধানের নাম পুলিন চাকমা। একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তখন ক্লাস চলছিল। আমাদের দেখে ছাত্ররা বের হয়ে চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকাল। তারপর আমাদের ক্যামেরায় পোজ দেওয়া শুরু করল। এখানে রেস্ট হাউস বা রাত্রি যাপনেরও ব্যবস্থা আছে। রেস্ট হাউস বলতে চাকমা বা মারমাদের ঘর। খাবার হোটেল আছে, খেতে চাইলে আগে থেকে ফরমাশ দিয়ে রাখতে হবে। রেস্ট হাউসে আশপাশের এলাকার লোকজন বা পাশের ভারতের মিজোরামের ডেমাক্রির অতিথি ছাড়া অন্য আর কারও থাকার সৌভাগ্য হয়নি, খাবার ব্যবস্থাও তাঁদের জন্যই জানালেন কারবারি পুলিন চাকমা। সপ্তাহের বুধ ও শুক্রবার এখানে হাট বসে। সেই দুই দিন এলাকা বেশ সরগরম থাকে। হাটে আসা ক্রেতার বেশির ভাগই ওপার মিজোরামের। ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে বাংলাদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। স্কাই টিভির অ্যানটেনা প্রতিটি ঘরে ঘরে। আমরা পুরো গ্রাম ঘুরে থেগামুখ বাজারের বটগাছ তলায় বসে কারবারি পুলিন চাকমার আতিথেয়তা নিই। চা-বিস্কুট খাই, সঙ্গে মিজোরামের কোমল পানীয়। এভাবেই থেগামুখে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে লুসাই পর্বতমালা বা মিজোরামের নীল পাহাড়ের (ব্লু মাউনটেইন) জলধারার স্রোতের মিলনস্থল কর্ণফুলী নদীর উৎসমুখ দেখে আমরা ফিরতে থাকি। থেগামুখ তখন পেছনে।

.প্রয়োজনীয় তথ্য
রাঙামাটি থেকে ছোট হরিণা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল রয়েছে। ছোট হরিণা পর্যন্ত সাধারণের চলাচলের অনুমতি, তারপর আর নেই। বড় হরিণা হয়ে থেগামুখ যেতে হলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। অনুমতির জন্য রাঙামাটির জিএসও (ইন্টেলিজেন্স) ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড বরাবর আবেদন করতে হবে। অনুমতি মিললে রাঙামাটি হয়ে সমতাঘাট বা রিজার্ভ বাজার থেকে ছোট হরিণা হয়ে থেগামুখ। যাত্রাকালে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানি সঙ্গে রাখবেন। থেগামুখে দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে। এক কিংবা দুই রাত আপনাকে ছোট হরিণা থাকতে হবে। রাত্রি যাপনের জন্য ছোট হরিণার বিদ্যুৎ ও টয়লেটবিহীন রেস্ট হাউসের ছোট্ট ঘরই একমাত্র ভরসা। দু-তিনটা খাবারের হোটেল থাকলেও আগে থেকে ফরমাশ না দিলে খাবার পাবেন না।

Categories
ফারুখ আহমেদ

মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি

 

আমরা জিপতলি হেলিপ্যাড ও তার আশপাশের রূপ-সৌন্দর্য চোখে ধারণ করে সেদিনের মতো কর্ণফুলী তীরে বন বিভাগের বিশ্রামাগার বনফুলে অবস্থান নিই। একবার রাত না কাটালে বোঝানো যাবে না বনফুলের অসাধারণত্ব। পরদিন সকালবেলা বের হলাম রাঙামাটির উদ্দেশে…লিখেছেন ফারুক আহমেদ Red dot

  এই পথ ধরে অনেকেই গিয়েছেন, বহুবার। চলতি পথে বিমোহিত অনেকেরই মুখ থেকে অস্ফুটে বের হয়েছে, বাহ্‌! গন্তব্য আপনাকে টানলেও, পথফুরাবে জানলেও আপনি চেয়েছেন পথ যেন না ফুরোয়। রাস্তার দুই পাশে ঘন জঙ্গল, সারি সারি গাছপালা আপনার ভালো লাগাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে বারবার। সেসব গাছপালা সরিয়ে আপনি কখনো দৃষ্টি প্রসারিত করেছেন পথের দুই পাশের গাছপালা বা নিচের চমৎকার লেকের দিকে। পাহাড়ের ধাপে ধাপে জুম আর কত না ভালো লাগা, কখনো কখনো জুমচাষি-পাহাড়িদের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে দেখেছেন।

সেই পথের কথাই বলব। অসাধারণ পাহাড়ি সেই পথ। রাঙামাটি থেকে কাপ্তাইয়ের পথ এটি। কাপ্তাই থেকে রাঙামাটি যেতে সময় বাঁচাতে আমরা এই পথটাই বেছে নিয়েছিলাম। এই পথ ধরে চলাটাও এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

.

গত বছর ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলাম রাঙামাটি। ঈদের রাতেই ঢাকা ছাড়ি চট্টগ্রামের উদ্দেশে। ট্রেন থেকে নেমে চড়ে বসি বন বিভাগের তাপানুকূল মাইক্রোবাসে। একে একে চট্টগ্রামের বাজার-মহল্লা পেছনে ফেলে একসময় শেখ রাসেল সাফারি পার্কে যাত্রাবিরতি। সাফারি পার্ক ঘোরা শেষ করে আবার চলি কাপ্তাইয়ের দিকে। এভাবেই একসময় পৌঁছে যাই কাপ্তাই বন বিভাগের বিশ্রামাগার বনফুলে। তারপর কাপ্তাই ফরেস্ট। কাপ্তাই ফরেস্টের শতবর্ষের পুরোনো বিশ্রামাগার ঘুরতে যাই। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সন্ধ্যাবেলা চলে আসি কাপ্তাই সেনাবাহিনীর পিকনিক স্পট হয়ে জিপতলি হেলিপ্যাডে। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তার ওপর সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আকাশে সোনারং। সেই গোধূলি অনেক দিন মনে থাকবে। আমরা জিপতলি হেলিপ্যাড ও তার আশপাশের রূপ-সৌন্দর্য চোখে ধারণ করে সেদিনের মতো কর্ণফুলী তীরে বন বিভাগের বিশ্রামাগার বনফুলে অবস্থান নিই। একবার রাত না কাটালে বোঝানো যাবে না বনফুলের অসাধারণত্ব। পরদিন সকালবেলা বের হলাম রাঙামাটির উদ্দেশে।

সেদিন মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরির দিন। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই দেখি অঝোর ধারায় বৃষ্টি। পথে নেমে অবশ্য ঝকঝকে রোদের মুখোমুখি হতে হলো। তারপর আমাদের এগিয়ে চলা। প্রথম আমাদের যাত্রাবিরতি ছিল খালেকের দোকানে। পাকা পেঁপে আর কলা দেখে সঙ্গে চায়ের পিপাসা মিলিয়ে বিরতি একটা দিতেই হলো। খালেকের দোকান নামে বেশ পরিচিত হলেও আমাদের কাভার্ড ভ্যানচালক জানালেন, জায়গার নাম কামাইল্যাছড়ি। ভ্যানচালকের তাড়ায় আমরা যাত্রা শুরু করি। কিছুদূর যেতেই আবার যাত্রাবিরতি। এবার জুমচাষ দেখতে হবে। নামলাম পথে। হঠাৎ একপশলা বৃষ্টি। পাশেই একটা অস্থায়ী বাঁশ-বেতের ঘর পেয়ে গাড়িতে না উঠে সেই ঘরে গিয়ে বসলাম। সবুজভরা পুরো এলাকা খুব ভালো লাগার। পাশেই কাপ্তাই হ্রদের জল। সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অসাধারণ। ঝুপ করে যেভাবে বৃষ্টি নেমেছিল, টুপ করে সেভাবেই সূর্য আলো ঢেলে দিল। আবার পথ আমাদের সঙ্গী হলো। চালক জানালেন, সেই জায়গার নাম ভরাদোম। ২৮ কিলোমিটার দূরত্বের ৪৫ মিনিটের রাস্তায় ইতিমধ্যে আমরা এক ঘণ্টা পার করেছি। পথ ও দুই পাশের মনকাড়া সৌন্দর্য আমাদের গন্তব্যে যাওয়ার ইচ্ছাটাই দূর করে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে আমরা মানিকছড়ি চলে এসেছি। আকাশ মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি নামবে যখন-তখন। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। ৪৫ মিনিটের রাঙামাটি নতুন রাস্তার ভ্রমণ আমরা শেষ করলাম দুই ঘণ্টায়।

আমরা রাঙামাটি পৌঁছলাম। বন বিভাগের বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা। পুরো রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদ আর কর্ণফুলী নদী দিয়ে ঘেরা। আমাদের ছুটে আসা এই অপরূপ জায়গা দেখার জন্য। আমরা রাঙামাটিতে দেখেছি ঝুলন্ত সেতু, শুভলং ঝরনা, কাপ্তাই হ্রদের পেদাটিংটং রেস্তোরাঁটা—সবকিছুতেই যেন প্রকৃতির অনন্য তুলির আঁচড়। শুভলং বাজারও ঘুরে দেখেছি একদিন। দেখেছি রাজবন বিহার আর কাপ্তাই হ্রদের পাশে বৌদ্ধবিহার। দেশের একমাত্র গজদন্ত কারুশিল্পী বিজয়কেতন চাকমার বাসা, সেটিও দেখার মতো।

প্রয়োজনীয় তথ্য

কাপ্তাই বা রাঙামাটি সরাসরি বাস চলে। রাঙামাটিতে থাকার হোটেলও পেয়ে যাবেন সুবিধামতো। রাঙামাটির সরাসরি বাস হচ্ছে সৌদিয়া, শ্যামলী, ডলফিন, এস আলম প্রভৃতি। রাঙামাটিতে থাকার বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। পর্যটন করপোরেশনের হলিডে, হোটেল সুফিয়া, হোটেল লেক ভিউ ও হোটেল প্রিন্স অন্যতম।

Categories
ফারুখ আহমেদ

ছোট ছোট কাঁকড়ার ছোটাছুটি

‘প্রকৃতির কাছে কিছু চাইতে হয় না, প্রকৃতি এমনি এমনি দেয়, যখন দেয় হাত ভরে দেয়।’
কেওড়ার বনের গভীরে হাঁটা তেমনি এক প্রাপ্তি…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot
নিঝুম দ্বীপ প্রথম যাই ২০০২ সালে, এরপর ২০০৪ সালে আরেকবার। সেসব স্মৃতি আবছা। গত অক্টোবরের একদিন আবার নিঝুম দ্বীপ রওনা হলাম। সঙ্গী নাজমূল হক, রাজীব রাসেল, আবদুল বাতিন, নাজিম, মাসুম আর নীরব। ঢাকা থেকে ফারহান-৪ লঞ্চের যাত্রী হয়ে হাতিয়ার জাহাজঘাট তমরুদ্দি পর্যন্ত খুব আরামের ভ্রমণ। তারপর অটোরিকশায় ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনি খেতে খেতে দেড় ঘণ্টায় মোক্তার ঘাট পৌঁছাই। মোক্তার খাল পেরিয়ে এবার আমাদের ওপারের নিঝুম দ্বীপ যেতে হবে। যাত্রী না থাকায় ট্রলার ছাড়তে দেরি দেখে নীরবের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মোরগের মাংস দিয়ে সেই বিকেলে দুপুরের খাবার খেলাম হোটেলের লাল চালের ভাত দিয়ে। এক অসাধারণ ভোজ হলো। আমরা ট্রলারে চেপে নিঝুম দ্বীপে যখন পা রাখি, তখন সূর্য অস্তাচলে।

মোক্তার ঘাট নিঝুম দ্বীপ পারাপারের মূল ঘাট। মোক্তার ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে পাঁচ মিনিটে মোক্তার খাল পার হয়ে নিঝুম দ্বীপ। ট্রলার আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল, সে জায়গার নাম বন্দরটিলা বাজার। সেখান থেকে নিঝুম দ্বীপের মূল লোকালয় নামা বাজার অল্প পথ। বাইকে চেপে ২০ মিনিটে চলে যাওয়া যায়। সেই গোধূলিবেলায় আমরা মোটরসাইকেলের যাত্রী হলাম। সেই পথ সাপের মতো এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। ঢালাই করা পাকা রাস্তা। দুপাশে চোখ জুড়ানো সবুজ আর সবুজ। দুই চোখ যত দূর যায় শুধু কেওড়াগাছ। স্থানীয়রা কেওড়াগাছকে কেরফা বলে ডাকে।
চলন্ত অবস্থাতেই দেখলাম গাছের নিচে পড়ে আছে অজস্র কেওড়া ফল। বাইকচালককে ফলের কথা বলতেই বাইক দাঁড় করিয়ে ভোঁ-দৌড়। ফিরে এলে দেখি হাতে তাঁর অনেক ফল। টক কাকে বলে কেওড়া ফলে কামড় না দিলে বোঝা কঠিন। সূর্য ডুবে যাওয়ায় আলো কমে অন্ধকার ঘনিয়েছিল। অন্ধকারে বাইকের হেডলাইটের আলো পেয়ে শতকোটি পোকা ও মশা আমাকে আক্রমণ করে বসল। সে আক্রমণের ঝাঁজ নিয়েই নামা বাজার জেলা পরিষদ ডাকবাংলো অবকাশে গিয়ে পৌঁছাই।
সে রাতে ভ্রমণে ক্লান্ত আমরা ঘুমিয়ে পড়ি একটু তাড়াতাড়ি। পরদিন সকালটা শুরু হলো দারুণভাবে। পরিকল্পনামতো সূর্যোদয় দেখার জন্য ঘুম থেকে উঠি ভোর পাঁচটায়, তারপর হাঁটা। পথশোভা আর ধানখেতে শিশিরবিন্দু দেখে দেখে চলে আসি সূর্যোদয় পাড়ায়। অবশ্য সূর্যোদয় পাড়া পৌঁছার আগেই সূর্যোদয় ঘটে। আমরা কুসুম কুসুম সূর্য দেখি মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা বাজারে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে সূর্যোদয় পাড়ায় বেশ ভালো কিছু সময় কাটে। গ্রামবাসীর জটলা আর তাঁদের প্রশ্ন করার ধরন দারুণভাবে উপভোগ করি। গ্রামবাসীর সব কৌতূহল মিটিয়ে যখন ডেরায় ফিরে চলি তখন সকাল আটটা বাজে প্রায়। দ্রুত পা চালিয়ে চলে আসি অবকাশে। কিছুক্ষণ পর আবার বের হই। এবার আমাদের গন্তব্য হরিণের খোঁজে চর ওসমান, চর কমলা ও চর কবিরা। নিঝুম দ্বীপের গ্রামগুলোর নাম খুব সুন্দর। মুক্তিযোদ্ধা, সূর্যোদয়, ছায়াবিথী, গুচ্ছগ্রাম, হাজিগ্রাম, মদিনা, বান্ধাখালী, ধানসিঁড়ি, আগমনী ইত্যাদি।
ঝকঝকে সকাল। অবকাশ থেকে বের হওয়ার সময় একঝাঁক হাঁস দেখে মনটা ভালো হয়ে যায়। নামা বাজারের পূর্বনির্ধারিত হোটেলে নাশতা খেয়ে যাত্রা শুরু করি। আজ সারা দিনের জন্য ট্রলার ভাড়া করা। ট্রলারে চড়ে বসতেই ট্রলার ছোট্ট খাল থেকে কয়েক মিনিটে আমাদের বিশাল মেঘনা নদীতে এনে ফেলল। নাজিমের চোখেমুখে বিস্ময়। সেই বিস্ময় নিয়ে সে বলল, এ যদি নদী হয় তবে
সিলেটের গুলো ড্রেন। সবাই নাজিমের কথায় হাসিতে ফেটে পড়লাম!
আমরা চলছি তো চলছি। আকাশে মেঘ নেই রোদেও তেজ নেই, আছে প্রবল বাতাস। সেই বাতাস গায়ে মেখে মেখে আর ইলিশ ধরা দেখে দেখে এক সময় চলে আসি চর কবিরাতে। কবিরার চরে ছোট ছোট কাঁকড়ার ছোটাছুটি। অবশ্য পাখি না দেখে নাজমূল স্যার হতাশ। আর আমি নিস্তব্ধ কবিরার তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবার পেছন ফিরে তাকালাম। এখানে গাছপালা কেমন মলিন। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেওড়াসহ বিভিন্ন গাছগাছালির বেহাল অবস্থা দেখে বেশি দূর যেতে মন চাইল না। এখানে নদীতীরের গাছগুলো থেকে মাটি বা বালু সরে শিকড় বের হয়ে আছে। এরপর শুনলাম এখানে হরিণ নেই, তখন আর চর কবিরাতে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে হলো না। আমরা আবার ট্রলারের যাত্রী হলাম। ছুটে চললাম কমলার চরে। এখানে রাখাল গরুর পাল নিয়ে বিরাট মাঠে বসে আছে। আর মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক একটি কেওড়াগাছ। আমরা কেওড়াগাছের ছায়ায় শেষ রসদ পিঠা ও কেওড়া ফল খেয়ে কেওড়ার বনে প্রবেশ করি।
শ্বাসমূল দেখেশুনে গভীর বনে হাঁটছি। সামনে কী বোঝা যাচ্ছে না, আবার লম্বা সব কেওড়াগাছের জন্য আকাশও দেখা যাচ্ছে না। এটা খুব ভালো হলো আমাদের জন্য, পানি ফুরিয়ে এসেছে। রোদ পড়লে গরম লাগত, তৃষ্ণার্ত হতাম। সে যাই হোক, হাঁটছি আর খুঁজছি হরিণ। পাশ থেকে নাজিম বলে যাচ্ছে, ‘বড় আশা নিয়ে এসেছি জঙ্গলে হরিণ দেখব বলে।’ কেওড়া ফল খেতে খেতে পাশ থেকে রাজীব রাসেলের প্রশ্ন ‘আমরা কি নিরাশ হব,’ বাতিন নির্লিপ্ত! আমরা নিরাশ হয়েছিলাম সত্যি সত্যি। নিঝুম দ্বীপের কমলার চর বা বন অংশে কেওড়াগাছ, হরিণের পায়ের ছাপ ছাড়া হরিণ আমাদের চোখে পড়েনি। আমরা প্রায় ১২ কিলোমিটারের মতো জংলা পথে চলে হরিণ না পেয়ে যখন ফিরে আসি তখন সূর্য মাথার ওপর থেকে অনেক পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আবার কমলার খালে ট্রলারের যাত্রী হলাম। হরিণ দেখিনি কিন্তু বনের ভেতর একঝাঁক বুনো কুকুরের দেখা পেয়েছি, দেখা হয়েছে শিয়ালের সঙ্গে। বেশি মাত্রায় দেখেছি ছাগল আর ভেড়ার পাল। দেখেছি জেলে পরিবার। হরিণের পায়ের ছাপ দেখে কী যে শিহরণ খেলেছে শরীরে। হতাশ নাজমূল হকের দেওয়া সান্ত্বনা—‘প্রকৃতির কাছে কিছু চাইতে হয় না, প্রকৃতি এমনি এমনি দেয়, যখন দেয় হাত ভরে দেয়।’ কেওড়ার বনের গভীরে হাঁটা তেমনি এক প্রাপ্তি। এমন সময়ে পেয়ে যাই একটা ইলিশের নাও। জাল থেকে সবে ইলিশ খুলছে। সে অবস্থায় এক হালি গ্রেড ইলিশ (৮০০ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের ইলিশকে গ্রেড ইলিশ বলে) কিনে নেই ১২০০ টাকায়। আমাদের নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে ইলিশধরা দেখা ও টাটকা ইলিশ ভাজা খাওয়াও জীবনের অনেক ঘটনার অন্যতম এক স্মরণীয় ঘটনা!
.প্রয়োজনীয় তথ্য
নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চের যাত্রী হয়ে যান। লঞ্চ ফারহান-২ ও ৩ প্রতিদিন ঢাকা-হাতিয়া চলাচল করে। যাত্রা শুরুর সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। হাতিয়ার তমরুদ্দি ভোর পাঁচটায় নেমে অটোরিকশা বা মোটরবাইকে চেপে দেড় ঘণ্টায় চলে আসুন মোল্লার ঘাট। এখান থেকে ট্রলারে বন্দরটিলা পাঁচ মিনিটের পথ। এরপর ১৫ বা ২০ মিনিটে নামার বাজার। চাইলে তমরুদ্দি বা হাতিয়া জাহাজ ঘাট থেকে সরাসরি ট্রলারে নামার বাজার চলে যেতে পারেন। নদীতে জোয়ার থাকলে সময় লাগবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। ট্রলার ভাড়া নেবে রিজার্ভ চার হাজার টাকার মতো।
এখানে খাবারের মান যেমনতেমন হলেও টাটকা মাছ ও দেশি মুরগি পাবেন। থাকার হোটেল আছে একটি। আছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো অবকাশ। আর বন বিভাগের বিশ্রামাগার, আর আছে নিঝুম দ্বীপবাসীর নিজস্ব কিছু আবাসিক ব্যবস্থা। বিদ্যুতের ব্যবস্থা বলতে সোলার আর জেনারেটর। জেনারেটর দেবে শুধু পানি তোলার জন্য। সুতরাং এসব সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে আর ঢাকা থেকেই থাকার ব্যবস্থা করে তবে নিঝুম দ্বীপের যাত্রী হবেন। চাইলে নোয়াখালী হয়ে বাসেও নিঝুম দ্বীপ যেতে পারেন। হাতিয়ায় মহিষের দই খেতে ভুলবেন না।
আরেকটি কথা, নামার বাজার থেকে ছোট্ট একটি সেতু পেরিয়ে সামনে গেলে নিঝুম দ্বীপ সৈকতের দেখা পাবেন।
নিঝুম দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন চষে ফেরার সময় একবার হলেও সূর্যাস্ত দেখতে সৈকতে যাবেন!

কেওড়াবন
Categories
ফারুখ আহমেদ

পাহাড় হ্রদ আর মেঘ-বৃষ্টির গল্প

ফারুখ আহমেদ Red dot
এই পথ ধরে অনেকেই গিয়েছেন, বহুবার। চলতি পথে বিমোহিত অনেকেরই মুখ থেকে অস্ফুটে বের হয়েছে, বাহ্‌! গন্তব্য আপনাকে টানলেও, পথ ফুরাবে জানলেও আপনি চেয়েছেন পথ যেন না ফুরোয়। রাস্তার দুই পাশে ঘন জঙ্গল, সারি সারি গাছপালা আপনার ভালো লাগাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে বারবার। সেসব গাছপালা সরিয়ে আপনি কখনো দৃষ্টি প্রসারিত করেছেন পথের দুই পাশের গাছপালা বা নিচের চমৎকার লেকের দিকে। পাহাড়ের ধাপে ধাপে জুম আর কত না ভালো লাগা, কখনো কখনো জুমচাষি-পাহাড়িদের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে দেখেছেন।

সেই পথের কথাই বলব। অসাধারণ পাহাড়ি সেই পথ। রাঙামাটি থেকে কাপ্তাইয়ের পথ এটি। কাপ্তাই থেকে রাঙামাটি যেতে সময় বাঁচাতে আমরা এই পথটাই বেছে নিয়েছিলাম। এই পথ ধরে চলাটাও এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

.গত বছর ঈদের ছুটিতে গিয়েছিলাম রাঙামাটি। ঈদের রাতেই ঢাকা ছাড়ি চট্টগ্রামের উদ্দেশে। ট্রেন থেকে নেমে চড়ে বসি বন বিভাগের তাপানুকূল মাইক্রোবাসে। একে একে চট্টগ্রামের বাজার-মহল্লা পেছনে ফেলে একসময় শেখ রাসেল সাফারি পার্কে যাত্রাবিরতি। সাফারি পার্ক ঘোরা শেষ করে আবার চলি কাপ্তাইয়ের দিকে। এভাবেই একসময় পৌঁছে যাই কাপ্তাই বন বিভাগের বিশ্রামাগার বনফুলে। তারপর কাপ্তাই ফরেস্ট। কাপ্তাই ফরেস্টের শতবর্ষের পুরোনো বিশ্রামাগার ঘুরতে যাই। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা সন্ধ্যাবেলা চলে আসি কাপ্তাই সেনাবাহিনীর পিকনিক স্পট হয়ে জিপতলি হেলিপ্যাডে। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। তার ওপর সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আকাশে সোনারং। সেই গোধূলি অনেক দিন মনে থাকবে। আমরা জিপতলি হেলিপ্যাড ও তার আশপাশের রূপ-সৌন্দর্য চোখে ধারণ করে সেদিনের মতো কর্ণফুলী তীরে বন বিভাগের বিশ্রামাগার বনফুলে অবস্থান নিই। একবার রাত না কাটালে বোঝানো যাবে না বনফুলের অসাধারণত্ব। পরদিন সকালবেলা বের হলাম রাঙামাটির উদ্দেশে।

সেদিন মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরির দিন। ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই দেখি অঝোর ধারায় বৃষ্টি। পথে নেমে অবশ্য ঝকঝকে রোদের মুখোমুখি হতে হলো। তারপর আমাদের এগিয়ে চলা। প্রথম আমাদের যাত্রাবিরতি ছিল খালেকের দোকানে। পাকা পেঁপে আর কলা দেখে সঙ্গে চায়ের পিপাসা মিলিয়ে বিরতি একটা দিতেই হলো। খালেকের দোকান নামে বেশ পরিচিত হলেও আমাদের কাভার্ড ভ্যানচালক জানালেন, জায়গার নাম কামাইল্যাছড়ি। ভ্যানচালকের তাড়ায় আমরা যাত্রা শুরু করি। কিছুদূর যেতেই আবার যাত্রাবিরতি। এবার জুমচাষ দেখতে হবে। নামলাম পথে। হঠাৎ একপশলা বৃষ্টি। পাশেই একটা অস্থায়ী বাঁশ-বেতের ঘর পেয়ে গাড়িতে না উঠে সেই ঘরে গিয়ে বসলাম। সবুজভরা পুরো এলাকা খুব ভালো লাগার। পাশেই কাপ্তাই হ্রদের জল। সব মিলিয়ে সময়টা ছিল অসাধারণ। ঝুপ করে যেভাবে বৃষ্টি নেমেছিল, টুপ করে সেভাবেই সূর্য আলো ঢেলে দিল। আবার পথ আমাদের সঙ্গী হলো। চালক জানালেন, সেই জায়গার নাম ভরাদোম। ২৮ কিলোমিটার দূরত্বের ৪৫ মিনিটের রাস্তায় ইতিমধ্যে আমরা এক ঘণ্টা পার করেছি। পথ ও দুই পাশের মনকাড়া সৌন্দর্য আমাদের গন্তব্যে যাওয়ার ইচ্ছাটাই দূর করে দিয়েছিল। ইতিমধ্যে আমরা মানিকছড়ি চলে এসেছি। আকাশ মেঘে ঢাকা, বৃষ্টি নামবে যখন-তখন। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। ৪৫ মিনিটের রাঙামাটি নতুন রাস্তার ভ্রমণ আমরা শেষ করলাম দুই ঘণ্টায়।

আমরা রাঙামাটি পৌঁছলাম। বন বিভাগের বাংলোতে থাকার ব্যবস্থা। পুরো রাঙামাটি কাপ্তাই হ্রদ আর কর্ণফুলী নদী দিয়ে ঘেরা। আমাদের ছুটে আসা এই অপরূপ জায়গা দেখার জন্য। আমরা রাঙামাটিতে দেখেছি ঝুলন্ত সেতু, শুভলং ঝরনা, কাপ্তাই হ্রদের পেদাটিংটং রেস্তোরাঁটা—সবকিছুতেই যেন প্রকৃতির অনন্য তুলির আঁচড়। শুভলং বাজারও ঘুরে দেখেছি একদিন। দেখেছি রাজবন বিহার আর কাপ্তাই হ্রদের পাশে বৌদ্ধবিহার। দেশের একমাত্র গজদন্ত কারুশিল্পী বিজয়কেতন চাকমার বাসা, সেটিও দেখার মতো।

প্রয়োজনীয় তথ্য

কাপ্তাই বা রাঙামাটি সরাসরি বাস চলে। রাঙামাটিতে থাকার হোটেলও পেয়ে যাবেন সুবিধামতো। রাঙামাটির সরাসরি বাস হচ্ছে সৌদিয়া, শ্যামলী, ডলফিন, এস আলম প্রভৃতি। রাঙামাটিতে থাকার বেশ কিছু ভালো মানের হোটেল রয়েছে। পর্যটন করপোরেশনের হলিডে, হোটেল সুফিয়া, হোটেল লেক ভিউ ও হোটেল প্রিন্স অন্যতম।

Categories
ফারুখ আহমেদ

ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনটঘাট

 

পদ্মার দুপাশের বিস্তীর্ণ ভূমি আর পদ্মার ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্যে আপনার সমুদ্র ঊর্মিমালার কথাই মনে হবে। আপনি হেঁটে হেঁটে চলে যাবেন বহুদূর। এখানে পদ্মার জলে পা ভিজিয়ে গল্প করার মজাই আলাদা!…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

ঢাকার একেবারে কাছে। দোহারের কার্তিকপুরের যে জায়গাটি পদ্মাপাড়ে গিয়ে মিশেছে তার নাম মৈনটঘাট। এখানে ডানে-বাঁয়ে বালু চিকচিক করা স্থলভূমি থাকলেও সামনে শুধু রুপোর মতো চকচকে পানি। এটা পদ্মা, আমাদের প্রিয় পদ্মা নদী। মৈনট পদ্মাপাড়ের একটি খেয়াঘাট। এখান থেকে প্রতিদিন ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। খেয়া পারাপারের জন্য জায়গাটির পরিচিতি আগে থেকেই ছিল। তবে এখন সেটা জনপ্রিয় বেড়ানোর জায়গা হিসেবেও। এত দিন অনেকটা আড়ালে থাকলেও ঢাকার কাছে বেড়ানোর ‘হটস্পট’ এখন এই মৈনটঘাট। মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া মৈনটঘাটের নতুন নাম হলো—মিনি কক্সবাজার!
প্রমত্তা পদ্মার হাঁকডাক আগের মতো না থাকলেও যা আছে সেটাই বা কম কী! বিশাল পদ্মার রূপ মৈনটঘাট এলাকায় বিস্ময়-জাগানিয়া। একটু পরপর পদ্মার ঢেউ কূলে আঁছড়ে পড়ছে। খানিক পরপর মাছ ধরার ট্রলার ছুটে চলে যাচ্ছে। তীরে সব ভ্রমণপিপাসুদের ভিড়। তাঁদের কেউ কেউ মাছ ধরার নৌকা দেখে মাছ কেনার জন্য এগোচ্ছেন। দরদাম ঠিক থাকলে অনেক পর্যটক মাছ কিনে নিচ্ছেন। পুরো নদীর তীর ও তার আশপাশের এলাকা সমুদ্রসৈকতের মতো করে সাজানো। এখানে সকালবেলাটা খুব ভালো কাটে, দুপুর কিছুটা মন্থর, তবে বিকেলবেলা অনেক বেশি জমজমাট। সোনা রোদের গোধূলিবেলার তো কোনো তুলনাই চলে না।
মৈনটপাড়ের দোকানপাটে বেচাকেনা আর পদ্মার জলে ঘুরে বেড়ানো। পদ্মার দুপাশের বিস্তীর্ণ ভূমি আর পদ্মার ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্যে আপনার সমুদ্র ঊর্মিমালার কথাই মনে হবে। আপনি হেঁটে হেঁটে চলে যাবেন বহুদূর। এখানে পদ্মার জলে পা ভিজিয়ে গল্প করার মজাই আলাদা!
সরাসরি বাস মৈনটঘাট চলে আসে। যাদের নিজস্ব বাহন আছে, তাদের তো কথাই নেই। বাস বা নিজস্ব বাহন থেকে নেমেই চোখে পড়বে নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে বসা অনেক দোকানপাট। খাবারের দোকান তো আছেই। এসব পেছন ফেলে সামনে গেলেই পাবেন বিশাল পদ্মা। এতটা বিশাল যে ওপারের কিছুই দেখা যায় না, দেখা যায় না ডান-বাঁয়ের কোনো বসতি। এখানে ট্রলার ও স্পিডবোট চলাচল করে। চাইলে ট্রলারে চেপে ওপারের চরভদ্রাসন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। আবার ঘণ্টা চুক্তিতে ট্রলার বা স্পিডবোট ভাড়া করে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতে পারেন। যা-ই করেন এখানে সময়টা কিন্তু বেশ কাটবে!

দরকারি কথা
মৈনটঘাট সারা দিনের ট্যুর। দিনে গিয়ে দিনেই ফেরত আসতে পারবেন। ঢাকার গুলিস্তানের মাজারের সামনে থেকে সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। যমুনা নামের এই বাসটি আপনাকে ঠিক দেড় ঘণ্টায় মৈনটঘাট পৌঁছে দেবে। ভাড়া ৯০ টাকা। তবে দলবেঁধে মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে দারুণ একটা পিকনিক পিকনিক ভাব পাবেন। মৈনটঘাট তো অবশ্যই যাবেন। দেখে আসতে পারবেন কোলাকোপা বান্দুরার সব ঐতিহাসিক স্থাপনা, আলালপুর তাঁতপল্লি ও হাছনাবাদ জপমালা রানির গির্জা! খাবার নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। মৈনটঘাটেই রয়েছে ছাপরাঘরের মতো কিছু ভালো রেস্তোরাঁ। একেবারে ঘরের খাবারের স্বাদই পাবেন। বাচা মাছ, চিংড়ি আর পদ্মার ইলিশে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।
সচেতনতা
বলা হয় প্রমত্তা পদ্মা। তার আগের সে রূপ না থাকলেও হালকাভাবে নেবেন না। এখন নদীতে গোসল করা নিষেধ। কেউ গার্ডের অবাধ্য হয়ে কিছু করবেন না। পানিপথে যাতায়াতে বা ট্রলারে ঘুরে বেড়ানোর সময় একটু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সম্ভব হলে সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখবেন। একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, আপনার বা আপনার ভ্রমণসঙ্গীদের দ্বারা পরিবেশ হুমকিতে পড়ে এমন কোনো কিছু অবশ্যই করা চলবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশ বিপন্ন হয় এমন কিছু ফেলে আসবেন না।

Categories
ফারুখ আহমেদ

নিঝুম দ্বীপের নিঝুম অরণ্যে

কমলার চর যাওয়ার পথে, ছবি: লেখক

ফারুখ আহমেদ Red dot

নিঝুম দ্বীপ প্রথম যাই ২০০২ সালে, এরপর ২০০৪ সালে আরেকবার। সেসব স্মৃতি আবছা। গত অক্টোবরের একদিন আবার নিঝুম দ্বীপ রওনা হলাম। সঙ্গী নাজমূল হক, রাজীব রাসেল, আবদুল বাতিন, নাজিম, মাসুম আর নীরব। ঢাকা থেকে ফারহান-৪ লঞ্চের যাত্রী হয়ে হাতিয়ার জাহাজঘাট তমরুদ্দি পর্যন্ত খুব আরামের ভ্রমণ। তারপর অটোরিকশায় ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনি খেতে খেতে দেড় ঘণ্টায় মোক্তার ঘাট পৌঁছাই। মোক্তার খাল পেরিয়ে এবার আমাদের ওপারের নিঝুম দ্বীপ যেতে হবে। যাত্রী না থাকায় ট্রলার ছাড়তে দেরি দেখে নীরবের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মোরগের মাংস দিয়ে সেই বিকেলে দুপুরের খাবার খেলাম হোটেলের লাল চালের ভাত দিয়ে। এক অসাধারণ ভোজ হলো। আমরা ট্রলারে চেপে নিঝুম দ্বীপে যখন পা রাখি, তখন সূর্য অস্তাচলে।
মোক্তার ঘাট নিঝুম দ্বীপ পারাপারের মূল ঘাট। মোক্তার ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে পাঁচ মিনিটে মোক্তার খাল পার হয়ে নিঝুম দ্বীপ। ট্রলার আমাদের যেখানে নামিয়ে দিল, সে জায়গার নাম বন্দরটিলা বাজার। সেখান থেকে নিঝুম দ্বীপের মূল লোকালয় নামা বাজার অল্প পথ। বাইকে চেপে ২০ মিনিটে চলে যাওয়া যায়। সেই গোধূলিবেলায় আমরা মোটরসাইকেলের যাত্রী হলাম। সেই পথ সাপের মতো এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। ঢালাই করা পাকা রাস্তা। দুপাশে চোখ জুড়ানো সবুজ আর সবুজ। দুই চোখ যত দূর যায় শুধু কেওড়াগাছ। স্থানীয়রা কেওড়াগাছকে কেরফা বলে ডাকে।
চলন্ত অবস্থাতেই দেখলাম গাছের নিচে পড়ে আছে অজস্র কেওড়া ফল। বাইকচালককে ফলের কথা বলতেই বাইক দাঁড় করিয়ে ভোঁ-দৌড়। ফিরে এলে দেখি হাতে তাঁর অনেক ফল। টক কাকে বলে কেওড়া ফলে কামড় না দিলে বোঝা কঠিন। সূর্য ডুবে যাওয়ায় আলো কমে অন্ধকার ঘনিয়েছিল। অন্ধকারে বাইকের হেডলাইটের আলো পেয়ে শতকোটি পোকা ও মশা আমাকে আক্রমণ করে বসল। সে আক্রমণের ঝাঁজ নিয়েই নামা বাজার জেলা পরিষদ ডাকবাংলো অবকাশে গিয়ে পৌঁছাই।
সে রাতে ভ্রমণে ক্লান্ত আমরা ঘুমিয়ে পড়ি একটু তাড়াতাড়ি। পরদিন সকালটা শুরু হলো দারুণভাবে। পরিকল্পনামতো সূর্যোদয় দেখার জন্য ঘুম থেকে উঠি ভোর পাঁচটায়, তারপর হাঁটা। পথশোভা আর ধানখেতে শিশিরবিন্দু দেখে দেখে চলে আসি সূর্যোদয় পাড়ায়। অবশ্য সূর্যোদয় পাড়া পৌঁছার আগেই সূর্যোদয় ঘটে। আমরা কুসুম কুসুম সূর্য দেখি মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা বাজারে দাঁড়িয়ে। সেখান থেকে সূর্যোদয় পাড়ায় বেশ ভালো কিছু সময় কাটে। গ্রামবাসীর জটলা আর তাঁদের প্রশ্ন করার ধরন দারুণভাবে উপভোগ করি। গ্রামবাসীর সব কৌতূহল মিটিয়ে যখন ডেরায় ফিরে চলি তখন সকাল আটটা বাজে প্রায়। দ্রুত পা চালিয়ে চলে আসি অবকাশে। কিছুক্ষণ পর আবার বের হই। এবার আমাদের গন্তব্য হরিণের খোঁজে চর ওসমান, চর কমলা ও চর কবিরা। নিঝুম দ্বীপের গ্রামগুলোর নাম খুব সুন্দর। মুক্তিযোদ্ধা, সূর্যোদয়, ছায়াবিথী, গুচ্ছগ্রাম, হাজিগ্রাম, মদিনা, বান্ধাখালী, ধানসিঁড়ি, আগমনী ইত্যাদি।
ঝকঝকে সকাল। অবকাশ থেকে বের হওয়ার সময় একঝাঁক হাঁস দেখে মনটা ভালো হয়ে যায়। নামা বাজারের পূর্বনির্ধারিত হোটেলে নাশতা খেয়ে যাত্রা শুরু করি। আজ সারা দিনের জন্য ট্রলার ভাড়া করা। ট্রলারে চড়ে বসতেই ট্রলার ছোট্ট খাল থেকে কয়েক মিনিটে আমাদের বিশাল মেঘনা নদীতে এনে ফেলল। নাজিমের চোখেমুখে বিস্ময়। সেই বিস্ময় নিয়ে সে বলল, এ যদি নদী হয় তবে
সিলেটের গুলো ড্রেন। সবাই নাজিমের কথায় হাসিতে ফেটে পড়লাম!
আমরা চলছি তো চলছি। আকাশে মেঘ নেই রোদেও তেজ নেই, আছে প্রবল বাতাস। সেই বাতাস গায়ে মেখে মেখে আর ইলিশ ধরা দেখে দেখে এক সময় চলে আসি চর কবিরাতে। কবিরার চরে ছোট ছোট কাঁকড়ার ছোটাছুটি। অবশ্য পাখি না দেখে নাজমূল স্যার হতাশ। আর আমি নিস্তব্ধ কবিরার তীরে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবার পেছন ফিরে তাকালাম। এখানে গাছপালা কেমন মলিন। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কেওড়াসহ বিভিন্ন গাছগাছালির বেহাল অবস্থা দেখে বেশি দূর যেতে মন চাইল না। এখানে নদীতীরের গাছগুলো থেকে মাটি বা বালু সরে শিকড় বের হয়ে আছে। এরপর শুনলাম এখানে হরিণ নেই, তখন আর চর কবিরাতে সময় নষ্ট করার ইচ্ছে হলো না। আমরা আবার ট্রলারের যাত্রী হলাম। ছুটে চললাম কমলার চরে। এখানে রাখাল গরুর পাল নিয়ে বিরাট মাঠে বসে আছে। আর মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক একটি কেওড়াগাছ। আমরা কেওড়াগাছের ছায়ায় শেষ রসদ পিঠা ও কেওড়া ফল খেয়ে কেওড়ার বনে প্রবেশ করি।
শ্বাসমূল দেখেশুনে গভীর বনে হাঁটছি। সামনে কী বোঝা যাচ্ছে না, আবার লম্বা সব কেওড়াগাছের জন্য আকাশও দেখা যাচ্ছে না। এটা খুব ভালো হলো আমাদের জন্য, পানি ফুরিয়ে এসেছে। রোদ পড়লে গরম লাগত, তৃষ্ণার্ত হতাম। সে যাই হোক, হাঁটছি আর খুঁজছি হরিণ। পাশ থেকে নাজিম বলে যাচ্ছে, ‘বড় আশা নিয়ে এসেছি জঙ্গলে হরিণ দেখব বলে।’ কেওড়া ফল খেতে খেতে পাশ থেকে রাজীব রাসেলের প্রশ্ন ‘আমরা কি নিরাশ হব,’ বাতিন নির্লিপ্ত! আমরা নিরাশ হয়েছিলাম সত্যি সত্যি। নিঝুম দ্বীপের কমলার চর বা বন অংশে কেওড়াগাছ, হরিণের পায়ের ছাপ ছাড়া হরিণ আমাদের চোখে পড়েনি। আমরা প্রায় ১২ কিলোমিটারের মতো জংলা পথে চলে হরিণ না পেয়ে যখন ফিরে আসি তখন সূর্য মাথার ওপর থেকে অনেক পশ্চিমে হেলে পড়েছে। আবার কমলার খালে ট্রলারের যাত্রী হলাম। হরিণ দেখিনি কিন্তু বনের ভেতর একঝাঁক বুনো কুকুরের দেখা পেয়েছি, দেখা হয়েছে শিয়ালের সঙ্গে। বেশি মাত্রায় দেখেছি ছাগল আর ভেড়ার পাল। দেখেছি জেলে পরিবার। হরিণের পায়ের ছাপ দেখে কী যে শিহরণ খেলেছে শরীরে। হতাশ নাজমূল হকের দেওয়া সান্ত্বনা—‘প্রকৃতির কাছে কিছু চাইতে হয় না, প্রকৃতি এমনি এমনি দেয়, যখন দেয় হাত ভরে দেয়।’ কেওড়ার বনের গভীরে হাঁটা তেমনি এক প্রাপ্তি। এমন সময়ে পেয়ে যাই একটা ইলিশের নাও। জাল থেকে সবে ইলিশ খুলছে। সে অবস্থায় এক হালি গ্রেড ইলিশ (৮০০ গ্রাম বা তার বেশি ওজনের ইলিশকে গ্রেড ইলিশ বলে) কিনে নেই ১২০০ টাকায়। আমাদের নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে ইলিশধরা দেখা ও টাটকা ইলিশ ভাজা খাওয়াও জীবনের অনেক ঘটনার অন্যতম এক স্মরণীয় ঘটনা!
.প্রয়োজনীয় তথ্য
নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চের যাত্রী হয়ে যান। লঞ্চ ফারহান-২ ও ৩ প্রতিদিন ঢাকা-হাতিয়া চলাচল করে। যাত্রা শুরুর সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা। হাতিয়ার তমরুদ্দি ভোর পাঁচটায় নেমে অটোরিকশা বা মোটরবাইকে চেপে দেড় ঘণ্টায় চলে আসুন মোল্লার ঘাট। এখান থেকে ট্রলারে বন্দরটিলা পাঁচ মিনিটের পথ। এরপর ১৫ বা ২০ মিনিটে নামার বাজার। চাইলে তমরুদ্দি বা হাতিয়া জাহাজ ঘাট থেকে সরাসরি ট্রলারে নামার বাজার চলে যেতে পারেন। নদীতে জোয়ার থাকলে সময় লাগবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। ট্রলার ভাড়া নেবে রিজার্ভ চার হাজার টাকার মতো।
এখানে খাবারের মান যেমনতেমন হলেও টাটকা মাছ ও দেশি মুরগি পাবেন। থাকার হোটেল আছে একটি। আছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো অবকাশ। আর বন বিভাগের বিশ্রামাগার, আর আছে নিঝুম দ্বীপবাসীর নিজস্ব কিছু আবাসিক ব্যবস্থা। বিদ্যুতের ব্যবস্থা বলতে সোলার আর জেনারেটর। জেনারেটর দেবে শুধু পানি তোলার জন্য। সুতরাং এসব সুবিধা-অসুবিধার কথা ভেবে আর ঢাকা থেকেই থাকার ব্যবস্থা করে তবে নিঝুম দ্বীপের যাত্রী হবেন। চাইলে নোয়াখালী হয়ে বাসেও নিঝুম দ্বীপ যেতে পারেন। হাতিয়ায় মহিষের দই খেতে ভুলবেন না।
আরেকটি কথা, নামার বাজার থেকে ছোট্ট একটি সেতু পেরিয়ে সামনে গেলে নিঝুম দ্বীপ সৈকতের দেখা পাবেন।
নিঝুম দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন চষে ফেরার সময় একবার হলেও সূর্যাস্ত দেখতে সৈকতে যাবেন!

দূরে কেওড়া বন
Categories
ফারুখ আহমেদ

মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে

 মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রে। মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে এবার আমরা চলে এলাম মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সামনের অংশে। এখানে বঙ্গবন্ধু হাত উঁচিয়ে বক্তৃতা করছেন। তখনই যেন তাঁর ভরাট কণ্ঠে ভেসে এল, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

মেহেরপুরের ছোট্ট শহর মুজিবনগর। ভোরবেলায় সেই শহরের সবুজ পথ ধরে হাঁটছি। সামনে দেখি উজ্জ্বল সবুজের মাঝখানে লাল রং। যেন আমাদের পতাকা। সেটিই আমাদের লঞ্চ। আমরা পাঁচজন—কণ্ঠশিল্পী শেখ শাহেদ, স্থপতি আসিফ হোসেন, আবু জাফর, অজয় রায় আর আমি। আমরা ঠিক যেন আলোর ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। আশপাশের সবটুকুই আমগাছে ঢাকা। সেসব গাছ ভেদ করেই পুরো এলাকা আলোর সমুদ্র হয়ে উঠেছে। আসলে রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে সূর্য টুক করে ওঠায় এমন আলোর নাচনের সৃষ্টি। রক্তিম আলো স্পর্শ করা জায়গাটি আম্রকানন। কেউবা আবার বলেন ‘আমবাগান’।
চমৎকার আমবাগানটির মালিক ছিলেন মেহেরপুরের ভবেরপাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। বৈদ্যনাথ বাবুর নামানুসারে জায়গাটির নাম হয়েছিল বৈদ্যনাথতলা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর আমবাগান বা বৈদ্যনাথতলায় প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সেই থেকে মেহেরপুরের এই জায়গাটার নাম হয় মুজিবনগর।১৯৯৬ সালে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ শুরু হয়। মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স দেখতে আগের রাতে এখানে আসা আমাদের। উঠেছি পিডব্লিউডির বিশ্রামাগারে। রাতটি ছিল অমাবস্যার। আমরা আমাদের বিশ্রামাগারে ব্যাকপ্যাক রেখেই ছুটেছিলাম স্মৃতিসৌধ দেখতে। রাতের অন্ধকারে স্মৃতিসৌধ কেমন দেখায়! সে রাতে স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে বসে যুদ্ধের গল্প করেছি অনেকক্ষণ। শুনে শুনে মনে হয়েছে, যুদ্ধ না করতে পারাটা জীবনের বড় অপূর্ণতা। স্মৃতিসৌধে বসে সেসব ভেবে বুকের মধ্যে কী এক অস্থিরতা কাজ করেছে। বারবার মনে হয়েছে আমি কেন মুক্তিযোদ্ধা হলাম না। বিশ্রামাগারে এসে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে ভোরে। শরতের সে ভোরে চোখ কচলে চলে আসি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে।
স্মৃতিসৌধে এসেই দেখা হয় সুভাষ মল্লিকের সঙ্গে। সুভাষ মল্লিককে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। সংবাদপত্রের মাধ্যমে সুভাষ মল্লিকের কথা সবার জানা। সাদামনের মানুষ সুভাষ মল্লিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নন। তবু স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর থেকেই নিয়মিত পুরো স্মৃতিসৌধ এলাকা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে পুরো স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স ঘুরে দেখি। তানভীর করিমের নকশায় তৈরি মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নিয়ে অনেক তথ্য জানান সুভাষ মল্লিক। ৩০ লাখ শহীদ, উদীয়মান সূর্য, একুশে ফেব্রুয়ারি আর সে সময়ের সাড়ে সাত কোটি জনতার প্রতিচ্ছবি এই মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। আমরা পুরো স্মৃতিসৌধ দেখে চলে এলাম মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে। এ নিয়ে কী বলব, আসলে চোখে দেখতে হবে। দেখতে দেখতে অস্ফুটে বলবেন ‘জয় বাংলা’।
বাংলাদেশের মানচিত্র নয়, এ যেন যুদ্ধদিনের বাংলাদেশ শুয়ে আছে। আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি, পলক পড়তে চায় না। এর মধ্যে আবু জাফরের ধাক্কা আগে চল। আমরা এগিয়ে চলি। মানচিত্রকে ঘিরে অনেক ডায়ওরামা (মডেল)। এমন একটি ডায়ওরামায় দেখা যায় পাকিস্তানি হানাদারেরা আক্রমণ করে ধ্বংস করেছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার। বিধ্বস্ত শহীদ মিনার দেখে পাশেই দেখতে পাই একই অবস্থায় আমাদের জাতীয় প্রেসক্লাব, সচিবালয়সহ পুলিশ লাইন, পিলখানা, বধ্যভূমি তুলে ধরা হয়েছে এসব ডায়ওরামার মাধ্যমে। আমরা এসব দেখে দেখে সদলবলে চলে আসি ওয়াচ টাওয়ারের ওপর। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখি স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্সের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ বাংলাদেশের মানচিত্র। আমাদের যুদ্ধকালীন অবস্থার রূপক। কোথায়, কোন এলাকায় যুদ্ধ হয়েছে, শরণার্থীরা কীভাবে সে সময় ভারত যান বা দেশ ছাড়েন সবই বোঝা যায়। মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর দেখানো হয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্রে। মানচিত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে এবার আমরা চলে এলাম মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের সামনের অংশে। এখানে বঙ্গবন্ধু হাত উঁচিয়ে বক্তৃতা করছেন। তখনই যেন তাঁর ভরাট কণ্ঠে ভেসে এল, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম…। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া সম্মেলন, মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, রাজাকার, আলবদর, আলশামসের সহযোগিতায় বাঙালি নারী-পুরুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা দেখে যেমন রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়ছিলাম, তেমনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য দেখে উচ্ছ্বসিত হলাম। খুশিতে আত্মহারা হয়ে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠলাম—জয় বাংলা।

.
যেভাবে যাবেন
বিজয়ের এ মাসে আপনিও মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কমপ্লেক্স ঘুরে আসতে পারেন। মেহেরপুর জেলা সদর থেকে মুজিবনগর আধঘণ্টার পথ। ঢাকা থেকে মেহেরপুর সরাসরি বাস চলাচল রয়েছে। ঢাকার গাবতলী থেকে মেহেরপুরের বাস ছাড়ে। মেহেরপুর থাকার জন্য মিতা, কামাল ও ফিন টাওয়ারসহ ভালো কিছু আবাসিক হোটেল পাবেন।