Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

হাজারো ঢেউ খেলানো পাহাড়ের চূড়ায়

বান্দরবানের এমন সৌন্দর্য জুড়িয়ে দেবে আপনার মন-প্রাণ। ছবি: জিয়া ইসলাম

ম্যালেরিয়া না হওয়ার ওষুধ খেয়ে নিয়ে বউ-বাচ্চা আর খালা-খালুর বিশাল লটবহর নিয়ে ডিসেম্বরের এক কাকডাকা ভোরে রওনা দিলাম বান্দরবানের দিকে…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন মিলন

 

‘ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক কী?’ ফেসবুকে এই স্ট্যাটাস দিয়ে রীতিমতো বিপদে পড়ে গেছি। ৭৯টা লাইক আর ৩৬টা ‘গেট ওয়েল সুন’ বলে বন্ধুদের মন্তব্য। অফিসের সহকর্মীরা চাঁদা তুলে আপেল, কমলা আর এক বোতল মেয়াদোত্তীর্ণ বিদেশি ফলের রস নিয়ে উপস্থিত হলো আমাকে দেখতে। আমাকে হাঁটতে-চলতে দেখে তারা একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। আসলে বান্দরবান যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওখানকার মশার কামড়ে নাকি ম্যালেরিয়া হয়। তাই ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক খুঁজছিলাম। আর বন্ধুরা ভেবেছে আমার বুঝি ম্যালেরিয়াই হয়েছে। কী আর করা, ম্যালেরিয়া না হওয়ার ওষুধ খেয়ে নিয়ে বউ-বাচ্চা আর খালা-খালুর বিশাল লটবহর নিয়ে ডিসেম্বরের এক কাকডাকা ভোরে রওনা দিলাম বান্দরবানের দিকে।

হাজির হলাম মিলনছড়ির রিসোর্টে। ছিমছাম পরিপাটি রিসোর্টটায় পা দিয়েই মন ভালো হয়ে গেল। রেস্তোরাঁর বিশাল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম দিগন্তের দিকে। দৃষ্টিসীমা আটকে যায় হাজারো ঢেউ খেলানো পাহাড়ের চূড়ায়। পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে যেই না ধোঁয়াওঠা চায়ে চুমুক দিতে যাব, অমনি পেছন থেকে বড় খালার গলা ভেসে এল। গিজারে গরম পানি আসছে না—এই নিয়ে ম্যানেজারের সঙ্গে ঝামেলা বাধিয়ে ফেললেন। চায়ের কাপ ফেলে রেখেই ছুটলাম ঝগড়া মেটাতে। এরপর বেরিয়ে পড়লাম বান্দরবান শহর ঘুরতে।

ছোট্ট ছিমছাম শহর। হেঁটে বেড়াতেই ভালো লাগে, নানা রঙের মানুষ। এর মধ্যে রাস্তার পাশে আধুনিক দোকানপাটে এক তরুণী বিক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষি চালিয়ে যাচ্ছেন আমার খালা। আর আমিও এই সুযোগে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর চষে বেড়াতে। পরদিন ঘোরাঘুরি করার জন্য গাড়িও তো ঠিক করতে হবে।

ঘুম ভাঙল খুব ভোরে, হাজারো পাখির কিচিরমিচিরে কান পাতা দায়। যেন এক পাখির দেশে চলে এসেছি। ভোর হচ্ছে বান্দরবানে। সারা রাতের তীব্র শীতে জমে যাওয়া মেঘগুলো পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আশ্রয় নিয়েছে। সূর্যের উষ্ণতা পেয়ে উড়ে যাচ্ছে আকাশ ছুঁতে। এ এক অপার্থিক দৃশ্য। ঘুম থেকে উঠে মেয়েটা যে কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টেরও পাইনি।

— বাবা, আমরা কি আকাশের কাছে চলে এসেছি?

— কেন রে মা?

— ওই যে দেখো, মেঘগুলো আমাদের নিচে।

— তাই তো! ঠিক বলেছ, আমরা আকাশের কাছে।

এরই মধ্যে খোলা জিপ চলে এল আমাদের নিতে। যাকে বলে চান্দের গাড়ি। গাড়ি দেখেই খালার চোখমুখ কুঁচকে গেল। এ কেমন গাড়ি রে বাবা! আমি তো ভেবেছিলাম এসি গাড়ি হবে। এ গাড়িতে যাব না। শেষে বহু কষ্টে খালাকে রাজি করিয়ে বসিয়ে দিলাম চালকের পাশের আসনে আর আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখেমুখে বাতাসের ঝাপটা মেখে নিচে ছুট লাগালাম বান্দরবান।

প্রথমেই গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল মেঘলা পর্যটনের গেটে। ছিমছাম সাজানো-গোছানো এক পর্যটনকেন্দ্র, যার মূল আকর্ষণ এর কৃত্রিম হ্রদ আর হ্রদের ওপর দিয়ে বানানো ঝুলন্ত সেতু। ঢাকা শহরের অত্যাধুনিক সব রাইডে চড়া শিশু-কিশোররাও এখানকার সাদামাটা পার্কটিতে ঘুরে বেশ ভালোই আনন্দ পাবে। হ্রদ, ঝুলন্ত সেতু, পাহাড়ি পথ বেয়ে হেঁটে চলে বেশ অনায়াসে কেটে গেল বান্দরবানের মিষ্টি সকালটা।

পরের গন্তব্য শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের নীলাচল স্পট। টাইগার পাড়ার এই স্থানটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট ওপরে। আর তাই এখান থেকে পুরো শহরটাকে দেখা যায়। ভালো লাগে। আরও ভালো লাগল বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পবিত্র গোল্ডেন টেম্পল। অসাধারণ এর নির্মাণশৈলী। কেমন যেন শান্তি লাগে এখানে। চিম্বুক, নীলগিরি যাওয়ার পথেই আমাদের রিসোর্ট পড়ে। চটপট স্থানীয় মেনুু দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়েই ছুটলাম সেদিকে। পথে খানিকটা যাত্রাবিরতি শৈলপ্রপাতে। স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ আর ঠান্ডা জল নেমে আসছে শৈলপ্রপাতের গা বেয়ে। স্থানীয় বোম নারীরা সেই পানিতেই সেরে নিচ্ছে গেরস্থালির কাজকর্ম।

গাড়ির পেছনের অংশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চিম্বুক যাচ্ছি আমরা। শোঁ শোঁ বাতাসে চোখ খোলা দায়। আঁকাবাঁকা পথে রোলার কোস্টারের মতো চলল আমাদের গাড়ি। একেকটা বাঁক পেরোয় আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি সবাই। এই পথ চলাতেই আনন্দ। এলোমেলো চুল আর মুখভর্তি হাসি নিয়ে হাজির হলাম চিম্বুকে। চারপাশের পাহাড়গুলো যেন আরও কাছে। দূরে বয়ে চলা সাংগু নদী ফিতার মতো বয়ে চলেছে। শহুরে মানুষগুলো মুঠোফোনের সিগন্যাল পাওয়ার জন্য এদিক-সেদিক ঘুরছে। হায়রে।

আর আমরা আরও একবার হইচই করতে করতে পৌঁছে গেলাম নীলগিরিতে। আহ, কেমন শান্তি শান্তি ভাব পুরো এলাকাজুড়ে। এখানকার রিসোর্টে একবার না থাকলে এর সৌন্দর্য পুরো উপভোগ করা যাবে না। এটা বোধ করি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি। চারপাশটা হেঁটে বেড়াতে মুগ্ধ হই বান্দরবানের সৌন্দর্যে। কী নেই এখানে? নানা রঙের মানুষ, নানান ভাষার মানুষ, সাংগু আর মাতামুহুরী নদী বয়ে চলে এর বুক চিরে।

এখানে কেওক্রাডং আছে, তাজিং ডং আছে। আরও আছে বগা লেক, নাফাখুম জলপ্রপাত ও লাইখ্যানগিরি ঝরনা।

সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্রুত। পাখিরা ব্যস্ত ঘরে ফিরতে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে মেঘ জমা শুরু করেছে। ঠান্ডা হিমেল হাওয়া গাঁ ছুয়ে হারিয়ে যায় অন্য কোনো গিরিখাদে। হঠাৎ করেই চোখ পড়ল খালার মুখের দিকে। খালা কাঁদছেন।

— খালা কাঁদছেন কেন?

— দেখেছ, আমাদের দেশটা কত সুন্দর।

— দূর, এটা আবার সুন্দর হলো নাকি? আপনিই তো বললেন দার্জিলিং অনেক সুন্দর।

— আমি ভুল বলেছি। দার্জিলিং দেখে বুকটা হু হু করে ওঠে না। চোখ বেয়ে পানি আসে না।

— খালা চলেন, অন্ধকার হয়ে আসছে।

— চলো। আর শোনো, আমি কিন্তু জিপের পেছনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে করতে যাব।

Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

যে পাহাড়ের ওপর কোনো নীল আকাশ নেই

সময় পেলে সন্তানকে নিয়ে একটু বেরিয়ে আসতে পারেন। ছবি: লেখক

বেচারা তো তার এই ছোট্ট জীবনে কোনো দিন নিজের ছায়াই দেখেনি। রোদ কি জিনিস তাই তো সে জানে না। এই নগরে উঁচু ইমারতের ভিড়ে আজ শিশুরা আকাশ দেখে না, রোদ খেলা করে না তাদের বাড়ির বারান্দায়…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন মিলন

কয়েক দিন আগে খুব সকালে মেয়ে এসে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-বাবা, আজকে কি রাস্তায় গ্যাঞ্জাম হবে?
হুম
আমরা কি বেড়াতে যেতে পারি?
– না
– আইসক্রিম খেতে?
– না
– ফুপির বাসায়?
– না
– সারা দিন কি আমি ‘বন্দী কারাগারে’ গানটি গাইতে হবে?
– হু

মেয়ে মন খারাপ করে চলে গেল নিজের ঘরে, জোরে জোরে গাইতে লাগল ‘আমি বন্দী কারাগারে…।’ আর আমি গান শুনতে শুনতে গভীর আবেশে দ্বিতীয় দফা ঘুমে ঢলে পড়লাম।

দুপুরে মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখি পাহাড় আর নদীর ছবি আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে গেছে। যে পাহাড়ের ওপর কোনো নীল আকাশ নেই, সেই আকাশে কোনো পাখি নেই। নদীর জলে কোনো নৌকা নেই। জলের রংটাও কেমন যেন অচেনা। মনে মনে এক অজানা আশঙ্কা পেয়ে বসে আমাকে। এ কেমন আকাশ আঁকছে আমার মেয়ে। তবে কি সে কোনো দিন নীল আকাশ দেখেনি? নীল আকাশে উড়ে বেড়ানো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখেনি? নদীর টলমলে জলে পালতোলা নৌকা দেখেনি? মনে পড়ে গেল এক বন্ধুর তিন বছর বয়সী শিশুপুত্রের কথা। শিশুটি গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের গেট পর্যন্ত যেতে নিজের ছায়া দেখে ভয়ে কেঁদে উঠত, যেদিন সকালে আকাশ মেঘলা থাকে সেদিন সব ঠিকঠাক। শিশুর আর কি দোষ? বেচারা তো তার এই ছোট্ট জীবনে কোনো দিন নিজের ছায়াই দেখেনি। রোদ কি জিনিস তাই তো সে জানে না। এই নগরে উঁচু ইমারতের ভিড়ে আজ শিশুরা আকাশ দেখে না, রোদ খেলা করে না তাদের বাড়ির বারান্দায়।

একসময় বেড়াতে যাওয়া মানে নানা বা দাদাবাড়ি যাওয়া। আর ধারেকাছে বিনোদন বলতে শিশুপার্ক আর চিড়িয়াখানা। জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখেছি এসএসসি পাস করার পর। এখন আর সে দিন নেই। দিন বদলেছে, শিশুরা এখন অনেক স্মার্ট। আমাদের সময় বেড়াতে নিয়ে না গেলে খানিকক্ষণ হাউমাউ করে কেঁদেকেটে আবার সব ভুলে যেতাম। আর এখন বাচ্চারা কিছুই ভোলে না। নিজেদের বিনোদন নিজেরাই খুঁজে নেয়, কখনো কখনো সেটা বিপদ ডেকে আনে।

তাই আসুন আপনার-আমার শিশুকে সুস্থ বিনোদন দিই। চলুন ওদের নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ি। এখনকার বাচ্চারা অনেক ব্যস্ত। ছুটি বলতে ফাইনাল পরীক্ষার পর মাস খানেক। এই ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে যান কক্সবাজার। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতটা যে বিশ্বের দীর্ঘতম তা কেবল ইন্টারনেট বা বইপত্রে পড়লে হবে? ছেড়ে দিন ওদের বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে, ভেজা বালু দিয়ে বানাক ওরা হাতিঘোড়া রাজপ্রাসাদ। সাগরের নোনাজলে ইচ্ছামতো হুটোপুটি করুক, দু-এক ঢোক লবণপানি না হয় খেল। প্রতিদিন তো আর খাবে না।

আরও খানিকটা এগিয়ে ওদের নিয়ে চলুন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। বঙ্গোপসাগরের স্বচ্ছ নীল জল কেটে কেটে যখন জাহাজ এগিয়ে যাবে দ্বীপের দিকে, নিজের সন্তানের মুখের দিকে একবার তাকান, দেখবেন আনন্দে কেমন চিক চিক করছে ওর কচি মুখটা।

কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বেড়ানো হলে একবার চলুন সুন্দরবন ঘুরে আসি, বাংলাদেশের আরেক গর্বের ধন রয়েলবেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলার গ্যালারিজুড়ে হাজারো শিশুকিশোর মুখে বাঘের ছবি এঁকে গায়ে বাঘের ছবি আঁকা গেঞ্জি পরে, হাতে বাঘের পুতুল নিয়ে ভিড় করে। নিজের কিশোর সন্তানকে বলুন ‘চলো, দেখে আসি আসল বাঘ’, ঢাকা থেকে অনেক টুর অপারেটর নিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন ঘুরিয়ে আনতে। ঢুকে পড়ুন কোনো এক দলে।

ভোরে কুয়াশায় ঢাকা বনের জেগে ওঠা, গাছের অনুচ্চ ডালে বসে থাকা নিরীহ মাছরাঙার চোখের পলকে ছোঁ মেরে মাছ ধরা, নদীর পারে রোদ পোহানো কুমির, …সাদা বকের দলের অনায়াস উড়ে বেড়ানো, হরিণের দলের নজর বাঁচিয়ে ওদের আরও কাছে যাওয়া, নরম মাটিতে বাঘমামার পায়ের ছাপ দেখে গা ছমছম অনুভূতি তো আর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।

এসবে যে কত আনন্দ, শিশুদের কত কিছু শেখা হয় তা আমি নিজেই বুঝেছি গত নভেম্বরে। আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গিয়েছিলাম সিলেট অঞ্চলে। সেখানে চলে যাই জাফলংয়ের দিকে। জাফলংয়ের স্বচ্ছ পানি, নিচে রকমারি পাথর দেখে আমার বাচ্চাদের চোখও নদীর পানির মতো চিকচিক করে ওঠে। লালাখালে নৌকায় তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াই। সারি নদীর…জলে ভাসতে ভাসতে ওদের প্রকৃতি দেখাই। চা-বাগান দেখিয়ে আনি। মাধবকুণ্ড ঝরনা দেখাই।

শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন আর সিলেট অঞ্চল কেন? সন্তানদের ঘুরিয়ে আনুন বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল। ওরা দেখুক, জানুক, বাংলাদেশ বলতে কেবল ঢাকা শহরটাকেই বোঝায় না। মনে রাখবেন, ওরা যত বেশি দেশটা দেখবে, তত বেশি দেশটাকে ভালোবাসবে। যে দেশকে ভালোবাসে, সে কোনো অন্যায় করতে পারে না।

Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

ঘন সবুজ পাইন বনের ভেজা বাতাস

 

পাখিদের কোলাহল কেবলই বাড়ছে। কান পাতা দায়, খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক করে দিল পাখিগুলো। এর ফাঁকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াটা টকটকে লাল হয়ে গেল। সেই লাল ছড়িয়ে পড়ল গোটা চূড়াতে। তারপর কমলা থেকে হলুদ, শেষে ধবধবে সাদা পাহাড়টা দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে, যেন কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন

রিশপে এসেছি দুদিন হলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে রিশপ। এখানে আসার পরদিন ভোরে মেঘের জন্য সূর্যোদয়ের সময় সোনারাঙা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়নি। মেঘের ওপর খানিকটা অভিমান নিয়েই ভোরে রিশপ ট্যুরিস্ট লজের উঠোনে চেয়ার পেতে বসে আছি আরও একটি সূর্যোদয়ের জন্য। চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেন সবাই অপেক্ষা করছে আমার মতো। হালকা সাদা হয়ে আসছে চারপাশ। পাখিগুলোর ঘুম ভাঙছে এর সঙ্গে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া কাঁপন ধরিয়ে দেয় দেহে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি দিগন্তের দিকে।

কাঞ্চনজঙ্ঘাটা ওখানেই কোথাও আছে। পাখিদের কোলাহল কেবলই বাড়ছে। কান পাতা দায়, খানিকক্ষণ অন্যমনস্ক করে দিল পাখিগুলো। এর ফাঁকেই কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াটা টকটকে লাল হয়ে গেল। সেই লাল ছড়িয়ে পড়ল গোটা চূড়াতে। তারপর কমলা থেকে হলুদ, শেষে ধবধবে সাদা পাহাড়টা দাঁড়িয়ে গেল চোখের সামনে, যেন কোনো এক জাদুর কাঠির স্পর্শে ঘুম ভেঙে উঠল। আমি তাকিয়েই রইলাম, তাকিয়েই রইলাম।

রিশপের পরের পাহাড়টাই পেডং। শান্ত নিরিবিলি জনপদ। আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ বেয়ে পেডংয়ে আসতেই সকালের নাশতা হজম হয়ে গেল। আমরা যাব পেডং থেকে ১৭ কিলোমিটার নিচের ঋষি নদীর পারের ঋষি ইকো ট্যুরিজম রিসোর্টে। আগে থেকে বুকিং না দিয়ে চলে এসেছি, সঙ্গে সেবাস্টিন প্রধানের ফোন নম্বর। ভাবলাম পেটে কিছু দানাপানি দিয়ে নাহয় জিপে উঠি। হোটেলে ঢুকে অর্ডার দিলাম।

ভাই, ডিম হ্যায়?

ক্যায়া?

মানে আন্ডা আছে?

ক্যায়া?

আরে ভাই ডিম ডিম, মানে আন্ডা আন্ডা।

এবার বুঝল হোটেলের বেয়ারা। ডিম-রুটি খেয়ে হেঁটে হেঁটে সোজা জিপ স্ট্যান্ডে। চলল তুমুল দরদাম। সব ড্রাইভার একজোট, আর আমি যেন এক বেচারা।

শেষে বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। সেবাস্টিন প্রধানের নাম বলতেই জোট ভেঙে গেল দ্রুত। আমি সেবাস্টিনের বন্ধু জানাতেই ৩০০ রুপির ভাড়া হয়ে গেল ২৫০ রুপি আর ড্রাইভারের গোমড়া মুখ হয়ে গেল উজ্জ্বল হাসিমাখা। ১৭ কিলোমিটার পথ গড়াতে গড়াতে এসে থামলাম সিকিমের চেকপোস্টে। ইকো ট্যুরিজম রিসোর্ট পশ্চিমবঙ্গ আর সিকিম সীমান্তে। সিকিমের চেকপোস্ট দিয়ে ঢুকে একটা নদীর সেতুর পার হয়ে রিসোর্টেযেতে সময় কম লাগে।তাই সিকিম চেকপোস্টে আসা।বাংলাদেশিদের সিকিমে ঢুকতে বিশেষ অনুমতি লাগে, যেটা আমার নেই। তাই নিজের পরিচয় লুকিয়ে সিকিম ঢোকার চেষ্টাই করলাম না। ফোন দিলাম সেবাস্টিনকে। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই হাজির ছিপছিপে গড়নের এক শক্তপোক্ত লোক। চেকপোস্টে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। গার্ডগুলো বেশ হাসিমুখেই আমাকে ঢুকতে দিল। পাঁচ-সাত মিনিট হেঁটে তারপর ছোট একটা কাঠের সেতু পেরিয়ে আবার পা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে। নদীর পাড় ধরে খানিকটা হেঁটে এসে পৌঁছালাম রিসোর্টের আঙিনায়। ‘রিসোর্ট’ শব্দটির মধ্যে যে রকম ভারিক্কি একটা ব্যাপারস্যাপার আছে, তার কিছুই নেই এখানে। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা রকমের ঘর। আর মাঝখানে একচিলতে উঠান। এর এক পাশ দিয়ে বয়ে চলছে তিস্তার ছোট্ট একটা শাখা নদী। কত চওড়াই বা হবে, এই ধরুন ২০-২৫ ফুট। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি, কিন্তু কী যে তার গর্জন। বড় বড় পাথরকে কোন মুলুক থেকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে এখানে কে জানে? উঠোনের অন্য পাশটা পাহাড়ি বন। ঘন সবুজ পাইন বনের ভেজা বাতাস দূর করে দেয় সব ক্লান্তি।

দুপুরটা কেটে গেল ঋষি নদীতে মাছ ধরে আর হাঁটুপানিতে হুটোপুটি করে। ঋষি নদী দিয়ে বয়ে চলা হিমালয়ের বরফ গলা কনকনে ঠান্ডা পানি হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে দিল। দুপুরের খাবারের মেনুতে ঠাঁই পেল নদীতে ধরা ছোট ছোট মাছ ভাজা, সবজি আর ডাল। ছিমছাম পরিবেশে ছিমছাম খাওয়া। বিকেলে ঘুরে বেড়ালাম নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে।

ঋষিতে সন্ধ্যা নেমে এল ঝুপ করে। কুপি আর হারিকেনের মিটিমিটি আলোতে অদ্ভুত এক আলো-আঁধারি পরিবেশ। হাজার হাজার পাখি ঘরবাড়ি নিয়ে ঝগড়া করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দুই পাশে পাহাড় আর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে বসে আছি সেবাস্টিন প্রধানের সঙ্গে।

সেবাস্টিনের পুরো নাম সেবাস্টিন সত্য প্রকাশ সাঙে চোগিয়াল প্রধান। জন্ম তাঁর খ্রিষ্টান পরিবারে। যুবক বয়সে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নেন, আর এখন বৌদ্ধ। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এর কারণ বললেন ‘আগে খেয়ে নাও তারপর শুনো।’ রাতের মেনু বেশ ভারী। গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে মুরগির ঝোল, সবজি আর ডাল। খোলা আকাশের নিচে হারিকেনের আলোয় ঠান্ডায় জমে যাওয়া হাত গরম ভাতের সঙ্গে উষ্ণতা খুঁজে নিল।

সেবাস্টিনের গল্প শুরু হয়। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি, কীভাবে একটা লোক পাল্টে দেন একটা গোটা জনপদ। কীভাবে একটা লোক নিজ হাতে পরিষ্কার করেন পেডংয়ের রাস্তার জঞ্জাল, কীভাবে ঘোরের মাঝে উড়ে বেড়ান হিমালয়ের ওপর।

রাতের আকাশে লক্ষ কোটি তারা মিটমিট করছে।রাত গভীর হয়। নদীর পথগুলোর শব্দ আরও তীব্র হয়। ঠান্ডা হাওয়া জেঁকে ধরে চারপাশ থেকে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসে পাহাড়ি পোকার তীক্ষ ডাক। সেবাস্টিনের কানে কিছুই পৌঁছায় না, সেবাস্টিন ঘোর লাগা মানুষের মতো গল্প বলেই যায়, বলেই যায়।

Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

আজীবন জমিয়ে রাখা স্মৃতি পেতে

সিলেটের বিছানাকান্দি ছবি: এস এম রেজোয়ান

বেড়ানোর কথা উঠলেই প্রথম যে প্রশ্নাটা মাথায় আসে তা হলো কোথায় যাব? ইউরোপ নাকি আমেরিকা? সিঙ্গাপুর নাকি থাইল্যান্ড? নেপাল নাকি ভুটান? আমি বলি আগে নিজের দেশ ঘুরুন, তারপর নাহয় অন্য দেশে গেলেন…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন

ছোটবেলায় আমার বাবা আমাকে কোনো দিন কক্সবাজার নিয়ে যাননি। কক্সবাজার বলে যে কোনো জায়গা আছে, তা–ই জেনেছি অনেক পরে। বাবা আমাদের দাদাবাড়ি নিয়ে যেতেন। লঞ্চের রেলিং ধরে আমাদের চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে ইলিশ মাছ ধরা দেখাতেন। পাশাপাশি বয়ে চলা পদ্মার স্বচ্ছ আর মেঘনা নদীর ঘোলা জল দেখিয়ে আমাদের অবাক করে দিতেন।
আমি এখন অনেক বড় হয়েছি, কিন্তু আজও আমি লঞ্চের রেলিং ধরে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকি। ইলিশ ধরা জেলেনৌকা খুঁজি। পদ্মা–মেঘনার দুই রঙের পানি দেখে আজও ছেলেমানুষি উত্তেজনায় ভুগি। বাবার মুখটা মনে পড়ে। আমার চোখের অবাক দৃষ্টি দেখে তাঁর খুশি হওয়া মুখটা মনে পড়ে।
আমার মেয়েটা তখন অনেক ছোট। রাতের বাসে কক্সবাজার যাচ্ছি। মেয়ে একটু পরপর জিজ্ঞেস করে, বাবা, আমরা এখন কোথায়? কুমিল্লা। কুমিল্লা কি বাংলাদেশে? হু।
আবার একটু পর, বাবা, আমরা কি এখনো বাংলাদেশে? হু। আমরা কখন কক্সবাজার দেশে যাব? সকাল হলেই চলে যাব।
বেচারি বাবার ঊরুর ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে চোখ খুলেই সে সাগর দেখে। চিৎকার করে বলে—বাবা দেখো, বাবা দেখো কত্তগুলো পানি। মেয়ের খুশি দেখে আমার মন ভরে যায়।
এই আনন্দ আর এই আজীবন জমিয়ে রাখা স্মৃতি পেতে বেড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
বেড়ানোর কথা উঠলেই প্রথম যে প্রশ্নাটা মাথায় আসে তা হলো কোথায় যাব? ইউরোপ নাকি আমেরিকা? সিঙ্গাপুর নাকি থাইল্যান্ড? নেপাল নাকি ভুটান? আমি বলি আগে নিজের দেশ ঘুরুন, তারপর নাহয় অন্য দেশে গেলেন। পরের প্রশ্ন—দেশে কি বেড়ানোর জায়গা আছে? বলি, আছে মানে? এক জীবনে ঘুরে শেষ করা যাবে না আমাদের দেশ। চলুন বাংলাদেশের দক্ষিণের শেষ ভূখণ্ড সেন্ট মার্টিন দ্বীপ দিয়ে শুরু করি।
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন বা নারিকেল জিঞ্জিরা দেখতে গেলেই পথিমধ্যে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার দেখা হয়ে যায়। মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ বেলাভূমি সাগরের আলতো ঢেউয়ে ভিজে যায় বারবার। আপনিও পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভিজুন এর ফেনিল জলে। তীর ধরে জিপে চড়ে বেড়িয়ে আসুন হিমছড়ি, নিরালা ইনানি, স্পিড বোটে করে বেড়িয়ে আসুন মহেশখালী দ্বীপ, নয়তো চলে যান কুতুবদিয়া। দেখে আসুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উইন্ডমিল। ঘুরে বেড়ান ঝিনুক মার্কেট, রামুর বৌদ্ধমন্দির। এ ছাড়া শহরের কেন্দ্রস্থলে বার্মিজ মার্কেট তো আছেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সৈকত শহরে দুটো দিন কীভাবে কেটে যাবে টেরও পাবেন না।
কক্সবাজারের পাট চুকিয়ে এক ভোরে বেরিয়ে পড়ুন সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে। তবে আপনার প্রথম গন্তব্য হবে কক্সবাজার থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের টেকনাফ। যেখানে অপেক্ষা করবে সাগরপাড়ি জাহাজ। সাধারণত নয়টা থেকে দশটার মধ্যে ছাড়ে। বাংলাদেশ আর মিয়ানমারের সীমানা নির্দেশকারী নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে জাহাজগুলো দুই আড়াই ঘণ্টায় আপনাকে নিয়ে যাবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। নারকেলগাছে ছাওয়া দ্বীপটি আপনার নজর কেড়ে নেবে প্রথম দর্শনেই। দ্বীপে নেমে তৃষ্ণা জুড়ান মিষ্টি ডাবের পানিতে। তারপর বেরিয়ে পড়ুন ঠিকানার উদ্দেশে। এখানকার প্রায় বেশির ভাগ হোটেলই সাগর মুখ করে তৈরি। ফলে যেখানেই থাকুন না কেন সাগর আপনার দৃষ্টিসীমা ছেড়ে যাবে না কখনোই।
রাতের আঁধারে মুখোমুখি হোন সাগরের। দেখুন ঢেউগুলো কেমন ফসফরাস জ্বালিয়ে ভেঙে পড়ে তীরে। রাতের আকাশকে আবিষ্কার করুন নতুন করে। এখানে মাছের বাজারটা বসে জেটির ধারে সকাল সকাল। চাইলে নিজেরাই বাজার করুন পছন্দমতো। যদি এক–দেড় কিলোগ্রামের লবস্টার পান তবে তো কথাই নেই। দ্বীপটাকে নিজের মতো করে দেখতে হাঁটাপথে ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়ার বিকল্প নেই। এক পার ধরে গিয়ে অন্য পার হয়ে ফিরে আসতে সময় লাগবে চার-পাঁচ ঘণ্টা। তবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে গেলে সে ভিন্ন হিসাব।
চলুন এবার বান্দরবান ঘুরে আসি। চট্টগ্রাম থেকে ৯২ কিলোমিটার দূরে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য বান্দরবান। এখানে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ নিই। আছে স্বচ্ছ টলটলে জলের সাঙ্গু নদী, আছে বগা লেক, রুমা বাজার, চিম্বুক পাহাড় আর নয়নাভিরাম নীলগিরি পাহাড়। আছে নীলাচল পাহাড়, আছে স্বর্ণমন্দির আর আছে স্থানীয় আদিবাসীদের আতিথেয়তা। যদি অ্যাডভেঞ্জার পছন্দ করেন, তবে দেখে আসুন ঋজুক ঝরনা, রেমাক্রি হয়ে চলে যান নাফাখুম জলপ্রপাত দেখতে।

রাতারগুল

রাঙামাটি নামটার মধ্যেই একটা অন্য রকমের জাদু আছে। আর সেই জাদুর টানে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় করে সেখানে। ঘন সবুজ পাহাড়ি বনাঞ্চল, নয়নাভিরাম কাপ্তাই হ্রদের সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও তাদের জীবনধারা রাঙামাটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। রাঙামাটি ভ্রমণে ঘুরে দেখতে পারেন আদিবাসী জাদুঘর, কাপ্তাই হ্রদের ওপর ঝুলন্ত সেতু, রাজবন বিহার বৌদ্ধমন্দির। নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ান কাপ্তাই হ্রদে। দেখে নিন চাকমা রাজার বাড়ি, শুভলং ঝরনা। তবে হ্রদের মাঝে দ্বীপের ওপর পেডা টিং টিং নামের বেস্তোরাঁয় এক বেলা খেতে ভুলবেন না। কাপ্তাই লেকের টাটকা মাছের স্বাদ মনে থাকবে কত দিন।
পার্বত্য তিন জেলার দুটোই আপনি ঘুর ফেললেন, তখন রইল বাকি খাগড়াছড়ি। এ শহরটা শুধু হেঁটে ঘুরে বেড়াতেও ভালো আগে। যদি কিছুক্ষণের জন্য গুহাবাসী হতে মন চায় তবে চলে যান আলুটিলা গুহায়। আপনার এক হাতে থাকবে মশাল আর আরেক হাতে সন্তানের হাত। অন্ধকারের গা–ছমছমে পরিবেশে আপনার সন্তান শক্ত করে ধরে থাকবে আপনার হাত। ভাবা যায়? এ ছাড়া রয়েছে বৌদ্ধবিহার আর ঝরনা। তবে হালের সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো এর সাজেক ভ্যালি। এক রাত থাকতেই হবে এখানে। থাকার জন্য সেনাবাহিনীর বিসোর্ট ছাড়াও স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি তো রয়েছেই।
এবার দলবেঁধে যাওয়া যাক সুন্দরবন। ঢাকা থেকে চলে যান খুলনা বা মংলা। পথে দেখে নিতে পারেন বাগেরহাটের খান জাহান আলীর মাজার আর এর বিশাল দিঘি। দেখে নিন ষাটগুম্বুজ মসজিদ। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দেখে নিতে পারেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি আর এর সংলগ্ন জাদুঘর। শান্ত–সুন্দর এর পরিবেশ আপনার ভালো লাগবে।
বাংলাদেশের একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন। চমৎকার জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই বনের ঘন সবুজ বনাঞ্চলের ছায়ায় ঘুরে বেড়ায় বাঙালির অহংকার রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ আরও অনেক প্রাণী। ভোরের প্রথম আলোয় নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান সরু খালের জলে, উপভোগ করুন ঘুমভাঙা জঙ্গলটাকে। সারাটা দিন কাটিয়ে দিন লঞ্চে করে নদী বেড়িয়ে, জেলেপল্লিতে ঘুরেফিরে। রাতে নাহয় নৌকা নিয়ে আরেকবার বেরিয়ে পড়লেন সরু খালে অ্যাডভেঞ্জারের সন্ধানে। বিস্তীর্ণ সাগরসৈকতে হৈ-হুল্লোড় করে সমুদ্রস্নানটাই বা বাদ যাবে কেন?
চলে যেতে পারেন সিলেটের দিকে। পুরো সিলেট বিভাগে রয়েছে অসংখ্য বেড়ানোর স্থান। তবে চা–বাগানের রাজ্য শ্রীমঙ্গলের জুড়ি নেই। বিস্তীর্ণ চা–বাগানের গাঢ় সবুজ প্রকৃতি মন কেড়ে নেবে মুহূর্তেই। শ্রীমঙ্গলে দেখতে পারেন লাউয়াছড়া অভয়ারণ্য। আবার শীতের পাখি দেখতে যাওয়া যায় বাইক্কার বিল। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় হলে দেখে আসুন হামহাম ঝরনা।

সাজেক ভ্যালি, খাগড়াছড়ি

সিলেট শহরটাকে কেন্দ্র করে দেখে নিতে পারেন বিছানাকান্দি, জাফলং বা রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। বিছানাকান্দির অগভীর শীতল জল যেমন গা জুড়িয়ে দেবে, অন্য দিকে রাতারগুলোর পানির ওপরে জেগে থাকা বন দেখে শিহরিত হবেন। এর বাইরে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত তো সেই ছোটবেলার পাঠ্যপুস্তক থেকেই আমাদের মনে গেঁথে আছে। উফ, শুধু এই কয়েকটা জায়গার কথা লিখতেই বরাদ্দকৃত স্পেস শেষ হয়ে গেল। এখনো তো নিঝুম দ্বীপ, কুয়াকাটা, উত্তরবঙ্গসহ বাকি বাংলাদেশের কথা তো বলাই হলো না। সে নাহয় অন্য দিন বলা যাবে। শুধু এটুকুই বলব, চলুন বেরিয়ে পড়ি। নিজের সন্তানকে নিজের দেশ দেখাই। নিজের দেশের মানুষ দেখাই। দেশকে ভালোবাসতে শেখাই, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শেখাই।
আসুন, সুখস্মৃতি সংগ্রহ করি।

Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

দূরত্ব ঘোচানোর সবচেয়ে ভালো উপায়…

বেড়াতে গিয়ে সন্তানকে বেশ ভালো সময় দিতে পারেন। ছবি: সংগ্রহ

আজকাল এই নগরজীবনে এমন অনেক পরিবারই আছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। জিজ্ঞেস করলে সবাই বলবেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই চাকরি করছেন। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি যে আমরা সন্তানের কোন ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি?…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন

ছুটির দিন। ভোরে মেয়ে এসে ঢুকল আমার ঘরে।
‘বাবা, আমরা কি আজকে বেড়াতে যেতে পারি?’
‘না।’
‘ফুপির বাসায়?’
‘বললাম তো না। কেন বিরক্ত করছ?’
‘তাহলে কি ক্রিম অ্যান্ড ফাজে আইসক্রিম খেতে যেতে পারি?’
‘তুমি যাবে এ ঘর থেকে।’ ধমক লাগালাম।
মেয়ে চলে গেল নিজের ঘরে। ওর গোমড়ামুখটা দেখতে পাইনি। শুধু পাশের ঘর থেকে ওর গান শুনতে পাচ্ছি। ‘আমি বন্দী কারাগারে…’ গান শুনতে শুনতে আমিও পাশ ফিরে দ্বিতীয় দফা ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম। পাশে তাকিয়ে দেখে নিলাম স্ত্রীর অবস্থান। এত সব কথাবার্তার মধ্যেও দিব্যি ঘুম। ছুটির দিন বলে কথা!
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। রোজ সকালে হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়ি অফিসের পথে। ফিরি সেই রাতে। মেয়ে আমাকে ঘুমোতে দেখে স্কুলে যায়। স্ত্রী ও আমি ফিরে এসে প্রায় দিনই মেয়েকে ঘুমোতে দেখি। কেবল ছুটির একটি দিনই মেয়ে পায় আমাদের। ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরে ওই এক দিনই। সেটাও মেটাতে পারি না!
মেয়ে বড় হচ্ছে। বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। আগের মতো অফিস থেকে ফিরলেই দৌড়ে কাছে আসে না। গলা ধরে এটা আনো, ওটা আনো বলে বায়না ধরে না। মাঝেমধ্যেই দেখি, মা আর মেয়ের মধ্যে ফিসফিস করে কথা হয়। আমি গেলেই সব চুপ। আমার আড়ালেই কিছু একটা হচ্ছে। আমি সব টের পাই। এ সময় বাবাদের একটু দূরেই থাকতে হয়। এই দূরত্ব বাড়তে থাকে প্রতিমুহূর্তে।
আমি বাবা, আমি কেন এমনটা হতে দেব? কেন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখব?
আর এই দূরত্ব ঘোচানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্ত্রী-সন্তানসহ কোথাও বেরিয়ে পড়া। অন্ত

এই পরিবারের মতো ছুটি মিললেই যেতে পারেন ঘুরতে

ত দুটো দিন ঘুরে আসুন ঢাকার বাইরে থেকে। দেখবেন, কেমন ম্যাজিকের মতো কাজ হয়।
আজকাল এই নগরজীবনে এমন অনেক পরিবারই আছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। জিজ্ঞেস করলে সবাই বলবেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই চাকরি করছেন। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি যে আমরা সন্তানের কোন ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি? আজকাল আপনার-আমার ছেলেমেয়েরা বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলে না। অথচ দেখবেন, অনেকেই ছেলেকে দামি ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিই। হাজার হাজার টাকা খরচ করে সাইকেল কিনে দেই। অথচ ছেলে বা মেয়েটাকে নিয়ে যে সাইকেল চালানো শেখাব, সে সময়টাই আমাদের কই? ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আপনার-আমার সন্তানেরা সময় কাটায় ফেসবুকে চ্যাট করে বা অনলাইন গেমস খেলে। একটা আলাদা ভার্চুয়াল জগতে তাদের বাস। আপনি হয়তো জানেনই না যে আপনার পিচ্চি ছেলেটা ‘ফ্যান্টম’ বা ‘ক্রেজি বয়’ নাম নিয়ে মাতিয়ে বেড়াচ্ছে সাইবার জগৎ। হয়তো জানেনই না আপনার আমাদের মেয়েটা ‘একাকী আমি’ বা ‘কল্পকথা’ নাম নিয়ে রাতভর চ্যাট করে যাচ্ছে আপনার বয়সী কোনো লোকের সঙ্গে।
জানি আপনি ব্যস্ত, আমি ব্যস্ত। একবার কি ভেবেছি, আপনার-আমার আদরের ধনটি এমন একটা জগৎ নিয়ে ব্যস্ত; সেই জগতে আপনি-আমি আমরা নিতান্তই অনাহূত। তাই এখনো সময় আছে। চলুন, বেরিয়ে পড়ি ছেলেমেয়েদের নিয়ে। পুরো পরিবার নিয়ে একান্তে কাটিয়ে আসি দুটো দিন। সকালের রোদ্দুর গায়ে লাগিয়ে বসে থাকি। বহুদিন পর সবাই মিলে রুম শেয়ার করি। সবাই মিলে আবার ভাগাভাগি করে খাই। শেষ কবে স্ত্রীর হাত ধরে হেঁটেছেন বলুন তো? শেষ কবে বলেছেন, ‘ভালোবাসি তোমায়’, শেষ কবে ছেলেকে বলেছেন, ‘আয় ব্যাটা, বুকে আয়!’ আপনি তো খেয়ালই করেননি যে মেয়ে সেই কবে কান ফুঁড়িয়েছে, সেই কানের ফুলটায় মেয়েকে কত সুন্দর লাগছে! মনে পড়ে, ছোট বেলায় মেয়ের চুলে ঝুঁটি করে দিতেন! সিঁথি সোজা না হওয়ায় স্ত্রীর বকাঝকা নাহয় আবারও খেলেন। বিশ্বাস করুন, এই অনুভূতি, এই মুহূর্তগুলো অমূল্য।
যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন। আপনার-আমার সন্তানেরা চাচা-চাচি বা দাদা-দাদির সান্নিধ্য আর পায় না। করপোরেট জীবনে ব্যস্ত মা-বাবার কাছেই ওদের সব আবদার, সব আহ্লাদ। এগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হতে একসময় আবদার করাই ছেড়ে দেবে। আপনি-আমি এইচএসসি পাস করার পর ভেবেছি বিদেশ যাব লেখাপড়া করতে। তাও এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে এসেছি মা-বাবা ছাড়া কীভাবে থাকব ভেবে। আর আজকাল ক্লাস থ্রি-ফোরের ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করলেই দেখবেন ওরা অনেকেই বড় হয়ে বিদেশ গিয়ে পড়ালেখা করবে বলে জানাবে।
দয়া করে কেউ ওদের দোষ দেবেন না। মনে রাখবেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ওরা জানে বেশি। এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে ওরা পরিবার থেকে অবহেলাও পায় বেশি। আমাদের ব্যস্ততাই আমাদের দূরে রাখে সন্তানদের কাছ থেকে।
অনেক হয়েছে জ্ঞানের কথা। এবার চলুন পুরো পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এই ঈদের ছুটিতেই নাহয় চলুন। পরিবারের সবাই মিলে নাহয় একটা রাত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে শুয়ে আকাশের তারা গুনলেন। নাহয় সিলেটের চা-বাগান থেকে দুই মুঠো চা-পাত ছিঁড়লেন। বান্দরবানের নীলগিরি পাহাড়ে বসে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় একবার তাকিয়ে দেখুন তো প্রিয় ছেলেমেয়ের মুখ। দেখবেন, আপনার আদরের সন্তানটিকে কেমন দেবশিশুর মতো লাগছে। এই অনুভূতির সমতুল্য কি কিছু আছে?

Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য যে জিনিসটা বেশি প্রয়োজন

বেড়ানোর জন্য পরিকল্পনাটা আগেই করে নিতে হয় মডেল: শামস, জিনিয়া, অহনা ও অনিরুদ্ধ। ছবি: কবির হোসেন

বেড়ানোর জন্য ইচ্ছাটা থাকা সবচেয়ে জরুরি। এরপর পরিকল্পনা। সেই দিন আর নেই যে হুট করে বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথাও চলে গেলেন…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন

আমার স্ত্রীর অনেক দিনের ইচ্ছা ভারতের ভূস্বর্গ কাশ্মীর বেড়াতে যাবে, আমিও একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কত দিনের স্বপ্ন হিন্দি ছবি সিলসিলার অমিতাভ বচ্চন আর রেখার মতো আমি আর আমার বউ কাশ্মীরের টিউলিপের বাগানে দৌড়ে বেড়াচ্ছি। পটভূমিতে বাজবে মিউজিক। আহ্ জীবন।
১০ দিন ধরে ভারতের ভিসার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিছুতেই সাক্ষাৎকারের ডেট পাচ্ছি না। শুনলাম একসঙ্গে অনেক মানুষ চেষ্টা করছে। তাই তারিখ পেতে দেরি হচ্ছে। আসলে আরও আগে থেকেই চেষ্টা করা দরকার ছিল।
বিপদেই আছি, দুই মাস আগে থাকতেই বউ-বাচ্চাকে কথা দিয়েছি এই ঈদুল আজহার ছুটিতে দেশের বাইরে নিয়ে যাব। একাজ-ওকাজের ঝামেলায় বেড়ানোর কাজ আর বেশি এগোয়নি। ভেবেছি এখনো ২০-২৫ দিন আছে, একটা ব্যবস্থা হয়েই যাবে, এটা কোনো ব্যাপার হলো?
ব্যাপারটা যে এত কঠিন হয়ে যাবে, সেটা কে বুঝেছে? শেষে উপায়ান্তর না দেখে তিন-চার দিন আগে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলাম,
‘ভিসা ছাড়া কোন কোন দেশে যাওয়া যায়, কেউ কি জানেন?
বড় বিপদে আছি রে ভাই!
ওগো শুনছ, আমি কিন্তু চেষ্টা করেই যাচ্ছি…।’
উত্তরে এমন সব দেশের নাম এল, তার অধিকাংশের নামও শুনিনি এই জীবনে। মালাউই, সেশেল, মন্টসের্রাট, নাউরু, পালাউ, সামোয়া, টুভালু, ভানুয়াটু—এইগুলো কোন দেশ? কীভাবে যায়?
ফোন দিলাম গাইড টুরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মনসুরকে। যদি দেশের মধ্যে কিছু ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
নিরাশ করলেন হাসান মনসুর। সঙ্গে খানিকটা পরামর্শও দিয়ে দিলেন। তাঁর মতে, ‘এ ধরনের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য যে জিনিসটা বেশি প্রয়োজন, তা হচ্ছে অনেক আগে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ। এই বিষয়ে আমরা এখনো পিছিয়ে রয়েছি। প্রায়ই দেখা যায় যে ছুটি শুরু হওয়ার অল্প কয়েক দিন আগে লোকজন এসে তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করে, যখন আমরা তাদের সাহায্য করতে পারি না।’
এদিকে দেখি বন্ধু রোকসানা জেরিনকে। নিজে একটি নামকরা বিদেশি স্কুলে চাকরি করেন আর স্বামী উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়েও দিব্যি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জানতে চাইলাম কীভাবে পারেন তাঁরা। রোকসানা জানালেন, ‘বছরের শুরুতেই স্কুলের ছুটির তালিকা নিয়ে বসি, দেখি শুক্র ও শনিবারের সঙ্গে বৃহস্পতি বা রোববার কোনো সরকারি ছুটি পড়েছে কি না। ব্যস, দেশের মধ্যে ছোটখাটো বেড়ানোর পরিকল্পনা করে ফেলি বছরের শুরুতেই। আর বাচ্চার স্কুলের ছুটি দেখে দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনাও করি।’
বেড়ানোর জন্য ইচ্ছাটা থাকা সবচেয়ে জরুরি। এরপর পরিকল্পনা। সেই দিন আর নেই যে হুট করে বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথাও চলে গেলেন! এই যে কক্সবাজারে শত শত হোটেল, তাও তো বড় ছুটিতে কোথাও থাকার জায়গা পাওয়া যায় না। আগে থেকে বুকিং করে গেলে নিশ্চিন্ত। আজকাল দেশের হোটেলগুলোতে দুই-তিন মাস আগে থেকেও বুকিং দেওয়া যায়।
থাকার জায়গা ঠিক করে নেমে পড়তে হবে গাড়ির ব্যবস্থা করতে। নিজের গাড়ি হলে তো হলোই আর না হলেও সমস্যা নেই, বাস-ট্রেন আর ভাড়ার গাড়ি তো আছেই।
অনেকে দলবেঁধে বেড়াতে যান। এটা ভালো। সবাই মিলে হইহুল্লোড় করে বেড়ানো যায়…তবে এখানে একটা ভেজালও আছে। সঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারটা জরুরি। ভুল সঙ্গী হলে আমার দশা হবে। বছর দশেক আগে দলবেঁধে গেলাম সুন্দরবন বেড়াতে। আমরা খাইদাই, ঘুরিফিরি আর লঞ্চে বসে সুন্দরবন দেখি। খুবই শান্তিময় জীবন। এমনই এক সকালে লঞ্চের ছাদে দাঁড়িয়ে বনের পাখি আর হরিণ দেখছি। পাশে এসে দাঁড়ালেন এক ভ্রমণসঙ্গী। বলে ফেললেন, ‘বুঝলেন ভাইজান, সুন্দরবনের বাঘগুলা মাইরা ফেলা দরকার।’
আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, কোনো রকমে জিজ্ঞেস করলাম, এর কারণ কী?
‘বাঘ না থাকলে সুন্দরবনে হরিণের চাষ করা যাইত।’
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বললাম, ‘ভাই, প্লিজ আপনি যান এখান থেকে।’
একবার আমার তিন সহকর্মী তাঁদের পরিবার নিয়ে গেলেন ভারত ঘুরতে। কত যে তাঁদের পরিকল্পনা—দিল্লির লালকেল্লা, জয়পুরের আমের ফোর্ট আর আগ্রার তাজমহলটা দেখতেই হবে। ঠিকমতো কলকাতাও পৌঁছে গেলেন। সমস্যা হলো তাঁদের গ্রুপের জনসংখ্যা। বাচ্চা-কাচ্চাসহ ১৩ জন। তিন-চার দিন কলকাতার রাস্তায় জুতা ক্ষয় করেও একসঙ্গে ১৩ জনের দিল্লি যাওয়ার ট্রেনের টিকিট জোগাড় করতে পারলেন না। আর প্লেনের টিকিট তো অনেক খরচের ব্যাপার। কী আর করা, পুরো ১০ দিন কলকাতার নিউমার্কেটের শাড়ি-জুতার দোকান ঘুরে দেশে ফিরে এলেন। তাই দলবেঁধে ঘুরতে যেতে হলেও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। মানসিকতার মিল আছে, এমন লোকজন নিয়েই গ্রুপ করা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে যেন গ্রুপ এত বড় না হয়, যে সবার সব সামাল দিতে গিয়ে বেড়ানোটাই মাটি হয়ে যায়। যদি বড় গ্রুপ নিয়ে যেতেই হয়, সে ক্ষেত্রে কোনো টুর অপারেটরকে দায়িত্ব দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
ঘুরতে যাওয়ার জন্য তিনটি বিষয় প্রয়োজন—ইচ্ছা, ছুটি আর টাকা। ধরুন ইচ্ছা আছে ছুটি আছে, কিন্তু টাকা নেই। আপনার বেড়ানো হবে। টাকারও ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আবার ইচ্ছা আছে, টাকা আছে, কিন্তু ছুটি নেই; একটু কষ্ট হলেও ছুটি ব্যবস্থা করে আপনার বেড়ানো হবে। কিন্তু যদি ধরেন আপনার ছুটি আছে, টাকা আছে, কিন্তু ইচ্ছা নেই; তাহলে কিন্তু আপনার বেড়ানো হবে না। ইচ্ছাটাই হলো সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
নিজের মনের মধ্যে বেড়ানোর ইচ্ছাটাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, কারণ বাংলাদেশে এখন বেড়ানোকে আর বিলাসিতা বলে বেশির ভাগ মানুষই মনে করে না। ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও এই ব্যাপারটা মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারের কাছে বিলাসিতার একটা বিষয় ছিল। এখন আর সেটা নেই।
এ ব্যাপারে হাসান মনসুর বলেন, গত দুই দশকে দেশে বড় পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনটা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ছোট হয়ে গেছে। ফলে পারিবারিকভাবে বেড়াতে যাওয়া এখন সম্ভব এবং অনেক পরিবারই তা-ই করে থাকে।
অন্যদিকে, রোকসানা জেরিনের মতে, ‘যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে আর মন প্রফুল্ল রাখতে চাই একটু ব্রেক। এই ব্রেকটুকুই অন্য দিনগুলোতে কাজের শক্তি আর সৃষ্টিশীল কাজের প্রেরণা দেয়।’
আমি এত কিছু বুঝি না, শুধু এইটুকু বুঝি যে হাজারো কাজের চাপে আমি আমার পরিবারের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাই। স্ত্রী-সন্তানের কাছে দূরের মানুষ হয়ে যেতে থাকি। এই দুই-চার দিনের ঘোরাঘুরি আমাকে আমার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। আমি নতুন করে খেয়াল করি যে আমার মেয়েটা আরও একটু বড় হয়ে গেছে, আর আমার স্ত্রী এখনো আমার হাত শক্ত করেই ধরে হাঁটে, সেই আগে যেভাবে হাঁটত।