Categories
ইতিহাস ও ঐহিত্য

এ একেবারে অন্য পৃথিবী

Kutch

কচ্ছের পথে…প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির দৌলতে পর্যটনের আকর্ষণ কচ্ছ।

ভুজ

দ্বিতীয় পর্বের গুজরাত পরিক্রমা আমরা শুরু করব ভুজ শহরকে কেন্দ্র করে। জামনগর থেকে সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিমি। এ পথে মাঝেমধ্যেই নজরে পড়বে লবণ তৈরির কর্মকাণ্ড। কোথাও বা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বায়ু বিদ্যুতের বিশালাকার সব স্তম্ভ। পথের রুক্ষতা বলে দেবে, আমরা ঢুকে পড়েছি মরুভূমির ভিতরে।

ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রায় অর্ধেক আয়তন বিশিষ্ট কচ্ছ জেলার সদর শহর ভুজ। ষোলো শতকের মাঝামাঝি জাদেজা রাজপুত রাজা প্রথম খেঙ্গার্জির হাতে এ শহরের পত্তন এবং লখপত, কোটেশ্বর, জাখাউ, খান্ডভি প্রভৃতি সমুদ্র-বন্দরের মাধ্যমে বাণিজ্যে ভুজ তথা কচ্ছের সমৃদ্ধি। তবে খরা এবং ভূমিকম্পে বার বার বিধ্বস্ত হয়েছে সমগ্র অঞ্চল। তবু পর্যটনের কচ্ছ আজও উজ্জ্বল তার প্রকৃতি, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির দৌলতে।


রুদ্রমাতা গ্রাম: প্রকৃতির উন্মুক্ত ক্যানভাস।

হামিরসর সরোবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ভুজ। কচ্ছ জাদুঘর, আয়না মহল, প্রাগমহল প্রাসাদ প্রভৃতি দ্রষ্টব্যও এর আশপাশেই। কিছুটা দূরে ভারতীয় সংস্কৃতি দর্শন সংগ্রহালয়টি। এই জাদুঘরগুলিই ভুজ শহরের প্রধান আকর্ষণ, কচ্ছের বৈচিত্রপূর্ণ শিল্পকর্মের দুর্লভ সংগ্রহে সমৃদ্ধ। এগুলির মধ্যে কচ্ছ জাদুঘরটি আবার গুজরাতের প্রাচীনতম। তেমনই সোনা, রূপা, হাতির দাঁত ও মূল্যবান রত্নাদিতে অলঙ্কৃত আয়না মহল। তবে কচ্ছের আসল রূপ ধরা আছে প্রকৃতির উন্মুক্ত ক্যানভাসে। এক বিরল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সন্ধানে আমরা প্রথমেই পাড়ি দেব ধর্দোর উদ্দেশ্যে। চাক্ষুষ করব বৃহত্তর রণ-এ লবণের চাদরে ঢাকা শুভ্র মরুভূমির এক অপার্থিব রূপ। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে এক বর্ণময় উৎসবের আয়োজন হয়। ট্যুরিজম কর্পোরেশন অব গুজরাত লিমিটেড (TCGL)-এর ব্যবস্থাপনায়।


বর্ণময় উৎসবে গুজরাতের লোকনৃত্য।

অস্থায়ী তাঁবুর নগরীতে আসর বসে কচ্ছি লোকসংস্কৃতির। ধর্দো গ্রামটিতে মুটওয়া সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাস। তাদের আয়না বসানো সূচিশিল্প এবং ঘরবাড়ির দেওয়ালচিত্রও আকর্ষণীয়। পাশাপাশি ভুজ থেকে যাওয়া আসার পথে দেখে নেব বন্নি তৃণভূমির অন্তর্গত হোডকা ঝিল (গ্রাম)-এর মেঘোয়াল সম্প্রদায়ের সূচিশিল্প ও চর্মশিল্পের নমুনা, লুডিয়া গ্রামের কাঠখোদাই, খাভদার খুম্বরদের মৃৎশিল্প, জুরার লোহার সম্প্রদায়ের তামার ঘণ্টা তৈরির কারিকুরি, নিরোলার ক্ষত্রি শিল্পীদের রোগান শিল্পকর্মগুলিও। খাভদা থেকে কুড়ি কিমি দূরের কালো দুঙ্গার পাহাড় এবং মননসিংহ সোধার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা ফসিল পার্কটিও দেখে নেওয়া যায় এই যাত্রায়।

অন্য দিকে, কচ্ছের পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে কোরি খাড়ি সংলগ্ন পরিত্যক্ত বন্দর-নগরী লখপত, প্রাচীন হিন্দুতীর্থ নারায়ণ সরোবর কোটেশ্বর মন্দির। পথ গিয়েছে নারায়ণ সরোবর অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে। চলার পথে তাই নজরে পড়ে কিঙ্কারা, নীলগাই, শিয়াল প্রভৃতির। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পে এই অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া, সিন্ধু নদীর ধারাটি পথ হারানোয় শুকিয়ে যায় এক সময়ের সমৃদ্ধ জনপদগুলি। আজ তাই সমগ্র অঞ্চলটি মরুভূমির জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যাওয়া এক খন্ডহরের মতোই মনে হয়।


প্রাচীন হিন্দুতীর্থ নারায়ণ সরোবর কোটেশ্বর মন্দির।

ফিরতি পথে আমরা ঘুরে নেব মান্ডভি। এটিও গুজরাতের একটি প্রাচীন সমৃদ্ধ সমুদ্রবন্দর। তবে আজ এর মুখ্য আকর্ষণ রূপালি বালির সৈকত। রুক্ষ, শুকনো মরুভূমির প্রান্তটি কিন্তু আশ্চর্য এক স্নিগ্ধতার পরশমাখা। ঝিনুক ছড়ানো শান্ত, নিরিবিলি সৈকতটি দিনভর মেতে থাকে সিগাল-এর আনাগোনায়। তেমনই দর্শনীয় এখানকার জাহাজ তৈরির কারখানা এবং কচ্ছের রাজাদের গ্রীষ্মাবকাশ বিজয় বিলাস প্রাসাদটিও।

লিটল রণ

পরিশেষে ভুজকে বিদায় জানিয়ে আমরা পাড়ি দেব লিটল রণের পথে। তবে আগ্রহীরা তার আগে ভুজ থেকে প্রায় আড়াইশো কিমি দূরের হরপ্পা সভ্যতার পঞ্চম বৃহত্তম নগরী ধোলাভিরার ধ্বংসাবশেষটিও ঘুরে নিতে পারেন। পোড়া ইটের বদলে সেখানে আবার বাড়িঘর তৈরি হয়েছিল পাথর দিয়ে। যাই হোক, এই পথেই ভুজের উপকণ্ঠে ভুজোড়ি, আজরখপুর গ্রামগুলিও দেখে নেওয়া যায়। তার মধ্যে ভুজোড়ি গ্রামের হাতেবোনা তাঁতের কাপড় ও রাবারি সম্প্রদায়ের আয়না বসানো সূচিশিল্প এবং আজরখপুরের মুসলিম ক্ষত্রিদের প্রাকৃতিক রঙে অলঙ্কৃত আজরখ শৈলীর হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টিং বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।


লিটল রণ: বিরল প্রজাতির বুনো গাধার অভয়ারণ্য।

কচ্ছের পূর্বতম অংশে লিটল রণ-এর পরিচিতি এক বিরল প্রজাতির বুনো গাধার অভয়ারণ্য হিসেবে। এই জঙ্গল মরুভূমির বাস্তুতন্ত্রের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। মূলত বাবলা জাতীয় উদ্ভিদ এবং ঘাস-গুল্মের আশ্রয়ে বুনো গাধা ছাড়াও চিঙ্কারা, কৃষ্ণসার, নীলগাই প্রভৃতি তৃণভোজী এবং শিয়াল, মরু শিয়াল, মরু বিড়ালের মতো মাংসাশী প্রাণীদের বাস। আর আছে কানঠুটি, গগনভেড়, ক্রৌঞ্চ, সারস, ঈগলের ওড়াউড়ি। পশ্চিমে আদেসর বা পূর্বে বাজানা রেঞ্জ অফিস থেকে অনুমতি নিয়ে ঘুরে নেওয়া যায় এই অভয়ারণ্য। ধোলাভিরা থেকে আদেসর খুব দূরে নয়, তবে আদেসর বা বাজানা— কোথাও রাত্রিবাসের সুব্যবস্থা নেই। সে ক্ষেত্রে উচিত হবে বাজানা রেঞ্জের কাছাকাছি দাসাদাতে ভাভনা রিসর্ট বা রণ রাইডার্সের ব্যবস্থাপনায় জঙ্গলটি ঘুরে দেখার।

পাটন

পরের গন্তব্য পাটন দাসাদা থেকে আরও প্রায় একশো কিলোমিটার। ইতিহাস বলে, সোলাঙ্কি রাজাদের আমলে পাটন, অতীতের অনহিলভরা সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। পরে মুসলিম শাসকদের হাতে শহরটি ধ্বংস হয়ে গেলেও অক্ষত থেকে যায় রানিকী ভাও-এর স্থাপত্যটি। বর্তমানে সেটি বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত। তেমনই পাটনের আর এক গর্ব পাটোলা শাড়ি। যদিও লাখ টাকা দামের শাড়িটি বর্তমানে টিকে আছে মাত্র দু’-চার জন শিল্পীর সৌজন্যে। তাই পাটোলাওয়ালা ফার্ম হাউস বা পাটন পাটোলা হেরিটেজ কেন্দ্রটি ঘুরে নেওয়া যায় বিরল এই শিল্পকর্মটির পরিচয় পেতে।

অন্য দিকে, মাধেরার সূর্যমন্দিরটিও সোলাঙ্কিদের এক অনন্য কীর্তি। পাটন থেকে ৩৫ কিমি দূরে পুষ্পবতী নদীর ধারে গড়ে ওঠা মন্দিরটি কারও কারও মতে, সোলাঙ্কিদের শ্রেষ্ঠ কীর্তিও বটে। মন্দিরটি আজ বিগ্রহশূন্য। তবে মন্দিরগাত্র বারোটি সূর্যমূর্তির সঙ্গে নানান দেবদেবী, দিকপাল, অপ্সরা প্রভৃতির অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তিতে সাজানো। এমনকী, এটির গর্ভগৃহ, সভামণ্ডপ এবং সামনের কুণ্ডটিও পাথরের অসাধারণ খোদাই কাজে অলঙ্কৃত।


তৎকালীন বরোদায় বিত্ত-বৈভবের নিদর্শন লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদ।

বদোদরা

যতই চলতে থাকি, পথও এগিয়ে চলে। এক সময় আমদাবাদকে পিছনে ফেলে পৌঁছে যাই গুজরাতের সাংস্কৃতিক রাজধানী বদোদরায়। তৃতীয় সয়াজিরাও গায়কোয়াড়ের সময় থেকে এ শহর শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে। দেশ-বিদেশের নানান গুণীজনের সঙ্গে অরবিন্দ, নন্দলাল, মুজতবা আলি প্রমুখের অবদানও ছিল তাতে। দ্রষ্টব্যের তালিকায় প্রথমেই বলতে হয় কীর্তি মন্দিরের কথা। নন্দলাল বসুর চারটি কালজয়ী দেওয়াল চিত্র— গঙ্গাবতরণ, মহাভারতের যুদ্ধ, মীরার জীবন ও নটির পূজায় অলঙ্কৃত গায়কোয়াড়দের এই স্মৃতিমন্দিরটি। পাশাপাশি, শ্রীঅরবিন্দ নিবাস, বিবেকানন্দ স্মৃতিমন্দির প্রভৃতিও উল্লেখযোগ্য। অন্য দিকে, তৎকালীন বরোদায় বিত্ত-বৈভবের নিদর্শন লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদটি। একই সঙ্গে স্থাপত্যটি অসাধারণ শিল্পসুষমা মণ্ডিত। এ ছাড়াও দ্রষ্টব্যের তালিকায় রয়েছে জাদুঘর, চিত্রশালা, তারামণ্ডল প্রভৃতি। তেমনই নবরাত্রির আলোর রোশনাইয়ে সেজে ওঠে গোটা শহর। তাই পুজোর ছুটিতে বেড়াতে এলে বদোদরা দিয়েও শুরু করা যায় গুজরাত পরিক্রমা, পুজোর মেজাজেই। তবে শুরু বা শেষ যা-ই হোক না কেন, বদোদরা থেকে ৪৫ কিমি দূরের বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকভুক্ত গুজরাতের প্রথম নিদর্শন চম্পানের পাওয়াগড় ঘুরে নিতে ভুলবেন না। গুজরাতের ইসলামি জমানার শেষ রাজধানী শহর চম্পানের নানান মসজিদ, ভাও, বিনোদনকেন্দ্র, দুর্গতোরণ, প্রাচীর, বুরুজ প্রভৃতির মধ্যে বিশেষ ভাবে বলতে হয় পনেরো শতকের শেষভাগে নির্মাণ শুরু হওয়া জামি মসজিদটির কথা।


পনেরো শতকের শেষভাগে দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তৈরি হয় জামি মসজিদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে তৈরি হওয়া স্থাপত্যটির গঠনশৈলী পরবর্তীকালে সারা দেশজুড়ে অনুসৃত হয়। অন্য দিকে, পাওয়াগড় পাহাড়ের ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা রাজপুত রাজাদের দুর্গ, প্রাসাদ, শষ্যাগার, পার্বত্য নগরীর জলধারণ ব্যবস্থা, মন্দির প্রভৃতির স্থাপত্য-ভাস্কর্যগুলিও সমান গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই, হিন্দু এবং মুসলিম সংস্কৃতির এমন যুগ্ম স্বীকৃতি (বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হওয়া) খুব অস্বাভাবিক নয়। বস্তুত, বৈচিত্র্যের এমন মিলন এবং সহাবস্থানই আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য।

Categories
ইতিহাস ও ঐহিত্য

খাটের তলা নয়, বাড়ির পাশে আগরতলা

Tripura

আমরা কৌতুক করে বলি, কোথায় আগরতলা আর কোথায় খাটের তলা! আগরতলা কিন্তু খুব বেশি দূরেরও নয়। বাংলাদেশের খুব কাছেই ভারতের ত্রিপুরা, আর তার রাজধানী আগরতলা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে যার ইতিহাস। শুধু আমাদের নয়, আগরতলার নিজেরও আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস আর ঐহিত্য। একবার ঢু মেরে আসতেই পারেন বাড়ির পাশের এই আরশিনগর থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ত্রিপুরা রাজ্যের ভৌগোলিক আয়তন কম হলেও, সৌন্দর্য ও বৈচিত্রের বিচারে এই রাজ্যের আকর্ষণ কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর প্রান্তে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, আর পূর্ব দিকে সীমানা ভাগ হয়েছে প্রতিবেশী দুই রাজ্য অসম ও মিজোরামের সঙ্গে। ১৯৪৯ সালে রাজ্য হিসেবে ভারতের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ ঘটে ত্রিপুরার।

ত্রিপুরা নামটি কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে অবশ্য দ্বিমত আছে। অনেকে বলেন, ‘টুই’ (অর্থাৎ,জল) ‘প্রা’ (অর্থাৎ, কাছে), মানে জলের কাছে। এই শব্দ থেকেই ত্রিপুরা নামের সৃষ্টি। আবার অন্য মতে, এখানকার ত্রিপুরাসুন্দরী (৫১ সতীপীঠের অন্যতম) মাতার নাম থেকেই এই রাজ্যের নামটি এসেছে। নামকরণ নিয়ে দ্বিমত যা-ই থাক, একটা বিষয়ে কিন্তু সকলেই সহমত— সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০০ ফুট উচ্চতার তারতম্যবিশিষ্ট রাজ্যে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়, টিলা, নদী, সরোবর, ঝর্না, প্রাসাদ, তীর্থস্থান, অভয়ারণ্য, রবার-চা-আনারসের বাগান, বিস্ময়কর জীববৈচিত্র্য— সব মিলিয়ে ত্রিপুরার সৌন্দর্য অনন্য, অতুলনীয়।

ত্রিপুরায় বাঙালি অধিবাসীর সংখ্যা এতটাই বেশি যে বাংলা থেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকেরা অন্য রাজ্যে এসেছেন বলে মনেই করবেন না। তবে বাঙালি ছাড়াও মণিপুরী ও অন্য উপজাতির মানুষও, যেমন ত্রিপুরী (দেববর্মন/দেববর্মা), চাকমা, লুসাই, মগ, রিয়াং, জামাতিয়া, উচাই, এখানে মিলেমিশে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকেন। রাজ্যের প্রায় ষাট শতাংশই বনভূমি (জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়) আর বাকি অংশ উপত্যকা ও সমতলভূমি। সারা বছরই মনোরম থাকে এখানকার আবহাওয়া তবে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যথেষ্টই বেশি। গোটা রাজ্যজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলি। ঠিক ভাবে পরিকল্পনা না করলে, একযাত্রায় সবটা দেখাই মুশকিল হয়ে পড়ে।

আগরতলা:

ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী, হাওড়া নদীর তীরবর্তী আগরতলা অবশ্য ত্রিপুরার নবীন রাজধানী, এমনটা বলাই যায়। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে পুরনো রাজধানী উদয়পুর থেকে মহারাজা কৃষ্ণমাণিক্য রাজধানী স্থানান্তর করেন ‘পুরনো আগরতলা’-য়। পরবর্তী কালে স্থায়ী ভাবে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় বর্তমান আগরতলা শহরে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আগরতলার দ্রষ্টব্য স্থানগুলি এক এক করে দেখে নিন।

উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ:

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই রাজপ্রাসাদের অনেকটা অংশই মিউজিয়ামে পর্যবসিত। ১৯০১ সালে মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য নির্মাণ করান এই প্রাসাদটির। দুধসাদা রঙের অভিনব স্থাপত্যটি (গ্রিক ও ভারতীয় স্থাপত্যের মেলবন্ধনে তৈরি) দেখার মতো। প্রাসাদের সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে মুঘল-শৈলীর এক বাগান ও দু’টি বড় দিঘি। বাগানের ফোয়ারাগুলো যথেষ্ট পর্যটক বিনোদন করে। তিনটি গম্বুজবিশিষ্ট এই বিশাল দ্বিতল প্রাসাদটির মাঝের গম্বুজটির উচ্চতা হল ৮৫ ফুট। প্রাসাদকে ঘিরে রয়েছে উমা-মহেশ্বর, লক্ষ্মীনারায়ণ, কালী ও জগন্নাথ মন্দির, এগুলির নির্মাণও হয় রাজাদের আমলেই। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় খননকার্য থেকে পাওয়া বহু প্রাচীন মূর্তির অনন্য সম্ভার রাখা আছে এই মিউজিয়ামে।

গ্রিক ও ভারতীয় স্থাপত্যের মেলবন্ধনে তৈরি অপরূপ সুন্দর দুধ-সাদা এই প্রাসাদ

এ ছাড়া বিভিন্ন মডেল রূপে স্থানীয় উপজাতিদের পোশাক-আশাক, অলংকার, অস্ত্রশস্ত্র, জীবনচর্চা, বাজনা ইত্যাদি দেখানো আছে সুন্দর ভাবে। ত্রিপুরার রাজা-রানিদের ছবি, অস্ত্রশস্ত্র, পাথরে খোদাই করা প্রাচীন লিপি, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ প্রভৃতিও প্রদর্শিত হয়েছে এখানে। ত্রিপুরার রাজপরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। রাজ-আমন্ত্রণে বেশ কয়েক বার যাওয়াই শুধু নয় (মোট সাত বার এসেছিলেন), বেশ কিছু কাব্য, নাটক, কবিতা, গান কবি রচনা করেছিলেন এখানে এসেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ এবং বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ও আকর্ষণীয় ছবি নিয়ে একটা আলাদা গ্যালারিই রাখা আছে এই মিউজিয়ামে। মিউজিয়ামে ক্যামেরা ব্যবহারে (মোবাইল ক্যামেরাও পড়ছে এর মধ্যে) নিষেধাজ্ঞা আছে। সোমবার ও অন্যান্য ছুটির দিনে বন্ধ থাকে এই মিউজিয়াম। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১৫ টাকা। খোলা থাকে সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।

কুঞ্জবন প্রাসাদ:

শহরের থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটি টিলার উপর অবস্থান এই প্রাসাদের। ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে মহারাজা বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবেই এটির নির্মাণ করান। তাঁর শেষ ত্রিপুরা ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ এই প্রাসাদেই ছিলেন বেশ কিছুকাল। বর্তমানে এই প্রাসাদটি অবশ্য রাজ্যপালের আবাস হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই প্রাসাদচত্বরে ঢুকতে হলে রাজ্যপালের অফিস থেকে অনুমতি নিতে হয়। তবে রবীন্দ্রকানন নামের সংলগ্ন বাগানটি সাধারণ পর্যটকের জন্য খোলা থাকে।

হেরিটেজ পার্ক:

কুঞ্জবন প্রাসাদের কাছেই বিমানবন্দর যাওয়ার রাস্তায় দেখে নিতে পারেন এই হেরিটেজ পার্কটি। অনেকটা জায়গা নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন এই পার্কটিতে ত্রিপুরার দর্শনীয় সব স্থানই ধরা আছে মিনিয়েচার বা ক্ষুদ্র সংস্করণে। ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির, নীরমহল, উজ্জয়ন্ত প্যালেস, রেললাইন (স্টেশন-সহ) সবই রয়েছে, ছোট সংস্করণে, রকমারি ফুল, গাছ দিয়ে সুন্দর ভাবে সাজানো পার্কটি খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা (মঙ্গলবার ও ছুটির দিন বন্ধ থাকে)। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা। আগরতলার অন্য দ্রষ্টব্যগুলির মধ্যে দেখে নিতে পারেন বেনুবন বিহার (বুদ্ধমন্দির), কৃষ্ণ মন্দির, উমা-মহেশ্বর মন্দির, জগন্নাথ মন্দির, মালঞ্চ নিবাস, মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর কলেজ (বাইরে থেকেই দেখতে হবে), গেদু মিঞার মসজিদ ইত্যাদি।

হেরিটেজ পার্কের রেপ্লিকা

চতুর্দশ দেবতার মন্দির:

অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে (১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে) রাজা কৃষ্ণমাণিক্য উদয়পুর থেকে রাজধানী পুরনো আগরতলায় স্থানান্তরিত করার সময় (সামসের গাজির কাছে যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর রাজধানী উদয়পুর থেকে সরিয়ে আগরতলায় নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছিল) ত্রিপুরা রাজবংশের আরাধ্য চতুর্দশ দেবতাকেও প্রতিষ্ঠা করা হয় পুরনো আগরতলার এই মন্দিরে। পরবর্তীকালে রাজধানী আবার বর্তমান আগরতলায় স্থানান্তরিত হলেও চতুর্দশ দেবতা অধিষ্ঠিত থেকে যান পুরনো আগরতলার মন্দিরেই। দেবতাদের আকৃতি এখানে পূর্ণাবয়ব নয়, মূলত মস্তকই পূজিত হয় দেববিগ্রহ হিসেবে।

চতুর্দশ দেবতার মন্দির

মন্দিরে বৈদিক রীতির সঙ্গে সঙ্গে উপজাতীয় রীতিরও সংমিশ্রণ ঘটেছে পূজার ক্ষেত্রে। আষাঢ় মাসে চতুর্দশ দেবতার মন্দিরে বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়, যা খার্চিপূজা নামেই বিখ্যাত। সে সময় সাত দিন ধরে জমকালো মেলা বসে মন্দিরপ্রাঙ্গনে। আগরতলা শহর থেকে চতুর্দশ দেবতার মন্দিরের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। মন্দিরের কাছেই রয়েছে ভগ্নদশাপ্রাপ্ত প্রাচীন রাজপ্রাসাদটি। সম্প্রতি সংস্কার করে সেটিতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি সংগ্রহশালা। দেখে নিতে পারেন সেটিও।

সিপাহিজলা:

সিপাহিজলা অভয়ারণ্য আগরতলা শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ১৮.৫৩ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই অভয়ারণ্যে ৪৫৬ প্রজাতির গাছ ও রকমারি প্রজাতির অসংখ্য পশুপাখির অবস্থান। বন্যপ্রাণীর মধ্যে ক্নাউডেড লেপার্ড, লাঙ্গুর, বার্কিং ডিয়ার, শিয়াল, খরগোশ, বন্য শুয়োর, মাউস ডিয়ার, নেউল, বিন্টুরং, ক্যাপড লাঙ্গুর, প্যাঙ্গোলিন ইত্যাদি তো আছেই, তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও উল্লেখযোগ্য প্রাণীটি হল চশমা বাঁদর। এই অভিনব প্রাণীটির দেখা কেবলমাত্র এই অঞ্চলেই মেলে।

একমাত্র এই অঞ্চলেই মেলে এই প্রজাতির বাঁদর

অভয়ারণ্যের মধ্যেই গড়ে ওঠা চিড়িয়াখানায় সহজেই দেখা মিলবে এই সব প্রাণীর। এ সব ছাড়া রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, চিতাবাঘ, বিভিন্ন প্রজাতির বিড়াল, বিচিত্র রকমের পাখি ইত্যাদির দেখাও মিলবে এই চিড়িয়াখানায়। জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ১০ টাকা। খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। শুক্রবার বন্ধ থাকে সিপাহিজলা। সিপাহিজলার লেকটিতে শীতের সময় অজস্র পরিযায়ী পাখি ঝাঁক বেঁধে আসে। লেকের জলে বোটিং করতে করতে খুব কাছ থেকে তখন দর্শনও মেলে এই সব পাখির। এখানকার রবার ও কফি গাছের সুদৃশ্য বাগানও সিপাহিজলার অতিরিক্ত আকর্ষণ হিসেবেই নজর কাড়বে।

সিপাহিজলার অভয়ারণ্যে নিশ্চিন্তে রোদ পোহাচ্ছে বনের রাজা

কমলাসাগর কালীমন্দির:

আগরতলা থেকে ৩১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন মহারাজা ধনমাণিক্য, পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে। এই মন্দিরটি কসবা কালীবাড়ি নামেও খ্যাত। মন্দিরে মূর্তিটি সিংহবাহিনী দশভুজা দুর্গার হলেও, পদতলে শায়িত শিব। সে কারণেই হয়তো দেবী এখানে কালী হিসেবেই পূজিতা হন। এই শক্তিপীঠে (৫১ সতীপীঠের মধ্যে নয়) সারা বছরই পুন্যার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। মন্দিরের সামনে বড় দিঘিটি কমলাসাগর নামে বিখ্যাত। মহারাজা ধনমাণিক্য তাঁর স্ত্রী কমলাদেবীর নামেই নাম রাখেন তাঁর সময় খনন করা এই দিঘির। মন্দিরের পাশেই রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া (আন্তর্জাতিক সীমানা), যার ওপারটাই হল বাংলাদেশ। এখান থেকে বাংলাদেশের প্রান্তের কসবা রেলস্টেশন (কুমিল্লা জেলার মধ্যে পড়ে) ও এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর নজরে আসে। এপ্রিলে মন্দির সংলগ্ন চত্বরে এক বড় মেলা বসে। সে সময় পুন্যার্থীর ঢল নামে এখানে। প্রতি রবিবার ভারত, বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে একটি হাট বসে এখানে। দু’টি দেশের ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় জমজমাট হয়ে ওঠে এই অভিনব হাট।

কমলাসাগর কালীমন্দির

যাত্রাপথ: কলকাতা থেকে বিমানে মাত্র ৫০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় আগরতলায়। সদ্য রেলপথেও সারা দেশের সঙ্গে সংযুক্তিকরণ হয়েছে এই রাজধানী শহরের। দিল্লির আনন্দবিহার ও অসমের ডিব্রুগড় থেকে সাপ্তাহিক ট্রেন চলে আগরতলা পর্যন্ত। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ছেড়ে সপ্তাহে দু’দিন (বৃহস্পতি ও রবিবার) কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস গুয়াহাটি হয়ে পৌঁছে দিচ্ছে আগরতলায়। সময় লাগছে ৩৮ ঘণ্টা।

আগরতলা সাইট সিয়িং, সিপাহিজলা, চতুর্দশ দেবতার মন্দির কিংবা কমলাসাগর দেখতে হলে আগরতলা থেকেই গাড়ি ভাড়া করতে হবে। গাড়িভাড়া পড়বে (সারাদিনের জন্য) ছোটগাড়ির ক্ষেত্রে (ইন্ডিকা, ওয়াগনআর, ইকো) ১৫০০ টাকা, আর বড় গাড়ির ক্ষেত্রে (স্করপিও, বোলেরো, জাইলো ইত্যাদি) ২২০০ টাকা। গাড়ি কিংবা হোটেল বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে: সঞ্জীব আচার্য, নীলজ্যোতি ট্রাভেলস, আগরতলা, ফোন: ৯৮৫৬০৯৩০০৭, ৯৪৩৬৪৫৬০৮৮

রাত্রিবাস: আগরতলায় থাকার জন্য আছে ত্রিপুরা ট্যুরিজমের ‘হোটেল গীতাঞ্জলি’। এসি দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ২০০০-২৫০০ টাকা (কর অতিরিক্ত), বেসরকারি হোটেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘হোটেল সোমরাজ রিজেন্সি’, দ্বিশয্যাঘর (এসি) ১৫০০-৩০০০ টাকা। ফোন: (০৩৮১)২৩৮২০৬৯/২৩৮৫১৭২ (আগরতলার এসটিডি কোড-০৩৮১)

বিস্তারিত তথ্য ও সরকারি টুরিস্ট লজ বুকিংয়ের জন্য কলকাতা যোগাযোগ: অতুল দেববর্মা, ত্রিপুরা ট্যুরিজম (কলকাতা শাখা), ত্রিপুরা ভবন, ১ প্রিটোরিয়া স্ট্রিট, কল-৭১,

ফোন: ৯৩৩১২৩১৪৫৯ (মোবাইল), (০৩৩)২২৮২-৫৭০৩ (কলকাতা কোড-০৩৩)।

আগরতলায় রসনাতৃপ্তি: বাঙালি তো মাছে-ভাতে থাকতেই ভালবাসে, আর সে মাছ যদি হয় বাংলাদেশের (যার সীমান্ত খুবই কাছে এখানে) সুস্বাদু ইলিশ, তবে তো কথাই নেই। তা ছাড়াও তেলকই, পাবদা মাছের ঝাল, স্থানীয় আউইন্যা মাছের ঝাল (চিকেন, মাটন তো আছেই) ইত্যাদি রকমারি আকর্ষণীয় পদের সমাহারে রসনাতৃপ্তি যে চরমপর্যায় পৌঁছবে, তা বলাই বাহুল্য।

ত্রিপুরার বাঙালির পছন্দের রসনা

আগরতলা শহরেই এই সব আকর্ষণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি: ‘বাহারী পাঁচফোড়ন’ (বি কে রোড), ফোন: ৯৮৫৬০৯২০০১, ৯৮৫৬০৯৩০০৮

কেনাকাটা: বাঁশ, বেত ইত্যাদি দিয়ে তৈরি ত্রিপুরার বিখ্যাত হস্তশিল্পের বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয় করতে পারেন আগরতলা শহরের সরকারি ‘পূর্বাশা’ এম্পোরিয়াম থেকে, হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস ছাড়া হ্যান্ডলুম সামগ্রীও পাওয়া যায় এখানে।

Categories
ইতিহাস ও ঐহিত্য

যদি চোখ জুড়াতে চান

ইট কংক্রিটের শহর দেখে দেখে চোখ পচে যাচ্ছে? চোখ যদি জুড়াতে চান, ঘুরে আসুন বাংলাদেশের খুব কাছের গন্তব্য নীলমহল, উদয়পুর, ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির…

Neerhal

নীরমহল

নীরমহল: নামকরণ থেকেই বোঝা যায় জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে যে মহল, উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র জলমহল হল এটি। আগরতলা থেকে ৫১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত জনপদটির নাম মেলাঘর। মেলাঘরের দুই কিলোমিটার দূরেই অবস্থান নীরমহলের। বিশাল রুদ্রসাগর সরোবরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব এই রাজপ্রাসাদ। মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শুরু করান এই সুদৃশ্য প্রাসাদটির। প্রাসাদের স্থাপত্যে মুঘল শৈলীর প্রভাব যথেষ্টই বোঝা যায়। নির্মাণকার্য শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় আট বছর।

১২২ মিটার লম্বা কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে দুধ-সাদা রঙের প্রাসাদে রয়েছে সর্বমোট ২৪টি কক্ষ, যাকে ঘিরে রয়েছে সুন্দর বাগান। প্রাসাদের গম্বুজ আকৃতির মিনারগুলি, বিরাট ‘দরবার কক্ষ’, রাজা-রানির বিশ্রামকক্ষ, সুউচ্চ নজরমিনার সবই চমৎকৃত করবে। রুদ্রসাগরের পাড় থেকে জলের মধ্যে থাকা নীরমহলকে দেখে রাজস্থানের উদয়পুরের লেক-প্যালেস ‘জগনিবাস’-এর (পিছোলা লেকের উপর অবস্থিত) কথা মনে পড়বে। রুদ্রসাগর লেকের জলেও পড়ে নীরমহলের প্রতিবিম্ব। ৫.৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রুদ্রসাগর সরোবর বিভিন্ন ধরনের পাখির (বিশেষত পরিযায়ী) জলকেলির এক নিরাপদ ঠাঁই। নীরমহলের প্রশস্ত ছাদ থেকেও রুদ্রসাগরের এক দারুণ দৃশ্য চোখে পড়ে।

রুদ্রসাগরের পাড় থেকে (সাগরমহল ট্যুরিস্ট লজের প্রান্তে) নিয়মিত মোটরবোট চলাচল করে নীরমহল পর্যন্ত, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি। ভাড়া মাথাপিছু ১০ টাকা। সপ্তাহের প্রতি দিনই খোলা থাকে নীরমহল। জুলাই মাসে প্রতি বছর এক নৌকা প্রতিযোগিতার আসরও বসে রুদ্রসাগরের জলে। নীরমহল প্রাসাদে ঢোকার প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা। স্টিল ক্যামেরার চার্জ ২০ টাকা। ভিডিও ক্যামেরার চার্জ ৪০ টাকা।

নীরমহল।

উদয়পুর: দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সদর শহর হল উদয়পুর। আগরতলা থেকে দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। মধ্যযুগে ত্রিপুরার রাজাদের রাজধানীও ছিল এই উদয়পুর। সে সময় রাঙামাটি নামেই পরিচিত ছিল এই জায়গাটি। রাজস্থানের উদয়পুরের মতোই ত্রিপুরার উদয়পুরকেও ‘লেক সিটি’ বলাই যায় নির্দ্বিধায়। সুখসাগর, অমরসাগর, জগন্নাথ দিঘি, মহাদেব দিঘি ইত্যাদি সুদৃশ্য জলাশয় সৌন্দর্য বাড়িয়েছে উদয়পুরের। আবার মন্দির-নগরীও বলা যেতে পারে উদয়পুরকে। ত্রিপুরাসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী, গুণবতী মন্দিররাজি, বিষ্ণু মন্দির, মহাদেব মন্দির, দুর্গামন্দির, জগন্নাথ মন্দিরের মতো প্রাচীন ও বিখ্যাত মন্দিরগুলির অবস্থান এখানেই। আগরতলা থেকে উদয়পুর যাওয়ার পথেই পড়বে তেপানিয়া ইকো-পার্ক (এখান থেকে উদয়পুরের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার)। সুন্দর এই পার্কটিতে ঝুলন্ত সেতু, অর্কিড হাউস, গাছবাড়ি, ক্যাকটাস হাউস প্রভৃতি রয়েছে। ঘন জঙ্গলে ঘেরা সুদৃশ্য পার্কটি দেখেও চলে যেতে পারেন উদয়পুর। নীরমহল থেকে উদয়পুরের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার।

গুণবতী মন্দির।

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির: ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে মহারাজা ধন্যমাণিক্য প্রতিষ্ঠিত ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দিরটি মাতাবাড়ি নামেই বেশি পরিচিত স্থানীয় মানুষজনের কাছে। কচ্ছপ আকৃতির এক অনুচ্চ টিলার উপরে অবস্থান এই মন্দিরের। ৫১ সতীপীঠের অন্যতম পীঠ এই ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরে সারা বছরই ভিড় লেগে থাকে পুণ্যার্থীর। কালীপুজোর সময় দু’দিনব্যাপী এক বড় মেলা বসে মন্দিরপ্রাঙ্গনে। আটচালা আকৃতির লালরঙা মন্দিরটির শীর্ষে রয়েছে স্তূপ, আর তারও উপরে রয়েছে কলস। কথিত আছে, সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পড়েছিল এখানে। মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী (কালীমূর্তি) মূর্তিটি কষ্ঠিপাথরের। ধন্যমাণিক্যর পরবর্তীকালে রাজা কল্যাণমাণিক্য মন্দিরের পিছনে একটি দিঘি খনন করান, যা তাঁর নামেই কল্যাণসাগর বলে খ্যাত হয়। দিঘি খননের সময় মাটির ভিতর থেকে আর একটি মূর্তি পাওয়া যায়। যে মূর্তিটিকেও কল্যাণমাণিক্য এই মন্দিরেই প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিপুরাসুন্দরীর মূর্তির পাশেই। অপেক্ষাকৃত ছোট এই মূর্তিটিই (দেবী চণ্ডীর) ‘ছোট মা’ বা ‘ছোটি মা’ রূপে পূজিতা হন। মন্দিরের সামনে রয়েছে বড় এক নাটমন্দির। আর পিছনে রয়েছে সেই কল্যাণসাগর। অগণিত মাছ ও কচ্ছপের বাস এই দিঘিতে। বিভিন্ন পূজা-পার্বণে বলিপ্রথাও চালু আছে এখানে। ভোর সাড়ে ৪টে থেকে রাত ১০টা অবধি খোলা থাকে মন্দির ভক্তদের জন্য, দুপুরে এক ঘণ্টা (১.৪৫ থেকে ২.৪৫ অবধি) শুধু বন্ধ থাকে গর্ভগৃহে দেবীকে ভোগ নিবেদনের জন্য। এখানকার প্যাঁড়া খুব বিখ্যাত তার স্বাদের জন্য। পুজোর জন্য তো বটেই, এমনিও সংগ্রহ করতে পারেন বাড়ির জন্য। মন্দিরের কাছেই রয়েছে সুবিখ্যাত ‘রাজেশ্বরী প্যাঁড়া ভাণ্ডার’ (ফোন: ০৯৪৩৬৫-২১৮১৩)। এখানকার ক্ষীরের প্যাঁড়ার খ্যাতি আছে।

ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দিরের মা ত্রিপুরাসুন্দরী।

ভুবনেশ্বরী মন্দির: মহারাজা গোবিন্দমাণিক্য তাঁর আরাধ্যা দেবী ভুবনেশ্বরীর এই মন্দিরটি নির্মাণ করান ১৬৬০-১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত টেরাকোটার এই মন্দিরটি অবশ্য বিগ্রহহীন। অতীতে এই মন্দিরে নাকি নরবলি দেওয়া হত। এমনটাই জনশ্রুতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত নিয়েই রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘বিসর্জন’ এবং উপন্যাস ‘রাজর্ষি’। মন্দিরের পাশেই রয়েছে প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

গুণবতী মন্দিরাজি: তিনটি পাশাপাশি টোরাকোটা মন্দির রয়েছে একই চত্বরে। এইগুলি মহারানি গুণবতী (মহারাজা গোবিন্দমাণিক্যের স্ত্রী) নির্মাণ করান ১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে। আর তাঁর নামেই পরিচিত হয় এই মন্দিররাজি। মন্দিরগুলি বিগ্রহহীন হলেও এদের নির্মাণশৈলী কিন্তু চোখ টানে।

দক্ষিণ ত্রিপুরার পিলাক এক ঐতিহাসিক স্থান।

পিলাক: দক্ষিণ ত্রিপুরার পিলাক এক ঐতিহাসিক স্থান। বৌদ্ধ ও হিন্দু স্থাপত্যের অনেক বিস্ময়কর নির্দশন পাওয়া গিয়েছে পিলাক ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১১৪ কিলোমিটার। প্রাচীন মন্দিরগুলির ধ্বংসাবশেষগুলিও যথেষ্ট নজরকাড়া। এখান থেকেই পাওয়া গিয়েছিল নবম শতাব্দীর ‘অবলোকিতেশ্বর’ ও দ্বাদশ শতাব্দীর ‘নরসিংহ’-র বিশাল মূর্তিগুলি। এই মূর্তিগুলি বর্তমানে আগরতলার সরকারি মিউজিয়ামে রাখা আছে। এখনও পিলাকে রাখা গণেশ, দুর্গা ও সূর্যমূর্তি (১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট) পর্যটকের মনে বিস্ময় সৃষ্টি করে। পিলাকের কাছে ঋষ্যমুখ থেকেও পাওয়া যায় বুদ্ধের দু’টি ব্রোঞ্জের মূর্তি। ঐতিহাসিক ভাবে প্রথমে বৌদ্ধ রাজারা ও পরবর্তীকালে হিন্দু রাজাদের শাসনকালে নমুনা পাওয়া যায় এই জায়গায়। খুব কাছেই অবস্থিত বাংলাদেশের ময়নামতী ও পাহাড়পুরের সঙ্গেও এই জায়গার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বিশেষ ভাবেই চোখে পড়ে। উদয়পুর থেকে পিলাকের দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার।

মহামুনি প্যাগোডা: দক্ষিণ ত্রিপুরার আর একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র হল মহামুনি প্যাগোডা। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১৩৪ কিলোমিটার। উদয়পুর থেকে দূরত্ব ৮২ কিলোমিটার আর পিলাক থেকে দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। মহামুনি প্যাগোডার অবস্থান হল মনুবংকুল নামক স্থানে। স্বর্নাভ প্যাগোডাটি শুধু যে সুদৃশ্য তাই নয়, সারা বছরই দেশ ও বিদেশের (মায়ানমার, জাপান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ) প্রচুর বৌদ্ধ পুণ্যার্থীও আসেন এই বৌদ্ধতীর্থে। এখান থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরেই সাবরুম। এখানেই বাংলাদেশ সীমান্ত ফেনী নদীর ওপারে। দেখে নিতে পারেন সেটিও একযাত্রায়।

প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।

তৃষ্ণা অভয়ারণ্য: ১৯৪.৭০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট এই বনাঞ্চলটি অভয়ারণ্যের শিরোপা পায় ১৯৮৭ সালে। এই অভয়ারণ্যের মুখ্য আকর্ষণ হল গাউর বা ইন্ডিয়ান বাইসন। অভয়ারণ্যের একটি অংশে আছে বাইসন পার্ক। যেটি দেড় শতাধিক বাইসনের অবাধ চারণভূমি। তৃষ্ণা অভয়ারণ্যের আর এক আকর্ষণ হল বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির প্রাণী ‘হুলক গিবন’। এ ছাড়াও ক্যাপড্ লাঙ্গুর, গোল্ডেন লাঙ্গুর, বার্কিং ডিয়ার ও বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য পাখিরও দেখা মেলে এই বিস্তৃত অরণ্যাঞ্চলে। আগরতলা থেকে দূরত্ব ১১১ কিলোমিটার ও উদয়পুর থেকে ৬০ কিলোমিটার।

কালাপানিয়া নেচার পার্ক: ২০০৪ সালে রাজ্য বন দফতরের উদ্যোগে ২১ হেক্টর পতিত জমিকে বনসৃজন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিণত করা হয়েছে এই নেচার পার্কে। চোখজুড়নো সবুজে মোড়া পার্কটির পরিবেশ ভারী সুন্দর। দু’টি টিলার মধ্যে রয়েছে একটি লেক, যেখানে বোটিং-এর ব্যবস্থাও আছে পর্যটকদের জন্য। আর রয়েছে একটি ‘নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার’ পার্কের কেন্দ্রস্থলে। অবশ্যই দেখে নিতে হবে সেটিও। আগরতলা থেকে কালাপানিয়া নেচার পার্কের দূরত্ব ১১৬ কিলোমিটার, উদয়পুর থেকে দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার।

রাত্রিবাস:

ক) ‘সাগরমহল ট্যুরিস্ট লজ’-এ (মেলাঘর) রাত্রিবাস করে দেখে নিন নীরমহল। দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া (এসি) ৭৫০-৯০০ টাকা।

খ) উদয়পুরে ‘গোমতী যাত্রী নিবাস’-এ রাত্রিবাস করে দেখে নিতে পারেন উদয়পুর, পিলাক, মহামুনি প্যাগোডা, তৃষ্ণা অভয়ারণ্য ও কালাপানিয়া নেচার পার্ক। দ্বিশয্যাঘরের (এসি) ভাড়া ৬০০-৮০০ টাকা।

গ) এ ছাড়া ইচ্ছে করলে পিলাক দর্শনের জন্য জোলাইবাড়িতে ‘পিলাক ট্যুরিস্ট লজ’ (দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ৪৫০-৬০০ টাকা), মহামুনি প্যাগোডা ও সাবরুম দর্শনের জন্য সাবরুমের ‘দক্ষিণায়ন ট্যুরিস্ট লজ’ (দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ৩৩৭-৪৮৭ টাকা) আর তৃষ্ণা অভয়ারণ্য দেখার জন্য বেলোনিয়ার ‘মুহুরী পর্যটন নিবাস’-এ (দ্বিশয্যাঘরের ভাড়া ২৫০-৭০০ টাকা) রাত্রিবাস করতে পারেন। তবে হাতে সময় কম থাকলে উদয়পুর কিংবা মেলাঘরে থেকেই সব ক’টি জায়গাই দেখে নেওয়া যায়।

প্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ।

বিস্তারিত তথ্য ও সরকারি ট্যুরিস্ট লজের বুকিং-এর জন্য যোগাযোগ:

অতুল দেববর্মা, অধিকর্তা, ত্রিপুরা ট্যুরিজম, কলকাতা শাখা (ত্রিপুরা ভবন, ১ প্রিটোরিয়া স্ট্রিট, কলকাতা-৭১)

ফোন: ৯৩৩১২-৩১৪৫৯, ৭৯৮০১-০৩০৮১

যাত্রাপথ: আগরতলা থেকে গাড়িভাড়া করেই ঘুরে নিতে হবে দক্ষিণ ত্রিপুরার এই সব জায়গা। গাড়িভাড়া পড়বে ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে (ইন্ডিকা, ওয়াগন আর, ইকো ইত্যাদি) ২২০০-২৫০০ টাকা (প্রতি দিন), আর বড় গাড়ির ক্ষেত্রে (স্করপিও, বোলেরো, জাইলো ইত্যাদি) ৩০০০-৩৫০০ টাকা প্রতি দিন।

যোগাযোগ: সঞ্জীব আচার্য, নীলজ্যোতি ট্রাভেলস, আগরতলা

ফোন: ০৯৪৩৬৪-৫৬০৮৮, ০৯৮৫৬০-৯৩০০৭

 

Categories
ইতিহাস ও ঐহিত্য

পা ফেললেই ইতিহাস!

বিভিন্ন সুত্রমতে মনে করা হয় বাংলাদেশে প্রায় ২,৫০০ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪৫২টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এসব প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকে। তেমনি আমাদের দেশের কিছু বিখ্যাত কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহ সম্পর্কে আসুন জেনে নেই।

আহসান মঞ্জিলঃ আহসান মঞ্জিলের প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গণি, এটি পুরাণ ঢাকার ইসলামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। ১৮৫৯ সালের ভবনটির নির্মান শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৮৭২ সালে। নওয়াব আবদুল গণি তার ছেলের নাম অনুসারে ভবনটির নাম দেন আহসান মঞ্জিল। এ ভবনটি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী যেমন ১৯০৬ সালে এই ভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। বর্তমানে ভবনটি জাদুঘর হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।উয়ারী বটেশ্বরঃ ঢাকা থেকে মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হচ্ছে উয়ারী বটেশ্বর। মাটির নিচে অবস্থিত দুর্গ-নগরীটি এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো।কান্তজীউ মন্দিরঃ দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার এবং কাহারোল উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সুন্দরপুর ইউনিয়নে, দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে একটি প্রাচীন মন্দির হচ্ছে কান্তজীউ মন্দির। তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিলো বলে এটি নবরত্ন মন্দির নামেও পরিচিত। মন্দিরটি ১৮ শতকে নির্মিত চমৎকার একটি ধর্মীয় স্থাপনা। এটি কৃষ্ণের মন্দির হিসেবে পরিচিত যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে করা হয়।পাহাড়পুরঃ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। এটি সোমপুর বিহার বা সোমপুর মহাবিহার নামেও পরিচিত। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব নবম শতকে এই বিহার তৈরি করছিলেন। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এটি আবিষ্কার করেন। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়। পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। ৩০০ বছর ধরে এটি চীন, তিব্বত, মায়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধদের কাছে বিখ্যাত ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র ছিল।

বড়কুঠিঃ বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন ইমারতের নাম বড়কুঠি। ভিন্ন সুত্র মতে ধারণা করা হয় বড়কুঠির নির্মাণকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথমে ওলন্দাজ বা ডাচদের বাবসাকেন্দ্র ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ডাচরা ভারতে যখন তাদের কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৮১৪ সালে ইংরেজদের সাথে একটি চুক্তি করে বড়কুঠিসহ ভারতের সকল বাবসা কেন্দ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হস্তান্তর করে। ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত এটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম প্রশাসনিক ভবন হিসাবে বড়কুঠিকে ব্যবহার করা হয়।

মহাস্থানগড়ঃ বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত মহাস্থানগড়ের পূর্ব নাম ছিল পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসাবে পরিচিত। এক সময় এটি বাংলার রাজধানী ছিল। এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন সাম্রাজ্যের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে।

মুঘল ঈদগাহঃ ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোড এলাকায় প্রাচীরেবেষ্টিত মাঠটি মুঘল ঈদগাহ্। এটি ধানমন্ডি ঈদগাহ্ নামে বহুল পরিচিত। ঈদগাহের কেন্দ্রীয় মেহরাবের শিলালিপি থেকে জানা যায় ঈদগাহ্ প্রায় চারশ বছর আগে শাহ্ সুজার আমলে তাঁর দেওয়ান মীর আবুল কাসিম কর্তৃক নির্মিত। প্রায় আড়াইশ ফুট দৈর্ঘ্য এবং দেড়শ ফুট প্রস্থে চুন-সুরকির প্রাচীর বেষ্টিত থাকলেও বর্তমানে কেবলমাত্র পশ্চিম দিকের মূল উঁচু দেয়ালটি দন্ডায়মান। ঈদগাহটি পর্যটকগণের জন্য একটি আকর্ষনীয় স্থান।

ময়নামতিঃ ময়নামতি কুমিল্লায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। লালমাই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন হল ময়নামতি প্রত্নস্থল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে জয়কর্মান্তবসাক নামে ময়নামতির এ অঞ্চলটি একটি প্রাচীন নগরী ও বৌদ্ধ বিহারের অবশিষ্টাংশ ।লালবাগ কেল্লাঃ লালবাগের কেল্লা ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত প্রাচীন দুর্গ। মোঘল আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে লালবাগের কেল্লা দাঁড়িয়ে আছে। পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত বলেই এটির নামকরন করা হয়েছে লালবাগের কেল্লা। বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল হিসাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ এই কেল্লা এলাকার রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে।

ষাট গম্বুজ মসজিদঃ ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় এটি কে নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় নি। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখে খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারনা পাওয়া যায়। ১৫শ শতাব্দীতে এটি নির্মিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য এর মর্যাদা দেয়।সোনারগাঁওঃ সোনারগাঁও বাংলার মুসলিম শাসকদের অধীনে পরিচালিত একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র। ঢাকা থেকে মাত্র ২৭ কিলোমিটার দূরে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা হচ্ছে সোনারগাঁও। ধারনা করা হয় বিস্তৃত এ জনপদটি পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী ও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল।