Categories
Uncategorized

চৈইক্ষ্যং-সীমান্তের শেষ পাড়া…

———————————————————————- বাবর আলী

উঁচু কোনো পাহাড় চূড়া কিংবা দুর্গম কোনো ঝরনায় যেতে পারাটা সবসময় আনন্দের। তবে আমার কাছে এর চেয়েও তৃপ্তির ব্যাপার হলো অজানা-অচেনা নতুন কোনো পাহাড়ি পাড়াতে রাত্রিযাপন। কোনো এক পাহাড়ি পরিবারের সাথে তাদেরই ঘরের এক কোণে অজানা ভাষায় কিচির-মিচির শুনতে শুনতে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার অনুভুতিটাই কেমন যেন স্বর্গীয়। এবারের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশ সীমান্তের শেষ পাড়া চৈইক্ষ্যং পাড়া। পাড়াটার অবস্থান  একেবারে মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া। এই পাড়া থেকে মায়ানমারের সীমান্ত মাত্র ২০-২৫ মিনিট দুরত্বের। আর মায়ানমারের নিকটবর্তী জনবসতি পিখিয়ং পাড়া যেতে এই পাড়া থেকে সর্বসাকুল্যে ঘন্টাদেড়েক লাগে। অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই পাড়ার নিকটবর্তী পাড়ায় যেতে সময় লাগে সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টা। তাই দৈনন্দিন জীবন-যাপন থেকে শুরু করে বিয়ে-শাদীর মতো সামাজিক ব্যাপারেও এই পাড়ার লোকেরা সীমান্তের ওপারের পাড়ার প্রতি অনেকাংশেই নির্ভরশীল। তাদের নিত্য যোগাযোগ লেগেই আছে। তাছাড়া এই পাড়ার অধিকাংশ লোকের জুম-ই মায়ানমার সীমান্ত লাগোয়া।

DSC_0241

আগের রাতটা কাটিয়েছিলাম সিলোপি পাড়াতে। রাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ব। ঘুম ভাঙতেই দেখি আমি লালে লাল! না,এই গহীনে এসে কোনো নগদ অর্থযোগ ঘটেনি। ঘটনা হলো,আগেরদিন সিলোপি পাড়ায় আসার সময় জোঁকের উপর্যুপরি অত্যাচারে শরীরের কয়েকটি অংশে অস্থায়ী নলের সৃষ্টি হয়েছিল। পাড়ায় এসে রাশিক ও লিটু ভাইয়ের সহায়তায় গুল, তুলা, গজ দিয়ে কোনোরকমে নলগুলো  বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। রাতে ঘুমের মধ্যে নড়া-চড়ার ফলে সেই বন্ধ হওয়া কিছু নল আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে খুলে গিয়েছে। সেই সকাবেলাতেই তিরিক্ষি মেজাজ নিয়েই আবার গজ-তুলা নিয়ে বসতে হল। সে-পর্ব শেষ করে পেনিষ্টোভে নুডলস আর কফি বানাতে বসে পড়লাম। এর মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে আমার সাথে যোগ দিল দুই ট্রিপমেট রাশিক আর লিটু ভাই। প্রাতঃরাশ সেরে আমাদের গন্তব্য সীমান্তের শেষ পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। মূল গন্তব্য চৈইক্ষ্যং পাড়া হলেও যাত্রাপথে আমাদের আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। সেটা হল ‘না থাম ভা’ ঝরনার শেষ ধাপগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। গুগল আর্থে এই ঝরনার ৩টি ধাপ চিহ্নিত করা আছে। আমরা জানতাম এই ঝরনার আরো বেশকিছু ধাপ আছে। দার্জিলিং পাড়া থেকে আমাদের সঙ্গী হওয়া দাদাও অন্য ধাপগুলোর ব্যাপারে বেশকিছু তথ্য দিলেন। দাদা বছর পনের আগে ঐ ঝরনাগুলোতে গিয়েছিলেন। মুলত ভালুক শিকারের উদ্দেশ্যেই ঐ দিকটাতে সে গিয়েছিল। দাদা সাথ থাকাতে আমাদের জন্য অবশ্য ভালোই হয়েছে। এবারের ট্রিপে এমনিতেই আমাদের সাথে কোনো গাইড নেই। তার উপর সাথে নেই এই ঝরনাগুলোর কোনো জিপিএস ট্রেইলও। যদিও দাদার গন্তব্য অবশ্য শেপ্রু পাড়া। নিজের পাড়ার জুম উৎসবের জন্য শুকর আনার গুরুদায়িত্ব পড়েছে তার ঘাড়ে।

DSC_0224-fb

সিলোপি পাড়া থেকে ট্রেইলের শুরুতে বেশ খানিকটা উৎরাই। নামতে নামতে একদম ‘না থাম ভা’ ঝিরির গোড়ায়। শর্টকাট মারার প্রবণতায় ঝিরির পথ না ধরে পাহাড়ি ট্রেইল বেছে নিলাম। কিছুদূর গিয়েই পথ হারালাম। ট্রেইলটা একটা জায়গায় গিয়ে একেবারে ডেড এন্ড। নীচে তাকিয়ে দেখি বিশাল একটা শ’দুয়েক ফুটের ড্রপ। ব্যাকট্রেক করে আগের জায়গায় ফিরে গিয়ে একেকজন একেকদিকে রেকি করতে গেলাম। ‘পথ পাইছি’-লিটু ভাইয়ের চিৎকার শুনে ওদিক লক্ষ্য করে এগুতে থাকলাম। এরপর শুরু হলো টানা উৎরাই। পাহাড়ের একেবারে গা ঘেঁষে গাছের শিকড়-বাকড় ধরে এগুচ্ছি। তবে এর মধ্যেই রাশিক রেম দাদার দেয়া ‘ভম’ নামটির সার্থকতা রক্ষা করে চলেছে। বম ভাষায় ভম শব্দের অর্থ ‘ভালুক’। ভালুক নাকি বর্ষায় ভুট্টা ক্ষেতে আছাড় খেতে খেতে পথ চলে। রাশিককে চলার পথে উপর্যুপরি আছাড় খেতে দেখেই রেমদার এই নামকরণ। আর কিছুদূর নামতেই ঝিরির দেখা পেলাম। অল্প কিছুদুর এগুতেই ঝরনার আওয়াজে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। বাঁক ঘুরতেই দেখি বিশাল এক ঝরনা। উচ্চতায় শ’দেড়েক ফুটের মত হবে। বেশ কিছুক্ষণ পানিতে দাপিয়ে উঠে পড়লাম।

 DSC_0226-fb

এইবারের পথ উল্টোদিকের পাহাড়ি রিজ ধরে। রিজ ধরে চলছি তো চলছিই। হঠাৎ চোখ আটকাল একটা বড়সড় গাছে। গাছের গায়ে খোদাই করে লেখা ‘এল পি’। দেখেই বুকটা ধ্বক করে উঠল। আগের দিনই অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত মায়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী এই দলের হাতে পড়েছিলাম আমরা। আমাদের ব্যাক-প্যাক আর তাঁবুগুলো তল্লাশি করে ছেড়ে দিয়েছিল। কোন অনিস্ট অবশ্য করেনি। তারপরও এই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আর হতে চাই না। হয়তো কাছেই কোথাও তাদের ক্যাম্প থাকতে পারে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঐ পথে না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছুক্ষণ ইতি-উতি করে এদিক-সেদিক ঘুরে একটা পথও পেয়ে গেলাম। পথ বললে অবশ্য ভুল হবে! পাহাড়ের গা ঘেঁষে দোয়া-দরুদ পড়তে পড়তে কোনোরকমে এগুনো। কিছুদূর যেতেই একটা নড়বড়ে আধশোয়া মরা গাছ পড়ল। ওটার উপর দিয়ে যেতে হবে। প্রথম দেখাতেই মনে প্রশ্ন জাগল, নড়বড়ে গাছটা আমাদের শরীরের ওজন নিতে পারবে তো? রাশিক আর লিটু ভাই কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হয়ে গেল। এবার আমার পালা। মাঝপথে আসতেই আমার আশংকাকে সত্যি করে গাছের গুড়ি সমেত আমি নীচের দিকে দেবে গেলাম। শেষ মুহূর্তে গুড়ি থেকে পা সরে যাওয়াতে আমি নীচের দিকে গড়িয়ে পড়া শুরু করলাম। পনের ফুটের মতো গড়াতেই দৈবক্রমে আমার হাত একটা গাছের গুড়িতে কিভাবে জানি আটকে গেল। নীচে তাকাতেই আক্ষরিক অর্থে মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোতের একটা ধারা বয়ে গেল। রেমদা তৎক্ষনাৎ দড়ি বের করে আমাকে উদ্ধার করলেন। যে ৩০ সেকেন্ডেরর মতো সময় গাছের গুড়িতে ঝুলে ছিলাম, সময়টাকে মনে হয়েছিল অনন্তকাল।

এরপর শুরু হলো একের পর এক বিস্ময়ের পালা। একটু এগুলেই দেখা মিলছিল অনিন্দ্যসুন্দর সব ঝরনা আর ক্যাসকেডের। এ বলে আমাকে দেখ, ও বলে আমাকে দেখ! ঝরনা-ক্যাসকেড দেখতে দেখতে মোটামুটি ত্যাক্ত-বিরক্ত। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর সুন্দর ছিল শেষ ঝরনাটি। ঝরনার পানি যেখানটায় পাশের ঝিরির সাথে মিশেছে সেখানে দুদিকে দু’রংয়ের পানি। মুগ্ধ নয়নে কিছুক্ষণ সেটাই উপভোগ করলাম। ঝিরি ধরে আর বেশ কিছুক্ষণ এগুতেই পেয়ে গেলাম রেমাক্রি খালের দেখা। খাল দেখেই সোজা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। গোসল সেরে পেটপুজাটা খালের পাশেই সারা হল। পেটপূজার মাঝখানেই দেখলাম বিপরীত দিক থেকে ক’জন আসছে। কথা বলে জানতে পারলাম তারা চৈইক্ষ্যং পাড়ার অধিবাসী। আমরাও চৈইক্ষ্যং পাড়া যাব জানতে পেরে একসাথে যাওয়ার জন্য বললো। তাদের স্নানপর্ব শেষ হতেই পাড়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমদিকের পথটা টানা চড়াই।সরু ট্রেইলটা খালের নীচ থেকে কুন্ডলী পাকানো দড়ির মতো পাহাড়ের উপরে গিয়ে মিশেছে। বেশ কিছুদূর উঠে যাওয়ার পর শুরু হলো উঁচু উঁচু সব গাছে ভর্তি এক জঙ্গল। বেশীরভাগ গাছই শতবর্ষী। প্রকাণ্ড গাছগুলোর ফাঁক গলে সূর্যদেব এই ভরদুপুরে ঠিকই তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে আছে জানা-অজানা পাখির কিচিরমিচির। আশেপাশের পাহাড়গুলো যেন সবুজ কার্পেটে মুড়িয়ে দিয়েছে কেউ। পথ চলতে চলতেই সাথের দাদাদের সাথে টুকটাক কথা-বার্তা চালাচ্ছিলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম, সাথের দাদাদের মধ্যে একজন চৈইক্ষ্যং পাড়ার মেম্বার। অন্যদের তুলনায় দাদা বেশ ভালোই বাংলা বলেন এবং বোঝেন। প্রথম দেখাতে তাকে অবশ্য পাহাড়ি বলে মনেই হয় না, বাঙ্গালী বলে ভ্রম হয়। অল্প এগুতেই সামনে বেশ হাঁক-ডাক শোনা গেল। ক’জন পাহাড়ি দাদা দুটো বিশাল আকারের গয়াল নিয়ে ফিরছে। কুশল বিনিময়ের পর জানতে পারলাম, তারা থিংদলতে পাড়ার অধিবাসী। বার্মা গিয়েছিল ফাঁদ পেতে গয়াল ধরতে। এখন পাড়ার দিকে ফিরছে। আর সামান্য চড়াই ভাঙতেই বহুল কাংক্ষিত চৈইক্ষ্যং পাড়ায় পৌছে গেলাম। পাড়ায় ঢুকতেই সবুজে ছাওয়া বিশাল এক মাঠ যেন অভ্যর্থনা  জানাল। মাঠের একপাশে গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ। গয়ালই সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে। অন্যপাশে ধুমসে ফুটবল খেলছে পাড়ার বাচ্চারা। রেম’দার পরিচিত এক ঘরে উঠার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মেম্বার দাদার পীড়াপীড়িতে উনার ঘরেই উঠতে হল। কাঠের দোতলা ঘরটার অবস্থান মাঠের একেবারে শেষপ্রান্তে। অতিকায় এক গয়ালের খুলি ঘরে ঢুকতেই আমাদের সম্ভাষণ জানাল। বিশালাকার সেই গয়ালের খুলির প্রতি আমাদের বিস্ময়ভরা চাহনি দেখে মেম্বার দা হেসে জানালেন, বছর কয়েক আগে বার্মার জংগলে শিকার করেছিলেন এই গয়ালটি। মেম্বারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন আর খুব একটা শিকারে যাওয়া হয় না তার। এ নিয়ে আফসোসও করলেন কিছুক্ষণ। পাশের ঝিরিতে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে তাকাতেই মাথা নস্ট হওয়ার জোগাড়। মেঘের সমুদ্র থেকে উঁকি দিয়ে যেন চারপাশটা দেখছে বাংলাদেশের উচ্চতম পাহাড় সাকা হাফংয়ের চূড়াটা। মেঘ আড়াল করে রেখেছে তার নীচের অংশটাকে। আর চারপাশের ভাসমান পেঁজা তুলার মতো মেঘ থেকে মাথা উঁচিয়ে সদর্পে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে চূড়াটি। ঝিরি থেকে ফিরে মেম্বার দাদার ভাইয়ের শিকার করা রামছাগলের মাংস দিয়ে দুপুরের খাবারটা জমকালোই হলো। খানিকক্ষণ জিরিয়ে বিকেল হতেই পাড়ার আশপাশটা ঘুরে দেখতে বেরুলাম। সঙ্গ দিল পাড়ারই ছেলে মালসম বম। ঢাকার একটি কলেজের এইচএসসির ছাত্র সে। সামনে জুম উৎসব, তাই বাড়ি ফিরেছে। পাড়ার ঘরে ঘরে জুম উৎসবের আয়োজন দেখাতে নিয়ে চলল সে। কিছুক্ষণ চার্চেও বসলাম। উৎসব উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন চলছে সেখানে। শেষ বিকেলটা পাড়ার ছেলে-পেলেদের ফুটবল ম্যাচ দেখতে দেখতেই কেটে গেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই মাঠের একপাশে বাঁশের বেঞ্চিতে বসে সাকা হাফংয়ের উপর মেঘের খেলা দেখতে লাগলাম। সূর্যের সোনালী আভা পড়ে এতক্ষণের শ্বেত-শুভ্র মেঘগুলোতে যেন রং ধরেছে। ক্ষণে ক্ষণে রং পালটাচ্ছে ভাসমান সাদা মেঘের ভেলাগুলো। আচমকা আমাদের বাঁশের বেঞ্চিটা ভেঙে পপাতঃধরণীতল। পাড়ার যুবতী মেয়েগুলো আমাদের দেখে দেখে হি-হি-লি-লি করতে লাগল। বাঁশের কঞ্চির সাথে লেগে প্যান্ট ফেঁসে গেলেও ‘তেমন ব্যাথা পাইনি’ এমন একটা ভাব করে পাড়ার মেয়েদের সামনে দিয়ে সটানে হেঁটে এলাম।

সন্ধ্যার পরে মালসম পাড়ার অন্যপ্রান্তে তার মামার বাসায় নিয়ে গেল। তারা সবেমাত্র তাদের রাতের খাবার নিয়ে বসেছে। আমাদেরকেও খেতে বসার জন্য আমন্ত্রণ জানালো। ‘তরকারি কি?’- কৌতুহলবশত রাশিকের করা প্রশ্নের উত্তরে মালসমের মামা একগাল হেসে জানালেন, আজকেই তিনি মায়ানমারের জঙ্গল থেকে একটি বানর শিকার করেছেন। রাতের ভুড়িভোজের আয়োজন সেটা দিয়েই। নিজের পূর্বপুরুষদের মাংস খেতে হবে-এটা ভাবতেই গা কেমন গুলিয়ে উঠল।একদম খিদে নেই-বলে এযাত্রা রক্ষা পেলাম। রাত আরেকটু বাড়তেই মেম্বারদার ঘরে ফিরে গেলাম আমরা। ঘরে ঢুকতেই দেখি বিশাল ভিড়। ভিড়ের উৎস খুঁজতে  গিয়ে দেখলাম, ঘরের এক কোণে একখানা পোর্টেবল ডিভিডি প্লেয়ার। মায়ানমারের একটা মিউজিক ভিডিও চলছে সেখানে। পাড়ার ছেলে-বুড়োদের একটা বড় অংশ নিবিস্ট মনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে সেটারই স্ক্রীনের দিকে। মেম্বারদা এবার রুমাবাজার থেকে ফেরার সময় নতুন মিউজিক ভিডিও নিয়ে এসেছেন। সেটারই প্রিমিয়ার শো চলছে এখন। গুটিসুটি মেরে এককোণে শুয়ে পড়লাম। ভিনদেশি সেই মিউজিকের অচেনা সুরে কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম কে জানে। সকাল হতেই ফিরতি যাত্রার প্রস্তুতি শুরু। মেম্বারদা বড়দিনে আবার আসার আমন্ত্রণ দিয়ে রাখলেন। মালসম বম দিল আরো বড় টোপ। বড়দিনে পাড়ায় আসলে সে আমাদেরকে মায়ানমারের বিশাল বড় এক ঝরনায় নিয়ে যাবে বলে কথা দিল। চোখে-মুখে সেই ঝরনার ছবি আঁকতে আঁকতেই আমরা ফিরতি পথ ধরলাম।

   DSC_0219-fb

লেখকের ফেসবুক আইডি লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

Categories
Uncategorized

ঝরনার নাম কাই লো ভা…

———————————————————- বাবর আলী

পাড়া থেকে বেরিয়ে ঘন্টাখানেক হাঁটতেই ঝাঁ ঝাঁ রোদে দফা-রফা অবস্থা। অল্প দূরেই ট্রেইলের পাশে একটা জুমঘর দেখে সেখানেই কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেব বলে মনস্থির করলাম। মিনিট দশেক পরেই সবুজ পাহাড়ের জমিনে বাদামী জুমঘরটার কাছে ভিড়তেই বিকটদর্শন দুটো কালো কুকুর গগনবিদারী চিৎকার শুরু করে দিল। কিছুতেই তারা আমাদের জুমঘরটার কাছে ভিড়তে দিবে না। মুখ দিয়ে উদ্ভট সব শব্দ করে কুকুর পটানোর নানারকম কায়দা-কসরত করেও খুব বেশী সুবিধা করতে না পেরে একসময় রণে ক্ষান্ত দিল রাশিক। বাইরে হাউ-কাউ শুনেই সম্ভবত জুমঘরের ওপাশটা থেকে বেরিয়ে এলেন জুমঘরের মালিক। কানে গোঁজা ফুল দেখেই বুঝলাম দাদা ম্রো তথা মুরং। কথা বলার চেষ্টা করতেই আবিষ্কার করলাম দাদার বাংলা জ্ঞান শুন্যের কোটায়। ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝালাম,উনার জুমঘরটায় ক্ষণিকের অতিথি হতে চাই আমরা। দাদা কুকুর দুটোকে ম্রো ভাষায় কি যেন একটা ধমক দিতেই তারা রীতিমতো চুপসানো বেলুন হয়ে গেল। বুঝলাম, সারমেয় গোত্রের এ দু’সদস্য রাশিকের উদ্ভট বাংলা শব্দাবলী বুঝতে না পারলেও ম্রো ভাষায় তারা বেশ সাবলীল! আর এই ফাঁকে আমরা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ছোট্ট সিড়িটা বেয়ে জুমঘরে উঠে পড়লাম।

মাচাটা ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকতেই বুঝলাম, সচরাচর যেসব জুমঘর দেখতে পাওয়া যায় সেসবের তুলনায় এই জুমঘরটিকে রীতিমতো প্রকান্ডই বলা চলে। ঘরের বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে সদ্যই কেটে আনা ধান। আর অন্যপাশে ফিরতেই দেখি ক’জোড়া উৎসুক চোখ আমাদের দিকে চেয়ে আছে।জুমঘরের মালিকের পরিবারের সদস্য তারা। দিনের প্রথমভাগের কাজ শেষ করে সবেমাত্র তারা দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছে। কুকুর দুটোকে শান্ত করে দাদা ঘরে ঢুকেই ভাত নিয়ে বসলেন। ইশারা-ইঙ্গিতে আমাদেরকেও খেতে বললেন। পাড়া থেকে সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এটা জানাতেই একটু পরে গরম গরম ভুট্টা আসলো আমাদের সামনে। ভুট্টা দেখেই আমি আর রাশিক হামলে পড়লাম। গোগ্রাসে আমাদের ভুট্টা খেতে দেখে রেম’দা ঘোষণা করলেন, এই কদিনে আমি আর রাশিক মিলে যতগুলো ভুট্টা খেয়েছি, একটা পূর্ণবয়স্ক ভালুকও এক মৌসুমে এতগুলো ভুট্টা খেতে পারে না! রেম’দার ইনসাল্টকে আমরা কনসাল্ট  হিসেবে বিবেচনা করে আবার পূর্ণ উদ্যমে ভুট্টার প্রতি মনোনিবেশ করলাম। মুখের ভেতর গালভরা ভুট্টা নিয়েই রেম’দার সাথে আজকের গন্তব্য নিয়ে আলোচনা চালাতে লাগলাম। ‘কাই লো ভা’ নামক একটা মনোলোভা ঝরনাতে যাওয়ার ইচ্ছা আজ।  ‘কাই লো ভা’ শব্দের অর্থ ‘যে ঝিরিতে মাছ উঠতে পারে না’। নাম শুনেই বুঝলাম,মনুষ্য প্রজাতির পাশাপাশি মৎস্যকুলের জন্যও যথেস্ট দুর্গম এই ঝরনার উৎসমুখের ঝিরিটি। রেম’দা বারবার করে বলে দিলেন, ঝরনার নীচের দিকে নামাটা বেশ কঠিন।বেশ কিছুদিন আগে তলাংচাঁদ পাড়ার এক ম্রো শিকারী এই ঝরনার উপর থেকে পড়ে মারা গিয়েছে। নীচের দিকে নামতে দড়ির পাশাপাশি দরকার বাড়তি সাবধানতা।।

DSC_0833-fb new

জুমঘরের মাচার দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি পশ্চিম আকাশের খানিকটা ছেয়ে গেছে কালো মেঘে। একটু পরেই হুড়মুড়িয়ে নামলো বৃষ্টি। শরতের এই এক রূপ। ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার রূপবদল। একবার ভাবলাম,আজকের রাতটা এই জুমঘরেই কাটিয়ে দিই। তবে খানিক পরেই ভাবনাটাকে আর ডাল-পালা মেলতে দেয়া গেল না। ঘরের একপাশ দখল করে রাখা পাকা ধানের বদৌলতে ঘরময় এক ধরনের বদখত দেখতে সবুজ পোকার উৎপাতে টেকাই দায়। ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থা সবার। বাইরে তখনো একটানা রিমঝিম বৃষ্টি।

ঘন্টাখানেক পর বৃষ্টি ধরে আসতেই ট্রেইলে নেমে পড়লাম। তলাংচাঁদ পাড়ার লোকেরা এবছর এদিকের পাহাড়গুলোতে জুম চাষ করেছে। তাই জুমের ফাঁক গলে  সুন্দর ট্রেইল করা আছে। হালকা হলুদ ধানগাছগুলোর নুইয়ে পড়া মাথা এড়িয়ে এগুচ্ছি। দুটো পাহাড় ডিঙানোর পর নিচের ঝিরিতে নেমে পড়ার পালা আসলো। লাল মাটির ট্রেইলটা কিছুক্ষণ আগের বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। ট্রেইলে হাঁটা উপভোগ করার চেয়ে আছাড় না খাওয়ার দিকে অখন্ড মনোযোগ সবার। অল্প এগুতেই দুপাশের জুমের হালকা হলুদ ধান গাছের স্থলাভিষিক্ত হলো বাঁশবাগান। দু’সারি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে সামনের দিকে এগিয়েছে ট্রেইলটা। মিনিট দশেক নামতেই নিচের ঝিরিতে গিয়ে পড়লাম আমরা। এবার পাথরের বোল্ডার টপকানোর পালা। এ-পাথর,ও-পাথরে ছোট ছোট লাফ দিয়ে এগুচ্ছি। ঝিরির দু’পাশে ঘন গাছ-পালার জঙ্গল ভেদ করে রোদ নেমেছে কিছু কিছু জায়গায়। কেমন যেন অদ্ভুত আলোয় আলোকিত সেসব জায়গা। ঝিরি ধরে আর খানিকটা এগুতেই ঝিরিটা দু’ভাগ হয়ে গেল। ডানপাশের ঝিরিতে নামতেই দেখা মিলল সুন্দর একটা ক্যাসকেডের। কিছুক্ষণ গা ভিজিয়ে উঠে এলাম সেটার গোড়া থেকে।এবার এই ঝিরি ধরে নীচে নামতে হবে। তাহলেই দেখা মিলবে কাই লো ভার।ঝিরির সুবিধাজনক একটা জায়গায় আমাদের ভারী ব্যাক-প্যাকগুলো রেখে পিঠে শুধুমাত্র ছোট্ট ডে-প্যাকগুলো চাপিয়ে নিলাম।

সামনের বাঁকটা ঘুরতেই দেখি ছোট-খাট একটা পাথর ধসের এলাকা। পাশের পাহাড়টার ঝুরঝুরে আলগা পাথরগুলোই ধসের কারণ। সাবধানে পথটা পাড়ি দিলাম। আরো কয়েকটা বাঁক ঘুরে খানিকটা নিচের দিকে নামতেই নিজেদেরকে আমরা আবিষ্কার করলাম ঝরনার উপরে। এবার নীচে নামার পালা। নামার পথ দেখে ভিরমি খাবার জোগাড়। রেম’দা জানালেন, এদিকটাতে নামার পথেই ঐ ম্রো শিকারী প্রাণ হারিয়েছে। তৎক্ষণাৎ রাশিকের ঝোলা থেকে রশি বের করে সামনের গাছটাতে বাঁধা হল। পাহাড়ের একেবারে কিনার ঘেঁষে এগুতে হবে। কোনোরকমে একজন মানুষ যেতে পারে এমন একটা পথ। হাতের বামপাশে শ’দুয়েক ফুটের খাদ। হাত বা পা ফসকালেই নিচের পাথুরে জমিনে পড়ে একেবারে আলুর দম। বুকের খাঁচার ভেতরে লাফানো হৃৎপিণ্ড নিয়ে দড়ি ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে এগুতে থাকলাম। খানিক পরেই শুরু হলো, পাশের পাহাড় থেকে খসে পড়া ক্ষুদে পাথরের চাঙড়ের এলাকা। পাথরগুলোর উপর পা পড়লেই সরে যাচ্ছে সেগুলো। দুয়েকটা হার্টবিট মিস করে পৌঁছালাম একটা ছাউনীর মতো অংশে। এখানেই প্রথম দেখা দিল ঝরনাটা। চারপাশের সবুজ বনানীর মধ্যে একখন্ড সাদা ফেনিল ঢেউ যেন। উদ্দাম গতিতে নিচের ঝিরিতে পানি ঢেলেই চলেছে। সাবধানে বাকীপথটুকু বেয়ে নেমে এলাম ঝিরিতে। বোল্ডারের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে পথ চলে বসে পড়লাম একদম ঝরনার গোড়ায়। অবিরত ধারায় ধাপে ধাপে গড়িয়ে নিচের ঝিরির দিকে এগুচ্ছে পানি। একটা ধাপে মাথা ডুবিয়ে প্রশান্তির খোঁজ করলাম খানিকক্ষণ। নিচের ক্যাসকেডটাতে গা ডুবিয়ে ততক্ষণে আপন রাজ্যে হারিয়ে গেছে রাশিক।

ঝিরি ধরে ঝরনার নিচের দিকে এগুতেই খেয়াল করলাম, এই ঝিরিটা একটু অন্যরকম। সাধারণত ঝিরিপথগুলোতে পাথরের বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে থাকে ছোট ছোট পাথর আর নুড়ি মিশ্রিত বালি। আর এই ঝিরিটা পুরোটাই পাথুরে একটা উঠান যেন। অল্প-স্বল্প কিছু বিশালাকৃতি বোল্ডারের দেখা পেলেও বালি-নুড়িপাথর একেবারেই অনুপস্থিত। ঝিরি ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই ভয়াবহ পিচ্ছিল পাথুরে জমিনে আছাড় খেয়ে হাঁটুর নীচে একটা আলু গজিয়ে ফেললাম। আর সামনে না এগিয়ে ঝরনার শেষ ধাপটায় এসে আবার মাথা এলিয়ে দিলাম। হঠাৎ গুড়ুমগুড়ুম শব্দে সংবিৎ ফিরে পেয়ে উপরে তাকিয়েই দেখি কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। আসার পথেই ট্রেইল থেকে অল্প দূরেই বেশ কিছু সুন্দর জুমঘর দেখে এসেছি।সে অভিমুখেই হাঁটা ধরলাম। মনের মধ্যে তখনো ভাসছে সবুজের সমুদ্রে একফালি উত্তাল সাদা ঢেউয়ের নিরন্তর নীচে আছড়ে পড়ার ছবি।

DSC_0797-fb

লেখকের ফেসবুক একাউন্ট লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

Categories
Uncategorized

জলের উপর বন দোলে…

বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান বন হলো ‘রাতারগুল ফরেস্ট’।

থৈ থৈ স্বচ্ছ পানিতে ভাসছে এই বন, সেই পানির আয়নায় সারাটা দিন নিজের চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে চির সবুজের এই স্বোয়াম্প ফরেস্ট। নৌকা নিয়ে ঘুরতে হয় এই বনে, বানর আর সাপের সাথে দোস্তি করে ঢুকতে হয় এই বনে – এই বনটা মায়ার, এই বনটা ছায়ার, এই বনটা অনেক কিছু না পাওয়াকে পাওয়ার।

২০১১ সালের জুনের ১ তারিখে গিয়েছিলাম বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির এই ভাসমান বন দেখার জন্য, কিন্ত বিধি বাম, মোটামুটি শুকনো কাদার ভেতরে বনের গহীনে হেঁটেই ভ্রমণ পিপাসা মেটাতে হয়েছে সেবারের মতোন। চার পাশে হিজল আর করচ গাছ থমথমে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, একেকটা গাছের শেকড় উঠে আছে ১০/১৫ ফিট উপরে, মনে হয় তাদের জন্মই হয়েছে অর্ধেক রাস্তা থেকে। উপরে সবুজের বিস্তীর্ণ সমাহার আর নিচে আাঁকাবাঁকা গাছের গোড়ালী, মাঝখানে গজিয়েছে নতুন শেকড়। সেবারই বুঝেছিলাম এ বন দেখতে হলে আসতে হবে বর্ষাকালে, হিজলের-করচের শাখে শাখে দুলতে হলে আসতে হবে বানের সময়, নীল সবুজের রহস্যে হারিয়ে যেতে হলে ঢুকতে হবে জলের সাথে। তাই সেবার ঘাড় উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জারুল গাছটাকে আবার আসবো বলে কথা দিয়ে চলে এসেছিলাম ধুলোর নগরীতে।

জুলাইয়ের বৃষ্টিকে আরো কিছুদিন গা ছাড়া ভাব নিয়ে পড়তে দিয়েছিলাম, যখনই খবর পেলাম সিলেটের বনে বান ডেকেছে তখনি তার টানে বেরিয়ে পড়লাম নিজের ছোট্ট পোটলাটা নিয়ে। প্ল্যান ছিলো এবারে একলা যাবো, কারণ রমজান মাসে ঘুরাঘুরির জন্য আর কাউকেই পাবোনা। যেমন কথা তেমন কাজ, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি সেখানে নববিবাহিত রকি ভাই এবং রেদওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। নীল সবুজের বন তাদেরকেও ডাকছে। ওদিকে ফেসবুকে খবর পেয়ে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর কোলে নিয়ে আহসান ভাই এবং লুৎফর ভাইও রওয়ানা দিয়েছে খুলনা থেকে। বিশাল সুন্দরবন ফেলে তারা আসছে সুন্দর আরেকটা বন ছুঁয়ে দেখতে। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই দলের একটাই উদ্দেশ্য, একটা বিশাল বন কিভাবে জলের উপর হেলতে দুলতে ভাসতে থাকে সেটাই দেখা।

সিলেট শহরে নেমেছি ভোর পৌনে পাঁচটায়, জনমাবহীন খাঁ খাঁ রাস্তায় রিক্সা আর সিএনজি চালকরা রীতীমতো রাস্তা কাঁপিয়ে নাক ডাকছেন, আমরাও হালকা ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এগুচ্ছি একটা সিএনজি’র আশায়, গন্তব্য পাহাড়ের পাড় ঘেঁসে নীলচে পানিতে শুয়ে দোল খাওয়া আশ্চর্য্য সুন্দর এক উপজেলা গোয়াইনঘাট। আমাদের হালকা কাঁপাকাঁপিতেই বোধ হয় ঘুম ভেঙ্গে গেলো রাস্তা কাঁপনো রিক্সা চালকদের। মেঘের আলোয় পাঁচজন যুবককে দেখে সে মহা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলো “কই যান” ! আমরা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে আরেকটু এগুতেই দেখি এক সিএনজি ড্রাইভার চোখ কচলে লাল করে সিএনজির সিটে শুয়েই ভীষণ উদ্বিগ্ন স্বরে বললো “কই যান”! পাশ থেকে আরেকজন বয়স্ক লোক গায়ে শাল জড়িয়ে যাবার পথে জিজ্ঞেস করলেন “কই যান”! তাদের সবার কন্ঠেই আমাদের নিয়ে উৎকণ্ঠা। সবার একটাই কথা “কই যান”? তাদের আগ্রহ মেটানোর জন্যই বলি আমরা ‘রাতারগুল’ যাবো, কেউ চিনেনা। অবশেষে এক সিএনজি পাওয়া গেলো যে গোয়াইনঘাট যেতে চায়। আর দেরী না করেই জড়াজড়ি করে উঠে গেলাম তার তিন চাক্কার দুনিয়ায়।

P1330743

ভরা বর্ষায়, ভেজা মেঘের কুয়াশার ভেতর দিয়ে জনমানবশুণ্য সিলেট শহরকে পেছনে ফেলে বিমানবন্দরের রাস্তা ধরে এগুতে থাকলাম শালুটিকরের দিকে। একপাশে বন্দী পাহাড়ের সারি মেঘ কোলে নিয়ে ঘুমুচ্ছে, আরেক পাশে চেঙ্গীর খালের ঘোলা পানিতে পড়ি পড়ি করেও গা ছোঁয়াচ্ছেনা ভোরের বৃষ্টি। এই চেঙ্গীরখাল যায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর, খালের উপরে বিশাল একটা ব্রিজ শুয়ে আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে পুরো শালুটিকর দেখা যায়। ঘোলা পানিতে শিকড় গেঁড়ে ভাসতে থাকা একেটা বাড়িকে মনে হচ্ছে একেকটা বিচ্ছন্ন দ্বীপ, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে বেড়াতে গেলেও নৌকা দিয়ে যেতে হয়। আমাদের সিএনজি এগুতে থাকলো চেঙ্গীর খালের পাড় ধরে। সামান্য একটা ইটের রাস্তায় প্রকৃতির কত বিস্ময়, কত সৌন্দর্য্য যে লুকিয়ে থাকতে পারে তা এখানে উঁকি না দিলে বুঝতে পারতাম না। দু’পাশে হাঁটু পানি, সে পানির রং আবার সাদাটে নীল ! দেখে মনে হবে যেন জলজ্যান্ত আকাশটাকে টেনে মাটিতে নামিয়ে এনছে এই শুকনো একাকী রাস্তাটি। আমার জীবনে আমি অনেক সুন্দর রাস্তা দেখেছি কিন্তু এই রাস্তার সৌন্দর্য্যরে ধারেকাছেও নেই বাকিগুলো। নিজের আপন খেয়ালে চলতে থাকা এই রাস্তা কিছুদূর সোজা গিয়েই খেয়ালী বালিকার মতো বেঁকে গিয়েছে একদিকে, আরো কিছুটা গিয়ে দুষ্টু বালকের মতো লাফ দিয়েছে ব্রিজের উপর দিয়ে, মাঝে মাঝে খেলার মেজাজে কয়েক ফুট করে ডুব দিয়েছে ক্রমশ জমতে থাকা পাহাড়ী ঢলে। আশ্চর্য সুন্দর এই রাস্তার একপাশ জুড়ে রয়েছে ভারতের সবুজ পাহাড়গুলো যেটাতে সবুজের লেশমাত্রও নেই, তুমুল নীলে হারিয়ে গেছে তারা। আর একপাশে রয়েছে জলে ভাসতে থাকা মুগ্ধ বাংলাদেশ। বাড়ি-ঘর সব ডুবে আছে পানিতে, বাচ্চারা হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে স্কুলে যাচ্ছে আর বাকিরা নৌকায়, প্রত্যেকটা দৃশ্যই ছবির মতোন। এই রাস্তার দু’পাশ জুড়ে বিশাল সব গাছের সারি, ছাগল – ভেড়ার পাল আর মানুষের বিস্মিত দৃষ্টি। এমন জায়গায় বিস্মিত না হওয়াটাই বিস্ময়কর। একসময় সিএনজি থেকে নেমে আহসান ভাই দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করে বললেন, এমন যায়গায় একলা আসাটাই বোকামী, পরেরবার প্রিয় কাউকে নিয়ে আসবো।

P1330766

বেলা ১০ টায় আমরা পৌঁছলাম গোয়াইন ঘাট বাজারে, সেখান থেকে একটা ট্রলার রিজার্ভ নিলাম ‘রাতারগুল’ ফরেস্টের উদ্দেশ্যে। পুরো নদী জুড়ে হাওর হাওড় ভাব, পেছনে ভারতের পাহাড় থেকে ঝরছে ছোট-বড় অসংখ্য ঝরণা, সেগুলোর পানিই মিশেছে এখানে। কাঁচের মতোন স্বচ্ছ পানি, একটানে ৮/১০ ফুট পরিষ্কার দেখা যায়। পুরো নদীটাই দেখার মতোন একটি দৃশ্য। মহিষেরা গা ডুবিয়ে আয়েশ করে ঢেঁকিশাক চিবুচ্ছে। আমাদের ট্রলারের পানি তাদের গায়ে লাগতেই ঘাড় ঘুরিয়ে মৃদু একটা ধমক দিয়ে আবার দূর পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ঘাস চিবুতে থাকে। এমন সৌন্দর্য্যে সেও মুগ্ধ। একসময় ট্রলার ভিড়ে ‘রাতারগুল’ ফরেস্টের বিট অফিসে, সেখানে আগের থেকেই চকচকে নতুন নৌকা নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বিট অফিসের কর্মচারী হুমায়ুন ভাই। আর দেরী করা কি চলে ! পড়িমড়ি করে সবাই ছোট নৌকায় উঠতে গিয়ে দেখি লুৎফর ভাই গায়েব, বন বিভাগের টয়লেটে গিয়ে তিনি বিপুল বিস্ময়ে চেয়ে আছেন পেছনের বিশাল বনের দিকে। সেখানে পানির দোলনায় দুলছে হিজলের বন, সেই সম্মোহন এড়ানো অসম্ভব। কোনোমতে তাঁকে ঠেলেঠুলে নৌকায় উঠালাম, জানালাম, হা করে থাকার সুযোগ সামনে আরো আছে। বৃথা চেষ্টা, তাঁর হা আরো বড় হয়ে উঠলো যখন দেখলো বনবিভাগের অফিসের সিঁড়ির গোড়ায় এইমাত্র একটা মাছ ঝপাৎ করে উঠে কতক্ষণ লাফিয়ে আবার টুপ করে ডুব দিলো পানিতে। যাবার আগে আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে যেন বলে গেলো ‘আমাদের রাজ্যে স্বাগতম’। এ আবেদন উপেক্ষা করার মতোন বোকা এখোনো হই নাই। রওয়ানা দিলাম পানির দেশে।

P1330752

বনের সীমানায় ঢুকতেই এলোমেলো হয়ে গেলো আগের থেকে সাজিয়ে রাখা সব পরিকল্পনা। চোখের সামনে তব্দা মেরে দেয়া সবুজের মশারী, গাছের মাথা সমান টলটলে পানি হইহুল্লোড় করে ছুটে যাচ্ছে এক গাছের কোল থেকে আরেক গাছের বুকে। পাতা গুলো নিচু হয়ে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছে পানির সাথে। প্রকৃতি এখানে ঠান্ডা, নীরব, কেমন যেন একটা ভরাট সৌন্দর্য্য হুটোপুটি খাচ্ছে। বনে ঢোকার পর থেকেই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন সারাক্ষণ বকবক করতে থাকা রকি ভাই, একফোঁটা শব্দও যেনো এ বনে মানায় না, চোখ বড়বড় করে তিনি তাকিয়ে আছেন সামনের চলমান গাছগুলোর দিকে। চলাৎ ছলাৎ শব্দে নৌকা চলছে গাছের ডাল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, মাঝে মাঝে ডালের বাড়ি খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে শুয়ে পড়ছে সবাই। কিন্তু বেশিক্ষণ শুয়ে থাকতে পারেনা, তাড়াতাড়ি উঠে আবার তাকায় অদ্ভুত গাছগুলোর দিকে। সারাজীবন হিজল আর করচ গাছের নাম শুনেছি আজ দেখলাম,এদের গড়নটাই আলাদা। অনেকটা জিগজ্যাগ স্টাইলে বেড়ে উঠেছে এই গাছগুলো, কাঁচের মতোন স্বচ্ছ পানিতে ক্রমাগত নড়ছে তাদের প্রতিবিম্ব। ভাবতে অবাক লাগে একমাস আগে এই বনের মাঝ দিয়ে খালি পায়ে হেঁটেছিলাম, এখন সেখানে ১০ ফুট পানি, রোদের আলো পড়ে একেবারে তলার মাটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সেখানে জেলেরা ব্যাঙ বেঁধে টোপ হিসেবে ঝুলিয়ে রেখেছে বোয়াল মাছের জন্য। প্রতিটা গাছের শেকড় দুলছে পানির উপরে। ইচ্ছে হলে নৌকা থেকে লাফিয়ে নেমে নির্দোষ একটা গোসলও দেয়া যেতে পারে ঠান্ডা এই পাহাড়ী জলে। কিন্তু সেটা করতে দিলেননা হুমায়ুন ভাই, চোখ গাছের উপরে উপরে তুলে আমাদের দেখালেন দুইটা সাপ চুপচাপ শুয়ে শুয়ে অতিথিদের দেখছে, এখন আপ্যায়ন না করতে চাইলেই হয় ! সাপ দেখে চুপসে যাওয়া রেদওয়ানকে ঠেলে-ঠুলে উঠিয়ে বানরের ঝাঁক দেখালেন আহসান ভাই। আমাদের দেখেও তারা কোনো গা করলোনা, এক হাত দিয়ে ঝুলতে ঝুলতে সবুজ পাতাগুলো পেটে চালান করে দিচ্ছে নির্লিপ্তভাবে।

একের পর এক বিস্ময় উপহার দেয়া এই বনে ঘুরতে ঘুরতে মাদকতা লেগে গিয়েছিলো চোখে, তাই সময়ের কোনো হিসাবই রাখিনি। এর মাঝেই আকাশ কালো করে মেঘ ধেয়ে এলো মেঘালয় থেকে। প্রকৃতির নিজের কাছে রাখা সব সৌন্দর্য্য একবারে উজাড় করে দিতে চায় আগত অতিথিদের। টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হলো ‘রাতারগুল’ জুড়ে। এতোক্ষণ চুপচাপ শান্ত হয়ে থাকা বনটা মুহূর্তেই নড়েচড়ে উঠলো। গাছগুলো গা-ঝাড়া দিয়ে শরীর থেকে পানি ফেলে দিচ্ছে। পাতার সাপগুলো হেলতে দুলতে নেমে গেলো পানিতে। অনেক্ষণ বিশ্রাম নেয়া হয়েছে, এবারে খাবার খোঁজার পালা তাদের। আমরাও চাইনি তাদের খাবার হতে, তাই ভাসমান এই বন থেকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেই বের হয়ে আসলাম।

নৌকা ছেড়ে আমাদের ট্রলারে করে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের একমাত্র ভাসমান বনটা ফেলে আসছি, আর বারবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছি। শুধু একটা কথাই মনে হচ্ছে বারবার – এই বনটা মায়ার, এই বনটা ছায়ার, এই বনটা অনেক কিছু না পাওয়াকে পাওয়ার। আবার আসবো এই বনে, ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের আলোতে গাছের ফাঁকে ফাঁকে থই থই পানিতে উথাল পাথাল জোৎস্না দেখতে আবার আসবো এই ঢেউয়ের বনে।

কিভাবে যাবেনঃ

এই পানির বনেতে যাওয়াটা পানির মতোই সোজা। এজন্যে সবার প্রথমে আপনাকে সিলেট যেতে হবে। সিলেট থেকে দুইভাবে ‘রাতারগুল’ ফরেস্টে যাওয়া যায়। বিমানবন্দরের পাশ ঘেঁসে শালুটিকর পাড়ি দিয়ে চেঙ্গেরখালের মায়াবী রাস্তাটি দিয়ে গোয়াইনঘাট বাজার পর্যন্ত সিএনজিতে যাবেন, সিলেট থেকে গোয়াইনঘাট পর্যন্ত সিএনজি ভাড়া নিবে ৪৫০ টাকা। সেখান থেকে একটা ট্রলার ৮০০ টাকা দিয়ে ভাড়া করে চলে যাবেন ‘রাতারগুল ফরেস্টে’। এ তো গেলো সিনেমা হলে যাওয়ার রাস্তা! আর সৌন্দর্য্যরে বাকি অংশটুকু দেখতে হলে বনে ঢুকতে হবে ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে। ফেরার পথে গোয়ইনঘাট নেমে জাফলং-এর ঠান্ডা পানিতে গোসলটা সেরে আসতে পারেন, ওটা খুব বেশী দূরে নয়। আর অন্য পথটা হলো সিলেট থেকে মোটরঘাট হয়ে। সেটার কথা নাইবা বললাম, জীবনে যদি মনে রাখার মতোন কোনো স্মৃতি নিয়ে ঘরে ফিরতে চান তাহলে গোয়াইনঘাটের রাস্তাটা দিয়েই ঘুরে আসুন।

আর সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে পরামর্শ সেটা হলো ‘রাতারগুল’ যেতে চাইলে অবশ্যই জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যাবেন, এর পরে বা আগে গেলে বনে পানি পাবেন না।

Categories
Uncategorized

জল – পাথরের দেশে…

 

বাংলাদেশের স্বর্গ বলে স্বীকৃত বান্দরবানে রয়েছে পানি আর পাথরের এক জাদুকরি শীতল খনি। যার যাদুর টান অগ্রাহ্য করা কষ্টকর। এই গল্পটা পাহাড়কন্যা এই বান্দরবনের বুকে অবিরাম ছুটে চলা দুষ্টু এক খেয়ালী নদ সাঙ্গুর তীরে গড়ে উঠা জল-পাথরের দেশ “তিন্দু”-কে নিয়ে।

তিন্দুর পথে যাত্রা...
তিন্দুর পথে যাত্রা…

বান্দরবানের থানচি থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে ২ ঘন্টা ২০ মিনিট গেলেই যে যায়গাটা আসবে তার নাম তিন্দু। তিন্দু সম্পর্কে একটা বিশাল বই লিখলেও এর সৌন্দর্য্যরে ছিঁটেফোঁটাও তুলে ধরা সম্ভব না। শুধু এতোটুকু বলি আকাশ-কুয়াশা-মেঘ-নদী-পাথর-পাহাড়-ঝর্ণা-বন-নীল সবুজ পানি আর রহস্য-রোমঞ্চ-ভয় সব যদি একবারে পেতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন তিন্দু।

মেঘ কুয়াশার তিন্দু...
মেঘ কুয়াশার তিন্দু…

সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয় তখন নিজেকে বারবার ধন্যবাদ দিতে হয় এই দেশটাতে জন্মাবার জন্য। মেঘ-কুয়াশার দেশ তিন্দুর সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে এখানে নৌকায় চড়ে মেঘের উপরে যাওয়া যায়, সাদাটে মেঘের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চললেই জামা মাথা ভিজে যায়। এখানে শক্ত কঠিন পাথরকে সারাক্ষণই বুকে নিয়ে লক্ষ্য ছাড়া দৌড়ে বেড়ায় স্বচ্ছ পানির ঢল।

বড় পাথরের পথে যাত্রা...
বড় পাথরের পথে যাত্রা…

নুড়ি পাথরে ছলাৎ ছলাৎ হাঁটতে হাঁটতেই ইচ্ছে করে হাঁটু পানিতে টুপ করে একটা ডুব দিয়ে হাপুস করে খেয়ে নেই পুরো একমুখ টলটলে পানি। পুরো বান্দরবানে পাহাড়ে পাহাড়ে লাইফ জ্যাকেট পড়ে ঘুরে বেড়ানো জুনায়েদ আজীম চৌধুরী পানি পেয়েই নৌকা থেকে ঝপাং করে লাফ দিয়েছে হাঁটু সমান জলে, মচকানো পা নিয়ে খোঁড়াতে থাকা আরমান ভাই এই সৌন্দর্য্য দেখে উদাস হয়ে পাথরে ঘুমিয়ে পড়ে, তাকে ঠেলে সরায় এমন সাধ্য কার! পাহাড়ের মায়াবী টানে সেই রংপুর থেকে ছুটে এসেছে নাসিরুল আলম মন্ডল, তার না ঘুমানো লাল টকটকে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছে প্রতিটি পাহাড়ি মুহূর্ত। আলুর দাম নাকি কমেছে! এই খবর পেয়ে হাসান ভাই থানচি থেকে ৫ কেজি গোলআলু কিনে এনেছে, আমাদের নাকি আলুপোড়া খাওয়াবেন! সাঙ্গুর জলে পা রেখে সবচাইতে শান্ত মিরানবাপ্পীও মাছের ঝাঁকের সাথে হুড়মুড় করে দৌড়ে বেড়িয়েছে পাথরের বাগানে। পিচ্ছিল পাথরে একবারও না পিছলে দিনের মধ্যে ১৬বার করে গোসল করেছে জীবনে প্রথমবারের মতন বান্দরবান যাওয়া ফাহাদ ভাই, আমরা তাকালেই সবচাইতে মায়াময় হাসিটি দিয়ে বলেন “ভাই, পানি এত আরামের যে এইখানেই সারাদিন ডুইবা থাকতে মন চায়, আজকে আর ভাত খামুনা, অনেকগুলা পানি খাইছি এতক্ষণ ধইরা”! আর ছিলো শাহেদ খাঁ নামক এক পিস। জীবনে প্রথম পাহাড় দেখা এই উচ্ছল ছেলেটা যা দেখে তাতেই “ওয়াও”! বলে দৌড়ে যায়। তাকে বলি শাহেদ, এই পাথর থেকে লাফ দিতে পারবা ? সে “ওয়াও” কি সুন্দর! বলে অবলীলায় ২৫ ফুট উপরের পাথর থেকে অচেনা পানিতে লাফিয়ে পড়ে। তাকে বলি শাহেদ, এই পাথরটা কি সুন্দর, তাইনা ? সে “ওয়াও”! বলে পরের আধাঘন্টা ঐ পাথরের ছবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শাহেদই মনে হয় একমাত্র ছেলে যে একদিনে বান্দরবানে ৬৪ জিবি মেমরির ছবি তুলেছে। সবাই বলেন “ওয়াও”!!

কুয়াশা ভেজা তিন্দু...
কুয়াশা ভেজা তিন্দু…

তিন্দুর দুই পাশ দিয়ে চলে গেছে দুটো ঝিড়িপথ, সারাদিন সেখান থেকে কলকল করে ছুটে আসছে পাহাড়গলা স্বচ্ছ পানি। এই সৌন্দর্য্য অবর্ণনীয়! পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশীকাঁথা তৈরি করেছে সেটা পুরোপুরিই দোদুল্যমান, কোথাও তার এক চিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃনতা। তিন্দুপাড়ের পাথুরে বীচটা এখানে যোগ করেছে নতুন একটা মাত্রা। লক্ষ লক্ষ অসমান পাথর মিলে তৈরি করেছে অমসৃন সমান একটা পায়ে চলা পথের, খালি পায়ে তীব্র ব্যাথা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথটা শেষ হলেই মন খারাপ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে এখানেই কাটিয়ে দেই আরো একটা বসন্ত।

বড়পাথরের নীলাভ পানি...
বড়পাথরের নীলাভ পানি…

 বান্দরবান কণ্যা তিন্দুকে ফেলে সাঙ্গু নদীর প্রকৃতিকে দুচোখে গিলতে গিলতে আমরা যখন আরো উপরের দিকে এগুতে থাকলাম তখন মিনিটে মিনিটে বদলে যেতে থাকলো পানির নিচের পাথুরে জগতটা, ছোট ছোট পাথরগুলো যেন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠতে লাগলো, উঠতে উঠতে নদীর বুক ফুঁড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো তাদের মাথা।

তিন্দু নৌকা ঘাট...
তিন্দু নৌকা ঘাট…

যায়গাটার নাম “বড় পাথর”। এখানে এসে নদীটা হয়ে গেছে সিঁড়ির মতন, এখানে পায়ের পাতা সমান পানিতে নেমে ঠেলেঠুলে নৌকাকে উঠাতে হয় উপরের দিকে, সেখান থেকে আরো উপরে একেবারে মেঘের কাছাকাছি। এখানে পাথর আর পানি মিলে ভরদুপরে তৈরি করে আমেজী রংধনুর। উত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে থাকা সেই রংধনুগুলোকে নিজের কোলে আশ্রয় দেয় নদীর পাড় জুড়ে মাথা নিচু করে ঝুলতে থাকা গাছের সবুজ পাতারা। এই যায়গাটা বান্দরবানের আর সব যায়গা থেকে আলাদা, এখানে সূর্যোদয় দেখতে হয় ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে, এখানে সূর্যাস্ত দেখতে হয় পানির চোখে চোখ রেখে, এখানে দিনের আলোতে বেড়াতে হয় রাতের আাঁধারকে সঙ্গে নিয়ে।

বড় পাথর এলাকা...
বড় পাথর এলাকা…

 পানি আর পাথরের এক সাদা-কালো জাদুঘর গড়ে উঠেছে এই তিন্দুকে ঘিরে। এখানে পাহাড়গলা পানিতে পা ডুবিয়ে চলতি পথের নতুন নতুন মাছের সাথে সারাদিন আড্ডা দিলেও ক্লান্তির ঘাম ঝরবেনা কানের লতি বেয়ে, এখানে ঘোলাটে মেঘের ভিড়ে সারাক্ষণ ভিজতে থাকলেও এতোটুকু ময়লা লাগবেনা গায়ে। জল-পাথরের আড্ডা জমে এখানে। এটা মেঘের দেশ, এটা কুয়াশার দেশ, এটা পাথুরে পানির দেশ, এটা তিন্দু – মেঘ-কুয়াশার তিন্দু।

কুয়াশা ভেজা তিন্দুর সকাল...
কুয়াশা ভেজা তিন্দুর সকাল…

 যেভাবে যাবেনঃ

তিন্দুতে যেতে হলে আপনাকে সবার আগে পৌঁছাতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে বাস বা চাঁন্দের গাড়িতে করে নীলগিরি পেরিয়ে চলে যাবেন ৭৯ কিলোমিটার দূরের স্বর্গদরজা থানচিতে।

বয়ে চলছে খরস্রোতা সাঙ্গু...
বয়ে চলছে খরস্রোতা সাঙ্গু…

থানচিতে নেমে বিজিবি-এর অনুমতি নিয়ে একটা ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে ঢুকে যাবেন স্বর্গের ভেতরে। এখান থেকেই মূলত মুগ্ধতার শুরু। “ওয়াও,ওয়াও” করতে করতে এরপরের অধ্যায়টুকু লিখবেন আপনি নিজেই। আর একটা কথা – সাথে করে অবশ্যই আলু নিয়ে যাবেন, পূর্ণিমা রাতে পাথুরে নদীর পাড়ে বসে কুয়াশা মোড়ানো আগুন ছোঁয়া পোড়া আলুর যে মায়াবী গন্ধ  আয়েশী বাতাসে ভর করে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবে সেই আমেজ আর হাজার ফুলের মধ্যেও খুঁজে পাবেন না।

থানচি নৌকা ঘাট...
থানচি নৌকা ঘাট…
Categories
Uncategorized

গঙ্গামতির বালুচরে…

বালি জিনিসটা পায়ের তলাতে থাকলেও এর গুণের কোনো শেষ নেই। বালি দিয়ে বাড়ি বানানোর পাশা-পাশি মুড়িও বানায় কেউ, কেউবা সেই মুড়ি খাওয়ার পর কোনো কাজ না পেয়ে বালি দিয়েই সাগরপাড়ে বানায় ক্ষণিকের বসতি। সাগর আর বালির মাঝে এই বন্ধুত্ব একেবারে আদিকালের। সমুদ্র তার থেকে মুখ ফিরিয়ে ভাটার সময় যখন দূরে চলে যায়, সেই ক্ষণিকের বিচ্ছেদেই বালির রং হয়ে যায় ধবধবে সাদা, আর বাকিটা সময় সাগর স্পর্শে প্রাণ ফিরে পাওয়া বালির রং হয় নিমেষ ঘোলাটে। ঐ ঘোলা বালিতে এলো-মেলো পা ফেলে সাগরের দিকে ছুটে গিয়ে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। সে আশাতেই এবারে ছুটে গিয়েছিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। কিন্তু আসল সাগরের সেই তুলতুলে সৌন্দর্য্য কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে কি আর পাওয়া যায় ! যেতে হবে আরেকটু দূরে, একেবারে নিরিবিলি সৈকতে – যেখানে নিরেট বালির হাতছানি আর নিটোল সবুজের গুণগুনানির সাথে কাত পাতলে শুনতে পাওয়া যায় চিরতরুণ বঙ্গোপসাগরের দুরন্ত ফিসফিস। পলাতক শেয়ালের ভীত পায়ের ছাপ আর উৎস্যুক বানরের বোধগম্যহীন ডাক আপনাকে ক্ষণে ক্ষণে মনে করিয়ে দিবে – স্বাগতম গঙ্গামতির চরে…

কুয়াকাটা হলো বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে একই সাথে সূর্যোদয় ও সুর্যাস্ত দেখা যায়। বাংলাদেশের সবচাইতে শান্ত সৈকতও এই কুয়াকাটা। কিন্তু এখানে গেলে কেউই আর শান্ত থাকেনা, ছুটে বেড়ায় সৈকতের এমাথা-ওমাথা, ঝাঁপিয়ে পড়ে বালুজলে। আমরাও বা আর বাদ থাকবো কেন ! আমার আর রকি ভাইয়ের ছোট্ট একটা পোঁটলা সবসময়ই রেডি থাকে, কখন যে কার ডাক আসে। পাহাড় ঘোরা শেষে এবার দু’জনেরই শখ হলো সাগরে মাথা ডুবানোর, সাগর আমাদের ডাক দিয়েছে ! কুয়াকাটার পশ্চিমে রয়েছে সবুজের অরণ্য – সুন্দরবন, আর সোজা দক্ষিণে রয়েছে নীলের অতল গহ্বর – সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড। সে গল্প আরেকদিন করবো, আপাতত গল্পের শুরুটা হোঁচট খেয়েছে পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার রাস্তায়, যে পরিমাণ ধুলো-বালি রাস্তায় খেয়েছি তাতে করে সকাল বেলা আমরা খেয়ে দেয়ে বের হয়ে ভুলই করেছিলাম। মটরসাইকলের পেছনে বসে ধুলোর সাগরের মাঝে চোখ কচলাতে কচলাতে দেখছি পটুয়াখালির কলাপাড়া ইউনিয়নের সাজানো গোছানো বাড়িগুলো, এতো সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো বাড়ি এর আগে আর কোনো এলাকায় দেখেছি বলে মনে পড়েনা। আমাদের ড্রাইভার ধুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য গামছা দিয়ে নিজের চেহারা এমনভাবে পেচিয়েছে যে সেই অবস্থায় তাকে দেখলে বারাক ওবামা সকল প্রাপ্তির উল্লাসে অনবরত সার্কাস নৃত্য দিতেন। তিনটা ফেরি পার হওয়ার দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা আর সারা গায়ে ১০/১২ কেজি বালু নিয়ে পৌঁছলাম বালুর শহর কুয়াকাটায়। এখান থেকেই যাবো সবুজ বনে ঘেরা শীতল বালির এক শান্ত নির্জন সৈকত – গঙ্গামতির চরে…

কুয়াকাটায় থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যা নেই, সাগর কখোনো কাউকে নিরাশ করেনা। আমরা এবারে এসেছিলাম মূলত সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে যাবার জন্য কিছু তথ্য যোগাড় করা ও বোট ভাড়া করার জন্য, সেই লক্ষ্যেই যাকে পাই তাকেই জিজ্ঞেস করি যে এদিকে দেখার মতন আর কোনো স্ন্দুর যায়গা আছে কিনা। একজন পূর্বদিক দেখায় তো একজন পশ্চিম দিক দেখায়, কেউ চোখ বড় করে আমাদের দিকে তাকায় তো কেউ চোখের উপরে হাত তুলে দূর সাগরের দিকে নির্দেশ করে – এরমানে যেদিকে মন চায় ঘুরতে পারো! আমরাও যেদিকে মন চায় ঘুরছি, কুয়াকাটার মূল সৈকতেই হাঁটতে হাঁটতে নজরে পড়লো উভচর নৌকার, মানে নৌকার নিচে চাকা লাগিয়ে ৩/৪ জন মিলে সেটাকে ঠেলেঠুলে ঝপাস করে পানিতে ফেলে দিচ্ছে, তারপর নির্দোষ চাকাগুলো খুলে নিয়ে আসছে আরেকটা নৌকায় প্রাণ দেবার জন্য, রীতিমতো বিচিত্র ঘটনা ! খানিকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে এভাবে ৮/৯ টা নৌকাকে পানিতে ঝাঁপ দিতে দেখলাম, অবাক হবো হবো ভাব করছি এমন সময়ই হুস করে পেছন দিয়ে কি যেন একটা জীবন্ত কিছু ছুটে গেলো। চোখ থেকে বালি মুছে তাকাতেই দেখলাম একটা ধুসর ঘোড়া লেজ নাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছে পূব দিকে, তার পিঠে মোটামুটি বড়সড় একটা বাচ্চাছেলে। ঘোড়াটার পেছন পেছন টেনশন নিয়ে ছুটতে থাকা মায়ের কাছে জানতে পারলাম এখানে চড়ার জন্য ভাড়ায় ঘোড়া পাওয়া যায়, বিকট আওয়াজ তুলে একটা মোটর সাইকেলও ধোঁয়া ছেড়ে যেতে যেতে জানিয়ে গেলো যে শুধু ঘোড়াই না, টাকা থাকলে তার পিঠে চড়েও সমুদ্র দেখা যায়।

সমুদ্র কি আর দূর থেকে দেখতে ভালো লাগে ! সমুদ্রকে দেখতে হয় এর বুকে বসে, হাজার হাজার মাইল সাঁতরে এসে একেটা ঢেউ যখন ক্লান্ত হয়ে তীরে আসে বিশ্রামের জন্য তখন তাদেরকে দু’হাত ছড়িয়ে আলিঙ্গন করার মাঝেই তো সমুদ্র দেখার তৃপ্তি। আমার এই দার্শনিক মতবাদে পানি ঢেলে দিলেন রকি ভাই, তিনি জানালেন যে তিনি সাঁতার পারেন না, কাজেই পানিতে নামানামির মতন শীতল চিন্তা-ভাবনা আমাকে যেকোনো মূল্যে বাদ দিতে হবে। তাই বলে কি আর সাগরে নামবোনা ! সুতরাং, সারাদিনের জন্য ভাড়া করা হলো মাত্রই সাগর থেকে তুলে আনা একটি ভেজা নৌকা, যেটার মাঝি ঘোষণা দিলেন তাঁর এই নৌকা দিগিজ্বয়ী, আমরা যেদিকে যেতে চাই কোনো ব্যাপারইনা, আমি ঘোষণা দিলাম – চলেন শ্রীলঙ্কা যাই, উনি নৌকার পানি সেঁচা বাদ দিয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন, তাঁর দৃষ্টিতেই বুঝলাম এদিকে আশেপাশে শ্রীলঙ্কা নামের কোনো জায়গা নাই, যেগুলো আছে সেগুলো হলো – সবুজ হলুদের মিশেলে তৈরী ম্যানগ্রোভ বন – ফাতরার চর, মাছের বসতি নামে পরিচিত – শুটকি পল্লী, ধবধবে সাদা বালি’র – লাল কাঁকড়ার দ্বীপ, আর সব কল্পনাকে হার মানানো সবুজে ঘেরা শান্ত নির্জন এক স্নিগ্ধ সৈকত – গঙ্গামতির চর।

শুরু করেছিলাম ফাতরার চর ভ্রমণ দিয়ে। কুয়াকাটার মূল সৈকতকে ডান পাশে রেখে বঙ্গোপসাগরে দোল খেতে খেতে দেখছি গাঙ্গচিলের উড়াউড়ি, একটা ফিশিং বোট আমাদের পাশ কাটিয়ে মুখ ঘুরিয়েছে শুঁটকি পল্লীর দিকে। তার পেছনে গাঙ্গচিলের মিছিল, এতোগুলো গাঙ্গচিল আমি কখোনো একসাথে দেখিনি, ফিশিং বোট থেকে বেদরকারী যে মাছগুলো সাগরে ফেলা দেয়া হচ্ছে সেগুলো দিয়েই হচ্ছে তাদের রাজভোজ, হুড়োহুড়ি লুটোপুটিতে যারা পেরে উঠছেনা তারা পাখাদুটো আস্তে করে মেলে বসে পড়েছে ধুসর সাগরে, সকালের বাড়ন্ত রোদে তাদের সাদাকালো পাখা গুলোতে যে রঙের ছটা ফুট উঠছে তার সৌন্দর্য্য বর্ননা করতে যাওয়াটাও বোকামী। আমাদের মাঝিটা কিন্তু অত বোকা না, তিনি সঠিক সময়েই আমাদের নামিয়ে দিলেন ফাতরার বনে। এই বনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি মূলত ম্যনগ্রোভ বন, সারাটা বন জুড়েই মাটিতে শাঁসমূল জেগে রয়েছে, ট্যুরিস্টরা এলাপাথাড়ি ঘুরতে ঘুরতে বনের ভেতর দিয়ে অনেকগুলো পায়েচলা রাস্তা বানিয়ে ফেলেছে, এর মধ্যে একটা রাস্তা অসম্ভব সুন্দর, গাছের শেকড় বেরিয়ে থাকা রাস্তাটির দু’পাশ জুড়ে ঝাউবন, কেওড়া গাছের তোরণ রয়েছে পুরোটা পথেই, যার শেষ মাথায় কাদামাটির সাগর। এখানে একটা চুলা রয়েছে, বোঝাই যায় যেই এদিকে আসুকনা কেন, পিকনিক করে যায়। আমাদের খাবার জো নেই ওদিকে মাঝিভাই আমাদের জন্য কাঁকড়া অর্ডার দিয়ে রেখেছে, ঝাল ঝাল করে রান্না করা সেই কাঁকড়া কথা চিন্তা করলে এখোনো জিবে জল চলে আসে। অনেকেই বলে ফাতরার বনে নাকি গাছে গাছে হলুদ পাতার ছড়াছড়ি, তেমন কিছু দেখতে না পেলেও একটা পুকুরপাড়ের পুরোটা ঘিরে অনেকগুলো হলুদ নারিকেল গাছ দেখলাম, হয়তোবা এটাই সব, হয়তোবা এর জন্যই অনেকে একে হলুদ পাতার বন বলে থাকে।

ফাতরার বনে কাঁকড়া খেয়ে ঝালের চোটে হা করে মুখে ঠান্ডা বাতাস লাগাতে লাগাতে ছুটলাম নৌকায়, গন্তব্য এবার শুঁটকি পল্লী। এখানে এসে দেখলাম মাছের এক নতুন রূপ, অগুনিত মাছ সাজিয়ে রাখা হয়েছে খোলা মাঠে। কয়েকটা জায়গায় আবার সুন্দর কিছু মাচা করে মাছগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, জেলেদের কাজ এখানেই শেষ, বাকিটা সূর্যের দায়িত্ব। শুঁটকি পল্লীর অন্যদিকে গ্রামের মহিলারা সবাই মিলে মাছ বাছাই করছে, আমাদের দেখে তেমন একটা পাত্তা দিলোনা, সম্ভবত আমাদের থেকেও মাছের দাম বেশী তাই। শুঁটকি পল্লীর সবচাইতে মজার বিষয় হলো এখানে সব ধরণের শুঁটকি পাওয়া যায়, এক যায়গায় দেখলাম মাঝারী সাইজের কয়েকটা হাঙ্গরের পাখা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, আরেক জায়গায় বিশাল এক তলোয়ার মাছের শুকনো দেহ সূর্যের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। যারা শুঁটকি মাছ পছন্দ করেন তারা জানেন যে এর গন্ধ কতটা মধুর, সৌভাগ্যক্রমে তাদের মধ্যে আমিও একজন, কাজেই ঘন্টা দুয়েক সময় এখানে কাটাতে আমার কোনোই আপত্তি ছিলোনা।

শুঁটকি পল্লী থেকে নৌকা চললো কাঁকড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে, ছোট ছোট লাল কাঁকড়ার বিশাল রাজত্ব এখানে। কেউ না থাকলে নির্ভয়ে এরা চরে বেড়ায় নিজেদের রাজত্বে। তাদের রাজত্ব ঘুরে দেখার জন্যই নৌকা থেকে নেমে সোজা হাঁটা দিলাম সাদা বালির রাজ্যে। এমন সাদা বালি এর আগে কোথাও দেখিনি, দেখিনি সেদিন কোনো লাল কাঁকড়াও, তাই বলে তাদের বাড়ি ঘরে চোখ বুলানোতো দোষের কিছু নয়। অতএব ঘুরে দেখতে লাগলাম কাঁকড়া দ্বীপ। এখানকার সৈকতটা খুবই সুন্দর, কোনো জনমানব নেই একেবারে শান্ত। একপাশে রয়েছে গাছের সারি আর পুরো সৈকত জুড়ে সাদা সাদা ঝিনুকের ছড়াছড়ি, দূর থেকে দেখলে মনে হবে পুরো সমুদ্র সৈকতটাই যেন একটা কোয়েল পাখি। তবে ভর দুপুরে এখানে বেড়াতে হলে কলিজায় পানি থাকা লাগবে, কেননা সূর্য তার পুরো উত্তাপটাই অকৃপণভাবে ঢেলে দেয় এখানে। প্রচন্ড বাতাসের তোড়ে যখন গাছপালাগুলো সব ধেই ধেই করে নাচছে তখন পড়ন্ত বিকেল প্রায়, সূর্যাস্ত দেখার জন্য তাই ছুট লাগালাম গঙ্গামতির চরে।

ঢেউয়ের দোলায় নাচতে নাচতে হঠাৎ করেই দেখি আমদের মাঝি সাহেব নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে বসে বসে ইঞ্জিনের সৌন্দর্য্য দেখছেন, শব্দহীন পরিবেশে সমুদ্র দেখার এমন সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমরা তার এই কর্মকান্ডের প্রসংশা না করে পারলাম না, তাকে বাহবা দিতে গিয়ে শুনি ভর সাগরে সে শুকনো মুখে জানাচ্ছে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে ! বলে কি ! অথৈ সাগরে এতো বড় নৌকাই যেখানে সাঁতার দিতে পারছেনা সেখানে আমিতো চুনোপুঁটি ! ভয়ে ভয়ে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, এখন কি হবে মামা ? তিনি বললেন কোনো সমস্যা নাই আপনেরা নাইমা হাঁইটা যান আমি নৌকা ঠেইলা নিয় আসতেছি ! বলে কি এই লোক, এই মাঝ সাগরে নেমে হাঁটবো ! আহারে নৌকার কষ্টে বেচারার বুঝি মাথাটাও গেলো, আমাদের অবাক করে দিয়ে মাঝি ঝুপ করে সাগরে নেমে গেলো – কোমর পানি সেখানে ! এই হলো গঙ্গামতির শুরু, সাগর এখানে অনেকদূর পর্যন্ত সি-বিচ বিছিয়ে রেখেছে, সেন্টমার্টিন্স ছাড়া আর কোথাও আমি এতোদূরে এরকম কোমর পানি দেখিনি। গঙ্গামতিকে দু’ভাগ করে মাঝখান দিয়ে দৌড়ে বনের ভেতরে চলে গেছে ভোলাভালা চেহারার একটা মোটাতাজা খাল, তার একপাশে কমলা আর বরইয়ের গাছের সারি আর অন্যপাশে নাম-না-জানা গাছের বাড়ি। সাগরে থেকেই ভোরের সূর্য উঠার মতো করে পানি ছেড়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠেছে ভেজা বালির সৈকত, এখানকার বালি এতোই নরম যে খালি পায়ে আলতো করে হাঁটলেও পায়ের স্থায়ী ছাপ পড়ে থাকে পরবর্তী জোয়ার না আসা পর্যন্ত, তার উপরে জমে থাকা পানিতে রপালী আভা তৈরি করে বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো। ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে দৌড়ে বেড়াই বাঁধাহীন বালির বুকে, অচেনা চরের অজানা বন হাতছানি দিয়ে ভেতরে ডাকে বিকেলের পড়ন্ত আলোতে। সেখানে সবুজের কারখানা, বিশাল বিশাল গাছের গায়ে লেপটে থাকা পরগাছার মতো ইচ্ছে করে নিজেও একটু ঝুুলে থাকি এদের মাঝে। এই বনে বানর আছে, আছে শিয়াল, শুকর, অজগর সহ নাম না জানা হাজার হাজার পাখি – আর, আর রয়েছে চোখের সীমানা ছাড়ানো সীমাহীন বঙ্গোপসাগর। এখান থেকেই একই জায়গার দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। এখানে এক সাগরের পানিই একদিনেই দুইবার লাল হয় – এক বার ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ সূর্যোদয়ের সময় আরেকবার বিদায়ী সূর্যের শেষ ছোঁয়াতে। গঙ্গামতি চরের এই সৌন্দর্য্য একবারের জন্যও মিস করতে চায়না সূর্য, তাই সারাটা দিন একে চোখে চোখে রাখে, সে চলে গেলেই এই দায়িত্ব নিয়ে নেয় রুপালী চাঁদ, আর সেও না থাকলে দূরদেশী মিটমিটে তারা।

ইঞ্জিন ঠিকঠাক করে ঠিক সন্ধ্যায় ফিরে আসি আমরা, পেছন ফিরে তাকাই বারবার। আবার আসবো গঙ্গামতিতে, পরেরবার তাঁবু নিয়ে আসবো, এই সোনালী চর-কে রুপালী আলোতে প্রাণভরে দেখবো।

কিভাবে যাবেনঃ
কুয়াকাটায় বাস ও লঞ্চ দিয়ে যাওয়া যায়। আমরা গিয়েছিলাম লঞ্চ দিয়ে। ঢাকা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত সরাসরি লঞ্চ রয়েছে, ভাড়া নিবে ১৮০ টাকা করে। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার গাড়ি রয়েছে, ইচ্ছে করলে আপনি মটরসাইকেলেও যেতে পারবেন। ফেরী পার হতে হবে ৩টা, শেষের দিকে রাস্তা খুবই খারাপ। কুয়াকাটায় নেমে যদি সব যায়গা ঘুরে বেড়াতে চান তাহলে ইঞ্জিনচালিত একটা ছোট নৌকা সারা দিনের জন্য ভাড়া করে নিন, ১০০০-১২০০ টাকার মতো চাইবে। গঙ্গামতির চরে যাবেন হয় খুব ভোরে অথবা মাঝ বিকেলে। কাঁকড়া দ্বীপটা বাদ দেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা। আর গঙ্গামতির সৌন্দর্য্য দেখার পর যদি ঢাকা বাসীরা শহরে ফিরতে চান তাহলে কুয়াকাটা থেকেই ঢাকাগামী বাসে উঠে যেতে পারেন। শুধু একটু খেয়াল রাখবেন ঢাকা আসার বাস কিন্তু একটাই, আর সেটা কুয়াকাটা ছেড়ে যায় ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায়। একবার মিস করলে যতই চেঁচামেচি করেননা কেন, পরদিনের সূর্যোদয় না দেখিয়ে আপনাকে আর ফিরতে দেবেনা সাগরকন্যা কুয়াকাটা।

Categories
Uncategorized

তারার সাথে বসবাস…

লোকালয়ের ঠিক পাশেই পাহাড়টির বাস। সেই পাহাড়ে দিনভর রোদের আলো খেলা করে, হাজার পাখির মেলা বসে, আর লাখো সবুজের আসর জমে বছরের পর বছর। আঁকাবাঁকা এক ঝিড়ি পথে পাথর ডুবিয়ে চলে ঠান্ডা পানির স্রোতহীন আয়েশী পথ চলা, সে পানির ধার ঘেঁসে এক পা ডুবিয়ে শিকারের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বসে থাকে সাদা বকের ঝাঁক। আর দু-কুল ছাপানো বুনো গাছের আড়ালে কৌতুহলী চোখ মেলে চেয়ে থাকে বানরের দল, তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ডাকে ঘরপালানো কোন এক দলছুট পাহাড়ী হরিণ। এমনই মায়া-ভালোবাসা আর আদর ঘিরে গড়ে উঠা এই চিরসবুজের বনটা হটাৎ করেই কেঁপে উঠে পাশ দিয়ে ছুটে চলা ট্রেনের শব্দে! কাদা-মাটি আর পিচ্ছিল পাথুরে ঝিড়িপথের জল-ঝরণা ঘেরা লোকালয়ের খুব কাছের এই যায়গাটির নাম সীতাকুন্ড বন। এবারে আমরা ক্যাম্পিং করেছিলাম জল-ঝর্নার এই বনে, তারার সাথে সারারাত কথা বলেছিলাম অচীন পাথরের গায়ের উপরে হেলান দিয়ে, এই গল্পের শুধু শুরুই আছে আর আছে গল্পটা প্রলম্বিত করার আয়েশী ইচ্ছে…

এবারের প্ল্যানটা হুট করেই হয়ে গেলো, মাঝ রাতে আরমান ভাই ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললেন “ভাই, আর কত লেপের তলায় ঘুমাইবেন ! চলেন কালকে পাথরের উপরে ঘুমাই, পাহাড় ডাকতেছে”। পাহাড়ের ডাক অগ্রাহ্য করার মতন দুঃসাহস আমার কখোনই ছিলোনা, এবারও হলো না, বিছানায় শুয়েই ছটফট করে অপেক্ষা করতে লাগলাম ভোরের আলো ফোটার জন্য – কিন্তু জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পুরো শহর কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে ঝিম মেরে শুয়ে আছে, আলো ফোটার নামটি নেই। অবশেষে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভোর এলো ধুলোর শহরে। জীবনে কখনোই যে কাজটি করিনি, সেটাই করলাম এবার! কাঁধের ছোট্ট ব্যাগটিতে একটা মোটাসোটা “কম্বল” ভরেই রওয়ানা দিলাম জল-ঝরনার দেশে। সকাল ৯টার গাড়ি পাহাড়ের টানেই শহর ছাড়লো, বাস ভর্তি কচিকাঁচার আসর ! পুরো বাসে সব মিলিয়ে গোটা দশেক মুরব্বী ছাড়া বাকি সব আন্ডা-বাচ্চার দল, সব নাকি বান্দরবান যাবে! মেঘ-পাহাড়ের দেশের গাড়ি আটকে গেলো কুমিল্লাতে, যেই সেই আটকানো না – টানা ৩ ঘন্টা জ্যামের মধ্যে থম মেরে বসে রইলো পিচঢালা রাস্তায়। অবশেষে সব জ্যাম তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমাকে বিকেল ৫টায় নামিয়ে দেয়া হলো সীতাকুন্ড বাজারে। ইকোপার্কের গেইটটা পার হয়ে দেখি সেখানে আগে থেকেই হাসিমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে অনেকগুলো চেনা মুখ, যাদের দেখলেই মনে হয় পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার জন্যই এদের জন্ম…

চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য...
চলছে তারা ক্যাম্পিং এর জন্য…

এবারে পাহাড়ে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো এক হাজারটা মোমবাতি জালানো, তারার আলোয় মোমের আলোয় পুরো পাহাড়ি ঝর্নাটার এক অন্য রুপ দেখা, আর অদূরেই তাঁবু টাঙ্গিয়ে হালকা আগুনের আঁচে নিজেদের গরম করতে করতে সেই রুপ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়া। চিন্তাভাবনা করা বড়দের কাজ, আমরা চিন্তা ভাবনা করিনা – ধুম করে কাজটা করে ফেলি। তাই ধুম করেই চলে গেলাম পাহাড়ের টানে। সীতাকুন্ডের সেই পাহাড়ের পথে ঢোকার আগেই দেখা গেলো কালপুরুষ অপু ভাই, লিমন ভাই, রুপা আপু, আরমান ভাই, রুবা আপু বিশাল বিশাল ব্যাগ নিয়ে হাঁটা শুরু করেছে, হাতে তাদের রাতের খাবারের জন্য বাজার সদাই, কি নেই তাতে! খিচুড়ি রাঁধার ডাল থেকে শুরু করে সালাদ বানানোর টমেটো পর্যন্ত সব রয়েছে, সেগুলোর ভীড়ে আবার থলে থেকে উকি দিচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা মুরগীর মাংস। এত বড় বড় ব্যাগ দেখে শুরুতেই হোঁচট খেলাম, আড়চোখে তাকালাম নিজের খুদে ব্যাগের দিকে – মনে হচ্ছে হাতির মিছিলে কোন এক দলছুট লিলিপুট ঝুলছে আমার পিঠে! যাই হোক এসব তোয়াক্কা করার দিন শেষ, চোখ রাখলাম এক্কেবারে উপরের পাহাড় চুড়াটায়, আর পা চালালাম সবুজ কেটে কেটে তৈরি করা একমাত্র মাটির রাস্তাটি ধরে। সে রাস্তা সাপের মতন একেবেঁকে ঝুপ করে গিয়ে পড়েছে পাথুরে ঝিড়িতে, সেটা দিয়ে নিশ্চিন্তে বয়ে চলেছে পৌষের শীতের ঊষালগ্নে হাড় কাঁপিয়ে দেয়া ঠান্ডা পানি! একেকবার একেকজনের পা পড়ে সেই পানিতে আর গগন বিদারী আওয়াজে ভরে উঠে বনের এমাথা ও মাথা। কিছুক্ষণ আগে একটা মায়া হরিণ বোধ হয় কাউকে ডাকছিলো ঘরে ফেরার জন্য, আমাদের আর্তনাদ শুনে সেও মুখে কলুপ এঁটে ভেগে গেলো অন্য কোন শান্ত যায়গায়। আর আমরা ১২টা প্রাণী পিঠে কয়েক কেজি বস্তা নিয়ে হেঁটে চলেছি ঝিড়ি থেকে বনে, বন থেকে পাথরে, পাথর থেকে কাঁটার জঙ্গলে, সেখান থেকে আবার চিৎপাত হয়ে শ্যাওলা ভরা পিচ্ছিল নতুন কোন ঝিড়িতে। দিনের আলো যখন আমাদের একাকী করে তারার দেশে রেখে গেলো ঠিক সে সময় দেখা মিলল আমাদের কাঙ্ক্ষিত জায়গার। এখানেই আমরা ক্যাম্পিং করবো আজ রাতে, মোমের আলোতে ভাসিয়ে দেবো পাহাড়ি ঝর্ণার ক্ষীণ স্রোতগুলোকে, আর কনকনে বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে গলা ছেড়ে গাইবো নিজেদেরই স্বরচিত কোন মুগ্ধ করা গান। অন্ধকারে যখন আমাদের হাতের তালু ছাড়া নিকটবর্তী আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না ঠিক সে সময় আমরা হাচড়ে পাচড়ে উঠে পৌছালাম পাহাড়ের এক্কেবারে চুড়ায়, এখান থেকে এক নিঃশ্বাসে পুরো ঝর্নাটা দেখা যায়, বর্ষাকালে চারপাশের বন, পাহাড় আর বাতাস কাঁপিয়ে যেই ঝর্নাটা নেমে আসে – সেখানে এখন হেলেদুলে বয়ে চলেছে রুগ্ন পানির ধারা। এই জায়গার নাম সুপ্তধারা ঝর্না।

ক্যাম্পিং করার প্রথম শর্তই হলো তাঁবু ফেলার জন্য ভালো এবং আরামদায়ক একটা জায়গা খুঁজে বের করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো খাবার রান্নার জন্য আগুনের ব্যবস্থা করা, আর তৃতীয় শর্ত হলো আয়েশ করে আসমান দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে যাওয়া। সুতরাং বসে থাকলে তো আমাদের হবে না, বিরাট বিরাট সব পাথর পড়ে আছে আমাদের সামনে, দুনিয়ার আর সব মানুষের কাছে এগুলো সামান্য পাথর হলেও আমাদের চোখে তখন এগুলো জলজ্যান্ত একেকটা বিছানা, কোন পাথরে কোন তাঁবু ফেলা হবে তাই নিয়ে জল্পনা কল্পনা আর গবেষণায় স্রোত বয়ে গেলো মিনিট পাঁচেক। এতক্ষনে অন্যদের বড় ব্যাগের রহস্য বোঝা গেলো, টপাটপ করে সেগুলো থেকে বের হতে লাগলো ভ্রাম্যমান ঘর, এদের মধ্যে একটা তাঁবু আবার বিশালতার দিক দিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলো, যখন সেটাকে দাড় করানো হলো তখন সে রীতিমতন একটা বিশাল ঘরে পরিনত হলো, যেখানে অনায়াসেই আটজন হাত পা মেলে ঘুমাতে পারবে। তাঁবুর গায়ে বাবর আলী নেপাল থেকে নিয়ে আসা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগিয়ে দিলো কয়েকটা, এগুলো নাকি যত উপরে সম্ভব লাগানো উচিত, এতে করে বুদ্ধের শান্তির বানী বাতাসের সাথে ছড়িয়ে পড়ে বন থেকে বনে, গ্রাম থেকে গ্রামে – আর সে বাতাস যদি শহুরে কোন লোকালয়ের উপরে দিয়ে বয়ে যায়, সেখানেও শান্তির বানী ছড়িয়ে পড়ে ঘর থেকে ঘরে। আমি হা করে তাবুর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি পোলাপাইন সব গায়েব ! কিছু চলে গেলো লাকড়ি জোগাড় করতে, আগুন জ্বালাবে আর কিছু চলে গেলো পেনি স্টোভ দিয়ে আগুন জ্বালাতে, কফি বানাবে। সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ভয়াবহ ঠান্ডা পানিতে খাবার দাবার কাটাকুটি করতে বসে গেলো রুপা দিদি! যে পানি দূর থেকে দেখলেই ঠান্ডায় গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায় সেই পানিতে অবলীলায় তিনি মুরগী, পেয়াজ, টমেটো কেটে আবার চাল, ডালও ধুয়ে ফেললেন ! ওদিকে সবার পেটে তখন ছুঁচোর নাচন – লাকড়ি রেডি, রান্না করার জন্য খাবার রেডি, পিপাসা মেটানোর জন্য ঝর্নার অঢেল পানি রেডি, আর কিসের চিন্তা – এবার জ্বালাও আগুন! কনকনে ঠান্ডায় আগুল জ্বলা মাত্রই সবাই সব কাজ ফেলে ছুটে এলো আগুনের পাশে, পরম মমতায় চুলোয় রান্না চড়িয়েছেন রুমী ভাই, তাকে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছেন বুনো ভাই। এই দুইজনের হাতের রান্না যেন চামচ চামচ শিল্প হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সবার প্লেটে প্লেটে, এতগুলো প্লেটও আসলে আনা হয়নাই! ফলে কেউ খেতে বসলো কুমিল্লা থেকে নিয়ে আসা সন্দেশের প্যাকেটে, আবার কেউ খেতে বসলো পাতিলের ঢাকনা উল্টো করে, এদের সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন আরমান ভাই, তিনি মগের মধ্যে খিচুড়ি-মাংস ঢেলে লাল জ্যাকেট পরে বসে গেলে কমলা আলোর কোলে। যেখানে কেউ ফোনের নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না সেখানে রুবা আপু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাইভারে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছেন আর আড্ডার ফাঁকে একফোঁটা ফুসরত পেলেই টপাটপ ক্যাম্পিং, রান্নার ছবি তুলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুকে। বিশাল সে আয়োজন – রান্নার স্বাদ এখনো মুখে লেগে রয়েছে, ফারহান ভাইএর কাছে রান্না এতই মজা লেগেছে যে তাঁকে খিচুড়ির পাতিলের আশপাশ থেকে নড়ানোই যাচ্ছে না, শেষমেশ খোকন কারিগর এসে তাঁকে পাজাকোলা করে তাঁবুতে নিয়ে শুইয়ে দিলেন, সাথে দিলেন পানির বোতল, উনি সারারাত পানি খেয়েই পার করে দিলেন!

খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট...
খুব ভোরে তোলা আমাদের ক্যাম্পিং সাইট…

রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে আমরা সবাই মুখোমুখি হলাম আকাশের, সেখান হাজার তারার মেলা বসেছে। সবাই সেজেছে আলোর সাজে। নিকষ আঁধারকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সবকটা তারা যেন আমাদের জন্যই কুয়াশাকে বিদায় করে দিয়েছে আজ, আজ তাদের অতিথিদের মুগ্ধ করার রাত, আজ তাদের নিজেদের উজাড় করে আঁধার পৃথিবীটা আলোকিত করার রাত। আমরা মুগ্ধ তাদের আয়োজন দেখে, প্রতি ঘণ্টায় পাল্টে যাচ্ছে আকাশের দৃশ্যপট, তারার সারি ক্রমেই বাড়ছে, দেখে মনে হচ্ছে রাতের সাথে সাথে ঘুমও ভাংছে তাদের, একেকজন একটা একটা করে চোখ মেলছে আর একটা একটা করে তারার জন্ম হচ্ছে ঘুটঘুটে কালো আকাশের গায়ে। হটাৎ তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হাজার হাজার ছিদ্র – সে ছিদ্র দিয়েই বুঝি আসছে আলোর বন্যা। তারার থেকে চোখ ফিরিয়ে এবার আমরা নজর দিলাম মর্ত্যের আঁধারে, এবার মোমবাতি জ্বালানো হবে। সবাই মিলে চললাম ঝর্নার একেবারে কোলে, ঠান্ডা পানি পায়ে মাড়িয়ে এসে থামলাম পাহাড়ের বুকের মাঝে, প্যাকেট থেকে একের পর এক অবমুক্ত করা হলো মোমবাতিগুলো। বসানো হলো নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর। মিনিটখানেক নিরবতা, সবাই চুপ, সবকিছুই যেন স্থবির।

এরপরই কালপুরুষ অপু, লিমন বড়ুয়া, বাবর আলী, বুনো ভাই, দিদার ভাই আর ফারহান ভাই এর হাতের ছোঁয়ায় জ্বলে উঠতে লাগলো মোমের শিখা, একের পর এক, শ’য়ের পর শ – সেগুলো ছাড়িয়ে গেলো হাজারের ঘরে। পুরো ঝর্না জুড়ে তিরতির করে চলছে মোমের আলোর নাচন! মুহূর্তেই কালো পাহাড় ভরে গেলো সোনালী আলোর ছটায়, সে আলোতে প্রাণ পেলো ঝর্নার পানি। তারার সাথে মিতালী গড়ে যে পানি এতদিন ধরে নিজের রুপে মুগ্ধ করছিলো পাহাড়ের অচেনা গাছের দলকে, সে পানি আজ তারার বসতি ছেড়ে গায়ে মেখেছে মোমের আলোর অলংকার! মুগ্ধ সে দৃশ্য দেখত হলেও দরকার মুগ্ধ চোখের, আমাদের সে চোখে মুগ্ধতা নেই আছে স্তব্ধ বিস্ময় – আমরা বিস্মিত হয়ে দেখছি সামান্য কিছু মোমের আলো কিভাবে রঙ ছড়িয়ে দেয় অচেনা জঙ্গলে ! আকাশ জুড়ে মিটমিট করতে হাসতে থাকা তারার দলও ম্রিয়মাণ হয়ে যায় টিমটিমে জ্বলতে থাকা এই মোমের শিখার কাছে। ধরাধমে চর্মচক্ষুতে এমন দৃশ্য খুব বেশী হয়তো দেখা সৌভাগ্য হয়না, তাই তোড়জোড় শুরু হলো ক্যামেরা নিয়ে। ট্রাইপডে বসে বসে সে একের পর এক ধরে রাখতে শুরু করলো মুগ্ধ বিস্ময়ের মুহূর্তটুকুকে। এক সময় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা এই আমাদের চোখের সামনেই গলে গলে থেমে গেলো বায়বীয় সোনালী আলোর নাচন, সে যায়গায় ভর করলো শুন্যতা। রাত তখন দেড়টা। আবার হেসেছে তারার মিছিল। আর আমরা ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম তাঁবুর ঘরের ঠান্ডা পাথুরে বিছানায়, সারারাত পৌষের শীত ছুরি চালালো কম্বলের বাহিরে থাকা শরীরের অংশে। আর সবকিছু রয়ে সয়ে আমরা চোখ বন্ধ করলাম গহীন অরণ্যে, তারার বিছানার ঠিক উল্টো দিকে। সারারাত তারার দল পাহারা দিয়ে রাখলো আমাদের, প্রকৃতির এই সন্তানদের…

হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল...
হাজার মোমের আলোয় জলে উঠেছিলো পাহাড়ের কোল…

পাহাড়ে ক্যাম্পিং করার সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন, কোন অপচনশীল জিনিস (পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, প্ল্যাস্টিকের প্যাকেট) ফেলে আসবেন না। এগুলো পুরো পরিবেশকে বিষিয়ে তুলবে। মলমুত্র এমন যায়গায় ত্যাগ করবেন যেখানে পানির সংস্পর্শ থাকবে না, এতে করে ঝর্নার পানি দূষিত হবে না। পাহাড়ে গিয়ে কাঁচা গাছ কাটবেন না, কোন পশু-পাখি হত্যা করবেন না। সবচাইতে বড় কথা চিৎকার চেঁচামেচি করবেন না, এটা জঙ্গলের প্রাণীদের আস্তানা, আমাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে সবচাইতে বড় অসুবিধা হয় তাদেরই। আর পাহাড়ে অনেক ঠান্ডা, কাজেই রাতে ক্যাম্পিং করতে গেলে গরম কাপড় অবশ্যই নিয়ে যাবেন, সাথে একটা তাঁবু। একটা জিনিস বুকের মধ্যে গেঁথে নিয়ে যাবেন – এই দেশের প্রতিটা  সম্পদ আমাদের, কাজেই একে কোনোভাবেই আমরা নস্ট করবো না। আমি যে সৌন্দর্যটা দেখার জন্য এখানে ছুটে এসেছি আমার ছোটভাইটা, সন্তানটা যেন ২০/৩০ বছর পরে এখানে এসে ঠিক আমার মত করেই যেন চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে বলতে পারে – “দেখো দেখো, আমাদের বাংলাদেশ কি সুন্দর”…

ও আরেকটা কথা, এখানে যাওয়া কিন্তু খুব সহজ, ঢাকা থেকে যেকোন চট্টগ্রামের গাড়িতে উঠে সীতাকুন্ডতে নেমে পড়বেন, সেখানের এসকেএম জুট মিলের রাস্তা ধরে রেললাইন পার হয়ে ঝিড়ি পথে হাঁটা দিবেন পাহাড় লক্ষ্য করে। ৪০ মিনিট পর নিজেদের আবিষ্কার করবেন সুপ্তধারা ঝর্নার নিচে, সেখান থেকে ডান পাশের পাহাড় বেয়ে উঠে যাবেন ঝর্নার উপরে। এবার জায়গা বেছে আরাম আয়েশ করে তাঁবু ফেলে কাটিয়ে দিতে পারেন জীবনের খুব অসাধারণ একটা রাত… জলে জঙ্গলে আপনাকে স্বাগতম…

Categories
Uncategorized

বান্দরবান – আমিয়াখুম, নাফাখুম ও রেমাক্রির গল্প…

……………………………………… (সোহান)……………………………………………

২৮ এপ্রিল – ৩ মে, ২০১৬

কয়দিন ধরেই পাহাড়ের কথা খুব মনে পরছে। বান্দরবানের আগের ট্যুরের স্মৃতি গুলো স্মরণ করেই দিন পার করছি। একদিকে কাজের ঝামেলা আর বান্দরবানের ভ্রমণ এত সহজে আয়োজন করা সম্ভব নয় দেখে দিন গুনছিলাম কখন একটু কাজের ঝামেলা কমবে আর একটা সুযোগ পাব। একদিন ফেসবুকে এই নিয়ে স্ট্যাটাস ও দিলাম। তারপর দিনই হাদি ভাই এর মেসেজ, যাবে নাকি বান্দরবান। ওনাদের একটা ক্লোজ গ্রুপ সার্কেল থেকে বান্দরবান ট্যুরে যাচ্ছে, আমি চাইলে যেতে পারি ওনাদের সাথে। এই কথা শুনে কাজের ঝামেলার কথা ভুলে গিয়ে রাজি হয়ে গেলাম।
২৮ এপ্রিল রাত সেই ভ্রমণের শুরু, তার আগের কয়দিনে যা দরকার গুছিয়ে নিলাম। কিছু প্রস্তুতির দরকার হয় তা সেরে নিলাম। আমার সাথে ভ্রমণ সঙ্গী ২২ জন। পরিচিত বলতে হাদি ভাই আর সহপাঠি তামান্না। বিশাল গ্রুপ নিয়ে ট্রেকিং ট্যুরে যাওয়া এবং বেশিরভাগ সঙ্গী অপরিচিত থাকায় কিছুটা শঙ্কায় ছিলাম কেমন হবে এই ভ্রমণ। রাত ৯ঃ৩০ এ সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে বন্ধু সুলভ সবার সাথে পরিচিত হতে হতে বুঝে গেলাম, এই ভ্রমণ বেশ মজারই হবে। আমাদের যাত্রা শুরু হলো ১০ঃ৪৫ এ বাস ছাড়ার সাথে সাথেই।
এই ভ্রমণের মূল গন্তব্য হলো আমিয়াখুম ঝর্না, নাফাখুম ঝর্ণা, রেমাক্রি আর তিন্দু। আমাদের যে রুট প্ল্যান ছিলো তা উলট পালট হয়ে গেলো হঠাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৯ তারিখ থানছি যাবে এই কারণে। ঐদিন দুপুর ১২ টার পর থেকে রেমাক্রির দিকে কোন ইঞ্জিন নৌকা চলবে না। যেভাবেই যাই আমাদের দুপুর ১২টার আগেই থানছি পৌঁছে নৌকা নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে আমাদের গন্তব্যের দিকে। তাই মনের মধ্যে একটা সংশয় ছিলো এই নিয়ে। তখন আমাদের রুট প্ল্যান হলো, বান্দরবান-থানছি-পদ্মমুখ-থুইসা পাড়া-আমিয়াখুম-থুইসা পাড়া-নাফাখুম-রেমাক্রি-থানছি-বান্দরবান ।
কাল সারাদিন দৌড়ের উপর থাকতে হবে, বাস ছাড়ার পর চেষ্টা করলাম কিছুটা ঘুমাতে। কিন্তু সব সময়ের মতো ঘুমের দেখা পেলাম না। পাশের যাত্রী রবিন ভাইয়ের সাথে গল্প করে আর গান শুনেই সময় যেতে লাগলো। কাল আবার পাহাড়ের কাছাকাছি থাকব এই ভেবে রোমাঞ্চিত ছিলাম। রাত ৩ টায় কুমিল্লায় নাস্তা করে বাস আবার চলতে শুরু করলো। বান্দরবানে নামলাম সকাল ৭টায়। ১২ টার আগেই থানছিতে থাকতে হবে, তাই তাড়াহুড়া করে পরোটা ডিম দিয়ে নাস্তা করে আগেই ঠিক করে রাখা দুইটা চান্দের গাড়িতে সবাই উঠে গেলাম।
 
বান্দরবান থেকে থানচির দূরত্ব ৭৬ কিলোমিটার। এখন পর্যন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় সড়ক পথ। আঁকা বাঁকা, উঁচু নিচু রাস্তা ধরে একটার পর একটা পাহাড়কে পাশ কাঁটিয়ে চলতে শুরু করেছে চাঁন্দের গাড়ি। এই যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দৃশ্যই দেখার মতো। গল্প, চিল্লানো আর গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাওয়া খেতে খেতে ১১টায় পৌঁছে গেলাম থানচি বাজারে। মাঝপথে কিছুটা বিশ্রাম আর আর্মি বিজিবি ক্যাম্প গুলোতে রিপোর্টের কাজ ও সারা হলো।
 
থানচিতে আমাদের সাথে গাইড আবুল যোগ দিলো, সাথে তার সহকারী শফিউল। অল্প কিছু নাস্তা আর দরকারি কিছু কেনাকাটা করে নিলো সবাই। এই দিকে টিম লিডার হাসান ভাই আর গাইড গেলো পুলিশ ক্যাম্পে অনুমতি নিতে। ফিরে এসে জানালো অনমুতি দেয় নাই। কিন্তু কিছু করার নাই, আমাদের যেতেই হবে, আর তা অনমুতি দিক কিংবা না দিক। আগেই ঠিক করে রাখা ৫টা ছোট ইঞ্জিন নৌকা দিয়ে যাত্রা শুরু হলো সাঙ্গু নদী দিয়ে। গন্তব্য পদ্মমুখ, যেখান থেকেই শুরু হবে আমাদের ট্রেকিং। সাঙ্গু নদী আর তার চারপাশের রূপের কথা আর কি বলবো, এক কথায় যাকে বলে অপরূপ। এই সময় পানির খুবই স্বল্পতা আর নৌকা চলছে উপরের দিকে স্রোতের বিপরীতে। নিচে ছোট বড় পাথরের আস্তরণ, একটু পর পর নৌকার তলা পাথরে আঁটকে যাচ্ছে। সবাইকে নেমে যেতে হচ্ছে, মাঝি আর তার সহকারী নৌকা ঠেলে একটু পানি বেশি আছে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা আবার উঠছি নৌকায়। গ্রীষ্মকাল চলে তবুও পাহাড়ে সবুজের কমতি নেই। দুইপাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে চলা সাংগু। ছবির মতো চারপাশ দেখতে দেখতে ঘন্টাকানেক পরেই পদ্মমুখ এ চলে আসলাম।
পদ্মমুখে নেমেই, সামনের সাঙ্গুর টলমল জল দেখে ঝাপিয়ে পড়লাম সবাই। বেশিক্ষণ ঝাপাঝাপি করা গেলো না। আজকেই যেতে হবে অনেক পথ। দুপুরের খাবার গাইডের বাসা থেকেই রান্না করে নিয়ে আসা হয়েছিলো। পদ্মমুখে বসে খিচুরী ডিম আর মুরগী দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে হলো। গলা দিয়ে ঢুকছিলো না, কিন্তু না খেয়ে উপায় নেই। আবার কখনো পেট ভরে খেতে পারবো তার ঠিক নেই। খাওয়ার পর্ব শেষ করে আদিবাসীর দোকানে এক কাপ চা খেয়ে শুরু হলো হাঁটা, সময় দুপুর ১ঃ৪০। গন্তব্য থুসাই পাড়া, যেখানে আজ রাত থাকা হবে। পাহাড়ি পথে ট্রেকিং এ অভ্যস্থ যাদের সময় লাগে ৪-৫ ঘন্টার মতো। আমাদের কত সময় লাগবে তার ঠিক নেই কোন। দলের বেশিরভাগ মানুষেরই এই প্রথম পাহাড়ে ট্রেকিং, সাথে আছে দুইজন মেয়ে। সব কিছু বিবেচনা করে ধরে নিয়েছি ৬-৭ ঘন্টার মতো লাগবে।
পদ্মঝিরি ধরে হাঁটছি। ঝিরিপথ সবসময় আমার পছন্দ। তুলনামূলক সহজ ট্রেইল। চারপাশের দৃশ্য সবসময়ের মতো মনোরম। ঝিরির কিছু জায়গায় শুকনো, কোথাও বা কোমর সমান পানি জমে আছে, দুইপাশেই পাহাড়, ছোট বড় পাথর, পিচ্ছিল পথ, গাছপালা, আলো আধারের খেলা। একেক জনের হাঁটার গতির কারণে কিছুক্ষণ পরেই কয়েক গ্রুপ হয়ে গেলো। কেউ সামনে কেউ পিছনে। নির্জন দুপুরে পাহাড়ের গরম স্বাভাবিক ভাবেই বেশি থাকে কিংবা বেশি লাগে। ঘামছি, শরীর ভিজছে, আবার শুকাচ্ছে। গলা শুকিয়ে গেলে বোতল থেকে এক চুমুক স্যালাইন খাচ্ছি। কতদূর হেঁটে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। আপ ট্রেইল না হওয়ায় সবাই বেশ আনন্দেই চলছি। চারপাশ দেখার সময় কমই পাওয়া যায়, সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়ে পথের উপর, কোথায় পা ফেলছি তার উপর। হঠাৎ জুতার ফিতে খুলে গিয়ে আছাড় খেলাম পাথরে, হাতে রাখা ক্যামের বাঁচাতে গিয়ে ঝিরির পানিতে পড়ে গিয়ে ব্যাগ গেলো ভিজে। ভিজলো ভিতরের সব কিছু। ভাগ্য ভালো কোন ব্যথা পেলাম না এইবার। ব্যাগের ওজন যত কম রাখা যায় ততই মঙ্গল। সেইভাবেই আমি ব্যাগ গুচিয়ে এনেছিলাম। কাপড় আর ব্যাগ ভিজে গিয়ে সেই কাঁধ ব্যাগের ওজন বেড়ে গেলো দ্বিগুন।
গত ৩ ঘন্টা ধরে হেঁটে আসা পথে আপ ট্রেইল ছিলো অল্পই। বাকি পথ টুকু আপ আর ডাউন ট্রেইল। অতিরাম পাড়ায় যাবার আগে এই প্রথম বার মোটামুটি একটা আপ ট্রেইল পাড়ি দিতে হবে। ২০ মিনিটের এই আপ ট্রেইলে উঠেই ফুসফুসে অক্সিজেনের অভাব অনুভব করছিলাম। পায়ের লিগামেন্ট গুলো মনে হচ্ছিলো যে কোন সময় ছিড়ে যাবে। জানি প্রথমদিন প্রথম উঁচু পাহাড়ে উঠা কষ্টকর, আস্তে ধীরে কিছুটা সয়ে যাবে। হরিতচন্দ্র পাড়ায় উঠেই এক আদিবাসীর ঘর থেকে ঠান্ডা পানি খেয়ে শরীর ঠান্ডা করলাম। একে একে সবাই উঠে আসলো, আর এই প্রথম অনেকেই প্রথমবারের মতো বুঝলো পাহাড়ে উঠা এত সহজ নয়। অনেকদিন পর পাহাড়ে উঠতে গিয়ে বুঝলাম আমার অবস্থাও এত ভালো নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাথার উপর সূর্য আর প্রচন্ড গরম।
হরিতচন্দ্র পাড়ায় ৩০ মিনিটের মত বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু হলো। বিকেল ৫ঃ৩০ তখন, সুর্য পশ্চিমে থাকলে গরম চারপাশেই আছে। পাড়া থেকে পথ চলে গেছে নিচের দিকে। পথ বেশি খাড়া আর ভেজা না থাকলে পাহাড় থেকে নামতে বেশ ভালই লাগে কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পথ উঠতে হবে অন্য এক পাহাড়ে। পাড়া থেকে কিছুদূর যাবার পরই চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা ঝুপ করে চলে আসে। আগেই জানা ছিল ট্রেক শেষ হতে রাত হবে। সাথে করে সবাই টর্চ নিয়ে আসা বাধ্যতামূলক ছিলো। টর্চের আলোয় আপ আর ডাউন ট্রেইলে চলছি। আশেপাশে কিছু দেখার উপায় নেই, সন্ধ্যায় পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকা গুলো ডেকেই যাচ্ছে অনবরত। অন্ধকার, পাহাড়, কেমন একটা অদ্ভুত পরিবেশে লাইন ধরে চলছি কয়েকজন। আমাদের সামনের কয়েকজন এক গাইড নিয়ে চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের সাথে আরেক গাইড, মাঝে আমরা কয়েকজন গাইড ছাড়া। পথ ভুল হলে বিপদে পরতে হবে এই চিন্তাও ঘুরছে। এইদিকে আমাদের সাথে যে পানি ছিল শেষ হয়ে গিয়েছে। গাইড বলে দিয়েছিলো পথে একটা ঝিরি পরবে, সেখানে পানি পাওয়া যাবে। হাঁটছি তো হাঁটছি কিন্তু ঝিরির দেখা নেই। সবার গলা শুকিয়ে গেছে। ঘেমে সব পানি বের হয়ে গেছে। বেশিক্ষণ এই ভাবে গেলে পানি শূন্যতায় ভুগতে হবে। অবশেষে এক ঝিরি পথ পেলাম, কিন্তু কোথায় পানি। সব শুকিয়ে আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম এইখানে বসে অপেক্ষা করবো পিছনের দলের জন্যে। শুকনো ঝিরির দুইপাশেই ঘন জংগল। উপরে খোলা আকাশে তারার মেলা। সবাই চুপচাপ। অদ্ভুত অনুভূতি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা আর পিছনে সাংকেতিক ভাষায় ডাকাডাকি করেও কোন সাড়াশব্দ পাওয়া গেলো না। আবার উঠে হাঁটা শুরু, পানি দরকার। পানি পেতেই হবে। পিছনে যারা আছে তাদের কাছেও যতদূর জানি পানি তেমন নাই। কিছুদূর এগিয়ে একটা ডাউন ট্রেইলে যেতেই একজনের মাথা ঘুরাতে লাগলো, টলতে টলতে হাটছিলো। অতীত অভিজ্ঞতায় থেকে উনাকে দেখেই বুঝলাম ডিহাইড্রেশন এর সমস্যা হচ্ছে। উনার ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আস্তে ধীরে ধরে ধরে সামনে এগুতে লাগলাম। ঐ মুহুর্তে কিছুটা ভয় লাগছিলো। পানি না পেলে খারাপ কিছু হতে পারে। ভাগ্য ভালো কিছুদূর সামনে এগিয়ে যেতেই একজন চিৎকার দিয়ে জানালো এক গর্তের মধ্যে অল্প জমে থাকা পানি পাওয়া গেছে। পানিতে ময়লা নাকি ব্যাঙ্গাছি আছে তা দেখার সময় নেই, বোতল ভরে স্যালাইল গুলিয়ে ঐ ভাইকে খাওয়ালাম। শরীর মুছিয়ে কিছুক্ষন রেস্ট নেবার পর উনি কিছুটা ঠিক হলো। আমরাও যে যতখানি পারি পানি খেয়ে খালি বোতল গুলো ভরে নিলাম। ঐদিকে পিছনে যারা আছে তাদের কোন খবর নেই। সময় যেতে লাগলো আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। মাথার ভিতর দুঃশ্চিন্তা, ওদের কারও কিছু হয় নি তো। যোগযোগ করার কোন উপায় নাই, ফিরতে পথে যে কেউ যাবে তার শক্তিও নেই। পিছনের দলে তামান্না আছে আর রুমকি আপু আছে তাই চিন্তা একটু বেশি লাগছিলো। অবশেষে ঘন্টা খানেক পরে তাদের সাড়া পাওয়া গেলো। আসার পর জানলাম এই ভাইয়ের মাসল পুল করেছে আর তামান্নার লো সুগার সমস্যা।
আবার শুরু হলো হাঁটা, কতটুকু পথ বাকি গাইডকে জিজ্ঞেস করলে বলে আর একটু আর একটু। কিন্তু একটু আর শেষ হয় না। এই দিকে রাত বাড়ছে, সন্ধ্যার পর ট্রেক করা আরও কঠিন হয়ে যায়। বেশি সবাধান থাকতে হয়। টর্চের আলো ফেলতেই মনে হলো কি জানি নড়লো, একটু পাশে আলো ফেলতেই প্রথমবারের মতো সাপের সাথে দেখা হয়ে গেলো। তিন হাতের মতো লম্বা, অপিরিচিত সাপ। পাশে থাকা হাদি ভাইকে বলতেই ইশারা দিলেন চেপে যেতে। সাপ দেখলে অনেকেই ভয় পেতে পারে তাই চুপ মেরে সামনের দিকে এগুতে লাগলাম। আমি ভুলে গেলাম একটু আগে আমার পা থেকে ৩-৪ হাত দূরে কি দেখেছি। সামনে কাঁধাময় ঝিরি আসলো, সাথে পিচ্ছিল পাথর। অন্ধকারে আরও বেশি দেখে শুনে চলতে হলো। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর পানির শব্দ পেলাম। গাইড কে জিজ্ঞেস করতেই বললো সামনেই রেমাক্রি খাল, সেই খালে পানি আসছে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য আমিয়াখুম থেকে। থুইসা পাড়া যেতে এই খাল পাড় হয়ে যেতে হবে। শুরু হলো পাহাড় থেকে নামা। এই প্রথম অনেকেই পাহাড় কত খাড়া হতে পারে তা টের পেলো। অন্ধকার থাকায় ভালই হলো, নিচে দেখা যায় না। দিনের বেলায় হয়তো এত খাড়া ঢাল দেখে মনে ভয় লেগে যেত। আস্তে ধীরে একে একে সবাই নেমে আসলাম খালের কাছে। পাড়ি দিলেই আমাদের গন্তব্যে চলে এসেছি, গাইডের কথা তাই। খালের ওপারে গিয়ে যাওয়ার পর শুনি, সামনে আরেকটা পাহাড় উঠতে হবে তারপর সেই কাঙ্ক্ষিত থুইসা পাড়া। শরীর আর কত সহ্য করবে, সেই গতকাল রাত থেকে জার্নি শুরু, তারপর ভালো ভাবে বিশ্রাম নেবার সুযোগ ও হয়নি। এই শেষ পাহাড় উঠতে গিয়ে আরও বেশি কষ্ট লাগছিলো। উঠার পর দেখি রাস্তা আমার নেমে গেছে নিচে, নিচে নেমে দেখি পাড়ার কোন দেখা নাই! আলো দেখে বুঝলাম সামনে আরেকটা ছোট পাহাড় আছে তার উপর সেই থুইসা পাড়া। সেই পাড়ায় উঠার পথটা মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার কঠিন পথ। দাঁতে দাঁত চেপে উঠে গেলাম সেখানে। উঠে বুক ভরে বাতাস নিলাম। পাড়ায় ঠিক করে রাখা ঘরের বারান্দায় হাত পা ছুড়ে কতক্ষণ তব্দা মেরে বসে থাকলাম। প্রচন্ড খিদা লেগেছে, দেরী না করে গোসল করে নিলাম। গোসল করার পর কিছুটা শান্তি লাগলো। এই দিকে আগেই চলে আসা গাইড সব কিছু ঠিক ফেলেছিলো। রান্নাও হয়ে গিয়েছিলো। গোসল করে এসেই ভাত ডাল মিষ্টি কুমড়া আর মুরগী মাংস দিয়ে পাগলের মতো খেয়ে নিলাম আমরা কয়েকজন। স্বাদ যেমনই হোক, ঐ সময় মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সেরা খারাপ খাচ্ছি। ঐদিকে পেছনের দলও চলে এসেছে। সবার মুখেই বিজয়ীর হাসি যদিও বেশিরভাগ জনই বলছিলো এইটাই জীবনের এই ধরণের তার শেষ ট্রেকিং ট্যুর। আর জীবনেও আসবেনা এইদিকে , এইভাবে। তামান্না আর রুমকী আপুর জন্যে বিশেষ অভিনন্দন জানালাম এত বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মানসিক শক্তির পরীক্ষা দিয়ে ঠিকমতো থুইসা পাড়ায় আসতে পারার জন্যে।
সবাই খুব বেশি ক্লান্ত। থাকার জন্যে দুইটা ঘর ঠিক করা হয়েছে। যে যার মতো শুয়ে গেলো। এইদিকে বেশি ক্লান্তি থাকলে আমার ঘুম আসে না। পাড়ার এই মাথা ঐ মাথা হেঁটে বেড়ালাম। ৮-৯ টা আদিবাসী পরিবারের বসবাস এই পাড়ায়। ছোট পাড়া। প্রায় সব ঘরেই সৌর বিদুৎ এর ব্যবস্থা আছে। সামনের ঘরেই আরেকটা গ্রুপ উঠেছে। তারাও ঘুরতে এসেছে গতকাল। উঠোনে গানের আসর বসিয়েছে। আমি বসে বসে আকাশের তারা দেখি আর গান শুনি। এই পাহাড়ে এত উচুতে মনে হচ্ছিলো আকাশের তারা গুলো আরও অনেকটা কাছে। অস্তির লাগছে, ঘুম নাই কিন্তু অনেক অনেক ক্লান্ত। আমাদের আরেক থাকার ঘরে গিয়ে দেখি কয়েকজন কার্ড খেলায় মেতেছে। আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। এই খেলা শেষ হলো রাত ৩টার পরে। ইচ্ছে ছিলো ভোর দেখার, কিন্তু সকালেই আবার শুরু হবে দ্বিতীয় দিনের মতো ট্রেকিং। অল্প হলেও ঘুম দরকার, অনিচ্ছা সত্তেও শুয়ে গেলাম। শুয়ে শুয়ে সারাদিনের কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে গেলাম।
সকাল ৭টার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল, আরও অনেকেই উঠে গেছে। ফ্রেশ হয়ে হালকা হলুদ দেওয়া খিচুড়ি, ডিম আর মুরগীর ঝুল দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। আজ যাবো আমিয়াখুম। থুইসা পাড়া থেকে যেতে কতক্ষণ লাগবে, পথ কেমন হবে গাইড কে জিজ্ঞেস করলে সে বলে আপনারা যেভাবে হাঁটেন তাঁতে ৫-৬ ঘন্টা লাগবে। সে আমাদের উপর চরম বিরক্ত এত বেশি বিশ্রাম নেই বলে। তাকে বুঝাতে পারলাম না যে গ্রুপের অনেকেরই জীবনের প্রথমবার এমন কঠিন পথে ট্রেকিং, তাই এমন হচ্ছে। সকাল ৯ঃ১৫ তে রওনা হয়ে গেলাম আমিয়াখুমের উদ্দ্যেশে। এই পথে পাড়ার এক দাদা কে সাথে করে নেওয়া হলো গাইড হিসেবে। গাইড আবুল থেকে গেলো অন্যসব কাজ ঘুছিয়ে রাখতে। পাড়ার দাদা জানালো আমাদের কে সহজ পথে অল্প সময়ে যাওয়া যায় এমন পথে নিয়ে যাবে। পাড়া থেকে বের হয়েই একটা আপ ট্রেইল। মাথার উপর সূর্য তার কাজ ঠিকমতই করে যাচ্ছে। পাড়া থেকে বের হয়েই এই আপট্রেইল দেখে আর গতকালের কথা চিন্তা করে একজনের মনোবল ভেঙ্গে গেলো। সে যাবে না আমাদের সাথে, পাড়ায় চলে যাবে। এইভাবে একে একে ৪জন পাড়ায় ফিরে গেলো। তাদের কে ফিরানো চেষ্টা করা হলো না। পাহাড় এমন এক জিনিস যেখানে প্রচন্ড মানসিক শক্তির দকার হয়। মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে গেলে তার জন্যে পাহাড়ে উঠা অসম্ভব হয়ে উঠে।
এই আপ ট্রেইলে উঠতে বেশ কষ্ট হলো আমার, সারা শরীর বেয়ে ঘামের স্রোতধারা। দম বন্ধ করা ঝাঁঝালো গরম। উপরে উঠেই হাপ পা ছুড়ে বসে গেলাম। সাথে থাকা স্যালাইনের অর্ধেক শেষ করে ফেললাম সেখানেই। ভরশা সামনে যদি কোথাও ঝিরি থাকে। তবে বাকি পথে এত কষ্ট হলো না। সুন্দর ট্রেইল আর ছোট কিছু আপ ডাউন ট্রেইল দিয়ে হেঁটে হেঁটে ২ ঘন্টা পর হাজির হলাম দেবতা পাহাড় নামক এক পাহাড়ের চূড়ায়। তখনো জানতাম না সামনে কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে। এই পাহাড় থেকে নামলেই আমিয়াখুমের কাছাকাছি চলে যাবো। ঘন গাছপালা থাকায় নিচে কি আছে বুঝার উপায় নেই। নামতে গিয়ে বুঝলাম এই খাড়া ঢাল অন্যসব পাহাড়ের মত নয়। বেশিরভাগ যায়গায় ৮০ডিগ্রী খাড়া ঢাল। একটু এদিক সেদিক কিংবা একটু অমনযোগ অথবা কপাল খারাপের কারণে হয়তো অনেক খারাপ কিছু ঘটে যেতে পারে। সবচেয়ে বাজে ব্যাপার ছিলো শুকনো গুড়ো মাটি আর ছোট ছোট পাথর। ট্রেকিং বান্ধব প্লাস্টিকের জুতো সেই গুলোর উপরে পড়লেও স্লিপ খেয়ে যায়। নামার পথের ঢালের দিকে অনেক জায়গাতেই ফাঁকা, তাকালেই মাথা ঘুরে এমন। এইখান থেকে পড়লে কত নিচে পরবো তা দেখার উপায় নেই। নামছি তো নামছি, শেষ হবার লক্ষণ নেই। আবার কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও পায়ের কাছেই গত রাতে পাহাড়ে লাগা আগুন থেকে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোয়া। এত দীর্ঘ খাড়া পাহাড় এ নামা এই প্রথম। বসে বসে, কাঁত হয়ে, হাতের লাটির উপর কখনো পুরো ব্যালেন্স দিয়ে, নুয়ে, জায়গায় জায়গায় অনেক কসরত করে নামছি। সবার কলিজাই ধুঁক ধুঁক করছে। একজন আরেকজন কে সাহস দিচ্ছে, সামনে কোন বিপদ হবার মতো কিছু থাকলে বলে দিচ্ছে, এই ভাবেই চলছি। আমার কোন ভয় কাজ করছিল না, হয়তো সেই অনুভূতি ছিলো না তখন। বুঝেছিলাম এইখানে ভয় পেয়ে লাভ নাই। যা আছে কপালে আর পায়ে, আর আছে ৮০ ডিগ্রী খাড়া ঢালে। মনে সাহস ছিলো, নিজের শরীরের ব্যলেন্সের উপর নিয়ন্ত্রণ ছিলো, আস্থা ছিলো পায়ের উপর, শরীরের সব ভর দেওয়া লাঠির উপর।
কোথাও বিশ্রাম নেবার মতো জায়গা নেই, এই ঢালে বসে থাকলেও কষ্ট লাগে। যত নিচে নামছিলাম চারপাশের গাছপালা গুলো আমাজনের মতো মনে হচ্ছিলো। প্রায় ৪৫ মিনিট নামার পর অবশেষে নিচে কিছু দেখা গুলো। মুখ দিয়ে এমনিতেই চিৎকার বের হলো। বাকি পথ তাড়াহুড়া করে নেমে চলে আসলাম নাইখ্যং মুখের কাছে। স্বচ্ছ পানির ছোটখাটো লেকের মতন দেখে আর দেরী করলাম না, সাথে সাথেই নেমে গেলাম আমরা যে কজন ছিলাম। শরীর ভাসিয়ে দিলাম পানিতে, পাথরে হেলান দিয়ে শুয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিলো অনন্তকাল এইভাবে থাকি। একে একে আরও কয়েজন চলে আসলো, পিছনে পথেও রয়ে গেল অনেকেই। তাদের জন্যে অপেক্ষা করছি তো করছি, কোন খবর নেই। এই দিকে এই পুরো সময় পানি থেকে উঠিনি। পানিতে বসে বসে দুপুরের খাওয়ার জন্যে নিয়ে আসা বিস্কিট কেক খেয়ে নিলাম। ঘন্টার চেয়েও বেশি সময় পরে শেষ দল পাহাড় থেকে নেমে আসলো। তাদের কে অভিনন্দন জানালাম হাত তালি দিয়ে, দেবতা পাহারের মতন নিষ্ঠুর খাড়া ঢাল বেয়ে সুস্থ মতে নিচে নামতে পারার জন্যে।
যেখানে ছিলাম সেখান থেকে মাত্র ১০মিনিটের হাঁটা পথ পরেই আমিয়াখুম। জানা ছিলো না, থাকলে এত সময় ঐখানে না থেকে ঝর্ণার কাছেই বসে থাকতাম। সে যাই হোক, দূর থেকেই যখন ঝর্ণার গর্জন শুনতে পেলাম, আর সহ্য হচ্ছিলোনা কখন উনার কাছে যেতে পারবো। বড় বড়ো পাথর পেড়িয়ে যখন ঊনার দেখা পেলাম। কয়েক পলক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বর্ষায় এর পুরো যৌবন থাকে, তখন আরও বেশি বন্য হলেও এই গ্রীষ্মে যতটুকুই পানি আছে তা দেখেই বিমোহিত হলাম। সবাই সবার মতো করে ছবি তোলতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। সময় তখন ২টার উপরে। এখানে বেশি সময় দেওয়া গেলো না, সামনে সাতভাইখুম থেকে ফিরে যাবার পথ ধরতে হবে। কিন্তু এতদূর আসলাম যে ঝর্ণার জন্যে সেখানে গাঁ ভিজাবো না তা কি হয়, নেমে গেলাম পানিতে। অল্প কিছুক্ষণ ভিজে সাঁতার কেটে উঠে চলে আসতে হলো।
সাতভাইখুম দেখে এইবার ফিরে যাবার পালা, ক্ষুধা অনেক, বিস্কুট ছাড়া কিছু নাই, আরও কিছু বিস্কুট খেয়ে এইবার অন্যপথ ধরে শুরু হলো হাঁটা। এই পথে বেশ কয়েকটা পাহাড় পাড়ি দিতে হবে। সেই কথা ভেবে সবাই মোটামুটি আতংকিত, আবার দেবতা পাহাড় দিয়ে ফিরে যেতে হবে না এই ভেবে খুশি। ৩ঃ৩০ এ শুরু হলো সেই পথ চলা। প্রথম পাহাড় উঠেই সবার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। শেষ বিকেলের আমাদের সাথে মুখোমুখি সূর্যের তাপদাহে মনে হচ্ছিলো সব পুড়ে যাচ্ছে। সবার সাথেই পানি অল্প করে ছিলো, আমি বুঝতে পারছিলাম সামনে পানির সন্ধান না পেলে সবাইকেই কষ্ট করতে হবে। আমিয়াখুমের জলের ধারা থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ৫০০এম এল এর দুইটা বোতলই ভরশা আমার। যত কমে পানি চুমুক দিয়ে গলা ভিজানো যায় সেইভাবেই পানি খাচ্ছি একটু পর পর। এক পাহাড় শেষ, আবার নামতে হবে নিচে, আবার উঠতে হবে আরেক পাহাড়ে। নামার পথে বড় বড় লতাপাতার আছড় লেগে হাতে পেয়ে মুখে লেগে জ্বলছে। মনে হচ্ছে পাহাড় গুলো মজার খেলায় মজেছে। একবার উঠো, একবার কষ্ট করে নামো আবার উঠো।
সবার কাছে থাকা পানি কমতে লাগলো, আশা সামনে একটা পাড়া আছে। দ্বিতীয় পাহাড় শেষ হবার পর কারও শরীরে শক্তি ছিলো না সামনের পাহাড় শেষ করার। আমার বোতলে এক দুই চুমু দেবার মত পানি বাকি আছে। সামনে পরে আছে সবচেয়ে উঁচু পাহাড়টা। কিছুক্ষণ দম নিয়ে মনে শক্তি নিয়ে শুরু হলো শেষ পাহাড়ে উঠা। এইতো দেখা যায় চূড়া, আর একটু পথ বাকি। উঠার পর দেখা যায় না সামনে আরেক চূড়া। বাঁকের জন্যে আগে দেখা যায় নি। ভাবলাম এইটাই শেষ, উঠে দেখি না পথ আরও বাকি। পাহাড় যেন খেলছে প্রতিনিয়ত আমাদের সাথে। কয়েকজন পানির অভাবে ভুগতে লাগল, শুয়ে গেলো পাহাড়ের ঢালে। মনের মাঝে জিদ চেপে গেলো, পানি ছাড়াই শুরু করলাম উপরে উঠা। একজন বললো ভাই আপনার চোখ তো অনেক হলুদ হয়ে গেছে। কেয়ার করলাম না কিছুই। অবশেষে চূড়ায় উঠেই দমকা বাতাসের স্পর্শ পেলাম। একটূ দূরেই দেখতে পেলাম পাড়ার ঘর গুলো। ভিতরটা সতেজ হয়ে গেলো সাথে সাথেই। পাড়ার নাম অতিরাম পাড়া। এক ঘরের সামনে মাচায় শুয়ে গেলাম, পানি খেলাম পেট ভরে। চুরি করে গাছ থেকে নিয়ে আসা আম খেলাম। কাঁচা আমের স্বাদ নতুন করে পেলাম নতুন পাড়ায় বসে। কিছুটা বিশ্রাম নেবার পর শরীরে শক্তি আসলো। অপেক্ষা করছিলাম সবাই কখন আসবে। অতিরাম পাড়ায় পৌঁছে ছিলাম ৫টায়। বাকিদের জন্যে অপেক্ষা করে আবার যখন রওনা দিলাম সূর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমের এক পাহাড়ের আড়ালে।
আর ঘন্টা খানেক পথ, তারপরই পৌঁছে যাবো থুইসা পাড়াতে। ঝিরির গর্ত থেকে আরও কিছু পানি নিয়ে আমি আর সাথে এক সঙ্গী নিয়ে হাঁটছি আনমনে। হঠাৎ সামনে দেখি রাস্তা মাঝে ভয়ংকর সদৃশ এক গয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথম গয়ালের সামনা সামনি। বুঝতে পারছিলাম না আমাদের দেখে সে রেগে গেলো নাকি ভয় পেলো। গয়াল কেমন আচরণ করে তার ব্যাপারেও ধারণা নেই। একটু দাড়ালাম, বুঝলাম সে কিছু করবে না। আস্তে ধীরে সে সরে গিয়ে আমাদের রাস্তা ছেড়ে দিলো। ছোট কিছু আপ আর ডাউন ট্রেইলের সহজ পথ। এই দিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আমার সাথে টর্চ ছিলো না, সাথের সঙ্গীর টর্চ ছিলো বলে রক্ষা। সামনের ওরা চলে গেছে আগেই, পিছনে যারা আছে তাদের দেখা নেই কারও। দুইজন হাঁটছি আধো অন্ধকারে। দুই পথ চলে আসলেই চিন্তা করছি কোন পথ সঠিক। পথে পায়ের ছাপ দেখে নিশ্চিত হতাম ঐ পথই সঠিক। ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর অবশেষে এক পাহাড়ের উপরে আলোর দেখা পেয়ে বুঝতে পারলাম আমরা চলে এসেছি থুইসা পাড়ার নিচে। পাড়ায় গিয়েই গোসল দিয়ে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেতে এক মুহুর্ত দেরী করলাম না। খাবারের মেন্যু ছিলো ভাত, ডাল, মিষ্টি কুমড়া আর পাড়া থেকে কেনা এক খাসীর মাংস দিয়ে। প্রতিবারের মতই পেটে একটুও জায়গা খালি না রেখে ভরে নিলাম। ঐসময় মনে হচ্ছিলো কি পরিমাণ ভাত খাচ্ছি আম্মা যদি দেখতো তাহলে সবথেকে খুশি হতো। জীবনে এত খাওয়া কমই খেয়েছি।
উঠোনে আড্ডা জমলো, আমাদের কষ্টের কথা শুনে যারা যায়নি আমাদের সাথে তাদের দুঃখ কিছুটা ঘুচলো। সবাই বলছিলো না গিয়ে তারাই ভালো কাজ করেছে। এই নিয়ে মজা চলছিলো যখন, শুরু হলো গানের আসর। এইদিকে উঠোনের আরেক পাশে গাইড বসে গেলো খাসীর মাংসের বারবিকিউ করতে। একটার পর একটা গান, সবার গলা মিলানো, আর উঠোনে শুয়ে আকাশের হাজার হাজার তারা দেখতে দেখতে মনের উঠোনে খেলা করছিলো অনেক কিছুই। জীবনের অর্থ কী বুঝার মতো কঠিক ব্যাপার গুলোও মাথায় ঘুরছিলো। জীবন সুন্দর কি না জানি না, তবে জীবনকে উপভোগ করতে চাই আমার মতো এমন ভাবনার প্রতি আত্মিবিশ্বাস বাড়ছিলো।
সবাই একসময় ঘুমাতে গেলো। আগের দিনের মত আমার ঘুম আসছিলো না। ঘরের ভিতর গরম লাগছিলো, আবার বাইরে ঠান্ডা পরিবেশ। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকেও ঘুমের দেখা না পেয়ে বাইরে চলে আসলাম। সুনশান নিরবতা, সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। প্রতি পাড়াতেই কুকুর আছে অনেক। আমি হাটছি, কয়েকটা কুকুরের বাচ্চা চলছে পিছু পিছু। হাত মুখ মাথা ভিজিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার আসলাম ঘুমাতে, অনেক্ষণ চেষ্টার পর ঘুমের দেখে পেলাম। সকাল সকাল উঠে যেতে হলো। আজও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আজকের গন্তব্য থুইসা পাড়া থেকে নাফাখুম ঝর্না, তারপর সেখান থেকে রেমাক্রি। অন্য দুই দিনের চেয়ে অনেক সহজ পথ। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম, গরম খিচুড়ি ডিম আর আগের দিনের খাসীর মাংস। স্বাদ যেমনই হোক, খেয়ে নিলাম পেট ভরে। জীবনের সুন্দর দুটো রাত কেটেছে এই পাড়ায়, হয়তো ভবিষ্যতে আবারও কখনো আসবো এই ভেবে সকাল ৯টার কিছু পর সবাইকে বিদায় জানিয়ে বের হলাম পাড়া থেকে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই সামনে পড়লো জিনা পাড়া। আমাদের আগের প্ল্যান অনুযায়ী এই পাড়াতেই থাকার কথা ছিলো। সুন্দর পাড়া, অন্য পাড়া গুলোর তুলনায় বেশি আদিবাসীর বসবাস। পাশ কাঁটিয়ে কিছুদূর আসতেই রেমাক্রি খালের দেখা পেলাম। এই সময়ে শুকিয়ে থাকা খালে অল্প বিস্তর পানি গড়িয়ে যাচ্ছে নিচের দিকে। বাকি পথ এই খাল ধরেই আগাতে হবে। কোথাও কোথাও একটু বেশি নিচু থাকায় বেশ পানি জমে আছে। চারপাশের প্রকৃতি আর রেমাক্রি খাল মিলেমিশে সুন্দর সব ল্যান্ডস্কেপ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। যখনই কোথাও বিশ্রামের জন্যে থেমেছি, পাশেই থাকা খালের স্বচ্ছ পানিতে গাঁ ডুবিয়ে বসে থাকার মতো মজার জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত করিনি। কাপড় বদলানোর কোন ঝামেলা নেই, কারণ সেই ভেজা কাপড় একটু পরেই রোদ আর শরীরের গরমে শুকিয়ে যায়। থুইসা পাড়া থেকে রেমাক্রি এই পুরো পথে গোসল করেছি ৫ বার!
রেমাক্রি খাল ধরে ট্রেইলটা মজার। এই কখনো মনে হচ্ছে মরুভূমির উপর, কখনো মনে হচ্ছে ছোট ছোট পাথরের দুনিয়ার উপর, কখনো নল খাগড়ার মাঝ দিয়ে কখনো বিশাল বিশাল সব পাথরের ফাঁক গলে, কখনো বা পাহাড়ের কিনারা ঘেষে চিকন পাথুরে দেয়াল দিয়ে। সামনে যতই যাচ্ছিলাম পাথর গুলোর আঁকার ততই বড় হচ্ছিলো। প্রায় ৩ঘন্টা হাঁটার পর দূর থেকেই নাফাখুমের গর্জন শুনতে পেলাম। ঝর্ণার পানি পতনের শব্দের চেয়ে মধুর শব্দ কমই আছে। গিয়ে আর দেরী না করে নেমে গেলাম ঝর্ণার উপরের স্টেপে। সেখান থেকে পানির স্রোতে ভেসে পড়লাম ঝর্ণার পানির সাথে নিচের জলাধারে। পানি কম থাকায় ভালই হয়েছে, যাওয়া যায় ফলের নিচেও। চিৎকার, উল্লাস, উপর থেকে লাফ, ঝর্ণার পানি দিয়ে শরীর ম্যাসেজ সবই হলো। ঘন্টাখানেক কাটালাম পানিতেই। এবার উঠে আবার পথ ধরতে হবে, সন্ধ্যার আগেই রেমাক্রি পৌছাতে হবে। যদিও এই ঝর্ণা ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না।
আবার শুরু হলো খালের পাশ দিয়ে হাঁটা। পুরো পথেই বেশ কয়েকবার খালের এইপাশ ঐপাশ যেতে হয়। একটু পর পরই উঁচু পাথরের খাঁজের ভাঁজ থেকে নিচে পানি পতনের কলকল শব্দ আর পাহাড়ে ঝিঁঝিঁ পোকাদের অবিরাম গেয়ে চলা গান, অচেনা পাখিদের ডাকাডাকি, সেই সাথে মোবাইলে বাজছিলো প্রিয় কিছু গান। ঐ মুহুর্তের অনুভূতি গুলো ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আরও প্রায় ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর এক পাড়ায় এসে নাস্তা করে নিলাম। এই দুইদিনে পাড়া কিংবা পথে সব জায়গাতেই ঝিরির ময়লা পানি খেয়েছি। পাড়ার পানি গুলো কিছুটা পরিস্কার থাকলেও, রাস্তায় যে সব ছোট গর্তের পানি খেয়েছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, দুনিয়ার যেখানেই যাই, যে কোন পানি খেতে আর সমস্যা হবে না। ছেঁকে কিছুটা পরিস্কার করবো সেই উপায় বা সময় ছিলো না। বোতলে ভরেছি, বোতলের মুখে গামছা রেখে পানি চুষে খেয়েছি। সহজ সিস্টেম। এই পাড়ায় এসে প্রথম কোন দোকান পেলাম, এইদিকে টুরিস্টদের আনাগোনা বেশি থাকে বলেই দোকান নিয়ে বসে আছে আদিবাসীদের পরিবার। অন্য কোন পানীয় এর স্বাদ এবার জন্যে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ অরেঞ্জ খেলাম ৩৫টাকা দিয়ে। দামই বলে দিচ্ছে, কতটুকু দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৫টাকা দামের ফিজ-আপ ৩৫টা হয়ে যায়। দুপুরের খাওয়া সারা হলো সিদ্ধ ডিম আর পাহাড়ি কলা দিয়েই।
আরও ৩০ মিনিটের পথ বাকি রেমাক্রি যেতে। উঠে গেলাম সবাই। পথ আগের মতই সুন্দর। পথের পাশে কিছু পাড়া চোখে পরে, মানুষজনও দেখা যায় কিছু এইদিকে। এই রেমাক্রি খাল মিশেছে সাঙ্গু নদীর সাথে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই রেমাক্রি পাড়া/বাজার। থাকা খাওয়া সবচেয়ে আধুনিকতার ছাপ চোখে পড়ে। থাকার জন্যে কাঠ বাঁশ দিয়ে তৈরি দুইতলা কটেজ আছে। সাঙ্গুর তীর ঘেষেই ৪রুমের ‘মেলোডি গেস্ট হাউজ’ নামের’ একটা কটেজ নেওয়া হলো আমাদের জন্যে। ছোট ছোট রুম, লম্বালম্বি করে ফ্ল্রোরে থাকার জন্যে আছে যাবতীয় সবকিছু। চারপাশে গাছপালা, সামনেই পাহাড়ের সারি, শুকিয়ে যাওয়া সাঙ্গু ছোট খালের মতো বয়ে চলছে।
সবকিছু কটেজে রেখেই চলে গেলাম গোসল করতে। হাটু পানি বা তারচেয়েও কম সাঙ্গুতে। কুসুম গরম পানির স্রোতে ডুবে থাকলাম অনেক্ষণ, বসে শুয়ে কাঁত হয়ে নানা ভঙ্গিমায় চললো নানান রকমে খেলা। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও উঠতে মন চাইছিলো না। পেটের কথা চিন্তা করে উঠে গেলাম। কাপড় বদলিয়ে কটেজে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কখন রাতের খাওয়ার জন্যে ডাক আসবে। শরীর ভালো লাগছিলো না, সাধারণত ঘুরতে গেলেই সবসময় আমার মাথা ব্যথা থাকে। গত দুইদিন মাথা ব্যাথার দেখা পাইনি, আজ শুরু হলো। প্রথমদিনই একজন কিছুটা অসুস্থ থাকায় তার ব্যাকপ্যাক আমার কাঁধে নিয়েই এক পাহাড়ে নামতে গিয়ে ঘাড়ের এক পেশিতে টান খেয়েছিলাম। আজ আবার সেই ব্যথা বেড়েছে। এইদিকে বাসায় বলে এসেছি দুইদিন নেটওয়ার্কের ভিতর থাকব না। আমি জানতাম রেমাক্রিতে টেলিটকে্র নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। কিন্তু এসে দেখি কোন নেটওয়ার্কই নেই। কাল থানচিতে যাবার আগে যোগাযোগ করার কোন উপায় নেই। বাসার কথা ভেবে অস্থির লাগছিল। সেই ব্যথা, মাথা ব্যাথা, বাসার কথা আর নিজের কিছু কারণে অস্থির লাগছিলো। ব্যথার ওষুধ খেয়ে রুমে অন্ধকারে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। সবাই মজা করছে, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি নিজের কাছেই ভালো লাগছিলো না। আমার এই অস্থির ভাব দূর করার জন্যেই হয়তো, হঠাৎ আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। পাহাড়ে ঝরের রাত, এমন একটা রাতের স্বপ্ন আমার অনেক আগে থেকেই ছিলো। সেই স্বপ্ন টা পূরণ করতেই বুঝি ঝড় শুরু হয়ে গেলো। বারান্দায় বসে থাকলাম পুরোটা সময়, বৃষ্টির ফোঁটা বাতাসে উড়ে এসে গায়ে পড়ছিলো। বিদ্যুতচমকের আলোতে সামনের সামনের পাহাড় গুলো দেখা যাচ্ছিলো, কোন দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘের ভাজে ভাজে আলোর রেখা খুব বেশি স্পষ্ট ছিলো। ঘণ্টাখানেক সময়ের এই ঝড় সব অস্থিরতা দূর করে দিলো। জীবনের সুন্দর আরেকটা রাত পাহাড়ে কাটছে আমার। রাত বাড়ছে, একে একে সবাই শুয়ে যাচ্ছে। এক রুমে কার্ড খেলা পাগলের খেলা জমে উঠেছে। একসময় আমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে। খেলা থেকে উঠলাম রাত ২টার পরে। ঘুমাতে যেতে যেতে ৩টা বাজলো। গত দুই দিনের একদিনও ভোর দেখিনি। কোন ট্যুরেই এমন হয় না আমার। আজ শেষ দিন, যে করেই হোক ভোর দেখবো। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
ঘুম ভাঙলো হাদী ভাইয়ের ডাক শুনে, ভাইকে আগেই বলে রেখেছিলাম ভোর দেখব বলে। বের হয়ে গেলাম কটেজ থেকে, স্নিগ্ধ ভোর। চারপাশেই পাহাড়ে জমাট মেঘ। এই তিন দিনে এই প্রথম কাছে মেঘের দেখা পেলাম। এই সময়ে ভোর ছাড়া বাকি সময়ে মেঘের দেখা পাওয়া যায় না এই দিকে। হাটতে হাঁটতে পাশেই বিজিবি ক্যাম্পের হেলিপ্যাডের চুড়ায় উঠে দেখলাম অন্যরকম এক রেমাক্রিকে। বেশ কিছু সময় কাটালাম সঙ্গে আরও কয়েকজন নিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় থেকে সূর্যের দেখা যাওয়ার পর চলে আসলাম কটেজে। একে একে সবাই উঠলো। হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম কটেজের মালিকের ঘরে ডিম আলু ভর্তা ডাল আর ভাত দিয়ে। এইখানের রান্নাও তুলনামূলক অনেক ভালো অন্য পাড়ার চেয়ে।
খেয়ে ব্যাগ ঘুছিয়ে প্রস্তুত হয়ে গেলাম ফিরে যাবার পথ ধরার জন্যে। রেমাক্রি ঘাটে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে নৌকা। ফেরার পথে বড়পাথর, তিন্দু দেখে যাবো থানচিতে। থানচি থেকে দুপুর ২টায় শেষ বাস যায় বান্দরবানে। ২টার আগেই থাকতে হবে থানচি। ৯টার দিকে একে একে বের হয়ে গেলাম রেমাক্রিকে বিদায় জানিয়ে। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর নৌপথ সাঙ্গু বা শঙ্খ নদীর এই থানচি-রেমাক্রি পথটুকু। অন্তত শুধু এই নৌপথের সৌন্দর্য দেখার জন্যে বার বার এই পথে আসা যায়। ফিরে আসার পথে ভাবছিলাম খুব শিগ্রই আবার দেখা হবে এই পথের সাথে, হয়তো তখন সাঙ্গু থাকবে ভরা যৌবনে।
বড় পাথর/রাজা পাথর জায়গাটুকু একটু বেশিই সুন্দর। বিশাল বিশাল সাইজের পাথর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সাঙ্গুর উপরে। এই পাথর গুলোর পাশ কেটেই আস্তে ধীরে চলছে নৌকা। পাথর গুলোর পাশে নিজেকে বেশ ছোটই মনে হচ্ছিলো। প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট এই মনোমুগ্ধকর নৌভ্রমণ শেষে থানচি ঘাঁটে চলে আসি। এইখানেই দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে বান্দরবানের উদ্দ্যেশে রওনা দিবো।
বাসের টিকেট কাটতে গিয়ে জানা গেলো বান্দরবান যেতে হবে বাস রিসার্ভ করে যেতে হবে। যে টাকা চায়, তারচেয়ে চান্দের গাড়ি করেই যাওয়া যায়। টিম লিডার জানালো বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়ি রওনা দিয়েছে, এইখানে এসে আমাদের নিয়ে যাবে। দুপুরের খাওয়ার পর্ব শেষ করার পর ঠান্ডা বাতাসের খোঁজে সামনে এগুলাম। থানচি নতুন ব্রিজের নিচে গিয়ে দেখি বড় বাঁশের মাচা। উপরে ব্রিজ, ব্রিজের পিলার ঘেঁষে মাচা, সাথেই নিচে বয়ে চলছে সাঙ্গু। অনেক বাতাস আর ছায়া পেয়ে চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভিড় করলো। ব্যাগটা মাথার নিচে রেখে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম এই খোলা পরিবেশে টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙল আমাদের আরেক সহযাত্রীর ডাকে। গিয়ে দেখি গাড়ি চলে এসেছে। ঘুম ঘুম চোখেই গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করতেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। পিছনে কত স্মৃতি ফেলে চলছি। জানি আবার দেখা হবে, নিশ্চয়ই হবে। সবাই বলে পাহাড় খুব খারাপ জিনিস, একবার ভালোবেসে ফেললে, তা থেকে দূরে থাকা যায় না বেশিদিন।
——————————————————————————–
লেখা এবং ছবি — সোহান…
পুরো ভ্রমণের ছবি পাওয়া যাবে এই খানে https://goo.gl/UAQueH ]
Categories
Uncategorized

জল-জঙ্গলের সুন্দরবনে…

ছবিঃ (আব্দুল্লাহ আবু দাইয়ান)…

বাংলাদেশের যে জায়গাটাতে সবুজের দল কখনো বুড়ো হয় না, যেখানে সারাটাদিন উড়ে উড়েও একটুও ময়লা হয় না শুভ্র বকের গায়ের পালক, যেখানে পাতার ফাঁকে ফাঁকে চোখ রেখে মায়ের সাথে লুকোচুরি খেলে দুস্টু বানরের দল–সেই যায়গাটার নাম সুন্দরবন। আলো আঁধারীর শ্বাসমূলের এই বনে চার পায়ে হাঁটা বাঘের সাথে প্রতিদিনই টেক্কা দেয় চিত্রা হরিণের ঝাঁক, জোয়ার ভাটার এই বনে লুকিয়ে চলা শুকরের পাল ধরতে নাক ডুবিয়ে বসে থাকে ধুসর কুমিরের ছোট্ট ছানাটা আর এলো চুলে খোঁপা বেঁধে কোমল বাতাসে দূলতে থাকে বনের গাছেরা, তাদের ডালে ডালে চলে সাপের আনাগোনা। সুন্দরবনকে বলা হয় ভয়ংকর সুন্দর একটা জায়গা যেখানে যেতে হয় শরীরের সবগুলো ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে নিয়ে, চলতে হয় তুমুল টেনশন আর কৌতূহলে দৌড়াতে থাকা শরীরের গরম রক্তকণাকে বুকে নিয়ে। বাঘ-হরিণের এই বনে আকর্ষণ যেমন আছে তেমনি আছে বিস্ময় আর চোখ জুড়ানো ভালোবাসা। এই বনে ঢুকতে হলে বন বিভাগ থেকে বিশেষ ধরণের পাশ নিতে হয়, যে কেউ যখন ইচ্ছা মন চাইলেই এখানে ঢুকে পড়তে পারে না। তবে মাঝে মধ্যে বিশেষ কোন অনুষ্ঠান থাকলে বনে প্রবেশ করা যায়। এর মধ্যে একটি হলো “রাসমেলা”।

Ek akash vorti tarar dol...

রাসমেলা মূলত অনুষ্ঠিত হয় সুন্দরবনের সাগরঘেঁষা দুবলার চরে। এই চরটা খুব মজার। এখানে বছরের ছয় মাস থৈ থৈ পানি থাকে, আর ছয় মাস থাকে শুকনো বালুচর। স্থানীয় জেলেরা ঐ ছয়মাসে এখানে এসে মাছের শুটকি বানায়। এই চরে কোন নারী নেই। পুরোপুরি পুরুষদের আস্তানা হিসেবে এটি স্বীকৃত। সুন্দরবনের নীলকমল বন ফাঁড়ির পরেই সাগর পাড়ি দিয়ে দুবলার চরের অবস্থান।

Sundarbans...

গেলোবছর এই রাসমেলার কারনেই আমাদের সুযোগ হয়েছিলো বনের একেবারে ভেতর দিয়ে ট্রলার নিয়ে ঘুরে বেড়াবার। সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে ২০ জনের এক বিশাল লটবহরসহ চকচকা নতুন এক ট্রলার নিয়ে আমরা ঢুকে পড়েছিলাম রয়্যাল বেঙ্গলের রাজত্বে। সারাদিন নৌকার উপরে চুপচাপ বসে থাকবো সে উপায় নেই এই প্রাণ-প্রানীদের অরণ্যে। ডান পাশে শিং বাগানো এক হরিণ দেখা যায় তো বাম পাশে অবাক হয়ে উঁকি দিতে থাকে শুকরের দল, তাদের দিকে ক্যামেরা তাক করতে করতেই ঘোলা নোনা পানি ঠেলে দিনের রোদে গা গরম করতে পাড়ে উঠে আসে বুড়ো কুমিরটা। চোখে ভয় আর বিস্ময় নিয়ে কুমিরের দিকে তাকিয়ে থাকে কোনদিন ছাড়া অবস্থায় কুমির না দেখা আমাদের শহুরে অনভ্যস্ত চোখ। বিস্ময়ের ঘোর দুপ করে কেটে যায় বানরের গাছ ঝাপটানোতে, আর ঠিক দুই হাত দূরত্বেই জ্ঞানী ভাব নিয়ে বসে বসে আমাদের দেখছে নানান রঙের মাছরাঙ্গা পাখি। সারা দুনিয়ার মানুষকে অবাক করা রহস্যঘেরা এই সুন্দরবন কখনোই আমাদেরকে একা থাকতে দেয়নি, কখনো সাপ দেখে চিৎকার করে উঠেছি, আবার কখনো হরিণের বাচ্চা দেখে খুব আদুরে মুখ করে তার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। কখনো বানর থেকে নিজেরাই বাঁদরামিতে লাফিয়ে বেড়িয়েছি আবার কখনো শুশুক দেখে চোখে দুরবীন লাগিয়ে আরো ভালোমতন বোঝার চেষ্টা করেছি যে আসলেই জিনিসটা কি। টানা তিন দিনের এই নৌকা ভ্রমণে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলো কয়েকশ সাদা বক আর নাম না জানা রঙ্গীন পাখির দল।

<!--nextpage-->

Sundorboner sokal...

<h2>দিনের সুন্দরবন যতটা প্রাণবন্ত, </h2>রাতের সুন্দরবন যেন তার চাইতেও চাকচিক্যময়-জৌলুসে ভরপুর। এক তারা ভর্তি আকাশের নিচে যখন শুয়ে শুয়ে তারা গোনার প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা, ঠিক তখনি সবটুকু মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে জোনাকিরা। জীবনে যে জিনিস কখনো দেখিনি সেই অদ্ভুত জিনিসই দেখালো আমাদের তারা। সবগুলো জোনাকি একটা নির্দিষ্ট গাছের পাতায় বসে মিটমিট করছে, এরপরের দুইটা গাছ পুরো অন্ধকার, তিন নাম্বার গাছটাতে আবার জোনাকির আসর বসেছে, পরের দুইটা গাছের তাদের কোন আগ্রহ নেই, কিন্তু পরের তিন নাম্বার গাছে আবার জমেছে তাদের আলোর আসর। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে অনেকগুলো ক্রিসমাস ট্রি শুধু জ্বলছে আর নিভছে! এই জিনিস যারা না দেখেছে তাদেরকে বলে বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। প্রকৃতির খুব কম মুগ্ধতাই আমরা দেখেছি, কিন্তু সুন্দরবনের রাতের যে আয়োজন প্রকৃতি করে রেখেছে তাকে ছাড়িয়ে যাবার মতন এখনো কেউ তৈরি হয়নি।

Doe in Sundarban

ভোরবেলাতে নীলকমল বনবিভাগের অফিসে নেমেই পেলাম বাঘের দেখা, দুটো শুকরকে দিক্বিদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে বনের রাজা। সেই দৃশ্য দেখার মতন পরিস্থিতিতে আমরা নেই, যে যার মতন পড়িমড়ি করে জান বাঁচাতে ছুটে গেলাম ওয়াচটাওয়ারে, সেখান থেকেই সবাইকে মুগ্ধ করে দিলো সকালের কুয়াশার চাদর মোড়ানো অপার্থিব সুন্দরবন। প্রতি পরতে পরতে মায়া ছড়িয়ে দেয়া বন ফেলে সাগর পাড়ি দিয়ে আমরা যখন দুবলার চরের দিকে রওানা দিলাম তখনি বিশাল লাফ দিয়ে পার হয়ে গেলো এক ঝাঁক হরিণের দল, সে আরেক বিস্ময়!

<!–nextpage–>

<!--nextpage-->

Great Tit

দুবলার চরে যখন পৌছালাম তখন মাঝ দুপুর। রাতে জমবে মেলার নাচ গান, সুতরাং আয়োজন শুরু হয়ে গেছে সকাল থেকেই। বৈশাখী মেলার মতন স্টল বসেছে কয়েকশ! পাওয়া যায়না এমন কিছুই নেই সেখানে। রাতে শুরু হলো গানের আসর, সে আসরে তাল মিয়ালাম শহর ফেরত আমরা কিছু তরুণ। এই চরে রাতের জ্যোৎস্নাটা ছিলো অপূর্ব, পুরো সাগরজুড়ে ছিলো সেই পূর্ণিমার চাঁদের আনাগোনা-যার আলো ছড়ানো ছিলো ভোরের সূর্য উঠার আগ পর্যন্ত। দুবলার চরের সমুদ্র সৈকতটা একেবারে নিরিবিলি আর ঝকঝকে নরম এক সৈকত, এখানে যতদূর চোখ পড়ে সব নারিকেল গাছের সারি আর বালুর ডিবি দিয়ে ঘেরা সমুদ্রের পাড়। আর সেই পাড়ের ধার ঘেঁসেই গড়ে উঠেছে অগুনিত শুটকিপল্লী। পুরো দ্বীপের বাতাস শুটকি মাছের এক আবেশী গন্ধে ভারি হয়ে আছে সারাক্ষণ। মানুষের মেলার সাথে সাথে সেই শুটকি খাবার জন্য জন্য জমেছে পাখিদের মেলাও। সেও এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।

Green Heron

যদি সুন্দরবনকে পরিপূর্ণভাবে দেখতে চান তাহলে “রাসমেলা” হচ্ছে একমাত্র সুযোগ। কেননা এখানে যেতে হলে সুন্দরবনের মাঝ দিয়েই যেতে হবে। এবারো নভেম্বরের ২৪ এবং ২৫ তারিখে সুন্দরবনে রাসমেলা অনুষ্ঠিত হবে। সাজানো হচ্ছে দুলার চর, নতুন অতিথিদের চমকে দেবার জন্য প্রস্তুত চমকের ভান্ডার আমাদের সুন্দরবন…

Spotted Deer

যেভাবে যাবেনঃ

রাসমেলায় যাওয়ার দুটি রাস্তা। প্রথমটি হলো সাতক্ষীরার মুন্সিগঞ্জ থেকে নীলকমল হয়ে দুবলার চর। এবং আরেকটি হলো মংলা হয়ে কটকা সি-বিচ ফেলে দুবলার চর। রাসমেলার মৌসুমে প্রচুর নৌকা এবং ট্রলার এখন দুবলাতে যাচ্ছে। আপনাকে প্রথমেই বনে ঢোকার পাশ নিয়ে নিতে হবে, সাথে যেই ট্রলারে যাচ্ছে সেই ট্রলারের জন্য অতিরিক্ত পাশ নিতে হবে। পুরো ট্রলার রিজার্ভ নিলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কাজেই সুন্দরবনে একটা দল হিসেবে যাওয়াটা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা কিছু সৌন্দর্য আছে যেগুলো কখনো একা দেখতে হয় না, সৌন্দর্য সবাইকে নিয়ে দেখতে হয়। টনা তিন দিনের ট্রলার জার্নিতে দিনে ঘুমালেও রাতে চেষ্টা করবেন না ঘুমিয়ে থাকতে। কারণ সুন্দরবন রাতের বেলাতেই যেগে উঠে। এর তারাভরা আকাশ এক কথায় অপূর্ব। ভালো কথা, দুবলার চলে কোন মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই, কাজেই পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই সেখানে যাবেন। আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো – বনের ভেতর দিয়ে যাবার সময় উচ্চস্বরে মাইক বাজাবেন না, এতে করে পশুপাখিদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যহত হয়। বনের অপচনশীল কিছু ফেলবেন না। বাঘের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ করবেন না। কারণ এই বাঘ আমাদের গর্ব, আমরাই এই বাঘের সুরক্ষা করবো”।

Wild Boar

Categories
Uncategorized

এক বর্ষায় লোভনীয় সিলেট…

ডুব পাথরে জলের বিছানাঃ বিছানাকান্দি, সিলেট

বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের রস্তুমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত বিছানাকান্দি সিলেট জেলার নবীনতম ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে এখন পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। সাদা কালো মেঘের চাদরে ঘেরা চেরাপুঞ্জি আর মেঘালয়ের সবুজ গালিচা পাতা পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাণবন্ত ঝর্ণার স্রোতস্বিনী জলধারার নিচে বিস্তৃত পাথুরে বিছানায় সজ্জিত অপরূপ সৌন্দর্যের আরেক নাম বিছানাকান্দি। অনেকের মতে গুচ্ছ গুচ্ছ পাথর বিছানো বলেই এর নাম হয়েছে বিছানাকান্দি।


বিছানাকান্দি মুলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সাতটি সুউচ্চ পর্বতের সঙ্গমস্থল যেখানে অনেকগুল ঝরনাধারার পানি একত্রিত হয়ে প্রবল বেগে আছড়ে পরে বাংলাদেশের পিয়াইন নদীতে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সাথে বড় বড় পাথর এসে জমা হয় বিছানাকান্দিতে। পিয়াইন নদীর একটি শাখা পাহাড়ের নীচ দিয়ে চলে গেছে ভোলাগঞ্জের দিকে আর একটি শাখা গেছে পাংতুমাই হয়ে জাফলং এর দিকে।


বর্ষার দিনে বিছানাকান্দির পূর্ণ যৌবনে লাভ করে, ভরাট জলে মেলে ধরে তার আসল রূপের বিস্তৃত মায়াজাল। শীতল এই স্রোতধারার স্বর্গীয় বিছানায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম লাবণ্যের স্পর্শ। সুযোগ করে দিতে পারে নগর জীবনের যাবতীয় ক্লান্তি বিসর্জন দিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটানোর। দুই পাশে আকাশচুম্বী পাহাড়, তার মাঝে বয়ে চলা ঝরনার স্রোত, পানি একেবারে পরিষ্কার, স্বচ্ছ, এবং টলমলে। স্বচ্ছ শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোমও দেখা যাবে স্পষ্ট। টলটলে পানিতে অর্ধ ডুবন্ত পাথরে মাথা রেখে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতে মন চাইবে। দীর্ঘ সময় জল পাথরের বিছানায় শুয়ে-বসে গোসল আর জলকেলিতে মেতে উঠলেও টের পাবেন না কখন বেলা গড়িয়ে যাবে। এই স্বর্গীয় বিছানা ছেড়ে হয়তো কোন কালেই উঠতে ইচ্ছে করবে না আপনার। কিন্তু বে-রসিক ঘড়ির কাঁটা একসময় জানিয়ে দিবে দুপুর পেড়িয়ে সময় এখন পড়ন্ত বিকেল, ফিরতে হবে আপন নীড়ে।


বিছানাকান্দি যেতে হলে র্সবপ্রথম আপনাকে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে প্রথমেই চোখে পরবে লাক্কাতুরা আর মালনিছরা চা বাগান। রাস্তার দুই পাশ জুড়ে শুধু সবুজ চা গাছের সারি, ওপরে নীল আকাশ আর নীচে যেন সবুজ গালিচা বিছানো। বিমানবন্দর পর্যন্ত এ রকমই সুন্দর রাস্তা দেখতে পাবেন। ছোট ছোট মনোলোভা টিলা পার হয়েই দেখা মিলবে পাথর ভাঙা রাজ্যের। এই রাস্তা ধরে সালুটিকর হয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন হাদারপার বাজারের কাছে। হাদারপার বাজারে যাবার আগেই মেঘালয়ের সারিবদ্ধ হয়ে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে সীমাহীন উঁচু পাহাড়ের সারি স্বাগত জানাতে জানাতে ধীরে ধীরে যেনো কাছে চলে আসতে থাকবে আপনার। দূর থেকে দেখতে পাবেন পাহারের বুক চিড়ে বয়ে আসা সাদা রেখার ন্যায় অসংখ্য ঝর্না হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে নিজেদের দিকে, আর আফসোস করতে থাকবেন ওই সবুজে মোড়ানো সারিবদ্ধ পাহাড় আর ঝর্নাগুলো কেন আমাদের হলো না! এসব ঝরণার কাছে গিয়ে পানি ছোঁয়ার কোনও সুযোগ নেই, শুধুই দুই চোখ ভরে উপভোগ করা যায়। কারণ এর সবগুলোই ভারতের।


হাদারপার খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চেঁপে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বিছানাকান্দির জল পাথরের বিছানার দিকে যতই এগিয়ে যাবেন ততই তার সৌন্দর্যছটা যেন উপচে বের হয়ে আসতে থাকবে। সঙ্গে মিলেমিশে একাকার নদীর এপার আর ওপারের অপার সৌন্দর্য যা আপনাকে দু হাত প্রসারিত করে আলিঙ্গন করবে সব সয়মই। এভাবেই ঠিক পনের মিনিট পর পৌঁছে যাবেন বিছানাকান্দি। দিনটি যদি হয় মেঘাবৃত আকাশ আর বৃষ্টিঝরা, তাহলে আপনি খুবই সৌভাগ্যবান! কারন আপনি উপলব্ধি করতে পারবেন এখানে আকাশে মেঘের কোলে হেলান দিয়ে পাহাড় যেন ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে।


বিছানাকান্দির এমন সৌন্দর্য বরষা চলে গেলে বা পানি কমে গেলে আর থাকেনা। তখন এটা হয়ে যায় একটা মরুদ্যান। পাথর বহন করার জন্য এখানে চলে অজস্র ট্রাক আর ট্রাকটর। সুতরাং অক্টোবর পর্যন্ত বিছানাকান্দি যাবার মোক্ষম সময়। তবে বর্ষায় পাহাড়ি ঢল থাকে বলে পিয়াইন নদীতে এ সময়ে মূল ধারায় স্রোত অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে, পানির প্রবাহ বেড়ে যায় কয়েকগুন । তাই বিছানাকান্দি যাওয়ার পথে ছোট নৌকা পরিহার করা উচিত। ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে বেড়াতে চেষ্টা করুন। এছাড়া এখানকার নৌকাগুলোতে লাইফ জ্যাকেট থাকে না। তাই যারা সাঁতার জানেন না, সঙ্গে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট নিয়ে নিবেন। আর যারা সাঁতার জানেন তারাও সাবধান, কারণ প্রচন্ড স্রোতে আপনি পাথরে আঘাত পেতে পারেন, কারণ মাঝে মাঝে পাথর খুবই পিচ্ছিল।


বিছানাকান্দির বিছানা বাংলাদেশ আর ভারত মিলিয়ে। স্বাভাবিক ভাবে সীমানা চিহ্ণিত করা নেই এখানে। জায়গাটিতে তাই সাবধানে বেড়ানো উচিৎ। বাংলাদেশ অংশ ছেড়ে ভারত অংশে চলে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। তবে দিনটা যদি হয় শুক্র বা সোমবার, তাহলে ভাববেন কপাল খুলে গেছে আপনার। সকাল দশটা থেকে চারটার ভিতর যেতে পারবেন ভারতে, সীমান্তে হাট বসে তখন। খেতে পারবেন ভারতীয় ফলমূল, কেনেকাটা করতে পারবেন রকমারি জিনিসপত্র।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন পাহাড়ি ঝর্না আর ডুব পাথরের জলখেলার দৃশ্যে শোভিত অপরূপ প্রকৃতির অপ্সরা বিছানাকান্দি থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। হাতে সময় থাকলে নৌকা নিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে আসতে পারেন পাংথুমাই ঝর্না আর লক্ষণছড়া থেকে। লিখাটি পড়ে ভালো লাগলে লাইক এবং শেয়ার দিয়ে অপরকে এই সুন্দর জায়গাটি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিন। 

Bichnakandi

জাফলং , গোয়াইনঘাট, সিলেট

জাফলং বাংলাদেশের সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকায়, ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য সমৃদ্ধ সম্পূর্ণ পাহাড়ী এলাকা যা সবুজ পাহাড়ের অরণ্যে ঘেরা। । এখানে পাহাড় আর নদীর অপূর্ব সম্মিলন বলে এই এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের পাহাড় থেকে ডাওকি নদী এই জাফলং দিয়ে পিয়াইন নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বর্ষাকালে ভারতীয় সীমান্তবর্তী শিলং মালভূমির পাহাড়গুলোতে প্রবল বৃষ্টিপাত হলে ঐসব পাহাড় থেকে ডাওকি নদীর প্রবল স্রোত বয়ে আনে বড় বড় গণ্ডশিলা (boulder)। একারণে সিলেট এলাকার জাফলং-এর নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাথর পাওয়া যায়। আর এই এলাকার মানুষের এক বৃহৎ অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে এই পাথর উত্তোলন ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে।


পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ, ভারত সীমান্ত-অভ্যন্তরে থাকা উঁচু উঁচু পাহাড়শ্রেণী, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, সর্পিলাকারে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেলপানি,উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তোলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। এসব দৃশ্যপট দেখতে প্রতিদিনই দেশী-বিদেশীপর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে।


ঋতুবৈচিত্র্যের সাথে জাফলংও তার রূপ বদলায়। বর্ষায় জাফলংএর রুপ লাবণ্য যেন ভিন্ন মাত্রায় ফুটে উঠে। মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের ফলে ভারত সীমান্তে প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ায় নদীর স্রোত বেড়ে গলে নদী ফিরে পায় তার প্রাণ, আর হয়ে ওঠে আরো মনোরম। ওপারের সবুজ পাহাড়ের বুক চিড়ে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়েরসবুজাভ চূড়ায় তুলার মত মেঘরাজির বিচরণ এবং যখন-তখন অঝোরধারায় বৃষ্টি মন্ত্রমূগ্ধ করে রাখে পর্যটকদের। আবার শীতে অন্য রূপে হাজির হয় জাফলং। চারিদেকে তখন সবুজের সমারোহ, পাহাড় চূড়ায় গহীন অরণ্য। ফলে শীত এবং বর্ষা সব সময়েই বেড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান হতে পারে জাফলং।


গাড়ী থেকে নেমে ভাড়ার নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্টে যাওয়া যায়, যেখানে রয়েছে ডাউকির ঝুলন্ত সেতু। খেয়া বা ভাড়া নৌকায় নদী পেরিয়ে পশ্চিম তীরে গেলে খাসিয়া আদিবাসীদের গ্রাম সংগ্রামপুঞ্জি ও নকশীয়াপুঞ্জি। নদীর পাড় থেকে স্থানীয় বাহনযোগে এসব পুঞ্জী ঘুরে বেড়ানো যায়। এই পুঞ্জিগুলোতে গেলে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর। প্রতিটি বাড়িতে সৃজিত পানবরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করেন। আর বাড়ির উঠোনে বসে নারী সদস্যরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করেন বিক্রির জন্য। পান পাতা সংগ্রহ ও খাঁচা ভর্তি করার অভিনব দৃশ্য পর্যটকদের নজরকাড়ে। পানবরজ ছাড়াও খাসিয়া পল্লীতে দেখা যাবে কমলা বাগান। কাঁচা-পাকা কমলায় নুয়ে আছে বাগানের গাছ। সংগ্রামপুঞ্জির রাস্তা ধরে আরেকটু এগুলো দেখা যাবে দেশের প্রথম সমতল চা বাগান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, হাজার বছর ধরে জাফলং ছিল খাসিয়া জৈন্তা-রাজার অধীন নির্জন বনভূমি। ১৯৫৪ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর খাসিয়া জৈন্তা রাজ্যের অবসান ঘটে।


যদি ও শীতকালেই পর্যটক সমাগম বেশী হয় কিন্তু এই অঞ্চলের পাহাড়ের সবুজ, মেঘ ও ঝর্ণার প্রকৃত সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায় বর্ষাকালে। সিলেটে বর্ষা সাধারনতঃ দীর্ঘ হয়। সেই হিসেবে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভ্রমনের উপযুক্ত সময়।


সরাসরি জাফলং যেতে সিলেট থেকে গাড়ীতে সময় লাগে একঘন্টা ত্রিশ মিনিটের মতো। সিলেট শহর থেকে ৬-৮ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৪৫০০ – ৫০০০ টাকার মধ্যে। ৯-১২ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৫৫০০ – ৬০০০ টাকার মধ্যে। শুক্রবার হলে আরেকটু বেশী ও হতে পারে। নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্টে যেতে স্থানীয় নৌকায় ৫০০ টাকার মতো খরচ পড়ে। নদী পেরিয়ে খাসিয়া পুঞ্জিতে যেতে স্থানীয় বাহনে ( ময়ূরী নামে পরিচিত) খরচ পড়বে সময়ভেদে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। যদি আপনি জাফলং-এ ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তাহলে জাফলং-এ সারাদিন বেড়িয়ে সন্ধ্যায় সিলেট শহরে ফিরে ডাওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
Jaflong

Photo Credit: TuheenBD

খাদিমনগর রেইনফরেস্ট, সিলেট

সিলেট শহর থেকে জাফলং রোড ধরে ১০ কিমি এর মতো এগুলেই শাহপরান মাজার গেট পেরুনোর পর পরই খাদিম চৌমুহনা। খাদিম চৌমুহনা থেকে হাতের ডানদিকে চলে গেছে রাস্তা। রাস্তা ধরে সামনে গেলে খাদিমনগর চাবাগানের শুরু। বাগানের রাস্তা ধরে আরেকটু সামনে গেলে একটা কালভার্ট। কালভার্ট পেরিয়ে বামের রাস্তা না ধরে পথ ধরে এগিয়ে যেতে থাকলে আরো চা বাগান, চা বাগানের পর প্রাকৃতিক বনের হাতছানি। মুল সড়ক থেকে উত্তরের দিকে পাকা, কাঁচা ও ইট বিছানো পাঁচ কিমি পথ পেরুনোর পর খাদিমনগর রেইনফরেস্টের শুরু। পূর্বে ছড়াগাঙ্গ ও হাবিবনগর, পশ্চিমে বরজান ও কালাগুল, উত্তরে গুলনি, দক্ষিনে খাদিমনগর এই ছয়টি চা বাগানের মাঝখানে ১৬৭৩ একর পাহাড় ও প্রাকৃতিক বনের সমন্বয়ে গড়ে উঠা এই রেইনফরেস্টটি জাতীয় উদ্যান বলে সরকারী স্বীকৃতি পেয়েছে এবং ইউএসএইড এর সহায়তায় এর ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে।

এই বনে হাঁটার জন্য ৪৫ মিনিট ও দুইঘন্টার দুটো ট্রেইল আছে। বনবিভাগের বিট অফিসের সামনে ট্রেইল দুটোর মানচিত্র দেয়া আছে, এ ছাড়া স্থানীয় কাউকে গাইড হিসাবে ও সাথে নেয়া যেতে পারে।

রেইনফরেস্টের সামনে দিয়ে উত্তর দিকে যে রাস্তা চলে গেছে, সে দিক দিয়ে এগিয়ে গেলে এয়ারপোর্ট-হরিপুর সড়কে উঠা যায়, সেখান থেকে আবার রাতারগুল সোয়াম্পফরেস্টে ও সহজেই যাওয়া সম্ভব। কোন পর্যটক যদি একদিনের জন্য সিলেট ঘুরতে চান সে ক্ষেত্রে এই পথটি ব্যবহার করে চাবাগান, রেইনফরেস্ট, সোয়ামফরেস্ট দেখে যেতে পারেন।

এই পথের অধিকাংশ কাঁচা ও ইট বিছানো হলে ও গাড়ী নিয়ে যাওয়া যায় তবে বৃষ্টি থাকলে সে ক্ষেত্রে সিএনজি নিয়ে যাওয়া ভালো। খাদিম চৌমুহনাতে ভাড়ার সিএনজি পাওয়া যায়।

Khadim Nagar Rain forests

Photo Credit: Mehedi Hasan Suvo

লালাখাল, জৈন্তিয়াপুর, সিলেট

মেঘালয় পর্বত শ্রেনীর সবচেয়ে পুর্বের অংশ জৈন্তিয়া হিলসের ঠিক নীচে পাহাড়, প্রাকৃতিক বন, চা বাগান ও নদীঘেরা একটি গ্রাম লালাখাল, । লালাখাল থেকে সারীঘাট পর্যন্ত নদীর ১২ কিমি পানির রঙ পান্না সবুজ- পুরো শীতকাল এবং অন্যান্য সময় বৃষ্টি না হলে এই রঙ থাকে। মুলতঃ জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে আসা প্রবাহমান পানির সাথে মিশে থাকা খনিজ এবং কাদার পরিবর্তে নদীর বালুময় তলদেশের কারনেই এই নদীর পানির রঙ এরকম দেখায়।

স্বচ্চ নীল জল রাশি আর দুধারের অপরুপ সোন্দর্য, দীর্ঘ নৌ পথ ভ্রমনের সাধ যেকোন পর্যটকের কাছে এক দূর্লভ আর্কষণ। সারি নদীর স্বচ্চ জলরাশির উপর দিয়ে নৌকা অথবা স্পীডবোটে করে আপনি যেতে পারেন লালা খালে। যাবার পথে আপনির দুচোখ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাবেন কিন্ত সৌন্দর্য শেষ হবে না। ৪৫ মিনিট যাত্রা শেষে আপনি পৌছে যাবেন লালখাল চা বাগানের ফ্যাক্টরী ঘাটে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবেন নদীর পানির দিকে। কি সুন্দর নীল, একদম নীচে দেখা যায়। ভারতের চেরাপুঞ্জির ঠিক নিচেই লালাখালের অবস্থান। চেরাপুঞ্জি পাহাড় থেকে উৎপন্ন এই নদী সারী নদী নামে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।


সিলেট জাফলং মহাসড়কে শহর থেকে প্রায় ৪২ কিমি দূরে সারীঘাট। সারীঘাট থেকে সাধারনতঃ নৌকা নিয়ে পর্যটকরা লালাখাল যান। স্থানীয় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় একঘন্টা পনেরো মিনিটের মতো সময় লাগে সারী নদীর উৎসমুখ পর্যন্ত যেতে। উৎসমুখের কাছাকাছিই রয়েছে লালাখাল চা বাগান।

সরাসরি গাড়ী নিয়ে ও লালাখাল যাওয়া যায়। সারী ব্রীজ় পেরিয়ে একটু সামনেই রাস্তার মাঝখানে একটি পুরনো স্থাপনা।এটি ছিলো জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজকুমারী ইরাবতীর নামে একটি পান্থশালা। এর পাশ দিয়ে হাতের ডানের রাস্তায় ঢুকে সাত কিমি গেলেই লালাখাল। লালাখাল এ রিভার কুইন রেস্টুরেন্ট এর সামনে থেকে ও নৌকা নিয়ে জিরোপয়েন্ট ঘুরে আসা যায়।

সিলেট শহর থেকে লালাখাল পর্যন্ত ৬-৮ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৩৫০০ – ৪০০০ টাকার মধ্যে। ৯-১২ জন বহনকারী মাইক্রো ভাড়া হতে পারে ৪৫০০ – ৫,৫০০ টাকার মধ্যে। শুক্রবার হলে আরেকটু বেশী ও হতে পারে।

সারীঘাট থেকে স্থানীয় নৌকা নিয়ে লালাখাল যেতে খরচ পড়বে ১০০০-১৫০০ টাকার মতো খরচ পড়ে। আর নাজিমগড় বোট স্টেশনের বিশেষায়িত নৌকাগুলোর ভাড়া ২০০০-৫০০০ টাকা পর্যন্ত। গাড়ী নিয়ে লালাখাল চলে গেলে রিভারকুইন রেস্টুরেন্ট থেকে আধাঘন্টার জন্য নৌকা ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা।

Lalakhal

Photo Credit: Shakhawat Hossain

লক্ষণছড়া, গোয়াইনঘাট, সিলেট

পাংথুমাই থেকে পিয়াইন নদী ধরে হাদারপাড়ের উদ্দেশে ফিরতি পথে দেখা যাবে আরেকটি পাহাড়ি ঝিরি। এর নাম লক্ষণছড়া। এ ঝিরিটিও ভারতের মেঘালয়ের পাহাড় থেকে এসে বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের এ ঝিরিটি দেখতে হলে পিয়াইন নদী ধরে চলতে চলতে পূর্ব রুস্তমপুর প্রামে নামতে হবে। সেখান থেকে লক্ষণছড়া প্রায় বিশ মিনিটের হাঁটা পথ। তবে ভরা বর্ষায় এলাকার নিচু জমি ডুবে গেলে একেবারে লক্ষণছড়ার খুব কাছাকাছি ছোট ইঞ্জিন নৌকায় যাওয়া যায়। এখানে রুস্তমপুর গ্রামে ১২৬৬ নং সীমানা পিলারের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে লক্ষণছড়া। পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে একটু দূরে সবুজের মাঝে একটি বাঁকানো সেতু দেখা যায় ঝিরির উপরে । সেতুটি ভারতের মধ্যে । লক্ষণছড়ার পানিও বেশ শীতল। দুই দেশের বাসিন্দারা নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে এ ছড়ার পানিই ব্যবহার করেন। লক্ষণ ছড়ায় কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। পিয়াইন নদীর পাড়ে রুস্তমপুর গ্রামের মেঠো পথ ধরে লক্ষণছড়ায় হেঁটে যেতে ভালো লাগবে । ভারতের আকাশছোঁয়া পাহাড়ের পাদদেশে এ গ্রামটি ছবির মতো সাজানো ।

Lokkhonchora

লোভাছড়া, কানাইঘাট, সিলেট

উত্তর-পূর্ব থেকে উত্তর পশ্চিম পর্যন্ত সিলেটকে ঘিরে রাখা মেঘালয় পাহাড়শ্রেনীর পূর্ব অংশে কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল লোভাছড়া। লোভাছড়া মুলতঃ একটি পাথর কোয়ারী, এ ছাড়া এখানে অনেক পুরনো একটি চাবাগান রয়েছে।

লোভাছড়া যেতে হলে পর্যটকদের প্রথমে যেতে হবে কানাইঘাট উপজেলা সদরে। সিলেট নগরী থেকে কানাইঘাট যাওয়ার কয়েকটি পথ আছে। সিলেট জাফলং মহাসড়কের উপর দরবস্ত বাজার থেকে হাতের ডান দিকে রাস্তা চলে গেছে কানাইঘাট পর্যন্ত। মাইক্রোতে ঘন্টা দেড়েক এর মতো সময় লাগবে। এই রাস্তাটি ও সুন্দর। বামদিকে জৈন্তিয়া পাহাড়ের সারি । কানাইঘাট উপজেলা সদর সুরমা নদীর তীরে। নদীরঘাট থেকে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয় লোভাছড়ার দিকে। নৌকা এগুতে থাকে পূর্ব দিকে। একটা পয়েন্টে এসে নৌকা পড়বে তিন নদীর মোহনায়। দক্ষিন থেকে এসেছে বরাক, উত্তর থেকে লোভা। এই দুই নদী মিশে সুরমা হিসেবে চলে গেছে পশ্চিমে। এই মোহনায় এসে নৌকা প্রবেশ করে স্বচ্ছ পানির নদী ‘লোভা’য়।


লোভা নদীর স্বচ্ছ কাঁচের মতো পানিতে দূরবর্তী পাহাড় সারির ছায়া এক মোহময় দৃশ্যের জন্ম দেয়। নদীর তীর থেকে উঁচু পাহাড়ের ঢাল পর্যন্ত বিস্তৃত লোভাছড়া চা বাগান। এই বাগানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধ্বংসপ্রাপ্ত ফ্যাক্টরী। বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পুরনো বাংলো দেখা আবশ্যক পর্যটকদের জন্য। বেশ উঁচু পাহাড়ের উপর নির্মিত এই বাংলোটি ‘ফার্গুসন’ এর বাংলো নামে পরিচিত। ফার্গুসন পরিবার এর হাতেই এই চাবাগানের পত্তন হয়েছিলো।
এছাড়া সীমান্তরক্ষীদের অনুমতিসাপেক্ষের লোভা নদীর উৎসমুখে গেলে পর্যটকদের চোখে পড়বে সীমান্তের ওপাড়ে দুই পাহাড়ের সংযোগকারী দীর্ঘ ঝুলন্ত ব্রীজ।


কানাইঘাট থেকে লোভাছড়া নৌকায় যেতে সময় লাগবে প্রায় দেড়ঘণ্টা।

Lovachora, Kanaighat

PC: Dulal Khan

পাহাড়ি মায়া ঝরনাঃ পাংথুমাই

ভারত সীমান্তবর্তি মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থানার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে অবস্থিত পাংথুমাই গ্রামটি বাংলাদেশ এর সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম হিসেবে ইতিমধ্যেই পর্যটকদের নিকট পরিচিতি লাভ করেছে। এই গ্রামের মুল সৌন্দর্য হচ্ছে মেঘালয় পাহাড় থেকে বেয়ে আসা দারুণ একটি ঝর্ণা। ঝরনাটি ভোগোলিক ভাবে ভারতে অন্তর্ভুক্ত। তাই আমরা বাংলাদেশীরা শুধু দূর থেকেই দেখি এর সৌন্দর্য।সুউচ্চ পাহাড় থেকে নেমে আসছে জলরাশি। সফেদ জলধারা লেপ্টে আছে সবুজ পাহাড়ের গায়। দেখলে মনে হবে সবুজের বুকে কেউ হয়তো বিছিয়ে রেখেছে সাদা শাড়ি।এই ঝর্ণাধারাটি স্থানীয়ভাবে মায়ামতি ও ফাটাছড়া ঝর্ণা হিসেবে পরিচিত, কেউ কেউ একে ডাকেন বড়হিল ঝরনা বলে। আর পর্যটকদের কাছে জলপ্রপাতটির পরিচিতি ‘পাংথুমাই ঝর্ণা’ নামে।


পাংথুমাই যেতে হলে র্সবপ্রথম আপনাকে আসতে হবে সিলেট শহরে। সিলেট নগরীর আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে গেলে প্রথমেই চোখে পরবে লাক্কাতুরা আর মালনিছরা চা বাগান। রাস্তার দুই পাশ জুড়ে শুধু সবুজ চা গাছের সারি, ওপরে নীল আকাশ আর নীচে যেন সবুজ গালিচা বিছানো। বিমানবন্দর পর্যন্ত এ রকমই সুন্দর রাস্তা দেখতে পাবেন। ছোট ছোট মনোলোভা টিলা পার হয়েই দেখা মিলবে পাথর ভাঙা রাজ্যের। এই রাস্তা ধরে সালুটিকর হয়ে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন হাদারপার বাজারের কাছে। হাদারপার বাজারে যাবার আগেই মেঘালয়ের সারিবদ্ধ হয়ে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে সীমাহীন উঁচু পাহাড়ের সারি স্বাগত জানাতে জানাতে ধীরে ধীরে যেনো কাছে চলে আসতে থাকবে আপনার। দূর থেকে দেখতে পাবেন পাহারের বুক চিড়ে বয়ে আসা সাদা রেখার ন্যায় অসংখ্য ঝর্না হাতছানি দিয়ে ডাকতে শুরু করেছে নিজেদের দিকে, আর আফসোস করতে থাকবেন ওই সবুজে মোড়ানো সারিবদ্ধ পাহাড় আর ঝর্নাগুলো কেন আমাদের হলো না! এসব ঝরণার কাছে গিয়ে পানি ছোঁয়ার কোনও সুযোগ নেই, শুধুই দুই চোখ ভরে উপভোগ করা যায়। কারণ এর সবগুলোই ভারতের। হাদারপার খেয়াঘাট থেকে নৌকায় চেঁপে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের সিমান্ত ঘেসা আকাবাকা পিয়াইন নদী ধরে এক থেকে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন পাংথুমাই।


এছাড়া সিলেট শহর থেকে মাইক্রোবাস অথবা সিএনজি ভাড়া করে সরাসরি যাওয়া যাবে পাংথুমাই পর্যন্ত। পাংথুমাইয়ে যাওয়া যায় দুটি রাস্তায়। একটি হচ্ছে গোয়াইনঘাটের সালুটিকর হয়ে আর অন্যটি জৈন্তাপুরের সারিঘাট হয়ে। উভয় রাস্তায় দূরত্ব ও ভাড়া সমান।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন পাহাড়ি ঝর্না পাংথুমাই থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। হাতে সময় থাকলে নৌকা নিয়ে বিকেলটা কাটিয়ে আসতে পারেন বিছানাকান্দি আর লক্ষণছড়া থেকে।পাংথুমাই ঘুরে এসে বুঝতে পারবেন ঝর্নার কলধ্বনি কানে বেজে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। আর আপসোস হবে মনে মনে, প্রকৃতির অপরূপ মায়াবী সবকটি ঝর্না কেন কেবলি সীমানা পেড়িয়ে ওপার থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।

Pangtumai Jhorna

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, গোয়াইনঘাট, সিলেট

জলাভূমিতে বিভিন্ন জাতের ছোট গাছপালা এমনিতেই জন্মে থাকে। কিন্তু এসব গাছের সঙ্গে পানিসহিষ্ণু বড় গাছপালা জন্মে একটা বনের রূপ নিলে তবেই তাকে বলে সোয়াম্প ফরেস্ট বা জলের জঙ্গল। বিশ্বের বৃহৎ জলাভূমির বনগুলো দেখা যায় কিছু বৃহৎ নদীর পাড়ে যেমন অ্যামাজন, মিসিসিপি এবং কঙ্গোর তীরে কিংবা অন্যান্য রেইন ফরেষ্ট অঞ্চলগুলোতে। সারা পৃথিবীতে ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট বা স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। যার মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আছে দুইটি, একটি শ্রীলংকায় আর আরেকটা আমাদের বাংলাদেশে।


বাংলাদেশের একমাত্র ফ্রেসওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট “জলারন্যঃ রাতারগুল”, শহর থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দূরত্বে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এই অঞ্চলের ৫০৪ একর বনকে ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বর্তমানে মাত্র দুই বর্গকিমি এর মতো জায়গাজুড়ে টিকে আছে এই বন। অনেক এই বনকে বাংলার আমাজানও বলে থাকেন আর স্থানীয়রা নাম দিয়েছেন “সুন্দরবন”। কেননা, ম্যানগ্রোভ বনের সাথে বেশ অদ্ভুত মিল আছে এ বনের। যদিও কোনো সমুদ্রের ধারে কাছে এটা অবস্থিত নয়, তবুও মিঠাপানির সংস্পর্শে বেঁচে থাকতে এ বনের গাছগুলো নিজেদের অভিযোজন করে নিয়েছে। কেবল বর্ষায় (বছরের ৫-৭ মাস)এই বনের গাছগুলো আংশিক জলে ডুবে থাকে। জলমগ্ন অবস্থায় এই বনে নৌ-ভ্রমন করতে চাইলে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল। বর্ষার পানি নেমে যাবার পর কিছুদিন কর্দমাক্ত থাকে এরপর আবার শীতকালে রাতারগুল বন পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ানো যায়।


রাতারগুল মুলতঃ তিনটি নদীর কাছাকাছি। দক্ষিন দিক থেকে চ্যাঙ্গের খাল এসেছে, পূর্বদিক থেকে কাফনা। চ্যাঙ্গের খাল ও কাফনা মিলে গোয়াইন নাম ধরে চলে গেছে উত্তরে গোয়াইনঘাটের দিকে। বর্ষাকালে এই নদীগুলোর পানি ঢুকে যায় বনের ভেতরে এবং ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত পানিবন্দী হয়ে পড়ে পুরো বন। তখন গাছগুলোর অর্ধেক পানির উপর, অর্ধেক পানির নীচে, পানিতে ঘন জঙ্গলের ছায়া সবমিলিয়ে এক অভূতপুর্ব দৃশ্যের অবতারনা হয়। নানা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত এই মিঠাপানির জলাবনটিতে উদ্ভিদের দুটো স্তর পরিলক্ষিত হয়। উপরের স্তরটি মূলত বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে গঠিত যেখানে নিচের স্তরটিতে ঘন পাটিপাতার (মুর্তা) আধিক্য বিদ্যমান । এছাড়াও অরণ্যের ৮০ শতাংশ এলাকাই উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত । এই বন মূলত প্রাকৃতিক বন হলেও পরবর্তিতে বাংলাদেশ বন বিভাগ নানা জাতের জলসহিষ্ণু গাছ লাগিয়েছে এখানে। এখন পর্যন্ত এখানে সর্বমোট ৭৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে যার মধ্যে রয়েছে জারুল, করচ, কদম, বরুণ, পিটালি, হিজল, অর্জুন, ছাতিয়ান, গুটিজাম, বটগাছ, জালি বেত ও মুর্তা বেতসহ পানিসহিষ্ণু বিভিন্য প্রজাতির উদ্ভিদ। জলমগ্ন বলে এই বনে সাঁপের আবাস বেশি, আছে জোঁকও; শুকনো মৌসুমে বেজিও দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে বানর, গুইসাপ; পাখির মধ্যে আছে সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিল এবং বাজপাখি। শীতকালে রাতারগুলে আগমন ঘটে অতিথি পাখির, আসে বিশালাকায় শকুনও। সাপের মধ্যে রয়েছে অজগর, গোসাপ, গোখরা, শঙ্খচূড়, কেউটে, জলধুড়াসহ বিষাক্ত অনেক প্রজাতি। বর্ষায় বনের ভেতর পানি ঢুকলে এসব সাপ গাছের ওপর ওঠে পরে। বনেও দাবিয়ে বেড়ায় মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোঁদড়, শিয়াল সহ নানা প্রজাতির বণ্যপ্রাণী।


রাতারগুল বনের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করে যতটানা বর্ণনা করা যায় তার থেকে সেই জলাভূমিয় চড়ে বেড়ানোটায় অনেক আনন্দঘন এবং রোমাঞ্চকর। রাতারগুল, বনে ঢুকার সাথে সাথে মুখ থেকে উধাও হয়ে যাবে সকল কথা। চোখের সামনে বাকরুদ্ধ করে দেবে সবুজের হাতছানি, দেখতে পাবেন গাছের পাতাদের পানির সাথে লুকোচুরি খেলা, কাকচক্ষুর মতো টলটলে পানি, বাতাসে গাছের পাতা নড়ার শন শন শব্দের সাথে পানিতে বৈঠা পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ মিলে তৈরী করেছে শব্দের মায়াজাল। এই চিরসবুজ বনাঞ্চলের কিছু অংশ এতোটাই নিমজ্জিত যে যেখানে নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় না। আপনি এই সবুজের চাঁদরে মোড়ানো জলভূমিতে অ্যামাজনের অনুভূতি উপভোগ করতে পারবেন। স্থানীয়ভাবে সুন্দরবন নামে পরিচিত এই জলাবন আপনাকে যেমন ভয় ধরাবে তেমনি স্মৃষ্টি বিস্ময় নিয়েও ভাবাবে। অর্ধ নিমজ্জিত গাছের ডালে ডালে ঝুলে পড়ার অদম্য ইচ্ছাকে অবশ্যই রোধ করতে হবে, কেননা কোন ডাল থেকে যে সর্পমহাশয় ঝুলে বিশ্রাম নিতেছেন তা ঠাহর করা বড় মুশকিল। হিজল, তমাল আর করচ গাছগুলো এখানে এতটাই এঁকে বেঁকে বেড়ে উঠেছে যে আকাশটাও ঢাকা পড়ে যায় গাছের আড়ালে। গাছের সবুজ আর পানিতে সেই সবুজের প্রতিবিম্ব তার উপর সূর্যালোকের লুকচুরি খেলা সবমিলিয়ে এক ভয়াবহ সৌন্দর্য।


নৌকায় করে কিছুদূর গেলে একটি ওয়াচটাওয়ার পাবেন। চেষ্টা করবেন কোথায় ঘুরতে এসেছেন তা একবার পুরোটা উপর থেকে দেখে নেয়ার। নতুবা মাঝির খেলায় বুঝবেন ও না আসলে এটি ৩৩২৫ একরের বাংলাদেশের একমাত্র জলাভূমি এবং বিশ্বের গোটা কয়েক বিশুদ্ধ পানির জলাবনগুলোর একটি। তাই সাবধানে নৌকা ঠিক করে নিবেন। যারা এখনো খুলনার সুন্দরবন দেখেন নি, তাঁরা অনায়াসেই স্বাদ মেটাতে পারেন এই বন দেখে।


রাতারগুল যাওয়ার রয়েছে বেশ কয়েকটি পথে। এর মধ্যে সবথেকে সহজ এবং শর্টকাট রাস্তা হোল আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্ট রোড ধরে সিএনজি বা মাইক্রবাসে এক থেকে দের ঘণ্টার মধ্যে মোটরঘাট হয়ে রাতারগুল গ্রাম। তারপর ইঞ্জিনচালিত নৌকা যোগে চলে যাবেন রাতারগুল বন, সময় লাগবে ২০ মিনিট আর ভাড়া যাওয়া আসা মিলিয়ে ৮০০-১০০০ টাকা। তবে এই নৌকা রাতারগুল বনের ভেতরে যাবে না, বনে ঢুকতে হবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ডিঙি নৌকা ভাড়া করে এবং প্রবেশের পূর্বে অবশ্যই রাতারগুল বন বিট অফিস থেকে অনুমতি নিতে হবে। বড় নৌকা নিবে ৬০০-৮০০টাকা, সময় দেড় থেকে দুই ঘন্টা আর ছোট নৌকার জন্য ২০০-৩০০ টাকা নিবে। এছাড়া গোয়াইনঘাট হয়েও রাতারগুল যাওয়া যায়, কিন্তু এই পথে সময় একটু বেশি লাগবে। যে পথেই যান, একটি কথা মনে রাখবেনঃ যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না এবং উদ্ভিদ ও বন্য প্রানির ক্ষতি হয় এমন আচরন থেকে বিরত থাকবেন।


এই বর্ষায় ঘুরে আসুন বাংলার অ্যামাজন অথবা সিলেটের সুন্দরবন থেকে, উপভোগ করুন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য বন্ধু অথবা পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে।

Ratargul Swamp Forests

ভোলাগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, সিলেট

সিলেট শহর থেকে সোজা উত্তরে তেত্রিশ কিমি দূরত্বে ভোলাগঞ্জ- বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাথর কোয়ারী। উত্তরের খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী ধলাই আর পূর্বদিকে ডাউকি থেকে আসা পিয়াইন এর মিলিতধারার পাড়েই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর। সিলেট শহর থেকে আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সালুটিকর-ভোলাগঞ্জ সড়ক ধরে ২৭ কিমি এগিয়ে গেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর। সেখান থেকে আরো ৬ কিমি গেলেই দীর্ঘ পাহাড় সারি, ধলাই নদী, দৃশ্যমান ঝর্ণা আর সারি সারি পাথরের তীর্থ ভোলাগঞ্জ।

১৭৬৫ সালে বৃটিশরা সিলেট দখল করার পর ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে কোম্পানীর রেভিনিউ কালেক্টর হিসাবে সিলেট আসেন, বারো বছর এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ভোলাগঞ্জ অঞ্চলে চুনাপাথরের ব্যবসার পত্তন ঘটান। ভোলাগঞ্জ থেকে শুরু করে উত্তরের চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়্গুলো থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করে নিয়ে আসা হতো ছাতকে, তারপর ছাতক থেকে সুরমা নদী হয়ে এই পাথর চলে যেতো কলকাতায়। এই অঞ্চলের পাথর ব্যবসার লাভ থেকেই লিন্ডসে স্কটল্যান্ড জমিদারী কেনেন, স্যার ও লর্ডস খেতাবে ভূষিত হন। রবার্ট লিন্ডসের আত্নজীবনীতে তৎকালীন পাড়ুয়া, বর্তমানের ভোলাগঞ্জ এলাকার অপার সৌন্দর্য্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্ষায় মেঘালয় পাহাড়জুড়ে মেঘের উচ্ছ্বাস, ঝর্ণার ছুটে চলা, নদীর স্রোতধারা, বর্ষাশেষে জেগে উঠা ধলাই’র দীর্ঘ বালিয়াড়ি পর্যটকদের মুগ্ধ করবে।

সিলেট থেকে মাত্র ৩৩ কিমি হলে ও মুলতঃ রাস্তার অবস্থার কারনে গাড়ী নিয়ে ভোলাগঞ্জ পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দেড়ঘন্টা। আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে ভাড়ায়চালিত সিএনজি নেবে জনপ্রতি ১২০ টাকা। যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন, ভোলাগঞ্জ থেকে পূর্বদিকে দয়ার বাজার, মায়ার বাজার, উথমা, তুরং, উপুর দমদমা, বিত্তরগুল হয়ে চলে যেতে পারেন বিছনাকান্দি পর্যন্ত। মেঘলায় পাহাড়ের নীচ ধরে বেশ কতোগুলো পাহাড়ী ছড়া পাড় হয়ে যেতে যেতে সময় লাগবে ঘন্টা চারেক। দূরত্ব বারো কিমি এর মতো। বিছনাকান্দি থেকে গাড়ী নিয়ে আবার ফিরে আসা যায় সিলেট শহরে।
Volagonj

Photo Credit: emonuzzaman chowdhury

Categories
Uncategorized

যে ঝরনাটা বাংলাদেশের না…

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোনাটা পাহাড় দিয়ে থরে থরে সাজানো, যেখানে পাহাড়ের শেষ – সেখান থেকেই বাংলাদেশ। আঁকা বাঁকা পথে যত উপরে উঠি ততই আফসোস বাড়ে – আহারে, কেন আমরা আরো উঁচু ঐ পাহাড়টা পেলাম না, উচ্চতার সাথে সাথে আফসোসের সীমানাটা বাড়তে বাড়তে একসময় ঝুপ করে পড়ে যায় দূর থেকে বয়ে যাওয়া ডাউকি নদী দেখে। নিটোল স্বচ্ছ আয়নারঙা পানিতে ঠোকর খেতে খেতে চলা গল্লুমল্লু পাথরের মতন গলার কাছে দলা বেঁধে জমাট বাঁধে আবেগী কান্নার দল। কাছের সবুজের কারখানাটা এতটা কাছে তবুও হাত বাড়িয়ে ধরার অনুমতি নেই, সবুজের বুকে বারুদের নল নিয়ে তাচ্ছিল্যের চোখে চেয়ে আছে ও পাড়ার সৈন্যবাহিনী। অনেক বড় বড় লেখা একটা সাইনবোর্ড “সাবধান ! সামনে ভারত, প্রবেশ নিষেধ”!!!

তো এভাবেই শুরু আমাদের সেবারের সিলেট যাত্রা, চলতি পথে ধমকি খেয়ে কিছুক্ষণ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম – তাকালাম আল মারুফের দিকে, সে বিশাল ঘুরাঘুরি পাগল মানুষ, তার কাছে কোনো উপায় পাওয়া যায় কিনা – এখন আমাদের কোথায় যাওয়া উচিত! মারুফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে ভারতের পাহাড়ের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে – মানুষ ঢুকতে না পারুক, তার ক্যামেরার লেন্স তো ঢুকবে, ভারতের দুই চারটা পাখিকে আজ আর বন্দি না করলেই নয়। হতাশ হয়ে ডাউকি নদী পার হয়ে স্থানীয় এক ভ্যানচালকের কাছে জানতে চাইলাম যে এখানে আশে পাশে আর কি কি আছে? উনি খুব আগ্রহ নিয়ে জানালেন এখানে রাজার বাড়ি আছে, একটা ছোট্ট ঝরণা আছে, কমলার বাগান আছে, চায়ের বাগান আছে। আমরা হতাশ, সিলেটে চা-বাগান থাকবো নাতো কি খেজুর বাগান থাকবো নাকি! অবশেষে তিনি জানালেন অনেক দূরে একটা ঝরণা আছে, সেটা অবশ্য বাংলাদেশে না, ভারতের ভেতরে পড়ছে তবে বাংলাদেশ থেকে দেখা যায়। আর আমাদের আটকায় কে! বড় ঝরনা বলে কথা! পড়িমড়ি করে তার ভ্যানগাড়িতে উঠে বসলাম।

খাসিয়া পাড়ার ভেতর দিয়ে চলতে লাগলো আমাদের ভ্যানগাড়ি। সিলেটের এই অঞ্চলের রাস্তাগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর, দুইপাশে বিশাল বিশাল গাছের সারি মাথার দুই হাত উপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক স্থায়ী সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। এপ্রিলের এই ভরা রোদেও ঝির ঝির ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, অতি উৎসাহী কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের। হাত দিয়ে তাদের সরাতে গেলেই দেখা যায় নানা রঙের পাতাবাহারের ঝাড়, প্রত্যেকের ঘরে ঘরে পাতাবাহারের স্তপ যেন আসন পেতে বসে বসে ঘরের সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে। বিশাল চা-বাগান আর কমলা বাগান দেখতে দেখতেই আমরা চলে এলাম প্রতাপপূর সীমান্ত ফাঁড়ির রাস্তায়। এখানে এসে রাস্তা ধীরে ধীরে প্রকাশ করতে লাগলো তার উদ্ভাসিত সৌন্দর্যটুকু। একপাশে মেঘ টপে যাওয়া পাহাড় আর তার নিচে শ’খানেক ফুটবল খেলার মাঠের মতন সমান জমি নিয়ে আমাদের অবাক করার জন্যই মনে হয় শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। এরপর তারা হটাত করেই জেগে উঠলো ! দূরের পাহাড়ের বুক চিরে সাদা সুতার মতন গলগল করে ঝরতে লাগলো ঝরণার পানি, একটা, দুইটা, ছয়টা, বারোটা এরপর আর গুনতে পারলাম না। একপাশে নীল আকাশের নীচে সবুজ পাহাড় আবার তার ঠিক কয়েক ফুট দূরেই মেঘ থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ! অপার্থিব একটা দৃশ্য ডান পাশে, আর আমরা এখানে রোদের তাপে কয়লা জাতির কাছাকাছি চলে যাচ্ছি! যে রাস্তা নিয়ে দিয়ে যাচ্ছিলাম সেটা সম্পর্কে একটু বলি, গাঁয়ের মেঠো রাস্তা যেমন হয় ঠিক তেমনি বড় বড় গাছের ছায়ায় চোখ যায়না এমন দূর পর্যন্ত এঁকেবেঁকে সবুজের বুক চিরে চলে গেছে সফেদ সাদা রাস্তাটি। এমন একটা পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য এমন রাস্তাই আসলে দরকার, প্রকৃতি জানে কোথায় কি দিতে হয়।

ছবির মতন সাজানো রাস্তাটি দিয়ে প্রায় ঘন্টা দুয়েক চলার পর ‘মাতুরতল’ বাজারে এসে নামলাম আমরা, আমাদের ভ্যানচালক জানালেন এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হবে, ঝরণার কথা শুনলে আমাদের ক্লান্তি পালিয়ে যায় অচীন দেশে। বিশাল এক পাথর পকেটে নিয়ে হাটা শুরু করলো চঞ্চল, অনেক দূর হাঁটতে হবে–ওজন নিয়ে হাঁটা শুরু করলে ক্লান্তি নাকি কম লাগবে। এতক্ষণ ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটা রিতু ছাতা বন্ধ করে রেখে দিলো, তার বক্তব্য ছাতা মাথায় নিয়া ঝর্না দেখতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না ! যাইতেছি ভিজতে–ছাতা মাথায় থাকলে ভিজবো কিভাবে!! যাই হোক, ‘মাতুরতল’ বাজার থেকে ধু ধু গরম বালু পায়ের তলায় নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমরা – মাঠ পেরোলাম, ঘাট পেরোলাম, সামনে থাকা খাল পেরোলাম, জংলা জলা-পাথর মেলা সব পেরিয়ে পড়লাম বাঁশবাগানে। এর বাড়ি, তার ঘর, আরেকজনের উঠোন সব মাড়িয়ে আমরা চলে এলাম এক বিশাল ফুটবল খেলার মাঠে। আমাদের ভ্যানচালক গাইড আঙ্গুল তুলে দেখালেন ঐ যে ঝর্না, “পাংতুমাই” ঝর্না ! আমরা তাজ্জব-চোখের সামনে মাঠ, আমরা মাঠের গোলপোস্ট ছাড়া আর কিছুই দেখিনা, এই লোক ঝর্না পাইলো কৈ ! সিলেটি ভাষায় ঝর্না মানে আবার ফুটবল খেলার মাঠ নাতো ! দুরু দুরু বুকে তাঁর দেখানো জায়গার দিকে হাঁটা দিলাম, সামনের ঝোপ সরিয়েই চক্ষুস্থির! বিস্ময়ে বোবা বনে গিয়ে প্রায় শ’খানেক ফুট দূরের ঝরণাটা দেখা শুরু করলাম। পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে ইংরেজি এস অক্ষরের মতন এঁকেবেঁকে কান ঝালাপালা করে দেয়া শব্দ নিয়ে ভারতের ঝরনাটা আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে।

ঝরণার দিকে এগুতে গিয়েই বাধা পেলাম স্থানীয় লোকজনদের,  কিছুদূর পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমানা – এরপর থেকেই নাকি ভারতের সীমানা, ওপাড়ে যাওয়া মানা ! তাই বলেকি আর আমাদের গোসল করা আটকে রাখা যাবে !  চরম গরমে এতদূর হেঁটে এসে পকেটে রাখা পাথরটা ছুঁড়ে ঝাঁপ দিলো চঞ্চল, তার পানির ঝাপটায় ভিজে চুপচুপা আমরা! গায়ে পানির ছোঁয়া লেগেছে, আর কার সাধ্য আছে আমাদের পানি থেকে দূরে রাখে, তাও আবার পাহাড়গলা হিম হিম পানি।

দেখতে শুনতে খুব সুন্দর এই ঝরনাটা কিন্তু বাংলাদেশের না, তবে এর সবটুকু পানি এসে পড়েছে এদেশেরই মাটিতে। এলোমেলো ছন্নছাড়াদের জন্য এই হটাৎ খুজে পাওয়া ঝর্নাটা একটা আশীর্বাদস্বরূপ। এই ঝরনাটা দেখার সবচাইতে বড় আফসোস, এত সুন্দর একটা ঝরনার একেবারে নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায় না, এর উল্টোপাশে কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপারও আছে – যদি ভারতীর কাউকে নিজ দেশের এই ঝর্না দেখতে আসতে হয় তাহলে তাকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে তারপর দেখতে হবে – কারণ এদেশ ছাড়া এই ঝর্নাটির সৌন্দর্য দেখার আর কোনো উপায় নাই।

 

কিভাবে যাবেন ?

সিলেট থেকে বাসে করে জাফলং, সেখান থেকে ডাউকি নদী পার হয় একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে বলবেন মাতুর তল বাজারে যাবেন, প্রায় দুইঘন্টা পর বাজারে এসে যে কাউকে বললেই হবে যে আপনি পাংতুমাই ঝর্না দেখতে যেতে চান। সানন্দে তারা আপনাকে নিয়ে যাবে।  এই রাস্তায় কোনো বিপদ নেই, ডুবে যাওয়ার ভয়ও নেই, শুধু দেশের সীমানা অতিক্রম করবেন না, ওপাড়ে কিন্তু দাদারা বন্দুক হাতে নিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে বাংলাদেশের সবুজ শ্যামল ফসলের মাঠ দেখে আর বসে বসে আফসোস করে – তাদের ওখানে খালি পাহাড় আর পাহাড় একটুও সমান জমি নাই…

 

Categories
Uncategorized

বিস্ময় ছড়ানো এক ঝর্ণা – “খইয়াছড়া”…

রাত ১০টায় ফোন দিলেন আরমান ভাই – ভাই কালকে পাহড়ে ঢুকতেছি, কাজ কাম না থাকলে চইলা আসেন। পরদিন আমার অনেক কাজ, পুরা দুনিয়া উঠাইয়া এক যায়গা থেকে আরেক যায়গায় নেওয়ার মত ঝামেলা মাথার উপরে। তাই তাকে বললাম যে যেতে পারছি না। ফোন রেখে ব্যাগ গুছাচ্ছি, অফিস থেকে বাসায় যাবো, হটাত করেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো পাহাড়ের সারি! অটল অবিচল সবুজ পাহাড় ধবধবে সাদা মেঘের ভেতরে গলা ডূবিয়ে বসে আছে, তার মাথায় সবুজ চুলগুলোতে একটানা বাতাসে দোল খেতে খেতে শিস দিচ্ছে ফিঙ্গে পাখির ছানা। আর সবকিছু ছাপিয়ে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে বিরামহীন ছরছর শব্দ। হাজার শব্দের মাঝেও এই শব্দকে আলাদা করে চিনি আমি, মনের ভেতরে খুশির ফোয়ারা ছড়িয়ে দেয়া মন প্রাণ নাচানো এই শব্দ – ঝরনার পানির শব্দ। মাথা ঝাড়া দিয়ে চোখ ফেরালাম সাদা দেয়াল থেকে। মনঃস্থির করা হয়ে গেছে, চুলোয় যাক কাজ, পাহাড় আমাকে ডাকছে, এই ডাক উপেক্ষা করার মতন কলিজা এখনো আমার হয়নাই। অফিসের হাসান ভাইকে রীতিমতন বেঁধে ধরে এক কাপড়েই সায়েদাবাদ রওয়ানা দিলাম, ঘড়ির কাঁটা যখন রাত ২টা ছুঁই ছুঁই ত্ততক্ষণে আমরা ছেড়ে গেছি ধুলোর নগরী ঢাকার সীমানা – গন্তব্য মীরসরাই।

ভোর ৫টার কিছুক্ষণ আগে মীরসরাই বাজারে নেমে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলাম খইয়াছড়া বিদ্যালয়ের মাঠে, চট্টগ্রাম থেকে আরমান, কালপুরুষ অপু আর লিমন ভাইয়ের আসতে সময় লাগবে আরো ৩ ঘন্টা। কাজেই এই তিনঘণ্টার জন্য উদ্বাস্তু আমরা। সাজানো গোছানো স্কুলের বারান্দায় গামছা পেতে শুয়ে পড়লাম আমি আর হাসান ভাই, পুব আকাশে ততক্ষনে আগুন লেগে গেছে! সূর্যের প্রথম আলো কেটে কুটে ফালাফালা করে দিচ্ছে ঘুমিয়ে থাকা মেঘের সারিকে, ভোরের বাতাসের এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে উদ্ভ্রান্ত মেঘের দল। ঘুম মাথায় উঠলো, শুয়ে শুয়েই দেখলাম মীরসরাইয়ের পাহাড়ের ওপাশ থেকে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। ততক্ষণে চলে এসেছে আমাদের চট্টগ্রামের পাহাড়ী বাহিনী, আর দেরী নয় পেটে দুটো পরোটা দিয়েই পা চালালাম পূবের পাহাড় লক্ষ্য করে। কালপুরুষ অপু’র কাছে জানলাম এই এলাকায় একটা ঝরণা আছে, কোনো নাম নেই এটার, যেহেতু খইয়াছড়া এলাকাতে অবস্থিত তাই স্থানীয়রা একে “খইয়াছড়া ঝর্না” বলে। আমরা জাচ্ছি এই ঝর্না দেখার জন্যই।

খইয়াছড়া স্কুলের উল্টাপাশের মেইন রোড থেকে পিচঢালা রাস্তা চলে গেছে ট্রেনলাইন পর্যন্ত, সেখান থেকে মেঠোপথ আর ক্ষেতের আইলের শুরু। তারপর হটাত করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হলো একটা ঝিড়িপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরণই বলে দিচ্ছে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। স্থানীয় লোকদের ক্ষেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। একটা বিশাল জাম গাছে পেকে টসটসে হয়ে ঝুলে আছে অজস্র জাম, হাত দিয়ে একটা পাতা টানতেই ঝরঝর করে পড়ে গেলো অনেকগুলো, সে কি মিস্টি! চলতি পথে এর বাড়ির উঠান, ওর বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অবশেষে ঢুকলাম পাহাড়ের মূল সীমানায়। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদেরকে আমরা আবিস্কার করলাম লাল আর নীল রঙের ফড়িংএর মিছিলে! যতদূর পর্যন্ত ঝিড়িপথ গেছে ততদুর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছি পানি পড়ার শব্দ, প্রকৃতি এখানে খুব শান্ত, কোথাও কোনো আওয়াজ নেই, চারপাশে মন ভালো করে দেয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংএর পাখায়। একটু দূরে কোনো একটা প্রাণী ডেকে উঠলো, লিমন ভাই জানালো ওটা মায়া হরিণ। হরিণের ডাক আবার শোনার জন্য কান খাড়া করে ফেললাম, তার বদলে শোনা যাচ্ছে একটানা ঝিমঝিম শব্দ! ঐ শব্দের উৎসের দিকেই আমাদের যাত্রা।  কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝর্ণা, অনেক উপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হা করে দেখার মতন কিছু নেই, এমন ঝর্ণা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। কালপুরুষ অপু জানালো এটা নাকি এই ঝরণার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরো আছে নাকি? সে হাসলো, আমাকে বললো দম বন্ধ করতে, সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই, এলাকার লোকজন সব নাকি এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, উপরের দিকে আর যায় না। এই ঝরনার উপরে আরো সাতটা ধাপ আছে, আমরা দাঁড়িয়ে আছি অস্টম ধাপের গোড়ায়!!

বিস্ময়ে মাথা বেকুব হওয়ার জোগাড়, তড়িঘড়ি করে প্রায় খাড়া ঢাল ধরে হাচড়ে পাচড়ে উঠে চললাম ঝরণার উৎসের দিকে। ঝরনার ষষ্ঠ স্টেপে এসে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা, চোখের সামনে যা দেখছি বিশ্বাস করতে কস্ট হচ্ছে! চশমা খুলে মুছে নিয়ে আবার বসালাম নাকের উপরে, না, ভুল দেখিনি – রীতিমতন আকাশ থেকেই পড়ছে ঝরনার পানি, আমার সামনে একেবারে খাড়া হয়ে ঝুলে আছে খইয়াছড়া ঝরণার ৩টা ধাপ ! প্রতিটা ধাপ থেকে সমান তালে পানি পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটা সিঁড়ি চিত হয়ে পড়ে আছে সবুজের বাজারে। প্রতিটা ধাপেই ফুটে আছে রংধনু! আমার আর আরমান ভাইয়ের অবাক হওয়া দেখে মজা পাচ্ছে বাকিরা, ওদের কাছে এই যায়গাটা পুরোনো, ওনেক আগে এরাই প্রথম খুজে বের করেছিলো এই যায়গা, কালপুরুষ অপু জানালো উপরে আরো তিনটা ধাপ আছে, সেখানে আছে একটা গভীর বাথটাব, লাফ-ডুব-সাঁতার সবকিছু ঐ জায়গার জন্যই তুলে রেখেছে তারা। এরপর উঠা শুরু হলো খাড়া ঝরনার গা বেয়ে, একেকটা ধাপে উঠছি আর অবাক হচ্চি নিচের দিকে তাকিয়ে, এও সম্ভব! একটা ঝর্ণা এতটা সুন্দর, এতো নিখুঁত কিভাবে হতে পারে! সবার উপরের ধাপে উঠে ব্যাগগুলো রেখে চললো পানিতে লাফালাফি, সে এক মুহূর্ত বটে।

বাংলাদেশের মোটামুটি অনেকগুলো ঝর্ণাই আমি দেখেছি, সৌন্দর্যের দিক থেকে সবাইকে যোজন যোজন মাইল পেছনে ফেলে এগিয়ে আছে বান্দরবানের “জাদিপাই ঝর্না”। এই ঝর্না দেখার পর আমার ঐ বিশ্বাসটা টলতে শুরু করেছে, কে বেশী সুন্দর – জাদিপাই নাকি খইয়াছড়া! গঠনশৈলীর দিক দিয়ে অদ্ভুত সুন্দর জাদিপাই’এর সাথে টক্কর বাঁধিয়ে দেবার জন্যই যেন এর উত্থান! আমার জীবনে এরকম অতিকায় সুন্দর ঝর্না আমি আর দেখিনি, এর ৮টা স্টেপের প্রতিটিতেই রয়েছে সুবিশাল যায়গা, যেখানে তাঁবু টাঙ্গিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝরনার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে।

 

কিভাবে যাবেন ?

পথের দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের সবচাইতে সহজপথের ঝর্না এটা। ঢাকা থেকে গেলে চট্টগ্রামের গাড়ীতে উঠে ভোরে নেমে যাবেন মীরসরাই বাজারে, সেখান থেকে আট টাকা সিএনজি ভাড়া দিয়ে চলে যাবেন “খইয়াছড়া স্কুলে”। খইয়াছড়া খুলের উল্টাপাশের পাহাড়ের দিকে যে পিচ ঢালা রাস্তাটা চলে গেছে সেদিকে হাঁটা দিবেন, ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পরে নিজেকে আবিস্কার করবেন এই ঝরনার শেষ স্টেপে। এটা বাংলাদেশের একমাত্র ঝর্না যেখানে সকল মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়! বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই ঝর্ণাটা একদমই নতুন শহুরে মানুষের কাছে। এখানকার লোকজন জানেও না যে কি এক আসাধারণ সম্পদ নিয়ে তারা বসে আছে! ঢাকা থেকে যাওয়া আসার বাস ভাড়া বাদ দিলে সারা দিনে এই ঝরণার পেছনে আপনার খরচ হবে ১০০ টাকারও কম, আর সেটাও নির্ভর করবে আপনি কি খাবেন তার উপরে।

খইয়াছড়া - ৩য় স্টেপ
পাথরের শরীর গলে বেরিয়ে আসছে হিম ঠান্ডা সাদাটে জীবনধারা…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
ছোট ছোট পানির নহর যেন জলের বিস্ফোরণ…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
বনের ভেতর জলের রাস্তা, কোন যানজট নেই…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
নিজেকে গোপন করে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা, কিন্তু ক্যামেরার চোখ দেখে ফেলেছে লাজুক এই ঝরনাধারাকে…
খইয়াছড়া - ঝিরিপথ
নিদারুণ উচ্ছ্বাস নিয়ে সাদাটে ফেনিল জলধারা আছড়ে পড়ছে সবুজ কার্পেটের উপর…
খইয়াছরা ঝিরি...
এ যেন জলের কার্পেট, বিছিয়ে আছে মুগ্ধ অতিথিদের বরণ করে নেবার জন্য…
খইয়াছড়া ঝরনা - ১ম স্টেপ
পানির ধারা নিজেকে সাপের মতন পেঁচিয়ে রেখেছে নিরেট পাথরের কোলে…
খইয়াছড়া ঝরনা - ২য় স্টেপ
চলছে জলের মিছিল, সবে ত শুরু…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৩য় স্টেপ
বিন্দু বিন্দু জল যেখানে তৈরি করেছে অনিন্দ্য সুন্দর এক পুকুরের…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৪-৩-২
ধাপে ধাপে নেমে এসেছে প্রকৃতির সবচাইতে সুন্দর রহস্যধারা…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৬ষ্ঠ স্টেপ
পাহাড় জুড়ে জলের বিস্ফোরণ…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৭-৬-৫
আকাশছোঁয়া পানির সিঁড়ি…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৮ম স্টেপ
বুনো জলের ফেনিল উচ্ছ্বাস…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৯ম স্টেপ
ঝরনা পাথর জল পুকুর, সময় তখন মধ্য দুপুর…
খইয়াছড়া ঝরনা - ২য় স্টেপ
যুগে যুগে এভাবেই অবাক হয়েছে পাহাড়প্রেমিরা…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৫-৬
ঝরনাসন…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৬ষ্ঠ স্টেপ
এখানে রংধনুরা জন্ম নেয়…
খইয়াছড়া ঝরনা - স্টেপ ৭-৬-৫
পূর্ণ যৌবনা খইয়াছড়া ঝরনা…
খইয়াছড়া ঝরনা - ৯ম স্টেপ
জল-ঝরনার পাহাড়ছড়া…
Categories
Uncategorized

সৌন্দর্যের রানী – অমিয়াকুম…

জায়গাটার নাম “অমিয়াকুম”…

সেই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখার জন্যই এবারে আমরা আবার ছুটে গিয়েছিলাম মেঘ-কুয়াশার দেখে…

অমিয়াকুম যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় থানচি থেকে রেমাক্রী পর্যন্ত পাথুরে সাঙ্গু নদী, বান্দরবানের সবচাইতে এডভেঞ্চারাস এই বর্ণালী সাঙ্গু নদীর প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে আছে রুপের ঝলক – এখানে বালির মিছিল তো ওখানে পাথরের হাউকাউ, একটু দূরে জলের কল্লোল তো মোড় পেরুলেই মাছের লাফ-ঝাঁপ। দুপাশের পাহাড়ের আলিঙ্গন থেকে ঝুঁকে ঝুঁকে কাঁচের মতন স্বচ্ছ পানিতে সারাটাদিন ধরে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের চেহারা দেখে সবুজ গাছের স্থবির দল। এই নদীর তলদেশে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা পাথর কণা হার মানিয়ে দেয় মুক্তো দানাকেও। এলোমেলো পানিরা সারাটাদিন ধরে আড্ডা দেয় পাথরের সাথে। এখানে নিশিদিন জমে জল-পাথরের আড্ডা।

সাঙ্গু নদীতে এলেই আমরা নৌকা ভাড়া নিয়ে ব্যাগগুলো উপরে তার তুলে দিয়ে নিজেরা হেঁটে বেড়াই, এক হাঁটুরও কম এই নদীতে প্রতিমুহূর্তেই নৌকার তলা আটকে যায়, তখন চলে নৌকা ঠেলা, সে কি ঠেলা ! রীতিমতন পানিতে শুয়ে পড়ে নৌকা ঠেলা! যে এখনো সাঙ্গুতে যায়নি সে বুঝবেনা নদীতে শুয়ে পড়তে কত্ত মজা। আমাদের নৌকা একেকবার পাথরে আটকে যায় আর আমরা ইচ্ছে করেই নৌকার দুই পাশ থেকে টুপ টুপ করে পানিতে পড়ে যাই।

এই পথেই পড়ে তিন্দু, আর রাজা পাথরের এলাকা। তিন্দুর ব্যাপারে একটা কথা আমি সবসময়ই বলি – “বান্দরবান যদি বাংলাদেশের স্বর্গ হয় তাহলে তিন্দু সেই স্বর্গের রাজধানী”। তিন্দুর সকালটা দুনিয়ার আর সব জায়গার সকালের থেকে আলাদা। তিন্দুর পরের জায়গাটাই হলো রাজা পাথর এলাকা। প্রকৃতি কি পরিমাণ সুন্দর হতে পারে তা এখানে না এলে বোঝা যায় না, দৈত্যাকার সব পাথরের ভীড়ে হটাত করেই সাঙ্গু নদী হারিয়ে গেছে, এপাথরে বাড়ি খেয়ে ও পাথরে ধাক্কা খেয়ে নৌকার তলা ঘসতে ঘসতে পার হয়ে গেলাম স্থানীয়দের পূজনীয় ভয়ঙ্কর পাথরের এই রাজ্য। বর্ষাকালে এখানে প্রতিদিন এক্সিডেন্ট হয়। এরপরের রাস্তাটুকুতে বিস্ময়েরা ডালপালা নিয়ে জন্ম নেয়, রাজা পাথরের পরের অংশটুকুর নদীর তলদেশ থেকে হারিয়ে গেছে নুড়ি পাথর, সেখানে এখন নিরেট একটা বেসিন, এক খন্ড সমতল পাথরের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে সাঙ্গু, কোথাও কোনো ফাঁকা নেই! মনে হচ্ছে যেনো কেউ ঢালাই করে দিয়েছে নদীর তলা! সারাটা রাস্তায় নৌকা ঠেলতে ঠেলতে ক্লান্ত বিধ্বস্ত আমরা শেষ বিকেলের আলোয় পৌঁছলাম রুপকুমারী রেমাক্রী খালের মুখে। এখানেই রাতে থাকতে হবে আমাদের, পরদিন এই খাল দিয়েই হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে জাবো নাফাকুম হয়ে জিনা পাড়ায়, সে আরেক বিস্ময়কর যায়গা…

রেমাক্রী রেস্টহাউজটা একেবারে খালের মুখে বানানো, প্রায় কয়েকশ ফুট সিড়ি ভেঙ্গে জেতে হয় সেখানে। সুকঠিন পাহাড়ের উপরে বানানো টলটলে এই বাড়ীসারারাত ধরে বাতাসের ধাক্কায় থরথর করে কেঁপেছে, আমি আর আলো ভাই রাত ১২টায় জাল নিয়ে চলে গেলাম সাঙ্গুতে-মাছ ধরবো। ২ ঘন্টা পরে গোটা বিশেক মাছ নিয়ে আমাদের সে কি উল্লাস। কেউ রান্না করতে জানিনা, অথচ মাছ রান্না হয়ে গেলো! হুড়মুড়িয়ে সে মাছ গলাঃধরণ করেই দোলনা ঘরে ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন সকালে আমাদের হাটাপথ শুরু, এখান থেকে আর কোনো যানবাহন নেই, দুই পা-ই একমাত্র সম্বল। টানা দেড় ঘন্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম নাফাকুমে, এই মৌসুমে নাফাকুমের আশপাশ অনেক শুকনো আর পানি অনেক কম। মনে পড়ে গেলো গতবার ভরা বর্ষায় যখন এসেছিলাম তখন এই নাফাকুমেই আমাদের সঙ্গীসাথীরা পা পিছলে টুপ্টাপ করে সারা রাস্তা জুড়ে ঝরে পড়েছিলো। পড়ে যাওয়ার সেই মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি, ফলাফল আমার ৩টা দাঁত ভেঙ্গে গুড়োগুড়ো হয়ে গেলো। সেই পিচ্ছিল ভয়ংকর নাফাকুমের তেমন কোনো আলামতই এবারে  পেলাম না, অনেক শুকনো আর নিরিবিলি যায়গা। অনেকেই বলে নাফাকুম হলো বাংলার নায়েগ্রা, কিন্তু আমার কাছে নাফাকুম কখনোই এতো সুন্দর লাগেনি। বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর ঝরণা যদি বলতেই হয় তাহলে সেটা জাদিপাই ঝরণা।

নাফাকুম পার হওয়ার পরই দৃশ্যপট বদলে গেলো, চলার পথা এখানে অমসৃণ। রাস্তা জুড়ে বিরাট বিড়াত “কুম”। স্থানীয়দের ভাসায় “কুম” মানে হলো ‘গর্ত’, সে কি আর জেনো তেনো গর্ত! একটাতে পা পড়লেই আর দিনের আলো দেখতে হবেনা, তাই হাঁটার সময় সাবধান হয়ে গেলাম আমরা, এগাছের ডাল তো ও গাছের শেকড় ধরে ধরে ভীত মনে এগিয়ে চলা, একের পর এক বিরাট বিরাট দিঘী মাথা খারাপ করে দিচ্ছে আমাদের, একটা যায়গা এত সুন্দ হয় কিভাবে ! আরমান আর আহসানকে আর ধরে রাখা গেলো না, পোটলাপুটলি ফেলে ঝুপ করে লাফ দিলো সবুজ হ্রদে, তাদের দেখাদেখি বাকি সবাই, এরপর শরীরের আধা অংশ পানিতে আর আধা অংশ বালিতে রেখে জীবনের সবচাইতে আরামের ২ ঘন্টার ঘুম দিলাম অচেনা সবুজের রাজ্যে। চোখ ধাঁধানো এই সবুজের কাছে আকাশের গাড় নীলও লজ্জা পেয়ে পাতার আড়ালে মুখ লুকায়। এরপর আবার পা গাড়ি চালিয়ে বিকেলের মধ্যেই জিনাপাড়ায় পৌঁছে গেলাম।

বান্দরবানে এই পর্যন্ত আমি যতগুলো পাড়া দেখলাম তাদের মধ্যে সবচাইতে ফলের গাছ বেশী দেখলাম এখানে, আম, পেঁপে, তেতুল, লেবু, কাঁঠাল আনারস থেকে শুরু করে সব মৌসুমি ফসলের মেলা বসেছে এই গ্রামে। এই গ্রামের মানুষ এখনো আদিম, সহজ সরল এই মানুষগুলো এখনো ট্যুরিস্ট দেখলে হা করে তাকিয়ে থাকে, কিছু খেতে চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই কোথা থেকে জেনো পাকা পেঁপে পেড়ে নিয়ে আসে। চরম আতিথেয়তার মিছিলে যোগ দেয় এলাকার গৃহপালিত পশুগুলোও! আমরা ঘুমিয়েছিলাম টং ঘরে, টং ঘর হলো এমন একটা ঘর যেটা মাটিতে থেকে ৩/৪ ফুট উঁচুতে বানানো হয় আর এর একমাত্র উপরের চালটা ছাড়া আর কোনো দেয়াল থাকেনা। মে মাসের প্রচন্ড গরমের রাতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে কম্বল মুড়িয়ে ঘুমানোর কি যে আরাম তা কারে বুঝাই! তার উপরে মাঝ রাতে যখন চোখ মেলেই দেখি আকাশে আধখানা চাঁদ তার ঘোলাটে হলদে আলো দিয়ে আমাদের দেখার প্রাণপণ চেস্টা করছে তখন মনে হয় আসলেই লাইফ ইস বিউটিফুল! সেই রাতের কথা আমি আজীবন মনে রাখবো, বিছানার নিচে কুকুর, ছাগল, মুরগী গরু আর শুকরের মিশ্রিত ডাক, আর উপরে মাথার উপরে অবাক চাদের মৌন হাতছানি, অস্থির! জিনা পাড়ায় একটাই সমস্যা – এখানে কোনো টয়লেট নাই। পরদিন সকালে আকাশ অন্ধকার, আমরা রওয়ানা দিচ্ছি দেখেই জিনাপাড়ার হেডম্যান ছুটে আসলেন, তিনি আমাদেরকে জেতে দিবেন না, বৃষ্টি নামলে আমরা নাকি আমিয়াকুমের পাহাড়ে বেঘোরে মারা পড়বো, কে শুনে কার কথা! তাকে অনেক কস্টে বুঝালাম আমরা ভারতের বারো হাজার ফুট উঁচু পাহাড় সান্দাকফু ফেরত, এইখানে এক দেড় হাজার পাহাড়ে আমাদের সমস্যা হবে না। তারপর বেচারার বিষণ্ণ দৃষ্টিকে পেছনে ফেলেই পা চালালাম বান্দরবানের সৌন্দর্যের রানী আমিয়াকুম দেখার উদ্দেশ্যে…

পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙ্গিয়ে প্রত্যেকের কলিজা তখন ছোটখাটো সাহারা মরুভূমি, এমন সময় পুরো পাহাড় জুড়ে নজরে পড়লো টমেটোর মতন এক ধরনের ফল, লম্বা লম্বা গাছে ঝুলে থাকা এই ফল্কে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে “আমের ভাই টাম”, গাইড বলল জিনিসটা খাওয়া যাবে, ভেতরে অনেক পানি আছে, আর যায় কই! একেকজন ২০/২৫টা করে টসটসে পাকা রসালো টাম খেয়ে ফেললাম, অই অবস্থায় মনে হলো এর চাইতে সুস্বাদু খাবার দুনিয়াতে আর নাই। জিনাপাড়া থেকে অমিয়াকুম যাওয়ার পথে কয়েকটা উঁচু উঁচু পাহাড় ডিঙ্গাতে হয়, এর মধ্যে একটা রাস্তা আবার ঝিড়ি পথের মধ্য দিয়ে, বৃষ্টি হলে এটা হয়ে যায় পানির রাজ্য, পুরোটা জুড়ে হাটু সমান ঘন জঙ্গল। আহসান সবার আগে আগে হাঁটছে, আমি তার পেছনে হটাত করেই সে থমকে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো, পরের চিৎকারটা আমার। চোখের সামনে বিশাল লম্বা ধবধবে সাদা একটা দুধরাজ সাপ কুন্ডলি পাকিয়ে শুয়ে ছিলো, আমাদের আওয়াজ পেয়ে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলো আরো গভীরে। এরপর আমরা বুঝলাম যে এই যাত্রা ছেলেখেলা নয়, আমরা জংলী প্রাণীদের রাজ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছি। এই ধারণা মিনিট পাচেক পরেই আরো পোক্ত করলো শিপন ভাইয়ের চিৎকার, অপু ভাই ততক্ষণে পেছন ফিরে দৌড় দিয়েছে। ঘটনা বুঝার জন্য সামনে এগিয়ে দেখি বিশাল বিশাল ৬ টা পাহাড়ি গয়াল আমাদের রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরকে ভদ্রভাবে রাস্তা থেকে সরানো আরেক ধৈর্যের কাজ। কিছুটা দুরেই একটা পাখির বাচ্চা নিচে পড়ে লতায় পেঁচিয়ে চেঁচাচ্ছে, আর তার অসহায় মা মাথার উপরে উড়ে বেড়াচ্ছে, আরমান আর আমি গিয়ে মুক্ত করলাম তাকে চেড়ে দিলাম স্বাধীন রাজ্যে।

পরের রাস্তাটুকু আতঙ্কের, জিনাপাড়ার হেডম্যান ক্যান আমাদের আস্তে দিতে চাননি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। জীবনে কখনো এতো খাড়া পাহাড়ী রাস্তা ধরে নামিনি, পুরা ৮৫ ডিগ্রি এঙ্গেলে নামতে হচ্ছে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড়! রাস্তা এখানে শুধু খাড়া নয়, খাড়া খাড়া খাড়া। নইচ্চেন তো মইচ্চেন অবস্থা। ভাগ্যকে বার বার দোষারোপ দিলাম সঙ্গে করে রশি আনিনি বলে। টানা ৪০ মিনিট থরে থরে পা নিয়ে পুরো খাড়া পাহাড় যখন নেমে ঢুক্লাম ঘন জঙ্গলের রাজ্যে। এখানে আমাদের হাসিমুখে স্বাগত জানালো জংলী মশা। স্নায়ুর উপর দিয়ে প্রচন্ড চাপ ফেলা এই ভয়াল রাস্তা পেরিয়ে আসা বিধ্বস্ত কাউকেই মুখ ফুটে বলতে হলোনা যে এই আধা ইঞ্চির রঙ্গীন মশাগুলো ম্যালেরিয়ার ঘরবাড়ি, সুতরাং পা চালানো বন্ধ করার উপায় নাই, আরো ২০ মিনিট হাঁটার পরে হটাত করেই চারপাশ থেকে উধাও হয়ে গেলো সবুজের পাঠশালা, সে জায়গায় চোখের সামনে ঝাঁপ দিয়ে পরলো স্তব্ধ বিস্ময়। খানিকক্ষণ বেকুবের মতন সামনে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম, এ কোথায় এলাম !!! পেছন থেকে আহসান ভাই তাগাদা দিচ্ছে সামনে বাড়ার জন্য, আমার পাশে দাঁড়িয়ে সেও স্তম্ভিত।

আমাদের সামনে আকাশ ছোঁয়া গোল গোল পাথরের দেয়াল, তার মধ্যে দিয়ে ঝরঝর করে বয়ে চলছে সবুজ পানির কোলাহল। এখানে ওখানে জমে সেই পানি রুপ নিয়েছে একেকটা লেগুনে, স্বচ্ছ সে লেগুনের বুকে অলসভাবে সাঁতরে বেড়াচ্ছে বিশাল বিশাল সব মাছেরদের দল, কারো কোনো তাড়া নেই, কোথাও যাওয়ার তাগিদ নেই। এমন একটা যায়গা পেলে আমিও মনে হয়ে সারাক্ষণ ওখানেই ঘুরঘুর করতাম। কিন্তু ততক্ষণে আমাদের গাইড তাগাদা দিলো, এসব নাকি কিছুই না, বামে অমিয়াকুম আর ডানে সাতভাইকুম। সেখানে গেলে আমরা নাকি মাথা ঘুরে পড়ে যাবো এমন সুন্দর! বলে কি ! মাথাটা ভালোমতন বেঁধে সবাই মিলে ছুট লাগালাম জল-পাথরের আড্ডা ছেড়ে জলের পাঠশালায়, দুপাশের সোজা উঠে যাওয়া পাহাড় তখন একের পর এক তার রঙের ডালি বিছিয়ে দিচ্ছে আমাদের জন্য, এখানে আলোর মিছিল তো একটু সামনেই গাছপালায় ঘেরা ঘন অন্ধকার, এ পাথরের উপরে দিয়ে ও পাথরের তলা দিয়ে যখন পৌঁছলাম তখন তীব্র ঘামের মধ্যেও মেরুদন্ড বেয়ে নেমে যাওয়া শীতল পানির ধারার অস্তিত্ব টের পেতে ভুললাম না, অবাক চোখের সামনে নিজেকে খোলামেলা করে মেলে ধরেছে বান্দরবানের সবচাইতে সুন্দর এই জায়গাটা। ভর দুপুরের আলোয় অদ্ভুত রহস্যলাগা সৌন্দর্য নিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে অনাদিকাল ধরে রুপধরে রাখা পাহাড়ি ঝর্না “অমিয়াকুম”…

রুপসী বান্দরবানের গহীন অরণ্যে যেখানে সৌন্দর্যরা মাথা খুটে মরে, সেখানের আরেকটা বিস্ময় এই অমিয়াকুম। প্রায় হাজার ফুট খাড়া দুই পাহাড়ের কোলে স্কুল পালানো দুষ্ট বালকের মতন এঁকেবেঁকে এলাকা রাঙ্গিয়ে দেয়া এই পানির ধারা ছুটে চলেছে সিঁড়ির পর সিড়ি ভেঙ্গে ভেঙ্গে। স্তব্ধ পাথরের নিস্তব্ধতা গুঁড়িয়ে ঝরঝর শব্দে এখানে সারাদিন চলে ঝরনার রিনিঝিনি গান, এখানে পাথরের তলে বসত গড়েছে কোনোদিন মানুষ না দেখা নির্ভীক মাছের মিছিল, এখানে নীলচে সাদা পানিতে সাঁতরে বেড়ায় সবুজ রঙা সাপের ঝাঁক, এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে নির্ভীক পাথরের শক্ত সৈনিক, এটা তাদের এলাকা, আমরা শুধু একদিনের মেহমান। যেই আসে তাকেই উজাড় করে দেখিয়ে দেয় নিজের না দেখা সৌন্দর্যটুকু। অমিয়াকুমকে প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়েছে, তার সাজার জন্য আয়না লাগেনা – সে নিজেই নিজের আয়না…

এমন পানিতে ঝাঁপ না দেওয়াটা গুরুতর অন্যায়, আমি তোড়জোড় শুরুর করার আগেই দেখি সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েছে সাতার না জানা অপু ভাই, গায়ে তার লাইফ জ্যাকেট! কয়েকশ কেজি ওজনের পানির চাপ অগ্রাহ্য করে চলে গেলাম এক্কেবারে ঝরণার গোড়ায়। বর্ষায় এখানে দুকুল ছাপিয়ে হাজারটা বজ্রের শব্দে পানি আছড়ে পরে দুপাশের “কুম” ভরা পাথরে, ভয়ংকর সুন্দর মনে হয় একেই বলে। অমিয়াকুমের দুই পাশের পাহাড়ের গঠনশৈলী পুরাই অন্যরকম। কেমন করে যেন এই দুই পাশে সিঁড়ির পরে সিঁড়ি জমেছে, সেগুলোর ধাপ আবার এতো বড় যে একেকটা ধাপে তাঁবু টাঙ্গিয়ে আরাম করে ঘুমানো যাবে। বাংলাদেশের আর কোনো ঝর্নায় আমি এমন মনোমুগ্ধকর গঠনশৈলী দেখিনি। আমিয়াকুম অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখার জিনিস, অমিয়াকুম তীব্র ভালোলাগায় বুকে ব্যাথা ধরিয়ে দেওয়ার জিনিস।

ভেবেছিলাম এবারের মতন ভালোলাগার বুঝি সমাপ্তি হলো, কিন্তু সে ধারণাটা ভেঙ্গে দিলো সাতভাইকুম নামক জায়গাটা। অমিয়াকুম থেকে একটু উপরের দিকে বাশের ভেলায় চড়ে যেতে হয় সাতভাইকুমে। মাত্র ১০ মিনিটের এই পানির রাস্তার কাছে নস্যি দুনিয়ার সপ্তম আশ্চর্যও! দুই পাশের পাহাড় ঘেরা অতল জলের শীতল পানিতে সামান্য কয়েকটা বাঁশের ভেলায় জীবনের সবচাইতে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও হয়ে গেলো এবারে। ওজন সইতে না পেরে টুপ করে ডুবে গেলো আরমান আর শিপন ভাইদের ভেলা, সেটা দেখে সাতার না জানা আলো ভাইয়ের চেহারা হলো দেখার মতন, তারপরও আমাদের মতন আনাড়ী ড্রাইভারের হাতে নিজের জীবন জেভাবে ছেড়ে দিয়েছিলেন আলো ভাই, তাঁর সে সাহসিকতার প্রসংশা না করলে অন্যায় হবে।  বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর ১০ মিনিটের পানিপথ পেরিয়ে যখন আমরা একটা পাথরের দুর্গে ঢুকলাম ততক্ষণে নিজেদের প্রথমবারের মতন বোবা মনে হলো, টানা ৩ মিনিট কেউ কোনো কথা বলল না, চোখের সামনে যেন পাথরের সভা বসেছে, একটা পাথরও ছোট না, ৪০,৫০ থেকে ১০০ ফুট উঁচু পাথরও বিজ্ঞের ন্যায় বসে আছে ঠান্ডা পানিতে কোমড় ডুবিয়ে। আমার জীবনে এতবড় পাথর আমি কখনো দেখি নাই। পুরো বান্দরবান যেনো এখানে একসাথে ধরা দিয়েছে, এখানে তিন্দুর মতন বড়বড় পাথরও আছে, আছে অমিয়াকুমের মতন সিঁড়ি সিঁড়ি ঝর্না, আছে বগা লেকের মতন স্বচ্ছ পানির হ্রদও। হাজার হাজার বছর ধরে প্রকৃতি খুব যত্ন করে সাজিয়েছে এই অসাধারণ জায়গাটাকে…

ফিরতে ফিরতে বার বার মনে হচ্ছে এখানে তাঁবু নিয়ে আরেকবার আসতে হবে, এই সবুজ পানির কালো মাছদের সাথে কাটাতে হবে একটা রাত, নাহলে জীবনে আর থাকলো কি ! সামনে তখন সেই হাজার ফুট খাড়া পাহাড়, উঠতে হবে যান বাজী রেখে। বেচে থাকলে আবার দেখা হবে…

 

Amiyakhum 8
অনন্ত সৌন্দর্যের প্রতীক – অমিয়াকুম…
Amiyakhum 9
এ এক অনন্ত বিস্ময়, যেখানে মুহূর্তের পর মুহূর্ত কেটে যায় মুগ্ধচোখের পাঠশালায়…
Amiyakhum er mach
অমিয়াকুমে পাহাড়ী জেলেদের ধরা পাহাড়ী মাছ…
Amiyakhum Jhornar niche
জলের বজ্রপাতের নিচে সামান্য এক মানবের আত্মাহুতি…
Amiyakhumer bishalota
অমিয়াকুমের একেকটা পাথর যেন একেটা বিছানা, সেখানে আরাম করে ঘুমানো শুধুমাত্র ক্লান্ত-শ্রান্ত-মুগ্ধ পথিকেরই মানায়…
Amiyakhumer panite satar
জলের স্রোতের মাঝে চলছে সাঁতারের আহ্বান…
Amiyakhumer shiri
বিশাল পাথরের রাজ্যে একাকী বিলাস…
Amiyakhumer subishal pathure shiri
বিছানাও মাঝে মাঝে হয়ে উঠে রাজকীয় আসন…
Naphakhum
অমিয়াকুম যাওয়ার পথে নাফাকুমের বিক্ষুব্ধ জলরাশির সহপতন…
Shatvai khum jawar rasta
দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সাতভাইকুম যাওয়ার রাস্তা…
Shatvai khum
নাইখ্যং এর বিলাসী এবং আয়েশি পাথর…
Shatvaikhum jawar rasta
বান্দরবানের সবচাইতে রহস্যময় জলপথ, যেপথে আছে শুধু বিস্ময়ের হাতছানি…
Shatvaikhum jawar vela
ভেলায় চড়ে পাথরের মেলা দেখতে যেতে হয় এখানে…
Categories
Uncategorized

সানাক্র পাড়া ঝরনা – বান্দরবান…

 

সুন্দরের খোঁজে মানুষ দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে, ঢুকে পড়ে গহীন থেকে আরো গহীনে। নতুন কিছু পাবার আশায়, নতুন কিছু দেখার আশায় মানুষ নিজেকে নিয়ে যায় বিরাণ কোন জঙ্গলে। অথচ খুব কাছেই একেবারে হাতের নাগালেও যে অমিত সুন্দর কিছু থাকতে পারে সেটা সম্পর্কে আমরা চিন্তাও করিনা। বান্দরবানের অলিতে গলিতে কানা ঘুপচিতে আমি অনেক ঘুরেছি, জেনেছি কোথায় আছে বিমুগ্ধ ঝর্না, বিস্ময়কর ঝিড়িপথ, আর মন ভালো করে দেয়া পাহাড়গুলো। কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি যে এত কাছেই রয়েছে আরো কয়েকটি মুগ্ধ করা ঝর্না!

এবারে হুট করেই ছুটি মিলল দুই দিনের, সাথে শুক্রু শনি মিলিয়ে মোট চার দিনের মামলা। ঠিক করি বান্দরবান যাবো, এই ভয়াবহ গরমে যেখানে নিজের গা থেকেই ঝর্না গড়িয়ে পড়ে সেখানে পাহাড়ী ঝর্না দেখতে যাওয়া দোষের কিছু না। ঠিক করে ফেললাম বাংলাদেশের সবচাইতে উঁচু গ্রাম পাশিং পাড়া-তে তিন রাত ঘুমাবো। সেখানে মেঘের রাজত্ব, জগতের কোন গরম, উষ্ণতা সেখানে ঠাঁই পায়না। এই কাঠ ফাটা গরমে সেখানে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে হয়, সন্ধ্যে হলেই ঠান্ডা ঠান্ডা মেঘের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। কথায় বলে লোভে একলা পোড়া ভালো না, আরো দশজনকে নিয়ে পড়তে হয়। আমি দশজন পেলাম না, পেলাম একজনকে। লালমণিরহাটের নাসিরুল আলম মন্ডল, তাকে জানালাম – আমি জামু, তুমি যাইবা ? কই যাবো, কোথায় যাবো জিজ্ঞেস না করেই সে জানিয়ে দিলো আসতেছে। আর পায় কে আমাকে, দুইজনের সংসার ! ব্যাগ গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম মেঘ-পাহাড়ের দেশে। চট্টগ্রাম বদ্দার হাট ফ্লাইওভারে বাস উঠার আগেই দেখি রাস্তা আগলে এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে না নিয়ে বাস যেতে দিবে না ! তাঁর নাম নাহিদ। এই ছেলেটা বান্দরবানের আনসাং হিরো। বান্দরবানে চেনে না এমন কোণ যায়গা তাঁর কাছে নাই। সব পাড়াতে তাঁর আত্মীয়তা। চলতে চলতেই তিনি জানালেন, পাহাড়ে গিয়া কি করবেন, চলেন ঝর্না দেখতে যাই, গোপন ঝর্না, কেউ জানেনা এইগুলার খবর! আমার আর মন্ডলের সকালের ঘুম তখন রাতের আঁধারের মতই ফুড়ুৎ করে হারিয়ে গেছে। আমাদের চকচক করতে থাকা চোখ দেখে যেকোন অচীন মানুষও চোখ বুঁজে বলে দিবে যে ছেলেগুলা আবার গেছে, আর কেউ এদের থামাতে পারবে না।

বান্দরবানের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে সোজা রুমা চলে গেলাম, সেখানে একটুও সময় নস্ট না করে আমরা উঠে গেলাম ইডেন পাড়ার পাহাড় বেয়ে। আমাদের গন্তব্য মংপ্রু পাড়া। নাহিদ ভাইএর ভাষ্যমতে মংপ্রু পাড়ায় যাবার আগেই বাম দিকে পাহাড়ের নিচে একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে বয়ে চলেছে কয়েকটি ঝর্না। আমাদের লক্ষ্য এবার সেগুলোতে গিয়ে শরীর জুড়ানো। এমন একটা ঘটনা শোনার পর মানুষের আনন্দের দিন শুরু হবার কথা, আমাদের শুরু হলো কস্টের দিন। ভর দুপুরে মাথা ফাটা রোদের মাঝে পাহাড় বাওয়া যে কি পরিমাণ অমানুষিক যন্ত্রণার কাজ সেটা বোঝনোর মতন ভাষা এখনো আমি রপ্ত করতে পারিনি। সামনে যতদূর পথ যায় খালি খাড়া পথ, পিঠের ছোটখাটো ব্যাগটাও তখন মনে হচ্ছে আস্ত একটা পাহাড়। হাঁটু আর বুক এক করে অনেক ঠেলে ঠুলে নিজেকে উঠাচ্ছি পাহাড়ের মাথায়, টপটপ শব্দটাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি বেয়ে। সাথে করে নিয়ে আসা ২ বোতল পানি তখন সোনার চেয়েও দামী। আমাদের হাঁটাপথের দুইপাশ আম বাগানে সয়লাব। সবগুলা গাছে বিশাল বিশাল আম ধরেছে। কিন্তু খাওয়ার মতন একটাও হয়নি, একটা কামড় দিয়েই দ্বিধায় পড়ে গেলাম যে আম খাইলাম নাকি লেবু, তেঁতুল খাইলাম! হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা যখন সহ্যের শেষ সীমায় তখন বাম পাশে দেখা গেলো অনিন্দ্য সুন্দর টেবিল পাহাড়ের। এই পাহাড়ের চুড়াটা একেবারে ডাইনিং টেবিলের মতন সমান হওয়াতে এর নাম দেয়া হয়েছে টেবিল পাহাড়, তার ওপাশে “সিপ্পি”র চূড়া। সিপ্পি-তে যাওয়ার জঙ্গলটা নাকি খুব সুন্দর, হয়তো যাবো একদিন সেখানে। দুই পাহাড়ের চূড়া দেখে যেই একরাশ আনন্দ নিয়ে আমাদের সামনের পথের দিকের তাকালাম, ওমনি যাবতীয় আনন্দ চুপসে গেলো, উঠতে হবে আরো খাড়া পথ! উঠতে উঠতে একেবারে আকাশে মিলিয়ে গেছে পথের বাঁক! উপরে উঠার একটা লাভ আছে, সেটা হলো ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায়, সেই লোভে আর সব কস্টকে ঠেলে ফেলে উঠতে লাগলাম আমরা, উঁচু-নিচু সমতল পেরিয়ে এক সময় হটাৎ করে নামা শুরু করলো আমাদের পথ। এবার সে নামছে তো নামছেই, সাথে সাথে বদলে যেতে থাকলো তার চার পাশের সব দৃশ্যপট। একপাশে কাশফুল, অন্যপাশে ঘাসফুল নিয়ে নামতে নামতে সেই পথ আমাদের নামিয়ে দিলো একেবারে পাহাড়ের গোড়ায়। সেখানে এলোমেলো পাথর পড়ে আছে, মনে হচ্ছে কোন এক মহাযুদ্ধ হয়েছিলো এদিকে। ভাঙ্গা পাথর, জুমের ক্ষেত, ফলবাগান, কৃষ্ণচূড়ার জঙ্গল সব পেরিয়ে একসময় ভর দুপুরে ঝুপ করে আঁধার নামিয়ে দিলো আকাশ সমান গাছের দল। নাম না জানা এই গাছের পাতায় পাতায় বাতাসের টান, সেই টান আর পাখি গান ছাড়িয়ে আমাদের কান পেলো নতুন এক প্রাণের শব্দ, অনেক অনেক পরিচিত এই শব্দ মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করে দিলো, শরীরের সব কয়টা ব্যাথাওয়ালা পেশী আনন্দে যেন নেচে উঠলো এই বয়ে চলা পানির শব্দে। জঙ্গল, ঘাস, গাছ, লতা মাড়িয়ে ছুটে চললাম পানির উৎসের দিকে – ধুম করে সামনে পড়লো এক পাহাড়ী পাড়া। অনেকগুলো ঘর আর নানান ফলবাগানে সাজানো এই পাড়ার নাম “সানাক্র পাড়া”। তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঝর্না আছে নাকি, জবাবে তিনি যেদিকে হাত তুললেন সেদিকে ঘণ জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই নাই। পাহাড়ীরা ভুল করে না, এই তত্ত্ব-কে মেনে নিয়ে ফল বাগান মাড়ালাম, ফুলবাগান ছাড়ালাম, নাহিদ ভাইয়ের জিপিএস বলছে আমরা ঠিক রাস্তাতেই যাচ্ছি। অবশেষে মিনিট দশেক হেঁটে পেলাম তাকে। দুই পাশে দুই বিশাল পাহাড়কে পাহারায় রেখে নিজের যৌবনকে পাথুরে পথে অকাতরে ঢেলে দিচ্ছে এই পাহাড়ী ঝর্না। কয়েকশ ফিট লম্বা ক্যাসকেইডের উপর দিয়ে ঝিরি ঝিরি শব্দ তুলে কই যে ছুটে যাচ্ছে সেও জানে না। দেখে ই মনে হচ্ছে বরফ শীতল ঠান্ডা পানি! এতক্ষণ ধরে রোদে লাল হয়ে যাওয়া তিন ছেলের কাছে এর চাইতে আরামের জিনিস আর কিছুই হতে পারে না। এই ঝরনার নাম “পলিখিয়াং ঝর্না”। পরের গল্পটুকু লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার, এক নাগাড়ে ঘন্টাদুয়েক ধরে ঠান্ডা পানিতে শীতে কাঁপতে থাকার, আর গণগণে সূর্যটাকে ঠান্ডা দৃষ্টি দিয়ে তাচ্ছিল্য করার। গোসল আর ছবি তোলার ফাঁকেই নাহিদ ভাই জানালেন এর উপরে আরো সুন্দর একটা ঝর্না আছে, মিনিট পাঁচেক এর পথ নাম তার “দেব্রখিয়াং ঝর্না”। তার কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু আমাদের ঐদিকে হাঁটার আর কোন দেরি নাই, ব্যাগ পোটলা একপাশে রেখে পাথুরে ক্যাসকেইড ধরে ভিজতে ভিজতে দুই চারবার পিছলা খেতে খেতে সামনে দেখলাম তরতর করে পানি আসছে এক জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। উত্তাল পাহাড় যে জয় করে এসেছে তার দুর্ভেদ্য জঙ্গলে কি ভয়! সুতরাং জঙ্গলে হারিয়ে গেলাম সবাই। মিনিট দুয়েক হেঁটেই থমকে দাঁড়ালাম ! চোখের সামনে কেউ যেন ইংরেজি “আই” অক্ষরটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে, “রোমান ব্যানার” এর মতন এক ঝর্না জঙ্গলের নিস্তব্ধতা খান খান করে আছড়ে পড়ছে বুকসমান এক পুকুরে, সেখানে একটু থেমেই পানিগুলো আবার ছুটছে আমরা একটু আগে যেদিকে গোসল করে এসেছি সেই দিকে। তাজ্জব হয়ে হা করে দাঁড়িয়ে রইলাম ঝরনার নিচে, জীবনে অনেক ঝর্না দেখেছি আমি, কিন্তু এমন অদ্ভুত একটানা লম্বা ঝর্না আমি আর দেখিনি, পুরো যেন ইংরেজি “আই” অক্ষর, কোথাও একফোঁটা বেশকম নাই! মন্ডল তো বলেই দিলো,এমন একটা ঝর্নাতে নিয়ে আসার জন্য নাহিদভাইকে নোবেল দেয়া দরকার, আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম – কারণ কথা বলার মতন অবস্থা আমার নাই।

প্রতিবারই পাহাড় আমাকে নতুন কিছু না কিছু দেয়, আজ পর্যন্ত নিরাশ করেনি এই মেঘ সবুজের অরণ্য। এবারও আবার সে আমাকে চমকে দিলো, বার বার ভাবি এক পাহাড় অরণ্যের মাঝে আর কি-ই বা নতুন থাকতে পারে, আর কিই বা অবাক করার মতন থাকতে পারে! আমার সেই ধারণাকে বার বার ভূল প্রমাণ করে দেয় এইমেঘ-পাহাড়ের দেশ। তাই বার বার পাহাড়ের কাছে ছুটে আসি, তাই বার বার পাহাড় ভালোবাসি…

 

 

Categories
Uncategorized

প্রবাল ঘেরা রুপালী দ্বীপে…

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে চার পাশের নীল পানিকে পাড়াপ্রতিবেশী বানিয়ে যে প্রবালদ্বীপের বসবাস সেটাই কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের রুপালী দ্বীপ। পূবের এলোমেলো পাহাড় আর পশ্চিমের ঢলঢলে সাগরের মাঝখানের অংশে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল নিয়ে নিত্যদিনের জোয়ার ভাটায় বছরের পর বছর ধরে গা ভিজিয়ে চলছে এই নারিকেল জিঞ্জিরা। মজার ব্যাপার হলো দুনিয়ার আর কোথাও এত প্রজাতির প্রবাল একসাথে পাওয়া যায় না।এই নীল সাগরের সাদা বালি আর টুকটুকে লাল কাঁকড়া দেখার টানে এর আগে অনেকবারই ছুটে গিয়েছিলাম অমাবশ্যার চকচকে তারা ভরা আকাশের স্বপ্নদ্বীপ সেন্টমারটিন্সে।

এত আশা, এত উন্মাদনা, এত স্বপ্ন নিয়ে সেন্টমারটিন্সে ছুটে যাওয়ার পর সেখানের বালিতে পা ফেললেই কারোরই আর কিছু করার থাকেনা। খুব ছোট এই দ্বীপটা চাইলে পায়ে হেঁটেই ৩ ঘন্টার মধ্যে পুরোটা ঘুরে ফেলা সম্ভব। তাই যারা সকালে গিয়ে বিকেলেই ফেরত চলে আসেন তাঁরা আসলে সেন্টুর কোনো মজাই পান না, সেন্টুর আসল মজা লুকিয়ে আছে এর বিকেল আর রাতগুলোতে। বিকেল বেলায় ভাটার টানে যখন সব পানি স্কুল ছুটির মতন হুড়হাড় করে পালিয়ে যেতে থাকে তখন প্রবালের খাঁজে খাঁজে এক হাঁটু পানিতে আটকে পড়ে রংধনু রঙের ছোট ছোট অনেক মাছের দল। পানি এতই স্বচ্ছ যে দেখেই মনে হয় মাছগুলো মিনারেল ওয়াটারের মধ্যে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। শেষ বিকেলের এই মাছ দেখা সময়টা কাটতে না কাটতেই তারার উঠোন নিয়ে চলে আসে রাত্রির আয়োজন। সেখানে রাতের জ্যোৎস্না এসে জড়িয়ে ধরে চিকচিকে বালির সারা গা, নীরব নিথর কেয়া বনে শাঁ শাঁ করে ছুটে যায় ব্যস্ত বাতাস, সাগরের ফেনা আছড়ে পরে রুক্ষ প্রবালের গায়ে – সেখান থেকে বালিতে চেয়ার ডুবিয়ে বসে থাকা আমাদের পায়ে, গায়ে, পুরো শরীরে… চাঁদের আলো গায়ে মাখা এই রুপালী দ্বীপে যে একবার জ্যোৎস্না দেখেছে সে জেনেছে পূর্ণিমা কি জিনিস, সে বুঝেছে চাঁদের হাসি কাকে বলে। এলোমেলো বাতাসে ভোলাভালা চুলগুলো পেছনের দিকে ছুটে গিয়ে চোখগুলোকে যখন টানটান করে তোলে তখন আরো ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে জাপটে ধরি ক্রমশ চলে যেতে থাকা নির্ঘুম রাতটাকে।

সেন্টমারটিন্সের সকালটা বাংলাদেশের আর সব জায়গার সকাল থেকে আলাদা। খুব ভোরে সুয্যিমামা জাগার আগেই মর্নিং ওয়াকে বের হয় লালকাঁকড়ার দল, তাদের নিজ পায়ে করা শিল্পকর্ম যদি তারা নিজেরা কোনোদিন দেখতো তাইলে এই দুনিয়াতে আর কোনো চিত্রশিল্পী পুরস্কার পেতেন না।

সেন্টমারটিন্সে আমরা যাই দুইটা কাজ করার জন্য। এক দেখা আর দুই হলো খাওয়া। বাংলাদেশের আর সব আনাচে কানাচে গিয়ে খাওয়া নিয়ে বাছবিচার করলেও সেন্টুতে গিয়ে আমরা উদরপূর্তির বিষয়টাতে রীতিমতন উদার হয়ে যাই। সারাদিন ছেঁড়াদীপে টই টই করে ঘুরে পেটে রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে সন্ধ্যের সময় ফিরলাম বাজারে। উদ্দেশ্য মাছের বার-বি-কিউ খাবো। মাছ দেখে চক্ষু চড়ক গাছ– কি বিশাল সাইজ একেকটার ! দোকানীর প্লেটে শুয়ে শুয়ে আমাদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে দেড়-দুই কেজি ওজনের রূপচাঁদা, টেকচাঁদা, কালাচাঁদা আর কোরালগুলো। লাইটের আলোয় চকচক করতে থাকা মাছগুলোর দিকে আমরা দিগুণ লোভনীয় দৃষ্টি ঢেলে দাম জানতে চাইলাম, ব্যাপক দর কষাকষি শেষে দুইটা বিশাল সাইজের মাছ কিনলাম ৮৫০ টাকা দিয়ে, জীবনের সেরা বার-বি-কিউ খেলাম সেদিন।  ফোলা পেট নিয়ে ঢুলতে ঢুলতে যখন সাগরের কিনারে এসে পা ডুবিয়ে দাঁড়ালাম, তখন ভরা পূর্ণিমার চাঁদকেও আড়াল করে দিলো উত্তর-দক্ষিনে সোজা চলে যাওয়া দুধ সাদা ছায়াপথ। তার সাথে তাল মিলিয়ে সোনালী চাঁদের রুপালী আলোতে থৈ থৈ করে নাচতে থাকা বঙ্গোপসাগর জানান দিলো আর দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দর জায়গাগুলোর একটাতে কি নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো যায়। চোখের তারায় কি চরম আশ্চর্য নিয়ে নির্ঘুম কাটিয়ে দেয়া যায় চাঁদ তারার এই সলিল দেশে, নীল সাগরের সাদা বালির এই প্রবালের দেশে…

For More Photos, please click here…