Categories
Uncategorized

সোনাদিয়া দ্বীপে তাঁবুবাস

sonadia-19সমির মল্লিক

দিগন্তব্যাপী সুনীল আকাশ, আকাশমুখী দীর্ঘ ঘন ঝাউবন, সবুজ তৃণভূমির বুকে জেগে থাকা সোনাঝরা বালুকা বেলা, ঝিনুক বাঁধানো সৈকত সোনাদিয়া দ্বীপ।

এই দ্বীপে হেমন্তের পূর্ণিমায় তাঁবুবাস যেন স্বপ্নের মতোই ছিল। স্বপ্ন আর অধরা রইল না, সোনাদিয়ায় তাঁবুবাসের জন্য কক্সবাজারে থেকে খোলা ছাদের ট্রলারে রওনা হলাম দ্বীপ সোনাদিয়ার পথে।

মাথার ওপরে কড়কড়ে রোদ। ঝলমলে আলোয় জলের স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি ছাপিয়ে নৌ-পথের দু’ধারে জলে ডোবা নোনা পানি বন। ঘাট ছেড়ে যত গভীরে যাচ্ছি ক্রমশ অদৃশ্য হচ্ছে স্থলভূমি।

স্থলভাগে সীমানা ছাড়িয়ে আsonadia-17মাদের ট্রলার জলপথ অতিক্রম করছে। সমুদ্রের নোনাজল ছুঁয়ে ঢেউ তুলে জলযান ছুটছে নীল আকাশের নিচে। জলের বুকে জেগে থাকা সারি সারি নোনাপানির বন। যেন ম্যানগ্রোভ গোত্রীয় বন, জোয়ারের পানি কমে গেলে ভেজে ওঠে পানির তলের জঙ্গল।

বিশাল জলরাশির পথ পেরিয়ে আমাদের ট্রলার চলল ছোট খালে পথ ধরে। পথের দু’ধারে কেবল সবুজ গাছের ঘন বন।

সবুজে ঘেরা খালের ধারে জেলেদের মাছ শিকার, এখানকার মুল জীবিকা।

দ্বীপের সীমানায় পা দিতে sonadia-16sonadia-15দিতে প্রায় মধ্য দুপুর। খালের পানি কমে যাওয়ায়, ট্রলার নোঙর করেছে কিছুটা কম পানির মধ্যে, পানি পেরিয়ে কাদা মাঠ। কাদা জুড়ে ছোট ছোট শামুক।

একে একে সবাই ট্রলার থেকে নেমে কাদা পেরেতো লাগল। চোরাবালির মতো কাদাতে তলিয়ে যাচ্ছে পা, এক পা দিয়ে, অন্য পা কাদা থেকে তুলতে হয়। নরম কাদায় হাঁটার অভ্যাসটা sonadia-10বেশিরভাগের জন্যই প্রথম।

কাদা পেরিয়ে, সোনাদিয়ার সবুজ তৃণভূমি। দূর থেকে চো্খে পড়ে ঝাউগাছের বিশাল বন। দেখে মুগ্ধ হবেন যে কোনো পথিক!

সবুজ মাঠ পেরিয়ে ঝাউবনে ডুকতেই মনে হয় এই যেন সবুজের দুয়ার। সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা এই সবুজ মায়াবী দ্বীপ রক্ষা করে যাচ্ছে ঝাউবন।

ঝাউবনের সবুজ ছায়ায় ক্যাম্পিং সবচেয়ে ভালো স্থান। ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের খুব কাছেই সৈকত, সুমদ্র থেকে ভেসে আসা গর্জন। ক্যাম্পিং গ্রাউন্ডের পাশের চুলা জ্বালানো হয়েছে। এখানেই রান্নার আয়োজন।

sonadia-12ঝাউবন পেরিয়ে এখানে সৈকতের সীমানা। ঘন ঝাউবন পেরিয়ে বালুকাবেলার দুপাশে চোখ ধাঁধানো চিত্রপট। ঝিনুকে বাঁধানো সৈকত, যতটুকু চোখ যায় কেবল নীল জলের ধারা।

সমুদ্রের বুক থেকে টেউ এসে একের পর আছড়ে পরছে সৈকত। জনশূন্য এই সৈকত যেন একান্তই নিজস্ব। কোথাও কোনো মানুষ নেই। ঝাউবনের ঘেরা সৈকতজুড়ে ঝিনুক, নুড়ি-পাথর আর লাল-কাঁকড়া।

লাল-কাঁকড়া সোনাদিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। তবে মানুষের পায়ের শব্দ এরা অনেক দূর থেকে পায়।

সৈকতে লাল-আভার সূর্যাস্ত শেষে ক্যাম্পিং ফিরে জোছনা-বিলাস পর্ব।

sonadia-5 sonadia-13 sonadia-8 sonadia-1ঝাউগাছের ফাঁক গলে নেমে অপরূপ জোছনার আলো। যেন চাঁদ থেকে মোমের মতো গলে নামছে আলোকচ্ছটা! যেন অন্য সোনাদিয়া। ক্যাম্প ফায়ারের আলোক-রশ্মিতে পুরো ঝাউবন, ক্যাম্পগ্রাউন্ড লালচে আলোয় ভরপুর।

কাছের সমুদ্র থেকে ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে টেউয়ের গর্জন। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে এই গর্জন যেন গ্রাস করছে পুরো দ্বীপকে।

চারপাশে ছড়ানো তাঁবুর ক্যাম্পগ্রাউন্ডে বসে মনে হচ্ছে- আক্ষরিকভাবে সোনায় মোড়ানো আমাদের সোনাদিয়া দ্বীপ।

জল-জোছনায় বিলিন হতে সোনাদিয়া বাক্যাতীত।

যেভাবে যাবেন: সোনাদিয়া যেতে আগে যেতে হবে কক্সবাজার। ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে এসি/ননএসি বাসে কক্সবাজার পৌঁছে, কোনো হোটেলে অল্প সময়ে ফ্রেশ হয়ে, সকালের নাস্তা করে রওনা হতে হবে।

কক্সবাজারের ৬ নম্বর ঘাট বা বিআইডব্লিউটিসি ঘাট থেকে সোনাদিয়ার ট্রলার ছাড়ে। তবে ট্রলার আগে থেকে রিজার্ভ করে নিতে হবে। প্রায় দুই ঘণ্টার নৌ-ভ্রমণে পৌঁছে যাবেন দ্বীপ সোনাদিয়ায়।

প্রয়োজনীয় তথ্য: সোনাদিয়া বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এখানে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আপনাকেই করতে হবে। স্থানীয় গাইড বা স্থানীয় কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

রান্নার প্রয়োজনীয় উপাদান কক্সবাজার থেকে কিনে নিয়ে যেতে হবে। সোনাদিয়ায় রাতে থাকার জন্য কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। রাত কাটাতে হয় নিজস্ব তাঁবুতে। তাই অবশ্যই তাঁবু নিয়ে যেতে হবে।

ছবি: সামির মল্লিক