Categories
রাকিব কিশোর

যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন

গাছে গাছে থোকায় থোকায় ধরে আছে লটকন। ছবিটি নরসিংদীর কামারটেক থেকে তোলা। ছবি: লেখক

পুরো গাছভর্তি লটকন পেকে হলুদ হয়ে আছে, সেই পাকা রঙে বিকেলের আলো আরও সোনালি করে তুলেছে পুরো পরিবেশ। হাঁ করা মুখ নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন। আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে, গাছের শরীর বেয়ে, কাণ্ড বেয়ে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

খুব ছোটবেলায় হাতিয়ায় নানাবাড়িতে একটা লটকনগাছ দেখেছিলাম। সেটাতে ধরে থাকত থোকায় থোকায় লটকন। কালেভদ্রে কখনো বর্ষাকালে গ্রামের বাড়িতে গেলে সেই লটকনগাছ ঘিরে উচ্ছ্বাসের অন্ত থাকত না। টক-মিষ্টির অপূর্ব স্বাদের এই ফলের নাম লটকন কেন হলো সেটা জানি না, তবে ধারণা করতাম থোকায় থোকায় লটকে বা ঝুলে থাকে বলেই এমন নামকরণ। সেবার ঝড়ে লটকনগাছটা ভেঙে পড়ে গেল, এরপর আর কোথাও লটকনগাছ দেখিনি।
এখন লটকনের মৌসুম। একবারে ঝোঁক পেয়ে গেল, খোঁজ লাগালাম কোথায় লটকন বাগান আছে। কোথায় গেলে একসঙ্গে অনেক লটকনগাছ দেখা যাবে। সব অঞ্চলের বন্ধুদের কাছে প্রশ্নটা ছড়িয়ে পড়ল, উত্তর এল কেবল নরসিংদী থেকে। এক বন্ধুর বাড়ি ওখানে। সে জানাল, এদিকে লটকনগাছ ভরা, দোস্ত, আইসা পড়। এখানে রাস্তাঘাটে ‘কোটি কোটি’ লটকন পইড়া রইছে।
দেরি না করে ঈদের পরদিন (৮ জুলাই) সকাল সকাল রওনা দিলাম নরসিংদীর উদ্দেশে। ঢাকা থেকে নরসিংদী যাওয়ার অনেক রাস্তা! একবার গিয়েছিলাম সায়েদাবাদ দিয়ে, পরেরবার গেলাম পূর্বাচলের ৩০০ ফুট রাস্তা দিয়ে। আর এবার যাচ্ছি উত্তরা-টঙ্গী হয়ে। দুপুর সাড়ে ১২টায় নরসিংদী নেমে বন্ধু শাহেদের বাড়িতে উঠলাম। সেখান থেকে শাহেদের মামা লটকন বাগান ঘুরে আসার জন্য গাড়ি দিয়ে দিলেন। নরসিংদীর পাঁচদোনা মোড় থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে আমাদের যেতে হবে ‘মরজাল’ নামের স্থানে। সেখানেই নাকি লটকনের বাগান। চালক কিছুক্ষণ চালিয়ে গাড়ি সোজা ঢুকিয়ে দিলেন কামারটেকের রাস্তায়। জানালেন, এখানেই লটকনের বাগান দেখা যাবে। চোখ কচলে গাড়ির জানালা দিয়ে সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম, একটা লটকনগাছও যেন মিস না হয়।
রাস্তা ক্রমেই সরু হয়ে আসছে সামনের দিকে। পিচ ঢালা রাস্তার দুই পাশে নাম না জানা গাছের সারি। হঠাৎ করে শাহেদ চেঁচিয়ে উঠল, ‘লটকন’, ‘লটকন’! তার আঙুলের নিশানা বরাবর আমিও দাঁড়ালাম, ওই তো বাঁ পাশে এক গাছভর্তি লটকন ঝুলে আছে। তড়িঘড়ি করে নামতে যাচ্ছিলাম। ড্রাইভার বাধা দিলেন, ‘সামনে আরও আছে, এগুলো তো শোপিস, চলেন গোডাউন দেখাই!’ কথায় বলে অপরিচিত জায়গায় অভিজ্ঞদের কথা শুনতে হয়, নইলে বিপদ। শক্ত হয়ে বসে রইলাম আরও বেশি গাছ দেখার আশায়। কিন্তু আর তো পাওয়া যাচ্ছে না! তবে কি এই একটাই গাছ আছে পুরো নরসিংদীতে। মন খারাপের ঠিক চূড়ান্ত অবস্থায় বিকেলের সোনালি আলোটা যেন আরও বেশি সোনালি রং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনের দুই পাশের গাছগুলোতে। হটাৎ করেই যেন লটকনের রাজত্বে চলে এলাম।
পুরো গাছভর্তি লটকন পেকে হলুদ হয়ে আছে, সেই পাকা রঙে বিকেলের আলো আরও সোনালি করে তুলেছে পুরো পরিবেশ। হাঁ করা মুখ নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু লটকন আর লটকন। আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলে আছে, গাছের শরীর বেয়ে, কাণ্ড বেয়ে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে, কোথায় নেই তারা। একেবারে গোড়া থেকে শুরু করে চোখ যায় না এমন ওপর পর্যন্ত ধরে আছে অজস্র লটকন। একেকটা আকারেও বিশাল। প্রতিটা গাছতলায় ঝরা পাতার মতো পাকা লটকন পড়ে আছে। খাওয়ার কেউ আছে বলে মনে হলো না। হাত ছোঁয়া দূরত্ব থেকে একটা লটকন ছিঁড়ে মুখে দিলাম। আহ! অমৃত। টসটসে রসে ভরা কী মিষ্টি! এত বড় লটকন সচরাচর দেখা যায় না। পাশে বাড়িঘর। তার পাশে কাঁঠালগাছের সারি, মাঝখানে লটকনের মিছিল।
আবার গাড়িতে উঠলাম, মাইলের পর মাইল রাস্তাজুড়ে লটকনের সমারোহ। এক জায়গায় এত বেশি লটকন ধরে আছে যে আর না থেমে পারলাম না, এখানকার লটকন আরও বড়। একসময় দেখি এক লোক আমাদের ডাক দিলেন, বললেন, ‘লটকন খাবেন? এদিকে আসেন। এদিকে অনেক লটকন আছে। গিয়ে দেখি তিনি মূলত লটকন ব্যবসায়ী। ছোটখাটো একটা আড়ত আছে তাঁর। সেখানে ঝুড়িতে লটকন সাজানো হচ্ছে। শহরে নিয়ে বিক্রি হবে এগুলো। এত সুন্দর, পরিপাটি করে লটকনগুলো সাজানো হচ্ছে যে দেখে মনে হয় সব নিয়ে যাই।’
তাঁর কাছ থেকে জানলাম, পুরো লটকন বাগান তাঁরা বছরের শুরুতে ইজারা নেন। বৈশাখ মাসে গাছে ফল আসে আর বর্ষায় এগুলো পাকা শুরু করে। ১০ কেজির ঝুড়ি আছে, ২০ কেজির ঝুড়িও আছে। আকার আর গুণগত মান ভেদে এর দাম ভিন্ন। ১০ কেজির ঝুড়ির দাম ৫০০-১০০০ টাকা। বললাম, ‘২ কেজি নেব, ব্যবস্থা করেন।’ তিনি বলেন, ‘দুই-তিন কেজির জন্য আমরা দাম রাখি না। এই মিজান, ভাইজানদের গাড়িতে কিছু লটকন দিয়া দে।’ কথা শেষ হওয়া মাত্রই দেখলাম দসাসই চেহারার একজন দুই হাতভর্তি করে লটকন তুলে নিয়ে গাড়িতে দিয়ে দিলেন। কোনো দাম নিলেন না। আড়তদার খুশি মনে আমাদের বিদায় দিলেন। দাওয়াত দিলেন—যখন মন চায় আসবেন, এখানে বসে যত ইচ্ছা খাবেন। কোনো পয়সা দেওয়া লাগবে না!
তাজ্জব চেহারা নিয়ে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম লটকন বাগানের মধ্য দিয়ে। এখানকার লোকজনের প্রায় সব বাড়িতেই লটকনগাছ আছে। সেসব গাছে পাতার থেকে লটকন বেশি। দেখতে দেখতে চলে এলাম সৃষ্টিগড় বাজারে। এটা মূলত লটকনের হাট। এখানে আরও বড় পরিসরে লটকন বিক্রি হয়। মাত্র ঘণ্টা খানেকের লটকন অভিযান শেষ করে আমরা আবার উঠলাম ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে, সেখান থেকে ‘মরজাল’ হয়ে ভেলনগর বাসস্ট্যান্ডে এসে আমি নেমে গেলাম, ঢাকায় আসতে হবে এখান থেকে। বাসে উঠে কাঁধের ব্যাগভর্তি লটকনের দিকে হাত চলে গেল, একটা একটা করে লটকন মুখে পুরছি আর ভীষণ আনন্দ নিয়ে ফেলে আসা সোনালি বাগানটার কথা ভাবছি। মনে হলো যেন এই মাত্র বিশাল এক আঙুর বাগান ফেলে এলাম।

 

সৃষ্টিগড় বাজারে লটকনের আড়ত

কীভাবে যাবেন
ঢাকার সায়েদাবাদ, বনানী, মহাখালী বা উত্তরা থেকে যেকোনো নরসিংদীর বাসে উঠে পাঁচদোনা বাসস্ট্যান্ড নামবেন। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করে চলে যাবেন মরজাল। সিএনজির চালককে বললেই হবে যে লটকন বাগান দেখতে যাবেন, তিনিই আপনাকে কামারটেকের রাস্তা দিয়ে সৃষ্টিগড় পর্যন্ত নিয়ে যাবেন। এই ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার সরু রাস্তার পুরোটাজুড়েই লটকন বাগান। লটকন জুলাই মাসের পর আর পাওয়া যাবে না। ফেরার সময় ভেলনগর বা পাঁচদোনা হয়ে আবার চলে আসতে পারেন। ঢাকা থেকে নরসিংদীর পাঁচদোনা পর্যন্ত বাসভাড়া ১০০ টাকা।