Categories
Uncategorized

ঝরনার নাম কাই লো ভা…

———————————————————- বাবর আলী

পাড়া থেকে বেরিয়ে ঘন্টাখানেক হাঁটতেই ঝাঁ ঝাঁ রোদে দফা-রফা অবস্থা। অল্প দূরেই ট্রেইলের পাশে একটা জুমঘর দেখে সেখানেই কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেব বলে মনস্থির করলাম। মিনিট দশেক পরেই সবুজ পাহাড়ের জমিনে বাদামী জুমঘরটার কাছে ভিড়তেই বিকটদর্শন দুটো কালো কুকুর গগনবিদারী চিৎকার শুরু করে দিল। কিছুতেই তারা আমাদের জুমঘরটার কাছে ভিড়তে দিবে না। মুখ দিয়ে উদ্ভট সব শব্দ করে কুকুর পটানোর নানারকম কায়দা-কসরত করেও খুব বেশী সুবিধা করতে না পেরে একসময় রণে ক্ষান্ত দিল রাশিক। বাইরে হাউ-কাউ শুনেই সম্ভবত জুমঘরের ওপাশটা থেকে বেরিয়ে এলেন জুমঘরের মালিক। কানে গোঁজা ফুল দেখেই বুঝলাম দাদা ম্রো তথা মুরং। কথা বলার চেষ্টা করতেই আবিষ্কার করলাম দাদার বাংলা জ্ঞান শুন্যের কোটায়। ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝালাম,উনার জুমঘরটায় ক্ষণিকের অতিথি হতে চাই আমরা। দাদা কুকুর দুটোকে ম্রো ভাষায় কি যেন একটা ধমক দিতেই তারা রীতিমতো চুপসানো বেলুন হয়ে গেল। বুঝলাম, সারমেয় গোত্রের এ দু’সদস্য রাশিকের উদ্ভট বাংলা শব্দাবলী বুঝতে না পারলেও ম্রো ভাষায় তারা বেশ সাবলীল! আর এই ফাঁকে আমরা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে বানানো ছোট্ট সিড়িটা বেয়ে জুমঘরে উঠে পড়লাম।

মাচাটা ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকতেই বুঝলাম, সচরাচর যেসব জুমঘর দেখতে পাওয়া যায় সেসবের তুলনায় এই জুমঘরটিকে রীতিমতো প্রকান্ডই বলা চলে। ঘরের বিশাল একটা অংশ দখল করে নিয়েছে সদ্যই কেটে আনা ধান। আর অন্যপাশে ফিরতেই দেখি ক’জোড়া উৎসুক চোখ আমাদের দিকে চেয়ে আছে।জুমঘরের মালিকের পরিবারের সদস্য তারা। দিনের প্রথমভাগের কাজ শেষ করে সবেমাত্র তারা দুপুরের খাবার নিয়ে বসেছে। কুকুর দুটোকে শান্ত করে দাদা ঘরে ঢুকেই ভাত নিয়ে বসলেন। ইশারা-ইঙ্গিতে আমাদেরকেও খেতে বললেন। পাড়া থেকে সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এটা জানাতেই একটু পরে গরম গরম ভুট্টা আসলো আমাদের সামনে। ভুট্টা দেখেই আমি আর রাশিক হামলে পড়লাম। গোগ্রাসে আমাদের ভুট্টা খেতে দেখে রেম’দা ঘোষণা করলেন, এই কদিনে আমি আর রাশিক মিলে যতগুলো ভুট্টা খেয়েছি, একটা পূর্ণবয়স্ক ভালুকও এক মৌসুমে এতগুলো ভুট্টা খেতে পারে না! রেম’দার ইনসাল্টকে আমরা কনসাল্ট  হিসেবে বিবেচনা করে আবার পূর্ণ উদ্যমে ভুট্টার প্রতি মনোনিবেশ করলাম। মুখের ভেতর গালভরা ভুট্টা নিয়েই রেম’দার সাথে আজকের গন্তব্য নিয়ে আলোচনা চালাতে লাগলাম। ‘কাই লো ভা’ নামক একটা মনোলোভা ঝরনাতে যাওয়ার ইচ্ছা আজ।  ‘কাই লো ভা’ শব্দের অর্থ ‘যে ঝিরিতে মাছ উঠতে পারে না’। নাম শুনেই বুঝলাম,মনুষ্য প্রজাতির পাশাপাশি মৎস্যকুলের জন্যও যথেস্ট দুর্গম এই ঝরনার উৎসমুখের ঝিরিটি। রেম’দা বারবার করে বলে দিলেন, ঝরনার নীচের দিকে নামাটা বেশ কঠিন।বেশ কিছুদিন আগে তলাংচাঁদ পাড়ার এক ম্রো শিকারী এই ঝরনার উপর থেকে পড়ে মারা গিয়েছে। নীচের দিকে নামতে দড়ির পাশাপাশি দরকার বাড়তি সাবধানতা।।

DSC_0833-fb new

জুমঘরের মাচার দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি পশ্চিম আকাশের খানিকটা ছেয়ে গেছে কালো মেঘে। একটু পরেই হুড়মুড়িয়ে নামলো বৃষ্টি। শরতের এই এক রূপ। ক্ষণে ক্ষণে আবহাওয়ার রূপবদল। একবার ভাবলাম,আজকের রাতটা এই জুমঘরেই কাটিয়ে দিই। তবে খানিক পরেই ভাবনাটাকে আর ডাল-পালা মেলতে দেয়া গেল না। ঘরের একপাশ দখল করে রাখা পাকা ধানের বদৌলতে ঘরময় এক ধরনের বদখত দেখতে সবুজ পোকার উৎপাতে টেকাই দায়। ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থা সবার। বাইরে তখনো একটানা রিমঝিম বৃষ্টি।

ঘন্টাখানেক পর বৃষ্টি ধরে আসতেই ট্রেইলে নেমে পড়লাম। তলাংচাঁদ পাড়ার লোকেরা এবছর এদিকের পাহাড়গুলোতে জুম চাষ করেছে। তাই জুমের ফাঁক গলে  সুন্দর ট্রেইল করা আছে। হালকা হলুদ ধানগাছগুলোর নুইয়ে পড়া মাথা এড়িয়ে এগুচ্ছি। দুটো পাহাড় ডিঙানোর পর নিচের ঝিরিতে নেমে পড়ার পালা আসলো। লাল মাটির ট্রেইলটা কিছুক্ষণ আগের বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। ট্রেইলে হাঁটা উপভোগ করার চেয়ে আছাড় না খাওয়ার দিকে অখন্ড মনোযোগ সবার। অল্প এগুতেই দুপাশের জুমের হালকা হলুদ ধান গাছের স্থলাভিষিক্ত হলো বাঁশবাগান। দু’সারি বাঁশবাগানের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে সামনের দিকে এগিয়েছে ট্রেইলটা। মিনিট দশেক নামতেই নিচের ঝিরিতে গিয়ে পড়লাম আমরা। এবার পাথরের বোল্ডার টপকানোর পালা। এ-পাথর,ও-পাথরে ছোট ছোট লাফ দিয়ে এগুচ্ছি। ঝিরির দু’পাশে ঘন গাছ-পালার জঙ্গল ভেদ করে রোদ নেমেছে কিছু কিছু জায়গায়। কেমন যেন অদ্ভুত আলোয় আলোকিত সেসব জায়গা। ঝিরি ধরে আর খানিকটা এগুতেই ঝিরিটা দু’ভাগ হয়ে গেল। ডানপাশের ঝিরিতে নামতেই দেখা মিলল সুন্দর একটা ক্যাসকেডের। কিছুক্ষণ গা ভিজিয়ে উঠে এলাম সেটার গোড়া থেকে।এবার এই ঝিরি ধরে নীচে নামতে হবে। তাহলেই দেখা মিলবে কাই লো ভার।ঝিরির সুবিধাজনক একটা জায়গায় আমাদের ভারী ব্যাক-প্যাকগুলো রেখে পিঠে শুধুমাত্র ছোট্ট ডে-প্যাকগুলো চাপিয়ে নিলাম।

সামনের বাঁকটা ঘুরতেই দেখি ছোট-খাট একটা পাথর ধসের এলাকা। পাশের পাহাড়টার ঝুরঝুরে আলগা পাথরগুলোই ধসের কারণ। সাবধানে পথটা পাড়ি দিলাম। আরো কয়েকটা বাঁক ঘুরে খানিকটা নিচের দিকে নামতেই নিজেদেরকে আমরা আবিষ্কার করলাম ঝরনার উপরে। এবার নীচে নামার পালা। নামার পথ দেখে ভিরমি খাবার জোগাড়। রেম’দা জানালেন, এদিকটাতে নামার পথেই ঐ ম্রো শিকারী প্রাণ হারিয়েছে। তৎক্ষণাৎ রাশিকের ঝোলা থেকে রশি বের করে সামনের গাছটাতে বাঁধা হল। পাহাড়ের একেবারে কিনার ঘেঁষে এগুতে হবে। কোনোরকমে একজন মানুষ যেতে পারে এমন একটা পথ। হাতের বামপাশে শ’দুয়েক ফুটের খাদ। হাত বা পা ফসকালেই নিচের পাথুরে জমিনে পড়ে একেবারে আলুর দম। বুকের খাঁচার ভেতরে লাফানো হৃৎপিণ্ড নিয়ে দড়ি ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে এগুতে থাকলাম। খানিক পরেই শুরু হলো, পাশের পাহাড় থেকে খসে পড়া ক্ষুদে পাথরের চাঙড়ের এলাকা। পাথরগুলোর উপর পা পড়লেই সরে যাচ্ছে সেগুলো। দুয়েকটা হার্টবিট মিস করে পৌঁছালাম একটা ছাউনীর মতো অংশে। এখানেই প্রথম দেখা দিল ঝরনাটা। চারপাশের সবুজ বনানীর মধ্যে একখন্ড সাদা ফেনিল ঢেউ যেন। উদ্দাম গতিতে নিচের ঝিরিতে পানি ঢেলেই চলেছে। সাবধানে বাকীপথটুকু বেয়ে নেমে এলাম ঝিরিতে। বোল্ডারের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে পথ চলে বসে পড়লাম একদম ঝরনার গোড়ায়। অবিরত ধারায় ধাপে ধাপে গড়িয়ে নিচের ঝিরির দিকে এগুচ্ছে পানি। একটা ধাপে মাথা ডুবিয়ে প্রশান্তির খোঁজ করলাম খানিকক্ষণ। নিচের ক্যাসকেডটাতে গা ডুবিয়ে ততক্ষণে আপন রাজ্যে হারিয়ে গেছে রাশিক।

ঝিরি ধরে ঝরনার নিচের দিকে এগুতেই খেয়াল করলাম, এই ঝিরিটা একটু অন্যরকম। সাধারণত ঝিরিপথগুলোতে পাথরের বোল্ডারের ফাঁকে ফাঁকে থাকে ছোট ছোট পাথর আর নুড়ি মিশ্রিত বালি। আর এই ঝিরিটা পুরোটাই পাথুরে একটা উঠান যেন। অল্প-স্বল্প কিছু বিশালাকৃতি বোল্ডারের দেখা পেলেও বালি-নুড়িপাথর একেবারেই অনুপস্থিত। ঝিরি ধরে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই ভয়াবহ পিচ্ছিল পাথুরে জমিনে আছাড় খেয়ে হাঁটুর নীচে একটা আলু গজিয়ে ফেললাম। আর সামনে না এগিয়ে ঝরনার শেষ ধাপটায় এসে আবার মাথা এলিয়ে দিলাম। হঠাৎ গুড়ুমগুড়ুম শব্দে সংবিৎ ফিরে পেয়ে উপরে তাকিয়েই দেখি কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। তাড়াতাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। আসার পথেই ট্রেইল থেকে অল্প দূরেই বেশ কিছু সুন্দর জুমঘর দেখে এসেছি।সে অভিমুখেই হাঁটা ধরলাম। মনের মধ্যে তখনো ভাসছে সবুজের সমুদ্রে একফালি উত্তাল সাদা ঢেউয়ের নিরন্তর নীচে আছড়ে পড়ার ছবি।

DSC_0797-fb

লেখকের ফেসবুক একাউন্ট লিংকঃ

https://www.facebook.com/Babar.Unmad

One reply on “ঝরনার নাম কাই লো ভা…”

Comments are closed.