Categories
Uncategorized

সানাক্র পাড়া ঝরনা – বান্দরবান…

 

সুন্দরের খোঁজে মানুষ দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে, ঢুকে পড়ে গহীন থেকে আরো গহীনে। নতুন কিছু পাবার আশায়, নতুন কিছু দেখার আশায় মানুষ নিজেকে নিয়ে যায় বিরাণ কোন জঙ্গলে। অথচ খুব কাছেই একেবারে হাতের নাগালেও যে অমিত সুন্দর কিছু থাকতে পারে সেটা সম্পর্কে আমরা চিন্তাও করিনা। বান্দরবানের অলিতে গলিতে কানা ঘুপচিতে আমি অনেক ঘুরেছি, জেনেছি কোথায় আছে বিমুগ্ধ ঝর্না, বিস্ময়কর ঝিড়িপথ, আর মন ভালো করে দেয়া পাহাড়গুলো। কিন্তু কল্পনাও করতে পারিনি যে এত কাছেই রয়েছে আরো কয়েকটি মুগ্ধ করা ঝর্না!

এবারে হুট করেই ছুটি মিলল দুই দিনের, সাথে শুক্রু শনি মিলিয়ে মোট চার দিনের মামলা। ঠিক করি বান্দরবান যাবো, এই ভয়াবহ গরমে যেখানে নিজের গা থেকেই ঝর্না গড়িয়ে পড়ে সেখানে পাহাড়ী ঝর্না দেখতে যাওয়া দোষের কিছু না। ঠিক করে ফেললাম বাংলাদেশের সবচাইতে উঁচু গ্রাম পাশিং পাড়া-তে তিন রাত ঘুমাবো। সেখানে মেঘের রাজত্ব, জগতের কোন গরম, উষ্ণতা সেখানে ঠাঁই পায়না। এই কাঠ ফাটা গরমে সেখানে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে হয়, সন্ধ্যে হলেই ঠান্ডা ঠান্ডা মেঘের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়। কথায় বলে লোভে একলা পোড়া ভালো না, আরো দশজনকে নিয়ে পড়তে হয়। আমি দশজন পেলাম না, পেলাম একজনকে। লালমণিরহাটের নাসিরুল আলম মন্ডল, তাকে জানালাম – আমি জামু, তুমি যাইবা ? কই যাবো, কোথায় যাবো জিজ্ঞেস না করেই সে জানিয়ে দিলো আসতেছে। আর পায় কে আমাকে, দুইজনের সংসার ! ব্যাগ গুছিয়ে রওয়ানা দিলাম মেঘ-পাহাড়ের দেশে। চট্টগ্রাম বদ্দার হাট ফ্লাইওভারে বাস উঠার আগেই দেখি রাস্তা আগলে এক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে না নিয়ে বাস যেতে দিবে না ! তাঁর নাম নাহিদ। এই ছেলেটা বান্দরবানের আনসাং হিরো। বান্দরবানে চেনে না এমন কোণ যায়গা তাঁর কাছে নাই। সব পাড়াতে তাঁর আত্মীয়তা। চলতে চলতেই তিনি জানালেন, পাহাড়ে গিয়া কি করবেন, চলেন ঝর্না দেখতে যাই, গোপন ঝর্না, কেউ জানেনা এইগুলার খবর! আমার আর মন্ডলের সকালের ঘুম তখন রাতের আঁধারের মতই ফুড়ুৎ করে হারিয়ে গেছে। আমাদের চকচক করতে থাকা চোখ দেখে যেকোন অচীন মানুষও চোখ বুঁজে বলে দিবে যে ছেলেগুলা আবার গেছে, আর কেউ এদের থামাতে পারবে না।

বান্দরবানের রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে সোজা রুমা চলে গেলাম, সেখানে একটুও সময় নস্ট না করে আমরা উঠে গেলাম ইডেন পাড়ার পাহাড় বেয়ে। আমাদের গন্তব্য মংপ্রু পাড়া। নাহিদ ভাইএর ভাষ্যমতে মংপ্রু পাড়ায় যাবার আগেই বাম দিকে পাহাড়ের নিচে একেবারে লোকচক্ষুর আড়ালে বয়ে চলেছে কয়েকটি ঝর্না। আমাদের লক্ষ্য এবার সেগুলোতে গিয়ে শরীর জুড়ানো। এমন একটা ঘটনা শোনার পর মানুষের আনন্দের দিন শুরু হবার কথা, আমাদের শুরু হলো কস্টের দিন। ভর দুপুরে মাথা ফাটা রোদের মাঝে পাহাড় বাওয়া যে কি পরিমাণ অমানুষিক যন্ত্রণার কাজ সেটা বোঝনোর মতন ভাষা এখনো আমি রপ্ত করতে পারিনি। সামনে যতদূর পথ যায় খালি খাড়া পথ, পিঠের ছোটখাটো ব্যাগটাও তখন মনে হচ্ছে আস্ত একটা পাহাড়। হাঁটু আর বুক এক করে অনেক ঠেলে ঠুলে নিজেকে উঠাচ্ছি পাহাড়ের মাথায়, টপটপ শব্দটাকে জাদুঘরে পাঠিয়ে দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ছে শরীরের ইঞ্চি ইঞ্চি বেয়ে। সাথে করে নিয়ে আসা ২ বোতল পানি তখন সোনার চেয়েও দামী। আমাদের হাঁটাপথের দুইপাশ আম বাগানে সয়লাব। সবগুলা গাছে বিশাল বিশাল আম ধরেছে। কিন্তু খাওয়ার মতন একটাও হয়নি, একটা কামড় দিয়েই দ্বিধায় পড়ে গেলাম যে আম খাইলাম নাকি লেবু, তেঁতুল খাইলাম! হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা যখন সহ্যের শেষ সীমায় তখন বাম পাশে দেখা গেলো অনিন্দ্য সুন্দর টেবিল পাহাড়ের। এই পাহাড়ের চুড়াটা একেবারে ডাইনিং টেবিলের মতন সমান হওয়াতে এর নাম দেয়া হয়েছে টেবিল পাহাড়, তার ওপাশে “সিপ্পি”র চূড়া। সিপ্পি-তে যাওয়ার জঙ্গলটা নাকি খুব সুন্দর, হয়তো যাবো একদিন সেখানে। দুই পাহাড়ের চূড়া দেখে যেই একরাশ আনন্দ নিয়ে আমাদের সামনের পথের দিকের তাকালাম, ওমনি যাবতীয় আনন্দ চুপসে গেলো, উঠতে হবে আরো খাড়া পথ! উঠতে উঠতে একেবারে আকাশে মিলিয়ে গেছে পথের বাঁক! উপরে উঠার একটা লাভ আছে, সেটা হলো ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যায়, সেই লোভে আর সব কস্টকে ঠেলে ফেলে উঠতে লাগলাম আমরা, উঁচু-নিচু সমতল পেরিয়ে এক সময় হটাৎ করে নামা শুরু করলো আমাদের পথ। এবার সে নামছে তো নামছেই, সাথে সাথে বদলে যেতে থাকলো তার চার পাশের সব দৃশ্যপট। একপাশে কাশফুল, অন্যপাশে ঘাসফুল নিয়ে নামতে নামতে সেই পথ আমাদের নামিয়ে দিলো একেবারে পাহাড়ের গোড়ায়। সেখানে এলোমেলো পাথর পড়ে আছে, মনে হচ্ছে কোন এক মহাযুদ্ধ হয়েছিলো এদিকে। ভাঙ্গা পাথর, জুমের ক্ষেত, ফলবাগান, কৃষ্ণচূড়ার জঙ্গল সব পেরিয়ে একসময় ভর দুপুরে ঝুপ করে আঁধার নামিয়ে দিলো আকাশ সমান গাছের দল। নাম না জানা এই গাছের পাতায় পাতায় বাতাসের টান, সেই টান আর পাখি গান ছাড়িয়ে আমাদের কান পেলো নতুন এক প্রাণের শব্দ, অনেক অনেক পরিচিত এই শব্দ মুহূর্তেই ক্লান্তি দূর করে দিলো, শরীরের সব কয়টা ব্যাথাওয়ালা পেশী আনন্দে যেন নেচে উঠলো এই বয়ে চলা পানির শব্দে। জঙ্গল, ঘাস, গাছ, লতা মাড়িয়ে ছুটে চললাম পানির উৎসের দিকে – ধুম করে সামনে পড়লো এক পাহাড়ী পাড়া। অনেকগুলো ঘর আর নানান ফলবাগানে সাজানো এই পাড়ার নাম “সানাক্র পাড়া”। তাদের একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঝর্না আছে নাকি, জবাবে তিনি যেদিকে হাত তুললেন সেদিকে ঘণ জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই নাই। পাহাড়ীরা ভুল করে না, এই তত্ত্ব-কে মেনে নিয়ে ফল বাগান মাড়ালাম, ফুলবাগান ছাড়ালাম, নাহিদ ভাইয়ের জিপিএস বলছে আমরা ঠিক রাস্তাতেই যাচ্ছি। অবশেষে মিনিট দশেক হেঁটে পেলাম তাকে। দুই পাশে দুই বিশাল পাহাড়কে পাহারায় রেখে নিজের যৌবনকে পাথুরে পথে অকাতরে ঢেলে দিচ্ছে এই পাহাড়ী ঝর্না। কয়েকশ ফিট লম্বা ক্যাসকেইডের উপর দিয়ে ঝিরি ঝিরি শব্দ তুলে কই যে ছুটে যাচ্ছে সেও জানে না। দেখে ই মনে হচ্ছে বরফ শীতল ঠান্ডা পানি! এতক্ষণ ধরে রোদে লাল হয়ে যাওয়া তিন ছেলের কাছে এর চাইতে আরামের জিনিস আর কিছুই হতে পারে না। এই ঝরনার নাম “পলিখিয়াং ঝর্না”। পরের গল্পটুকু লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার, এক নাগাড়ে ঘন্টাদুয়েক ধরে ঠান্ডা পানিতে শীতে কাঁপতে থাকার, আর গণগণে সূর্যটাকে ঠান্ডা দৃষ্টি দিয়ে তাচ্ছিল্য করার। গোসল আর ছবি তোলার ফাঁকেই নাহিদ ভাই জানালেন এর উপরে আরো সুন্দর একটা ঝর্না আছে, মিনিট পাঁচেক এর পথ নাম তার “দেব্রখিয়াং ঝর্না”। তার কথা শেষ হতে দেরি, কিন্তু আমাদের ঐদিকে হাঁটার আর কোন দেরি নাই, ব্যাগ পোটলা একপাশে রেখে পাথুরে ক্যাসকেইড ধরে ভিজতে ভিজতে দুই চারবার পিছলা খেতে খেতে সামনে দেখলাম তরতর করে পানি আসছে এক জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। উত্তাল পাহাড় যে জয় করে এসেছে তার দুর্ভেদ্য জঙ্গলে কি ভয়! সুতরাং জঙ্গলে হারিয়ে গেলাম সবাই। মিনিট দুয়েক হেঁটেই থমকে দাঁড়ালাম ! চোখের সামনে কেউ যেন ইংরেজি “আই” অক্ষরটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে, “রোমান ব্যানার” এর মতন এক ঝর্না জঙ্গলের নিস্তব্ধতা খান খান করে আছড়ে পড়ছে বুকসমান এক পুকুরে, সেখানে একটু থেমেই পানিগুলো আবার ছুটছে আমরা একটু আগে যেদিকে গোসল করে এসেছি সেই দিকে। তাজ্জব হয়ে হা করে দাঁড়িয়ে রইলাম ঝরনার নিচে, জীবনে অনেক ঝর্না দেখেছি আমি, কিন্তু এমন অদ্ভুত একটানা লম্বা ঝর্না আমি আর দেখিনি, পুরো যেন ইংরেজি “আই” অক্ষর, কোথাও একফোঁটা বেশকম নাই! মন্ডল তো বলেই দিলো,এমন একটা ঝর্নাতে নিয়ে আসার জন্য নাহিদভাইকে নোবেল দেয়া দরকার, আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম – কারণ কথা বলার মতন অবস্থা আমার নাই।

প্রতিবারই পাহাড় আমাকে নতুন কিছু না কিছু দেয়, আজ পর্যন্ত নিরাশ করেনি এই মেঘ সবুজের অরণ্য। এবারও আবার সে আমাকে চমকে দিলো, বার বার ভাবি এক পাহাড় অরণ্যের মাঝে আর কি-ই বা নতুন থাকতে পারে, আর কিই বা অবাক করার মতন থাকতে পারে! আমার সেই ধারণাকে বার বার ভূল প্রমাণ করে দেয় এইমেঘ-পাহাড়ের দেশ। তাই বার বার পাহাড়ের কাছে ছুটে আসি, তাই বার বার পাহাড় ভালোবাসি…