Categories
ফখরুল আবেদীন মিলন

দূরত্ব ঘোচানোর সবচেয়ে ভালো উপায়…

বেড়াতে গিয়ে সন্তানকে বেশ ভালো সময় দিতে পারেন। ছবি: সংগ্রহ

আজকাল এই নগরজীবনে এমন অনেক পরিবারই আছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। জিজ্ঞেস করলে সবাই বলবেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই চাকরি করছেন। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি যে আমরা সন্তানের কোন ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি?…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন

ছুটির দিন। ভোরে মেয়ে এসে ঢুকল আমার ঘরে।
‘বাবা, আমরা কি আজকে বেড়াতে যেতে পারি?’
‘না।’
‘ফুপির বাসায়?’
‘বললাম তো না। কেন বিরক্ত করছ?’
‘তাহলে কি ক্রিম অ্যান্ড ফাজে আইসক্রিম খেতে যেতে পারি?’
‘তুমি যাবে এ ঘর থেকে।’ ধমক লাগালাম।
মেয়ে চলে গেল নিজের ঘরে। ওর গোমড়ামুখটা দেখতে পাইনি। শুধু পাশের ঘর থেকে ওর গান শুনতে পাচ্ছি। ‘আমি বন্দী কারাগারে…’ গান শুনতে শুনতে আমিও পাশ ফিরে দ্বিতীয় দফা ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম। পাশে তাকিয়ে দেখে নিলাম স্ত্রীর অবস্থান। এত সব কথাবার্তার মধ্যেও দিব্যি ঘুম। ছুটির দিন বলে কথা!
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরি করি। রোজ সকালে হুড়মুড় করে বেরিয়ে পড়ি অফিসের পথে। ফিরি সেই রাতে। মেয়ে আমাকে ঘুমোতে দেখে স্কুলে যায়। স্ত্রী ও আমি ফিরে এসে প্রায় দিনই মেয়েকে ঘুমোতে দেখি। কেবল ছুটির একটি দিনই মেয়ে পায় আমাদের। ঘুরতে যাওয়ার বায়না ধরে ওই এক দিনই। সেটাও মেটাতে পারি না!
মেয়ে বড় হচ্ছে। বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন। আগের মতো অফিস থেকে ফিরলেই দৌড়ে কাছে আসে না। গলা ধরে এটা আনো, ওটা আনো বলে বায়না ধরে না। মাঝেমধ্যেই দেখি, মা আর মেয়ের মধ্যে ফিসফিস করে কথা হয়। আমি গেলেই সব চুপ। আমার আড়ালেই কিছু একটা হচ্ছে। আমি সব টের পাই। এ সময় বাবাদের একটু দূরেই থাকতে হয়। এই দূরত্ব বাড়তে থাকে প্রতিমুহূর্তে।
আমি বাবা, আমি কেন এমনটা হতে দেব? কেন নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখব?
আর এই দূরত্ব ঘোচানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো স্ত্রী-সন্তানসহ কোথাও বেরিয়ে পড়া। অন্ত

এই পরিবারের মতো ছুটি মিললেই যেতে পারেন ঘুরতে

ত দুটো দিন ঘুরে আসুন ঢাকার বাইরে থেকে। দেখবেন, কেমন ম্যাজিকের মতো কাজ হয়।
আজকাল এই নগরজীবনে এমন অনেক পরিবারই আছে, যেখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। জিজ্ঞেস করলে সবাই বলবেন, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই চাকরি করছেন। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি যে আমরা সন্তানের কোন ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছি? আজকাল আপনার-আমার ছেলেমেয়েরা বিকেলে মাঠে গিয়ে খেলে না। অথচ দেখবেন, অনেকেই ছেলেকে দামি ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিই। হাজার হাজার টাকা খরচ করে সাইকেল কিনে দেই। অথচ ছেলে বা মেয়েটাকে নিয়ে যে সাইকেল চালানো শেখাব, সে সময়টাই আমাদের কই? ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আপনার-আমার সন্তানেরা সময় কাটায় ফেসবুকে চ্যাট করে বা অনলাইন গেমস খেলে। একটা আলাদা ভার্চুয়াল জগতে তাদের বাস। আপনি হয়তো জানেনই না যে আপনার পিচ্চি ছেলেটা ‘ফ্যান্টম’ বা ‘ক্রেজি বয়’ নাম নিয়ে মাতিয়ে বেড়াচ্ছে সাইবার জগৎ। হয়তো জানেনই না আপনার আমাদের মেয়েটা ‘একাকী আমি’ বা ‘কল্পকথা’ নাম নিয়ে রাতভর চ্যাট করে যাচ্ছে আপনার বয়সী কোনো লোকের সঙ্গে।
জানি আপনি ব্যস্ত, আমি ব্যস্ত। একবার কি ভেবেছি, আপনার-আমার আদরের ধনটি এমন একটা জগৎ নিয়ে ব্যস্ত; সেই জগতে আপনি-আমি আমরা নিতান্তই অনাহূত। তাই এখনো সময় আছে। চলুন, বেরিয়ে পড়ি ছেলেমেয়েদের নিয়ে। পুরো পরিবার নিয়ে একান্তে কাটিয়ে আসি দুটো দিন। সকালের রোদ্দুর গায়ে লাগিয়ে বসে থাকি। বহুদিন পর সবাই মিলে রুম শেয়ার করি। সবাই মিলে আবার ভাগাভাগি করে খাই। শেষ কবে স্ত্রীর হাত ধরে হেঁটেছেন বলুন তো? শেষ কবে বলেছেন, ‘ভালোবাসি তোমায়’, শেষ কবে ছেলেকে বলেছেন, ‘আয় ব্যাটা, বুকে আয়!’ আপনি তো খেয়ালই করেননি যে মেয়ে সেই কবে কান ফুঁড়িয়েছে, সেই কানের ফুলটায় মেয়েকে কত সুন্দর লাগছে! মনে পড়ে, ছোট বেলায় মেয়ের চুলে ঝুঁটি করে দিতেন! সিঁথি সোজা না হওয়ায় স্ত্রীর বকাঝকা নাহয় আবারও খেলেন। বিশ্বাস করুন, এই অনুভূতি, এই মুহূর্তগুলো অমূল্য।
যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে পড়ছে প্রতিদিন। আপনার-আমার সন্তানেরা চাচা-চাচি বা দাদা-দাদির সান্নিধ্য আর পায় না। করপোরেট জীবনে ব্যস্ত মা-বাবার কাছেই ওদের সব আবদার, সব আহ্লাদ। এগুলো থেকে বঞ্চিত হতে হতে একসময় আবদার করাই ছেড়ে দেবে। আপনি-আমি এইচএসসি পাস করার পর ভেবেছি বিদেশ যাব লেখাপড়া করতে। তাও এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে এসেছি মা-বাবা ছাড়া কীভাবে থাকব ভেবে। আর আজকাল ক্লাস থ্রি-ফোরের ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করলেই দেখবেন ওরা অনেকেই বড় হয়ে বিদেশ গিয়ে পড়ালেখা করবে বলে জানাবে।
দয়া করে কেউ ওদের দোষ দেবেন না। মনে রাখবেন, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ওরা জানে বেশি। এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে ওরা পরিবার থেকে অবহেলাও পায় বেশি। আমাদের ব্যস্ততাই আমাদের দূরে রাখে সন্তানদের কাছ থেকে।
অনেক হয়েছে জ্ঞানের কথা। এবার চলুন পুরো পরিবার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। এই ঈদের ছুটিতেই নাহয় চলুন। পরিবারের সবাই মিলে নাহয় একটা রাত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে শুয়ে আকাশের তারা গুনলেন। নাহয় সিলেটের চা-বাগান থেকে দুই মুঠো চা-পাত ছিঁড়লেন। বান্দরবানের নীলগিরি পাহাড়ে বসে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় একবার তাকিয়ে দেখুন তো প্রিয় ছেলেমেয়ের মুখ। দেখবেন, আপনার আদরের সন্তানটিকে কেমন দেবশিশুর মতো লাগছে। এই অনুভূতির সমতুল্য কি কিছু আছে?