Categories
ফারুখ আহমেদ

জাদুকাটার যাত্রা শুরু

নীল-সবুজের নানা ছোঁয়া জাদুকাটার চারপাশে। ছবি: লেখক

ঝকঝকে আকাশে তুলোর মেঘ। পাশাপাশি হাত বাড়ানো দূরত্বে মেঘালয় পর্বতমালা আর জাদুকাটা নদী। বিশাল জলরাশি নিয়ে বয়ে চলা জাদুকাটায় মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখে চলি…লিখেছেন ফারুখ আহমেদ Red dot

বারিকটিলা। মাথার ওপর নীল আকাশ। নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ সবুজরঙা জলধারা নিয়ে একটি নদী। পাহাড়ি নদীগুলো খুব একটা বড় হয় না। ভুল ভাঙল নদীটির বুকে দৃষ্টি মেলে। নদীতে উথাল-পাথাল ঢেউ নেই কিন্তু নদীর বিশালতায় ঠিক তলিয়ে গেলাম যেন। হেমন্তেই নদীর যে অবস্থা তাতে ভাবতেই বিষম খেলাম, বর্ষায় এ নদীর কী হাল হবে!

নদীর নাম জাদুকাটা। জাদুকাটা নামের উত্স সন্ধান করে নদীর মতোই এর কূল-কিনারা পেলাম না। তবে জাদুকাটা নদীটি অসাধারণ। বারিকটিলার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো নদী দেখতে পাবেন। এখানে ঝকঝকে আকাশের সঙ্গে পুরো এলাকাটাই মনে হবে রঙিন ক্যানভাস। অসাধারণ স্বপ্নিল এক পরিবেশ। বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী একজন বললেন, অসম্ভব রূপবতী! পাশেরজনের জিজ্ঞাসা, রূপবতী, কিন্তু রূপবান নয় কেন! এবার আরেকজন ব্যাখ্যা দিলেন ‘নদীর প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে যেন জাদুর পরশ, সঙ্গে মায়ার খেলা। সুতরাং এ কখনো রূপবান হতেই পারে না। এ আমাদের অসম্ভব রূপবতী আর মায়াবতী জাদুকাটা।’ এরপর আর কোনো কথাই চলে না, কোনো কথা হলো না। সবাই তাঁর ব্যাখ্যা মেনে নিয়েই টিলার বাঁক ধরে নিচে নদীর দিকে পা বাড়ালেন।

হেমন্তের এক সকালে আমাদের জাদুকাটা যাত্রা শুরু হয়। এর আগে টেকেরঘাটে কয়লার ডিপোতে রাতযাপন শেষে লাকমাছড়া হয়ে আমরা চারটা মোটরবাইকে চেপে জাদুকাটার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। আগের দিন তাহিরপুর থেকে বজরায় চেপে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে টেকেরঘাটে ডেরা গেড়েছি। আমাদের বন্ধু তৌফিক যাবতীয় বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া আর চাঁদনিরাতে কয়লার ডিপোতে রাতযাপনের অসম্ভব সুন্দর গল্প আছে। সে গল্প অন্য দিন হবে। যাই হোক, পরের দিন আমরা লাকমাছড়া ঘুরে জাদুকাটার পথে নামি।

নীল-সবুজের নানা ছোঁয়া জাদুকাটার চারপাশে। ছবি: লেখক

লাকমাছড়া যেন আরেক জাফলং। পথিমধ্যে লাইমস্টোন লেকে কিছু সময় কাটিয়ে শুরু হয় আমাদের একটানা পথচলা। মোটরসাইকেল ছুটে চলেছে মেঘালয় পর্বতমালা ছুঁয়ে। চড়াইয়ের পথ তবু আমাদের বাহন খুব দ্রুতই এগিয়ে চলে। ঘুম ঘুম পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলতে দিনের বেলা গায়ে কেমন শীত শীত লাগছিল। এভাবেই একসময় সামনে পড়ে একটি উঁচু টিলা। মোটরসাইকেল যখন সে টিলার পাদদেশ বেয়ে ওপরে উঠছিল তখন মনে হচ্ছিল এই বুঝি উল্টে যাবে। জায়গাটির নাম বারিকটিলা। একটি গির্জা রয়েছে এখানে। চারদিকে সবুজ প্রকৃতি। পাশেই মেঘালয় পর্বতমালা আর চুনা পাথরের সৌন্দর্যের সঙ্গে আকাশে মেঘেদের লুকোচুরি আর বাতাসের দোল।

ঝকঝকে আকাশে তুলোর মেঘ। পাশাপাশি হাত বাড়ানো দূরত্বে মেঘালয় পর্বতমালা আর জাদুকাটা নদী। বিশাল জলরাশি নিয়ে বয়ে চলা জাদুকাটায় মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে দেখে চলি। কত মানুষ নদীতে, কত কত নৌকা। নদী থেকে পাথর তোলা হচ্ছে। এসব দেখে একসময় আমরা টিলার খাঁজ বেয়ে নেমে আসি নদীতে। তারপর যার যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ি। জলের তলে পাথরে ঘষা লেগে অনেকে আহত হলেও এমন ভালোলাগায় তাতে কেউই গা করেন না। একসময় আমাদের জাদুকাটার জল ছেড়ে উঠে আসতেই হয়। তখন নীলাকাশে গোধূলির ছোঁয়া। ওপারের বালিয়ারিতে শেষ বেলার সূর্যের ঝিকিমিকি দেখি। তারপর গুদারাঘাটে এসে যখন খেয়াযানে চড়ে বসি তখন পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়েছে।

জেনে নিন

জাদুকাটা নদী সুনামগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে অবস্থিত। একসঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘোরার প্রস্তুতি নিয়েই আপনাকে জাদুকাটার উদ্দেশে বের হতে হবে। ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস সার্ভিস রয়েছে। এনা, হানিফ, শ্যামলী, ইউনিকসহ অনেক বাস এই লাইনে চলে। অগ্রিম টিকিট কেটে নিন। সুনামগঞ্জ থাকার ব্যবস্থা মোটামুটি। এখানে দলবেঁধে যাওয়াই ভালো। সরাসরি জাদুকাটায় যেতে পারেন। আবার টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরেও জাদুকাটায় যাওয়া যায়। আমার পরামর্শ হবে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে টেকেরঘাট রাতযাপন।

টেকেরঘাটে হোটেলে থাকতে পারেন। থাকতে পারেন নৌকাতে। পরদিন লাকমাছড়া, লাইমস্টোন লেক ও টিলা ঘুরে মোটরসাইকেলে চলে যান বারিকটিলা। বারিকটিলা আর জাদুকাটা পাশাপাশি। টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে মনে ভালোলাগা তৈরি হবে। টেকেরঘাট থেকে জাদুকাটা যাওয়ার পথটুকু সে ভালোলাগার মাত্রা বাড়িয়ে দেবে বহুগুণ আর জাদুকাটা আপনাকে ভালো লাগার স্বপ্নময় জগতে পৌঁছে দেবে!