ছোটাছুটি

যে পাহাড়ের ওপর কোনো নীল আকাশ নেই

সময় পেলে সন্তানকে নিয়ে একটু বেরিয়ে আসতে পারেন। ছবি: লেখক

বেচারা তো তার এই ছোট্ট জীবনে কোনো দিন নিজের ছায়াই দেখেনি। রোদ কি জিনিস তাই তো সে জানে না। এই নগরে উঁচু ইমারতের ভিড়ে আজ শিশুরা আকাশ দেখে না, রোদ খেলা করে না তাদের বাড়ির বারান্দায়…লিখেছেন ফখরুল আবেদীন মিলন

কয়েক দিন আগে খুব সকালে মেয়ে এসে আমার ঘুম ভাঙ্গিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-বাবা, আজকে কি রাস্তায় গ্যাঞ্জাম হবে?
হুম
আমরা কি বেড়াতে যেতে পারি?
– না
– আইসক্রিম খেতে?
– না
– ফুপির বাসায়?
– না
– সারা দিন কি আমি ‘বন্দী কারাগারে’ গানটি গাইতে হবে?
– হু

মেয়ে মন খারাপ করে চলে গেল নিজের ঘরে, জোরে জোরে গাইতে লাগল ‘আমি বন্দী কারাগারে…।’ আর আমি গান শুনতে শুনতে গভীর আবেশে দ্বিতীয় দফা ঘুমে ঢলে পড়লাম।

দুপুরে মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখি পাহাড় আর নদীর ছবি আঁকতে আঁকতে ঘুমিয়ে গেছে। যে পাহাড়ের ওপর কোনো নীল আকাশ নেই, সেই আকাশে কোনো পাখি নেই। নদীর জলে কোনো নৌকা নেই। জলের রংটাও কেমন যেন অচেনা। মনে মনে এক অজানা আশঙ্কা পেয়ে বসে আমাকে। এ কেমন আকাশ আঁকছে আমার মেয়ে। তবে কি সে কোনো দিন নীল আকাশ দেখেনি? নীল আকাশে উড়ে বেড়ানো ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি দেখেনি? নদীর টলমলে জলে পালতোলা নৌকা দেখেনি? মনে পড়ে গেল এক বন্ধুর তিন বছর বয়সী শিশুপুত্রের কথা। শিশুটি গাড়ি থেকে নেমে স্কুলের গেট পর্যন্ত যেতে নিজের ছায়া দেখে ভয়ে কেঁদে উঠত, যেদিন সকালে আকাশ মেঘলা থাকে সেদিন সব ঠিকঠাক। শিশুর আর কি দোষ? বেচারা তো তার এই ছোট্ট জীবনে কোনো দিন নিজের ছায়াই দেখেনি। রোদ কি জিনিস তাই তো সে জানে না। এই নগরে উঁচু ইমারতের ভিড়ে আজ শিশুরা আকাশ দেখে না, রোদ খেলা করে না তাদের বাড়ির বারান্দায়।

একসময় বেড়াতে যাওয়া মানে নানা বা দাদাবাড়ি যাওয়া। আর ধারেকাছে বিনোদন বলতে শিশুপার্ক আর চিড়িয়াখানা। জীবনে প্রথম সমুদ্র দেখেছি এসএসসি পাস করার পর। এখন আর সে দিন নেই। দিন বদলেছে, শিশুরা এখন অনেক স্মার্ট। আমাদের সময় বেড়াতে নিয়ে না গেলে খানিকক্ষণ হাউমাউ করে কেঁদেকেটে আবার সব ভুলে যেতাম। আর এখন বাচ্চারা কিছুই ভোলে না। নিজেদের বিনোদন নিজেরাই খুঁজে নেয়, কখনো কখনো সেটা বিপদ ডেকে আনে।

তাই আসুন আপনার-আমার শিশুকে সুস্থ বিনোদন দিই। চলুন ওদের নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ি। এখনকার বাচ্চারা অনেক ব্যস্ত। ছুটি বলতে ফাইনাল পরীক্ষার পর মাস খানেক। এই ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে যান কক্সবাজার। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতটা যে বিশ্বের দীর্ঘতম তা কেবল ইন্টারনেট বা বইপত্রে পড়লে হবে? ছেড়ে দিন ওদের বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে, ভেজা বালু দিয়ে বানাক ওরা হাতিঘোড়া রাজপ্রাসাদ। সাগরের নোনাজলে ইচ্ছামতো হুটোপুটি করুক, দু-এক ঢোক লবণপানি না হয় খেল। প্রতিদিন তো আর খাবে না।

আরও খানিকটা এগিয়ে ওদের নিয়ে চলুন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। বঙ্গোপসাগরের স্বচ্ছ নীল জল কেটে কেটে যখন জাহাজ এগিয়ে যাবে দ্বীপের দিকে, নিজের সন্তানের মুখের দিকে একবার তাকান, দেখবেন আনন্দে কেমন চিক চিক করছে ওর কচি মুখটা।

কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বেড়ানো হলে একবার চলুন সুন্দরবন ঘুরে আসি, বাংলাদেশের আরেক গর্বের ধন রয়েলবেঙ্গল টাইগারের বাসস্থান। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলার গ্যালারিজুড়ে হাজারো শিশুকিশোর মুখে বাঘের ছবি এঁকে গায়ে বাঘের ছবি আঁকা গেঞ্জি পরে, হাতে বাঘের পুতুল নিয়ে ভিড় করে। নিজের কিশোর সন্তানকে বলুন ‘চলো, দেখে আসি আসল বাঘ’, ঢাকা থেকে অনেক টুর অপারেটর নিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবন ঘুরিয়ে আনতে। ঢুকে পড়ুন কোনো এক দলে।

ভোরে কুয়াশায় ঢাকা বনের জেগে ওঠা, গাছের অনুচ্চ ডালে বসে থাকা নিরীহ মাছরাঙার চোখের পলকে ছোঁ মেরে মাছ ধরা, নদীর পারে রোদ পোহানো কুমির, …সাদা বকের দলের অনায়াস উড়ে বেড়ানো, হরিণের দলের নজর বাঁচিয়ে ওদের আরও কাছে যাওয়া, নরম মাটিতে বাঘমামার পায়ের ছাপ দেখে গা ছমছম অনুভূতি তো আর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না।

এসবে যে কত আনন্দ, শিশুদের কত কিছু শেখা হয় তা আমি নিজেই বুঝেছি গত নভেম্বরে। আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গিয়েছিলাম সিলেট অঞ্চলে। সেখানে চলে যাই জাফলংয়ের দিকে। জাফলংয়ের স্বচ্ছ পানি, নিচে রকমারি পাথর দেখে আমার বাচ্চাদের চোখও নদীর পানির মতো চিকচিক করে ওঠে। লালাখালে নৌকায় তাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াই। সারি নদীর…জলে ভাসতে ভাসতে ওদের প্রকৃতি দেখাই। চা-বাগান দেখিয়ে আনি। মাধবকুণ্ড ঝরনা দেখাই।

শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন আর সিলেট অঞ্চল কেন? সন্তানদের ঘুরিয়ে আনুন বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল। ওরা দেখুক, জানুক, বাংলাদেশ বলতে কেবল ঢাকা শহরটাকেই বোঝায় না। মনে রাখবেন, ওরা যত বেশি দেশটা দেখবে, তত বেশি দেশটাকে ভালোবাসবে। যে দেশকে ভালোবাসে, সে কোনো অন্যায় করতে পারে না।

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook