ছোটাছুটি

ঘুরতে টাকা লাগে কে বলেছে!

IMG_1798---Cathedral-Sveta-

নিখরচায় বিশ্বভ্রমণ

বেড়াতে গেলে ট্যাঁকে জোর থাকতে হয়৷ এই খরচের গুঁতোতেই অনেকের স্বপ্নের বেড়াতে যাওয়া, স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়৷ কিন্তু এমন কি কোনও উপায় নেই যাতে এক পয়সাও খরচ না-করে পৌঁছে যাওয়া যায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়? দিব্যি ঘুরে বেড়ানো যায় গোটা বিশ্ব? আলবাত আছে৷ নিখরচায় বিশ্বভ্রমণ হল হিচহাইকিং৷ গমন লিফট নিয়ে, বাকিটা যত্রতত্র আর হট্টমন্দির৷

সত্তরের দশকে ক্ষ্যাপামিটা প্রথম শুরু করেছিল মার্কিন ছাত্ররা৷ তারাই ইউরোপে এসে কপর্দকশূন্য বহু মানুষকে দেশ দেখার এই পদ্ধতি শেখান৷ সেখান থেকে তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্থান, পাকিস্তান হয়ে ভারতেও পৌঁছে গিয়েছেন হিচহাইকাররা৷ তাঁদের অনেকে তো থাইল্যান্ড পর্যন্ত দেখে ফেলেছেন৷ জনপ্রিয় এই রাস্তার নাম তাঁরা দিয়েছেন ‘হিপ্পি ট্রেইল’৷

সেই সময় থেকে দুনিয়া বদলেছে, তার রাজনীতি বদলেছে, মানুষজন বদলেছে, কিন্ত্ত হিচহাইকাররা বদলাননি৷ তাঁরা এখনও রাস্তার পাশে বুড়ো আঙুল পিছনে হেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন৷ হ্যাঁ, এটাই বিশ্বজুড়ে হিচহাইকারদের প্রতীক৷ আর দয়ালু মানুষের কৃপায় একটি কড়িও না খসিয়ে আরামে পৌঁছে যান গন্তব্যে৷ সময়ের হিসেব করলে কিন্তু এমন ভ্রমণ হবে না৷

আমরাও হিচহাইকিং করেছি৷ জার্মানি থেকে এভাবেই চেক রিপাবলিক, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান হয়ে পৌঁছেছি ভারতে৷ তাতে অবশ্যি ৮ মাস সময় লেগেছে৷

তবে হ্যাঁ, আমরা তো আর সোজা রাস্তা ধরে আসিনি৷ দেশ দেখতে দেখতে এসেছি৷ তাদের সংস্কতি, সভ্যতাকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছি৷ সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রচুর কথা হয়েছে৷

তবে শুধুমাত্র বিনি মাগনায় বেড়ানোর মতলবে হিচহাইকিংয়ে বেরোলে ভুল করবেন৷ কারণ, আরও অনেক কিছু মিশে রয়েছে এই নেশায়৷ সব থেকে বড় হল মানুষের প্রতি এই আস্থা যে, সত্যিকারের সহানুভূতিশীল মানুষ এখনো পৃথিবীতে রয়েছে৷ যাঁরা সম্পূর্ণ অচেনা একজনকে নিজের গাড়িতে তুলে নিতে দু’বার ভাবেন না৷ আসলে যে কারও সঙ্গে মিশে যেতে পারার চরম পরীক্ষা এই হিচহাইকিং৷

গাড়িতে যেতে যেতে আপনি আপনার কথা বলবেন, তিনি তাঁর৷ আমাদের ক্ষেত্রে আমরা যে এলাকায় বেড়াতে গিয়েছি তাকে জানতে অসম্ভব সাহায্য করে হিচহাইকিং৷ এমনকী একটা যাত্রাতেই সেই জায়গার প্রতি মনোভাব পুরো বদলে যায়৷ খুলে যায় ভাবনার নতুন দিগন্ত৷

এছাড়া হিচহাইকিং পরিবেশের জন্যও ভালো৷ অন্যের সঙ্গে একই গাড়িতে যাওয়ায় বাড়তি দূষণ ছড়ায় না৷ যা গাড়ি, বাইক, বাস বা বিমানে ছড়াত৷ আপনি যে গাড়িতে উঠছেন তা তো নির্দিষ্ট ওই গন্তব্যে যেতই৷ ফলে বাড়তি কোনও দূষণের দায় আপনার ঘাড়ে বর্তাচ্ছে না৷ আরও বড় করে ভাবলে এতে যানজটও কমে৷

এদিক থেকে দেখলে হিচহাইকিং বেশ মজাদার ও প্রেরণার উত্স৷ তাই পরের বার আপনি যখন বেড়াতে যাবেন বা শহরের মধ্যেই ঘুরে বেড়াবেন হিচহাইকিং করে দেখতেই পারেন৷ সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর এই নেশা৷ আর কিছু ক্ষেত্রে তো আপনাকে বাস বা ট্রেনের থেকেও দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে৷ আমাদের সেরকমই অদ্ভত কিছু অভিজ্ঞতা অন্য সময়ের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম…

জার্মানি

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে যখন থেকে জার্মানি ছেড়েছি আমরা অন্তত ৩৪০টি লিফ্ট নিয়ে ৩৫,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছি৷ আমরা এমন জায়গা দেখেছি যেখানে হিচহাইকিং খুব সোজা৷ এর মধ্যে অন্যতম তুরস্ক৷ যেখানে আমাদের লিফ্ট পাওয়ার জন্য ১০ মিনিটের বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি৷ এমনকী লিফ্ট চাওয়ার আগেই লিফ্ট মিলেছে৷ যে কোনও ধরণের গাড়িতেই হিচহাইকিং সম্ভব৷ ছোট গাড়ি, ট্রাক৷ এমনকী ট্যাক্সি চালকরাও আমাদের লিফ্ট দিয়েছেন৷ আমি তো অ্যাম্বুলেন্সেও লিফ্ট পেয়েছি৷

আর্জেন্টিনা, তুরস্ক

তুরস্ক ছাড়া আর্জেন্তিনা, চিলি ও উরুগুয়েতেও হিচহাইকিং করা খুব সোজা৷ এই সব দেশে গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়ানোর থেকে রাস্তার পাশে হিচহাইকিংয়ের জন্য দাঁড়ালে দ্রুত গাড়ি মেলে৷ আসলে এসব দেশে রেল ব্যবস্থা সুগঠিত নয়৷ ফলে সমস্ত পণ্যই পরিবহন হয় সড়কপথে৷ তেমন হলে ট্রাক ড্রাইভারের পাশে আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাটাতে হতে পারে৷ আমাদের সব থেকে দীর্ঘ সফর ছিল উরুগুয়ে থেকে ট্রাকে আর্জেন্তিনা-চিলির সীমান্ত শহর মেনডোজ পর্যন্ত৷

ইরান ও পাকিস্তান

তবে এমন জায়গাও রয়েছে যেখানে মানুষ হিচহাইকিংয়ের ব্যাপারে কিছুই জানে না৷ মানুষ বুঝতে পারে না আসলে আমরা কী করছি৷ কিন্ত্ত যখন তারা ফাঁকা রাস্তার পাশে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন৷ জিজ্ঞাসা করেন, কোনও বিপদ হয়েছে কি না৷ কিংবা কিছু চাই কি না মানুষ যত্নশীল৷ ইরান ও পাকিস্তানের মানুষকে বিনা পয়সায় বিশ্বভ্রমণের এই পদ্ধতি বোঝাতে পারিনি৷ তাই বলে আমাদের সেই দেশে ঘুরতে কোনও সমস্যা হয়নি৷

ভারত

যেখানে মানুষের হিচহাইকিং সম্পর্কে ধারণা নেই, সেখানে বোঝাতে অনেক সময় গিয়েছে৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি৷ বিশেষ করে ভারতে, যেখানে আমাদের এই ভ্রমণ রহস্যময় মনে হয়েছে মানুষের৷ কিন্ত্ত তার পরেও আমরা সব জায়গাতেই লিফ্ট পেয়েছি৷ যখনই কোনও গাড়িতে উঠেছি চালক সবার আগে সতর্ক করেছেন, ‘এবার লিফ্ট পেয়েছ ভাল কথা, কিন্ত্ত ভবিষ্যতে আশা কোরো না৷ ভারতে লিফ্ট পাওয়া অসম্ভব৷’ যদিও ততক্ষণে তাঁরা হিচহাইকিংয়ের অংশ হয়ে উঠেছেন৷ আর যদি একজন আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন তাহলে সেটা দু’জন বা তিন জন হতে কতক্ষণ?

ভারতে হিচহাইকিং করতে গিয়ে সব থেকে আলাদা যে জিনিসটা দেখেছি তা হল ভিড়৷ হিচহাইকারদের জন্য ফাঁকা শুনশান জায়গা সব থেকে সুবিধাজনক৷ সাধারণ ভাবে ফাঁকা দীর্ঘ সোজা রাস্তায় লিফ্ট সহজে মেলে৷ চালকরা আমাদের অনেক দূর থেকে দেখতে পান৷ ফলে বুঝতে সময় পান যে আমরা আসলে কী চাইছি৷ ভারতে তেমন জায়গা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর৷ শহর, শহরতলি এমনকী গ্রামেও সব সময় সব জায়গায় মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ তারা খুবই বন্ধুত্বপ্রবণ, কিন্ত্ত তার থেকেও বেশি কৌতুহলি৷ তাঁরা আমাদের দাঁড় করিয়ে অনেকরকম প্রশ্ন করতে শুরু করেন৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই চারদিকে ভিড় জমে যায়৷ ফলে চালকরা আমাদের দেখতে পান না৷

তাঁদের সেখান থেকে সরাতে কিছুটা সময় লাগে৷ অথবা আমাদেরই সরে যেতে হয়৷ কিন্ত্ত তখনও ভিড় পিছু নেয়৷ কিন্ত্ত অধিকাংশ সময়ই ভিড় আমাদের ঘিরে ধরার আগে বরাতজোরে লিফ্ট পেয়ে যাই৷ ফলে সমস্যা হয় না৷ তবে ভারতের মতো দেশে, যেখানে হিচহাইকিং ব্যাপারটা কেউ জানেই না, সেখানেও পথে থাকা প্রতিটি মানুষ আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন৷

আমরা ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকেছিলাম৷ সেখান থেকে আমরা জম্মু-কাশ্মীরে যাই৷ শ্রীনগর থেকে লেহ্, হিমালয়ের অখ্যাত শৈলশহরগুলি ঘুরে দেখেছি৷ গিয়েছি স্পিতি, কিন্নরের মতে হিমাচলের অখ্যাত উপত্যকায়৷ সেখান থেকে গঙ্গোত্রী ও ঋষিকেশেসেখান থেকে আগ্রা, বারাণসী, তার পর নেপাল৷ নেপাল থেকে ফিরে দিল্লি গিয়েছি৷ রাজস্থান ও গুজরাট ঘুরেছি৷ সেখান থেকে মুম্বই, গোয়া, কর্ণাটক ও কেরালা৷ তার পর তামিলনাড়ু৷ ভারতের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণতম অংশ কন্যাকুমারী৷ সেখান থেকে মাদুরাই ও পুদুচেরির লিফ্ট পেয়েছি৷ ধীরে ধীরে পৌঁছেছি কলকাতা৷ আর এই গোটা সফরে গাড়িভাড়া বাবদ আমাদের একটা পয়সাও খরচ হয়নি৷ বদলে চালকদের সঙ্গে আমরা আমাদের পথের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়েছি৷

হিচহাইকিংয়ের সহজ পাঠ

পরিচ্ছন্ন থাকুন

আপনার পরিচ্ছন্নতা দ্রুত লিফ্ট পেতে বেশ সাহায্য করে৷ দেখে যেন আপনাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মনে হয়৷ সবাই তার গাড়িকে ভালবাসে৷ তাই কেউ অপরিচ্ছন্ন মানুষকে গাড়িতে তুলতে চায় না৷

ধৈর্য ধরুন

নিজেকে ধৈর্যশীল করে তোলার জন্য হিচহাইকিং খুব কার্যকরী৷ লিফ্ট পাওয়ার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হতে পারে কেউ বলতে পারে না৷ কয়েক মিনিটে কপাল খুলতে পারে, আবার কয়েক দিনও অপেক্ষা করতে হতে পারে৷

বিনয়ী ও বন্ধুত্বপূর্ণ হোন

মানুষ লিফ্ট দিয়ে আপনার উপকার করছে৷ তাই তাঁদের সঙ্গে কোনও দুর্ব্যবহার করবেন না৷ সারা দিন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে আপনার ক্লান্তির কোনও প্রভাব যেন তাঁদের ওপর না পড়ে৷

মজাদার হোন

সাধারণত মানুষ লিফ্ট দেয় কারণ একা গাড়ি চালাতে তাদের একঘেয়ে লাগে৷ তাঁরা সফরকালে একটু মজা করতে চায়৷ ফলে তাঁদের গল্প বলুন, মশকরা করুন, হাসুন, প্রশ্ন করুন৷ অল্পসল্প কথাও বলতে পারেন৷ গাইতে পারলে গান গেয়ে শোনান৷

শহরের বাইরে যান

শহরের ভিতর থেকে লিফ্ট পাওয়া খুব কঠিন৷ তেমন রাস্তায় অপেক্ষা করুন যেটা আপনার গন্তব্যের দিকে গিয়েছে৷ হাইওয়ের টোল বুথ লিফ্টের জন্য অপেক্ষা করার আদর্শ জায়গা৷ এখানে গাড়ি আস্তে চলে৷ ফলে চালকরা আপনাকে অনেক্ষণ ধরে খেয়াল করতে পারবেন৷ গাড়ি দাঁড় করানোর জন্য সেখানে যথেষ্ট জায়গাও থাকে৷

পথে বেরোনোর আগে নিজেকে প্রস্ত্তত করুন

কোথায় যাচ্ছেন না-জেনে বাড়ি থেকে বেরোবেন না৷ কোন রাস্তা ধরবেন আগে থেকে ঠিক করে রাখুন৷ কোথা থেকে হিচহাইকিং শুরু করবেন তাও নির্দিষ্ট করুন৷ তাড়াতাড়ি লিফ্ট পেতে একটা বোর্ডে গন্তব্য লিখে উঁচু করে ধরে থাকুন৷ এতে সেই গন্তব্যে যে চালকরা যাচ্ছেন তাঁরা প্রভাবিত হবেন৷

মানুষের সঙ্গে কথা বলুন

ফাঁকা রাস্তার পাশে দাঁড়ানোর থেকে পেট্রল পাম্প বা রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়ানো ভাল৷ কারণ সেখানে কথা বলার জন্য অনেকটা সময় মেলে৷ লিফ্ট দেওয়া নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার জন্য চালকরা বেশ কিছুটা সময় পান৷

নিজের মনের কথা শুনুন, সাধারণ বোধকে কাজে লাগান

আপনাকে লিফ্ট দেওয়ার জন্য যারা দাঁড়াচ্ছেন তাঁদের সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না৷ ফলে গাড়িতে বসার আগে চালককে ভাল করে জেনে বুঝে নিন৷ তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলুন৷ বোঝার চেষ্টা করুন তিনি সব সত্যি বলছেন কি না৷

সুরক্ষিত থাকুন

যে গাড়িতে উঠেছেন, সঙ্গে সঙ্গে তার নম্বর বন্ধু ও পরিজনদের এসএমএস করে দিন৷ কাউকে ফোন করে জানানযে আপনি রওনা দিয়েছেন৷ গন্তব্যে কাউকে ফোন করে একই কথা বলুন৷

চাপ নেবেন না

যদি হিচহাইকিং ব্যাপারটা নিতে না-পারেন তাহলে করবেন না৷ ভয়ে ভয়ে বেড়ানোর থেকে খারাপ কিছু হতে পারে না৷ তাতে আপনি ও গাড়িচালক দুজনেরই সমস্যা হবে৷ চালক এটা বুঝবেন যে আপনার কিছু একটা হয়েছে কিন্ত্ত কী হয়েছে তা বুঝতে পারবেন না৷ ফলে তিনিও চিন্তায় পড়ে যাবেন৷

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook