ছোটাছুটি

জল – পাথরের দেশে…

 

বাংলাদেশের স্বর্গ বলে স্বীকৃত বান্দরবানে রয়েছে পানি আর পাথরের এক জাদুকরি শীতল খনি। যার যাদুর টান অগ্রাহ্য করা কষ্টকর। এই গল্পটা পাহাড়কন্যা এই বান্দরবনের বুকে অবিরাম ছুটে চলা দুষ্টু এক খেয়ালী নদ সাঙ্গুর তীরে গড়ে উঠা জল-পাথরের দেশ “তিন্দু”-কে নিয়ে।

তিন্দুর পথে যাত্রা...

তিন্দুর পথে যাত্রা…

বান্দরবানের থানচি থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় করে ২ ঘন্টা ২০ মিনিট গেলেই যে যায়গাটা আসবে তার নাম তিন্দু। তিন্দু সম্পর্কে একটা বিশাল বই লিখলেও এর সৌন্দর্য্যরে ছিঁটেফোঁটাও তুলে ধরা সম্ভব না। শুধু এতোটুকু বলি আকাশ-কুয়াশা-মেঘ-নদী-পাথর-পাহাড়-ঝর্ণা-বন-নীল সবুজ পানি আর রহস্য-রোমঞ্চ-ভয় সব যদি একবারে পেতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন তিন্দু।

মেঘ কুয়াশার তিন্দু...

মেঘ কুয়াশার তিন্দু…

সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয় তখন নিজেকে বারবার ধন্যবাদ দিতে হয় এই দেশটাতে জন্মাবার জন্য। মেঘ-কুয়াশার দেশ তিন্দুর সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে এখানে নৌকায় চড়ে মেঘের উপরে যাওয়া যায়, সাদাটে মেঘের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চললেই জামা মাথা ভিজে যায়। এখানে শক্ত কঠিন পাথরকে সারাক্ষণই বুকে নিয়ে লক্ষ্য ছাড়া দৌড়ে বেড়ায় স্বচ্ছ পানির ঢল।

বড় পাথরের পথে যাত্রা...

বড় পাথরের পথে যাত্রা…

নুড়ি পাথরে ছলাৎ ছলাৎ হাঁটতে হাঁটতেই ইচ্ছে করে হাঁটু পানিতে টুপ করে একটা ডুব দিয়ে হাপুস করে খেয়ে নেই পুরো একমুখ টলটলে পানি। পুরো বান্দরবানে পাহাড়ে পাহাড়ে লাইফ জ্যাকেট পড়ে ঘুরে বেড়ানো জুনায়েদ আজীম চৌধুরী পানি পেয়েই নৌকা থেকে ঝপাং করে লাফ দিয়েছে হাঁটু সমান জলে, মচকানো পা নিয়ে খোঁড়াতে থাকা আরমান ভাই এই সৌন্দর্য্য দেখে উদাস হয়ে পাথরে ঘুমিয়ে পড়ে, তাকে ঠেলে সরায় এমন সাধ্য কার! পাহাড়ের মায়াবী টানে সেই রংপুর থেকে ছুটে এসেছে নাসিরুল আলম মন্ডল, তার না ঘুমানো লাল টকটকে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছে প্রতিটি পাহাড়ি মুহূর্ত। আলুর দাম নাকি কমেছে! এই খবর পেয়ে হাসান ভাই থানচি থেকে ৫ কেজি গোলআলু কিনে এনেছে, আমাদের নাকি আলুপোড়া খাওয়াবেন! সাঙ্গুর জলে পা রেখে সবচাইতে শান্ত মিরানবাপ্পীও মাছের ঝাঁকের সাথে হুড়মুড় করে দৌড়ে বেড়িয়েছে পাথরের বাগানে। পিচ্ছিল পাথরে একবারও না পিছলে দিনের মধ্যে ১৬বার করে গোসল করেছে জীবনে প্রথমবারের মতন বান্দরবান যাওয়া ফাহাদ ভাই, আমরা তাকালেই সবচাইতে মায়াময় হাসিটি দিয়ে বলেন “ভাই, পানি এত আরামের যে এইখানেই সারাদিন ডুইবা থাকতে মন চায়, আজকে আর ভাত খামুনা, অনেকগুলা পানি খাইছি এতক্ষণ ধইরা”! আর ছিলো শাহেদ খাঁ নামক এক পিস। জীবনে প্রথম পাহাড় দেখা এই উচ্ছল ছেলেটা যা দেখে তাতেই “ওয়াও”! বলে দৌড়ে যায়। তাকে বলি শাহেদ, এই পাথর থেকে লাফ দিতে পারবা ? সে “ওয়াও” কি সুন্দর! বলে অবলীলায় ২৫ ফুট উপরের পাথর থেকে অচেনা পানিতে লাফিয়ে পড়ে। তাকে বলি শাহেদ, এই পাথরটা কি সুন্দর, তাইনা ? সে “ওয়াও”! বলে পরের আধাঘন্টা ঐ পাথরের ছবি তোলে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শাহেদই মনে হয় একমাত্র ছেলে যে একদিনে বান্দরবানে ৬৪ জিবি মেমরির ছবি তুলেছে। সবাই বলেন “ওয়াও”!!

কুয়াশা ভেজা তিন্দু...

কুয়াশা ভেজা তিন্দু…

তিন্দুর দুই পাশ দিয়ে চলে গেছে দুটো ঝিড়িপথ, সারাদিন সেখান থেকে কলকল করে ছুটে আসছে পাহাড়গলা স্বচ্ছ পানি। এই সৌন্দর্য্য অবর্ণনীয়! পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশীকাঁথা তৈরি করেছে সেটা পুরোপুরিই দোদুল্যমান, কোথাও তার এক চিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃনতা। তিন্দুপাড়ের পাথুরে বীচটা এখানে যোগ করেছে নতুন একটা মাত্রা। লক্ষ লক্ষ অসমান পাথর মিলে তৈরি করেছে অমসৃন সমান একটা পায়ে চলা পথের, খালি পায়ে তীব্র ব্যাথা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথটা শেষ হলেই মন খারাপ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে এখানেই কাটিয়ে দেই আরো একটা বসন্ত।

বড়পাথরের নীলাভ পানি...

বড়পাথরের নীলাভ পানি…

 বান্দরবান কণ্যা তিন্দুকে ফেলে সাঙ্গু নদীর প্রকৃতিকে দুচোখে গিলতে গিলতে আমরা যখন আরো উপরের দিকে এগুতে থাকলাম তখন মিনিটে মিনিটে বদলে যেতে থাকলো পানির নিচের পাথুরে জগতটা, ছোট ছোট পাথরগুলো যেন আড়মোড়া ভেঙ্গে জেগে উঠতে লাগলো, উঠতে উঠতে নদীর বুক ফুঁড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেলো তাদের মাথা।

তিন্দু নৌকা ঘাট...

তিন্দু নৌকা ঘাট…

যায়গাটার নাম “বড় পাথর”। এখানে এসে নদীটা হয়ে গেছে সিঁড়ির মতন, এখানে পায়ের পাতা সমান পানিতে নেমে ঠেলেঠুলে নৌকাকে উঠাতে হয় উপরের দিকে, সেখান থেকে আরো উপরে একেবারে মেঘের কাছাকাছি। এখানে পাথর আর পানি মিলে ভরদুপরে তৈরি করে আমেজী রংধনুর। উত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে থাকা সেই রংধনুগুলোকে নিজের কোলে আশ্রয় দেয় নদীর পাড় জুড়ে মাথা নিচু করে ঝুলতে থাকা গাছের সবুজ পাতারা। এই যায়গাটা বান্দরবানের আর সব যায়গা থেকে আলাদা, এখানে সূর্যোদয় দেখতে হয় ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে, এখানে সূর্যাস্ত দেখতে হয় পানির চোখে চোখ রেখে, এখানে দিনের আলোতে বেড়াতে হয় রাতের আাঁধারকে সঙ্গে নিয়ে।

বড় পাথর এলাকা...

বড় পাথর এলাকা…

 পানি আর পাথরের এক সাদা-কালো জাদুঘর গড়ে উঠেছে এই তিন্দুকে ঘিরে। এখানে পাহাড়গলা পানিতে পা ডুবিয়ে চলতি পথের নতুন নতুন মাছের সাথে সারাদিন আড্ডা দিলেও ক্লান্তির ঘাম ঝরবেনা কানের লতি বেয়ে, এখানে ঘোলাটে মেঘের ভিড়ে সারাক্ষণ ভিজতে থাকলেও এতোটুকু ময়লা লাগবেনা গায়ে। জল-পাথরের আড্ডা জমে এখানে। এটা মেঘের দেশ, এটা কুয়াশার দেশ, এটা পাথুরে পানির দেশ, এটা তিন্দু – মেঘ-কুয়াশার তিন্দু।

কুয়াশা ভেজা তিন্দুর সকাল...

কুয়াশা ভেজা তিন্দুর সকাল…

 যেভাবে যাবেনঃ

তিন্দুতে যেতে হলে আপনাকে সবার আগে পৌঁছাতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে বাস বা চাঁন্দের গাড়িতে করে নীলগিরি পেরিয়ে চলে যাবেন ৭৯ কিলোমিটার দূরের স্বর্গদরজা থানচিতে।

বয়ে চলছে খরস্রোতা সাঙ্গু...

বয়ে চলছে খরস্রোতা সাঙ্গু…

থানচিতে নেমে বিজিবি-এর অনুমতি নিয়ে একটা ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে ঢুকে যাবেন স্বর্গের ভেতরে। এখান থেকেই মূলত মুগ্ধতার শুরু। “ওয়াও,ওয়াও” করতে করতে এরপরের অধ্যায়টুকু লিখবেন আপনি নিজেই। আর একটা কথা – সাথে করে অবশ্যই আলু নিয়ে যাবেন, পূর্ণিমা রাতে পাথুরে নদীর পাড়ে বসে কুয়াশা মোড়ানো আগুন ছোঁয়া পোড়া আলুর যে মায়াবী গন্ধ  আয়েশী বাতাসে ভর করে এ পাহাড় থেকে ও পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবে সেই আমেজ আর হাজার ফুলের মধ্যেও খুঁজে পাবেন না।

থানচি নৌকা ঘাট...

থানচি নৌকা ঘাট…

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail

You might also like

Facebook