ছোটাছুটি

পাথুরে নদীর পাড়ে…

জল-পাথরের দেশে…

 

 পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশিকাঁথা তৈরি করেছে, কোথাও তার একচিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃণতা …লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

আকাশ-কুয়াশা-মেঘ-নদী-পাথর-পাহাড়-ঝরনা-বন-নীল সবুজ পানি আর রহস্য-রোমাঞ্চ-ভয়—সব যদি একবারে পেতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসুন তিন্দু। সকালে ঘরের ভেতরে ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে যখন দরজা খুঁজে বের করতে হয় তখন নিজেকে বারবার ধন্যবাদ দিতে হয় এই দেশে জন্মানোর জন্য।
বান্দরবানের থানচি থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট গেলেই পৌঁছে যাবেন তিন্দু। তিন্দু সম্পর্কে একটা বিশাল বই লিখলেও এর সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটাও তুলে ধরা সম্ভব না। শুধু এতটুকু বলি, মেঘ-কুয়াশার দেশ তিন্দুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষাকালে এখানে নৌকায় চড়ে মেঘের ওপরে যাওয়া যায়, সাদাটে মেঘের ভেতর দিয়ে কিছুক্ষণ চললেই মাথা ভিজে যায়। এখানে শক্ত কঠিন পাথরকে সারাক্ষণই বুকে নিয়ে লক্ষ্য ছাড়া দৌড়ে বেড়ায় স্বচ্ছ পানির ঢল। নুড়ি পাথরে ছলাৎ ছলাৎ হাঁটতে হাঁটতেই ইচ্ছে করে হাঁটুপানিতে টুপ করে একটা ডুব দিয়ে হাপুস করে খেয়ে নিই পুরো একমুখ টলটলে পানি।
এবার আমাদের তিন্দু অভিযানে দলটা ছিল বিচিত্র। পুরো বান্দরবানে পাহাড়ে পাহাড়ে লাইফ জ্যাকেট পরে ঘুরে বেড়ানো জুনায়েদ আজীম চৌধুরী পানি পেয়েই নৌকা থেকে ঝপাং করে লাফ দিয়েছেন হাঁটুসমান জলে। পাহাড়ের মায়াবী টানে সেই রংপুর থেকে ছুটে এসেছেন নাসিরুল আলম মণ্ডল, তাঁর না ঘুমানো লাল টকটকে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন প্রতিটি পা

তিন্দুর পথে সাঙ্গু নদীতে এমন পাথরের দেখা মিলবে। ছবি: লেখক

হাড়ি মুহূর্ত। আলুর দাম নাকি কমেছে! এই খবর পেয়ে হাসান ভাই থানচি থেকে পাঁচ কেজি গোলআলু কিনে এনেছেন, আমাদের আলুপোড়া খাওয়াবেন। সাঙ্গুর জলে পা রেখে সবচেয়ে শান্ত ছেলে মিরান বাপ্পীও মাছের ঝাঁকের সঙ্গে হুড়মুড় করে দৌড়ে বেড়িয়েছেন পাথরের বাগানে। পিচ্ছিল পাথরে একবারও না পিছলে দিনের মধ্যে ১৬ বার করে গোসল করেছেন ফাহাদ ভাই। আর ছিলেন শাহেদ খাঁ। জীবনে প্রথম পাহাড় দেখা এই উচ্ছল ছেলেটা যা দেখেন তাতেই ‘ওয়াও’ বলে দৌড়ে যান। যে এক দিনে বান্দরবানে ৬৪ জিবি মেমোরির ছবি তুলেছেন।
তিন্দুর দুই পাশ দিয়ে চলে গেছে দুটো ঝিরিপথ, সারা দিন সেখান থেকে কলকল করে ছুটে আসছে পাহাড়গলা স্বচ্ছ পানি। পানি আর পাথর মিলে এখানে যে নকশিকাঁথা তৈরি করেছে, কোথাও তার একচিলতে ছিদ্র নেই, নেই অমসৃণতা। তিন্দুপাড়ের পাথুরে সৈকত এখানে যোগ করেছে নতুন একটা মাত্রা। লাখ লাখ অসমান পাথর মিলে তৈরি করেছে অমসৃণ সমান একটা পায়ে চলা পথের, হাঁটতে হাঁটতে পথটা শেষ হলেই মন খারাপ হয়ে যায়, ইচ্ছে করে এখানেই কাটিয়ে দিই আরও একটা বসন্ত।

বান্দরবান-কন্যা তিন্দুকে ফেলে আমরা যখন আরও ওপরের দিকে এগোতে থাকলাম তখন মিনিটে মিনিটে বদলে যেতে থাকল পানির নিচের পাথুরে জগৎটা, ছোট ছোট পাথর যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে লাগল, উঠতে উঠতে নদীর বুক ফুঁড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল তাদের মাথা। জায়গাটার নাম ‘বড় পাথর’। এখানে এসে নদীটা হয়ে গেছে সিঁড়ির মতন, এখানে পায়ের পাতাসমান পানিতে নেমে ঠেলেঠুলে নৌকাকে ওঠাতে হয় উপরের দিকে, সেখান থেকে আরও ওপরে একেবারে মেঘের কাছাকাছি। এখানে পাথর আর পানি মিলে ভরদুপুরে তৈরি করে রংধনুর। উত্তুরে হাওয়ায় ভাসতে থাকা সেই রংধনুগুলোকে নিজের কোলে আশ্রয় দেয় নদীর পাড়জুড়ে ঝুলতে থাকা গাছের সবুজ পাতারা। এখানে সূর্যোদয় দেখতে হয় ফুঁ দিয়ে মেঘ সরিয়ে, এখানে সূর্যাস্ত দেখতে হয় পানির চোখে চোখ রেখে।
পানি আর পাথরের এক সাদা-কালো জাদুঘর গড়ে উঠেছে এই তিন্দুকে ঘিরে। এখানে পাহাড়গলা পানিতে পা ডুবিয়ে চলতি পথের নতুন নতুন মাছের সঙ্গে সারা দিন আড্ডা দিলেও ক্লান্তির ঘাম ঝরবে না কানের লতি বেয়ে, এখানে ঘোলাটে মেঘের ভিড়ে সারাক্ষণ ভিজতে থাকলেও এতটুকু ময়লা লাগবে না গায়ে। জল-পাথরের আড্ডা জমে এখানে। এটা মেঘের দেশ, এটা কুয়াশার দেশ, এটা পাথুরে পানির দেশ, এটা তিন্দু, মেঘ-কুয়াশার তিন্দু।

যেভাবে যাবেন
তিন্দুতে যেতে হলে আপনাকে সবার আগে পৌঁছাতে হবে বান্দরবান। বান্দরবান থেকে বাস বা চান্দের গাড়িতে করে নীলগিরি পেরিয়ে চলে যাবেন ৭৯ কিলোমিটার দূরের থানচিতে। থানচিতে নেমে বিজিবির অনুমতি নিয়ে একটা ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে ঢুকে যাবেন ভূস্বর্গের ভেতরে। এখান থেকেই মূলত মুগ্ধতার শুরু। ‘ওয়াও, ওয়াও’ করতে করতে এরপরের অধ্যায়টুকু লিখবেন আপনি নিজেই। আর একটা কথা, সঙ্গে করে অবশ্যই আলু নিয়ে যাবেন, পূর্ণিমা রাতে পাথুরে নদীর পাড়ে বসে পোড়া আলু খাওয়ার মজা আর কোথাও কি পাবেন?

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook