ছোটাছুটি

যেখানে পাহাড় এসে থেমে গেছে

মণিপুরি ঘাট পার হতেই সামনের দৃশ্যপট মুহূর্তে পাল্টে গেল। পানি থেকে জেগে ওঠা ডাঙা বাঁক খেয়ে উঠে গেছে দূরের পাহাড়ের দেয়ালে, যত দূর চোখ যায়, সবুজের মখমল…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

মেঘালয়ের পাহাড় যেখানে এসে থেমে গেছে, ঠিক সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে আশ্চর্য এক জলবাগান, এলোমেলো সাদা মেঘের দল পাহাড়ে ঠোকর খেতে খেতে এসে ঝপ করে গা এলিয়ে দেয় এই জলের বিছানায়। এখানে নৌকা চলে জলের উচ্ছ্বাসে। সাতরঙা রংধনুর সবটুকু খুশি গায়ে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা এই অপরূপ জায়গাটার নাম টাঙ্গুয়ার হাওর।
এবারে হাওরে গিয়েছিলাম নওয়াজেশ নলেজ সেন্টার থেকে। আমার ফেসবুক বন্ধু সুনামগঞ্জ জেলার সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জেবুন নাহার আমাদের সব ব্যবস্থা করে দিলেন, হাসন রাজার বাড়ির ঘাট থেকে একটা ট্রলার নিয়ে রওনা দিলাম টাঙ্গুয়া হাওরের উদ্দেশে।

নীল-সবুজ জলে আনন্দের অবগাহন

মণিপুরি ঘাট পার হতেই সামনের দৃশ্যপট মুহূর্তে পাল্টে গেল। পানি থেকে জেগে ওঠা ডাঙা বাঁক খেয়ে উঠে গেছে দূরের পাহাড়ের দেয়ালে, যত দূর চোখ যায়, সবুজের মখমল। নৌকার পাশ দিয়ে বয়সী চোখজোড়া নিয়ে নিচে তাকালাম—নীলচে পানি, পানির নিচে শেওলার অস্তিত্ব পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, নলখাগড়ার ডগা ভেসে ভেসে ঢেউয়ের দোলায় নাচছে হাওরজুড়ে। তার মাঝ দিয়েই মহাসড়কে গাড়ি চালানোর মতো করে শাঁই শাঁই করে ছুটে চলছি আমরা হাওরের উদ্দেশে। যাওয়ার পথে মাছের ঘের পড়ল একটা।
ধীরে ধীরে রং বদলাচ্ছে পানির। নীল থেকে কালো, কালো থেকে সবুজ, আবার গাঢ় নীল। টানা ৬ ঘণ্টা পর আমরা পৌঁছলাম টাঙ্গুয়া হাওরের সবচেয়ে স্বচ্ছ অংশে, এখানে বর্ষা মৌসুমে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে পানি এসে ভরে যায় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা, শুকনো সতেজ ধানখেতগুলো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে জলের আধারে। এ সময়ে অগণিত হাওর আর বাঁওড় সব এক হয়ে যায়, পানিতে পানিতে মিলেমিশে জন্ম নেয় অসাধারণ এক স্বচ্ছ জলের আধার।
বাংলাদেশের শেষ সীমান্ত টেকেরঘাটের এই অংশে হাওর দেখে মাথা খারাপ অবস্থা। জলের নিচে যেন জলবাগান—এক হাত লতা গুল্ম থেকে শুরু করে ১১ হাত লম্বা বিশাল গাছও ডুবে আছে, তার পাতায় পাতায় আবার রোদের ঝিলিক!
অচেনা এক পৃথিবী মনে হয় যখন দেখি কোনো রকম ভেলা বা জাহাজ ছাড়াই থইথই পানিতে পইপই ভাসছে ছোট ছোট গ্রাম। পুরো হাওর গাছের সীমানা দিয়ে ঘেরা। সেই গাছও মাথাটুকু বাদে ডুবে আছে নীলের সমুদ্রে।

জলবাগানে ঘোরাঘুরি করার লোভ সামলানো অসম্ভব। গায়ে লাইফ জ্যাকেট চড়িয়ে সবাই একের পর এক টুপ টুপ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা ডুবসাঁতার নিয়ে চলে গেছি ঘন জঙ্গলে, পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে আয়েশি লতা, হাতে মুখে এসে লাগছে সবুজের রেনু, আর মাথার ওপরে কালো আলকাতরা মাখা নৌকার তলদেশ। সবকিছু ছাড়িয়ে চোখে এসে লাগল সূর্যের ঠান্ডা আলো!
সেখান থেকে উঠে আমরা বিস্কিট চিবোতে চিবোতে যখন পৌঁছলাম শাপলা ফুলের বাগানে, তখন দিগন্তে সূর্যটা চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে, তার চোখে ঘুমের আনাগোনা। মেঘের পর্দায় সে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা পৌঁছে গেলাম টেকেরঘাটে।

কীভাবে যাবেন

শ্যামলী পরিবহনে ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ পর্যন্ত ৫৫০ টাকা ভাড়া নেবে। সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সাহেববাজার ঘাট পর্যন্ত রিকশায়। সেখান থেকে টাঙ্গুয়া হাওরের উদ্দেশে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া করবেন। প্রতিদিনের জন্য ভাড়া নেবে চার হাজার টাকা। হাওরে যেতে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা সময় লাগবে। দু-তিন দিনের জন্য নৌকা ভাড়া করলে প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করে নেবেন। হাওর ঘুরে রাতটা তাহিরপুর থানার ডাকবাংলোতে থাকতে পারেন। সঙ্গে তেমন কিছুই নিতে হবে না, তবে লাইফ জ্যাকেট অবশ্যই নেবেন। এটা বর্ষাকালে যাওয়ার রাস্তা। শীতকালে নৌকা চলবে না, সে ক্ষেত্রে আপনাকে সুরমা নদী পার হয়ে মণিপুরিঘাট থেকে মোটরসাইকেলে টেকেরঘাট হয়ে টাঙ্গুয়া হাওরে যেতে হবে। নভেম্বর মাসজুড়ে এখানে এমন পানি পাবেন। এর পর থেকে পানি শুকিয়ে যায়।

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook