ছোটাছুটি

ঘরকুনো দুর্নাম ঘুচিয়ে বাঙালির ১১৫ নট আউট

globe-trotter

বাঙালির ১১৫ নট আউট

পেশার টানে জার্মানি হয়ে কানাডা৷ নেশা দেশভ্রমণ৷ ঘুরেছেন ১১৫টি রাষ্ট্র৷ বিশ্বের বাকি দেশগুলোতেও পৌঁছে বাঙালি হিসেবে রেকর্ড করতে চান৷ পর্যটক প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়৷ গল্প শুনলেন পীযূষ আশ

বাঙালি ঘরকুনো! নাকি বাঙালির পায়ের তলায় সরষে? আর যার ক্ষেত্রে যাই হোক না কেন, প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টি সত্যি৷ ভীষণভাবে সত্যি৷ কেননা, আড়াই দশকের দেশভ্রমণের নেশায় প্রসাদবাবু ঘুরে ফেলেছেন ১১৫টি দেশ৷ ইচ্ছে, বিশ্বের সব দেশে অন্তত একবার পা-রাখবেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখেছি দু’একজন বাঙালি পর্যটক এখনও পর্যন্ত ঘুরেছেন আশিটার মতো দেশ৷ আমার সংগ্রহে এখনও পর্যন্ত ১১৫৷ বাকি দেশগুলো ঘুরে ফেলে বাঙালি গ্লোবট্রটার হিসেবে একটা নজির গড়তে চাই৷’

জন্ম, বেড়ে ওঠা কলকাতার ভবানীপুরে৷ ভালো টেবিল টেনিস খেলতেন৷ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রথমে জামালপুর, সেখান থেকে জার্মানি৷ পেশার টানে জার্মানি থেকে পাড়ি কানাডা৷ চাকরি বেশিদিন করেননি৷ বিদেশের মাটিতেই শুরু নিজের ব্যবসা৷ ব্যবসা যেটা, সেটাও বেশ ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’৷ লিমুজিন, মার্সেডিজ-এর অত্যন্ত বিলাসবহুল মডেল কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের কাছে ধার দেওয়া৷ ভবানীপুরের এই বাঙালি আমেরিকা-কানাডার হাই-প্রোফাইল কর্পোরেটদের অলিন্দে ঢুকে পড়েন খুব দ্রুত৷ ব্যবসাতেও সফল, বলাই বাহুল্য৷এতো গেল পেশার কথা৷ এবার নেশা৷ প্রতি বছর দেশে আসেন, কলকাতায় সপ্তাহ দু’য়েক কাটানো একেবারে মাস্ট৷ আর তারপর অজানা, অচেনাকে দেখার নেশায় বেরিয়ে পড়া৷ না, একা নন৷ স্ত্রী-পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে৷ স্ত্রী রূপা মুখোপাধ্যায় (বিয়ের পর বন্দ্যোপাধ্যায়) আন্তজার্তিক স্তরে টেবল টেনিস খেলোয়াড়৷ প্রাক্তন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন৷ জাতীয় স্তরে খেলেছেন কানাডাতেও৷ আর ছেলে কানাডারই সরকারি চাকুরে৷ পাশাপাশি স্বল্প-দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র তৈরি করেন৷ সব মিলিয়ে গোটা পরিবারই টো-টো কোম্পানি৷ প্রসাদবাবুর দেশভ্রমণের বিশেষত্ব সমুদ্রপথ৷ পৃথিবীর নামকরা প্রায় সবক’টা ক্রুজে তিনি চড়েছেন৷ ক্যারিবিয়ান ক্রুজ, নরওয়েজিয়ান ক্রুজ, সেলেব্রিটি ক্রজ-বলতে গেলে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পথ অতিক্রম করেছে এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার৷

তা বেড়ানোর এই বিপুল অভিজ্ঞতা কি সততই সুখের? নাকি বিচিত্র পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে? প্রসাদবাবুর গল্পের স্টক প্রচুর৷ যেমন শোনালেন প্রাগের পকেটমারির কথা! ‘ট্রাম থেকে নামতে যাব, স্থানীয় একজন হাত চেপে ধরলেন৷ কী বললেন, বুঝতে পারলাম না৷ মিনিটখানেক পর যখন মুক্তি পেয়ে রাস্তায় নামলাম, তখনও টের পাইনি আসলে কী হয়েছে! পরে হোটেলে ওয়ালেট বার করতে গিয়ে দেখি সেটি হাওয়া৷ শুধু ইউরো চোট গেলে না হয় একটা কথা ছিল, ওয়ালেটের সঙ্গেই ছিল হেলথ কার্ড, ইনসিওরেন্স-এ সব দরকারি কাগজ৷ এখন কানাডার নাগরিক৷ তাই কানাডিয়ান দূতাবাসেই ফোন করলাম৷ ওরা বলল কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার একটি পুলিশ রিপোর্ট সঙ্গে রাখতে৷ গেলাম পুলিশ স্টেশন৷ ওদের ভাষা আমি বুঝি না৷ ওরাও ইংরেজি জানে না৷ অবশেষে দোভাষী এলেন৷ সব শুনে-টুনে একটা চল্লিশ পাতার রিপোর্ট বার করে বলল, সই করে দাও৷ অজানা ভাষা, তারপর চল্লিশ পাতা-কী লেখা আছে, কে জানে৷ সই না করেই হোটেলে ফিরে এলাম৷ কিন্ত্ত দূতাবাস থেকে আশ্বস্ত করে বলল, এটা এখানকার নিয়ম, সই করে চল্লিশ পাতার রিপোর্টটাই সংগ্রহ করুন৷ এসব চক্করে বেলা গড়িয়ে সন্ধে৷ আবার গেলাম পুলিশ স্টেশন৷ আবার অপেক্ষা৷ দোভাষীর আগমন৷ সইসাবুদ৷ যখন পুলিশ স্টেশন থেকে বেরোলাম, মধ্যরাত৷ ট্রাম-বাস, মানুষজন তো নেই-ই, ট্যাক্সিও নেই৷ মধ্যরাতে প্রাগ শহরে আমি একা৷ আলো-আঁধারি দিয়ে আন্দাজমতো হেঁটে চলেছি৷ দুপুরে পকেটমারি৷ আর মাঝরাতে পথ ভুলে অচেনা শহরে হেঁটে বেড়ানো-আমার তখন ডাক ছেড়ে কাঁদার উপক্রম৷ বেশ কিছুক্ষণ ঘোরার পর, তখন প্রায় ভোর হয়ে আসছে, দেখি একজন পোষ্য কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন৷ হোটেলের নাম বললাম তাঁকে৷ তিনি ইংরেজি বোঝেন৷ বললেন, চিন্তা নেই৷ আমি নাকি হেঁটে হোটেলের কাছেই চলে এসেছি৷ বাকি রাস্তাটাও বাতলে দিলেন৷’ প্রাগ কাহিনি শোনালেন প্রসাদবাবু৷ শোনালেন মেক্সিকোর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনাও৷ জঙ্গলে তিনজন বেরিয়েছিলেন ঘোড়ায় চেপে৷ গাইড, ছেলে আর তিনি৷ গাইড সঙ্গে আছে, এই ভরসায় জঙ্গলের বেশ ভিতরে চলে গিয়েছিলেন৷ ফেরার সময়, তখন আলো পড়ে আসছে, আবিষ্কার করলেন তিনি একা৷ ঘোড়া চলার শব্দ, আর পাখির ডাক ছাড়া সঙ্গী কেউ নেই৷ জঙ্গল, তাই মোবাইলের টাওয়ার নেই৷ জিপিএস তো দূর অস্ত৷ আধঘণ্টা এদিক-ওদিক করার পর দেখা পেলেন গাইডের৷ ততক্ষণে সকলেই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছেন৷

এখন কানাডার নাগরিক হলেও, ভারতীয় পাসপোর্টটি ছাড়েননি তিনি৷ খাতায়-কলমে তিনি OCI-ওভারসিজ সিটিজেন অফ ইন্ডিয়া৷ ‘ভারতীয় পাসপোর্টের কী মহিমা, বুঝেছি জার্মানিতে থাকার সময়’৷ বললেন প্রসাদবাবু৷ ‘আমি যখনকার কথা বলছি, তখনও দুই জার্মানি এক হয়নি৷ মাঝখানে বার্লিন প্রাচীর৷ দুই জার্মানির লোক একদিক থেকে অন্যদিকে যেতে আসতে পারে না৷ কিন্ত্ত ভারতীয় পাসপোর্ট দেখালে চেক পয়েন্টের দরজা আমার জন্য খোলা৷ নেহরুর জন্য আমরা ভারতীয়রা এই সুবিধেটা পেতাম৷’

এই প্রতিবেদন আপনারা যখন পড়ছেন তখন প্রসাদবাবু অস্ট্রেলিয়ার পথে৷ জানালেন, যেখানেই থাকি, যাই করি, বছরে একবার কলকাতা ছুঁয়ে যাবই৷ কানাডার নাগরিক নন, সফল ব্যবসায়ী নন, বাঙালি হয়েই যে তাঁর বিশ্বরেকর্ডের স্বপ্ন৷

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook