ছোটাছুটি

সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই

ধাপে ধাপে নেমে এসেছে খইয়াছড়ার সাদা পানি। ছবি: তোফাজ্জল অপু

 কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝরনা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হাঁ করে দেখার মতো কিছু নেই। এমন ঝরনা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। অপু জানালেন, এটা নাকি এই ঝরনার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরও আছে নাকি?…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

রাত ১০টায় ফোন দিলেন আরমান ভাই, ‘কালকে পাহড়ে ঢুকছি, কাজ-টাজ না থাকলে চলে আসেন।’ পরদিন আমার অনেক কাজ, বলে দিলাম যেতে পারছি না। ফোন রেখে ব্যাগ গোছাচ্ছি, অফিস থেকে বাসায় যাব। হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল পাহাড়ের সারি! অটল-অবিচল সবুজ পাহাড় ধবধবে সাদা মেঘের ভেতরে গলা ডুবিয়ে বসে আছে, তার মাথায় সবুজ চুলের বনে একটানা বাতাসে দোল খেতে খেতে শিস দিচ্ছে ফিঙে পাখির ছানা। আর সবকিছু ছাপিয়ে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে বিরামহীন ছরছর শব্দ। হাজার শব্দের মধ্যেও এই শব্দকে আলাদা করে চিনি আমি। মনের ভেতরে খুশির ফোয়ারা ছড়িয়ে দেওয়া মন-প্রাণ নাচানো এই শব্দ—ঝরনার পানির শব্দ। মাথা ঝাড়া দিয়ে চোখ ফেরালাম সাদা দেয়াল থেকে। চুলোয় যাক কাজ, পাহাড় আমাকে ডাকছে, এই ডাক উপেক্ষা করার মতো কলিজা এখনো আমার হয়নি। অফিসের হাসান ভাইকে রীতিমতো বেঁধে-ধরে এক কাপড়েই সায়েদাবাদ রওনা দিলাম। ঘড়ির কাঁটা রাত দুইটা ছুঁইছুঁই, ততক্ষণে আমরা ছেড়ে গেছি ধুলোর নগর ঢাকার সীমানা—গন্তব্য চট্টগ্রামের মীরসরাই।
.ভোর পাঁচটার কিছুক্ষণ আগে মীরসরাই বাজারে নেমে আরও কিছুদূর এগিয়ে গেলাম খইয়াছড়া বিদ্যালয়ের মাঠে। চট্টগ্রাম থেকে আরমান, অপু আর লিমন ভাইয়ের আসতে সময় লাগবে আর তিন ঘণ্টা। কাজেই এই তিন ঘণ্টার জন্য উদ্বাস্তু আমরা। সাজানো-গোছানো স্কুলের বারান্দায় গামছা পেতে শুয়ে পড়লাম আমি আর হাসান ভাই। পুব আকাশে ততক্ষণে আগুন লেগে গেছে! সূর্যের প্রথম আলো কেটেকুটে ফালাফালা করে দিচ্ছে ঘুমিয়ে থাকা মেঘের সারিকে। ভোরের বাতাসে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে উদ্ভ্রান্ত মেঘের দল। ঘুম মাথায় উঠল, শুয়ে শুয়েই দেখলাম মীরসরাইয়ের পাহাড়ের ওপাশ থেকে সূর্যের উঁকিঝুঁকি। ততক্ষণে চলে এসেছে আমাদের চট্টগ্রামের ‘পাহাড়ি বাহিনী’। পেটে দুটো পরাটা দিয়েই পা চালালাম পুবের পাহাড় লক্ষ্য করে। অপুর কাছে জানলাম এই এলাকায় একটা ঝরনা আছে, কোনো নাম নেই এটার। যেহেতু খইয়াছড়া এলাকায় অবস্থিত, তাই স্থানীয়রা একে ‘খইয়াছড়া ঝরনা’ বলে। আমরা যাচ্ছি এই ঝরনা দেখতেই।
খইয়াছড়া স্কুলের উল্টো পাশের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হলো একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দিচ্ছে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। স্থানীয় লোকদের খেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। একটা বিশাল জামগাছে পেকে টসটসে হয়ে ঝুলে আছে অজস্র জাম। হাত দিয়ে একটা পাতা টানতেই ঝরঝর করে পড়ে গেল অনেক জাম। সে কী মিষ্টি! চলতি পথে এর বাড়ির উঠান, ওর বাড়ির সীমানা পেরিয়ে অবশেষে ঢুকলাম পাহাড়ের মূল সীমানায়। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদের আমরা আবিষ্কার করলাম লাল আর নীল রঙের ফড়িংয়ের মিছিলে! যত দূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে তত দূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাচ্ছি পানি পড়ার শব্দ। চারপাশে মন ভালো করে দেওয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংয়ের পাখায়। একটু দূরে কোনো একটা প্রাণী ডেকে উঠল। লিমন ভাই জানালেন, ওটা মায়া হরিণ। হরিণের ডাক আবার শোনার জন্য কান খাড়া করে ফেললাম। তার বদলে শোনা যাচ্ছে একটানা ঝিমঝিম শব্দ! ওই শব্দের উৎসের দিকেই আমাদের যাত্রা। কিছুদূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরতেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে ঝুপ করে হাজির হলো খইয়াছড়া ঝরনা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে, হাঁ করে দেখার মতো কিছু নেই। এমন ঝরনা আমি এর আগেও গোটা বিশেক দেখেছি। অপু জানালেন, এটা নাকি এই ঝরনার শেষ ধাপ! বলে কি! আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম, আরও আছে নাকি? অপু হেসে বললেন, দম বন্ধ করতে, সৌন্দর্যের শুরু নাকি এখান থেকেই, এলাকার লোকজন সব নাকি এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, ওপরের দিকে আর যায় না। এই ঝরনার ওপরে আরও আটটা ধাপ আছে, আমরা দাঁড়িয়ে আছি নবম বা শেষ ধাপের গোড়ায়।
তড়িঘড়ি করে প্রায় খাড়া ঢাল ধরে হাঁচড়ে-পাঁচড় উঠে চললাম উৎসের দিকে। ঝরনার ষষ্ঠ ধাপে এসে মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা। চোখের সামনে যা দেখছি বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। চশমা খুলে মুছে নিয়ে আবার বসালাম নাকের ওপরে। না, ভুল দেখিনি। আমার সামনে একেবারে খাড়া হয়ে ঝুলে আছে খইয়াছড়া ঝরনার তিনটা ধাপ! প্রতিটা ধাপ থেকে সমান তালে পানি পড়ছে। মনে হচ্ছে যেন বিশাল একটা সিঁড়ি চিৎ হয়ে পড়ে আছে সবুজের বাজারে। প্রতিটা ধাপেই ফুটে আছে রংধনু! আমার আর আরমান ভাইয়ের অবাক হওয়া দেখে মজা পাচ্ছে বাকিরা, ওরা আগেও এসেছে। ওপরে নাকি আরও তিনটা ধাপ আছে, সেখানে আছে একটা গভীর বাথটাব, লাফ-ডুব-সাঁতার সবকিছুই হবে ওখানে।
বাংলাদেশের অনেক ঝরনাই আমি দেখেছি। আমার কাছে সৌন্দর্যের দিক থেকে সবাইকে যোজন যোজন মাইল পেছনে ফেলে এগিয়ে আছে বান্দরবানের জাদিপাই ঝরনা। তবে এই ঝরনা দেখার পর আমার ওই বিশ্বাসটা টলতে শুরু করেছে, কে বেশি সুন্দর? জাদিপাই নাকি খইয়াছড়া!
এখানকার নয়টা ধাপের প্রতিটিতেই রয়েছে প্রশস্ত জায়গা, যেখানে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেওয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝরনার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে।

.কীভাবে যাবেন
পথের দিক হিসাব করলে বাংলাদেশের বেশ সহজপথের ঝরনা এটা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠে ভোরে নেমে যাবেন মীরসরাই বাজারে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে চলে যাবেন খইয়াছড়া স্কুলে। এর উল্টো পাশের পাহাড়ের দিকে যে পিচঢালা রাস্তাটা চলে গেছে, সেদিকে হাঁটা দেবেন। ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পরে নিজেকে আবিষ্কার করবেন এই ঝরনার শেষ ধাপে। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসার বাসভাড়া বাদ দিলে সারা দিনে এই ঝরনার পেছনে আপনার খরচ হবে ১০০ টাকারও কম আর সেটাও নির্ভর করবে আপনি কী খাবেন তার ওপর। সারা দিন ঘুরে রাতের বাসেই ঢাকার পথ ধরতে পারেন।

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook