ছোটাছুটি

ভারতের ঝরনা, দেখা যায় শুধু বাংলাদেশে

দূর পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে পাংতুমাই ঝরনা। ছবি: আল মারুফ রাসেল

গাছের সারি মাথার ওপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। গ্রীষ্মের এই ভরা রোদেও ঝিরি ঝিরি ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের…লিখেছেন রাকিব কিশোর Red dot

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব কোনাটা পাহাড় দিয়ে থরে থরে সাজানো। আঁকাবাঁকা পথে যত ওপরে উঠি ততই আফসোস বাড়ে—আহারে, কেন আমরা আরও উঁচু ওই পাহাড়টা পেলাম না, উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে আফসোসের সীমানাটা বাড়তে বাড়তে একসময় ঝুপ করে পড়ে যায় দূর থেকে বয়ে যাওয়া ডাউকি নদী দেখে। নিটোল স্বচ্ছ আয়নারঙা পানিতে ঠোকর খেতে খেতে চলা পাথরের মতো বুকে জমাট বাঁধে আবেগি কান্নার দল। কাছের সবুজের কারখানাটা এতটা কাছে তবুও হাত বাড়িয়ে ধরার অনুমতি নেই, অনেক বড় বড় লেখা একটা সাইনবোর্ড ‘সাবধান! সামনে ভারত, প্রবেশ নিষেধ’।
তো এভাবেই শুরু আমাদের সেবারের সিলেটযাত্রা। ঠিক এক বছর আগের কথা। গত বছর মে মাসেই গিয়েছিলাম। চলতি পথে সাইনবোর্ডে লেখা সতর্কবার্তা দেখেকিছুক্ষণ মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তাকালাম আল মারুফের দিকে, সে ঘোরাঘুরিপাগল মানুষ, তার কাছে কোনো উপায় পাওয়া যায় কি না। দেখি মারুফ ক্যামেরা হাতে নিয়ে ভারতের পাহাড়ের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। মানুষ ঢুকতে না পারুক, তার ক্যামেরার লেন্স তো ঢুকবে, ভারতের দুই-চারটা পাখিকে আজ আর ‘বন্দী’ না করলেই নয়। হতাশ হয়ে ডাউকি নদী পার হয়ে স্থানীয় এক ভ্যানচালকের কাছে জানতে চাইলাম যে এখানে আশপাশে আর কী কী আছে? উনি খুব আগ্রহ নিয়ে জানালেন এখানে রাজার বাড়ি আছে, একটা ছোট্ট ঝরনা আছে, কমলার বাগান আছে, চায়ের বাগান আছে। আমরা হতাশ, সিলেটে চা-বাগান থাকবে না, তো কী খেজুরবাগান থাকবে! অবশেষে তিনি জানালেন অনেক দূরে একটা ঝরনা আছে, সেটা অবশ্য বাংলাদেশে না, ভারতের ভেতরে পড়ছে তবে বাংলাদেশ থেকে দেখা যায়। আর আমাদের আটকায় কে! ঝরনা বলে কথা! পড়িমরি করে তাঁর ভ্যানগাড়িতে উঠে বসলাম।
খাসিয়াপাড়ার ভেতর দিয়ে চলতে লাগল আমাদের ভ্যানগাড়ি। সিলেটের এই অঞ্চলের রাস্তাগুলো খুব সুন্দর, দুপাশে বিশাল বিশাল গাছের সারি মাথার ওপর দিয়ে তৈরি করেছে সবুজের এক সুড়ঙ্গ, রাস্তা যেদিকে বাঁক নেয় সুড়ঙ্গ সেদিকে ঘুরে যায় অবলীলায়। গ্রীষ্মের এই ভরা রোদেও ঝিরি ঝিরি ঠান্ডা বাতাস গাছের পাতাদের গায়ে গায়ে, কিছু বিশাল পাতার দল একটু নিচু হয়ে আলতো করে নিজের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আগত অতিথিদের।

হাত দিয়ে তাদের সরাতে গেলেই দেখা যায় নানা রঙের পাতাবাহারের ঝাড়। বিশাল চা-বাগান আর কমলাবাগান দেখতে দেখতেই আমরা চলে এলাম প্রতাপপুর সীমান্ত ফাঁড়ির রাস্তায়। এই জায়গাটা একপাশে প্রায় মেঘ টপকে যাওয়া পাহাড় আর তার নিচে শ খানেক ফুটবল খেলার মাঠের মতো সমান জমি নিয়ে আমাদের অবাক করার জন্যই মনে হয় শুয়ে ছিল এতক্ষণ। দূরের পাহাড়ের বুক চিরে সাদা সুতার মতো গলগল করে ঝরছে ঝরনার পানি, একটা, দুইটা, ছয়টা, ১২টা এরপর আর গুনতে পারলাম না। বড় বড় গাছের ছায়ায় চোখ যায় না এমন দূর পর্যন্ত এঁকেবেঁকে সবুজের বুক চিরে চলে গেছে সফেদ সাদা পথটি। এমন একটা পাহাড়ের দৃশ্য দেখার জন্য এমন রাস্তাই আসলে দরকার, প্রকৃতি জানে কোথায় কী দিতে হয়।

ছবির মতো সাজানো রাস্তাটি দিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক চলার পর ‘মাতুরতল’ বাজারে এসে নামলাম আমরা, ভ্যানচালক জানালেন এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হবে, ঝরনার কথা শুনলে আমাদের ক্লান্তি পালিয়ে যায় অচীন দেশে। বিশাল এক পাথর পকেটে নিয়ে হাঁটা শুরু করল চঞ্চল, অনেক দূর হাঁটতে হবে। তবু ওজন নিয়ে হাঁটা শুরু করলে ক্লান্তি নাকি কম লাগবে। এতক্ষণ ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটা রিতু ছাতা বন্ধ করে রেখে দিল, তার বক্তব্য ছাতা মাথায় নিয়ে ঝরনা দেখতে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ‘যাচ্ছি ঝরনায় ভিজতে, ছাতা মাথায় থাকলে ভিজব কীভাবে!’
যাই হোক, ‘মাতুরতল’ বাজার থেকে ধু ধু গরম বালু পায়ের তলায় নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমরা। মাঠ পেরোলাম, ঘাট পেরোলাম, সামনে থাকা খাল পেরোলাম, জংলা জলা-পাথর সব পেরিয়ে পড়লাম বাঁশবাগানে। এর বাড়ি, তার ঘর, আরেকজনের উঠোন সব মাড়িয়ে আমরা চলে এলাম এক বিশাল মাঠে। আমাদের ভ্যানচালক গাইড আঙুল তুলে দেখালেন ওই যে ঝরনা, ‘পাংতুমাই’ ঝরনা। আমরা তাজ্জব—চোখের সামনে মাঠ, আমরা মাঠের গোলপোস্ট ছাড়া আর কিছুই দেখি না, ঝরনা কই! তাঁর দেখানো জায়গার দিকে হাঁটা দিলাম, সামনের ঝোপ সরিয়েই চক্ষুঃস্থির! পাহাড়ের বুক ফুঁড়ে ইংরেজি এস অক্ষরের মতো এঁকেবেঁকে কান ঝালাপালা করে দেওয়া শব্দ নিয়ে ভারতের ঝরনাটা আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তে।
ঝরনার দিকে এগোতে গিয়েই বাধা পেলাম স্থানীয় লোকজনের, কিছু দূর পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমানা। এর পর থেকেই না কি ভারতের সীমানা, ওপারে যাওয়া মানা।
চরম গরমে এত দূর হেঁটে এসে পকেটে রাখা পাথরটা ছুড়ে ঝাঁপ দিল চঞ্চল, তার পানির ঝাপটায় ভিজে চুপচুপে আমরা। গায়ে পানির ছোঁয়া লেগেছে, আর কার সাধ্য আছে আমাদের পানি থেকে দূরে রাখে, তা-ও আবার পাহাড়গলা হিম হিম পানি।
এই ঝরনাটা বাংলাদেশের না, তবে এর সবটুকু পানি এসে পড়েছে এ দেশেরই মাটিতে। এটি দেখার সবচেয়ে বড় আফসোস, এত সুন্দর একটা ঝরনার একেবারে নিচ পর্যন্ত যাওয়া যায় না, এর উল্টো পাশে কিন্তু আরেকটা মজার ব্যাপারও আছে। যদি ভারতীর কাউকে নিজ দেশের এই ঝরনা দেখতে আসতে হয় তাহলে তাকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে এসে তারপর দেখতে হবে। কারণ, এ দেশ ছাড়া এই ঝরনাটির সৌন্দর্য দেখার আর কোনো উপায় নেই।

যেভাবে যাবেন
সিলেট থেকে বাসে করে জাফলং, সেখান থেকে ডাউকি নদী পার হয়ে একটা ভ্যানগাড়ি নিয়ে বলবেন মাতুরতল বাজারে যাবেন, প্রায় দুই ঘণ্টা পর বাজারে এসে যে কাউকে বললেই হবে আপনি পাংতুমাই ঝরনা দেখতে যেতে চান। সানন্দে তারা আপনাকে পথ দেখিয়ে দেবে। এই রাস্তায় কোনো বিপদ নেই, ডুবে যাওয়ার ভয়ও নেই, শুধু দেশের সীমানা অতিক্রম করবেন না।

Facebook Twitter Google+ Pinterest
More
Reddit LinkedIn Vk Tumblr Mail
Facebook